প্রবন্ধ
দ্বীন ও দুনিয়া
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৯৩
০
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত]
দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক অংশের নাম দ্বীন, আরেক অংশের নাম দুনিয়া। আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালামদের পাঠিয়েছেন মানুষকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে দ্বীনের ব্যস্ততায় লাগানোর জন্য।
দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য
দুনিয়ার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
প্রথম বৈশিষ্ট্য
নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য কাজ করা। মানুষের মনে ইচ্ছা জাগে—ভালো খেতে ইচ্ছা করে, ভালো পোশাক পরতে ইচ্ছা করে, ভালো বাড়িতে থাকতে ইচ্ছা করে, মানুষের কাছে সম্মান পেতে ইচ্ছা করে। রাজা হোক আর প্রজা হোক, হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, নারী হোক আর পুরুষ হোক—সবার মনেই ইচ্ছা জাগে।
রাজারও ইচ্ছা জাগে ভালো জামা-কাপড় পরার, ফকিরেরও ইচ্ছা হয়। রাজা পায়, ফকির পায় না, কিন্তু ইচ্ছা দুজনেরই আছে। মানুষের মনে যত ইচ্ছা জাগে, এই ইচ্ছা পূরণের জন্য যে চেষ্টা করা হয়, তাকে বলা হয় দুনিয়া।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য
নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে জিনিস ব্যবহার করে ইচ্ছা পূরণ করা। কৃষক জমি-কৃষিকাজ ব্যবহার করে, ব্যবসায়ী ব্যবসা ব্যবহার করে, চাকরিজীবী চাকরি ব্যবহার করে নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে চায়। দারোয়ান দারোয়ানগিরি দিয়ে, পুলিশ পুলিশগিরি দিয়ে, এমনকি চোরও চুরি করে তার ইচ্ছা পূরণ করতে চায়।
ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারে দারোয়ান আর চোরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু পদ্ধতিতে। একই রাতে বিভিন্ন মানুষ জেগে থাকে—চোর চুরি করে, দারোয়ান পাহারা দেয়, ব্যবসায়ী ব্যবসা করে, ড্রাইভার গাড়ি চালায়। সবারই একটা জিনিস এক: সবাই নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে চায়, কিন্তু পদ্ধতি ভিন্ন।
দ্বীনের মর্মকথা
এর মোকাবেলায় আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামদের পাঠিয়েছেন দ্বীনের দিকে আনার জন্য। দ্বীনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো: তোমার ইচ্ছা পূরণ নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছা পূরণ, আল্লাহকে রাজি করা।
একজন দোকানদার দোকানে ব্যবসা করছেন কেন? তার ইচ্ছা পূরণের জন্য। মুয়াজ্জিন তাকে ডাক দেন: "এসব ছেড়ে মসজিদে আসো, নামাজ পড়ো—তোমার ইচ্ছার জন্য নয়, আল্লাহকে রাজি করার জন্য।"
দোকানে দোকানদারি করা হয় নিজেকে রাজি করার জন্য, যাতে আমি সন্তুষ্ট হই। আর মসজিদে নামাজ পড়তে হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। নামাজে আমরা নিয়ত করি "লিল্লাহি তায়ালা"—আল্লাহর ওয়াস্তে, যেন আল্লাহ আমার উপর রাজি হয়ে যান।
কেউ জিকির করে আল্লাহকে রাজি করার জন্য, তিলাওয়াত করে আল্লাহকে রাজি করার জন্য, নামাজ পড়ে আল্লাহকে রাজি করার জন্য, রোজা রাখে আল্লাহকে রাজি করার জন্য। দ্বীনের সব কাজের প্রধান কথা হলো আল্লাহকে রাজি করা, নিজেকে রাজি করা নয়। আর দুনিয়ার প্রধান কথা হলো নিজেকে রাজি করা, অন্য কাউকে নয়।
দুনিয়া ও দ্বীনের পার্থক্য
প্রজারা কৃষিকাজ করে। কৃষিকাজের দ্বারা রাজারও লাভ হয়, কিন্তু প্রজা যে কৃষিকাজ করে, তা রাজার জন্য নয়, নিজের জন্য। নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য।
পাড়ার দোকানে দিয়াশলাই, ডিম, মোমবাতি পাওয়া যায়। দোকান থাকার কারণে পাড়ার সবার সুবিধা হয়। কিন্তু দোকানদার যে দোকান করেছে, তা পাড়ার লোকের সুবিধার জন্য নয়, নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য। অন্যের সুবিধা হওয়াটা ভিন্ন বিষয়, তার উদ্দেশ্য নিজেকে রাজি করা।
আর দ্বীনের সব কাজ তার বিপরীত—আল্লাহকে রাজি করার জন্য।
একজন ধনী ব্যক্তি তার কারখানার শ্রমিকদের বলল, "যে নামাজ পড়বে, তাকে ১০০ টাকা করে দেব।" শ্রমিকরা যারা নামাজ পড়ত না, তারা নামাজ পড়া শুরু করল—১০০ টাকা পাওয়ার জন্য। তারা ভাবে, "১০০ টাকা পেলে ভালো নাস্তা করতে পারব, বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতে পারব।"
নামাজ যদিও ঠিকমতো পড়ল, আজুও করল, নিয়তও করল, সূরা ফাতিহা-রুকু-সিজদা সবকিছু ঠিকমতো করল। কিন্তু যেহেতু তার নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য, কেউ বলবে এটা কোনো নামাজই হলো না। এটা আল্লাহকে রাজি করার জন্য নয়, বরং টাকা পাওয়ার জন্য।
দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হলো নিজের ইচ্ছা পূরণ করা, আর দ্বীন মানে আল্লাহর ইচ্ছা ও পছন্দ পূরণ করা, আল্লাহ যেন সন্তুষ্ট হন।
হযরত মূসা (আ.)-এর ঘটনা
আল্লাহ তায়ালা মূসা আলাইহিস সালাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মূসা! তোমার ডান হাতে কী?"
তিনি বললেন, "আমার লাঠি। এর উপর আমি হেলান দিই, এটা দিয়ে ছাগলের জন্য পাতা ছিঁড়ে খাওয়াই, আরও অন্যান্য কাজ এটা দিয়ে করি।"
বোঝা গেল, মূসা আলাইহিস সালাম একজন দুনিয়ার মানুষ, দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত। রাখালগিরি করেন, ছাগল চরান, অন্যান্য কাজ করেন। এই কাজগুলো কেন করেন? এর দ্বারা তাঁর প্রয়োজন মিটবে। ছাগল চরালে ছাগলের দুধ-গোশত খাবেন। ক্লান্ত হলে লাঠির উপর হেলান দিয়ে বিশ্রাম করেন। লাঠি দিয়ে গাছের ফল ছিঁড়তে পারেন, সাপ দেখলে মারতে পারেন। যখন যে জিনিসের মন চায়, লাঠি দিয়ে তা করতে পারেন।
যে জিনিস উপকারী মনে হয়, প্রিয় মনে হয়, সেটা নিজের কাছে রাখেন—"এটা আমার। আমার বাড়ি, আমার ঘর।" মূসা আলাইহিস সালাম বলেন, "এটা আমার লাঠি"—মহব্বতের সাথে।
আল্লাহ তায়ালা বললেন, "এটা ফেলে দাও।"
এই ফেলে দেওয়ার মধ্যে দুটি জিনিস আছে:
১. নিজের মনের ইচ্ছা ফেলে দেওয়া—কারণ লাঠি দিয়ে তাঁর মনের অনেক ইচ্ছা পূরণ হয়।
২. লাঠি দিয়ে যে উপকার পাচ্ছেন, সেই উপকারও ফেলে দেওয়া।
আল্লাহর কথামতো মূসা আলাইহিস সালাম লাঠি ফেলে দিলেন। লাঠি যখন ফেলে দিলেন, আল্লাহ তায়ালা এই লাঠিকে সাপ বানিয়ে দেখালেন। তিনি ভয় পেলেন।
এবার আল্লাহ তায়ালা বললেন, "লাঠিকে ধরো।"
ভয়ের জিনিস নিজে ধরতে চান না। লাঠি ধরেছিলেন উপকারের জন্য—এর দ্বারা অনেক উপকার হয়। কিন্তু সাপ ধরলে কোনো উপকার হবে না, বরং ক্ষতি হবে। সাপ কামড় দিয়ে দিতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বললেন, "ধরো।"
মূসা আলাইহিস সালাম ধরলেন। কেন ধরলেন? যেহেতু আল্লাহ বলেছেন। আল্লাহর কথা মানলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন। এই লাঠি ধরে তাঁর কোনো উপকার হবে, এরকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। লাঠির উপর হেলান দেওয়া যায়, সাপের উপর হেলান দেওয়া যায় না। লাঠি দিয়ে ছাগলের জন্য পাতা ছিঁড়ে খাওয়ানো যায়, সাপ দিয়ে সেই কাজ হবে না।
কিন্তু আল্লাহ বললেন "ধরো", তাই ধরলেন। কেন ধরলেন? আল্লাহ রাজি হবেন। আল্লাহর কথা মানলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন। তাঁর মনের কোনো ইচ্ছা পূরণ হবে না, কিন্তু আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন।
ইবাদত তাকেই বলা হয়, যার লক্ষ্য আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, এবং কীভাবে আল্লাহর হুকুম মানার মাধ্যমে।
মূসা আলাইহিস সালাম সাপকে ধরলেন, সেটা আবার লাঠি হয়ে গেল। হাতে এল। কিন্তু আগের লাঠি আর এই লাঠি একই জিনিস নয়। আগের লাঠি নিজে ধরেছিলেন নিজ বিবেচনায়, নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য। এখন যদিও লাঠি হাতে আছে, কিন্তু:
- প্রথমত, নিজে ধরেননি—নিজ চিন্তায় নয়, আল্লাহকে রাজি করার জন্য।
- এটা দিয়ে কী হবে, সেই চিন্তাও নেই।
যদি মূসা আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞেস করতেন, "এই সাপ দিয়ে তোমার কী উপকার হবে?" মূসা আলাইহিস সালাম হয়তো বলতেন, "সাপ দিয়ে আবার কী উপকার হতে পারে? সাপ তো ক্ষতিকর জিনিস। এটা দিয়ে কী উপকার হবে?"
মূসা আলাইহিস সালাম এই কথা জানেন, কিন্তু তবুও ধরলেন—কোনো উপকারের কথা চিন্তা করে নয়, বরং এই কথা যে আল্লাহ বলেছেন। আল্লাহর কথা মানলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন। এটার নাম ইবাদত।
ইবাদতের মূলনীতি
ফজরের দুই রাকাত নামাজ পড়লাম। কেন পড়লাম? আল্লাহ বলেছেন, তাই পড়েছি। এতে লাভ কী? লাভ-টাভ কিছু জানি না, আল্লাহ পড়তে বলেছেন, তাই পড়লাম।
রমজানে রোজা রাখলাম—সারাদিন খাওয়া-পান করা বন্ধ। না খেয়ে-পান না করে কী লাভ? লাভ কিছুই জানি না, আল্লাহ বলেছেন করতে, তাই করলাম। এতে কী হবে? আল্লাহ রাজি হবেন, এছাড়া আমি কিছুই জানি না। হজ করতে বলেছেন, করলাম। আল্লাহ রাজি হবেন।
আল্লাহ রাজি হবেন বলে আল্লাহর আদেশ পালন করা—এটার নাম ইবাদত। আর আমার প্রয়োজন মিটবে বলে কোনো জিনিস ব্যবহার করা—এটার নাম দুনিয়া।
রাখাল লাঠি ব্যবহার করে, কৃষক লাঙল ব্যবহার করে, ডাক্তার কলম ব্যবহার করে প্রেসক্রিপশন লিখতে। এমনকি ক্রিকেট খেলোয়াড় ব্যাট ব্যবহার করে খেলার জন্য, আসলে অনেক টাকা উপার্জনের জন্য। তার খেলতে ইচ্ছা না করলেও খেলতে যায়, কারণ খেললে অনেক টাকা পাবে।
প্রতিটি মানুষ একেক জিনিস ব্যবহার করে নিজের ইচ্ছা পূরণ করে—এটার নাম দুনিয়া। আর আল্লাহর হুকুম পালন করে আল্লাহকে রাজি করা—এটার নাম দ্বীন।
আম্বিয়াদের মিশন
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালামদের পাঠিয়েছেন পুরো দুনিয়ার মানুষকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দ্বীনের দিকে আনতে।
দুনিয়া থেকে সরানোর মানে কী? আমার মন যেটা চায়, তা ছাড়ো। আর আল্লাহ যেটা বলেন, সেটা ধরো।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
لَنۡ تَنَالُوا الۡبِرَّ حَتّٰی تُنۡفِقُوۡا مِمَّا تُحِبُّوۡنَ
"তোমরা নেকির দরজায় পৌঁছাতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের মহব্বতের জিনিস খরচ করো।"
আমার মন চায়, আমি ভালোবাসি। কিন্তু আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দিলাম। আল্লাহর ওয়াস্তে যখন আমি আমার মনের ইচ্ছা ছাড়ব, তখন আল্লাহ তায়ালা আমার উপর সন্তুষ্ট হবেন।
মানুষ আল্লাহর নাফরমানি করে যখন মনের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে আল্লাহর হুকুম ছেড়ে দেয়—এটার নাম নাফরমানি।
ব্যবসা করছে, মিথ্যা বললে অনেক টাকা পাবে। আর অনেক টাকা পেলে সে মনে করে গাড়ি কিনতে পারবে, বাড়ি কিনতে পারবে। এগুলোর লোভ সামলাতে না পেরে সে মিথ্যা বলে ফেলে, অন্যের জমি দখল করে ফেলে। বোঝে আল্লাহ নারাজ হবেন, কিন্তু নিজের মনের ইচ্ছা প্রবল হওয়ার কারণে আল্লাহকে নারাজ করেও ইচ্ছা পূরণ করতে চায়।
ঠিক যেরকম একদিকে মনের ইচ্ছা প্রবল হওয়ার কারণে আল্লাহকে নারাজ করে ইচ্ছা পূরণ করতে চায়, যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চায়, তবে তাকে তার মনের ইচ্ছা বাদ দিতে হবে।
ফজরের নামাজের উদাহরণ
মন চাচ্ছে ঘুমাই। শুতে শুতে দেরি হয়েছে, খুব ঘুম পাচ্ছে। এখনো ফজরের ওয়াক্ত আছে। এখনো যদি উঠে নামাজ না পড়ি, তাহলে কিছুক্ষণ পর সূর্য উঠে যাবে, ফজরের ওয়াক্ত চলে যাবে, নামাজ কাজা হয়ে যাবে, আল্লাহ তায়ালা নারাজ হবেন। কিন্তু আমার মন চাচ্ছে ঘুমাতে।
এখন যে আল্লাহকে রাজি করতে চায়, মনের চাওয়া ছাড়তে হবে, আর উঠে নামাজ পড়তে হবে। আর যদি বলে, "আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করে নিই", তাহলে নামাজ কাজা হয়ে যাবে, আর আল্লাহ নারাজ হয়ে যাবেন।
একদিকে নিজেকে রাজি করা, অপরদিকে আল্লাহকে রাজি করা।
ইবলিস নিজের অহংকারে বলল:
خَلَقۡتَنِیۡ مِنۡ نَّارٍ وَّخَلَقۡتَہٗ مِنۡ طِیۡنٍ
"আমি আগুনের সৃষ্টি, আর আদম মাটির সৃষ্টি। আমি আদমের চেয়ে ভালো। আমি আদমকে সিজদা করব না।"
আদমকে সিজদা না করলে আল্লাহ নারাজ হবেন। কিন্তু সিজদা করলে তার মন নারাজ হবে। অন্যের কাছে ছোট হওয়া, এটা তার মন চায় না।
যদি আল্লাহকে রাজি করতে চায়, তবে নিজের মনকে ছোট করতে হবে, মনকে নারাজ করতে হবে। আর যদি মনকে রাজি করতে চায়, আল্লাহর নাফরমানি হবে, আল্লাহ নারাজ হবেন।
জমির মোকদ্দমা হচ্ছে। যদি সত্য কথা বলি, জমির মালিকানা পাব না। আল্লাহ রাজি হবেন, কিন্তু জমি চলে যাবে। আর যদি মিথ্যা বলি, জমির মালিকানা পেয়ে যাব, কিন্তু আল্লাহ নারাজ হবেন।
এই দুই জিনিস নিয়ে টানাটানি জীবনে হামেশা চলতে থাকবে। আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করতে গেলে আল্লাহ নারাজ, আল্লাহকে রাজি করতে গেলে মনের ইচ্ছা পূরণ হয় না।
আল্লাহ তায়ালা দ্বীন দিয়েছেন যে, আল্লাহর পথে বের হয়ে দ্বীনের চর্চা করে, আমল করে, দোয়া করে নিজের মনের ইচ্ছাকে কাবু করতে হবে, যেন আল্লাহ তায়ালা রাজি হন।
আবু দারদা (রা.)-এর ঘটনা
আবু দারদা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এলেন এবং তাঁর কাছে এই কথা শুনলেন: "মান যাল্লাজি ইউকরিদুল্লাহা কারদান হাসানা" - অর্থাৎ, কে আল্লাহকে সুন্দর ঋণ দেবে?
আল্লাহর কোনো ঠেকা নেই, তবুও আল্লাহ ঋণ চান। এর অর্থ হলো, আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দুনিয়াবি সম্পদ খরচ করা। আল্লাহ তাআলা আখিরাতে তা বহুগুণ বাড়িয়ে ফেরত দেবেন।
আবু দারদা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, "আল্লাহ তাআলা আমাদের কাছ থেকে ঋণ চান?"
রাসূল (সা.) বললেন, "হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা ঋণ চান।"
তিনি বললেন, "আমার বাগান-বাড়ি তো আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। এটা আমি সদকা করব।"
রাসূল (সা.) তা কবুল করলেন। তাঁর বড় বাগান-বাড়ি ছিল—বাগানের ভেতরে ছোট বাড়িও ছিল, যেখানে তিনি নিজে ও তাঁর পরিবার থাকতেন। চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা বাগান।
তিনি দেয়ালের বাইরে থেকেই পরিবারকে ডাক দিলেন, বাগানের ভেতর ঢুকলেন না। বললেন, "এই বাগান সদকা হয়ে গেছে, তোমরা বের হয়ে চলে আসো।"
নিজের প্রিয় বাড়ি, প্রিয় বাগান—সবকিছু সদকা করে দিলেন আল্লাহর ওয়াস্তে, আল্লাহকে রাজি করার জন্য।
দ্বীন মানে মনের বিরুদ্ধে চলা
দ্বীন মানে হলো আমার মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে আল্লাহকে রাজি করানো। মন চায় আমি বড় হব, আর অন্য সবাই আমার কাছে ছোট হয়ে থাকবে। এজন্য মানুষ বড় বাড়ি বানাতে চায়, রাজা-বাদশা হতে চায়, চাকরিতে বড় অফিসার হতে চায়—যাতে অন্য লোক তার সামনে ছোট হয়ে থাকে, আর সে সবার সামনে বড় হয়ে থাকে। এটাই মনের চাওয়া।
এর বিপরীতে, আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন যে আমি আল্লাহর ওয়াস্তে মানুষের কাছে ছোট হব। সব আল্লাহওয়ালারা ফকির
সব যুগের আল্লাহওয়ালা, সব অলি-আল্লাহ তাঁরা ইচ্ছা করেই নিজেদের ফকির বানাতেন। লোকে বলে "পীর-ফকির"—এরা সবাই ফকির। কেন ফকির? কারণ আল্লাহর ওয়াস্তে মানুষের কাছে গিয়ে তাঁরা হাত পাতেন।
দুনিয়ায় যত কাজ আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেইজ্জতি ও লাঞ্ছনার কাজ হচ্ছে ফকিরের কাজ। মানুষের কাছে হাত পাততে হয়, তারা ধমক দেয়, বকে, খারাপ ব্যবহার করে—কিন্তু ফকির পাল্টা বকতে পারে না, রাগ করতে পারে না। যে যা করে, সব মেনে নিতে হয়। তারপর কান্নাকাটি করে ভিক্ষা চাইতে হয়। নিজেকে খুব লাঞ্ছিত করতে হয় ফকির হতে হলে।
আর দুনিয়ার সব মানুষের ইচ্ছা হচ্ছে তার একেবারে বিপরীত—আমি কারও কাছে হাত পাতব না, বরং আমি চাই দুনিয়ার মানুষ আমার কাছে হাত পাতবে, আমি তাদের ধমক দিয়ে বিদায় করব।
গরিব থেকে ধনী হলে মানুষের পরিবর্তন
একজন লোক গরিব থাকতে অন্যকে সালাম করত, তাকে কেউ সালাম করত না। গরিব মানুষকে সালাম করে কী লাভ? সে যখন গরিব ছিল, মনও দুর্বল ছিল, ডানে-বামে গিয়ে সালাম করত—ভাবত, "আমি গরিব মানুষ, ঠেকা আছে, এদেরকে সালাম করলে আমার সুবিধা হবে।" পাড়ার মধ্যে যে দুর্বল, সে সবলদের সন্তুষ্ট রাখতে চায়।
এখন সেই ব্যক্তি ধনী হয়ে গেছে—শুধু ধনী নয়, বিরাট ধনী। আগে যাদের সে সালাম করত, তারা খুব একটা উত্তর দিত না। এখন তারা তাকে সালাম করে—দূর থেকে দেখলেই সালাম করে, দরকার হলে রাস্তার ভিড়ের মধ্য দিয়ে রাস্তা পার হয়ে এসে সালাম করে।
এখন সে আর বেশি উত্তর দেয় না। সামনে কেউ সালাম দিলে "হু" বলে, "ওয়া আলাইকুমুস সালাম" বলার ধৈর্য ও সময় তার নেই। অনেক সময় "হু"ও বলে না।
এত বড় ব্যবসা কেন করেছে? এখনো রাত জেগে ব্যবসা করে, আরও টাকা উপার্জন করে, আরও বড় ব্যবসা করতে চায়—যাতে মানুষ তার কাছে ঠেকায় থাকে।
ক্ষমতার লোভ: কমিশনারের উদাহরণ
নির্বাচন হয়, ওয়ার্ড কমিশনার হয়—এতে লাভ কী? অনেক লোক আছে যারা টাকাপয়সা মারে না, রিলিফের টাকা বা অন্য কোনো দুর্নীতি করে না। বরং সে মোটামুটি ধনী লোক, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে পাড়ার কাজ করে।
তাহলে কেন সে কমিশনার হতে চায়? লাভটা কী? লাভ এই যে, তার কাছে লোক এসে সালাম করবে, নানা ঠেকার কথা বলবে, আর সে বলবে, "ঠিক আছে, দেখব।" তার কাছে লোক সাহায্য চাইবে, আর সে বলবে, "ঠিক আছে, দেখব"—এটাই তার লাভ।
মানুষ চায় যে তার বড় পরিচিতি থাকবে, তাকে লোকে চিনবে।
পাইকারের গল্প
এক জায়গায় এক লোক ধান কিনত—বারো টাকা মণ হিসেবে ধান কিনত, আর এনে বাজারে খুচরা বিক্রি করত একই দরে। কিনেও বারো টাকা, বিক্রিও বারো টাকা মণ হিসেবে।
কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল, "তাহলে তোমার লাভটা কী? যে দামে কিনলে, সেই দামে বিক্রি করলে তো কোনো লাভ থাকল না।"
সে বলল, "এই যে আমাকে 'পাইকার' বলে, এটাই আমার লাভ। বাজারে আমি কিনি আর বিক্রি করি, এতে আমার একটা নাম আছে—'আবদুর রহিম পাইকার'। এই 'পাইকার' যে বলে, এটাই লাভ। আমি যদি বেচাকেনা না করতাম, তাহলে আমাকে শুধু 'আবদুর রহিম' ডাকত, 'পাইকার' ডাকত না।"
দুনিয়ার আসল মেহনত
মানুষ বড় বাড়ি বানায়—সম্পূর্ণ বাড়িতে তো সে একটা খাটেই ঘুমায়, এত বড় বাড়ির দরকার কী? সেই বড় বাড়িটাই তার পরিচয়।
দুনিয়ার বড় মেহনত হচ্ছে—এক, ভালো থাকা-খাওয়া; আর বড় একটা মেহনত হলো মানুষের সামনে বড় পরিচয় থাকা।
এর বিপরীতে দ্বীন হচ্ছে মানুষের সামনে আল্লাহর ওয়াস্তে ছোট হওয়া।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ফকির। মক্কার লোকদের কাছে যেতেন, এক একজনের কাছে যেতেন—তারা ধমক দিত, বিদায় করে দিত, কথা শুনত না।
ফকিরকে তো লোকে শুধু "যাও যাও" বলে ছেড়ে দেয়। আমি জীবনে কোনোদিন দেখিনি যে ভিক্ষা চাওয়ার কারণে কেউ তাকে মারছে—"এই বেটা ফকির, ভিক্ষা কেন চাইলি? মার ওকে।" এরকম কখনো দেখিনি। ভিক্ষা না দিলে বলে, "ভাই, মাফ কর, এখন না।" "মাফ" শব্দটা বলে—যদিও ধমক দিয়ে বলে, কিন্তু "মাফ" তো বলেই।
কিন্তう রাসূল (সা.)-কে মারত! এত বেশি ভিক্ষা চাইতেন যে তারা বিরক্ত হয়ে মেরেছে, থুতু দিয়েছে। তারপরও ভিক্ষা চাইতেন। কী ভিক্ষা চাইতেন? "ভাই, কালেমা পড়ে নাও। বলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।" এটাই ছিল তাঁর ভিক্ষা চাওয়া।
পীর-ফকিররা মানুষের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চায়। এটা মানুষের নফসের জন্য বড় অপছন্দের জিনিস। নফস কখনো চায় না কারও কাছে গিয়ে ছোট হতে। এজন্য সব জায়গায় সে উপরে থাকতে চায়।
ছাত্র পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে চায়। কেন? যাতে তার সহপাঠীদের কাছে তার কদর বেশি থাকে। "আমি ফার্স্ট, তুই সেকেন্ড"—এই কথা বলার জন্য। আর যদি ফার্স্ট না হয়, তাহলে কেউ তার উপরে উঠে গেল—এটা তার ভালো লাগে না।
ঝগড়া-ফাসাদের মূল
ঝগড়া-ফাসাদের বড় অংশ থাকে অহংকার থেকে। জমি নিয়ে মোকদ্দমা চলছে, মোকদ্দমা করতে করতে বাকি জমি শেষ—কিন্তু মোকদ্দমা করেই যাচ্ছে। সে বোঝে না মোকদ্দমার খরচ কত, আর জমির দাম কত। জমি এক লাখ টাকার হলে, মোকদ্দমার খরচ দশ লাখ টাকা। দশ লাখ টাকা দিয়ে এক লাখ টাকার জমি জিতে তার কী লাভ?
লাভ হলো এই—"ওকে আমি দেখিয়ে দেব, বেটা চেনে না যে আমি কে।" এটাই আসল ব্যাপার। "ওকে আমি জেলের ভাত খাওয়াব।" কিন্তু ওকে জেলের ভাত খাওয়ালে তোমার লাভটা কী? "ওকে আমি চেনাব—বেটা চেনে না।"
ঝগড়া যখন করে, বলে, "আমাকে চিনিস? আমাকে চেনাব।" এটা তার অহংকার।
দুনিয়ার মানুষ নিজেকে বড় করে দেখাতে চায়, আর আল্লাহওয়ালারা নিজেকে ফকির বানায়। কেউ যদি ফকিরই হয়ে যায়, তার সাথে ঝগড়া হবে না।
যে গ্রামে কত ঝগড়া-ফাসাদ চলছে, সেই গ্রামে অনেক ফকির আছে—আমাদের দেশে অনেক ফকির। এই ফকিরদের উপর কোনো মোকদ্দমা নেই, কোথাও পাওয়া যাবে না যে ফকিরদের বিরুদ্ধে কেউ মোকদ্দমা করেছে। ফকির কি ফকিরের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা করবে? মোকদ্দমা করবে তো অহংকারী লোকের উপর—দেখাবে।
রাগ করে জিজ্ঞেস করে, "আমাকে চিনিস?" ফকির যদি বিনীত স্বরে বলে, "স্যার, আপনাকে চিনি," তবে সে বলবে, "দূর, বেটা! তোর চেনার দরকার কী? ফকির চিনলে লাভ কী? বড়লোক চিনলে তাও লাভ আছে।"
বিয়ের প্রস্তাবের উদাহরণ
বিয়ের প্রস্তাব দিল এক বড়লোকের মেয়ের কাছে। তারা তার পরিচয় জানতে চায়—"কে কে তোমাকে চেনে?"
"আমার গ্রামের সব ফকির আমাকে চেনে।"
এই কথা শুনলে কোনো লোক তার মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইবে না। "কী, এক লোক—ফকিররা চেনে?" যদি ধনী-ধনী লোকেরা চেনে, তখন তার কদর করবে।
দ্বীন ও দুনিয়ার পার্থক্য
আল্লাহ তাআলা আমাদের দ্বীন দিয়েছেন। দ্বীন আমাদের কাছে চায় যে আল্লাহর ওয়াস্তে মানুষের সামনে নিজেকে ছোট বানাব। আর দুনিয়া চায় মানুষের কাছে আমি বড় হব।
মানুষের কাছে যে বড় হয়, আল্লাহর কাছে সে ছোট হয়ে যায়। আর যে নিজেকে মানুষের সামনে ছোট বানায়, আল্লাহ তাআলা তাকে বড় বানিয়ে দেন।
আবার বলছি—দুনিয়ার মানে আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করা। মনের ইচ্ছা মানে ভালো থাকা-খাওয়া—এগুলো আছে। আর বড় একটা ইচ্ছা হলো লোকে যেন আমাকে চেনে, আমাকে বড় মনে করে।
তাবলিগের কাজ: আল্লাহর ওয়াস্তে ফকির হওয়া
তাবলিগওয়ালারা ফকির হয় গাশত করতে গিয়ে। যার কাছে গাশতে গেল, তার কাছে গিয়ে ফকির। ফকির যেরকম দোকানে দোকানে গিয়ে ভিক্ষা চায়, গাশতওয়ালারাও দোকানে দোকানে গিয়ে ভিক্ষা চায়। ফকিরকে কেউ পয়সা দেয়, কেউ দেয় না—গাশতওয়ালাকেও কেউ বলে "আসব," কেউ বলে "এখন না," জান, বিদায় করে দেয়।
অলি-বুজুর্গ যারা থাকেন, তারাও মানুষের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চান। কী ভিক্ষা চান? তাবলিগের মতো এ কথা তো বলেন না যে "ভাই, বয়ান হবে, আসেন।" কিন্তু তবুও মানুষের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চান—"ভাই, নামাজ পড়েন, জিকির করেন, হারাম খাওয়া ছেড়ে দেন।" ওয়াজ করে, নসিহত করে লোকের কাছে গিয়ে এগুলো বলেন।
ঘুরেফিরে সব আল্লাহওয়ালারা মানুষের কাছে ফকির—আল্লাহর ওয়াস্তে।
হযরত মূসা (আ.)-এর ঘটনা: আল্লাহর হুকুম পালন
মূসা (আ.)-কে আল্লাহ তাআলা বললেন, "তোমার লাঠি ফেলে দাও," যখন জাদুকরদের সাপ তাঁকে আক্রমণ করেছিল। জাদুকররা তাদের লাঠি আর দড়ি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, আর ফেলার সাথে সাথে সব দড়ি ও লাঠি সাপ হয়ে গিয়েছিল। এই অসংখ্য সাপ মূসা (আ.)-কে আক্রমণ করছিল।
মূসা (আ.)-এর হাতে লাঠি ছিল। আল্লাহ তাআলা বললেন, "তোমার লাঠি ফেলে দাও।"
মানুষ লাঠি হাতে রাখে এজন্যই যে সাপ-বিচ্ছু আক্রমণ করলে লাঠি দিয়ে নিজেকে বাঁচাবে। প্রতিদিন ফজরে যাওয়ার সময় অন্ধকারে লাঠি হাতে নেয়—যদি অন্ধকারে কোনো সাপ ফোঁস করে ওঠে, লাঠি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করবে। কখনো রাস্তার পাশে কুকুর থাকে, ঘেউ ঘেউ করে—লাঠি হাতে থাকলে কুকুর আক্রমণ করলে বাঁচাবে।
একজন নামাজে যাচ্ছে, এমন সময় হঠাৎ সামনে সাপ দেখল। তার সাথে যে আছে, বলল, "সামনে কী দেখতে পাচ্ছেন?"
"হ্যাঁ, কী এটা?"
"সাপ! জলদি হাতের লাঠি ফেলে দেন।"
"তুমি পাগল! লাঠি হাতে রেখেই সাপকে মারব। লাঠি ফেলে দেব এখন? তুমি তো উল্টা কথা বলছ।"
মূসা (আ.)-কে যখন সাপ আক্রমণ করল, আল্লাহ তাআলা বললেন, "তোমার লাঠি ফেলে দাও।"
মানুষের যুক্তি-বুদ্ধি হিসাবে মূসা (আ.)-এর উত্তর এটাই হওয়ার কথা যে "আল্লাহ, আপনি তো উল্টা কথা বলছেন। অনেক সাপ আক্রমণ করেছে, এখন তো আমার লাঠির প্রয়োজন বেশি। এখন তো ফেলে দেওয়া যাবে না।"
কিন্তু মূসা (আ.) ফেলে দিলেন। কেন? ইবাদতের মানেই হচ্ছে আল্লাহ যেটা বলেছেন, সেটাই করব—এতে আমার বুদ্ধিতে লাভ হোক বা ক্ষতি হোক, যা-ই হোক, আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন।
মানুষের বুদ্ধি বলে, সাপ দেখে লাঠি আরও টাইট করে ধরো, তারপর সেই লাঠি দিয়ে সাপকে মারো। আর আল্লাহ তাআলা বলছেন, টাইট করে ধরা তো নয়ই, বরং ছেড়ে দাও—পড়ে যাবে, হাত খালি করে দাও। একেবারে উল্টো।
কিন্তু যে আল্লাহর কথা মানে, সে নিজের বুদ্ধি দিয়ে এটাকে আর বিচার করবে না—এটা আমার বুদ্ধিতে লাভের না ক্ষতির, কোনো চিন্তা করবে না। আল্লাহ বলেছেন ফেলে দিতে, ফেলে দিলাম।
তারপর তিনি গেলেন সমুদ্রের সামনে। সামনে সমুদ্র, পিছনে ফেরাউনের বাহিনী। সমুদ্রের সামনে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বললেন, "লাঠি দিয়ে পানিতে আঘাত করো।" মুসা আলাইহিস সালাম এভাবে বলতে পারতেন, "হে আল্লাহ! আপনার সব কথা তো উল্টাপাল্টা। একটু বুঝে শুনে বলেন। সাপের সামনে বললেন লাঠি ফেলে দিতে, আর এখন পানিতে লাঠি মারতে বলছেন। পানিতে লাঠি মেরে লাভটা কী? পানির কী হবে?"
কিন্তু মুসা আলাইহিস সালাম পানিতে লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন। আগে জানতেন না কী হবে। মারলেন, তারপর আল্লাহ তায়ালা রাস্তা বানিয়ে দিলেন। এটা তিনি আগে জানতেন না। কেন মেরেছেন? কারণ আল্লাহ বলেছেন মারো। এ কথা বলেননি যে, "মেরে লাভটা কী?" কোনো বুদ্ধি-বিবেচনা কিছুই খাটাননি। আল্লাহ করতে বলেছেন, করলাম। কেন? আল্লাহকে রাজি করার জন্য।
আল্লাহকে রাজি করার জন্য একটা কাজ করা—এটার নাম ইবাদত। আর নিজের বুদ্ধি-বিবেচনায় কোনো ফায়দা পাওয়ার জন্য একটা কাজ করা—এটার নাম দুনিয়া। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন। দুনিয়া ছাড়ি আর দ্বীন ধরি। আমার বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে আমার ইচ্ছা পূরণ করা, আমার প্রয়োজন মেটানো—এই জীবনের পথকে ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পথকে ধরি।
যে আল্লাহর হুকুম পালন করবে, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে—আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা, আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়াতেও ভালো জীবন দেবেন, আখিরাতেও ভালো জীবন দেবেন। কীভাবে দেবেন? ওটা আল্লাহ জানেন।
আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামকে আগেই কিছু বলেননি। যখন পানিতে আঘাত করলেন, আল্লাহ তায়ালা রাস্তা খুলে দিলেন। ওপারে চলে গেলেন। ওপারে চলে যাওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা সম্পূর্ণ ফেরাউন আর ফেরাউনের দেশ আর সবকিছু বনি ইসরাইলকে দিয়ে দিলেন। আগে থেকে কোনোটাই তাদের ছিল না। দুনিয়াও আল্লাহ তায়ালা দিয়ে দিলেন, অনেক বেশি দিলেন। কিন্তু দিলেন আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে।
আল্লাহ যদি কারও উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান—আল্লাহ তায়ালার হাতে দুনিয়া আর আখিরাতের সব ভাণ্ডার। আল্লাহ যখন যা চান তাই দিতে পারেন। দুনিয়াও দিতে পারেন, আখিরাতও দিতে পারেন।
এজন্য আমরা সবাই নিয়ত করি, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহর পথে বের হব আর আল্লাহর পথে বের হয়ে আল্লাহকে রাজি করব। আল্লাহকে রাজি করে দুনিয়ারও ফায়দা নেব আল্লাহর কাছ থেকে, আখিরাতেরও ফায়দা নেব আল্লাহর কাছ থেকে।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দা'য়ীর সাথে আল্লাহ তা'আলা আছেন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... আহলে ইলমের ওয়াদা রূহের জগতে আল্লাহ তা'আলা সাধারণ ল...
জামাতসমূহের প্রতি বিদায়ী হেদায়েত ও নির্দেশনা
...
ইংরেজি পড়ব কি পড়ব না
...
হাদীসের আলোকে মসজিদে ঘুমানোর শরয়ী বিধান
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন