প্রবন্ধ
ত্যাগের বিনিময়ে সম্পর্ক: উম্মতের মহব্বতের বুনিয়াদ
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৭০
০
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
স্থান: গাউসনগর জামে মসজিদ, ইস্কাটন রোড, ঢাকা
তারিখ: ৯ জুন ২০০৬,বেলা:৩.৩০ মিনিট
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ، إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ، إِقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ، الَّذِيْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قُوْلُوْا لَا إلهَ إِلاَّ اللهُ تفْلِحُوْا، أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلَامُ
সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা - মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, যেগুলো জীবজগতে অন্যদেরকে দেওয়া হয়নি। তার মধ্যে বহুত বড় হলো ভালোবাসা এবং সম্পর্ক রাখতে পারা। সম্পর্ক গড়তে এবং রাখতে জানা—যেটাকে অন্যভাবে বলা যায় যে, ভালোবাসতে জানা।
গরু তার বাচ্চাকে যদিও ভালোবাসে, কিন্তু এই সম্পর্ক রাখতে পারে না। বড় হয়ে যায় তো মা-ও ভুলে যায়, মেয়ে-ও ভুলে যায়। বড় হয়ে যাওয়ার পরে যেটা বাচ্চা ছিল, সে-ও মনে রাখে না যে, এ আমার মা। যে মা ছিল, সে-ও মনে রাখে না যে, এ আমার মেয়ে। কিন্তু মানুষ রাখে। মানুষকে আল্লাহ তায়ালা সম্পর্ক গড়া এবং সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষমতা দিয়েছেন। এটা বহুত বড় একটা নেয়ামত দিয়েছেন।
সম্পর্কের মূল্য - ব্যথা ও কষ্ট
প্রতিটি নেয়ামতই কিছু দাম চায়। এমনি আসে না। তো এই যে সম্পর্কের নেয়ামত, এটা আসে ব্যথার মাধ্যমেই। ব্যথা ছাড়া, কষ্ট ছাড়া সম্পর্ক গড়াও হয় না আর ওই সম্পর্ক টিকবেও না।
আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির মধ্যে ব্যথা দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করেন। গর্ভধারণ করাও একটা কষ্ট, আর প্রসব করাও একটা কষ্ট। এই কষ্টের ভেতর দিয়ে মায়ের সাথে তার সন্তানের ভালোবাসা গড়ে ওঠে।
যদি এমন হতো যে, বাচ্চা বিনা কষ্টেই হয়ে যায়, কোনো কষ্ট লাগে না, বিনা কষ্টেই বাচ্চা হয়ে যায়, তাহলে ওই বাচ্চার জন্য মায়ের ভালোবাসা হতো না। আর যে বাচ্চা ওরকম বিনা কষ্টে পাওয়া গেছে, বেশিরভাগ বাচ্চা সে ক্ষেত্রে অবহেলায় মারা যেত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা জন্ম দেওয়ার আগে মাকে কষ্ট দেন। আর ওই কষ্টের ভেতর দিয়ে বাচ্চার জন্য ভালোবাসা জন্মানো হয়, ভালোবাসা গড়া হয়। যার ফলে বাচ্চা যখন হয় তো বাচ্চার জন্ম হওয়ার আগে থেকেই, বাচ্চা এখনো কোলে পায়নি, তো মা তার বাচ্চাকে ভালোবাসে। আর কোলে পাওয়ার পর তো আরও বেশি ভালোবাসে। এই সন্তান কোনো কষ্ট পেলে মা সহ্য করতে পারে না।
আর যেরকম বলছি, যদি বিনা কষ্টে হতো তাহলে ভালোবাসা থাকত না, আর ভালোবাসা না থাকলে অবহেলায় মারা যেত। ধরুন, কোথাও বেড়াতে গিয়েছে। ওখানে ব্যস্ত হয়ে গেল বন্ধু-বান্ধবের সাথে। মজলিসে খুব আড্ডা জমেছে, ঘরে যে একটা বাচ্চা আছে ওটা আর খেয়াল করত না। হয়তো ঘরের ভেতরে বাচ্চা কষ্ট পাবে। ক্ষুধায় পিপাসায় মারা যাবে। তখন মা ততটুকু কষ্ট পাবে, যতটুকু কষ্ট ঘরের কোনো মুরগি মারা গেলে পেত। এরপর কাজের লোককে বলত যে, এই বাচ্চাটা মরে গেছে। এটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসো। আরেকটা নেওয়া যাবে।
কিন্তু যেহেতু সন্তান বড় কষ্টে এসেছে, এটাকে এত সহজভাবে ফেলতে পারে না; বড় বেশি ভালোবাসে। জন্মের পরপরই যদি বাচ্চা মারা যায় বা মরা বাচ্চার জন্ম হয়, বাচ্চার বাপ কাঁদবে না, কারণ সে এই বাচ্চার জন্য কষ্ট করেনি। বাপের ভালোবাসা বাচ্চার প্রতি জন্মায় মোটামুটিভাবে জন্মের পর থেকে ধীরে ধীরে। সে-ও কোলে নেয়, সে-ও রাত জাগে, সে-ও লালনপালন করে। সে-ও যখন কষ্টের মধ্যে শরিক হয়, চিন্তার মধ্যে শরিক হয়, তখন আস্তে আস্তে বাপের ভেতরও বাচ্চার জন্য ভালোবাসা গড়ে ওঠে। আগে নয়। জন্মের পরই যদি বাচ্চা মারা যায়, মা তো কাঁদবে, বাপ কাঁদবে না; কারণ, সে এজন্য কষ্টও করেনি, এজন্য তার ভালোবাসাও হয়নি।
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক - ব্যথার মাধ্যমে
তো আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা দিয়েছেন আর ওটা ব্যথার মাধ্যমেই গড়া হয়। ব্যথা ছাড়া সম্পর্ক হবে না।
প্রথম ওহি রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এভাবে এলো: জিবরাইল আলাইহিস সালাম এলেন আল্লাহর কাছ থেকে কথা নিয়ে, আর রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, "আল্লাহর নামে পড়ো।" রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, مَا أنَا بِقَارِئ "আমি পড়তে জানি না।"
জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাছে টানলেন। বুকের মধ্যে চেপে ধরলেন। এত জোরে চাপ দিলেন যে, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যথা পেলেন। তারপর ছেড়ে দিলেন। আবার বললেন, "আল্লাহর নামে পড়ো।" রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, "আমি পড়তে জানি না।"
আবার জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুকে ধরে জোরে চাপ দিলেন যে, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যথা পেলেন। আবার ছেড়ে দিলেন। আবার বললেন "পড়ো।" আবার রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমি পড়তে জানি না।" এভাবে তিনবার।
তারপর যখন ছাড়লেন, বুকে চাপ দিয়ে, এত জোরে চাপ দিলেন যে, ব্যথা পেলেন। তারপর যখন ছেড়ে দিলেন তখন বললেন, "আল্লাহর নামে পড়ো।" তখন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবারের পরে পড়তে পারলেন।
আল্লাহর নামে - সম্পর্কের দাবি
তো বুকের মধ্যে চেপে ধরে পড়া শেখাচ্ছেন না; বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়াচ্ছেন। বলা হয়েছে "আল্লাহর নামে পড়ো", আর এটা রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন না।
কারো নামে বলা মানে, তার পক্ষ থেকে তার একটা সম্পর্কের বুনিয়াদির উপরে করা। "তার নামে বলছি", "তার পক্ষ থেকে বলছি", "তার হয়ে বলছি"—এই সবগুলোই দাবি করে যে, একটা সম্পর্ক আছে। সম্পর্ক যদি না থাকে তাহলে তার পক্ষ থেকে তার নামে তার হয়ে এই কথাগুলো বলা যায় না। বলা হল যে, "আল্লাহর নামে পড়ো।" তখন আল্লাহর সাথে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওই সম্পর্কই ছিল না। এখন আল্লাহর নামে পড়বেন কেমন করে? বুকের মধ্যে চেপে ধরে একটা সম্পর্ক গড়া হলো। যখন সম্পর্ক হয়ে গেল, এখন আল্লাহর নামে পড়ছেন।
একজন দূত মালিকের পক্ষ থেকে কথা বলে, রাষ্ট্রদূত (অ্যাম্বাসেডর) সে রাজার পক্ষ থেকে কথা বলে। মানে রাজার সাথে তার একটা সম্পর্ক আছে। ছেলে বাপের পক্ষে বলে, বাপের সাথে তার একটা সম্পর্ক আছে। স্ত্রী স্বামীর পক্ষ থেকে কথা বলে, একটা সম্পর্ক আছে কথা বলার; তার একটা অধিকার আছে। সম্পর্ক যদি না থাকে তাহলে এই কথা হবে না।
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়া হলো। এই যে জিবরাইল আলাইহিস সালাম বুকের মধ্যে চেপে ধরে সম্পর্ক গড়লেন, আর হাদিস শরীফে এই কথা বলা হয় যে, এত জোরে চাপ দিলেন যে, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যথা পেলেন।
তো মায়ের সাথে বাচ্চার সম্পর্ক যেরকম একটা ব্যথা দিয়ে করা হয়—গর্ভধারণের ব্যথা আছে, প্রসবের ব্যথা আছে—এই ব্যথা দিয়ে যেরকম বাচ্চার সাথে যে একটা সম্পর্ক গড়া হয়, তো আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্কও একটা ব্যথা দিয়েই গড়া হয়। আল্লাহর জন্য কষ্ট সহ্য করে ব্যথা বহন করে তবেই আল্লাহর সাথে সম্পর্ক হয়।
ওই সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার পরে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বলতে পারে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ব্যথা সহ্য করা এবং ব্যথা দিয়ে সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। যাদের জন্য আমরা কষ্ট সহ্য করি, যাদের জন্য ব্যথা বহন করি, তাদের সাথে সম্পর্ক হয়। সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার পরে তার পক্ষ থেকে কথাও বলা যায় আর তার সেই কথাকে রক্ষাও করে দুই পক্ষের হয়ে। সম্পর্ক হয়ে গেছে। তার পক্ষ থেকে কথা বলা যায়, আর সেই কথা সে রক্ষা করবে।
সম্পর্কের বাস্তব উদাহরণ
মনে করুন, একটা নতুন মসজিদ বানাবে। মহল্লার এক লোকের কাছে গেল যে, মসজিদের জন্য টাকার প্রয়োজন। সাহেব বাড়ি ছিলেন না, খবর পাঠানো হলো বাড়িতে। বেগম সাহেবা বলে পাঠালেন, "ঠিক আছে। তাদেরকে বলো, ইনশাআল্লাহ ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে।" সাহেব বাড়িতে নেই, বেগম সাহেবা বলে পাঠিয়েছেন যে, তাদেরকে বলো ইনশাআল্লাহ ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
পরবর্তীকালে এই কথা নিয়ে সাহেবের সাথে যখন দেখা হলো তো বলল যে, "আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম, আপনি তখন তো ছিলেন না। আপনার বাড়ি থেকে বলেছেন, ২৫ হাজার দেওয়া হবে।" তো রশিদ বই নিয়ে এসেছেন তিনি। কোনো কথা না বলে ২৫ হাজার দিয়ে দিলেন। তখন কিন্তু টাকা-পয়সার ব্যাপারে তিনি অসুবিধায় ছিলেন। হাতে টাকা নেই, কোনো কারণে অসুবিধা চলছে। এমন সময় তারা উপস্থিত হয়েছে। তাদের কাছে কোনো অসুবিধার কথা বললেন না। টাকা দিয়ে দিলেন। পরে বেগমের কাছে গিয়ে হয়তো বলবেন যে, "আমাকে কিছু বললে না আর টাকার কথা বলে দিলে! এখন তো আমি এই অসুবিধায় ছিলাম; কিন্তু তুমি এখন বলে ফেলেছ, তাই দিতে হয়। ওদেরকে তো কিছু বলতে পারি না, দিয়ে দিলাম।"
যেহেতু একটা সম্পর্ক আছে, অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও টাকা দিয়ে দিলেন। কিছুই বললেন না। স্ত্রীর কথা পূর্ণ করলেন। কারণ, তার সাথে একটা সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্ক কিভাবে হয়েছে, খোঁজ করলে দেখা যাবে যে, একজন আরেকজনের জন্য কষ্ট করেই সম্পর্ক হয়েছে। পরস্পরের জন্য আগে কষ্ট করেছে এবং আগামী দিনেও পরস্পরের জন্য কষ্ট সহ্য করতে রাজি আছে।
বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক
বান্দা যখন আল্লাহর জন্য কষ্ট করে, আল্লাহর সাথে তার একটা সম্পর্ক হয়ে যায়। দেখুন, আল্লাহর কোনো ঠ্যাকা নেই।
অনেক মানুষ তো এ কথা বলতে পারে যে, আমি তো টাকার অসুবিধায় ছিলাম, এমন সময় তুমি বলেছ; তারপরও কিন্তু দিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ তো এমন যে, তাঁর কখনও কোনো অসুবিধা হয় না। তাঁর দিতে কী অসুবিধা? তিনি দিয়ে দেন।
হাদিস শরিফে আল্লাহ তায়ালার খাস কিছু বান্দার সম্পর্কে এসেছে যে,
"কিছু লোক আছে এরকম - رُبَّ أشْعَثَ أغْبَرَ مَدْفُوْعٍ بِالْأَبْوَابِ، لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللهِ لَأَبَرَّهُ - যাদের এলোমেলো চুল, ধুলোমাখা শরীর, প্রতিটি দরজা থেকে বিতাড়িত; যদি এমন ব্যক্তি আল্লাহর নামে কোনো কসম করে ফেলে, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তার সেই কসম পূর্ণ করেন।"
ধুলোমাখা শরীর, এলোমেলো চুল, প্রতিটি দরজা থেকে বিতাড়িত। সব সম্পর্ক ছেড়েছে, আর এ সম্পর্ক ছাড়ার মধ্যে কিছু কষ্টও আছে। সম্পর্ক গড়তেও কষ্ট লাগে, সম্পর্ক ছাড়তেও কষ্ট লাগে। এক সম্পর্ক গড়তে আরেক সম্পর্ক ছাড়তে হয়। তবেই সে আরেকটা সম্পর্ক গড়তে পারে।
সম্পর্কের উদাহরণ
একটা মেয়ের বিয়ে হলে সে এক বাড়ি ছেড়ে আরেক বাড়ি চলে যায়। বাবার বাড়ি ছাড়তে তার কষ্ট হয়, সেজন্য কাঁদে। নতুন বাড়িতে যখন যায়, কাঁদতে কাঁদতে যায়। এই বাড়ির সম্পর্ক ছিঁড়তে তার কষ্ট লাগে। আর এই ছেঁড়ার কষ্টের কারণেই নতুন যে জায়গায় যায়, সেখানে নতুন একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সম্ভবত এ ব্যাপারেই আশরাফ আলি থানভি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছিলেন যে, অল্প বয়সের একটা মেয়ে দুদিনে যে কাজ করে দেখায়, আমরা বেশিরভাগ মানুষ সারা জীবনেও তা করতে পারি না। বিয়ে হয়, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি চলে যায়; একটা সম্পর্ক ছেড়ে দেয়, আরেকটা সম্পর্ক গড়ে নেয়। তার মতো আমরা যদি দুনিয়ার একটা সম্পর্ক ছিঁড়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করতে পারতাম, আমাদের জীবন ধন্য হতো। একটা মেয়ে তার মা-বাবার বাড়ির সম্পর্ক ছিঁড়ে দিল আর শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক গড়ে ফেলল, আর আমি বুড়ো হয়েও পারলাম না।
কষ্টের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়া
তো এক সম্পর্ক গড়া, আরেক সম্পর্ক ভাঙা। যার কথা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে, কসম খেলে আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই কসমকে পূরণ করেন। সে ওই কাজ করেছে, প্রতিটি দরজা থেকে বিতাড়িত। সমাজের সাথে সে সম্পর্ক ছেড়েছে। নিজের সাথে সম্পর্কও সে ছেড়েছে। ধুলোমাখা শরীর আর এলোমেলো চুলে সে নিজেরও পরোয়া করে না। প্রতিটি দরজা থেকে বিতাড়িত। সমাজেরও পরোয়া করে না। পরোয়া করে না বলেই সব জায়গা থেকে সে বিতাড়িত। সব জায়গা ছেড়ে দিয়েছে বটে, কিন্তু এক জায়গাকে সে মজবুত করেছে।
ওখানে সে এতই মজবুত যে, যদি একটা কথা বলে ফেলে, তার কথা নিশ্চয়ই রক্ষা করা হবে। সেই বান্দা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে, সে কসম খেলে আল্লাহ তায়ালা তার কসম পূর্ণ করেন। ও যদি হঠাৎ বলে ফেলে, আজকে বৃষ্টি হওয়া দরকার বা আজকে বৃষ্টি হতে হবে; তো যদি ওর মুখ দিয়ে বের হয় যে, আজকে বৃষ্টি হতে হবে, তা যে মাসেই হোক না কেন, বৃষ্টি হবে; কারণ, সে এমনই বান্দা।
মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর ঘটনা
মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আল্লাহর সেরকম বান্দাদের একজন ছিলেন। একবার মদিনায় বৃষ্টির দরকার পড়ল। লোকেরা ডাকল। তিনি তখন এমন নামাজই পড়লেন যে, বাড়িতে ফিরে যেতে যেতে সবাই ভিজে গেল। কারণ, এমনই লোক বলেছে যে, আল্লাহ দেরি করা সমীচীন মনে করেননি। দেরি করতেও রাজি না, মুয়াজের মতো লোক ডেকেছে, এখন দেরি করি কেমন করে! সাথে সাথে বৃষ্টি দিয়ে দিলেন।
কষ্টের বিনিময়ে সম্পর্ক
বান্দা যখন একটা কষ্ট সহ্য করে, আর একটা সম্পর্ক গড়ে নেয়, এক কষ্ট করে অন্য সম্পর্ক ছাড়ে, তখন আল্লাহ তায়ালা এই সম্পর্ক স্থাপনকারীর লাজ রাখেন। মা তার বাচ্চার জন্য কষ্ট করেছে — জন্মের আগেও কষ্ট করেছে, জন্মের পরেও কষ্ট করেছে, এখন সে বার্ধক্যে যদি অজ্ঞান অবস্থায় একটা কথা বলে ফেলে, তার ওই কথা পূরণ করার জন্য পাগল হয়ে দৌড়াবে।
যেমন হঠাৎ করে মা বলল যে, লেবু। অথচ তখন লেবুর মৌসুমও নয়, আর কোনো হুঁশের মধ্যেও বলেনি; কিন্তু ছেলের কানে যদি একবার পড়ে যে, কী যেন একটা কথা বলল, যেন লেবুর মতো কিছু একটা শুনাল, তো বোধ হয় লেবুর শরবত খাবে। এখন সে তার পুরোটা সামর্থ্য ব্যয় করবে কোথায় লেবু পাওয়া যায়। অমৌসুমেও সে লেবুর জন্য সব জায়গায় ছুটবে। যদি তার সামর্থ্য থাকে তো ভারতে খোঁজ করবে, পাকিস্তানে খোঁজ করবে, আর যত টাকাই হোক না কেন, সামর্থ্যে কুলালে যে করেই হোক সে ওটা জোগাড় করে মাকে দেবে। কারণ, যে বলেছে সে সাধারণ কেউ না। আমার মা বলেছে, কেন? একটা সম্পর্ক গড়েছে।
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়া
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সম্পর্ক গড়ার শক্তি দিয়েছেন আর এই সম্পর্ক গড়া হয় কষ্ট করে। মা যেমন কষ্ট করে ছেলের সাথে সম্পর্ক গড়ে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালাম এসেছেন পুরো দুনিয়ার মানুষের কাছে দাওয়াত নিয়ে দুটি কষ্ট করে, দুটি সম্পর্ক গড়ার জন্য — একটি সম্পর্ক আল্লাহর সাথে, আরেকটি সম্পর্ক আল্লাহর মাখলুকের সাথে।
সম্পর্ক যখন গড়বে, তো সম্পর্ক থাকার কারণে কোনো কষ্টই কষ্ট লাগে না। শীতের সময় বাচ্চা বুকের ওপর পেশাব করে দিল। গরিব মা। তার একটিমাত্র শাড়ি; আর ওটাই ভিজিয়ে দিল। শীতের কষ্টের মধ্যে মা এ কথা বলবে না যে, তুমি ভিজিয়েছ, তাই তুমি ভেজা জায়গায় শোও, আর আমি শুকনা জায়গায় শোব। বরং যত কষ্টই হোক, বাচ্চাকে শুকনা জায়গায় শোয়াবে আর নিজে ভেজা জায়গায় শোবে। তার দ্বিতীয় আর কাঁথা নেই, ওই ছোট কাঁথাই, তবুও বাচ্চাকে কষ্ট করতে দেবে না।
এখানে সে কোনো ন্যায়বিচার করে না। ন্যায়বিচার হলো, তুমি ভিজিয়েছ, তুমি ভেজা জায়গায় শোবে; আমি তো আর পেশাব করিনি যে, আমি ভেজা জায়গায় শোব। এটা হলো ন্যায়বিচার, তো মা তার বাচ্চার সাথে ন্যায়বিচার করে না; বরং ভালোবাসার বিচার করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়া
রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন,
"হে আল্লাহ, তোমার কাছে আমি ন্যায়বিচার চাই না। তোমার কাছে আমি দয়া চাই। আমার আমলের বিনিময়ে তুমি আমাকে জান্নাত দাও এটা আমি চাই না; বরং তুমি দয়া করে আমাকে জান্নাত দাও। وَرَحْمَتُكَ أرْجَى عنْدِيْ مِنْ عَمَلِيْ — আমার কাছে আমার আমলের চেয়ে তোমার রহমত অধিক প্রত্যাশিত।"
আমার আমলের বিচার দিয়ে বলি না যে, এটা আমার প্রাপ্য, এটা আমার হক; বরং আমার ওপর দয়া করো, রহমত করো।
নবীদের উম্মতের প্রতি ভালোবাসা
অতএব, কষ্ট করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়া, আবার কষ্ট করে আল্লাহর মাখলুকের সাথে সম্পর্ক গড়া। রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। সব নবীই নিজ উম্মতের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। মা তার বাচ্চাকে যত ভালোবাসে, রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ উম্মতকে তদ্ধিক ভালোবাসতেন। কারণ, কষ্টও তার চেয়ে বেশি করেছেন। এই কষ্টের বুনিয়াদের ওপরই ভালোবাসা গড়ে উঠেছে।
ওই ভালোবাসা থাকার কারণেই উম্মত যখন কষ্ট দিয়েছে, রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য কখনই বদদোয়া করেননি; বরং তাদের জন্য মাফ চেয়েছেন। তায়েফে উম্মত কত কষ্ট দিয়েছে; কিন্তু রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদদোয়া দেননি।
একটি ঘটনা
রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে এরকম ঘটনা আছে যে, ছেলে কালিমা পড়তে পারছে না, খোঁজ করে জানা গেল, মাকে কষ্ট দিয়েছে। রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাকে ডেকে বললেন, তোমার ছেলেকে যদি কেউ আগুনে ফেলতে চায় তাহলে তুমি সুপারিশ করবে? নিশ্চয়ই করব। তুমি তোমার ছেলেকে মাফ করে দাও, ও আগুন থেকে বেঁচে যাবে। তখন মা ছেলেকে মাফ করে দিলেন।
মনে করা যাক এরকম একটা ঘটনা, কোনো ছেলে তার মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে, মাকে মেরেছে। গ্রামের লোক বিচার করল যে, আগুন জ্বালিয়ে এই ছেলেকে আগুনে ফেলো, এটাই তার বিচার। এরপর যখন বিচার কার্যকর হয়ে আগুন জ্বালানো হবে। আর ছেলেকে সেই আগুনে জ্বালাবার প্রস্তুতি নেবে, তখন সবার আগে ওই মা-ই বিচারকদের পায়ে গিয়ে পড়বে। বলবে, আমার ছেলেকে মাফ করে দাও।
তখন বিচারকরা বলবে, মাফ করার মালিক তো আর আমরা না। মাফ করার মালিক তো তুমি। তাহলে দেখুন, মাফ করার সময় কিন্তু মা ছেলের দেওয়া সকল কষ্টের ফিরিস্তি ভুলে যাবে। তো রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কষ্টের বদলা চাননি, বরং উম্মতের মাফ চেয়েছেন। কারণ, উম্মতের জন্য ভালোবাসা ছিল।
রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন উম্মতকে ভালোবেসেছেন, এজন্য তিনি আল্লাহর কাছে এ কথা বলেননি যে, আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তুমি তাদের বিচার করো; বরং আল্লাহকে এ কথা বলেছেন যে, তুমি তাদেরকে মাফ করো।
মায়ের মমতার উদাহরণ
কোনো বদখত ছেলে তার মাকে মারছে। পাশের লোক দেখল যে, ছেলে তার মাকে মারছে। এ দৃশ্য দেখে খুব রেগে গেল। তারা দৌড়ে এলো। তাদেরকে দেখেই মা ভয় পেল যে, এরা আজ যেরকম রেগেছে, আমার ছেলেকে শেষ করে ফেলবে। যদিও তার কারণেই রেগেছে, মাকে মেরেছে, মা যেমনি দেখবে যে, পাশের লোকজন ক্রোধান্বিত হয়ে তার ছেলেকে শেষ করে ফেলবে।
তখন সে নিজের চিন্তা না করে ছেলেকে বাঁচানোর চিন্তায় পড়ে যাবে। সবার কাছে ছুটে গিয়ে বলবে যে, ভাই, আমার ছেলে, আমার ছেলে! আমার ছেলেকে মাফ করে দিন, আপনারা মাফ করে দিন। মেরেছে মাকে, কিন্তু সেই মা-ই পাশের লোকের পায়ে পড়ে মাফ চাইবে যে, আমার ছেলেকে মাফ করে দিন। কারণ, সে তার ছেলেকে ভালোবাসে।
মায়ের মনে আল্লাহ তায়ালাই এই জবরদস্ত মহব্বত দিয়েছেন। নবীদের মহব্বত তো সন্তানের প্রতি মায়ের মুহাব্বতের চেয়ে আরও গভীর, আরও প্রগাঢ়।
আরেকটি গল্প
মায়ের মুহাব্বত সম্পর্কে একটা গল্প শুনেছি। সত্য ঘটনা নয়, বানানো গল্প। বোঝাবার জন্য যে, মা কীভাবে ভালোবাসে।
এক যুবক এক মেয়েকে পেতে চাইল। তার বুকের ভেতরে যৌবনের আগুন জ্বলছে। যুবতী মেয়ে তাকে পেতে যত শর্ত বলবে, সে অকপটে পূরণ করবে। কোনো দ্বিধা করবে না।
যৌবনের উন্মাদনার মধ্যে যখন মেয়েটি বলল, "তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো, না তোমার মাকে বেশি ভালোবাসো?" ছেলেটি বলল, "আমি তোমাকেই বেশি ভালোবাসি।"
মেয়েটি তখন বলল, "তাহলে তোমার মায়ের কলিজা এনে আমাকে দাও।"
সে গেল মায়ের কলিজা আনতে। এসে মাকে হত্যা করে কলিজা বের করল। গ্রামাঞ্চলে কচুর পাতা সহজলভ্য। ছেলেটি কচুর পাতার মধ্যে তার মায়ের কলিজা নিয়ে রওনা হয়ে গেল। প্রেমিকার হাতে তুলে দেবে। ভালোবাসার অগ্নিপরীক্ষায় নিজেকে উত্তীর্ণ করবে - এই তার বাসনা।
ছেলেটি অন্ধকার পথে যাচ্ছিল। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। যার ফলে হাতের তালুতে রাখা কচুর পাতা থেকে মায়ের কলিজাও মাটিতে পড়ে গেল।
কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের হাঁটু ঝাড়তে শুরু করল। পাথরের ওপর পড়ে হাঁটুতে ব্যথা করছে। অদূরেই মায়ের কলিজা পড়ে আছে। যখন সে তার হাঁটু ঝাড়ছে, তখন ওই কলিজা তাকে বলছে, "বাবা, তোমার পায়ে লেগেছে?"
এটা অবশ্য বানানো গল্প। এখানে বোঝানো হয়েছে যে, একজন মা নিজ সন্তানকে কতটা ভালোবাসেন। নিজেকে শেষ করে ফেলেছে, তখনও ছেলের ভালোবাসা তার কাছে প্রবল।
উম্মতের প্রতি নবীজির ভালোবাসা
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালামকে উম্মতের জন্য এরকম ভালোবাসা দিয়েছেন। যে ব্যক্তি রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপযুক্ত ওয়ারিশ, তার মনের মাঝেও উম্মতের প্রতি এমন দরদভরা ভালোবাসা থাকবে। যে সম্পত্তির ওয়ারিশ হয়, সে ভালোবাসারও ওয়ারিশ হয়।
আলেমরা হচ্ছেন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়ারিশ। আলেমদের তো উচিত, তারা যেন উম্মতকে এরকম ভালোবাসেন। এই উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তই কিছু না কিছু আলেম। যে কালিমা পড়তে জানে, সে কালিমার আলেম। যে নামাজ পড়তে জানে, সে নামাজের আলেম। যে ওজু করতে জানে, সে ওজুর আলেম।
সে ব্যক্তি তার জানার অনুপাতে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী। তার করণীয় হলো, সে ওই অনুপাতে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতকে ভালোবাসবে।
ভালোবাসা আসে ব্যথার মাধ্যমে
ভালোবাসা তো আসে ব্যথার মাধ্যমে। হযরত জিবরিল আলাইহিস সালাম আল্লাহর সাথে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিলেন। সম্পর্ক গড়ে দেওয়ার তালিম এরকম ছিল যে, বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। এত জোরে চাপ দিলেন যে, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যথা পেলেন। ওই ব্যথা দিয়ে আল্লাহর সাথে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক গড়া হয়েছে।
ইবাদতের ব্যথা
ইবাদতের একটা ব্যথা আছে। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত জেগে ইবাদত করতেন। এত লম্বা ইবাদত করতেন যে, পা ফুলে যেত; কিন্তু রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদত শেষ হতো না।
একবার নামাজে দাঁড়িয়ে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লম্বা কেরাত পড়লেন। একজন সাহাবি এসে সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়েই যাচ্ছেন। সাহাবি ভাবলেন, ১০০ আয়াত শেষে বোধহয় রুকু করবেন, কিন্তু ১০০ আয়াত শেষে রুকু করলেন না, সূরা শেষ করলেন। সূরা শেষ করার পরে দ্বিতীয় সূরা 'আলে ইমরান' শুরু করলেন আর পড়তে থাকলেন।
সাহাবায়ে কেরামও খুব বেশি ইবাদতওয়ালা ছিলেন। কিন্তু ওই সাহাবির হিম্মত হলো না শেষ পর্যন্ত থাকার, তিনি নামাজ ভেঙে চলে গেলেন। আর রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়তেই থাকলেন।
প্রথম রাকাতে প্রায় সাড়ে পাঁচ পারার মতো পড়লেন। আর রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন পড়তেন অত্যন্ত ধীরে-সুস্থে তারতিলের সাথে। আয়াতের মাঝে আজাবের জায়গায় এলে আজাব থেকে পানাহ চাইতেন। নেয়ামতের জায়গা এলে নেয়ামত পাওয়ার জন্য দোয়া করতেন। এভাবে সাড়ে পাঁচ পারা পড়লেন।
ইবাদতের মধ্যে এত লম্বা ইবাদত করতেন যে, অন্য কেউ শরিক হতে সাহস করত না। ওই ইবাদত করে করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়েছেন, উম্মতের জন্য কষ্ট করেছেন, উম্মতের কাছ থেকে মার খেয়েছেন, সহ্য করেছেন, দোয়া করেছেন; এই কষ্ট সহ্য করে উম্মতের মুহাব্বত দিলের মধ্যে অর্জন করেছেন।
উম্মতের জন্য দায়িত্ব
তো এই মুহাব্বত ছিল রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পদ। আল্লাহ তায়ালা রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষের দিল বদলানোর জন্য। পুরো দুনিয়ার মানুষের দিলের পরিবর্তন করার জন্য। একটা কথা শেখানোর জন্য।
সরকার যদি কোনো অঞ্চলে কাউকে প্রশাসক হিসেবে পাঠায়, তখন সাধারণত তাকে অনেক ক্ষমতা দিয়ে পাঠায়। যেহেতু দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে, কাজেই সেই দায়িত্ব পালন করার জন্য তাকে সুযোগ-সুবিধা, টাকা-পয়সা, অস্ত্র ইত্যাদি দেওয়া হয়।
আল্লাহ তায়ালা পুরো দুনিয়ার মানুষের কাছে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠালেন, তো কী দিয়ে পাঠালেন? হ্যাঁ, উম্মতের মহব্বত দিয়ে পাঠালেন। এটাই ছিল রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পদ। এই সম্পদ দিয়ে পাঠিয়েছেন, মহব্বত না থাকলে কষ্টও করতে পারবে না, আর তার তারবিয়তও করতে পারবে না।
মায়ের উদাহরণ
মায়ের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাচ্চাকে লালন করার। বাচ্চাকে যেভাবে লালন-পালন করতে হয়, উম্মতকে সেভাবেই কিন্তু লালন-পালন করতে হয়। মা যদি বাচ্চাকে না ভালোবাসত, তাহলে লালন-পালন করতে পারত না।
বাচ্চা মাঝরাতে কাঁদতে আরম্ভ করলে তাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হয়; অথচ এই বাচ্চা দিনের বেলায় বিশ্রাম করেছে, আর মা সেসময় হাড়ভাঙা কাজ করেছে। এখন সে অসুস্থ। তার শোয়ার খুবই প্রয়োজন। একে তো অসুস্থ, তার ওপর ক্লান্ত। অসুস্থ শরীরে সারাদিন সে কাজ করেছে, এখন ঘুমাবে। তার ঘুম প্রাপ্য। এটা কোনো অন্যায় আবদার নয়।
আর বাচ্চার দাবি হলো এখন তুমি আমাকে কোলে নিয়ে হাঁটো। বাচ্চা ভাবে না যে, মা বেচারি অসুস্থ। সারাদিন কাজ করেছে। এখন ক্লান্ত। এখন তার ঘুমের প্রয়োজন। আপনি বলুন, এর চেয়ে অন্যায় দাবি কী হতে পারে?
বাচ্চা ঘুমাবে, তাই তাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হবে। কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কিন্তু চলবে না। যদি দাঁড়িয়ে যায় তো চিৎকার আরম্ভ করবে। হাঁটতে থাকে তো শান্ত থাকে। এমন পরিস্থিতিতেও মা সন্তানের সব অন্যায় আবদার মেনে নেয়। নিজের সব দাবি ছেড়ে দেয়। নিজের সব ন্যায়-অন্যায় বিচার ছেড়ে দেয়। তার সন্তানের অন্যায় আবদার মেনে কোলে নিয়ে হাঁটে। অথচ সে অসুস্থ, দুর্বল ও ক্লান্ত।
সন্তানের লালন-পালন তো এভাবেই করতে হয়। নিজে না খেয়ে বাচ্চাকে খাওয়ায়, নিজে কষ্ট করে বাচ্চাকে বিশ্রাম করায়।
নবীদের দায়িত্ব
আল্লাহ তায়ালা নবীদের পাঠিয়েছেন লালন-পালন করার জন্য, নিজে কষ্ট করে উম্মতের জন্য দোয়া করার জন্য। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের জন্য দোয়া করতে করতে রাত শেষ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছেন যে, সেও এই উম্মতের জন্য দোয়া করবে, কষ্ট করবে, যেরকম রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে রাত জেগে জেগে উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন, এই উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তি রাত জেগে উম্মতের জন্য দোয়া করবে।
করবে কখন? যখন উম্মতের সাথে তার সম্পর্ক হবে। আজ আমরা ছেলে-মেয়েদের সাথে তো সম্পর্ক গড়েছি, তাদের জন্য কখনো রাত জেগে দোয়া করেছি। যদি শুনি আমার ছেলে কোনো মুসিবতে পড়েছে, ছেলে বিদেশে আছে, অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। বা অসুস্থ, আগামীকাল ছেলের অপারেশনের তারিখ। এরকম অনেক খবর আসে যে, আগামীকাল ছেলের অপারেশনের তারিখ।
দেখা যাবে মায়ের আর ঘুম নেই। রাত জেগে দোয়া করছে - 'হায় আল্লাহ, আমার ছেলে!' ছেলে জানেও না। ও তো হাসপাতালে ঘুমাচ্ছে। ওদিকে মা জেগে আছে। মা যেমন ছেলের জন্য জেগে থাকে, তেমনই উম্মতের সকল ব্যক্তি যেন উম্মতের জন্য রাতজাগা শেখে। এটাই উম্মতের দায়িত্ব। এটাই রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া সম্পদ।
কিন্তু আজ আমরা ছেলের জন্য যেভাবে রাতজাগা জানি; কিন্তু উম্মতের জন্য রাত জাগতে জানি না। কারণ, ছেলের জন্য কষ্ট করেছি, তার জন্য রাত জাগতে পারি; উম্মতের জন্য কষ্ট করিনি, উম্মতের জন্য রাত জাগতেও পারি না।
আল্লাহ তায়ালা দীন দিয়েছেন, যেন আমরা উম্মতের জন্য কষ্ট করি। নিজের দিলের মধ্যে উম্মতের জন্য ভালোবাসার বীজ বপন করতে পারি। এজন্য আল্লাহ তায়ালা দীনের মেহনত দিয়েছেন। আর দীনের মেহনত মানেই হলো, উম্মতের জন্য ভালোবাসা ও সহ্য করতে শেখা; যাতে এই ভালোবাসার ভেতর দিয়ে আমাদের মনের ভেতরে উম্মতের মুহাব্বতের জন্ম হয়।
মায়ের ভালোবাসার উদাহরণ
আল্লাহ তায়ালা মায়ের মনে সন্তানের যে মুহাব্বত দিয়েছেন, কীভাবে দিয়েছেন? কষ্ট দিয়ে। মায়ের গর্ভে সন্তান আসামাত্র মায়ের কষ্ট শুরু হয়ে যায়। এই কষ্টের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে সন্তানের মুহাব্বত পরিপূর্ণ হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় মনে করা যাক, চার মাসের সন্তান পেটে আছে, মায়ের তখন কিছু কষ্ট হয়। ওই চার মাসের সন্তান যদি নষ্ট হয়ে যায়, তার জন্য মা কাঁদবে না। একটু হয়তো মন খারাপ হবে, কিন্তু চোখের পানি ফেলবে না। কারণ, পেটের ভেতরে থাকা চার মাসের সন্তানের জন্য মায়ের যথেষ্ট পরিমাণ কষ্ট করা হয়নি। যার কারণে তার ভালোবাসাও পরিপূর্ণ হয়নি।
কিন্তু গর্ভধারণের পূর্ণ সময় পার হওয়ার পর যদি পেটের সন্তান মারা যায়, তাহলে তার জন্য মা দু'চোখের অশ্রু ফেলে কাঁদবে। অঝোরে কাঁদবে। একাকী শুয়ে শুয়ে কাঁদবে।
এর চেয়েও বেশি কাঁদবে, যখন কিছুদিন প্রতিপালন করা সন্তান মারা যাবে। কারণ, এক দিকে গর্ভের কষ্ট ছিল, এখন কোলে নেওয়ার কষ্ট। তাকে নিয়ে রাত জাগার কষ্ট, রাত জেগে জেগে তাকে দুধ খাওয়ানোর কষ্ট। যার ফলে তার ভালোবাসা আরও পরিপূর্ণ হয়েছে।
তো যেভাবে একটা সন্তানের ভালোবাসাকে সে কষ্ট করে পরিপূর্ণ করে তুলেছে, এখন যদি সন্তানের গায়ে একটু ব্যথা লাগে, সে সন্তানের চেয়ে বেশি কাঁদবে। নিজের সমস্যার জন্য সন্তান নিজে যত কষ্ট পায়, তার জন্মদাত্রী মা তার চেয়ে অধিক কষ্ট অনুভব করে।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কুরবানি
ইবরাহিম আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম কুরবানি দিয়েছেন। এটাকে ইবরাহিমি কুরবানি বলা হয়। অথচ কুরবানি তো গেছে তাঁর ছেলে ও ছেলের মায়ের উপর। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছেলেকে ও ছেলের মাকে নির্জন প্রান্তরে রেখে চলে এলেন; তিনি নিজে ছিলেন নিরাপদ জায়গায়, যেখানে খাবারও পাওয়া যায়, পানিও পাওয়া যায়। কিন্তু বিপদের মধ্যে তো ছিল তাঁর ছেলে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ও স্ত্রী হাজেরা আলাইহাস সালাম। কিন্তু সব জায়গায় বলা হয় ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কুরবানি।
কারণ, ভালোবাসা যদি প্রবল হয়, তো নিজের যত কষ্ট হয়, যে তাকে ভালোবাসে তার কষ্ট আরও বেশি হয়। দুনিয়াতেও দেখা যায়, কেউ যদি কাউকে বেশি কষ্ট দিতে চায়, নিষ্ঠুর কষ্ট দিতে চায়, তাহলে কোনো মা-বাবাকে মারে না, তার চোখের সামনে তার ছেলেকে কষ্ট দেয়। কারণ, চোখের সামনে নিজ ছেলের কষ্ট পাওয়া নিজের কষ্ট পাওয়ার চেয়ে বেশি তীব্র।
ইসমাঈল আলাইহিস সালামের কষ্ট ইসমাঈল আলাইহিস সালামের চেয়ে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বেশি অনুভব হতো, হাজেরা আলাইহাস সালামের বেশি অনুভব হতো। হাজেরা আলাইহাস সালাম সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়েছেন। তখন পিপাসা তাঁরও ছিল, কিন্তু তিনি তখন দৌড়েছিলেন ছেলের পিপাসার কারণে। সেই দৌড়ের মধ্যেও তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কারণ, নিজের পিপাসাকে ভুলে গেছেন ছেলের পিপাসার মোকাবিলায়।
এভাবেই নিজের কষ্ট ছোট হয়ে যায় আর অন্যের কষ্ট বড় হয়ে যায়। খাইরে উম্মত তো সেই ব্যক্তি, যে উম্মতের জন্য নিজের কষ্টকে ছোট করতে পারে, আর উম্মতের কষ্টকে বড় করতে পারে। এটাই রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বড় সম্পদ। নামাজ, হজ, জাকাত এগুলো তো বুঝি; কিন্তু কষ্ট করে উম্মতের জন্য মুহাব্বত পয়দা করা যে নবুওয়তের বড় মেহনত, এ কথা আজ আমরা বুঝি না।
সাহাবাদের উম্মতের প্রতি মুহাব্বত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বড় মেহনত করে এবং সাহাবিদের দিয়ে বড় মেহনত করিয়ে, কষ্ট করিয়ে তাদের দিলের ভেতরে উম্মতের মুহাব্বতের বীজ বপন করিয়েছিলেন। ওটাই ছিল তাদের সম্পদ।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা
উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তখন খলিফা ছিলেন। বাইরে থেকে মদিনায় কাফেলা এসেছে। আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সে কাফেলাকে দেখতে পেয়ে উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহুর কাছে গেলেন। বললেন, চলো, আমরা যাই। তারা মুসাফির, তারা ঘুমাক। তুমি আর আমি মিলে পাহারা দিই।
তখনকার নিয়ম ছিল, কোনো কাফেলা এলে পালাবদল করে এক দল পাহারা দেবে আর বাকিরা ঘুমাবে। আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, চলো, তুমি আর আমি গিয়ে পাহারা দিই, আর তারা আরাম করে ঘুমাক। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সঙ্গে রওনা হলেন। দুজন মিলে পাহারা দিতে চলে গেলেন।
দেখুন, খলিফা নিজে যাদেরকে পাহারা দিচ্ছেন তারা তার মামা, বা চাচা, বা অন্য কোনোভাবে আত্মীয় ছিল না। তারা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত। অজানা উম্মতের জন্য এত মুহাব্বত যে, তারা আরাম করে ঘুমাক আর আমরা রাত জাগি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই জিনিস শিখিয়েছেন। তিনি শুধু যে নামাজ-রোজা শিখিয়েছেন তা কিন্তু নয়। বরং উম্মতের প্রতেক ব্যক্তিকে এত বেশি ভালোবাসা যে, সেই ভালোবাসার কারণে তার জন্য কষ্ট সহ্য করা যেন সহজ হয়ে যায়।
পাহারার সময়ের ঘটনা
দুজন মিলে পাহারা দিচ্ছেন। হঠাৎ ভেতরের এক তাঁবু থেকে শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। মা তখন শিশুর যত্ন নেওয়া শুরু করল, তো শিশু চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার যখন শিশু কাঁদতে শুরু করল, তখন উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শিশুর মায়ের উপর বিরক্ত হলেন। যদিও জানেন না যে, শিশুই বা কে আর তার মাই বা কে। কাউকেই জানেন না। তবুও তিনি রেগে গেছেন শিশুর মায়ের উপর। কারণ, শিশুকে সে কাঁদাচ্ছে।
এজন্য একটু জোর গলায় কর্কশ স্বরে বললেন, তুমি বড় খারাপ মা, বারবার শিশুকে কাঁদাচ্ছ। এতে শিশুর মা-ও একটু চড়া গলায় বলল, কিছু না জেনে হৈচৈ করছ।
তখন উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, কেন কী ব্যাপার? মানে ব্যাপারটা কী? মহিলা বললেন, শিশু দুধ খেতে চায়, আর মা-ও দুধ ছাড়াতে চায়। সেজন্য শিশুর ক্ষুধা পাচ্ছে, তাই সে কাঁদে। তো মা দুধ দেয় না আর শিশু কাঁদে।
উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তখন খলিফা। তিনি আইন করেছিলেন যে, শিশু যখন মায়ের দুধ ছাড়বে, তখন সরকারি ভাতা পাবে। এই নিয়ম কুরআন শরিফেরও নয়, হাদিস শরিফেরও নয়; উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর বানানো নিয়ম।
যখন মা সেই আইনের কথা বললেন, উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কেঁদে ফেললেন। অঝোর অশ্রুতে দু'চোখ ভিজিয়ে নিজেকে সম্বোধন করে বললেন, হায় উমর, আল্লাহ জানে কত শিশুকে কাঁদিয়েছ। নিয়ম তিনি বানিয়েছিলেন; কিন্তু কোথায় এই অজানা মা আর কোথায় অজানা বাবা। তার কান্নার কারণে উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এখন কাঁদছেন।
তারা তো সেই কওম, নিজের শিশুকে দাফন করতেন চোখের পানি না ফেলে। আর এখন পরের শিশুর জন্য চোখের পানি ফেলছেন। তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু নামাজ-রোজার মাসআলা নিয়ে আসেননি; বরং যে নিজের শিশুকে দাফন করতে পারে চোখের পানি না ফেলে, সেই বাবাকে পরের শিশুর জন্য কান্না শিখিয়েছেন। এটাই ছিল নবুওয়তি মেহনত যে, এক একজন ব্যক্তির জন্য চোখে অশ্রু ঝরবে। এত ভালোবাসা দিলের মধ্যে যে, শিশুর কান্নার জন্য নিজে কেঁদে ফেললেন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কাদিয়ানী থেকে মুসলমানঃ ফিরে আসার গল্প - ০১
...
তাবলীগী মেহনতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
হযরত মাওলানা সায়্যিদ আবুল হাসান ‘আলী নাদাবী রাহ. বাংলাদেশের এক সফরে কাকরাইল মসজিদে বয়ান করেছিলেন। তা...
দাওয়াত ও তাবলীগ : কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কথা
...
বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় ভিন দেশী সংস্কৃতির প্রবর্তন
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন