প্রবন্ধ
মূসার পথে কারুনের স্বপ্ন
৩৫৩
০
[আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন — ঈমান ও নেক আমলের বিনিময়ে দুনিয়া ও আখিরাতে ভালো জীবন দেবেন। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, নামাজ-রোজা-চিল্লা পালনকারীরাও মানসিক অশান্তি ও সমস্যায় ডুবে আছেন। এই গড়মিলের কারণ কী?
মূল কারণ হলো — আমরা আল্লাহর ওয়াদার নিজস্ব মনগড়া ব্যাখ্যা করি। ছাত্র ভাবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাবে, ব্যবসায়ী ভাবে বেশি মুনাফা হবে। অথচ আল্লাহ এসব ওয়াদা করেননি। আল্লাহ বান্দার চাওয়ামতো দেন না — এটাই তাঁর রহমত। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার দুআ কবুল হলে পরদিন ক্যাম্পাসে শুধু লাশ পাওয়া যেত।
দ্বিতীয় কারণ — বাহ্যিক আমল ঠিক করা হয়, কিন্তু অন্তরের ইচ্ছা ফাসেদ থেকে যায়। মদ ছেড়েছে, কিন্তু মাতাল হওয়ার শখ এখনও মনে আছে। সুদ ছেড়েছে, কিন্তু অবৈধ পথে ধনী হওয়ার স্বপ্ন এখনও বুকে লালন করছে। মূসা আ.-এর পথে চলছে, কিন্তু কারুনের মহলের আশা করছে — এই পেরেশানি নিজেই ডেকে আনা।
সমাধান — সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. অন্ধ হয়েও দৃষ্টিশক্তির দুআ করতে অস্বীকার করলেন। কারণ: "আল্লাহ আমার জন্য যা চেয়েছেন, তা আমার পছন্দের চেয়ে উত্তম।" পাখি বাতাসে নিজেকে ছেড়ে দেয় — পরিশ্রম ছাড়াই উপরে ওঠে। আল্লাহওয়ালারা এভাবেই জীবন যাপন করতেন, তাই তারা টেনশন কী বস্তু জানতেন না।
নিজেকে ঠিক করার পথ দুটি: বাহ্যিক আমলের সংশোধন ও মনের ইচ্ছার সংশোধন। মক্কার তেরো বছর শুধু দ্বিতীয় কাজটিই হয়েছিল।]
اعوذ بالله من الشيطان الرجيم، بسم الله الرحمن الرحيم،
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
(সূরা নাহল: ৯৭)
وقال تعالى:
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
(সূরা রাদ: ২৮)
وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم:
إن الله تعالى قال: من عادى لي وليا فقد آذنته بالحرب وما تقرب إلى عبدي بشئ أحب إلي مما افترضته عليه ولا يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به ويده التي يبطش بها ورجله التي يمشي بها ولئن سألني لأعطينه ولئن استعاذني لأعيذنه.(রাওয়াহুল বুখারি)
দীনের অনুসারীদের জন্য আল্লাহ তায়ালা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন। এ কথা বলেননি যে, শুধু মৃত্যুর পরেই ভালো জীবন পাবে; বরং দুনিয়া ও আখিরাতে ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা সত্য।
ভালো জীবনের যেসব উপাদান, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো মনে তৃপ্তি থাকা। মন যদি অস্থির হয় তবে কোনো ভালো জীবন হতে পারে না। শরীরের কষ্ট মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু অশান্তির সাথে বাঁচা যায় না। তাই সবাই চেষ্টা করে মন যেন শান্ত থাকে, সুস্থির থাকে। আল্লাহ তায়ালার এটি ওয়াদা।
আল্লাহর মেহেরবানি, মুসলমানরা নিজ নিজ সাধ্যমতো দীনের উপর থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে... আমরাও করে যাচ্ছি। সে হিসেবে আমাদেরও প্রত্যাশা 'ভালো জীবন'। আমাদের নিজেদের ব্যাপারে অথবা আমাদের কাছের যারা আছেন তাদের দিকে যদি তাকাই তবে আল্লাহ তায়ালা যে ওয়াদা করেছেন, সে ওয়াদার বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। দীনের বিভিন্ন লাইনে যারা মেহনত করছেন বা নামাজ-রোজা করছেন, তারা যে অন্যান্যদের তুলনায় একটু শান্ত মন নিয়ে আছেন — এটা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। বিভিন্ন কারণে দুনিয়ার বাকি মানুষ যেমন পেরেশান, নামাজ-রোজার পাবন্দ ব্যক্তি একেবারে সমানভাবে না হলেও উল্লেখযোগ্য তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। এমনকি আরেক ধাপ এগিয়ে বলা যায়, যারা তাবলিগে গেছে, চিল্লা দিয়েছে, দাড়ি রেখেছে, টুপি পরে — তারাও যে খুব একটা আনন্দের মধ্যে, শান্তির মধ্যে, সন্তুষ্টির জীবন পাচ্ছে, এমনটা নয়। তারাও যখন আপনজনদের সাথে বসে কথা বলে, তো নানান অভিযোগ আর দুশ্চিন্তা ব্যক্ত করে; নানান সমস্যার কথা বলে।
দীনের অন্যান্য যে মেহনতগুলো আছে, যেগুলো শুদ্ধ-সহিহ মেহনতের — কোনো বাতিল মেহনতের কথা বলছি না — সাথে যারা জড়িত আছেন, তারাও নানান ধরনের সমস্যার মধ্যে ডুবে আছেন। আর যারা দীনের মেহনতের সাথে নেই, তাদের সমস্যাগুলোর জরিপ যদিও কেউ করেনি; কিন্তু খুব জোর দিয়ে বলা যায় না যে, তাদের সমস্যাগুলো কেটে গেছে বা তারা উন্নত জীবন পেয়েছে। তবে ব্যতিক্রমও কিছু আছে। সেই ব্যতিক্রম তো বেনামাজিদের মধ্যেও পাওয়া যায়। নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না... কিন্তু সে দাবি করে, আমি ভালো আছি। হাবভাবও মনে হয় তাই। আবার নামাজও পড়ে, রোজাও রাখে, অথচ যখন সে বলে, 'আমি সমস্যার মধ্যে আছি', তাহলে তো এটা ভালো কোনো নির্দেশনা দেয় না। কারণ, ব্যাপকভাবে এমনটা বলা হচ্ছে। যদি একজন-দুজন হতো, তাহলে তো ব্যতিক্রমই বলা যেত।
আল্লাহ তায়ালা যে ওয়াদা করেছেন, আল্লাহর ওয়াদা চিরসত্য এবং আমরা যে দীনের উপর চলছি না, এমনও তো নয়। অতএব, বড় একটা কঠিন ধরনের গড়মিলের মধ্যে যেন পড়ে গেলাম।
খলিফা হারুনুর রশিদের জামানায় এক দরবেশ ছিলেন, যিনি বাহলুল নামে পরিচিত। বাহলুল সম্পর্কে অনেক ঘটনা, অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। কোনটি ঘটনা আর কোনটি গল্প — সব আলাদা করে বোঝা মুশকিল। কেননা অনেককিছুই বলা হয়ে থাকে। বাহলুলকে জিজ্ঞাসা করা হলো, বাহলুল, কেমন আছো? উত্তরে বাহলুল বললেন, 'তার কথা কি জিজ্ঞাসা করো, যার ইচ্ছায় জগৎ চলে।' প্রশ্নকারী হতভাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি প্রভুত্বের দাবি করছো নাকি যে, তোমার ইচ্ছায় জগৎ চলে? তোমার কথা তো এমনই মনে হচ্ছে। বাহলুল উত্তর দিলেন, আমি রবুবিয়্যাতের (প্রভুত্বের) দাবি করছি না, আমি আবদিয়্যাতের (দাসত্বের) দাবি করছি। আমি আল্লাহর বান্দা হয়ে গেছি; গোলাম হয়ে গেছি। যেহেতু আমি বান্দা হয়েছি, তাই আমার স্বতন্ত্র কোনো ইচ্ছা নেই। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, আমার ইচ্ছাও তাই। যেহেতু আল্লাহর ইচ্ছায় জগৎ চলে, তাই আমার ইচ্ছাতেই জগৎ চলে। অন্তরে ইতমিনান এসে গেছে।
ইতমিনান তো হাসিল হলো। ইতমিনান হাসিল হওয়ার জন্য জিকিরের শর্ত। জিকির আদায় হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মন থেকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক থাকা চাই। যদি সে দীনের জন্য কিছু করে আর প্রত্যাশা করে এমন জিনিসের যা আল্লাহ তায়ালা দিতেও চাননি এবং ওয়াদাও করেননি; কিন্তু সে নিজে থেকে ধারণা করে বসে আছে। সে তো তার ধারণার উপর ভর করে অগ্রসর হচ্ছে, নামাজ পড়ছে, রোজা রাখছে, হজ্জ করছে, যাকাত দিচ্ছে, অথচ তার কল্পনামতো দেওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেননি। যেমন, আল্লাহ তায়ালা ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন যে, ভালো জীবন দেবেন। এখন যদি সে ছাত্র হয়, হয়তো তার পরীক্ষা সন্নিকটে। এখন সে নিজে থেকে ভেবে নেবে যে, ভালো জীবন মানে হচ্ছে পরীক্ষায় অনেক নম্বর পাওয়া, ভালো রেজাল্ট করা। এটা কেউ তাকে বলেনি; বরং এটা তার মস্তিষ্কপ্রসূত। এখন যদি সে পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পায় বা পরবর্তী পরীক্ষায় যদি সে ভালো নম্বর না পায়, তবে সে মুসলমান হওয়ার কারণে এ কথা তো বলবেনা যে, আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা ঠিক নয়; কিন্তু তার মনের ভেতর অস্থিরতা আসবে। ভাববে, হুজুররা বলেছেন, দীনের পথে চললে প্রশান্তি আছে। আমি তো নামাজও পড়লাম, রোজাও রাখলাম, সদকাও করলাম, আরও অনেক কিছু করলাম... অথচ ভালো কিছু তো পেলাম না। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তার মনে অস্থিরতা আসবে।
আল্লাহ তায়ালা যে ওয়াদা করেছেন —
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
এটা তো সে মোটেই পাচ্ছে না। কলবের ইতমিনান... তো নামাজ-রোজাও তো জিকির। সব ইতাআতকেই জিকির বলা হয়। আল্লাহর সব আদেশ পালনও জিকির। এ সংজ্ঞানুযায়ী সে তো জিকির করেছে; কিন্তু সে তো কিছুই পেল না। এমনিভাবে যদি সে ব্যবসায়ী হয়, সেও এর সত্যায়ন করবে। ভেবে নেবে, অনেক টাকা লাভ হবে। যদি সে নেতা হয় আর ইলেকশন সন্নিকটে হয় তবে সে ধরে নেবে এর মানে হচ্ছে, আগত ইলেকশনে বিজয়ী হওয়া।
ফাযায়েলের কিতাবে
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً
সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে কিছু কথা হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহ. লিখেছেন। তিনি তো লিখেছেন আল্লাহওয়ালাদের কথা; সাহাবাদের কথা; তাবেইদের কথা যে,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا
বলতে কী বোঝায়। সাহাবা ও তাবেইদের মাঝেও অনেক পার্থক্য যে,
فِي الدُّنْيَا
'ফিদ্ দুনিয়া' বলতে কী বোঝায়। বর্তমানে যদি কেউ চট্টগ্রামের বাজারে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, বলো তো, 'রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনিয়া' দ্বারা কী বোঝায়? তো প্রত্যেকে তার নিজস্ব আন্দাজে বলবে; নিজ নিজ ধারণানুযায়ী বলবে। যেমন, কেউ চায়ে অভ্যস্ত; খুব চা পান করে। আর বাজারে চায়ের দাম বেড়ে গেছে। তখন সে বলবে, 'ফিদ্ দুনিয়া হাসানা'-র অর্থ হলো, চায়ের দাম কম হওয়া। সিগারেটখোর বলবে, সিগারেট সস্তা হওয়া। অর্থাৎ, প্রত্যেকে তার নিজ কাঙ্ক্ষিত জিনিসকেই দুনিয়াতে 'হাসানা'-র ব্যাখ্যা করে নেবে। শুধু ব্যাখ্যা করেই ক্ষান্ত দেবে — এমন নয়; বরং সে এমনটাই প্রত্যাশাও করবে। অথচ আল্লাহ তায়ালা তো এমনটা ওয়াদা করেননি।
যাই হোক, এই বিষয়ে আমি একটু অতিরঞ্জিত করে বললাম যে, সিগারেটওয়ালা বলবে, সিগারেট সস্তা হয়ে যাওয়া। মূলত বাস্তবে এমনটাই ঘটে; এর ব্যতিক্রম নয়।
মানুষ যা চাচ্ছে, তার বেশিরভাগের মধ্যে কোনো মঙ্গল নেই। আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানি যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দার কথামতো তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো দেবেন না। মানুষ যা চায় যদি তাই দেওয়া হতো তবে নিজের ক্ষতি আরও বেশি করে করত। বর্তমানে আমাদের সমাজের একেকজন মানুষ নিজেকে গরিব মনে করে। এই কাজটি সে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে নয়; বরং নিজে নিজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, 'আমি গরিব।' এই হিসেবে সে চায়, তার দারিদ্র্যতা যেন দূর হয়। যখন সে নিজেকে গরিবের স্তরে রেখে দেয় যে, আমি গরিব। আর এ কথা যখন সে বলছে, তখন সে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথেই বলছে, 'আমি গরিব মানুষ।' অথচ তার দৈনন্দিন জীবনে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সে প্রচুর অপচয় করে থাকে। অপচয় করে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে; অপচয় করে জামা-কাপড়ের ব্যাপারে... ইত্যাদি আরও বিভিন্নভাবে। অথচ সে প্রার্থনা করে, আমার অভাব যেন দূর হয়। সে যখন আরও অর্থ-সম্পদ পাবে, তখন আরও অপচয় করবে। আর হিসাবের বোঝা তার উপর আরও ভারি হতে থাকবে। অতএব, তার চাওয়া অনুযায়ী তো আল্লাহ তায়ালা দেবেন না। আল্লাহ তায়ালা দেবেন তাঁর নিজ ইলম মতো ওর জন্য যা মঙ্গলজনক।
বান্দা যখন নিজ আমলগুলো করতে থাকে আর সাথে সাথে তার মনের ভেতর যে স্বপ্ন লালন করছিল, সেদিকে অগ্রসর হওয়ার আশা ধরে রাখে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সে সেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পাবে না। আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের উপর যত মেহেরবান আছেন, তার মধ্যে এটাও একটা মেহেরবানি যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তার কথামতো দেবেন না। আমি থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন যদি এখানে আল্লাহ তায়ালা সবার দুআ কবুল করতেন, তবে পরেরদিন ক্যাম্পাসে শুধু লাশই লাশ পাওয়া যেত। এই পার্টির দুআ যেন ওই পার্টি শেষ হয়ে যায়। ওই পার্টির দুআ যেন এই পার্টি শেষ হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালার বহুত বড় মেহেরবানি যে, আল্লাহ তায়ালা কারো দুআই কবুল করেননি। দুআ কবুল করলে কারোরই উপায়ই থাকত না।
আল্লাহ তায়ালা যে ইতমিনানের জিন্দেগির ওয়াদা দেবেন, তো ইতমিনানের জিন্দেগির জন্য বাহ্যিক আমল শুদ্ধ হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং বাহ্যিক আমল তো খুবই ছোট অংশ। আমি যে খুব জোর দিয়ে বললাম, 'ছোট অংশ'-এর দলিল কী? দলিল হলো, আল্লাহ তায়ালা আমলের ই'তেবার করবেন নিয়্যতের উপর। নিয়্যত যদি শুদ্ধ হয় তবে আমল গ্রহণযোগ্য। আর আমল যদি শুদ্ধ হয় আর নিয়্যত যদি ভুল হয় তবে আমল অগ্রহণযোগ্য। নিয়্যত হলো ইচ্ছা, যা মনের ভেতরে থাকে।
আল্লাহ তায়ালা ইতমিনানের জিন্দেগির ওয়াদা করেছেন। ইতমিনানের জিন্দেগি তখনই আসবে যখন সে তার বাহ্যিক আমলকে সংশোধন করার সাথে সাথে অভ্যন্তরকে সংশোধন করবে। বর্তমান তারতিব হিসেবে বললাম। নচেৎ রাসূল সা.-এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাসূল সা. বাহ্যিক আমল সংশোধনের উপর হাতই দেননি আভ্যন্তরীণ সংশোধন যথেষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে। মক্কার দশ বছরে বাহ্যিক কোনো আমল সংশোধনের দিকে নজর দেওয়া হয়নি। মদ পান করত — নিষেধ করা হয়নি; সুদ খেত — নিষেধ করা হয়নি; নারী-পুরুষে অবাধ মেলামেশা ছিল — নিষেধ করা হয়নি। একটি জিনিসেরই আমল ছিল — নিজের অভ্যন্তরকে ঠিক করা; নিজের ঈমানকে ঠিক করা। আল্লাহ তায়ালার সাথে ভালোবাসা কায়েম করা। ঈমানই হচ্ছে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক —
اَلَّذِيْنَ آمَنُوْا أَشَدُّ حُبًّا لِلّٰه
'যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহকে অনেক বেশি ভালোবাসে।'
মনের ফাসাদ কী জিনিস? মনের ভুল কী জিনিস? মনের ভুল হচ্ছে, এমন জিনিসকে ভালোবাসা, যে জিনিসকে আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না। এই তাহারাতের (পবিত্রতার) উপর সর্বাগ্রে আমল করতে হবে।
هُدًى لِلْمُتَّقِيْنَতাহারাতের (পবিত্রতার) উপর সর্বাগ্রে আমল করতে হবে। নামাজের মধ্যে যেমন পবিত্রতার শর্ত রয়েছে যথা, কাপড় পবিত্র হতে হবে; জায়গা পবিত্র হতে হবে; শরীর পবিত্র হতে হবে। বাহ্যিক নাপাকি যদি হয় অথবা এমন কিছু জিনিস যদি লেগে থাকে, যা আল্লাহ তায়ালা পাক হিসেবে গ্রহণ করেন না। যেমন, জামায় যদি গোবর লেগে থাকে অথবা কাপড়ে পেশাব লেগে থাকে; অথবা গায়ে থাকে। অর্থাৎ, অপবিত্র জিনিস লাগলে যেমন শরীর নাপাক হয়, ঠিক তেমনিভাবে অন্তরে খারাপ মহব্বত থাকলে অন্তর নাপাক হয়। বাহ্যিক নাপাকি যেমন শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে নামাজ ফাসেদ হয়, ঠিক তেমনিভাবে আভ্যন্তরীণ নাপাকির ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা সহজতা রেখেছেন যে, শরয়ি ফাসেদ হবে না; কিন্তু ওই আমল গ্রহণযোগ্যও হবে না।
আল্লাহ তায়ালা দীনের জন্য কিতাব দিয়েছেন। এই কিতাব থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা শর্তও দিয়েছেন। বাহ্যিক শর্ত হলো, এই কিতাবকে স্পর্শ করা যাবে না নাপাক অবস্থায় —
لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُوْنَ
'নাপাক অবস্থায় যেন কুরআন শরীফ স্পর্শ না করে।' বাহ্যিক স্পর্শ করার জন্য এইটুকু শর্ত। আর তার দিলটা যেন কুরআনকে ছুঁতে পারে, তার দিলটা যেন কুরআন শরীফ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, এইজন্য আল্লাহ তায়ালা আভ্যন্তরীণ শর্ত রেখেছেন। বলেছেন —
هُدًى لِلْمُتَّقِيْنَ
এই অংশটি বয়ান নং-৪ এর সেই জায়গার সংযোগ যেখানে বলা হয়েছিল — মুত্তাকি না হলে কুরআনের মর্মার্থ অন্তরে পৌঁছায় না। বাহ্যিক তাহারাত ও আভ্যন্তরীণ তাহারাতের এই সুন্দর তুলনাটি পুরো বয়ানের মূল বক্তব্যকে আরও পরিপূর্ণ করে দিয়েছে।
যদি অপবিত্র হয় তাহলে সে কুরআন শরীফ স্পর্শ করতে পারবে না, ঠিক তেমনিভাবে মুত্তাকি যদি না হয় অর্থাৎ, তার অন্তর যদি পবিত্র না হয় তাহলে তার অন্তর কুরআন শরীফের মর্মার্থ স্পর্শ করতে পারবে না। ওই অবস্থায় সে কুরআন শরীফ পাঠ করে যেত আর অর্থ সে নিজে নিজে বের করত। স্বাভাবিকভাবে ওটা শুদ্ধ হতো না; আল্লাহ তায়ালা যে ধরনের বলেছেন, সে ধরনের নয়। কেউ কেউ এর দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, যা বাস্তব নাকি কাল্পনিক — আমি ঠিক জানি না। এক ব্যক্তি কুরআনের অর্থ জানে, আরবি জানে, তাকে নামাজ পড়তে বলা হলো। সে উত্তর দিলো, আমার উপর নামাজ ফরজ নয়। কেন? কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ঈমানদারদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে নামাজ কায়েমের মাধ্যমে —
اَلَّذِيْنَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ
'দুনিয়াতে তাকে প্রতিষ্ঠিত করলে নামাজ কায়েম করবে।' আমি প্রতিষ্ঠিত নই। অস্থায়ী চাকরি করি; ভাড়া বাড়িতে থাকি। আর যদি প্রবাসী কেউ হয়, সে বলবে, আমি তো এখনো সিটিজেনশিপ পাইনি। তো কোনোভাবেই আমি প্রতিষ্ঠিত হইনি। অতএব, আমার উপর নামাজ ফরজ নয়। অতএব, এই অবস্থায় নামাজ পড়া ঈমানদারির কাজ হবে না। কেননা, ঈমানদারদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হলে নামাজ কায়েম হবে। আমি যেহেতু প্রতিষ্ঠিত না, তাই এই অবস্থায় নামাজ পড়া, এটা বে-ঈমানির কাজ হবে।
আরেকজনকে নামাজ পড়তে বলা হলো। সে আরও এক ধাপ এগিয়ে উত্তর দিলো, নামাজ পড়া তো জায়েযই নয়। কেন? কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ
'নামাজের নিকটবর্তীও হয়ো না।' তখন তাকে বলা হলো, তুমি তো অর্ধেক আয়াত বললে। সম্পূর্ণ আয়াত পড়লেই তো তুমি সঠিক অর্থ বুঝতে। তখন সে বলল,
فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ
'কুরআনের ওইটাই পড়ো যা তোমার জন্য সহজ।' সূরা মুয্যাম্মিলের আয়াত। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ভাষার সমস্যা নয়, বোঝার সমস্যাও নয়। সমস্যা হলো তার অন্তরের ভুল গতিপথ। তার মনে যা চায়, সে সেদিকেই ধাবমান। সুতরাং তার দৃষ্টি যদি ঠিক না হয়, তাহলে যা দেখবে সবই বে-ঠিক।
যাদুর বিষয়টা ধরুন! হিন্দুরাও যাদু করে, মুসলমানরাও করে। মুসলমানদের অনেকে কুরআন শরীফের আয়াত দিয়ে করে; হাদিসের শরীফের কথা দিয়ে করে। তো আয়াত তো কুরআন শরীফের, পবিত্র; কিন্তু আয়াত দিয়ে সে যে কাজ করছে, ওই কাজে তো কাফের হয়ে যাবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা এইজন্য কুরআন দেননি; অন্য কাজের জন্য দিয়েছেন। সুতরাং একজন যাদুকর যেমনিভাবে কুরআন শরীফের আয়াতকে বেজায়গায় লাগায়। কারণ, তার অন্তর বেঠিক কিন্তু আয়াত বেঠিক নয়; আয়াত ঠিক। কিন্তু এর মাধ্যমে তার নামাজ-রোজা-হজ-যাকাত তথা সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে যদি সে ঠিক পথে না চলে তাহলে স্বাভাবিকভাবে তার অন্তর অস্থির থাকবে; পেরেশান থাকবে।
এর দৃষ্টান্ত হলো, এক ব্যক্তি আমল ঠিকঠাক মতো করেছে, মূসা আ.-এর পথে চলছে। আর মনে মনে আশা করছে, কারুনের বাড়িতে পৌঁছাবে। সুতরাং সে যতবেশি মূসা আ.-এর পথে চলবে, ধাপে ধাপে ততবেশি মূসা আ.-এর ঝুপড়ি নজরে আসবে আর ততবেশি কারুনের ঐশ্বর্য থেকে দূরে সরে যাবে। তার পথ চলা তো ঠিক যে, সে মূসা আ.-এর পথেই যাচ্ছে; কিন্তু সে পথে গিয়ে যদি সে আশা করে, এই পথে চললে আমি কারুনের মহল পাবো, তবে সে বড়ই পেরেশানির মধ্যে আছে। কারণ, এটা কারুনের পথ নয়, মূসা আ.-এর ঝুপড়ির পথ। এই পথে কারুনের মহল পাওয়া যাবে না, আর আল্লাহ তায়ালা এর ওয়াদাও করেননি। এটা স্রেফ সে নিজের ধারণাবশত করছে। মানুষ তার ধারণার উপরই চলে।
আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি জামানায় শুধু দীনের কথাই বলেননি; বরং সাথে সাথে প্রত্যেকের জন্য মেহনতও দিয়ে দিয়েছেন। এই মেহনত আমলের মধ্য দিয়ে, পরিবেশের মধ্য দিয়ে তার মনের ইচ্ছার সংশোধন করে। পরীক্ষা-সংশোধন ছাড়া যদি সে কথাগুলো পায়, তবে কথাগুলোর সে সঠিক ব্যবহার করবে না।
আমাদের দেশে ঘরে ঘরে যদি দীনি কিতাবের জরিপ করা হয় যে, সাধারণত ঘরগুলোতে কী কী দীনি কিতাব পাওয়া যেতে পারে? ঘরে কী ধরনের দীনি প্রচলন আছে? দেখা যাবে, বেহেশতি জেওরজাতীয় কিতাব খুব বেশি পাওয়া যাবে না; বরং এর চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া যাবে অন্যসব কিতাব যেগুলো দিয়ে নানান ধরনের মুকদ্দমা জেতা যায়; রোগ সারানো যায়; প্রতিবেশীকে ধ্বংস করা যায়; বিবিকে বশ করা যায়; স্বামীকে বশ করা যায়; শ্বশুরের সম্পদ কীভাবে দখল করা যায়। এসব আমলই পাওয়া যাবে, আর ঘরে ঘরেই পাওয়া যাবে। এগুলো যদিও কুরআনি বা হাদিসের আমল, আর আয়াতও বেঠিক নয়, সঠিক আয়াত। আর এই আয়াতগুলো দিয়ে যদি আমলগুলো করা হয় তবে এটা কার্যকরও বটে। আয়াতগুলো কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলেও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সে এই আয়াতগুলো দিয়ে এই আমল করে তবে সম্ভাবনা আছে যে, তার প্রতিবেশী ধ্বংস হবে। বা শ্বশুর তার সব সম্পত্তি দিয়ে দেবে। অথচ আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফ দিয়েছেন, এটা তিনি প্রতিবেশীকে ধ্বংস করতে দেননি; শ্বশুরের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য দেননি। দিয়েছেন অন্য কাজে, অথচ আমরা এই কাজে প্রয়োগ করছি। কেন প্রয়োগ করছি? কারণ, যার অন্তরের রুখ যেদিকে, সে হাতের কাছে যা পায়, সব ওদিকেই লাগায়।
আল্লাহ তায়ালা দীনের মেহনত দিয়েছেন। দীনের মেহনতের প্রধান কাজ হলো, অন্তরের সংশোধন। এক্ষেত্রে 'ইসলাহ...' শব্দটা খুব প্রচলিত ও পরিচিত। সাধারণত আমরা ইসলাহ বলতে বুঝি, আমলের সংশোধন। নামাজ পড়ে না, পড়তে আরম্ভ করা; মদ পান করে, মদ পান ত্যাগ করা; সুদ খায়, সুদ খাওয়া ছেড়ে দেওয়া; মিথ্যা বলে, মিথ্যা বলা ছেড়ে দেওয়া। এগুলো হলো ইসলাহ। নিশ্চয়ই ইসলাহের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ আমলকে সংশোধন করা; কিন্তু ইসলাহের প্রধান অংশ হচ্ছে, তার অন্তরের ইচ্ছার সংশোধন করা। সব ভালো আমলগুলো সে করতে থাকে; কিন্তু তার ইচ্ছা যদি ফাসেদ হয়, তবে সে পেরেশানির মধ্যে থাকবে। সে সত্য কথা বলে, নামাজ পড়ে, মদ পান ছেড়েছে, সুদ খাওয়া ছেড়েছে; কিন্তু পূর্বে যে ইচ্ছা ছিল, সে বিরাট ধনী হবে — সে ইচ্ছা এখনও আছে। এখন যে সে মদ পান ছেড়েছে, সুদ খাওয়া ছেড়েছে, অতএব ধন-সম্পদ যে বেশি কামাইয়ের সম্ভাবনা ছিল, এটা ক্রমেই তার থেকে দূরে সরে যাবে। এবং যেগুলো ছিল, ওগুলোও তার হাতছাড়া হয়ে যাবে। কারণ, সে তার ব্যবসাকে যেভাবে গড়ে তুলেছিল, ওই যে ভালো কন্ট্রাক্ট পেতে হলে পার্টিতে যেতে হয়, মদ পান করতে হয়, মদ পান করাতে হয়, ইত্যাদি নানা বিষয় জড়িত ছিল। এখন সে বাহ্যিক আমলের তো ইসলাহ করে ফেলেছে যে, এখন সে মদ পান করছে না, পান করাচ্ছেও না, পার্টিতেও যায় না, কিন্তু এরপরেও তার অন্তরের ইচ্ছার ইসলাহ হয়নি। আগে যেমন সে ধনী হতে চাইত, এখনও সে সেইরকমভাবে ধনী হতে চায়। আর ধনী হওয়ার জন্য যে পথ ছিল, সে পথে ধনী হওয়ার উপায় নেই। মনের ইচ্ছা যদি সকলের পূরণ হতো তবে কেউ কাফের থাকত না, কেউ ফাসেক থাকত না। আর নানান ধরনের গুনাহর নানান ধরনের ফায়দা বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাময়িকভাবে দেখা যায়। আর দেখা যায় বলেই গুনাহর কাজগুলো দুনিয়াতে টিকে আছে, এবং থাকবেও।
গুনাহর কাজ দ্বারা যে ফায়দা সে পেত, সে ফায়দা এখনও চায়; যদিও গুনাহর কাজ সে ছেড়ে দিয়েছে। এর একটা দৃষ্টান্ত হলো, মাতাল... মাতাল হওয়ার মাঝে বড়ই আনন্দ লাগে। যখন কেউ মাতাল হয় তো দেখা যায়, সে কারো কথায় নাচছে, গান গাইছে... যেন খুবই আনন্দ-বিভোর হয়ে আছে।
তো তার মাতাল হওয়ার শখ এখনও বাকি আছে, যদিও সে মদ পান ছেড়ে দিয়েছে। মাতাল হতে হলে মদ পান করতেই হবে, এছাড়া মাতাল হওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। তার বাহ্যিক আমল তো ঠিক করেছে, কিন্তু অন্তর মাতালই রয়ে গেছে। আর সে খারাপ জিনিসগুলোই চায়।
আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবান করে আমাদেরকে দীন দিয়েছেন। যেমনভাবে দীনের মাঝে বাহ্যিক আমলের সংশোধন করতে হয়, ঠিক তেমনিভাবে আভ্যন্তরীণ সংশোধন জরুরি; বরং অত্যন্ত জরুরি তার ভেতরের অংশকে সংশোধন করা। বেশি জরুরি এইজন্য বললাম যে, রাসূল সা. এভাবেই দুআ করেছেন:
قُلِ اللَّهُمَّ اجْعَلْ سَرِيْرَتِي خَيْرًا مِّنْ عَلَانِيَتِي وَاجْعَلْ عَلَانِيَتِي صَالِحَة
'হে আল্লাহ, তুমি আমার অভ্যন্তরকে আমার বাহ্যিকের চেয়ে বেশি ভালো করে দাও।' (এটা বেশি চেয়েছেন।) আর এরপর চেয়েছেন, 'আমার বাহ্যিকও ঠিক করে দাও।' বাহ্যিক যে খারাপ হবে, তা নয়; তবে ভেতরের সংশোধন বেশি চেয়েছেন।
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّات
নিয়্যত হলো ভেতরের জিনিস। নিয়্যত শুদ্ধ হয়ে আমল যদি ভুলও হয়, তবুও আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন। আর নিয়্যত যদি ভুল হয় আর আমল যদি শুদ্ধ হয় তবে তা প্রত্যাখ্যাত। সুতরাং বোঝা গেল, ভেতরেরটাই বেশি জরুরি।
সাহাবাগণ বায়তুল মাকদিস অভিমুখী হয়ে নামাজ পড়তেন। রাসূল সা.-ও পড়তেন। পরবর্তীতে যখন হুকুম হলো, বায়তুল্লাহর দিকে ঘুরে গেলেন। ইহুদিরা বলল, মুসলমানরা বায়তুল মাকদিস অভিমুখী হয়ে এতদিন যত নামাজ পড়েছে, সব বাদ হয়ে গেল। আল্লাহ তায়ালা উত্তরে বললেন:
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ
'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ঈমানকে নষ্ট করেননি।' উলামাগণ বলেন, এই জায়গায় ঈমান বলতে নামাজ বোঝায়। সুতরাং প্রশ্ন আসতে পারে যে, নামাজই যদি বোঝায় তবে আল্লাহ তায়ালা কেন সরাসরি বললেন না যে, 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নামাজকে নষ্ট করেননি!'? আল্লাহ তায়ালা তো তাঁর দীনকে সহজ করে দিয়েছেন, খামোখা কঠিন বানাবেন না। আল্লাহ তায়ালা তো সাহিত্যিক আর কবিদের মতো নন, যারা খামোখা কঠিন বানায়। আল্লাহ তায়ালা তো সহজই করতে চান। এর উত্তর হলো, বাহ্যিকভাবে সবার নামাজই ঠিক হয়ে গেছে। কেননা, কিবলামুখী হওয়া নামাজের আরকানের অন্তর্ভুক্ত। আর সবাই কিবলামুখীই হয়েছে। কারণ, শুধু বাহ্যিক নামাজই নয়, আল্লাহ তায়ালা নিয়্যতকেও ধর্তব্য করেন। আর যেহেতু সবার অন্তরে ঈমান ছিল, অতএব নামাজ হয়েছে। আর এই ঈমানটাই উদ্দেশ্য।
এইজন্য ভাই, বড় জবরদস্ত মেহনতের প্রয়োজন যে, আমি আল্লাহর পথে বের হয়ে আমার অন্তরের ইসলাহ করি। আর দুআ করার সময় এই দুআগুলোই করবে, যে দুআগুলো আল্লাহর নিকট পছন্দনীয়।
সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বড় মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবি ছিলেন। মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ (যাঁদের দুআ কবুল হয়) ছিলেন। মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ অনেক সাহাবি ছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিও একজন, যাঁর দুআ কবুল হতো। তাঁর কাছে লোকেরা এসে বিভিন্ন দুআর দরখাস্ত করত। তিনি দুআ করতেন, আর দুআ কবুল হয়ে যেত। শেষ জীবনে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এক লোক তাঁকে বলল, 'কত লোকের জন্য দুআ করেছেন, আর আল্লাহ তায়ালা কবুলও করেছেন। এখন আপনি আপনার নিজের জন্য আল্লাহর নিকট দৃষ্টিশক্তি প্রার্থনা করুন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য যা পছন্দ করেছেন, সেটা আমার নিজের পছন্দের চেয়ে বেশি ভালো।' তাঁর ক্ষেত্রে তো এইরকম হয়নি যে, দুআ করেছি; কিন্তু কবুল হয়নি, অতএব সবর করলাম। বরং দুআ করতেই রাজি হননি যে, আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য যা চেয়েছেন, আমি এর বিপরীত কেন চাইবো! বনী ইসরাইলের মতো যে, যখন তারা মূসা আ.-কে বলেছিল, 'আমাদের মান্না-সালওয়া আর ভালো লাগছে না। আমাদের পেঁয়াজ দাও... রসুন দাও...।' আর আল্লাহ তায়ালা নারাজ হয়ে বলেছিলেন, 'ভালোর পরিবর্তে খারাপ চাও!' তো সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা আমাকে যা দিয়েছেন, সেটা ভালোর জন্যই দিয়েছেন। এর উপরেই আমি সন্তুষ্ট। আমি এটা বদলাতে চাই না।' সুতরাং যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য ইতমিনানের ওয়াদা করেছেন।
দুনিয়ার জীবনে অন্ধ হয়ে যাওয়া বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বড়ই মুসিবত। এটা দুবেলা ভাত না পাওয়ার মতো নয়; অভাবে পড়ার মতো নয়; বরং অনেক বেশি কষ্টের। এতদসত্ত্বেও তিনি এর বিপরীতে দুআই করতে চাচ্ছেন না; বরং এতেই তিনি সন্তুষ্ট। তো সন্তুষ্ট অবস্থায় অন্তরে পেরেশানি আসবে কোথেকে? অন্তরে পেরেশানি তো তখনই আসবে যখন মনে চায় এক জিনিস আর হয় অন্য জিনিস।
আল্লাহওয়ালারা আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর নিজেদেরকে এমনভাবে সমর্পণ করতেন, যেভাবে পাখি নিজেকে বাতাসের স্রোতের উপর ছেড়ে দেয়। পাখিগুলো কোনো পরিশ্রমই করে না। আর বিনা পরিশ্রমে উপরে উঠতে থাকে। এমনিভাবে আল্লাহওয়ালাদের জীবনে কোনো পেরেশানি থাকে না। অস্থিরতা আর পেরেশানি দুনিয়াদারদের বড় অংশজুড়ে রয়েছে। ওলি-আল্লাহদেরকে যদি এই শব্দগুলো নানানভাবে, নানান শব্দে, নানান প্রতিশব্দ আর তাফসির দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করে, তবে শেষ পর্যন্ত বোঝাতে পারবে না যে, টেনশন কাকে বলে; ফ্রাস্ট্রেশন কাকে বলে। কারণ, এ সম্পর্কে তো তাঁর কোনো অভিজ্ঞতাই নেই, বুঝবেন কেমন করে। তাঁরা তো আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট, অসন্তুষ্ট হবেন কখন!
এইজন্য ভাই, আল্লাহর পথে বের হই, আল্লাহর কথামতো চলা শিখি। শুধু বাহ্যিকভাবে নয় যে, আল্লাহ তায়ালা যেভাবে হুকুম দিয়েছেন — হালালকে ধরা, হারামকে ছাড়া। এটা তো করতেই হবে; কিন্তু এর সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা আমাকে যেখানে নিয়ে যেতে চান, আমি যেন সেখানে যেতে রাজি হয়ে যাই।
ঘোড়ার উদাহরণটা পছন্দনীয় যে, ঘোড়া এইরকম — মালিক তাকে যেদিকেই ইশারা দেয়, সে সেদিকেই দৌড়ে যায়। একেবারে টানাটানির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করে না। একটি পরিণত ঘোড়া ইঙ্গিত বোঝে। ইঙ্গিতমতো মালিক যেদিকে যেতে চায়, সে সেদিকেই নিয়ে যায়। এর মোকাবেলায় ছাগলের দৃষ্টান্ত একেবারেই বিপরীত। ছাগলকে দিয়ে নবীদের তারবিয়ত করা হয়েছে। কারণ, এটা বড়ই উগ্র মেজাজের। গৃহস্থ যখন সকালে তাকে বাইরে নিয়ে যেতে যায় যেখানে তার খাবার আছে, সে পা দুটো সামনে শক্ত করে আঁটসাঁট হয়ে বসে যাবে যে, ও আগে যাবেই না। কী কারণে? কী যুক্তিতে? কিছু না; ও যাবে না, ব্যস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গৃহস্থের মারধোর খেয়ে বাধ্য হয়ে সামনে যায়। সামনে ঠিকই গেল আর খামোখাই এই মারধোরে কষ্ট পেল। আবার সন্ধ্যাবেলা যখন তাকে নিয়ে আসবে, তখনও সে উলটো কথা, সে আসবে না।
তো বেশিরভাগ মানুষ এই উলটো। আল্লাহ তায়ালা তাকে কল্যাণের দিকে ডাকছেন আর সে তার উলটো দিকে চলে যাচ্ছে। কেন? এর কোনো কারণ নেই। তাহলে তো পেরেশানিই হবে। মনের এই অস্থিরতার কারণে ছাগল সর্বদা পেরেশান থাকে। ছাগলকে বেঁধে দেওয়া হলো, দড়ি পাঁচ হাত লম্বা। ছাগলকে দেখা যাবে, একেবারে প্রান্তের পাতাগুলো যেগুলো বড় কষ্ট করে নাগাল পাবে, যে পাতাগুলো খেতে গিয়ে দড়িতে টান লাগে, হাঁটু গেড়ে আছে, জিভ লম্বা করে সে পাতাগুলো খাচ্ছে। কাছের সহজে নাগালসাধ্য পাতা সে খাবে না। এখন যদি দড়ি আরও পাঁচ হাত লম্বা করে দেওয়া হয়, আগে পাঁচ হাত ছিল, এখন যদি দশ হাত করে দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে, কিছুক্ষণ আগে বহু কষ্টে যে পাতাগুলো খেতে চাচ্ছিল, সেগুলো আর খাবে না। আবারও টান টান করে সর্বশেষ পাতা ধরতে যাবে। অর্থাৎ, ও নিজেই নিজের জন্য পেরেশানিকে বেছে নেয়। যেখানে ওকে থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে সে থাকতে চায় না।
মানুষ যদি তার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যে ফয়সালা করেছেন, এর মধ্যে থাকতে না চায় তবে সে পেরেশান থাকবে। আর তার জন্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে যদি না থাকে, তবে তার জীবনের আরাম চলে যাবে। এইজন্য ভাই, আল্লাহর পথে বের হই। আল্লাহর কথামতো, আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য যে জীবন পছন্দ করেন, আমি সে জীবনকে গ্রহণ করি। আর এই গ্রহণ মুখের কথায় নয়, বরং বড় মেহনত দিয়ে এটা দিলের মধ্যে নিতে হবে। এইজন্য সময় লাগাতে হবে। এটা বড় মেহনতের জিনিস। সেইজন্য সব জামানায় সফল ব্যক্তিগণ বড় জবরদস্ত মেহনত করে মনে এই পরিবর্তনগুলো এনেছেন।
মক্কার তেরো বছরের মেহনত-কোরবানি... অন্য কিছু নয়। পরবর্তী জামানায় কেউ কেউ পীরের কাছে বছরের পর বছর পড়ে থাকতেন; কেউ ঘোড়ার আস্তাবলে পড়ে থাকতেন; কেউ ঘোড়ার গোবর পরিষ্কার করতেন। তো বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, গোবর পরিষ্কার করার বড়ই ঠেকা। মূলত গোবর পরিষ্কার করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না; বরং অন্তরকে পরিষ্কার করার জন্যই গোবর পরিষ্কার করানো হচ্ছিল। বলা হয়, 'অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে তুমি এখানে চলে এসেছো! অস্ট্রেলিয়ার সবাই কি দীনদার হয়ে গেছে?' আবার এখান থেকে যখন যায়, তখন বলা হয়, 'এখানকার সবাই কি দীনদার হয়ে গেছে?' সবাই দীনদার হয়েছে কি হয়নি, এটা বড় কথা নয়। এর মেহনত করে নিজেকে ঠিক করতে হবে। এই মেহনতের (বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সংশোধন) বিভিন্ন দিক রয়েছে, তার মধ্যে এটাও (আল্লাহর পথে বের হওয়া) একটি। এইজন্য ভাই, আল্লাহর পথে বের হয়ে আমি আমার নিজেকে ঠিক করি।
আর নিজেকে ঠিক করার জন্য প্রধানত
দুটি জিনিস:
১. বাহ্যিক আমলকে ঠিক করা,
আর ২. মনের ইচ্ছাকে ঠিক করা।
এইজন্য বুজুর্গগণ তিন চিল্লার জন্য বলেন। যাদের আগেই তিন চিল্লা হয়ে গেছে, তারা প্রতি বছরই তিন চিল্লার নিয়ত করি। আর যাদের তিন চিল্লা হয়নি, তারা তিন চিল্লার নিয়ত করি। আল্লাহ তায়ালা কবুল করুন। আমিন।
সমাপ্ত।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ওয়ায-মাহফিল আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-নীতি
ওয়ায মাহফিলের উদ্দেশ্য দৈনন্দিন জীবনে মহান আল্লাহ পাকের বিধি-বিধান সঠিকভাবে পালন করার জন্য প্রয়োজনী...
বিশ্ব ইজতেমা মানুষের জীবনে ইসলামি প্রভাব ফেলছে কতটা?
টঙ্গীর তুরাগ তীরে শুরু হয়েছে বিশ্ব ইজতেমা। করোনা মহামারিতে দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে...
দাওয়াত ও তাবলীগ : কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কথা
...
ইংরেজি পড়ব কি পড়ব না
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন