
মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার
লেখক
জীবনবৃত্তান্ত
ইলমের আলোয় নির্মিত এক জীবন
কিছু মানুষ জন্ম নেন কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়—
তাঁরা জন্ম নেন আলোকবর্তিকা হয়ে।
তাঁদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন একেকটি দোয়া,
প্রতিটি পদচারণা যেন ইলমের পথে নীরব সিজদা।
মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার তেমনই এক আলোকিত নাম।
মোমেনশাহীর নান্দাইল থানার সাভার গ্রামে, এক শান্ত-স্নিগ্ধ ভোরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির শৈশব থেকেই হৃদয়ে গাঁথা ছিল কুরআনের ডাক। তাঁর পিতা মরহুম হাজী আব্দুস সালাম ছিলেন একজন সৎ, ধর্মপরায়ণ ও পরিশ্রমী মানুষ—যাঁর ছায়ায় বেড়ে ওঠা সন্তান শৈশবেই ঈমান ও ইলমের সুবাসে হৃদয়কে সিক্ত করেন।
সেই শিশু খুব অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিল—জীবন কেবল জীবিকা নয়, জীবন এক মহান আমানত।
জ্ঞান, সাধনা ও দায়িত্ববোধ—এই তিনের সুষম সমন্বয়ে গঠিত এক আলোকিত মানুষ। তিনি এমন এক মনীষী, যাঁর জীবনপথ কেবল ব্যক্তিগত সাধনার ইতিহাস নয়; বরং তা একটি যুগের দ্বীনি চেতনাকে ধারণকারী এক প্রাঞ্জল দলিল।
শৈশবেই কুরআনের সাথে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের যে শুভ সূচনা, তা পরবর্তীতে এক বিস্তৃত জ্ঞানভাণ্ডারের ভিত্তি স্থাপন করে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার অধীনে ধারাবাহিকভাবে ইবতেদাইয়্যাহ থেকে তাকমীল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তিনি কেবল উত্তীর্ণই হননি—বরং মেধা তালিকায় সম্মানজনক স্থান অধিকার করে নিজ যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
মিজান জামাআত থেকে তাকমীল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় প্রথম, অষ্টম, একাদশ কিংবা ষোড়শ স্থান অর্জন—এগুলো কেবল সংখ্যাগত সাফল্য নয়; বরং এক নিষ্ঠাবান তালিবুল ইলমের নিরলস অধ্যবসায়ের নীরব সাক্ষ্য। বিশেষত ইফতা ও উলুমুল হাদীস বিষয়ে উচ্চতর গবেষণায় তাঁর কৃতিত্ব তাঁকে সমসাময়িক আলেম সমাজে একটি দৃঢ় অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।
তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্দাওয়াহ আল ইসলামিয়ায় হাদীস গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন এবং প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। একইসাথে আরবি ভাষা ও আদবে তাঁর পারদর্শিতা, শহীদুল্লাহ ফজলুল বারী রহ.-এর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ—তাঁর ভাষাগত দক্ষতাকে করেছে শানিত ও প্রাঞ্জল।
শিক্ষকতা তাঁর পেশা হলেও, দাওয়াহ তাঁর নেশা। প্রায় চৌদ্দ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, সাত বছর ইমামতি এবং পাঁচ বছর ইমাম ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি মসজিদ-মিম্বরকে রূপ দিয়েছেন চিন্তা ও চেতনার বাতিঘরে। তাঁর জুমুআর বয়ান বিষয়ভিত্তিক, তথ্যসমৃদ্ধ ও উদ্ধৃতিনির্ভর—যেখানে শ্রোতা কেবল আবেগে নয়, যুক্তি ও জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়। কুরআনের সহজ-সাবলীল তাফসিরে তাঁর দুই বছরের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কুরআনের বার্তাকে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
লেখনী তাঁর আরেক পরিচয়। সময়, সমাজ ও শরিয়াহ—এই তিন অঙ্গনে তাঁর চিন্তাশীল কলম বিচরণ করে।
“ছাত্রের জীবন বিনির্মাণে সময়ের ভূমিকা”, “কাবিননামার ১৮ নং ধারা: আমাদের অজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণতি”—এসব গ্রন্থে তিনি সমাজের গভীর ক্ষতকে স্পর্শ করেছেন দায়িত্বশীল আলেমের দৃষ্টিতে। সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, আরবি কথোপকথনের গাইডবুক ও জাল হাদীস বিষয়ে গবেষণামূলক রচনা—সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যকর্ম একাধারে শিক্ষণীয়, সতর্কতামূলক ও সংস্কারধর্মী।
বর্তমানে তিনি ঢাকার মুহাম্মদপুরে অবস্থিত জামিয়া বাইতুল আমান মিনার মসজিদ মাদরাসায় সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত। এই আলেম ব্যক্তিগত জীবনে বিনয়ী, শালীন ও দায়িত্বশীল—যাঁর জীবনদর্শন ইলমকে আমলে রূপ দেওয়ার এক জীবন্ত উদাহরণ।
মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার এমন এক নাম, যাঁর জীবন আমাদের শেখায়—ইলম যদি ইখলাসে রঞ্জিত হয়, তবে তা কেবল ব্যক্তিকে নয়; সমাজকেও আলোকিত করে।
রচনাবলীঃ-
১. الوقت ودوره الفعال في بناء حياة طالب العلم (ছাত্রের জীবন বিনির্মাণে সময়ের ভূমিকা) দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিতব্য।
২. কাবিননামার ১৮ নং ধারা: আমাদের অজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণতি” সদ্য প্রকাশিত।
৩. توفيق الرب المنعم بشرح صحيح مسلم (মুসলিম শরীফের ১ম খণ্ডের ব্যাখ্যাগ্রন্থ) প্রকাশিতব্য।
৪. (دروس من التعبير) (আরবী কথোপকথন শিখার গাইডবুক) প্রকাশিতব্য।
৫. সমাজে জাল হাদিসের ছড়াছড়ি” প্রকাশিতব্য।
মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার-এর প্রবন্ধসমূহ
মোট প্রবন্ধ ১টি