প্রবন্ধ
কাবিননামার ১৮নং ধারা: আমাদের অজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণতি
২২ জানুয়ারী, ২০২৬
১১৫৪৬২৫
০
আমরা অনেক স্বামীকেই দেখেছি যে, তারা কাবিননামার ১৮ নং ধারায় উল্লেখিত “স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অধিকার” প্রাপ্ত
হওয়ার ভিত্তিতে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে প্রায়শই ঠুনকো অজুহাতে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেওয়ার
অভিযোগ উত্থাপন করেন। তখন তাদের কাছে কাবিননামার কপি তলব করলে তারা নকল কপি উঠিয়ে আমাদের
কাছে পেশ করেন। অতঃপর তাদের দিকে যখন এই প্রশ্ন ছুড়ে দেই–কাবিননামায় ১৮ নং একটি ধারা আছে, সেই
ধারা সম্পর্কে কিছু জানেন? কেউ নতদৃষ্টিতে, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠেন—“হুজুর, কাবিননামায় এমন
একটি ধারা যে আছে, তা আমাদের জানাই ছিল না।”
কারো কারো কাবিননামার ১৮ নং ধারার ঘরটি
সম্পূর্ণ খালি পেয়েছি। কারোটায় শুধু “হ্যাঁ” লেখা পেয়েছি। কোনটিতে গদবাধা একটি কথা
লেখা আছে, “হ্যাঁ, বনিবনা না হলে” । আহ, কী অজ্ঞতা! আমি এও শুনতে পেয়েছি–কারো এ ধারার ঘরে “তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ
করা হয়েছে” বলে লেখা আছে। কী সর্বনাশ! আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই
সর্বনাশার দায় বর্তায় কাজি সাহেবের উপর।
মূলত এই ঘরটি রাখাই হয়েছে বরকে পূরণ করার জন্য। সে
প্রাজ্ঞ আলেমেদীন হলে ভালোভাবে ভেবেচিন্তে আর আলেম না হলে বিজ্ঞ মুফতি সাহেবের পরামর্শক্রমে
নিজে পূরণ করবে বা কাজি সাহেবকে কণ্ঠে মধু মেখে বলবে–এইভাবে পূরণ করুন। তারপর সে স্বাক্ষর
করবে।
সবচেয়ে অবাককরা বিষয় হল–কাজি সাহেব বরকে না জানিয়ে দায়সারাভাবে
গদবাধা কিছু কথা লিখে বরের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।
এ হল ঘুণেধরা কাজিপাড়ার বেহাল চিত্র! এর পেছনের বড় কয়েকটি কারণ হল—
১. বিবাহ-বিচ্ছেদ ও তালাক-ডিভোর্স সংক্রান্ত
মাসায়েল সম্পর্কে তাদের চরম অজ্ঞতা। অথচ উচিত ছিল এ বিষয়ে পর্যাপ্ত পড়াশোনা
করেই এ পদে তাদের অধিষ্ঠিত হওয়া।
২. কাবিননামা পূরণে যারপর নাই তাড়াহুড়ো।
অথচ এ কাজটির জন্য তারা নির্দিষ্ট ফি গ্রহণ করে থাকেন। তাহলে
তাড়াহুড়ো কিছুতেই কাম্য নয়।
৩. তাদের অপরিণামদর্শিতা ও অসতর্কতাও
বড় একটি কারণ। সুতরাং প্রত্যেক বর ও অভিভাবকের এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি
রাখতে হবে।
হে তরুণ! মানুষের জীবনে বিবাহ কেবল একটি
সামাজিক চুক্তি নয়; এটি বিশ্বাস, দায়িত্ব
ও পারস্পরিক সম্মানের এক পবিত্র অঙ্গীকার। অথচ সেই অঙ্গীকারের লিখিত দলিল—কাবিননামা— আমাদের দৃষ্টিতে এটি যেন কেবলই একটি কাগজ; নীরব, নিরীহ, নিঃশব্দ। তবু তার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে
দুটি জীবনের ভবিষ্যৎ, ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি আর অবহেলার সম্ভাব্য ক্ষতচিহ্ন।
আমাদের সমাজে বহু সময়ই রয়ে যায় এটি অপঠিত ও অজ্ঞাত। যে দলিলটি নারীর অধিকার, পুরুষের
দায়িত্ব এবং দাম্পত্য জীবনের নৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে, তা-ই
পরিণত হয় একখানা আনুষ্ঠানিক কাগজে, যার গভীরতা আমরা বুঝে
উঠতে পারি না।
এই প্রবন্ধটি সেই অজ্ঞতার অন্ধকারে একটি প্রদীপ জ্বালানোর প্রয়াস। কাবিননামার ১৮ নং
ধারা—যা দাম্পত্য জীবনের ভবিষ্যতকে নিয়ন্ত্রণ করার এক নীরব অথচ শক্তিশালী হাতিয়ার—তার গুরুত্ব, প্রাসঙ্গিকতা ও সম্ভাব্য পরিণামকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে
ভাষার সংবেদনশীলতা ও যুক্তির দৃঢ়তায়। এটি কোনো শুষ্ক আইনি আলোচনা নয়; বরং জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা ও নৈতিক
বোধের সম্মিলিত পাঠ।
এটি কোনো অভিযোগপত্র নয়,
এটি একটি আহ্বান—
সচেতনতার দিকে,
ন্যায়ের দিকে,
মানবিকতার দিকে।
বান্দা এখানে প্রশ্ন তুলেছে,
জাগ্রত করেছে, আবার আশার আলোও দেখিয়েছে। তরুণদের জন্য এটি
সতর্কবার্তা, অভিভাবকদের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ, আর সমাজের জন্য একটি দর্পণ—যেখানে আমরা নিজেদের দায়হীনতা ও অবহেলার প্রতিচ্ছবি
দেখতে পাই।
এই লেখাটি পাঠককে শুধু তথ্য দেবে না; চিন্তায় আলোড়ন তুলবে,
বিবেককে নাড়া দেবে, বোধকে শাণিত ও পরিশীলিত করবে, আবেগের কুয়াশা
সরিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তের দিগন্ত মেলে ধরবে, ইনশাআল্লাহ। যদি এটি একজন পাঠককেও সচেতন করে তোলে, একটি সুখময় দাম্পত্যকে ভাঙনের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনে, কিংবা একজন
নারীর অধিকারকে সুরক্ষিত করে—তবে এই প্রয়াস সার্থক হবে।
হে ভবিষ্যৎ বর! তোমাকে স্বাগতম, “কাবিননামার
১৮ নং ধারা আমাদের অজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণতি” —এর সোনালি পাতায়! সুখী পরিবার বিনির্মাণের
সজীব আঙিনায়! —স্বামী সোহাগীনী, স্বামীনুরাগীণী, প্রেমময়ী, পুণ্যবতী জীবনসঙ্গীনীর
ভালোবাসার উষ্ণ ছোঁয়ায় সাজানো মধুময় জীবনের বর্ণিল গাথায়।
হে সুখী দাম্পত্যের স্বপ্নদ্রষ্টা! তোমাকে ভালোবেসে, তোমার স্বপ্নের সুখকর
দাম্পত্যের প্রত্যাশায় হৃদয়ের স্নিগ্ধ কালিতে লিখেছি এই ক্ষুদ্র সৃষ্টিকর্ম—আমার হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতি যদি সামান্যও স্পর্শ করে তোমার মনন-চেতনাকে,
তবে বৃথা যায়নি আমাদের শ্রম-আমাদের কষ্ট!
অজ্ঞতার ফাঁদে
দাম্পত্য জীবন: নড়বড়ে সংসারের অন্তরকথা
মানুষের জীবনযাত্রার সবচেয়ে
সংবেদনশীল ও প্রভাবশালী সম্পর্কগুলোর একটি হলো দাম্পত্য সম্পর্ক। এই সম্পর্কের ভেতরেই মানুষ
খুঁজে পায় নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও আত্মিক
পূর্ণতা। কিন্তু দাম্পত্য কেবল আবেগের বন্ধন নয়; এটি দায়িত্ব,
সচেতনতা ও ন্যায় বোধের সমন্বয়ে গঠিত এক সূক্ষ্ম সামাজিক কাঠামো। এই
কাঠামোতে সামান্য অবহেলা কিংবা অজ্ঞতা কখনো কখনো হয়ে ওঠে মারাত্মক ঝুঁকির কারণ।
বিশেষত যখন দাম্পত্য সম্পর্কের আইনি ও শরয়ী বিধিগুলো
যথাযথভাবে অনুধাবন না করা হয়, তখন দাম্পত্য জীবন ভালোবাসার
বন্ধনের পরিবর্তে পরিণত হয় বেদনার কারাগারে।
সম্প্রতি যে ভুলের কারণে অনেকের
সুখী দাম্পত্যে চিড় ধরছে। যার মূলে হলো: আমাদের অজ্ঞতা, অসতর্কতা ও অপরিণামদর্শিতা। সামান্য এ ভুলের কারণে আজ কোন কোন সংসার হয়ে যাচ্ছে একেবারে নড়বড়ে,
কোনোটি ভগ্নপ্রায়, আবার কোনোটি চিরতরেই ভেঙে
যাচ্ছে।
ইনসাফের পাল্লায়
দাম্পত্য জীবন: নির্যাতনের অদৃশ্য সমীকরণ
দাম্পত্যের এমন অবক্ষয় একমুখী নয়। এটি পারস্পরিক
মতবিরোধ, অনাস্থা আর অসহিষ্ণুতার ফল। কোথাও পুরুষের
কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণ নারীর স্বাধীনতাকে গ্রাস করে। আবার কোথাও অসংযত দোষারোপ ও
মানসিক উৎপীড়নে পুরুষ হয়ে যায় নিরুপায়। ফলে সামাজিক লাঞ্ছনার মুখে ক্ষুণ্ন হয় তার মানবিক মর্যাদা
এবং মুখ থুবড়ে পড়ে সুখের সোনালি সংসারের ভিত।
অপরদিকে হলুদ মিডিয়াগুলো “নারী
নির্যাতন” এর কথা ফলাও করে প্রচার করে থাকে। কাজি, আদালত ও মানবাধিকার পাড়াগুলো “নারী নির্যাতন” বুলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। তা অনেকাংশে সত্য হলেও এটা
সমাজের বাস্তব চিত্র নয়। কারণ বহুক্ষেত্রে পুরুষও মানসিক নিপীড়ন, সামাজিক অবমূল্যায়ন ও পারিবারিক হয়রানির নিরব শিকার হন,
যার স্বীকৃতি আমাদের সমাজে বিরল। সুতরাং “নারী নির্যাতন” এর বুলি
আউড়িয়ে “পুরুষ নির্যাতন” এর বিষয়টি দেয়ালে ছুড়ে মারা কি আদৌ ইনসাফ?
নীরব দর্শক যখন
বর: অপরিণামদর্শী কলমের অমোঘ আঘাত
প্রিয় পাঠক, আপনার দিকে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছি, হৃদয়ের
সবগুলো কপাট খুলে ভেবে দেখুনতো, আপনিও একই ভুল করে রেখেছেন
কিনা! ৯৯% ছেলেপক্ষদের এই বিষয়টা দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। একদিকে তারা বিয়ে
বাড়ির খাওয়া-দাওয়া ও আমোদ-প্রমোদ,
আনন্দ-উচ্ছাসে মেতে ওঠে। অপরদিকে জামাই বাবু ভদ্রতার খাতিরে মুখে রুমাল দিয়ে নীরব
দর্শকের ভূমিকা পালন করে। সেই পরম সুযোগে বরের সোনালী জীবনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি
ধারা অপরিণামদর্শী কাজির কলমের নৃশংস
থাবায় অবলীলায় বিকল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে কাবিননামার ১৮ নং ধারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইনি আশ্রয় হিসেবে প্রতিভাত হয়। তাই হৃদয়ের সবটুকু আবেগ-উচ্ছাস ঢেলে দিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে-ফুরফুরে মেজাজে প্রবন্ধটি বারবার পাঠ করুন।
কাবিননামা: শরীয়তের নৈতিকতা ও আইনের
কাঠামোয় দাম্পত্যের লিখিত ইতিহাস
বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম বিবাহ ও
তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ ইং অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহ নিবন্ধন করা আবশ্যক। উক্ত
আইনে বিবাহ নিবন্ধন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ সংঘটিত হওয়ার জন্য তা জরুরি নয়। আর
যেহেতু তা বিবাহের লিখিত রূপ এবং স্বীকৃত প্রমাণ, তাই তাতে
শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে দোষের কিছু নেই; বরং তা প্রশংসনীয়।
সরকার নিযুক্ত কাজি কে দিয়ে নির্ধারিত ফরমে বিবাহের নিবন্ধন
করাতে হয়। কিন্তু এই নিকাহনামা পূরণের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতি
পরিলক্ষিত হয়।
যে ফরমে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন বা
নিবন্ধন করে সেটিকে ‘নিকাহনামা’ বলা হয়, যা ‘কাবিননামা’
নামেই সর্বাধিক পরিচিত। উক্ত নিবন্ধন ফরমে মোট ২৪টি ধারা রয়েছে। এসব ধারায়
মৌলিকভাবে যে বিষয়গুলো আছে তা হলো, বিবাহ ও নিবন্ধনের স্থান
এবং তারিখ, স্বামী-স্ত্রীর নাম,
পরিচয় ও বয়স, সাক্ষী ও উকিলদের নাম এবং পরিচয়, দেনমোহরের পরিমাণ এবং তা নগদ ও বাকির হিসাব,
স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অধিকার প্রদান ও শর্তসমূহের
বিবরণ, কাজির স্বাক্ষর ও সিলমোহর ইত্যাদি। বর-কনের
ইজাব-কবুলের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর কাজি উপরিউক্ত
তথ্যগুলো দিয়ে কাবিননামা ফরম পূরণ করেন। ফরম পূরণ শেষে বর ও কনে তাতে স্বাক্ষর
করেন।
সোনালি সংসারের নিরাপত্তা: ১৮ নং ধারায় ‘তালাকে তাফয়ীয’ এর বিধান
তবে কাবিননামার এসব ধারার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি হলো ১৮ নং ধারা। এতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। আর এটি ক্ষেত্র বিশেষে স্ত্রীর জন্য খুবই গুরুত্বের দাবী রাখে। কেননা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক যখন এতোটা বিষাদময় হয়ে ওঠে যে, তাদের পক্ষে একত্রে বসবাস করা কোনোভাবে সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে এমন সীমাহীন কষ্টের বেড়াজাল থেকে বের হওয়ার জন্য শরীয়ত স্বামীকে তালাকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর বিধান দিয়েছে। কিন্তু কোনো স্বামী এ পর্যায়েও যেন তালাকের পথ অবলম্বন না করে স্ত্রীকে আটকে রেখে তার উপর জুলুম নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাতে না পারে সেজন্য শরীয়ত ‘তালাকে তাফয়ীয’ এর নিয়ম প্রবর্তন করেছে। অর্থাৎ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের পূর্বানুমতি প্রদান করা; যেন প্রয়োজনবোধে স্ত্রী নিজেই তালাক গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং স্ত্রী বা স্ত্রীপক্ষের জন্য বিয়ের আকদের সময় পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে স্বামী থেকে সেই অধিকার নেওয়ার সুযোগ শরীয়তে রয়েছে। ইসলামী আইনের ভাষায় এরই নাম, ‘তালাকে তাফয়ীয’। সুতরাং কাবিননামার এ ১৮ নং ধারাটি (স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কি না? করিয়া থাকিলে কী কী শর্তে?) শরয়ী নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। অতএব মুসলিম পারিবারিক আইনে কাবিননামার মধ্যে ‘তালাকে তাফয়ীয’ এর ধারাটি জুতসই ও কার্যকরী একটি সংযোজন। এ ধারাটি সহজে রপ্ত করার জন্য নিম্নে কাবিননামার অপর পৃষ্ঠার একটি ছবি তোলে ধরা হল।
তবে এই ধারাটি পূরণ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে অনেক সময়ই বিভিন্ন
ধরনের ভুল ও শরীয়ত পরিপন্থী কার্যকলাপ সংঘটিত হয়ে থাকে। যার ফলে দেখা যায়, বিয়ের পর স্ত্রীরা অহরহ তালাক গ্রহণ করে থাকে। সামান্য
কারণে হুট করেই স্বামীকে তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে দেয়। এরপর আবার নিজেরাই আফসোস করতে থাকে। এটা
আমাদের অভিজ্ঞতায় দগ্ধসত্য।
বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার এ যুগে সমাজের এমন অবক্ষয়-চিত্র মোটেও গোপন কিছু নয়। শুধুমাত্র
বোঝার সুবিধার্থে এখানে দেশের একটি বহুল প্রচলিত দৈনিক প্রথম আলোর সামান্য একটি সমীক্ষার সারচিত্র তুলে ধরা হল:-
গ্রাম থেকে শহরে: দাম্পত্য ভাঙনের নতুন মানচিত্র
“দেশে সংসার ভেঙে যাওয়ার সংখ্যা প্রতিনিয়ত
বাড়ছে। রাজধানীতে এর হার সবচেয়ে বেশি। গত বছর
(২০২৫) ঢাকায় প্রতি ৪০ মিনিটে ১টি করে তালাক হয়েছে। বিচ্ছেদ বাড়ছে ঢাকার বাইরেও।
বিচ্ছেদের আবেদন নারীরা বেশি করছেন। নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে
আত্মমর্যাদাবান নারীরা তালাকে খুঁজছেন মুক্তি। বিচ্ছেদের আবেদনের পর সমঝোতা হয়েছে
খুবই কম—৫ শতাংশের নিচে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবাহবিচ্ছেদের এই চিত্র পাওয়া
গেছে।
ঢাকার দুই সিটির মেয়রের কার্যালয়ের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে তালাকের আবেদন এসেছিল মোট ১৩ হাজার ২৮৮টি। এর
মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন -এ মোট ৭৬৯৮টি ডিভোর্সের আবেদন
হয়েছিল, যার মধ্যে ৫৩৯৩টি ( ৭০%) নারীদের দ্বারা করা হয়েছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন- এও নারীরা ৬৫% এর বেশি আবেদন করেছিলেন। এর পরবর্তী বছর অর্থাৎ
২০২৩ সনের শুধু জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আবেদনের সংখ্যা ছাড়ায় ২৪৮৮টি। এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমান সময়ে নারীরাই অধিকাংশ ডিভোর্সের উদ্যোগ নিচ্ছেন — যা ২০২৪ এবং ২০২৫
সালেও প্রায় একই ধারায় বজায় আছে বলে বিভিন্ন সংবাদ ও বিশ্লেষণ থেকে ধারণা পাওয়া যায় (যেমন ঢাকা-তে
৭০%-এর মতো নারীদের উদ্যোগ)। এ হিসাবে রাজধানীতে প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে প্রায় ৩৭টি
দাম্পত্য সম্পর্ক, অর্থাৎ তালাকের
ঘটনা ঘটছে প্রতি ৪০ মিনিটে ১টি করে। জরীপে এটাও দেখা গিয়েছে যে, গ্রামের তুলনায় শহরে স্ত্রীদের পক্ষ থেকেই তালাক গ্রহণ
বা ডিভোর্স প্রদানের ঘটনা বেশি ঘটছে”। এ হচ্ছে ছোট্ট একটি সমীক্ষার সামান্য
চিত্র ।
একটি মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের সমাজের এমন নাজুক অবস্থা সত্যিকারার্থেই সমাজচিন্তকদের
ভাবিয়ে তোলে। মূলত এর পিছনে দায়ী হলো ইসলাম সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা আর
অবহেলা। তাই এর থেকে বাঁচার উপায় হলো, শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায়
সঠিকভাবে কাবিননামার এ ধারাটি পূরণ করা। এবং এ সংক্রান্ত যেসব
ভুলভ্রান্তি রয়েছে তা থেকে বেঁচে থাকা।
নিম্নে এ সংক্রান্ত বহুল প্রচলিত ভুলগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. স্ত্রীকে তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা: কাজি বা
রেজিস্ট্রাররা অনেক ক্ষেত্রেই কাবিননামার এই ১৮ নং ধারার ঘরে ‘তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে’ বলে লিখে
দেয়। এটি অনেক বড় ভুল। কারণ,
এক তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হলেই এ ধারার উদ্দেশ্য
পরিপূর্ণরূপে হাসিল হয়ে যায়। কিন্তু বিবাহ রেজিস্ট্রার এদিকটি বিবেচনা না করেই
তিন তালাকের অধিকারের কথা লিখে ফেলে। ফলে এ ক্ষমতাবলে পরবর্তীতে স্ত্রী যখন সামান্য
কারণেই তিন তালাক গ্রহণ করে বসে এবং এরপর আবার ঐ স্বামীর সাথে ঘর-সংসার করতে চায়
তখন আর সেই সুযোগ থাকে না। অতএব ধারাটি এমনভাবে লেখা উচিত, যেন সহজে আসল উদ্দেশ্য হাসিল হয়। আবার বিবাহ বিচ্ছেদের পর
পুনরায় ঘর-সংসার করতে চাইলে সে সুযোগও বাকি থাকে। এজন্য
এক্ষেত্রে কেবল ‘এক তালাকে বায়েন’ গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা
উচিত। এবং এটিই এ সম্পর্কিত শরয়ী নির্দেশনার সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ
। (তালাকে বায়েন হলো
এমন তালাক, যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে ও
সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই তালাক দেওয়ার পর স্বামী ইদ্দতের ভেতরেও স্ত্রীকে
নতুন করে বিবাহ ও মোহর ছাড়া ফিরিয়ে নিতে পারে না। যদি আবার সংসার
করতে চায়, তবে ইদ্দত শেষ হলে নতুন নিকাহ ও নতুন মোহর আবশ্যক হয়।)
২. তালাক গ্রহণের শর্তসমূহ গদবাধা লিখে দেওয়া: উক্ত ধারায় লেখা আছে, “কী কী শর্তে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে?” এক্ষেত্রে যে সকল শর্ত সাপেক্ষে স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা
প্রদান করা হয়ে থাকে সাধারণত সেগুলো কাজিরা গদবাধা লিখে দেয়। এ ব্যাপারে ছেলে বা মেয়েপক্ষের মতামত নেয়া বা শর্তগুলো
সুচিন্তিতভাবে লেখার চেষ্টা করা হয় না। এ ধারায় সাধারণত যে শর্তগুলো লেখা হয়
তন্মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি শর্ত হলো,
‘বনিবনা না হলে স্ত্রী তালাক গ্রহণ করতে পারবে’। একটু চিন্তা
করলেই বোঝা যায় যে,
শর্তটি খুবই হালকা। অনেকটা বিনা শর্তে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণের নামান্তর।
কেননা প্রতিটি বৈবাহিক সম্পর্কে কিছু না কিছু মনোমালিন্য হয়েই থাকে। মাঝে মাঝে
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মামুলি বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। কিছুক্ষণ পর আবার সব
ঠিক হয়ে যায়। সুতরাং বনিবনা না হলেই যদি স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের
ক্ষমতা দেয়া হয় তাহলে ব্যাপারটি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে, সামান্য অভিমান, ক্ষুদ্র বিরোধ বা ক্ষণিকের
বিরূপতার জের ধরেও স্ত্রী তার নিজের উপর তালাক
নিয়ে বসবে, অথচ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এমনটা তাদের কারোই কাম্য নয়, কিন্তু উক্ত গদবাধা শর্তের কারণে দেখা যায়, অল্পতেই সংসার চিরতরে ভেঙে যায়। স্ত্রী তিন তালাক গ্রহণ করায় এরপর আর একসাথে থাকার কোনো সুযোগ
বাকি থাকে না। মনে রাখতে হবে, তালাক গ্রহণ ও প্রদান খুবই গুরুতর ও স্পর্শকাতর বিষয়। তাই এধরনের ক্ষমতা অর্পণে লঘুভাবে শর্তারোপ
করা কখনোই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে শর্তগুলো সুচিন্তিত
ও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। এমন
কিছু ভারসাম্যপূর্ণ শর্তারোপ করা উচিত, যেন স্ত্রী প্রয়োজন ছাড়া সামান্য রাগ হলেই তালাক গ্রহণ না
করতে পারে। আবার স্বামীও যেন জুলুম-অত্যাচার করে তাকে আটকে রাখতে না পারে। বরং
এ ক্ষেত্রে যেন উভয় পক্ষের সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ
থাকে।
৩. তালাক গ্রহণে স্ত্রীকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান: আলোচ্য ধারায়
প্রথাগতভাবে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা, স্ত্রীর নিকট অর্পিত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে নিজ অভিভাবকদের সঙ্গে
পরামর্শ করার কথা উল্লেখ না থাকা সমীচীন নয়। কারণ স্ত্রী একাকী তালাকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তাতে তাড়াহুড়া বা বাড়াবাড়ির প্রবল আশংঙ্কা
থাকে। অতএব তালাক গ্রহণের ক্ষমতাকে অভিভাবকদের অনুমতির সাথে শর্তযুক্ত করে দেয়া অধিক যুক্তিযুক্ত ও কল্যাণকর।
বাস্তবেও দেখা যায়, অভিভাবকদের বিচক্ষণতাপূর্ণ হস্তক্ষেপে বহু ক্ষেত্রে আপস মীমাংসার মাধ্যমে দাম্পত্য বিরোধ সমাধান
হয়ে যায়, ফলে তালাকের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণের
প্রয়োজন পড়ে না।
যেমনটি প্রতিভাত হয় রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে তালাক গ্রহণের অবকাশ প্রদান প্রসঙ্গে,
যেখানে তিনি বলেন—
"إنِّي ذاكرٌ لَكِ أمرًا فلاَ عليْكِ أن لاَ تستعجلي حتَّى تستأمري أبويْكِ".
অর্থাৎ আমি তোমাকে বিচ্ছেদ গ্রহণের বিষয়ে অবকাশ দিয়ে বলছি যে, তুমি এ বিষয়ে তাড়াহুড়ো করবে না বরং তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করবে।
উক্ত হাদিস সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে
যে, স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণের সময় অভিভাবকদের
সঙ্গে পরামর্শের শর্ত সংযুক্ত
করা সুবিবেচনার পরিচয়। যাতে নারীরা
আবেগ বা ক্ষণিক উত্তেজনায় ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে এবং
বৈবাহিক জীবন অযথা বিপর্যস্ত না হয়ে পড়ে।
৪. ১৮ নং ধারা পূরণের আগেই বরের স্বাক্ষর নিয়ে নেওয়া: অনেকে কাবিননামার ধারাগুলো পূরণ
করার আগেই সাদা ফরমে দস্তখত করে দেয়। সাধারণত বিবাহের রেজিস্ট্রার বা কাজিরা বর-কনে থেকে এভাবে আগেই স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। এরপর তারা ধারাগুলো, বিশেষ করে ১৮ নং ধারাটি নিজেদের মত করে পূরণ করে। এটিও একটি
চরম ভুল। এতে ঐ কাবিননামায় বরের স্বাক্ষর
করা সত্ত্বেও স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণের বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে
অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। তাই এ ধারার শর্ত ও
তালাক প্রয়োগের ক্ষমতা লেখার সময় বা পরে পাত্রকে অবহিত করেই তার স্বাক্ষর নেয়া
উচিত। তবে তালাক গ্রহণের বিষয়টি যেহেতু স্পর্শকাতর তাই
খুব ভেবেচিন্তে আমাদের আলোচ্য ধারাটি পূরণ করা উচিত। (সামনে ১৮ নং ধারা পূরণের একটি প্রস্তাবিত নমুনা পেশ করা হবে)
৫.তালাক গ্রহণ-প্রদানে বাড়াবাড়ি: অনেক সময় দেখা যায় তালাক গ্রহণ-প্রদানের মত স্পর্শকাতর বিষয়ে অভিভাবকরাও ক্ষেত্রবিশেষে
বাড়াবাড়ির শিকার হন। ফলশ্রুতিতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে দাঁড়ায়, কখনো বা পরিণতিও হয়
অপ্রত্যাশিত। তাই তালাক গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর্যায় ও
পরিস্থিতির ব্যাপারে আমাদের সম্যক ধারণা থাকা অতিব জরুরি। মূলত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিরোধ যদি এ পর্যায়ে পৌঁছে যে, তারা একে অপরের হক কোনোক্রমেই আদায় করতে পারছে না। তাহলে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের নিয়ে প্রথমে সমঝোতা বৈঠক করতে
হবে। এতে যদি উভয়কে মিলিয়ে দেয়া সম্ভব হয় তাহলে তো অনেক ভালো। অন্যথায় উভয়
পক্ষের অন্তত একজন করে বিজ্ঞ অভিভাবক অথবা “নির্ভরযোগ্য
ফতোয়া বিভাগ যদি এ মর্মে রায় পেশ করেন যে, এই দুই দম্পতির একত্রে
থাকার চেয়ে বিচ্ছেদই শ্রেয়, তখন স্ত্রী তাঁদের লিখিত অনুমোদন সাপেক্ষে নিজ সত্তার উপর এক তালাকে
বায়েন গ্রহণ করতে পারবে”।
৬. স্বামীকে তালাক
দিলাম বলা বা লেখা: উক্ত ধারায় স্বামী কর্তৃক
প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্ত্রী যখন তালাক গ্রহণ করে তখন অনেক ক্ষেত্রে ডিভোর্স লেটারে
বিষয়টি এভাবে লেখা হয় যে, ‘আমি আমার স্বামী অমুককে তালাক দিলাম’ বা ‘প্রদান করলাম’। এটি একটি মারাত্মক ভুল। কেননা শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাকের একচ্ছত্র অধিকার স্বামীর, স্ত্রীর নয়। তবে স্বামীর দেয়া
ক্ষমতাবলে স্ত্রী নিজের উপর তালাক গ্রহণ করতে পারে; স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। অতএব ১৮ নং ধারায় উল্লেখিত শর্তাবলি যথাযথভাবে পাওয়া গেলে এবং সবদিক বিবেচনায় বিচ্ছেদের
সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে স্ত্রী তালাক গ্রহণের কথা এভাবে বলবে বা লিখবে, ‘আমি কাবিননামার ১৮ নং ধারায় স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত
ক্ষমতাবলে নিজ নফসের (সত্তার) উপর
এক তালাকে বায়েন গ্রহণ করলাম।’
প্রকাশ থাকে যে, আমাদের দেশের কাবিননামার উক্ত ধারার ভাষ্যটিও সঠিক নয়।
কেননা তাতে লেখা আছে, ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কি না? করিয়া থাকিলে কী কী শর্তে? ’ এমন ভাষ্য থেকেই মূলত
এ ভ্রান্ত ধারণার উৎপত্তি হয় যে,স্বামী স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দিলে- স্ত্রী স্বামীকেই তালাক দিতে পারে। অথচ এখানে কথাটা এভাবে লেখা উচিত ছিল যে, ‘স্বামী স্ত্রীকে নিজ নফসের উপর তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কি না? অথবা এভাবেও লেখা যেতো, ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করিয়াছে কি
না?’ পারিবারিক
আদালতের এ বিষয়টি আমলে নেওয়া উচিত।
৭. ১৮ নং ধারায় শুধু
‘হ্যাঁ’ শব্দ লেখা : অনেকে
কাবিননামার ১৮ নং ধারায় অবিবেচনাপ্রসূত শুধু
‘হ্যাঁ’ শব্দটি লিখে দেয়। এটা নিতান্তই অপরিণামদর্শিতার পরিচায়ক।
কেননা এতে স্ত্রী নিঃশর্তভাবে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। যা বাস্তবে
পারিবারিক ও আইনত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের
ক্ষমতা প্রদান যদিও শর্তযুক্ত বা শর্তহীন দুভাবেই হতে পারে; কিন্তু নিঃশর্ত ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে যেহেতু ঝুঁকি
রয়েছে তাই এমনটি করা আদৌ ঠিক নয়। সুতরাং এতে ভারসাম্যপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা
বাঞ্ছনীয়।
৮. ১৮ নং ধারাটি খালি
রেখে দেওয়া: অনেক ক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮ নং ধারাটি পূরণ না করে ফাঁকা রেখে দেওয়া হয়। এটা মোটেও সমীচীন নয়। কারণ মুসলিম
বিবাহবিচ্ছেদ আইনে যে ৯টি কারণে বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতির কথা বলা আছে তার কোনোটি না
থাকলে এবং “খোলা তালাকের” মাধ্যমেও স্বামীর
কাছ থেকে বিচ্ছেদ না পেলে একজন স্ত্রীর পক্ষে বিবাহবন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া দুরূহ
হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮ নং ধারায় স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের
ক্ষমতা অর্পণ না করে তাহলে স্ত্রী নিজে তালাক গ্রহণ করতে পারে না। অথচ স্বামীর প্রতারণা
বা জুলুমের কারণে স্ত্রীর কখনো তালাক গ্রহণের মাধ্যমে নিজ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ
ঘটানোর প্রয়োজন হয়। উক্ত অসুবিধার কথা চিন্তা করেই মূলত কাবিননামার ১৮ নং ধারাটি
সংযোজন করা হয়েছে। সুতরাং ধারাটি খালি রাখা মোটেও উচিত হবে না।
৯. বিয়ের আগেই কাবিন করে ফেলা :
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, বিয়ের বহু আগেই অনেকে কাবিন করে রাখে। আবার অনেক সময়
সরকারি কাজি বিয়ের মজলিসে ইজাব-কবুল সংঘটিত হওয়ার
পূর্বেই সময় না থাকা বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে কাবিনের ফরম পূরণ করে ফেলে এবং
বর-কনে ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। এটা কোনোভাবেই বিধিসংগত
নয়, কারণ কাবিননামা কেবলমাত্র বিবাহ
নিবন্ধনের একটি আনুষ্ঠানিক সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফরম, যা শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী এবং আইনগতভাবে কেবল
বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পরই পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণযোগ্য। সরকারি বিধি
সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে যে, বিবাহ সম্পন্ন না হওয়া
অবস্থায় ফরম পূরণ কখনোই বৈধ হবে না।
বিয়ে সম্পন্ন না হলে কাবিননামার রেজিস্ট্রেশন কার্যকর ভাবে
প্রযোজ্য হতে পারে না। পূর্ব কাবিনের ফলে ফরমে মিথ্যাচার বা
প্রতারণার আশ্রয় নেওয়াও প্রায় আবশ্যক হয়ে ওঠে, যা আইনত এবং শরীয়তের দৃষ্টিতেও গ্রহণযোগ্য নয়।
আরো একটি জটিল সমস্যা পরিলক্ষিত
হয় কাবিননামার ১৮ নং ধারায়, কেননা এই ধারার মাধ্যমে স্বামী স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা
প্রদান করে। অথচ বিয়ের পূর্বে ফরম পূরণ করা হলে স্বামীও তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত হয় না, যার ফলে স্ত্রীকেও কোন কার্যকরী অধিকার প্রদান করা
সম্ভব নয়। ফলশ্রুতিতে পূর্ব কাবিননামার
ভিত্তিতে ডিভোর্স গ্রহণ কখনই আইনত বা শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক হতে পারে না। অধিকন্তু, অনেক
ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কাবিনকেই বিবাহ মনে করা হয়, অথচ মৌখিক
ইজাব-কবুল ছাড়া বিবাহ কখনোই সম্পন্ন হয় না। এরপরে এ সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের বৈধতা
আইনি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ
থেকে যায়। অতএব ইসলামী শরীয়ত এবং রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী কেবল
বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পরেই কাবিননামা পূরণ বৈধ। পূর্বে ফরম পূরণ করা হলে বরের স্বাক্ষর কেবল বিবাহ
সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রহণযোগ্য হবে। যদি আগে নেওয়া থাকে তবে
অন্তত ১৮ নং ধারার বিষয়ে বরকে পূর্ণরূপে অবহিত করে অনুমোদন
ও পুন:স্বাক্ষর গ্রহণ অপরিহার্য।
কাবিননামা পূরণে উদ্ভুত ভ্রান্তির অন্তর্গত কারণ:
কাবিননামা পূরণে প্রতীয়মান নানাবিধ ভ্রান্তির অন্তর্নিহিত
কারণসমূহ মূলত তিনটি প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়ে থাকে:
১. প্রথমত বিষয়টির প্রকৃত
তাৎপর্য সম্বন্ধে জনসাধারণের সীমাহীন অজ্ঞতা। অনেকে কাবিননামাকে
কেবল বিয়ের আনুষাঙ্গিক আচারবিধির একটি গতানুগতিক পর্ব বলে
মনে করেন। এর বিধিসম্মত গুরুত্ব, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং আইনি জটিলতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা তাদের থাকে না। এই অজ্ঞতার ফলে কাজিরা যেভাবেই কাবিননামা পূরণ করেন না কেন এতে তাদের
কোন মাথা ব্যথা নেই পরবর্তীতে যখন সর্ম্পকের অবনতি ঘটে এবং বিকল্প কোন পথও বাকি থাকে
না তখন ঠিকই বুঝে আসে এর গুরুত্ব। তাই শুরুতেই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
২. বিয়ের সময় সাধারণত পাত্ররা স্বভাবজাত
লজ্জা ও সংকোচ বোধ করে। সামাজিক
প্রথায়ও বিয়ের মজলিসে পাত্রের কথা বলাকে অনভিপ্রেত আচরণ বলে মনে করা হয়। ফলে কাজিরা কাবিননামায় পাত্রের মতের বিপরীত কোনো কথা লিখলেও সে তার প্রতিবাদ
করে না বা করতে পারে না, বরং মুখে রুমাল চেপে তাকে নিরবতাই পালন করে যেতে হয়। আহ কী অজ্ঞতা! কী অপরিণামদর্শিতা!
৩. অনেক কাজি কাবিননামার কলামগুলো পূরণের জন্য নিজে থেকে একটা গদবাধা ভাষ্য তৈরি করে নেয়। বিশেষ করে ১৮ নং কলামটি পূরণের ক্ষেত্রে তো কেউ কেউ
নির্দিষ্ট বাক্য সংবলিত সিলমোহরও বানিয়ে নেয়। এরপর ঢালাওভাবে সকল কাবিননামায় ওই
গদবাধা ভাষ্যই ব্যবহার করে। কোনো বর যদি এর বিপরীতে তার
নিজের দেয়া কোনো কথা লিখতে বলে তখন কাজিরা তা লিখতে
অস্বীকৃতি জানায় এবং বলে,এভাবে লেখার নিয়ম নেই। অথচ ১৮
নং ধারাটি রাখাই হয়েছে বর-কনের ইচ্ছা
অনুযায়ী তাদের মতো করে পূরণ করার জন্য। এতে কাজিদের হস্তক্ষেপ করার সাংবিধানিক বা ধর্মীয় কোনো
অধিকার নেই।
এমনকি এক্ষেত্রে
সকলের জন্য বাস্তবেও সাংবিধানিক কিংবা সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এমন কোন গতানুগতিক
ভাষ্য প্রয়োগের বিধান নেই। এগুলো সব কাজিদের
মনগড়া নিয়ম। যদি সংবিধানে সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো ভাষ্য
নির্ধারিত থাকতো তাহলে সেটি ফরমেই ছাপানো থাকতো। সেক্ষেত্রে ‘কি না?’ ও ‘কী কী?’ এজাতীয় স্বাধীনতাসূচক শব্দ লেখা থাকতো না।
জরুরি পরামর্শ :
কাবিননামা সঠিকভাবে পূরণের মধ্যে
যেহেতু বর-কনের ভবিষ্যৎ জীবনের বহু
সুবিধা-অসুবিধার বিষয় নিহিত রয়েছে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে নিখুঁতভাবে এটি
পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে ১৭ ও ১৮ নং কলাম দুটি ভালো করে দেখে এবং ভেবেচিন্তে পূরণ
করা জরুরি। আর বিয়ের মজলিসে যেহেতু ১৮ নং ধারার বিষয়বস্তু তথা ‘স্ত্রীকে তালাক
গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান প্রক্রিয়া’ নিয়ে সবিস্তারে কথা বলা যায় না বা বিয়ের
মুহূর্তে তালাকের বিষয়ে কথাবার্তা বলাকে অনেকে পছন্দও করে না। তাই মজলিসের আগেই পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের পারস্পরিক
আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে নেওয়া উচিত। এরপর সেই ভিত্তিতে বিয়ে
সম্পন্ন হওয়ার পর কাজিকে দিয়ে কাবিননামা পূরণ করিয়ে নিবে।
তবে কখনো যদি কাজি নিজে থেকে আগেই কাবিননামা ফরমটি পূরণ করে
ফেলে তাহলে সেটি ভালোভাবে পড়ে দেখতে হবে। যদি অসঙ্গত কোনো কথা লেখা থাকে তাহলে তা
কেটে দিয়ে বা সংশোধন করে স্বাক্ষর করবে। এক্ষেত্রে লজ্জা-সংকোচ করা আদৌ ঠিক হবে না।
১৮ নং ধারা পূরণের
সঠিক পদ্ধতি :
স্ত্রী যেন নিজের উপর তালাক
প্রয়োগে তাড়াহুড়া না করে ভেবেচিন্তে তালাক গ্রহণ করতে পারে এবং পরে যেন তাকে
আফসোস করতে না হয় সেজন্য অত্যন্ত সুচিন্তিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ভাষায় ধারাটি পূরণ
করা উচিত। যেন প্রয়োজন ছাড়া সামান্য রাগ হলেই স্ত্রী তালাক গ্রহণ করতে না পারে।
আবার স্বামীও যেন স্ত্রীকে আটকে রেখে জুলুম নির্যাতন না করতে পারে। উক্ত বিবেচনায়
ধারাটি পূরণের সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি:
ক. সর্বোচ্চ এক তালাকে বায়েন
গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা।
খ. উক্ত ক্ষমতার বাস্তবায়নে উভয় পক্ষের অন্তত একজন করে বিজ্ঞ অভিভাবকের
একমত পোষণ অথবা “নির্ভরযোগ্য ফতোয়া বিভাগের রায় সাপেক্ষে হওয়ার শর্ত
আরোপ করা।
গ. তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণটি সুচিন্তিত
শর্তসাপেক্ষে হওয়া। প্রচলিত হালকা ও গদবাধা
শর্তে না হওয়া।
ঘ. কাবিননামার সকল ধারা বিশেষত ১৮
নং ধারাটি পূরণ করার পরেই বরের স্বাক্ষর করা।
উপরিউক্ত চারটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখেই আমাদের আলোচ্য ধারাটি পূরণ করা উচিত। তবে
অনেকেই কাবিননামার ধারাগুলো পূরণ করার বিষয়টি কাজিকে হস্তান্তর করে। যা নিয়ম পরিপন্থী এবং অদূরদর্শিতা। কারণ সেক্ষেত্রে কাজিরা নিজেদের মতো করে ধারাগুলো পূরণ করবে, যা অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর স্বার্থ বিরোধীও হয়ে যেতে
পারে। অতএব এমনটি না করাই কাম্য।
১৮ নং ধারা পূরণের
প্রস্তাবিত নমুনা :
সংক্ষেপে
ধারাটি এভাবে লেখা যেতে পারে- “হ্যাঁ, এক
তালাকে বায়েন গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হলো, এই
শর্তে যে,
স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য যদি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে এবং
উভয় পক্ষের অন্তত একজন করে বিজ্ঞ অভিভাবক অথবা
“নির্ভরযোগ্য ফতোয়া বিভাগ যদি
এ মর্মে রায় পেশ করেন যে, এই দুই দম্পতির একত্রে থাকার চেয়ে বিচ্ছেদই শ্রেয়, তখন স্ত্রী তাঁদের লিখিত
অনুমোদন সাপেক্ষে নিজ সত্তার উপর এক তালাকে বায়েন গ্রহণ
করতে পারবে”।
প্রকাশ থাকে যে, স্ত্রী কর্তৃক তালাক গ্রহণের ব্যাপারে অভিভাবকের অনুমতি লিখিত থাকার শর্ত এ জন্য করা হয়েছে যে, পরবর্তীতে যেন এ ব্যাপারে ফতোয়া বা রায় পেতে কোনো ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে না হয়। উপরিউক্ত নিয়মে ধারাটি পূরণ করলে যে ফায়দা হবে তা হলো, তালাক গ্রহণে তাড়াহুড়া হবে না। কেবল এক তালাকে বায়েন গ্রহণের কারণে পরবর্তীতে পুনরায় একসাথে থাকার সুযোগও বাকি থাকবে। অতএব এ ব্যাপারে সকলেরই সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষত, যারা বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন বা বিবাহ পড়ান, তাদের অসচেতনতার কারণে অনেক সংসার অল্পতেই ভেঙে যেতে পারে। সুতরাং তাদের সচেতন হওয়া খুবই জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুখী পরিবার বিনির্মাণের তাওফিক দান করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ইসলামী আইন: প্রসঙ্গ বাল্যবিবাহ
বিবাহ বিধিবদ্ধ দাম্পত্য জীবন বিনির্মাণের প্রধানতম সূত্র। এটি নারী-পুরুষের মধ্যকার সবচেয়ে প্রাচীনতম ব...
যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধিঃ বহু কবীরা গোনাহের সমষ্টি
...
তাফবীযে তালাক স্ত্রীর তালাক গ্রহণ প্রসঙ্গ
তালাক আবগাযুল মুবাহাত তথা নিকৃষ্টতম বৈধ কাজ। অতএব এর ব্যবহার একেবারেই নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। আর এজন্...
বিবাহ-তালাক কিছু আদাব কিছু আহকাম
الحمد لله نحمده و نستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন