সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আত তাওবাহ্ (التوبة) | অনুশোচনা

মাদানী

মোট আয়াতঃ ১২৯

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

بَرَآءَۃٌ مِّنَ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖۤ اِلَی الَّذِیۡنَ عٰہَدۡتُّمۡ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ؕ ١

বারাআতুম মিনাল্লা-হি ওয়া রাছূলিহীইলাল্লাযীনা ‘আ-হাত্তুম মিনাল মুশরিকীন।

(হে মুসলিমগণ! এটা) আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা সেই সকল মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।

তাফসীরঃ

১. পূর্বে এ সূরার পরিচিতিতে যে প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে, এ আয়াতগুলি ভালোভাবে বুঝতে হলে সেটা জানা থাকা আবশ্যক। জাযিরাতুল আরবকে ইসলামের কেন্দ্রভূমি বানানোর লক্ষ্যে আল্লাহ তাআলা আদেশ নাযিল করেন যে, কিছু কালের অবকাশ দেওয়া হল। এরপর আর কোন মূর্তিপূজক আরব উপদ্বীপে নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং যে সামান্য সংখ্যক মুশরিক অদ্যাবধি ইসলাম গ্রহণ করেনি, এ আয়াতে তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এরা ছিল সেই সব লোক, যারা মুসলিমদেরকে কষ্ট দানের কোন পন্থা বাকি রাখেনি, সর্বদা তাদের উপর বর্বরোচিত জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদেরকে জাযিরাতুল আরব ত্যাগ করার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে, সামনের আয়াতসমূহে বিস্তারিতভাবে তা আসছে। এ সকল মুশরিক ছিল চার রকমের। এক. এক তো হল সেই সকল মুশরিক, যাদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ বন্ধের কোন চুক্তি হয়নি। এরূপ মুশরিকদেরকে চার মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তারা ইসলাম গ্রহণ করলে তো ভালো কথা। যদি তা না করে জাযিরাতুল আরবের বাইরে কোনও দেশে যেতে চায়, তবে তারও ব্যবস্থা করতে পারে। যদি এ দু’টো বিকল্পের কোনওটি গ্রহণ না করে, তবে এখনই তাদেরকে জানিয়ে দেওয়া যাচ্ছে যে, তাদেরকে যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে (তিরমিযী, হজ্জ অধ্যায়, হাদীস নং ৮৭১)। দুই. দ্বিতীয় প্রকার হল সেই সকল মুশরিকের, যাদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু তার জন্য নির্দিষ্ট কোনও মেয়াদ ধার্য করা হয়নি। তাদের সম্পর্কেও ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে যে, এখন থেকে সে চুক্তি চার মাস পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এর ভেতর তাদেরকেও প্রথমোক্ত দলের মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সূরা তাওবার প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াত এ দুই শ্রেণীর মুশরিক সম্পর্কেই। তিন. তৃতীয় প্রকারের মুশরিক হল তারা, যাদের সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধবিরোধী চুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন বটে, কিন্তু তারা সে চুক্তির মর্যাদা রক্ষা না করে বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়েছিল, যেমন হুদায়বিয়ায় কুরাইশ কাফেরদের সাথে এ রকম চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু তারা সে চুক্তি লংঘন করেছিল। তারই ফলশ্রুতিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা মুকাররমায় অভিযান চালিয়েছিলেন এবং বিজয় অর্জন করেছিলেন। তাদেরকে বাড়তি কোন সময় দেওয়া হয়নি, তবে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা যেহেতু হজ্জের সময় দেওয়া হয়েছিল, যা এমনিতেই সম্মানিত মাস, যখন যুদ্ধ-বিগ্রহ জায়েয নয় এবং এর পরের মহররমও এ রকমই একটি মাস, তাই স্বাভাবিকভাবেই মহররম মাসের শেষ পর্যন্ত তারা সময় পেয়ে গিয়েছিল। তাদেরই সম্পর্কে ৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, সম্মানিত মাসসমূহ গত হওয়ার পরও যদি তারা ঈমান না আনে এবং জাযিরাতুল আরব ত্যাগও না করে, তবে তাদেরকে কতল করা হবে। চার. চতুর্থ প্রকারের মুশরিক তারা, যাদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এবং এর ভেতর তারা বিশ্বাস ভঙ্গও করেনি। ৪নং আয়াতে এদের সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাদের চুক্তির মেয়াদ যত দিনই অবশিষ্ট আছে, তা পূরণ করতে দেওয়া হবে। এর মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে কোনও রকম ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। বনু কিনানার শাখা গোত্র বনু যাম্রা ও বনু মুদলিজের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ রকমই চুক্তি ছিল। তাদের দিক থেকে চুক্তিবিরোধী কোনও রকম তৎপরতাও পাওয়া যায়নি। তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আরও নয় মাস বাকি ছিল। সুতরাং তাদেরকে নয় মাস সময় দেওয়া হল। এ চারও প্রকারের ঘোষণাসমূহকে বারাআঃ বা সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা বলা হয়।

فَسِیۡحُوۡا فِی الۡاَرۡضِ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّاعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ غَیۡرُ مُعۡجِزِی اللّٰہِ ۙ وَاَنَّ اللّٰہَ مُخۡزِی الۡکٰفِرِیۡنَ ٢

ফাছীহূফিল আরদিআরবা‘আতা আশহুরিওঁ ওয়া‘লামূআন্নাকুম গাইরু মু‘জিঝিল্লা-হি ওয়া আন্নাল্লা-হা মুখঝিল কা-ফিরীন।

সুতরাং (হে মুশরিকগণ! আরবের) ভূমিতে চার মাস পর্যন্ত তোমরা (স্বাধীনভাবে) বিচরণ করতে পার। জেনে রেখ, তোমরা আল্লাহকে ব্যর্থ করতে পারবে না এবং এটাও (জেনে রেখ) যে, আল্লাহ কাফেরদেরকে লাঞ্ছিত করে ছাড়বেন।

وَاَذَانٌ مِّنَ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖۤ اِلَی النَّاسِ یَوۡمَ الۡحَجِّ الۡاَکۡبَرِ اَنَّ اللّٰہَ بَرِیۡٓءٌ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ۬ۙ  وَرَسُوۡلُہٗ ؕ  فَاِنۡ تُبۡتُمۡ فَہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ۚ  وَاِنۡ تَوَلَّیۡتُمۡ فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ غَیۡرُ مُعۡجِزِی اللّٰہِ ؕ  وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ ۙ ٣

ওয়া আযা-নুম মিনাল্লা-হি ওয়া রাছূলিহীইলান্না-ছি ইয়াওমাল হাজ্জিল আকবারি আন্নাল্লাহা বারী-উম মিনাল মুশরিকীনা ওয়া রাছূলুহূ ফাইন তুবতুম ফাহুওয়া খাইরুল্লাকুম ওয়া ইন তাওয়াল্লাইতুম ফা‘লামূআন্নাকুম গাইরু মু‘জিঝিল্লা-হি ওয়া বাশশিরিল্লাযীনা কাফারূবি‘আযা-বিন আলীম।

বড় হজ্জের দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে সমস্ত মানুষের জন্য ঘোষণা করা যাচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং তাঁর রাসূলও। সুতরাং (হে মুশরিকগণ!) তোমরা যদি তাওবা কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে কল্যাণকর হবে। আর যদি (এখনও) তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে স্মরণ রেখ, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না এবং কাফেরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শোনাও।

তাফসীরঃ

২. কুরআন মাজীদে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের হুকুম এসে গেলেও ইনসাফের খাতিরে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেক শ্রেণীকে যে মেয়াদে অবকাশ দিয়েছিলেন, তার শুরু ধরা হয় সেই সময় থেকে যখন তারা এ সকল বিধান সম্পর্কে অবগতি লাভ করেছিল। সমগ্র আরবে এ ঘোষণা পৌঁছানোর সর্বোত্তম মাধ্যম ছিল হজ্জের সময়ে ঘোষণা দান। কেননা তখন হিজাযে সারা আরব থেকে লোকজন একত্র হত এবং তখনও পর্যন্ত মুশরিকরাও হজ্জ করতে আসত। সুতরাং মক্কা বিজয়ের পর হিজরী ৯ সনে যে হজ্জ অনুষ্ঠিত হয়, তাকেই এ ঘোষণার জন্য বেছে নেওয়া হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এ হজ্জে শরীক হননি। তিনি হযরত আবু বকর (রাযি.) কে হজ্জের আমীর বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি সম্পর্কচ্ছেদের উপরিউক্ত বিধানসমূহ ঘোষণা করার জন্য হযরত আলী (রাযি.)কে প্রেরণ করেন। এর কারণ ছিল এই যে, সে কালে আরবে রেওয়াজ ছিল কেউ কোনও চুক্তি করার পর তা বাতিল করতে চাইলে সরাসরি তার নিজেকেই তা ঘোষণা করতে হত অথবা তার কোন নিকটাত্মীয়ের দ্বারা ঘোষণা দেওয়াতে হত। তখনকার সেই রেওয়াজ হিসেবেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রাযি.)কে প্রেরণ করেছিলেন (আদ-দুররুল মানছুর, ৪ খণ্ড, ১১৪ পৃষ্ঠা, বৈরুত ১৪২১ হিজরী)। প্রকাশ থাকে যে, প্রত্যেক হজ্জকেই আল-হাজ্জুল আকবার বা বড় হজ্জ বলে। এটা বলা হয় এ কারণে যে, উমরাও এক রকমের হজ্জ, তবে সেটা ছোট হজ্জ আর তার বিপরীতে হজ্জ হল বড় হজ্জ। মানুষের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, কোনও বছর হজ্জ যদি জুমুআর দিন হয়, তবে তা আকবারী হজ্জ (বড় হজ্জ) হয়। বস্তুত এর কোনও ভিত্তি নেই। এ কথা অনস্বীকার্য যে, জুমুআর দিন হজ্জ হলে দু’টি ফযীলত একত্র হয়, কিন্তু তাই বলে সেটাকেই আকবারী হজ্জ সাব্যস্ত করা ঠিক নয়। বরং যে-কোনও হজ্জই আকবারী হজ্জ, তা যে দিনেই অনুষ্ঠিত হোক।

اِلَّا الَّذِیۡنَ عٰہَدۡتُّمۡ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ثُمَّ لَمۡ یَنۡقُصُوۡکُمۡ شَیۡئًا وَّلَمۡ یُظَاہِرُوۡا عَلَیۡکُمۡ اَحَدًا فَاَتِمُّوۡۤا اِلَیۡہِمۡ عَہۡدَہُمۡ اِلٰی مُدَّتِہِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَّقِیۡنَ ٤

ইল্লাযীনা ‘আ-হাত্তুম মিনাল মুশরিকীনা ছুম্মা লাম ইয়ানকুসূকুম শাইআওঁ ওয়া লাম ইউজাহিরূ‘আলাইকুম আহাদান ফাআতিম্মূ ইলাইহিম ‘আহদাহুম ইলা-মুদ্দাতিহিম ইন্নাল্লা-হা ইউহিব্বুল মুত্তাকীন।

তবে (হে মুসলিমগণ!) যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তি সম্পন্ন করেছ ও পরে তারা তোমাদের চুক্তি রক্ষায় কোনও ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সহযোগিতাও করেনি, তাদের সঙ্গে কৃত চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সাবধানতা অবলম্বনকারীদের পছন্দ করেন।

তাফসীরঃ

৩. অর্থাৎ পূর্ণ সাবধানতার সাথে চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করা বাঞ্ছনীয়, যাতে পূর্ণ হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে কোনওরূপ সন্দেহ বাকি না থাকে।

فَاِذَا انۡسَلَخَ الۡاَشۡہُرُ الۡحُرُمُ فَاقۡتُلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَیۡثُ وَجَدۡتُّمُوۡہُمۡ وَخُذُوۡہُمۡ وَاحۡصُرُوۡہُمۡ وَاقۡعُدُوۡا لَہُمۡ کُلَّ مَرۡصَدٍ ۚ فَاِنۡ تَابُوۡا وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَخَلُّوۡا سَبِیۡلَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٥

ফাইযানছালাখাল আশহুরুল হুরুমুফাকতুলুল মুশরিকীনা হাইছুওয়াজাত্তুমূহুম ওয়া খুযূহুম ওয়াহসুরূহুম ওয়াক‘উদূলাহুম কুল্লা মারসাদিন ফাইন তা-বূওয়া আকা-মুসসলা-তা ওয়া আ-তাউঝঝাকাতা ফাখাললূছাবীলাহুম ইন্নাল্লা-হা গাফুরুর রাহীম।

অতঃপর সম্মানিত মাসসমূহ অতিবাহিত হলে মুশরিকদেরকে (যারা তোমাদের চুক্তি ভঙ্গ করেছিল) যেখানেই পাবে হত্যা করবে। তাদেরকে গ্রেফতার করবে, অবরোধ করবে এবং তাদেরকে ধরার জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে বসে থাকবে। অবশ্য তারা যদি তাওবা করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৪. এতে তৃতীয় প্রকার মুশরিকদের কথা বলা হয়েছে, যারা চুক্তিবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিল।

وَاِنۡ اَحَدٌ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ اسۡتَجَارَکَ فَاَجِرۡہُ حَتّٰی یَسۡمَعَ کَلٰمَ اللّٰہِ ثُمَّ اَبۡلِغۡہُ مَاۡمَنَہٗ ؕ  ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَوۡمٌ لَّا یَعۡلَمُوۡنَ ٪ ٦

ওয়া ইন আহাদুম মিনাল মুশরিকীনাছ তাজা-রাকা ফাআজিরহু হাত্তা-ইয়াছমা‘আ কালামাল্লা-হি ছুম্মা আবলিগহু মা’মানাহূ যা-লিকা বিআন্নাহুম কাওমুল লা-ইয়া‘লামূন।

মুশরিকদের মধ্যে কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পারে। তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দেবে। এটা এ কারণে যে, তারা এমন লোক, যাদের জ্ঞান নেই।

তাফসীরঃ

৫. এ আয়াত মুশরিকদের চারও শ্রেণীকে তাদের নিজ-নিজ মেয়াদের বাইরে এই সুবিধা দিয়েছে যে, তাদের কেউ যদি অতিরিক্ত সময় চায় এবং ইসলামী দাওয়াত সম্পর্কে চিন্তা করতে ইচ্ছুক হয়, তবে তাকে আশ্রয় দিয়ে আল্লাহর কালাম শোনানো হবে অর্থাৎ ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে দলীল-প্রমাণ বোঝানো হবে। (কেননা মূল উদ্দেশ্য তো অমুসলিমদের নিপাত করা নয়; বরং তারা যাতে সত্য দ্বীন গ্রহণ করে নেয়, সেই ব্যবস্থা করা। এর জন্য তাদের সামনে হিদায়াতের বাণী তুলে ধরা ও দলীল-প্রমাণ পরিস্ফুট করে তোলা জরুরি, যাতে তারা সত্য চিনতে সক্ষম হয় এবং মিথ্যা ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণে প্রস্তুত হয়ে যায়। -অনুবাদক)

کَیۡفَ یَکُوۡنُ لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ عَہۡدٌ عِنۡدَ اللّٰہِ وَعِنۡدَ رَسُوۡلِہٖۤ اِلَّا الَّذِیۡنَ عٰہَدۡتُّمۡ عِنۡدَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ۚ فَمَا اسۡتَقَامُوۡا لَکُمۡ فَاسۡتَقِیۡمُوۡا لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَّقِیۡنَ ٧

কাইফা ইয়াকূনুলিলমুশরিকীনা ‘আহদুন ‘ইনদাল্লা-হি ওয়া ‘ইনদা রাছূলিহীইল্লাল্লাযীনা ‘আহাত্তুম ‘ইনদাল মাছজিদিল হারা-মি ফামাছতাকা-মূলাকুম ফাছতাকীমূলাহুম ইন্নাল্লা-হা ইউহিব্বুল মুত্তাকীন।

মুশরিকদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে কোন চুক্তি কি করে বলবৎ থাকতে পারে? তবে মসজিদুল হারামের নিকটে তোমরা যাদের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করেছ, তারা যতক্ষণ তোমাদের সাথে সোজা থাকবে, তোমরাও তাদের সাথে সোজা থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে পছন্দ করেন।

তাফসীরঃ

৮. এতটুকু কথা স্পষ্ট যে, ৭ থেকে ১৬নং পর্যন্ত আয়াতসমূহে কুরাইশ কাফেরদের সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে এবং তাদের কর্তৃক চুক্তি ভঙ্গের কথা বর্ণিত হয়েছে। আর মুসলিমদেরকে হুকুম করা হয়েছে, তারা যেন তাদের কথায় আস্থা না রাখে। যদি তারা চুক্তি ভঙ্গ করে তবে তাদের সাথে যেন যুদ্ধ করে। তবে এ আয়াতসমূহ কখন নাযিল হয়েছিল সে সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। একদল মুফাসসির বলেন, এ আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল মক্কা বিজয়ের আগে হুদায়বিয়ায়, যখন কুরাইশের সাথে মুসলিমগণ চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। এ চুক্তি বলবৎ ছিল। কিন্তু এ আয়াতসমূহে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, তারা নিজেদের চুক্তিতে অবিচল থাকবে না। কাজেই তারা চুক্তিভঙ্গ করলে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। অতঃপর তারা পুনরায় চুক্তি সম্পাদন করতে চাইলে তাদের কথায় আস্থা রাখবে না। কেননা তারা মুখে বলে এক কথা, কিন্তু অন্তরে থাকে অন্য কিছু। তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করলে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তাদেরকে করবেন লাঞ্ছিত। এভাবে যে সকল মুসলিম তাদের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের অন্তর জুড়াবে। এ তাফসীর অনুসারে এ আয়াতসমূহ সম্পর্কচ্ছেদের সেই ঘোষণার আগে নাযিল হয়েছে, যা ১ থেকে ৬নং পর্যন্ত আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে। সে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল মক্কা বিজয়ের এক বছর দু’মাস পর হিজরী ৯ সনের হজ্জের সময়। অপর একদল মুফাসসির বলেন, এ সকল আয়াত সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়ার আগের নয়; বরং সেই সম্পর্কিত আয়াতসমূহে যে বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়ে আসছে এ আয়াতসমূহও তারই অংশ। এতে সেই ঘোষণা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর তা এই যে, এসব লোক আগেই যেহেতু চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাই এখন আর আশা করা যায় না যে, তাদের সঙ্গে নতুন কোন চুক্তি করা হলে তারা তা রক্ষা করবে। কেননা মুসলিমদের প্রতি তাদের মনে যে বিদ্বেষ ও শত্রুতা বিরাজ করে, সে কারণে তাদের কাছে না কোনও আত্মীয়তার মূল্য আছে আর না কোনও চুক্তির। যেহেতু মক্কা বিজয়কালে ও তার পরে কুরাইশের বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং কুরাইশ কাফেরদের সাথে তাদের আত্মীয়তা ছিল, তাই কুরাইশ সম্পর্কে তাদের অন্তরে কিছুটা কোমলতা থাকা অস্বাভাবিক ছিল না। তাই এ আয়াতসমূহে তাদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে, তারা যেন কুরাইশ কাফেরদের কথায় প্রতারিত না হয়। বরং অন্তরে যেন দৃঢ় সংকল্প রাখে, যদি কখনও তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হয় তবে পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাদের সাথে লড়বে। এ লেখকের কাছে একাধিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই তাফসীরই বেশি শক্তিশালী মনে হয়। প্রথম কারণ তো এই যে, ৭ থেকে ১৬ পর্যন্ত আয়াতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সবগুলো একই বিষয়বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত। আলোচনার ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করলে ৭নং আয়াত সম্পর্কে এরূপ ধারণা করা কঠিন যে, এ আয়াত প্রথম ছয় আয়াতের বহু আগে নাযিল হয়েছিল। দ্বিতীয়ত ঘোষণা দানকালে হযরত আলী (রাযি.) কুরআন মাজীদর যে আয়াতসমূহ পাঠ করেছিলেন, রিওয়ায়াতসমূহে তার সংখ্যা সর্বনি¤œ দশ এবং সর্বোচ্চ চল্লিশ বলা হয়েছে। (দেখুন আদ-দুররুল মানছুর, ৪র্থ খণ্ড, ১১২ পৃষ্ঠা; আল-বিকাঈ, নাজমুদ দুরার, ৮ খণ্ড, ৩৬৬ পৃষ্ঠা)। আর নাসায়ী শরীফের এক রিওয়ায়াতে যে আছে ‘তিনি তা শেষ পর্যন্ত পড়লেন’ (অধ্যায় হজ্জ, পরিচ্ছেদ তারবিয়ার দিন খুতবা প্রসঙ্গ, হাদীস নং ২৯৯৩), এর অর্থ যে সমস্ত আয়াত দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল, তার শেষ পর্যন্ত পড়লেন। তৃতীয়ত হাফেজ ইবনে জারীর তাবারী (রহ.), আল্লামা বিকাঈ (রহ.) ও কাযী আবুস সাউদ (রহ.)-সহ বড়-বড় মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ এ আয়াতসমূহকে বারাআঃ বা সম্পর্কচ্ছেদেরই অংশ সাব্যস্ত করেছেন। তাদের মতে এতে সম্পর্কচ্ছেদের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

کَیۡفَ وَاِنۡ یَّظۡہَرُوۡا عَلَیۡکُمۡ لَا یَرۡقُبُوۡا فِیۡکُمۡ اِلًّا وَّلَا ذِمَّۃً ؕ  یُرۡضُوۡنَکُمۡ بِاَفۡوَاہِہِمۡ وَتَاۡبٰی قُلُوۡبُہُمۡ ۚ  وَاَکۡثَرُہُمۡ فٰسِقُوۡنَ ۚ ٨

কাইফা ওয়া ইয়ঁইয়াজহারূ‘আলাইকুম লা-ইয়ারকুবূফীকুম ইল্লাওঁ ওয়ালা-যিম্মাতাইঁ ইউরদূ নাকুম বিআফওয়া-হিহিম ওয়া তা’বা-কুলূবুহুম ওয়া আকছারুহুম ফা-ছিকূন।

(কিন্তু অন্য মুশরিকদের সাথে) কেমন করে (চুক্তি বলবৎ থাকবে), যখন (তাদের অবস্থা হল), তারা কখনও তোমাদের উপর বিজয়ী হলে তোমাদের ব্যাপারে কোনওরূপ আত্মীয়তার মর্যাদা দেয় না এবং অঙ্গীকারেরও না। তারা মুখে তোমাদেরকে সন্তুষ্ট রাখতে চায়, অথচ তাদের অন্তর তা অস্বীকার করে। তাদের অধিকাংশই অবাধ্য।

اِشۡتَرَوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ ثَمَنًا قَلِیۡلًا فَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِہٖ ؕ اِنَّہُمۡ سَآءَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ٩

ইশতারাও বিআ-য়া-তিল্লা-হি ছামানান কালীলান ফাসাদ্দূ‘আন ছাবীলিহী ইন্নাহুম ছাআ মা-কা-নূইয়া‘মালূন।

তারা আল্লাহর আয়াতসমূহের বিনিময়ে (দুনিয়ার) তুচ্ছ মূল্য গ্রহণকেই পছন্দ করেছে ১০ এবং তার ফলে (মানুষকে) আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করে। বস্তুত তারা যা কিছু করে তা অতি নিকৃষ্ট।

তাফসীরঃ

১০. অর্থাৎ তারা আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহ অনুসরণ করার পরিবর্তে পার্থিব জীবনের তুচ্ছ স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছে।
১০

لَا یَرۡقُبُوۡنَ فِیۡ مُؤۡمِنٍ اِلًّا وَّلَا ذِمَّۃً ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُعۡتَدُوۡنَ ١۰

লা-ইয়ারকুবূনা ফী মু’মিনিন ইল্লাওঁ ওয়ালা-যিম্মাতাওঁ ওয়া উলাইকা হুমুল মু‘তাদুন।

তারা কোনও মুমিনের ক্ষেত্রেই কোনও আত্মীয়তার মর্যাদা দেয় না এবং অঙ্গীকারেরও নয় এবং তারাই সীমালংঘনকারী।
১১

فَاِنۡ تَابُوۡا وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَاِخۡوَانُکُمۡ فِی الدِّیۡنِ ؕ وَنُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ١١

ফাইন তা-বূওয়া আকা-মুস সালা-তা ওয়া আ-তাউঝঝাকা-তা ফাইখওয়া-নুকুম ফিদদীনি ওয়ানুফাসসিলুল আ-য়া-তি লিকাওমিইঁ ইয়া‘লামূন।

সুতরাং যদি তারা তাওবা করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই হয়ে যাবে। ১১ যারা জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য বিধানাবলী (এভাবে) বিশদ বর্ণনা করি।

তাফসীরঃ

১১. এখানে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, কোনও ব্যক্তি খাঁটি মনে তাওবা করলে মুসলিমদের উচিত তার সাথে ভ্রাতৃসুলভ আচরণ করা এবং ইসলাম গ্রহণের আগে যেসব কষ্ট দিয়েছে, তা ভুলে যাওয়া। কেননা ইসলাম পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ও অন্যায়-অপরাধ মিটিয়ে দেয়। (অতঃপর অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যে তারা অন্যান্য মুসলিমের সমতুল্য হয়ে যায়। (-অনুবাদক)
১২

وَاِنۡ نَّکَثُوۡۤا اَیۡمَانَہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ عَہۡدِہِمۡ وَطَعَنُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ فَقَاتِلُوۡۤا اَئِمَّۃَ الۡکُفۡرِ ۙ اِنَّہُمۡ لَاۤ اَیۡمَانَ لَہُمۡ لَعَلَّہُمۡ یَنۡتَہُوۡنَ ١٢

ওয়া ইন নাকাছূদ্মআইমা-নাহুম মিম বা‘দি ‘আহদিহিম ওয়া তা‘আনূফী দীনিকুম ফাকাতিলূআইম্মাতাল কুফরি ইন্নাহুম লা-আইমা-না লাহুম লা‘আল্লাহুম ইয়ানতাহূন।

তারা যদি চুক্তি সম্পন্ন করার পর নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দ্বীনের নিন্দা করে, তবে কুফরের এ সকল নেতৃবর্গের সঙ্গে এই আশায় যুদ্ধ কর যে, তারা হয়ত নিরস্ত হবে। ১২ বস্তুত এরা এমন লোক, যাদের প্রতিশ্রুতির কোনও মূল্য নেই।

তাফসীরঃ

১২. পূর্বের আয়াতসমূহের দৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এক অর্থ হতে পারে ইসলাম গ্রহণের পর মুরতাদ হয়ে যাওয়া, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর অনেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল এবং হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) তাদের সঙ্গে জিহাদ করেছিলেন। আবার এ অর্থও হতে পারে যে, যাদের সঙ্গে তোমাদের চুক্তি ছিল এবং তারা সে চুক্তি আগেই ভঙ্গ করেছে কিংবা যাদের চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হতে আরও নয় মাস বাকি আছে, তারা যদি এই সময়ের মধ্যে চুক্তি ভঙ্গ করে, তবে তাদের সঙ্গে জিহাদ করবে। ‘এই আশায় যুদ্ধ কর যে, তারা হয়ত নিরস্ত হবে’ এর অর্থ, তোমাদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের উদ্দেশ্য রাজ্য বিস্তার নয়; বরং এই হওয়া চাই যে, তোমাদের শত্রু যাতে কুফর ও জুলুম পরিত্যাগ করে।
১৩

اَلَا تُقَاتِلُوۡنَ قَوۡمًا نَّکَثُوۡۤا اَیۡمَانَہُمۡ وَہَمُّوۡا بِاِخۡرَاجِ الرَّسُوۡلِ وَہُمۡ بَدَءُوۡکُمۡ اَوَّلَ مَرَّۃٍ ؕ اَتَخۡشَوۡنَہُمۡ ۚ فَاللّٰہُ اَحَقُّ اَنۡ تَخۡشَوۡہُ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ١٣

আলা-তুকা-তিলূনা কাওমান্নাকাছুদ্মআইমা-নাহুম ওয়া হাম্মূবিইখরা-জির রাছূলি ওয়া হুম বাদাউকুম আওওয়ালা মাররাতিন আতাখশাওনাহুম ফাল্লা-হু আহাক্কুআনতাখশাওহু ইন কুনতুম মু’মিনীন।

তোমরা কি সেই সকল লোকের সাথে যুদ্ধ করবে না, যারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং রাসূলকে (দেশ থেকে) বহিষ্কারের ইচ্ছা করেছে এবং তারাই তোমাদের বিরুদ্ধে (উস্কানী দান ও উত্যক্তকরণের কাজ) প্রথম করেছে। ১৩ তোমরা কি তাদেরকে ভয় কর? (যদি তাই হয়) তবে তো আল্লাহই এ বিষয়ের বেশি হকদার যে, তোমরা তাকে ভয় করবে যদি তোমরা মুমিন হও।

তাফসীরঃ

১৩. অর্থাৎ তারাই মক্কা মুকাররমায় প্রথমে জুলুম করেছে, অথবা এর অর্থ হুদায়বিয়ার সন্ধি তারাই প্রথম ভঙ্গ করেছে।
১৪

قَاتِلُوۡہُمۡ یُعَذِّبۡہُمُ اللّٰہُ بِاَیۡدِیۡکُمۡ وَیُخۡزِہِمۡ وَیَنۡصُرۡکُمۡ عَلَیۡہِمۡ وَیَشۡفِ صُدُوۡرَ قَوۡمٍ مُّؤۡمِنِیۡنَ ۙ ١٤

কা-তিলূহুম ইউ‘আযযিবহুমুল্লা-হু বিআইদীকুম ওয়া ইউখঝিহিম ওয়াইয়ানসুরকুম‘আলাইহিম ওয়া ইয়াশফি সুদূরা কাওমিম মু’মিনীন।

তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদেরকে শাস্তি দান করেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে সাহায্য করেন এবং মুমিনদের অন্তর জুড়িয়ে দেন।
১৫

وَیُذۡہِبۡ غَیۡظَ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ وَیَتُوۡبُ اللّٰہُ عَلٰی مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ١٥

ওয়া ইউযহিব গাইজা কুলূবিহিম ওয়া ইয়াতূবুল্লা-হু ‘আলা-মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।

এবং তাদের মনের ক্ষোভ দূর করেন। আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা তার তাওবা কবুল করেন। ১৪ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

১৪. অর্থাৎ এটা অসম্ভব নয় যে, কাফেরগণ তাওবা করে ইসলামে প্রবেশ করবে। সুতরাং এর পরে বহু লোক সত্যিকারের মুসলিম হয়ে যায়।
১৬

اَمۡ حَسِبۡتُمۡ اَنۡ تُتۡرَکُوۡا وَلَمَّا یَعۡلَمِ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ جٰہَدُوۡا مِنۡکُمۡ وَلَمۡ یَتَّخِذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَلَا رَسُوۡلِہٖ وَلَا الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَلِیۡجَۃً ؕ  وَاللّٰہُ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ ٪ ١٦

আম হাছিবতুম আন তুতরাকূওয়া লাম্মা-ইয়া‘লামিল্লা-হুল্লাযীনা জা-হাদূমিনকুম ওয়া লাম ইয়াত্তাখিযূমিন দূ নিল্লা-হি ওয়ালা-রাছূলিহী ওয়ালাল মু’মিনীনা ওয়ালীজাতাওঁ ওয়াল্লা-হু খাবীরুম বিমা-তা‘মালূন।

তোমরা কি মনে করেছ তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে, অথচ আল্লাহ এখনও দেখে নেননি তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করে এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানায় না? ১৫ তোমরা যা-কিছু কর, আল্লাহ তা পরিপূর্ণরূপে জানেন।

তাফসীরঃ

১৫. দৃশ্যত এর দ্বারা ইশারা করা হয়েছে সেই সকল ব্যক্তির প্রতি, যারা মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তখনও পর্যন্ত কোনও জিহাদে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি। অন্যান্য সাহাবীগণ তো মক্কা বিজয়ের আগেও বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই নও মুসলিমদেরকে বলা হচ্ছে, তোমাদেরও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। বারাআঃ বা সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দানের পর যদিও বড় কোনও যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, তথাপি তাদেরকে সর্বান্তকরণে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে এ কারণে যে, পাছে আত্মীয়তার পিছুটানের ফলে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটানোর যাবতীয় দাবী ও চাহিদা পূরণে তারা ইতস্ততঃ করে। এজন্যই জিহাদের নির্দেশ দানের সাথে সাথে এ কথাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদের ছাড়া অন্য কাউকে এমন অন্তরঙ্গ বন্ধু না বানায়, যার কাছে নিজেদের গোপন কথা প্রকাশ করা যায়।
১৭

مَا کَانَ لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ اَنۡ یَّعۡمُرُوۡا مَسٰجِدَ اللّٰہِ شٰہِدِیۡنَ عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ بِالۡکُفۡرِ ؕ اُولٰٓئِکَ حَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ ۚۖ وَفِی النَّارِ ہُمۡ خٰلِدُوۡنَ ١٧

মা-কা-না লিলমুশরিকীনা আইঁ ইয়া‘মুরূমাছা-জিদাল্লা-হি শা-হিদীনা ‘আলাআনফুছিহিম বিলকুফরি উলাইকা হাবিতাত আ‘মা-লুহুম ওয়াফিন্না-রি হুম খা-লিদূ ন।

আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করার কোন উপযুক্ততা মুশরিকদের নেই, ১৬ যখন তারা নিজেরাই নিজেদের কুফরের সাক্ষী। তাদের সমস্ত কর্মই নিষ্ফল হয়ে গেছে এবং তারা জাহান্নামেই স্থায়ীভাবে থাকবে।

তাফসীরঃ

১৬. মক্কার মুশরিকগণ এই বলে গর্ব করত যে, তারা মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধায়ক। তারা এ পবিত্র মসজিদের খেদমত ও দেখাশোনা করে এবং এর নির্মাণকার্যের মত গৌরবময় দায়িত্ব পালন করে। এ হিসেবে তাদের মর্যাদা মুসলিমদের উপরে। এ আয়াত তাদের সে ভ্রান্ত ধারণা রদ করছে। বলা হচ্ছে যে, মসজিদুল হারাম বা অন্য যে-কোনও মসজিদের খেদমত করা নিঃসন্দেহে এক বড় ইবাদত, কিন্তু এর জন্য ঈমান থাকা শর্ত। কেননা মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যই হল আল্লাহ তাআলার এমন ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা, যাতে আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কাউকে শরীক করা হবে না। এই বুনিয়াদী উদ্দেশ্য যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে মসজিদ নির্মাণের সার্থকতা কী? সুতরাং কুফর ও শিরকে লিপ্ত কোনও ব্যক্তি মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার উপযুক্ত নয়। সামনে ২৮নং আয়াতে মুশরিকদেরকে এই বিধান জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এখন থেকে তারা এসব কাজের জন্য মসজিদুল হারামের কাছেও আসতে পারবে না।
১৮

اِنَّمَا یَعۡمُرُ مَسٰجِدَ اللّٰہِ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَاَقَامَ الصَّلٰوۃَ وَاٰتَی الزَّکٰوۃَ وَلَمۡ یَخۡشَ اِلَّا اللّٰہَ فَعَسٰۤی اُولٰٓئِکَ اَنۡ یَّکُوۡنُوۡا مِنَ الۡمُہۡتَدِیۡنَ ١٨

ইন্নামা-ইয়া‘মুরু মাছা-জিদাল্লা-হি মান আ-মানা বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়া আকা-মাসসালা-তা ওয়া আ-তাঝঝাকা-তা ওয়ালাম ইয়াখশা ইল্লাল্লা-হা ফা‘আছাউলাইকা আইঁ ইয়াকূনূমিনাল মুহতাদীন।

আল্লাহর মসজিদ তো আবাদ করে তারাই, যারা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান এনেছে এবং নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। এরূপ লোকদের সম্পর্কেই আশা আছে যে, তারা সঠিক পথ অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
১৯

اَجَعَلۡتُمۡ سِقَایَۃَ الۡحَآجِّ وَعِمَارَۃَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ کَمَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَجٰہَدَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  لَا یَسۡتَوٗنَ عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ  وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ۘ ١٩

আজা‘আলতুম ছিকা-ইয়াতাল হাজজি ওয়া ‘ইমা-রাতাল মাছজিদিল হারা-মি কামান আমানা বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়া জা-হাদা ফী ছাবীলিল্লা-হি লা-ইয়াছতাঊনা ‘ইনদাল্লা-হি ওয়াল্লা-হু লা-ইয়াহদিল কাওমাজ্জা-লিমীন।

তোমরা কি হাজীদেরকে পানি পান করানো ও মসজিদুল হারামকে আবাদ করার কাজকে সেই ব্যক্তির (কার্যাবলীর) সমান মনে কর, যে আল্লাহ ও পরকালে ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? ১৭ আল্লাহর কাছে এরা সমতুল্য নয়। আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছান না।

তাফসীরঃ

১৭. এ আয়াতে মূলনীতি বলে দেওয়া হয়েছে যে, সমস্ত নেক কাজ সম-মর্যাদার হয় না। কোনও ব্যক্তি যদি ফরয কাজসমূহ আদায় না করে নফল ইবাদতে লিপ্ত থাকে, তবে এটা কোন নেক কাজ হিসেবেই গণ্য হবে না। নিশ্চয়ই হাজীদেরকে পানি পান করানো একটি মহৎ কাজ, কিন্তু মর্যাদা হিসেবে তা নফল বৈ নয়। অনুরূপ মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধানও অবস্থাভেদে ফরযে কিফায়া কিংবা একটি নফল ইবাদত। পক্ষান্তরে ঈমান তো মানুষের মুক্তির জন্য বুনিয়াদী শর্ত। আর জিহাদ কখনও ফরযে আইন এবং কখনও ফরযে কিফায়া। প্রথমোক্ত কাজ দু’টির তুলনায় এ দু’টোর মর্যাদা অনেক উপরে। সুতরাং ঈমান ব্যতিরেকে কেবল এ জাতীয় সেবার কারণে কেউ কোনও মুমিনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে না।
২০

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ ۙ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ ٢۰

আল্লাযীনা আ-মানূওয়া হা-জারূওয়া জা-হাদূফী ছাবীলিল্লা-হি বিআমওয়া-লিহিম ওয়া আনফুছিহিম আ‘জামুদারাজাতান ‘ইনদাল্লা-হি ওয়া উলাইকা হুমুল ফাইঝূন।

যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহর পথে হিজরত করেছে এবং নিজেদের জান-মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর কাছে মর্যাদায় অনেক শ্রেষ্ঠ এবং তারাই সফলকাম।
২১

یُبَشِّرُہُمۡ رَبُّہُمۡ بِرَحۡمَۃٍ مِّنۡہُ وَرِضۡوَانٍ وَّجَنّٰتٍ لَّہُمۡ فِیۡہَا نَعِیۡمٌ مُّقِیۡمٌ ۙ ٢١

ইউবাশশিরুহুম রাব্বুহুম বিরাহমাতিম মিনহু ওয়া রিদওয়া-নিওঁ ওয়া জান্না-তিল লাহুম ফীহানা‘ঈমুম মুকীম।

তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে রহমত, সন্তুষ্টি ও এমন উদ্যানসমূহের সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার ভেতর তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী নি‘আমত।
২২

خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ اِنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗۤ اَجۡرٌ عَظِیۡمٌ ٢٢

খা-লিদীনা ফীহা-আবাদান ইন্নাল্লা-হা ‘ইনদাহূআজরুন ‘আজীম।

তারা তাতে সর্বদা থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহরই কাছে আছে মহা-প্রতিদান।
২৩

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّخِذُوۡۤا اٰبَآءَکُمۡ وَاِخۡوَانَکُمۡ اَوۡلِیَآءَ اِنِ اسۡتَحَبُّوا الۡکُفۡرَ عَلَی الۡاِیۡمَانِ ؕ وَمَنۡ یَّتَوَلَّہُمۡ مِّنۡکُمۡ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ ٢٣

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূলা-তাত্তাখিযূআ-বাআকুম ওয়া ইখওয়া-নাকুম আওলিয়াআ ইনিছতাহাব্বুল কুফরা ‘আলাল ঈমা-নি ওয়া মাই ইয়াতাওয়াল্লাহুম মিনকুম ফাউলাইকা হুমুজ্জা-লিমূন।

হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভাইয়েরা যদি ঈমানের বিপরীতে কুফরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়, তবে তাদেরকে নিজেদের অভিভাবক বানিও না। ১৮ তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবক বানাবে, তারাই জালেম।

তাফসীরঃ

১৮. অর্থাৎ তাদের সাথে এমন সম্পর্ক রেখ না, যা তোমাদের দ্বীনী দায়িত্ব-কর্তব্য আদায়ে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। নিজেদের ঈমান রক্ষা করা ও দ্বীনী কর্তব্যসমূহ আদায় করার পাশাপাশি তাদের সাথে সদাচরণ করার যে ব্যাপারটা, ইসলামে সেটা উপেক্ষণীয় নয়; বরং কুরআন মাজীদ তাকে উত্তম কাজ সাব্যস্ত করেছে ও তাতে উৎসাহ যুগিয়েছে (দেখুন সূরা লুকমান, ৩১ : ১৫; সূরা মুমতাহানা, ৬০ : ৮)।
২৪

قُلۡ اِنۡ کَانَ اٰبَآؤُکُمۡ وَاَبۡنَآؤُکُمۡ وَاِخۡوَانُکُمۡ وَاَزۡوَاجُکُمۡ وَعَشِیۡرَتُکُمۡ وَاَمۡوَالُۨ اقۡتَرَفۡتُمُوۡہَا وَتِجَارَۃٌ تَخۡشَوۡنَ کَسَادَہَا وَمَسٰکِنُ تَرۡضَوۡنَہَاۤ اَحَبَّ اِلَیۡکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَجِہَادٍ فِیۡ سَبِیۡلِہٖ فَتَرَبَّصُوۡا حَتّٰی یَاۡتِیَ اللّٰہُ بِاَمۡرِہٖ ؕ  وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ ٪ ٢٤

কুলইন কা-না আ-বাউকুম ওয়া আবনাউকুম ওয়া ইখওয়া-নুকুম ওয়া আঝওয়া-জুকুম ওয়া ‘আশীরাতুকুম ওয়া আমওয়া-লুনিকতারাফতুমূহা-ওয়া তিজা-রাতুন তাখশাওনা কাছা-দাহা-ওয়া মাছা-কিনুতারদাওনাহা-আহাব্বা ইলাইকুম মিনাল্লা-হি ওয়া রাছূলিহী ওয়া জিহাদিন ফী ছাবীলিহী ফাতারাব্বাসূহাত্তা-ইয়া’তিয়াল্লা-হু বিআমরিহী ওয়াল্লা-হু লা-ইয়াহদিল কাওমাল ফা-ছিকীন।

(হে নবী! মুসলিমদেরকে) বল, তোমাদের কাছে যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের খান্দান, তোমাদের সেই সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, তোমাদের সেই ব্যবসা, যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা কর এবং বসবাসের সেই ঘর, যা তোমরা ভালোবাস, তবে অপেক্ষা কর, যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ ফায়সালা প্রকাশ করেন। ১৯ আল্লাহ অবাধ্য লোকদেরকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছান না।

তাফসীরঃ

১৯. ফায়সালা দ্বারা শাস্তির ফায়সালা বোঝানো হয়েছে। এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, অর্থ-সম্পদ, ঘর-বাড়ি, জমি-জায়েদাদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবই আল্লাহ তাআলার নিয়ামত। তবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না এগুলো আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনে বাধা হবে। যদি বাধা হয়ে যায় তবে এসব জিনিসই মানুষের জন্য আযাবে পরিণত হয় (আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করুন)।
২৫

لَقَدۡ نَصَرَکُمُ اللّٰہُ فِیۡ مَوَاطِنَ کَثِیۡرَۃٍ ۙ  وَّیَوۡمَ حُنَیۡنٍ ۙ  اِذۡ اَعۡجَبَتۡکُمۡ کَثۡرَتُکُمۡ فَلَمۡ تُغۡنِ عَنۡکُمۡ شَیۡئًا وَّضَاقَتۡ عَلَیۡکُمُ الۡاَرۡضُ بِمَا رَحُبَتۡ ثُمَّ وَلَّیۡتُمۡ مُّدۡبِرِیۡنَ ۚ ٢٥

লাকাদ নাসারাকুমুল্লা-হু ফী মাওয়া-তিনা কাছীরতিওঁ ওয়া ইয়াওমা হুনাইনিন ইযআ‘জাবাতকুম কাছরাতুকুম ফালাম তুগনি ‘আনকুম শাইআওঁ ওয়া দা-কাত ‘আলাইকুমুল আরদুবিমা-রাহুবাত ছুম্মা ওয়াল্লাইতুম মুদবিরীন।

বস্তুত আল্লাহ বহু ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করেছেন এবং (বিশেষ করে) হুনায়নের দিন, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত করেছিল। ২০ কিন্তু সে সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনও কাজে আসেনি এবং যমীন তার প্রশস্ততা সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) পলায়ণ করেছিলে।

তাফসীরঃ

২০. সংক্ষেপে হুনায়ন যুদ্ধের ঘটনা নিম্নরূপ, মক্কা মুকাররমায় জয়লাভ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ পেলেন মালিক ইবনে আউফের নেতৃত্বে বনু হাওয়াযিন তাঁর বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহ করছে। বনু হাওয়াযিন এক বিশাল জনগোষ্ঠীর নাম। এর অনেকগুলো শাখা-প্রশাখা ছিল। তায়েফের প্রসিদ্ধ ছাকীফ গোত্রও এ গোষ্ঠীরই শাখা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গুপ্তচর পাঠিয়ে সংবাদটির সত্যতা যাচাই করলেন। জানা গেল, সংবাদ সত্য এবং তারা জোরে-শোরে বিপুল উত্তেজনায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ইবনে হাজার রহমাতুল্লাহি আলাইহির বর্ণনা অনুযায়ী বনু হাওয়াযিনের লোকসংখ্যা ছিল চব্বিশ হাজার থেকে আটাশ হাজারের মাঝামাঝি। সুতরাং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দ হাজার সাহাবায়ে কিরামের এক বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হলেন। এ যুদ্ধ হয়েছিল হুনায়ন নামক স্থানে, যা মক্কা মুকাররমা থেকে আনুমানিক দশ মাইল দূরে অবস্থিত মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটা উপত্যকার নাম। এ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ছিল চৌদ্দ হাজার। এর আগে অন্য কোন যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যদের সংখ্যা এত বিপুল ছিল না। মুসলিমগণ সর্বদা নিজেদের সৈন্যসংখ্যা অল্প হওয়া সত্ত্বেও বেশি সৈন্যের মুকাবিলায় জয়লাভ করেছে। এবার যেহেতু তাদের সৈন্য সংখ্যাও বিপুল, তাই তাদের কারও কারও মুখ থেকে বের হয়ে গেল যে, আজ আমাদের সংখ্যা অনেক বেশি। সুতরাং আজ আমরা কারও কাছে পরাস্ত হতেই পারি না। মুসলিমগণ আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে নিজেদের সংখ্যার উপর নির্ভর করবে এটা আল্লাহ তাআলার পছন্দ হল না। সুতরাং তিনি এর ফল দেখালেন। মুসলিম বাহিনী এক সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করছিল। এ সময় বনু হাওয়াযিনের তীরন্দাজ বাহিনী অকস্মাৎ তাদের উপর বৃষ্টির মত তীর ছুঁড়তে শুরু করল। তা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, মুসলিম বাহিনী তার সামনে তিষ্ঠাতে পারছিল না। তাদের বহু সদস্য পালাতে শুরু করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশ্য কতিপয় নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীসহ অবিচলিত থাকলেন। তিনি হযরত আব্বাস (রাযি.)-কে হুকুম দিলেন, যেন পলায়নরতদেরকে উচ্চস্বরে ডাক দেন। হযরত আব্বাস (রাযি.)-এর আওয়াজ খুব বড় ছিল। তিনি ডাক দিলেন এবং মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে তা বিজলীর মত ছড়িয়ে পড়ল। যারা ময়দান ত্যাগ করেছিল তারা নতুন উদ্যমে ফিরে আসল। দেখতে না দেখতে দৃশ্যপট পাল্টে গেল এবং মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হল। বনু হাওয়াযিনের সত্তর জন নেতা নিহত হল। দলপতি মালিক ইবনে আউফ তার পরিবার-পরিজন ও অর্থ-সম্পদ ছেড়ে পালিয়ে গেল এবং তায়েফের দূর্গে গিয়ে আশ্রয় নিল। তাদের ছয় হাজার সদস্য বন্দী হল। বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু ও চার হাজার উকিয়া রূপা গনীমত হিসেবে মুসলিমদের হস্তগত হল।
২৬

ثُمَّ اَنۡزَلَ اللّٰہُ سَکِیۡنَتَہٗ عَلٰی رَسُوۡلِہٖ وَعَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَاَنۡزَلَ جُنُوۡدًا لَّمۡ تَرَوۡہَا وَعَذَّبَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ؕ وَذٰلِکَ جَزَآءُ الۡکٰفِرِیۡنَ ٢٦

ছু ম্মা আনঝালাল্লা-হু ছাকীনাতাহূ‘আলা-রাছূলিহী ওয়া ‘আলাল মু’মিনীনা ওয়া আনঝালা জুনূদাল লাম তারাওহা- ওয়া ‘আযযাবাল্লাযীনা কাফারূ ওয়া যা-লিকা জাঝাউল কা-ফিরীন।

অতঃপর আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তাঁর রাসূল ও মুমিনদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন ২১ এবং এমন এক বাহিনী অবতীর্ণ করলেন, যা তোমরা দেখতে পাওনি। আর যারা কুফর অবলম্বন করেছিল, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিলেন। আর এটাই কাফিরদের কর্মফল।

তাফসীরঃ

২১. এটা সেই সময়ের কথা, যখন রণক্ষেত্র ত্যাগকারী মুসলিমগণ হযরত আব্বাস (রাযি.)-এর ডাক শুনে ফিরে আসেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে এমন স্বস্তি সৃষ্টি করে দেন যে, ক্ষণিকের জন্য তাদের অন্তরে শত্রুর পক্ষ থেকে যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল তা উবে গেল।
২৭

ثُمَّ یَتُوۡبُ اللّٰہُ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ عَلٰی مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٢٧

ছু ম্মা ইয়াতূবুল্লা-হু মিম বা‘দি যা-লিকা ‘আলা-মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু গাফূরুর রাহীম।

অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাওবার সুযোগ দান করেন। ২২ আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

২২. এ আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে, হাওয়াযিনের যে সব লোক অমিত বিক্রমের সাথে লড়তে এসেছিল, তাদের অনেকেরই তাওবা করে ঈমান আনার তাওফীক লাভ হবে। হয়েছিলও তাই, বনু হাওয়াযিন ও বনু ছাকীফের বিপুল সংখ্যক লোক পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। স্বয়ং তাদের নেতা মালিক ইবনে আউফও ঈমান এনেছিলেন এবং তিনি ইসলামের একজন বীর সিপাহসালার রূপে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আজ তাকে হযরত মালিক ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু নামে স্মরণ করা হয়ে থাকে।
২৮

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡمُشۡرِکُوۡنَ نَجَسٌ فَلَا یَقۡرَبُوا الۡمَسۡجِدَ الۡحَرَامَ بَعۡدَ عَامِہِمۡ ہٰذَا ۚ وَاِنۡ خِفۡتُمۡ عَیۡلَۃً فَسَوۡفَ یُغۡنِیۡکُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖۤ اِنۡ شَآءَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ٢٨

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইন্নামাল মুশরিকূনা নাজাছুন ফালা-ইয়াকরাবুল মাছজিদাল হারা-মা বা‘দা ‘আ-মিহিম হা-যা- ওয়া ইন খিফতুম ‘আইলাতান ফাছাওফা ইউগনীকুমুল্লা-হু মিন ফাদলিহী ইন শাআ ইন্নাল্লা-হা ‘আলীমুন হাকীম।

হে মুমিনগণ! মুশরিকরা তো আপাদমস্তক অপবিত্র। ২৩ সুতরাং এ বছরের পর যেন তারা মসজিদুল হারামের নিকটেও না আসে ২৪ এবং (হে মুসলিমগণ!) তোমরা যদি দারিদ্র্যের ভয় কর, তবে (জেনে রেখ), আল্লাহ চাইলে নিজ অনুগ্রহে তোমাদেরকে (মুশরিকদের থেকে) বেনিয়ায করে দেবেন। ২৫ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

২৩. এর অর্থ এই নয় যে, তাদের শরীরটাই নাপাক; বরং এর দ্বারা তাদের বিশ্বাসগত অপবিত্রতা বোঝানো হয়েছে, যা তাদের সত্তায় বিস্তার লাভ করেছে।
২৯

قَاتِلُوا الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَلَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَلَا یُحَرِّمُوۡنَ مَا حَرَّمَ اللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗ وَلَا یَدِیۡنُوۡنَ دِیۡنَ الۡحَقِّ مِنَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ حَتّٰی یُعۡطُوا الۡجِزۡیَۃَ عَنۡ ‌یَّدٍ وَّہُمۡ صٰغِرُوۡنَ ٪ ٢٩

কা-তিলুল্লাযীনা লা-ইউ’মিনূনা বিল্লা-হি ওয়ালা-বিল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়ালাইউহাররিমূনা মা-হাররামাল্লা-হুওয়ারাছূলুহূওয়ালা-ইয়াদীনূনা দীনাল হাক্কিমিনাল্লাযীনা ঊতুল কিতা-বা হাত্তা-ইউ‘তুল জিঝইয়াতা ‘আইঁ ইয়াদিওঁ ওয়া হুম সা-গিরূন।

কিতাবীদের মধ্যে যারা ২৬ আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না এবং পরকালেও নয় ২৭ এবং আল্লাহ ও তার রাসূল যা-কিছু হারাম করেছেন তাকে হারাম মনে করে না এবং সত্য দ্বীনকে নিজের দ্বীন বলে স্বীকার করে না, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর, যাবৎ না তারা হেয় হয়ে নিজ হাতে জিযিয়া আদায় করে। ২৮

তাফসীরঃ

২৬. এর পূর্বের আটাশটি আয়াত ছিল আরবের মূর্তিপূজকদের সম্পর্কে। এখান থেকে তাবুক যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতসমূহ শুরু হচ্ছে (আদ-দুররুল মানছুর, ৪ খণ্ড, ১৫৩ পৃষ্ঠা, মুজাহিদের বরাতে)। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, এসব আয়াত নাযিল হয়েছিল উপরের আটাশ আয়াতের আগে। কেননা তাবুকের যুদ্ধ হয়েছিল বারাআঃ বা সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়ার আগে। এ যুদ্ধের ঘটনা ইনশাআল্লাহ সামনে কিছুটা বিস্তারিতভাবে আসবে। এ যুদ্ধ হয়েছিল রোমানদের বিরুদ্ধে, যাদের অধিকাংশই ছিল খ্রিস্টান। ইয়াহুদীদেরও একটা বড় অংশ রোম সাম্রাজ্যের অধীনে জীবন যাপন করছিল। কুরআন মাজীদে এ উভয় সম্প্রদায়কে ‘আহলে কিতাব’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। তাই তাদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দান প্রসঙ্গে তাদের কিছু নিন্দনীয় আকীদা-বিশ্বাস ও কাজ-কর্ম তুলে ধরা হয়েছে। প্রকাশ থাকে যে, যদিও এ সকল আয়াত নাযিল হয়েছিল পূর্বের আয়াতসমূহের আগে, কিন্তু কুরআন মাজীদের বিন্যাসে এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে পরে। সম্ভবত এর দ্বারা ইশারা করা হয়েছে যে, জাযিরাতুল আরবকে পৌত্তলিকতা হতে পবিত্র করার পর মুসলিমদেরকে বাইরের কিতাবীদের মুকাবিলা করতে হবে। তাছাড়া মূর্তিপূজকদের জন্য জাযিরাতুল আরবে নাগরিক হিসেবে বসবাস নিষিদ্ধ করা হলেও কিতাবীদের জন্য এই সুযোগ রাখা হয়েছিল যে, তারা জিযিয়া আদায় করে ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় তাদের জন্য এ সুযোগ বলবৎ রাখা হয়েছিল, কিন্তু ওফাতের পূর্বে তিনি অসিয়ত করে যান যে, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে জাযিরাতুল আরব থেকে বের করে দিয়ো (সহীহ বুখারী, অধ্যায় : জিহাদ, হাদীস নং ৩০৫৩)। পরবর্তীকালে হযরত উমর (রাযি.) এ অসিয়ত বাস্তবায়ন করেন। তবে এ হুকুম জাযিরাতুল আরবের জন্যই নির্দিষ্ট। জাযিরাতুল আরবের বাইরে যেখানেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক, সেখানে এখনও কিতাবীগণসহ যে-কোনও অমুসলিম সম্প্রদায় ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বাস করতে পারবে এবং সেখানে তারা তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। শর্ত একটাই রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত থাকতে হবে। এখানে যদিও কেবল ‘আহলে কিতাব’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু যে কারণ বলা হয়েছে, অর্থাৎ ‘সত্য দ্বীনের অনুসরণ না করা’, এটা যেহেতু যে-কোনও প্রকার অমুসলিমের মধ্যেই পাওয়া যায়, তাই জাযিরাতুল আরবের বাইরে যে কোন অমুসলিমের জন্যই এ হুকুম প্রযোজ্য। এ সম্পর্কে উম্মতের ইজমা রয়েছে।
৩০

وَقَالَتِ الۡیَہُوۡدُ عُزَیۡرُۨ ابۡنُ اللّٰہِ وَقَالَتِ النَّصٰرَی الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ قَوۡلُہُمۡ بِاَفۡوَاہِہِمۡ ۚ یُضَاہِـُٔوۡنَ قَوۡلَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ قَبۡلُ ؕ قٰتَلَہُمُ اللّٰہُ ۚ۫ اَنّٰی یُؤۡفَکُوۡنَ ٣۰

ওয়া কা-লাতিল ইয়াহূদু‘ঊঝাইরুনিবনুল্লা-হি ওয়াকা-লাতিন নাসা-রাল মাছীহুবনুল্লা-হি যা-লিকা কাওলুহুম বিআফওয়া-হিহিম ইউদা-হিঊনা কাওলাল্লাযীনা কাফারূ মিন কাবলু কা-তালাহুমুল্লা-হু; আন্না-ইউ’ফাকূন।

ইয়াহুদীরা বলে, উযায়র আল্লাহর পুত্র ২৯ আর নাসারাগণ বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এসবই তাদের মুখের তৈরি কথা। এরা তাদের পূর্বে যারা কাফের হয়ে গিয়েছিল, ৩০ তাদেরই মত কথা বলে। তাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করুন! তারা বিভ্রান্ত হয়ে কোন দিকে উল্টে যাচ্ছে?

তাফসীরঃ

২৯. হযরত উযায়ের আলাইহিস সালাম ছিলেন একজন মহান নবী। বাইবেলে তাকে ‘আযরা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাইবেলের একটি পূর্ণ অধ্যায় তাঁর নামের সাথেই যুক্ত। ‘বুখত নাসসার’-এর আক্রমণে তাওরাতের কপি বিলুপ্ত হয়ে গেলে তিনি নিজ স্মৃতিপট থেকে তা পুনরায় লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই একদল ইয়াহুদী তাকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেছিল। প্রকাশ থাকে যে, হযরত উযায়ের আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলার পুত্র সাব্যস্ত করার আকীদা সমগ্র ইয়াহুদী জাতির নয়; বরং এটা তাদের একটি উপদলের বিশ্বাস, যাদের একটা অংশ আরবেও বাস করত।
৩১

اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَہُمۡ وَرُہۡبَانَہُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَالۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَمَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ سُبۡحٰنَہٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ ٣١

ইত্তাখাযূআহবা-রাহুম ও রুহবা-নাহুম আরবা-বাম মিন দূ নিল্লা-হি ওয়াল মাছীহাবনা মারইয়ামা ওয়ামা উমিরূ ইল্লা-লিয়া‘বুদূ ইলা-হাওঁ ওয়াহিদাল লাইলা-হা ইল্লাহুওয়া; ছুবহা-নাহূ‘আম্মা-ইউশরিকূন।

তারা আল্লাহর পরিবর্তে নিজেদের আহবার (অর্থাৎ ইয়াহুদী ধর্মগুরু) এবং রাহিব (খ্রিস্টান বৈরাগী)কে খোদা বানিয়ে নিয়েছে ৩১ এবং মাসীহ ইবনে মারয়ামকেও। অথচ তাদেরকে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করার হুকুম দেওয়া হয়নি। তিনি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তাদের অংশীবাদীসুলভ কথাবার্তা হতে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র।

তাফসীরঃ

৩১. তাদেরকে খোদা বানানোর যে ব্যাখ্যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন, তার সারমর্ম এই যে, তারা তাদের ধর্মগুরুদেরকে বিপুল ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিল। ফলে তারা তাদের ইচ্ছা মত কোনও জিনিসকে হালাল এবং কোনও জিনিসকে হারাম ঘোষণা করতে পারত। প্রকাশ থাকে যে, যারা সরাসরি আসমানী কিতাবের জ্ঞান রাখে না, শরীয়তের বিধান জানার জন্য সেই আম সাধারণকে আলেম-উলামার শরণাপন্ন হতেই হয় এবং আল্লাহ তাআলার বিধানের ব্যাখ্যাতা হিসেবে তাদের কথা মানতেও হয়। খোদ কুরআন মাজীদই এ নির্দেশ দান করেছে (দেখুন, সূরা নাহল ১৬ : ৪৩ ও সূরা আম্বিয়া, ২১ : ৭)। এতটুকুর মধ্যে তো আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ এতটুকুতেই ক্ষান্ত ছিল না। তারা আরও অগ্রসর হয়ে তাদের ধর্মগুরুদেরকে বিধান তৈরি করারও এখতিয়ার প্রদান করেছিল। ফলে তারা কেবল আসমানী কিতাবের ব্যাখ্যা হিসেবেই নয়; বরং নিজেদের ইচ্ছা মত কোনও জিনিসকে হালাল এবং কোনও জিনিসকে হারাম সাব্যস্ত করতে পারত, তাতে তাদের সে বিধান আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থীই হোক না কেন!
৩২

یُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ یُّطۡفِـُٔوۡا نُوۡرَ اللّٰہِ بِاَفۡوَاہِہِمۡ وَیَاۡبَی اللّٰہُ اِلَّاۤ اَنۡ یُّتِمَّ نُوۡرَہٗ وَلَوۡ کَرِہَ الۡکٰفِرُوۡنَ ٣٢

ইউরীদূনা আইঁ ইউতফিঊ নূরাল্লা-হি বিআফওয়া-হিহিম ওয়া ইয়া’বাল্লা-হুইল্লাআইঁ ইউতিম্মা নূরাহূওয়া লাও কারিহাল কা-ফিরূন।

তারা আল্লাহর নূরকে তাদের মুখের (ফুঁ) দ্বারা নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তার নূরের পূর্ণ উদ্ভাসন ছাড়া আর কিছুতেই সম্মত নন, তাতে কাফেরগণ এটাকে যতই অপ্রীতিকর মনে করুক।
৩৩

ہُوَ الَّذِیۡۤ اَرۡسَلَ رَسُوۡلَہٗ بِالۡہُدٰی وَدِیۡنِ الۡحَقِّ لِیُظۡہِرَہٗ عَلَی الدِّیۡنِ کُلِّہٖ ۙ وَلَوۡ کَرِہَ الۡمُشۡرِکُوۡنَ ٣٣

হুওয়াল্লাযীআরছালা রাছূলাহূবিল হুদা-ওয়া দীনিল হাক্কিলিইউজহিরাহূ‘আলাদদীনি কুল্লিহী ওয়া লাও কারিহাল মুশরিকূন।

আল্লাহই তো হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ নিজ রাসূলকে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি অন্য সব দ্বীনের উপর তাকে জয়যুক্ত করেন, তাতে মুশরিকগণ এটাকে যতই অপ্রীতিকর মনে করুক।
৩৪

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنَ الۡاَحۡبَارِ وَالرُّہۡبَانِ لَیَاۡکُلُوۡنَ اَمۡوَالَ النَّاسِ بِالۡبَاطِلِ وَیَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  وَالَّذِیۡنَ یَکۡنِزُوۡنَ الذَّہَبَ وَالۡفِضَّۃَ وَلَا یُنۡفِقُوۡنَہَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ  فَبَشِّرۡہُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ ۙ ٣٤

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইন্না কাছীরাম মিনাল আহবা-রি ওয়াররুহবা-নি লাইয়া’কুলূনা আমওয়া-লান্না-ছি বিল বা-তিলি ওয়া ইয়াসুদ্দূনা ‘আন ছাবীলিল্লা-হি ওয়াল্লাযীনা ইয়াকনিঝূনাযযাহাবা ওয়াল ফিদ্দাতা ওয়ালা-ইউনফিকূনাহা-ফী ছাবীলিল্লাহি ফাবাশশিরহুম বি‘আযা-বিন আলীম।

হে মুমিনগণ! (ইয়াহুদী) আহবার ও (খ্রিস্টান) রাহিবদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে, যারা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করে এবং (অন্যদেরকে) আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করে। ৩২ যারা সোনা-রুপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাময় শাস্তির ‘সুসংবাদ’ দাও। ৩৩

তাফসীরঃ

৩২. মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার বিভিন্ন পন্থা হতে পারে, কিন্তু ওই সকল ধর্মগুরুরা বিশেষভাবে যা করত বলে বর্ণিত আছে তা এই যে, তারা মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে শরীয়তকে ভেঙ্গে-চুরে তাদের মর্জিমত বিধান বর্ণনা করত আর এভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যে সরল-সঠিক পথ নির্ধারণ করেছেন তা থেকে মানুষকে দূরে রাখত।
৩৫

یَّوۡمَ یُحۡمٰی عَلَیۡہَا فِیۡ نَارِ جَہَنَّمَ فَتُکۡوٰی بِہَا جِبَاہُہُمۡ وَجُنُوۡبُہُمۡ وَظُہُوۡرُہُمۡ ؕ ہٰذَا مَا کَنَزۡتُمۡ لِاَنۡفُسِکُمۡ فَذُوۡقُوۡا مَا کُنۡتُمۡ تَکۡنِزُوۡنَ ٣٥

ইয়াওমা ইউহমা-‘আলাইহা-ফী না-রি জাহান্নামা ফাতুকওয়া-বিহা-জিবা-হুহুম ওয়া জুনূবুহুম ওয়া জুহূরুহুম হা-যা-মা-কানাঝতুম লিআনফুছিকুম ফাযূকূমা-কুনতুম তাকনিঝূন।

যে দিন সে ধন-সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দ্বারা তাদের কপাল, তাদের পাঁজর ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে (এবং বলা হবে) এই হচ্ছে সেই সম্পদ, যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যে সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে, তার মজা ভোগ কর।
৩৬

اِنَّ عِدَّۃَ الشُّہُوۡرِ عِنۡدَ اللّٰہِ اثۡنَا عَشَرَ شَہۡرًا فِیۡ کِتٰبِ اللّٰہِ یَوۡمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ مِنۡہَاۤ اَرۡبَعَۃٌ حُرُمٌ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ۬ۙ فَلَا تَظۡلِمُوۡا فِیۡہِنَّ اَنۡفُسَکُمۡ وَقَاتِلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ کَآفَّۃً کَمَا یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ کَآفَّۃً ؕ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ مَعَ الۡمُتَّقِیۡنَ ٣٦

ইন্না ‘ইদ্দাতাশশুহূরি ‘ইনদাল্লা-হিছনা-‘আশারা শাহরান ফী কিতা-বিল্লা-হি ইয়াওমা খালাকাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা মিনহা-আরবা‘আতুন হুরুমুন যা-লিকাদদীনুল কাইয়িমু ফালা-তাজলিমূফীহিন্না আনফুছাকুম ওয়া কা-তিলুল মুশরিকীনা কাফফাতান কামা-ইউকা-তিলূনাকুম কাফফাতাওঁ ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা মা‘আল মুত্তাকীন।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে আল্লাহর কিতাবে (অর্থাৎ লাওহে মাহ্ফূজে) মাসের সংখ্যা বারটি, ৩৪ সেই দিন থেকে, যে দিন আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ। এটাই সহজ-সরল দ্বীন (-এর দাবী)। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহের ব্যাপারে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না ৩৫ এবং তোমরা সকলে মিলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর, যেমন তারা সকলে মিলে তোমাদের সাথে লড়াই করে। একীন রেখো নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।

তাফসীরঃ

৩৪. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মাসসমূহকে যেভাবে বিন্যস্ত করেছেন তাতে রদবদল ও আগুপিছু করার পরিণাম এই হল যে, যে মাসে যুদ্ধ হারাম ছিল, সে মাসে তা হালাল করে নেওয়া হল, যা একটি মহাপাপ। যে ব্যক্তি পাপ কর্ম করে সে নিজের উপরই জুলুম করে। কেননা তার অশুভ ফল তার নিজেকে ভুগতে হবে। সেই সঙ্গে এ বাক্যে ইশারা করা হয়েছে যে, এই মর্যাদাপূর্ণ মাসসমূহে আল্লাহর ইবাদত তুলনামূলক বেশি করা উচিত এবং অন্যান্য দিন অপেক্ষা এ সময় গুনাহ থেকেও বেশি দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়।
৩৭

اِنَّمَا النَّسِیۡٓءُ زِیَادَۃٌ فِی الۡکُفۡرِ یُضَلُّ بِہِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا یُحِلُّوۡنَہٗ عَامًا وَّیُحَرِّمُوۡنَہٗ عَامًا لِّیُوَاطِـُٔوۡا عِدَّۃَ مَا حَرَّمَ اللّٰہُ فَیُحِلُّوۡا مَا حَرَّمَ اللّٰہُ ؕ  زُیِّنَ لَہُمۡ سُوۡٓءُ اَعۡمَالِہِمۡ ؕ  وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ ٪ ٣٧

ইন্নামান নাছীউঝিয়া-দাতুন ফিল কুফরি ইউদাল্লুবিহিল্লাযীনা কাফারূ ইউহিললূনাহূ‘আমাওঁ ওয়া ইউহাররিমূনাহূ‘আ-মাল লিইউওয়া-তিঊ ‘ইদ্দাতা মা-হাররামাল্লা-হু ফাইউহিললূ মা-হাররামাল্লা-হু ঝুইয়িনা লাহুম ছূউ আ‘মা-লিহিম ওয়াল্লা-হু লা-ইয়াহদিল কাওমাল কা-ফিরীন।

এই নাসী (অর্থাৎ মাসকে পিছিয়ে নেওয়া) তো কুফরকেই বৃদ্ধি করা, যা দ্বারা কাফেরদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়। তারা এ কাজকে এক বছর হালাল করে নেয় ও এক বছর হারাম সাব্যস্ত করে, যাতে আল্লাহ যে মাসকে নিষিদ্ধ করেছেন তার গণনা পূরণ করতে পারে এবং (এভাবে) আল্লাহ যা হারাম সাব্যস্ত করেছিলেন, তাকে হালাল করতে পারে। ৩৬ তাদের কুকর্মকে তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দেওয়া হয়েছে। আর আল্লাহ এরূপ কাফেরদেরকে হিদায়াতপ্রাপ্ত করেন না।

তাফসীরঃ

৩৬. অর্থাৎ মাসসমূহকে আগে-পিছে করে তারা চার মাসের গণনা তো পূরণ করে নিল, কিন্তু বিন্যাস বদলের কুফল দাঁড়াল এই যে, আল্লাহ তাআলা যে মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহকে বাস্তবিকই হারাম করেছিলেন, সে মাসে তারা তা হালাল করে নিল।
৩৮

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَا لَکُمۡ اِذَا قِیۡلَ لَکُمُ انۡفِرُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اثَّاقَلۡتُمۡ اِلَی الۡاَرۡضِ ؕ اَرَضِیۡتُمۡ بِالۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا مِنَ الۡاٰخِرَۃِ ۚ فَمَا مَتَاعُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا فِی الۡاٰخِرَۃِ اِلَّا قَلِیۡلٌ ٣٨

ইয়াআইয়ূহাল্লাযীনা আ-মানূমা-লাকুম ইযা-কীলা লাকুমুন ফিরূফী ছাবীলিল্লা-হিছছাকালতুম ইলাল আরদি আরাদীতুম বিলহাইয়া-তিদদুনইয়া-মিনাল আ-খিরাতি ফামা-মাতা-‘উল হায়া-তিদদুনইয়া-ফিল আ-খিরাতি ইল্লা-কালীল।

হে মুমিনগণ! তোমাদের কি হল যে, যখন তোমাদেরকে বলা হয় আল্লাহর পথে অভিযানে বের হও, তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে মাটির সাথে মিশে যাও? ৩৭ তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে গেছ? (তাই যদি হয়) তবে (স্মরণ রেখ), আখিরাতের বিপরীতে পার্থিব জীবনের আনন্দ অতি সামান্য।

তাফসীরঃ

৩৭. এখান থেকে তাবুক যুদ্ধের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা সূরার প্রায় শেষ পর্যন্ত চলতে থাকবে। সংক্ষেপে এ যুদ্ধের ঘটনা এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় ও হুনায়নের যুদ্ধ শেষে যখন মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসলেন, তার কিছুদিন পর শাম থেকে আগত কতিপয় ব্যবসায়ী মুসলিমদেরকে জানাল, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদীনা মুনাওয়ারায় এক জোরালো হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতদুদ্দেশ্যে সে শাম ও আরবের সীমান্তে এক বিশাল বাহিনীও মোতায়েন করেছে। এমনকি সৈন্যদেরকে এক বছরের অগ্রিম বেতনও আদায় করে দিয়েছে। যদিও সাহাবায়ে কেরাম এ যাবৎকাল বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, কিন্তু তা সবই জাযিরাতুল আরবের ভিতরে। কোনও বহিঃশক্তির সাথে এ পর্যন্ত মুকাবিলা হয়নি। এবার তাঁরা সেই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন। তাও দুনিয়ার এক বৃহৎ শক্তির সাথে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফায়সালা করলেন যে, হিরাক্লিয়াসের আক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে আমরা নিজেরাই অগ্রসর হয়ে তাদের উপর হামলা চালাব। সুতরাং তিনি মদীনা মুনাওয়ারার সমস্ত মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার হুকুম দিলেন। মুসলিমদের পক্ষে এটা ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। কেননা এটা ছিল দীর্ঘ দশ বছরের উপর্যুপরি যুদ্ধ, অবশেষে পবিত্র মক্কায় জয়লাভের পর প্রথমবারের মত এক সুযোগ, যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কিছুটা সময় পাওয়া গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার সময়টা ছিল এমন, যখন মদীনা মুনাওয়ারার খেজুর বাগানগুলোতে খেজুর পাকছিল। এই খেজুরের উপরই মদীনাবাসীদের সারা বছরের জীবিকা নির্ভরশীল ছিল। সন্দেহ নেই এমন অবস্থায় বাগান ছেড়ে যাওয়াটা অত সহজ ব্যাপার ছিল না। তৃতীয়ত এটা ছিল আরব অঞ্চলে তীব্র গরমের সময়। মনে হত আকাশ থেকে আগুন ঝরছে ও ভূমি থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। চতুর্থত তাবুকের সফর ছিল অনেক দীর্ঘ। প্রায় আটশ’ মাইলের সবটা পথই ছিল দুর্গম মরুভূমির উপর দিয়ে। আবার বাহন পশুর সংখ্যাও ছিল খুব কম। তদুপরি সফরের উদ্দেশ্য ছিল রোমানদের সাথে যুদ্ধ করা, যারা ছিল তখনকার বিশ্বের সর্ববৃহৎ শক্তি এবং তাদের যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কেও মুসলিমদের কোনও জানাশোনা ছিল না। মোদ্দাকথা সব দিক থেকেই এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং জান-মাল ও আবেগ-অনুভূতি বিসর্জন দেওয়ার জিহাদ। যা হোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ত্রিশ হাজার সাহাবায়ে কিরামের এক বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। আল্লাহ তাআলা হিরাক্লিয়াস ও তার বাহিনীর উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই দুঃসাহসিক অগ্রাভিযানের এমন প্রভাব ফেললেন যে, তারা কালবিলম্ব না করে সেখান থেকে ওয়াপস চলে গেল। ফলে যুদ্ধ করার অবকাশ হল না। উপরে বর্ণিত সমস্যাদি সত্ত্বেও সাহাবায়ে কিরামের অধিকাংশই শাহাদাতের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে অত্যন্ত খুশী মনে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য এমন কিছু সাহাবীও ছিলেন, যাদের কাছে এ অভিযান অত্যন্ত কঠিন মনে হয়েছিল, ফলে শুরুর দিকে তারা কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও সৈন্যদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়েছিলেন। তারপরও কয়েকজন সাহাবী এমন রয়ে গিয়েছিলেন, যারা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হননি। ফলে তারা অভিযানে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকেন। আর মুনাফিকদের দল তো ছিলই, যারা প্রকাশ্যে নিজেদেরকে মুমিন বলে দাবী করলেও আন্তরিকভাবে ঈমানদার ছিল না। এমন সমস্যাসংকুল অভিযানে তাদের পক্ষে মুসলিমদের সহযাত্রী হওয়া সম্ভবই ছিল না। তাই তারা বিভিন্ন রকমের ছল ও বাহানা দেখিয়ে মদীনায় থেকে গিয়েছিল। এ সূরার সামনের আয়াতসমূহে এই সকল শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। তাতে তাদের কর্মপন্থা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ৩৮নং আয়াতে যে সকল লোকের নিন্দা করা হয়েছে তারা কারা, এ সম্পর্কে দু’টো সম্ভাবনা আছে। (ক) তারা হয়ত মুনাফিক শ্রেণী। আর এ অবস্থায় ‘হে মুমিনগণ’ বলে যে সম্বোধন করা হয়েছে, এটা তাদের বাহ্যিক দাবীর ভিত্তিতে করা হয়েছে। (খ) এমনও হতে পারে যে, যে সকল সাহাবীর অন্তরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল, তাদেরকে বোঝানো হয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, ৪২ নং আয়াত থেকে মুনাফিকদের সম্পর্কেই আলোচনা হয়েছে।
৩৯

اِلَّا تَنۡفِرُوۡا یُعَذِّبۡکُمۡ عَذَابًا اَلِیۡمًا ۬ۙ وَّیَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَیۡرَکُمۡ وَلَا تَضُرُّوۡہُ شَیۡئًا ؕ وَاللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ٣٩

ইল্লা-তানফিরু ইউ‘আযযিবকুম ‘আযা-বান আলীমাওঁ ওয়া ইয়াছতাবদিল কাওমান গাইরাকুম ওয়ালা-তাদুররূহু শাইআওঁ ওয়াল্লা-হু ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদির।

তোমরা যদি অভিযানে বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে যন্ত্রণাময় শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের স্থানে অন্য কোনও জাতিকে আনয়ন করবেন এবং তোমরা তাঁর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতা রাখেন।
৪০

اِلَّا تَنۡصُرُوۡہُ فَقَدۡ نَصَرَہُ اللّٰہُ اِذۡ اَخۡرَجَہُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ثَانِیَ اثۡنَیۡنِ اِذۡ ہُمَا فِی الۡغَارِ اِذۡ یَقُوۡلُ لِصَاحِبِہٖ لَا تَحۡزَنۡ اِنَّ اللّٰہَ مَعَنَا ۚ فَاَنۡزَلَ اللّٰہُ سَکِیۡنَتَہٗ عَلَیۡہِ وَاَیَّدَہٗ بِجُنُوۡدٍ لَّمۡ تَرَوۡہَا وَجَعَلَ کَلِمَۃَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوا السُّفۡلٰی ؕ وَکَلِمَۃُ اللّٰہِ ہِیَ الۡعُلۡیَا ؕ وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٤۰

ইল্লা-তানসুরূহু ফাকাদ নাসারাহুল্লা-হু ইযআখরাজাহুল্লাযীনা কাফারূ ছা-নিয়াছনাইনি ইযহুমা-ফিল গা-রি ইযইয়াকূলুলিসা-হিবিহী লা-তাহঝান ইন্নাল্লা-হা মা‘আনা- ফাআনাঝাল্লা-হু ছাকীনাতাহূ‘আলাইহি ওয়া আইইয়াদাহূবিজুনূদিল লাম তারাওহা-ওয়া জা‘আলা কালিমাতাল্লাযীনা কাফারুছছুফলা- ওয়া কালিমাতুল্লা-হি হিয়াল ‘ঊলইয়া- ওয়াল্লা-হু ‘আঝীঝুন হাকীম।

তোমরা যদি তার (অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) সাহায্য না কর, তবে (তাতে তার কোনও ক্ষতি নেই। কেননা) আল্লাহ তো সেই সময়ও তার সাহায্য করেছিলেন, যখন কাফেরগণ তাকে (মক্কা থেকে) বের করে দিয়েছিল এবং তখন সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল, তখন সে তার সঙ্গীকে বলেছিল, চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। ৩৮ সুতরাং আল্লাহ তার প্রতি নিজের পক্ষ থেকে প্রশান্তি বর্ষণ করলেন এবং এমন বাহিনী দ্বারা তার সাহায্য করলেন, যা তোমরা দেখনি এবং কাফেরদের কথাকে হেয় করে দিলেন। বস্তুত আল্লাহর কথাই সমুচ্চ। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৩৮. এর দ্বারা হিজরতের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একমাত্র সফরসঙ্গী হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.)-কে সঙ্গে নিয়ে মক্কা মুকাররমা থেকে বের হয়ে পড়েছিলেন এবং তিন দিন পর্যন্ত ছাওর পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে থেকেছিলেন। মক্কা মুকাররমার কাফেরদের সর্দারগণ তাঁর সন্ধানে চারদিকে লোকজন নামিয়ে দিয়েছিল। এমনকি ঘোষণা করে দিয়েছিল, যে ব্যক্তি তাকে গ্রেফতার করতে পারবে তাকে একশ’ উট পুরস্কার দেওয়া হবে। একবার অনুসন্ধানকারী দল ছাওরের গুহা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। হযরত সিদ্দীকে আকবার (রাযি.) তাদের পা দেখতে পাচ্ছিলেন। ফলে তাঁর চেহারায় উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। এ সময়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন, চিন্তা করো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা গুহার মুখে মাকড়সা লাগিয়ে দিলেন। তারা সেখানে জাল বুনে ফেলল। তারা সে জাল দেখে ওয়াপস চলে গেল। এ ঘটনার বরাত দিয়েই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কারও কোনও সাহায্য করার প্রয়োজন নেই। তার জন্য এক আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট। তবে যারা তাঁর সাহায্য করার সুযোগ পায় তারা বড় ভাগ্যবান।
৪১

اِنۡفِرُوۡا خِفَافًا وَّثِقَالًا وَّجَاہِدُوۡا بِاَمۡوَالِکُمۡ وَاَنۡفُسِکُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکُمۡ خَیۡرٌ لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ٤١

ইনফিরূখিফা-ফাওঁ ওয়া ছিকা-লাওঁ ওয়া জা-হিদূবিআমওয়া-লিকুম ওয়া আনফুছিকুম ফী ছাবীলিল্লা-হি যা-লিকুম খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম তা‘লামূন।

(জিহাদের জন্য) বের হয়ে পড়, তোমরা হালকা অবস্থায় থাক বা ভারী অবস্থায় এবং নিজেদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ কর। তোমরা যদি বুঝ-সমঝ রাখ, তবে এটাই তোমাদের পক্ষে উত্তম।
৪২

لَوۡ کَانَ عَرَضًا قَرِیۡبًا وَّسَفَرًا قَاصِدًا لَّاتَّبَعُوۡکَ وَلٰکِنۡۢ بَعُدَتۡ عَلَیۡہِمُ الشُّقَّۃُ ؕ  وَسَیَحۡلِفُوۡنَ بِاللّٰہِ لَوِ اسۡتَطَعۡنَا لَخَرَجۡنَا مَعَکُمۡ ۚ  یُہۡلِکُوۡنَ اَنۡفُسَہُمۡ ۚ  وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ اِنَّہُمۡ لَکٰذِبُوۡنَ ٪ ٤٢

লাও কা-না ‘আরাদান কারীবাওঁ ওয়া ছাফারান কা-সিদাল লাত্তাবা‘ঊকা ওয়ালা-কিম বা‘উদাত ‘আলাইহিমূশশুক্কাতু ওয়া ছাইয়াহলিফূনা বিল্লা-হি লাবিছতাতা‘নালাখারাজনা-মা‘আকুম ইউহলিকূনা আনফুছাহুম ওয়াল্লা-হু ইয়া‘লামুইন্নাহুম লাকাযিবূন।

যদি পার্থিব সামগ্রী আশু লভ্য এবং সফরও মাঝামাঝি রকমের হত, তবে তারা (অর্থাৎ মুনাফিকগণ) অবশ্যই তোমার অনুগামী হত। কিন্তু তাদের পক্ষে এই কঠিন পথ অনেক দূরবর্তী মনে হল। এখন তারা আল্লাহর নামে কসম করে বলবে, আমাদের সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম। তারা নিজেরা নিজেদেরকেই ধ্বংস করছে এবং আল্লাহ জানেন, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।
৪৩

عَفَا اللّٰہُ عَنۡکَ ۚ لِمَ اَذِنۡتَ لَہُمۡ حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَکَ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا وَتَعۡلَمَ الۡکٰذِبِیۡنَ ٤٣

‘আফাল্লা-হু ‘আনকা লিমা আযিনতা লাহুম হাত্তা-ইয়াতাবাইইয়ানা লাকাল্লাযীনা সাদাকূ ওয়া তা‘লামাল কা-যিবীন।

(হে নবী!) আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ৩৯ কারা সত্যবাদী তোমার কাছে তা স্পষ্ট হওয়া এবং কারা মিথ্যাবাদী তা না জানা পর্যন্ত তুমি তাদেরকে (জিহাদে শরীক না হওয়ার) অনুমতি কেন দিলে?

তাফসীরঃ

৩৯. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদেরকে জিহাদে অংশগ্রহণ না করার অনুমতি কেন দিলেন এজন্য তাকে তিরস্কার করা উদ্দেশ্য, কিন্তু মহব্বতপূর্ণ ভঙ্গি লক্ষ্য করুন। তিরস্কার করার আগেই ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। কেননা প্রথমেই যদি তিরস্কার করা হত এবং ক্ষমার ঘোষণা পরে দেওয়া হত, তবে এই মধ্যবর্তী সময়টা না জানি তাঁর কী অবস্থার ভেতর দিয়ে কাটত। যা হোক আয়াতের মর্ম এই যে, ওই মুনাফিকদের তো যুদ্ধে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিল না, যেমন সামনে ৪৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলাও চাচ্ছিলেন না, তারা সৈন্যদের সাথে মিশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ পাক। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তাদেরকে যুদ্ধে শরীক না হওয়ার অনুমতি না দিতেন, তবে তারা যে নাফরমান এ বিষয়টা সুস্পষ্ট হয়ে যেত। পক্ষান্তরে বর্তমান অবস্থায় তারা যেহেতু অনুমতি নিয়ে ফেলেছে, তাই একদিকে মুসলিমদেরকে বলে বেড়াবে আমরা তো অনুমতি নিয়েই মদীনা মুনাওয়ারায় থেকেছি, অপর দিকে নিজেদের লোকদের কাছে এই বলে কৃতিত্ব জাহির করবে যে, দেখলে তো, আমরা মুসলিমদেরকে কেমন ধোঁকা দিয়েছি।
৪৪

لَا یَسۡتَاۡذِنُکَ الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ اَنۡ یُّجَاہِدُوۡا بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالۡمُتَّقِیۡنَ ٤٤

লা-ইয়াছতা’যিনুকাল্লাযীনা ইউ’মিনূনা বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি আই ইউজা-হিদূ বিআমওয়া-লিহিম ওয়া আনফুছিহিম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুম বিলমুত্তাকীন।

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে, তারা নিজেদের জান-মাল দ্বারা জিহাদ না করার অনুমতি তোমার কাছে চায় না। আল্লাহ মুত্তাকীদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন।
৪৫

اِنَّمَا یَسۡتَاۡذِنُکَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَارۡتَابَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ فَہُمۡ فِیۡ رَیۡبِہِمۡ یَتَرَدَّدُوۡنَ ٤٥

ইন্নামা-ইয়াছতা’যিনুকাল্লাযীনা লা-ইউ’মিনূনা বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়ারতাবাত কুলূবুহুম ফাহুম ফী রাইবিহিম ইয়াতারাদ্দাদূন।

তোমার কাছে (জিহাদ না করার) অনুমতি চায় তো তারা, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহে নিপতিত এবং তারা নিজেদের সন্দেহের ভেতর দোদুল্যমান।
৪৬

وَلَوۡ اَرَادُوا الۡخُرُوۡجَ لَاَعَدُّوۡا لَہٗ عُدَّۃً وَّلٰکِنۡ کَرِہَ اللّٰہُ انۡۢبِعَاثَہُمۡ فَثَبَّطَہُمۡ وَقِیۡلَ اقۡعُدُوۡا مَعَ الۡقٰعِدِیۡنَ ٤٦

ওয়া লাও আরা-দুলখুরূজা লাআ‘আদ্দূলাহূ‘উদ্দাতাওঁ ওয়ালা-কিন কারিহাল্লা-হুম বি‘আছাহুম ফাছাব্বাতাহুম ওয়া কীলাক‘উদূমা‘আল কা-‘ইদীন।

যদি বের হওয়ার ইচ্ছাই তাদের থাকত, তবে তার জন্য কিছু না কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করত। ৪০ কিন্তু তাদের অভিযাত্রা আল্লাহর পছন্দ ছিল না। তাই তাদেরকে আলস্যে পড়ে থাকতে দিলেন এবং বলে দেওয়া হল, যারা (পঙ্গুত্বের কারণে) বসে আছে তাদের সাথে তোমরাও বসে থাক।

তাফসীরঃ

৪০. এ আয়াত জানাচ্ছে যে, মানুষের ওজর-অজুহাত কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন নিজের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনের পুরোপুরি চেষ্টা ও সাধ্যমত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়, তারপর তার ইচ্ছা-বহির্ভূত এমন কোনও কারণ সামনে এসে পড়ে, যদ্দরুণ দায়িত্ব পালন সম্ভব হয় না। পক্ষান্তরে কোনও লোক যদি চেষ্টাই না করে এবং সাধ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ থেকে বিরত থাকে আর এ অবস্থায় বলে, আমি অক্ষম, আমার ওজর আছে, তবে তার এ কথা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। উদাহরণত এক ব্যক্তি ফজরের সময় জাগ্রত হওয়ার সব রকম চেষ্টা করল, অ্যালার্ম লাগাল, কিংবা কাউকে জাগানোর জন্য বলে রাখল, কিন্তু তারপরও সে জাগতে পারল না, তবে সে নিশ্চয়ই মাজুর। কিন্তু যে ব্যক্তি কোনও প্রস্তুতিই গ্রহণ করল না, তারপর জাগতে না পারার ওজর দেখাল, তার এ ওজর গ্রহণযোগ্য নয়।
৪৭

لَوۡ خَرَجُوۡا فِیۡکُمۡ مَّا زَادُوۡکُمۡ اِلَّا خَبَالًا وَّلَا۠اَوۡضَعُوۡا خِلٰلَکُمۡ یَبۡغُوۡنَکُمُ الۡفِتۡنَۃَ ۚ وَفِیۡکُمۡ سَمّٰعُوۡنَ لَہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ ٤٧

লাও খারাজূফীকুম মা-ঝা-দুকুম ইল্লা-খাবা-লাওঁ ওয়ালা আও দা‘ঊ খিলা-লাকুম ইয়াবগূনাকুমুল ফিতনাতা ওয়া ফীকুম ছাম্মা-‘ঊনা লাহুম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুম বিজ্জা-লিমীন।

তারা তোমাদের সাথে বের হলে তোমাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছু বৃদ্ধি করত না এবং তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির চেষ্টায় তোমাদের সারিসমূহের মধ্যে ছোটাছুটি করত। আর তোমাদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে, যারা তাদের (মতলবের) কথা বেশ শুনে থাকে। ৪১ আল্লাহ জালেমদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন।

তাফসীরঃ

৪১. এর দুই অর্থ হতে পারে। (এক) কতক সরলপ্রাণ মুসলিম ওই সব লোকের স্বরূপ জানে না। তাই তাদের কথা শুনে মনে করে তারা তা খাঁটি মনেই বলছে। মুনাফিকরা তোমাদের সাথে যুদ্ধে আসলে সরলমনা মুসলিমদেরকে প্ররোচনা দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করত। (দুই) দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে যে, মুনাফিকরা নিজেরা যদিও সেনাদলে যোগদান করেনি, কিন্তু তোমাদের ভেতর তাদের গুপ্তচর আছে। তারা তোমাদের কথা কান পেতে শোনে এবং যেসব কথা দ্বারা মুনাফিকদের কোন সুবিধা হতে পারে, তা তাদের কাছে পৌঁছে দেয়।
৪৮

لَقَدِ ابۡتَغَوُا الۡفِتۡنَۃَ مِنۡ قَبۡلُ وَقَلَّبُوۡا لَکَ الۡاُمُوۡرَ حَتّٰی جَآءَ الۡحَقُّ وَظَہَرَ اَمۡرُ اللّٰہِ وَہُمۡ کٰرِہُوۡنَ ٤٨

লাকাদিব তাগাউল ফিতনাতা মিন কাবলুওয়া কাল্লাবূলাকাল উমূরা হাত্তা-জাআল হাক্কু ওয়া জাহারা আমরুল্লা-হি ওয়া হুম কা-রিহূন।

তারা এর আগেও ফিতনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। তোমার ক্ষতি করার লক্ষ্যে তারা বিষয়াবলীকে ওলট-পালট করে যাচ্ছিল। অবশেষে সত্য আসল এবং আল্লাহর হুকুম বিজয়ী হল অথচ তারা তা অপছন্দ করছিল। ৪২

তাফসীরঃ

৪২. এর দ্বারা মুসলিমদের বিজয়সমূহের প্রতি ইশারা করা হয়েছে। মক্কা বিজয় ও হুনায়নের বিজয় তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুনাফিকদের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল মুসলিমগণ যাতে সফল না হতে পারে। তারা নানা রকম ষড়যন্ত্র করছিল। দ্বীনে ইসলামকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একেকবার একেক ফন্দী আঁটছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার হুকুম জয়ী হল আর তারা হা করে তাকিয়ে থাকল।
৪৯

وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّقُوۡلُ ائۡذَنۡ لِّیۡ وَلَا تَفۡتِنِّیۡ ؕ اَلَا فِی الۡفِتۡنَۃِ سَقَطُوۡا ؕ وَاِنَّ جَہَنَّمَ لَمُحِیۡطَۃٌۢ بِالۡکٰفِرِیۡنَ ٤٩

ওয়া মিনহুম মাইঁ ইয়াকূলু’যাললী ওয়ালা-তাফতিন্নী আলা-ফিল ফিতনাতি ছাকাতূ ওয়া ইন্না জাহান্নামা লামুহীতাতুম বিলকা-ফিরীন।

আর তাদের মধ্যেই সেই ব্যক্তিও আছে, যে বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে ফিতনায় ফেলবেন না। ৪৩ ওহে! ফিতনায় তো তারা পড়েই রয়েছে। বিশ্বাস রাখ, জাহান্নাম কাফেরদেরকে বেষ্টন করে রাখবেই।

তাফসীরঃ

৪৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে, মুনাফিকদের মধ্যে জাদ্দ ইবনে কায়স নামক একজন লোক ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বললে সে জবাব দিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি বড় নারীকাতর লোক। রোমান সুন্দরীদের দেখলে আমার পক্ষে ইন্দ্রিয় সংযম সম্ভব হবে না। ফলে আমি ফিতনায় পড়ে যাব। সুতরাং আমাকে এই যুদ্ধে শরীক না হওয়ার অনুমতি দিন এবং এভাবে আমাকে ফিতনার শিকার হওয়া থেকে বাঁচান। এ আয়াতে তার দিকেই ইশারা করা হয়েছে (রূহুল মাআনী ইবনুল মুনযির, তাবারানী ও ইবনে মারদাওয়ায়হের বরাতে)।
৫০

اِنۡ تُصِبۡکَ حَسَنَۃٌ تَسُؤۡہُمۡ ۚ وَاِنۡ تُصِبۡکَ مُصِیۡبَۃٌ یَّقُوۡلُوۡا قَدۡ اَخَذۡنَاۤ اَمۡرَنَا مِنۡ قَبۡلُ وَیَتَوَلَّوۡا وَّہُمۡ فَرِحُوۡنَ ٥۰

ইন তুসিবকা হাছানাতুন তাছু’হুম ওয়াইন তুসিবকা মুসিবাতুইঁ ইয়াকূলূকাদ আখাযনাআমরানা-মিন কাবলুওয়া ইয়াতাওয়াল্লাও ওয়া হুম ফারিহূন।

তোমার কোন কল্যাণ লাভ হলে তাদের দুঃখ হয় আর যদি তোমার কোন মুসিবত দেখা দেয়, তবে বলে, আমরা তো আগেই আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলাম, আর (একথা বলে) তারা বড় খুশী মনে সটকে পড়ে।
৫১

قُلۡ لَّنۡ یُّصِیۡبَنَاۤ اِلَّا مَا کَتَبَ اللّٰہُ لَنَا ۚ ہُوَ مَوۡلٰىنَا ۚ وَعَلَی اللّٰہِ فَلۡیَتَوَکَّلِ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ٥١

কুল লাইঁ ইউসীবানাইল্লা-মা-কাতাবাল্লা-হু লানা- হুওয়া মাওলা-না- ওয়া ‘আলাল্লা-হি ফালইয়াতাওয়াক্কালিল মু’মিনূন।

বলে দাও, আল্লাহ আমাদের জন্য (তাকদীরে) যা লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কোন কষ্ট আমাদেরকে কিছুতেই স্পর্শ করবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহরই উপর মুমিনদের ভরসা করা উচিত।
৫২

قُلۡ ہَلۡ تَرَبَّصُوۡنَ بِنَاۤ اِلَّاۤ اِحۡدَی الۡحُسۡنَیَیۡنِ ؕ وَنَحۡنُ نَتَرَبَّصُ بِکُمۡ اَنۡ یُّصِیۡبَکُمُ اللّٰہُ بِعَذَابٍ مِّنۡ عِنۡدِہٖۤ اَوۡ بِاَیۡدِیۡنَا ۫ۖ فَتَرَبَّصُوۡۤا اِنَّا مَعَکُمۡ مُّتَرَبِّصُوۡنَ ٥٢

কুল হাল তারাব্বাসূনা বিনাইল্লা-ইহদাল হুছনাইয়াইনি ওয়া নাহনুনাতারাব্বাসুবিকুম আইঁ ইউসীবাকুমুল্লা-হু বি‘আযা-বিম মিন ‘ইনদিহী-আও বিআইদীনা- ফাতারাব্বাসূইন্না-মা‘আকুম মুতারাব্বিসূন।

বলে দাও, তোমরা আমাদের জন্য কি দু’টি মঙ্গলের যে-কোন একটির অপেক্ষাই করছ, (যা আমরা লাভ করব?) ৪৪ আর আমরা তোমাদের ব্যাপারে এই অপেক্ষায় আছি যে, আল্লাহ নিজের পক্ষ হতে অথবা আমাদের হাতে তোমাদেরকে শাস্তি দান করবেন। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় আছি।

তাফসীরঃ

৪৪. অর্থাৎ হয়ত আমরা জয়লাভ করব অথবা আল্লাহ তাআলার পথে শহীদ হয়ে যাব। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, আমাদের পক্ষে এ দুটোই কল্যাণকর। তোমরা মনে করছ শহীদ হয়ে গেলে আমাদের ক্ষতি হবে, অথচ শহীদ হওয়াটা আদৌ ক্ষতির বিষয় নয়; বরং অতি বড় লাভজনক ব্যাপার।
৫৩

قُلۡ اَنۡفِقُوۡا طَوۡعًا اَوۡ کَرۡہًا لَّنۡ یُّتَقَبَّلَ مِنۡکُمۡ ؕ اِنَّکُمۡ کُنۡتُمۡ قَوۡمًا فٰسِقِیۡنَ ٥٣

কুল আনফিকূতাও‘আন আও কারহাল লাইঁ ইউতাকাব্বালা মিনকুম ইন্নাকুম কুনতুম কাওমান ফা-ছিকীন।

বলে দাও, তোমরা (নিজেদের সম্পদ থেকে) খুশী মনে চাঁদা দাও অথবা অসন্তোষের সাথে, তোমাদের পক্ষ হতে তা কিছুতেই কবুল করা হবে না। ৪৫ নিশ্চয়ই তোমরা ক্রমাগত অবাধ্যতাকারী সম্প্রদায়।

তাফসীরঃ

৪৫. এ আয়াত নাযিল হয়েছে জাদ্দ ইবনে কায়েস প্রসঙ্গে, যার কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এক রিওয়ায়াতে আছে, যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে একে তো সে পূর্বোক্ত বেহুদা ওজর পেশ করেছিল, সেই সঙ্গে সে প্রস্তাব করেছিল, তার বদলে (অর্থাৎ, যুদ্ধে যাওয়ার বদলে) আমি যুদ্ধের চাঁদা দেব (ইবেন জারীর, ১ম খণ্ড, ১৫২ পৃষ্ঠা)। তারই জবাবে এ আয়াত ঘোষণা করছে যে, মুনাফিকদের চাঁদা গ্রহণযোগ্য নয়।
৫৪

وَمَا مَنَعَہُمۡ اَنۡ تُقۡبَلَ مِنۡہُمۡ نَفَقٰتُہُمۡ اِلَّاۤ اَنَّہُمۡ کَفَرُوۡا بِاللّٰہِ وَبِرَسُوۡلِہٖ وَلَا یَاۡتُوۡنَ الصَّلٰوۃَ اِلَّا وَہُمۡ کُسَالٰی وَلَا یُنۡفِقُوۡنَ اِلَّا وَہُمۡ کٰرِہُوۡنَ ٥٤

ওয়া মা-মানা‘আহুম আন তুকবালা মিনহুম নাফাকা-তুহুম ইল্লাআন্নাহুম কাফারু বিল্লা-হি ওয়া বিরাছূলিহী ওয়ালা-ইয়া’তূনাসসালা-তা ইল্লা-ওয়া হুম কুছা-লা-ওয়ালা-ইউনফিকূ না ইল্লা-ওয়া হুম কা-রিহূন।

তাদের চাঁদা কবুল হওয়ার পক্ষে বাধা এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কুফরী করেছে এবং তারা সালাতে আসলে গড়িমসি করেই আসে এবং (কোনও সৎকাজে অর্থ) ব্যয় করলে তা করে অসন্তোষের সাথে।
৫৫

فَلَا تُعۡجِبۡکَ اَمۡوَالُہُمۡ وَلَاۤ اَوۡلَادُہُمۡ ؕ اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیُعَذِّبَہُمۡ بِہَا فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَتَزۡہَقَ اَنۡفُسُہُمۡ وَہُمۡ کٰفِرُوۡنَ ٥٥

ফালা-তু‘জিবকা আমওয়া-লুহুম ওয়ালাআওলা-দুহুম ইন্নামা-ইউরীদুল্লা-হু লিইউ‘আযযিবাহুম বিহা-ফিল হায়া-তিদদুনইয়া-ওয়া তাঝহাকা আনফুছুহুম ওয়া হুম কাফিরূন ।

তাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি (-এর আধিক্য) দেখে তোমার বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তো চান দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে এসব জিনিস দ্বারাই শাস্তি দিতে। ৪৬ আর যাতে কাফির অবস্থায়ই তাদের প্রাণ বের হয়।

তাফসীরঃ

৪৬. এ আয়াত দুনিয়ার ধন-দৌলত সম্পর্কিত এক মহা সত্যের প্রতি ইশারা করছে। ইসলামের শিক্ষা হল, ধন-দৌলত এমনিতে এমন কোন বিষয় নয়, যাকে মানুষ তার জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। মানুষের আসল লক্ষ্য তো হবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন ও আখিরাতের সর্বোত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ। তবে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হলে যেহেতু অর্থ-সম্পদের প্রয়োজন, তাই বৈধ উপায়ে তা অর্জন করা চাই। এক্ষেত্রেও ভুলে গেলে চলবে না যে, দুনিয়ার প্রয়োজন সমাধায়ও অর্থ-সম্পদ স্বয়ং সরাসরি কোনও উপকার দিতে পারে না। বরং তা আরাম-আয়েশের উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমই হতে পারে। মানুষ যখন তাকে জীবনের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নেয় এবং সর্বদা এই ধান্ধায় পড়ে থাকে যে, দিন-দিন তা কিভাবে বাড়ানো যায়, তবে সে বেচারার জন্য অর্থ-সম্পদ একটা মুসিবত হয়ে দাঁড়ায়। সে যে এই ধান্ধার ভেতর নিজের সুখণ্ডশান্তি সব বিসর্জন দিয়েছে সে খবরও তার থাকে না। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, তার ব্যাংক-ব্যালান্স উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু তার তো দিনেও স্বস্তি নেই, রাতেও আরাম নেই। না স্ত্রী-সন্তানদের সাথে কথা বলার ফুরসত আছে আর না আরাম-আয়েশের উপকরণসমূহ ভোগ করার অবকাশ আছে। যদি কখনও তার অর্থ-বিত্তে লোকসান দেখা দেয়, তবে তো মাথার উপর দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ে। কেননা তার তো সে লোকসানের বিনিময়ে আখিরাতে কিছু পাওয়ার ধারণা নেই। এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, দুনিয়াদারের পক্ষে অর্থ-বিত্ত তার দুনিয়ার জীবনেই আযাব হয়ে দাঁড়ায়।
৫৬

وَیَحۡلِفُوۡنَ بِاللّٰہِ اِنَّہُمۡ لَمِنۡکُمۡ ؕ وَمَا ہُمۡ مِّنۡکُمۡ وَلٰکِنَّہُمۡ قَوۡمٌ یَّفۡرَقُوۡنَ ٥٦

ওয়া ইয়াহলিফূনা বিল্লা-হি ইন্নাহুম লামিনকুম ওয়ামা-হুম মিনকুম ওয়ালা-কিন্নাহুম কাওমুইঁ ইয়াফরাকূন।

তারা আল্লাহর কসম করে বলে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত, অথচ তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে তারা এক ভীরু সম্প্রদায়।
৫৭

لَوۡ یَجِدُوۡنَ مَلۡجَاً اَوۡ مَغٰرٰتٍ اَوۡ مُدَّخَلًا لَّوَلَّوۡا اِلَیۡہِ وَہُمۡ یَجۡمَحُوۡنَ ٥٧

লাও ইয়াজিদূনা মালজাআন আও মাগা-রা-তিন আও মুদ্দাখালাল লাওয়াল্লাও ইলাইহি ওয়াহুম ইয়াজমাহূন।

তারা যদি কোনও আশ্রয়স্থল, কোনও গিরি-গুহা কিংবা কোন প্রবেশস্থল পেয়ে যায়, তবে লাগামহীনভাবে সে দিকেই ধাবিত হয়। ৪৭

তাফসীরঃ

৪৭. অর্থাৎ তারা যে নিজেকে মুসলিম বলে ঘোষণা করেছে তা কেবল মুসলিমদের ভয়ে। নয়ত তাদের অন্তরে কণামাত্র ঈমান নেই। সুতরাং এমন কোনও স্থান যদি তারা পেত যেখানে গিয়ে আশ্রয় নিতে পারত, তবে তারা ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা না দিয়ে বরং সেখানে গিয়ে আত্মগোপন করত।
৫৮

وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّلۡمِزُکَ فِی الصَّدَقٰتِ ۚ فَاِنۡ اُعۡطُوۡا مِنۡہَا رَضُوۡا وَاِنۡ لَّمۡ یُعۡطَوۡا مِنۡہَاۤ اِذَا ہُمۡ یَسۡخَطُوۡنَ ٥٨

ওয়া মিনহুম মাইঁ ইয়ালমিঝুকা ফিসসাদাকা-তি ফাইন উ‘তূমিনহা-রাদূ ওয়াইল্লাম ইউ‘তাও মিনহা-ইযা-হুম ইয়াছখাতূন।

তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা সদকা (বণ্টন) সম্পর্কে তোমাকে দোষারোপ করে। ৪৮ সদকা থেকে তাদেরকে (তাদের মন মত) দেওয়া হলে তারা খুশী হয়ে যায় আর তাদেরকে যদি তা থেকে না দেওয়া হয়, অমনি তারা ক্ষুব্ধ হয়।

তাফসীরঃ

৪৮. ইবনে জারীর (রহ.) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে কয়েকটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেছেন, যাতে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদকা বণ্টন করলে কিছু মুনাফিক তাতে প্রশ্ন তুলল। তারা বলল, এ বণ্টন ইনসাফ মোতাবেক হয়নি (নাউযুবিল্লাহ)। এর কারণ ছিল এই যে, মুনাফিকদেরকে তা থেকে তাদের খাহেশ মত দেওয়া হয়নি।
৫৯

وَلَوۡ اَنَّہُمۡ رَضُوۡا مَاۤ اٰتٰىہُمُ اللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗ ۙ  وَقَالُوۡا حَسۡبُنَا اللّٰہُ سَیُؤۡتِیۡنَا اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ وَرَسُوۡلُہٗۤ ۙ  اِنَّاۤ اِلَی اللّٰہِ رٰغِبُوۡنَ ٪ ٥٩

ওয়ালাও আন্নাহুম রাদূ মাআ-তা-হুমুল্লা-হু ওয়া রাছূলুহূ ওয়া কা-লূহাছবুনাল্লা-হু ছাইউ’তীনাল্লা-হু মিন ফাদলিহী ওয়া রাছূলুহূ ইন্নাইলাল্লা-হি রা-গিবূন।

কত ভালো হত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদেরকে যা-ই দিয়েছেন তাতে যদি তারা খুশী থাকত এবং বলত, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, ভবিষ্যতে আল্লাহ আমাদেরকে নিজ অনুগ্রহ দান করবেন এবং তাঁর রাসূলও। আমরা তো আল্লাহরই কাছে আশাবাদী।
৬০

اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَالۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡہَا وَالۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُہُمۡ وَفِی الرِّقَابِ وَالۡغٰرِمِیۡنَ وَفِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ٦۰

ইন্নামাসসাদাকা-তুলিলফুকারাই ওয়ালা মাছা-কীনি ওয়াল ‘আ-মিলীনা ‘আলাইহা-ওয়াল মুআল্লাফাতি কুলূবুহুম ওয়া ফিররিকা-বি ওয়াল গা-রিমীনা ওয়া ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়াবনিছ ছাবীলি ফারীদাতাম মিনাল্লা-হি; ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।

প্রকৃতপক্ষে সদকা ফকীর ও মিসকীনদের হক ৪৯ এবং সেই সকল কর্মচারীদের, যারা সদকা উসূলের কাজে নিয়োজিত ৫০ এবং যাদের মনোরঞ্জন করা উদ্দেশ্য তাদের। ৫১ তাছাড়া দাসমুক্তিতে, ৫২ ঋণগ্রস্তের ঋণ পরিশোধে ৫৩ এবং আল্লাহর পথে ৫৪ ও মুসাফিরদের সাহায্যেও ৫৫ (তা ব্যয় করা হবে)। এটা আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৪৯. ফকীর ও মিসকীন কাছাকাছি অর্থের শব্দ। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কেউ কেউ এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন যে, মিসকীন সেই ব্যক্তি, যার কিছুই নেই; সম্পূর্ণ নিঃস্ব। আর ফকীর বলে সেই ব্যক্তিকে, যার কাছে কিছু থাকে, কিন্তু তা প্রয়োজন অপেক্ষা কম। আবার কেউ কেউ পার্থক্যটা এর বিপরীতভাবে করেছেন। তবে যাকাতের বিধানে উভয়ই সমান। অর্থাৎ যার কাছে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা তার সমমূল্যের মাল-সামগ্রী, যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত, না থাকে, তার জন্য যাকাত গ্রহণ জায়েয। বিস্তারিত জানার জন্য ফিকহী গ্রন্থাবলী দ্রষ্টব্য।
৬১

وَمِنۡہُمُ الَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ النَّبِیَّ وَیَقُوۡلُوۡنَ ہُوَ اُذُنٌ ؕ قُلۡ اُذُنُ خَیۡرٍ لَّکُمۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَیُؤۡمِنُ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَرَحۡمَۃٌ لِّلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ؕ وَالَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ رَسُوۡلَ اللّٰہِ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ٦١

ওয়া মিনহুমুল্লাযীনা ইউ’যূনান্নাবিইইয়া ওয়া ইয়াকূলূনা হুওয়া উযুনুন কুল উযুনু খাইরিল্লাকুম ইউ’মিনুবিল্লা-হি ওয়া ইউ’মিনুলিলমু’মিনীনা ওয়া রাহমাতুল লিল্লাযীনা আ-মানূ মিনকুম ওয়াল্লাযীনা ইউ’যূনা রাছুলাল্লা-হি লাহুম ‘আযা-বুন আলীম।

তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয় এবং (তাঁর সম্পর্কে) বলে, ‘সে তো আপাদমস্তক কান’। ৫৬ বলে দাও, তোমাদের পক্ষে যা মঙ্গলজনক, সে তারই জন্য কান। ৫৭ সে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং মুমিনদের কথা বিশ্বাস করে। তোমাদের মধ্যে যারা (বাহ্যিকভাবে) ঈমান এনেছে, তাদের জন্য সে রহমত (সুলভ আচরণকারী)। যারা আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে।

তাফসীরঃ

৫৬. মুনাফিকদের উপরিউক্ত বাক্যের উত্তরে আল্লাহ তাআলা তিনটি বিষয় ইরশাদ করেছেন। (এক) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কান পেতে সর্বপ্রথম যে কথা শোনেন, তা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার ওহী। আর ওহী তো তোমাদের সকলের কল্যাণার্থেই নাযিল করা হয়। (দুই) তিনি খাঁটি মুমিনদের কথা শুনে সত্যিই তা বিশ্বাস করে নেন। কেননা তাদের সম্পর্কে তাঁর জানা আছে, তারা মিথ্যা বলে না। (তিন) যারা কেবল বাহ্যিকভাবে ঈমান এনেছে সেই মুনাফিকদের কথাও তিনি শোনেন। কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, তিনি তাদের কথায় ধোঁকায় পড়ে যান। বরং আল্লাহ তাআলা যেহেতু তাকে সাক্ষাৎ রহমত ও করুণাস্বরূপ পাঠিয়েছেন, তাই যতদূর সম্ভব তিনি প্রত্যেকের সাথে দয়ার আচরণ করেন। আর সে কারণেই তিনি মুনাফিকদের কথা সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে বরং নীরবতা অবলম্বন করেন। সুতরাং এটা ধোঁকায় পড়া নয়; বরং তাঁর দয়ালু চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।
৬২

یَحۡلِفُوۡنَ بِاللّٰہِ لَکُمۡ لِیُرۡضُوۡکُمۡ ۚ وَاللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗۤ اَحَقُّ اَنۡ یُّرۡضُوۡہُ اِنۡ کَانُوۡا مُؤۡمِنِیۡنَ ٦٢

ইয়াহলিফূনা বিল্লা-হি লাকুম লিইউরদূ কুম ওয়াল্লা-হু ওয়া রাছূলুহূআহাক্কুআইঁ ইউরদূ হু ইন কা-নূমু’মিনীন।

(হে মুসলিমগণ!) তারা তোমাদেরকে খুশী করার জন্য তোমাদের কাছে আল্লাহর নামে শপথ করে, অথচ তারা সত্যিকারের মুমিন হলে তো আল্লাহ ও তার রাসূলই এ বিষয়ের বেশি হকদার যে, তারা তাদেরকেই খুশী করবে।
৬৩

اَلَمۡ یَعۡلَمُوۡۤا اَنَّہٗ مَنۡ یُّحَادِدِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ فَاَنَّ لَہٗ نَارَ جَہَنَّمَ خَالِدًا فِیۡہَا ؕ ذٰلِکَ الۡخِزۡیُ الۡعَظِیۡمُ ٦٣

আলাম ইয়া‘লামূআন্নাহূমাইঁ ইউহা-দিদিল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূফাআন্না লাহূনা-রা জাহান্নামা খা-লিদান ফীহা- যা-লিকাল খিঝইউল ‘আজীম।

তারা কি জানে না, কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করলে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, যাতে সে সর্বদা থাকবে? এটা তো চরম লাঞ্ছনা!
৬৪

یَحۡذَرُ الۡمُنٰفِقُوۡنَ اَنۡ تُنَزَّلَ عَلَیۡہِمۡ سُوۡرَۃٌ تُنَبِّئُہُمۡ بِمَا فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ قُلِ اسۡتَہۡزِءُوۡا ۚ اِنَّ اللّٰہَ مُخۡرِجٌ مَّا تَحۡذَرُوۡنَ ٦٤

ইয়াহযারুল মুনা-ফিকূনা আন তুনাঝঝালা ‘আলাইহিম ছূরাতুন তুনাব্বিউহুম বিমা-ফী কুলূবিহিম কুলিছ তাহঝিঊ ইন্নাল্লা-হা মুখরিজুম মা-তাহযারুন।

মুনাফিকগণ ভয় পায় যে, পাছে মুসলিমদের প্রতি এমন কোনও সূরা নাযিল হয়, যা তাদেরকে তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) মনের কথা জানিয়ে দিবে। ৫৮ বলে দাও, তোমরা ঠাট্টা করতে থাক। তোমরা যা ভয় কর আল্লাহ তা প্রকাশ করেই দিবেন।

তাফসীরঃ

৫৮. মুনাফিকগণ তাদের নিজেদের মধ্যকার আলাপ-আলোচনায় মুসলিমদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। কেউ এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলত, আমরা এসব কথা কেবল ফূর্তি করেই বলেছিলাম, মনের থেকে বলিনি। (তারা মনের দিক থেকে যেহেতু দোদুল্যমান ছিল, যেমন কুফর পরিত্যাগ করতে পারছিল না, তেমনি চাক্ষুস প্রমাণাদি দেখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতকেও পুরোপুরি অগ্রাহ্য করতে পারছিল না, তাই হাজারও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ সত্ত্বেও মনের মধ্যে একটা খটকা তাদের লেগেই থাকত। মাঝে মধ্যে ওহীর মাধ্যমে তাদের কোন কোন গোপন কথা প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় সে খটকা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তারা শঙ্কিত হয়ে ওঠে, না জানি কুরআনের একটা পূর্ণাঙ্গ সূরাই তাদের সম্পর্কে নাযিল হয়ে যায় আর তা তাদের সব গোমর ফাঁস করে দেয় এবং সমস্ত মানুষের মধ্যে তাদেরকে লাঞ্ছিত করে ছাড়ে।-অনুবাদক) ৬৪ থেকে ৬৬ নং পর্যন্ত আয়াতসমূহে তাদের এসব কার্যকলাপের পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
৬৫

وَلَئِنۡ سَاَلۡتَہُمۡ لَیَقُوۡلُنَّ اِنَّمَا کُنَّا نَخُوۡضُ وَنَلۡعَبُ ؕ قُلۡ اَبِاللّٰہِ وَاٰیٰتِہٖ وَرَسُوۡلِہٖ کُنۡتُمۡ تَسۡتَہۡزِءُوۡنَ ٦٥

ওয়া লাইন ছাআলতাহুম লাইয়াকূলুন্না ইন্নামা-কুন্না-নাখূদুওয়া নাল‘আবু কুল আবিল্লাহি ওয়া আ-য়া-তিহী ওয়া রাছূলিহী কুনতুম তাছতাহঝিঊন।

তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো হাসি-তামাশা ও ফূর্তি করছিলাম। বল, তোমরা কি আল্লাহ, আল্লাহর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ফূর্তি করছিলে?
৬৬

لَا تَعۡتَذِرُوۡا قَدۡ کَفَرۡتُمۡ بَعۡدَ اِیۡمَانِکُمۡ ؕ  اِنۡ نَّعۡفُ عَنۡ طَآئِفَۃٍ مِّنۡکُمۡ نُعَذِّبۡ طَآئِفَۃًۢ بِاَنَّہُمۡ کَانُوۡا مُجۡرِمِیۡنَ ٪ ٦٦

লা- তা‘তাযিরূকাদ কাফারতুম বা‘দা ঈমা-নিকুম ইন না‘ফু‘আন তাইফাতিম মিনকুম নুআ‘যযিব তাইফাতাম বিআন্নাহুম কা-নূমুজরিমীন।

অজুহাত দেখিও না। তোমরা ঈমান জাহির করার পর কুফরীতে লিপ্ত হয়েছ। আমি তোমাদের মধ্যে এক দলকে ক্ষমা করলেও, অন্য দলকে অবশ্যই শাস্তি দিব। ৫৯ কেননা তারা অপরাধী।

তাফসীরঃ

৫৯. অর্থাৎ মুনাফিকদের মধ্যে যারা তাওবা করবে তাদেরকে ক্ষমা করা হবে। আর যারা তাওবা করবে না তারা অবশ্যই শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।
৬৭

اَلۡمُنٰفِقُوۡنَ وَالۡمُنٰفِقٰتُ بَعۡضُہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمُنۡکَرِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمَعۡرُوۡفِ وَیَقۡبِضُوۡنَ اَیۡدِیَہُمۡ ؕ نَسُوا اللّٰہَ فَنَسِیَہُمۡ ؕ اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ ہُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ ٦٧

আল মুনা-ফিকূনা ওয়াল মুনা-ফিকা-তুবা‘দুহুম মিম বা‘দ । ইয়া’মুরূনা বিল মুনকারি ওয়া ইয়ানহাওনা ‘আনিল মা‘রূফি ওয়া ইয়াকবিদূনা আইদিয়াহুম নাছুল্লা-হা ফানাছিয়াহুম ইন্নাল মুনা-ফিকীনা হুমুল ফা-ছিকূ ন।

মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী সকলেই একে অন্যের মত। তারা মন্দ কাজের আদেশ করে ও ভালো কাজে বাধা দেয় এবং তারা নিজেদের হাত বন্ধ করে রাখে। ৬০ তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। ৬১ নিঃসন্দেহে মুনাফিকগণ ঘোর অবাধ্য।

তাফসীরঃ

৬০. অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য পরিহার করেছে, তাই আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে পরিহার করেছেন এবং নিজ রহমত ও অনুগ্রহ হতে তাদেরকে দূরে রেখেছেন। ফলে তারা তার পক্ষে বিস্মৃততুল্য হয়ে গেছে। -অনুবাদক
৬৮

وَعَدَ اللّٰہُ الۡمُنٰفِقِیۡنَ وَالۡمُنٰفِقٰتِ وَالۡکُفَّارَ نَارَ جَہَنَّمَ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ  ہِیَ حَسۡبُہُمۡ ۚ  وَلَعَنَہُمُ اللّٰہُ ۚ  وَلَہُمۡ عَذَابٌ مُّقِیۡمٌ ۙ ٦٨

ওয়া‘আদাল্লা-হুল মুনা-ফিকীনা ওয়াল মুনা-ফিকা-তি ওয়াল কুফফা-রা না-রা জাহান্নামা খালিদীনা ফীহা- হিয়া হাছবুহুম ওয়া লা‘আনাহুমুল্লা-হু ওয়া লাহুম ‘আযা-বুম মুকীম।

আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী এবং সমস্ত কাফেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। তাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন আর তাদের জন্য আছে স্থায়ী শাস্তি।
৬৯

کَالَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ کَانُوۡۤا اَشَدَّ مِنۡکُمۡ قُوَّۃً وَّاَکۡثَرَ اَمۡوَالًا وَّاَوۡلَادًا ؕ فَاسۡتَمۡتَعُوۡا بِخَلَاقِہِمۡ فَاسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِخَلَاقِکُمۡ کَمَا اسۡتَمۡتَعَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ بِخَلَاقِہِمۡ وَخُضۡتُمۡ کَالَّذِیۡ خَاضُوۡا ؕ اُولٰٓئِکَ حَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۚ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ٦٩

কাল্লাযীনা মিন কাবলিকুম কা-নূআশাদ্দা মিনকুম কুওওয়াতাওঁ ওয়া আকছারা আমওয়ালাওঁ ওয়া আওলা-দান ফাছতামতা‘ঊ বিখালা-কিহিম ফাছতামতা‘তুম বিখালা-কিকুম কামাছতামতা‘আল্লাযীনা মিন কাবলিকুম বিখালা-কিহিম ওয়া খুদতুম কাল্লাযী খা-দূ উলাইকা হাবিতাত আ‘মা-লুহুম ফিদ দুনইয়া-ওয়াল আ-খিরাতি ওয়া উলাইকা হুমুল খা-ছিরূন।

(হে মুনাফিকগণ!) তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে, (তোমরা) তাদেরই মত। তারা শক্তিতে তোমাদের অপেক্ষা প্রবল এবং ধনে-জনে তোমাদের অপেক্ষা অনেক বেশি ছিল। তারা তাদের ভাগের মজা লুটে নিয়েছিল, তারপর তোমরাও তোমাদের ভাগের মজা লুটছ, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজেদের ভাগের মজা লুটেছিল এবং তোমরাও বেহুদা কথাবার্তায় লিপ্ত হয়েছিল, যেমন তারা লিপ্ত হয়েছিল। ৬২ তারাই এমন লোক, যাদের কর্ম দুনিয়া ও আখিরাতে নিষ্ফল হয়েছে এবং তারাই এমন লোক, যারা (ব্যবসায়) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তাফসীরঃ

৬২. অর্থাৎ ভোগবাদিতায় এবং আল্লাহ ও দ্বীন-ঈমান সম্পর্কে অসার-অনুচিত কথাবার্তায় তোমরা সেই অতীত জাতিসমূহেরই মত। সুতরাং সাবধান হও, তাদের যে পরিণতি হয়েছিল, অনুরূপ পরিণতি তোমাদেরও ভোগ করতে হতে পারে। -অনুবাদক
৭০

اَلَمۡ یَاۡتِہِمۡ نَبَاُ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ قَوۡمِ نُوۡحٍ وَّعَادٍ وَّثَمُوۡدَ ۬ۙ وَقَوۡمِ اِبۡرٰہِیۡمَ وَاَصۡحٰبِ مَدۡیَنَ وَالۡمُؤۡتَفِکٰتِ ؕ اَتَتۡہُمۡ رُسُلُہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ ۚ فَمَا کَانَ اللّٰہُ لِیَظۡلِمَہُمۡ وَلٰکِنۡ کَانُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ یَظۡلِمُوۡنَ ٧۰

আলাম ইয়া’তিহিম নাবাউল্লাযীনা মিন কাবলিহিম কাওমি নূহিওঁ ওয়া ‘আ-দিওঁ ওয়া ছামূদা ওয়া কাওমি ইবরা-হীমা ওয়া আসহা-বি মাদইয়ানা ওয়াল মু’তাফিকা-তি আতাতহুম রুছুলুহুম বিলবাইয়িনা-তি ফামা-কা-নাল্লা-হু লিইয়াজলিমাহুম ওয়ালা-কিন কা-নূআনফুছাহুম ইয়াজলিমূন।

তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) কাছে কি তাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের সংবাদ পৌঁছেনি? নূহের কওম, আদ, ছামুদ, ইবরাহীমের কওম, মাদয়ানবাসী এবং সেই সকল জনপদ, যা উল্টিয়ে দেওয়া হয়েছে! ৬৩ তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ নিয়ে এসেছিল। অতঃপর আল্লাহ এমন নন যে, তাদের উপর জুলুম করবেন; বস্তুত তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।

তাফসীরঃ

৬৩. এদের ঘটনাবলীর জন্য দেখুন সূরা আরাফের ৭ : ৫৯ থেকে ৭ : ৯২ আয়াত ও সংশ্লিষ্ট টীকাসমূহ।
৭১

وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیۡعُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُہُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٧١

ওয়াল মু’মিনূনা ওয়াল মু’মিনা-তুবা‘দুহুম আওলিয়াউ বা‘দ । ইয়া’মুরূনা বিল মা‘রূফি ওয়া ইয়ানহাওনা ‘আনিল মুনকারি ওয়া ইউকীমূনাসসালা-তা ওয়া ইউ’তূনাঝঝাকা-তা ওয়া ইউতী‘ঊনাল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূ উলাইকা ছাইয়ারহামুহুমুল্লা-হু ইন্নাল্লা-হা ‘আঝীঝুন হাকীম।

মুমিন নর ও মুমিন নারী পরস্পরে একে অন্যের সহযোগী। তারা সৎকাজের আদেশ করে, অসৎ কাজে বাধা দেয়, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তারা এমন লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ নিজ রহমত বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
৭২

وَعَدَ اللّٰہُ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَمَسٰکِنَ طَیِّبَۃً فِیۡ جَنّٰتِ عَدۡنٍ ؕ  وَرِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰہِ اَکۡبَرُ ؕ  ذٰلِکَ ہُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ٪ ٧٢

ওয়া ‘আদাল্লা-হুল মু’মিনীনা ওয়াল মু’মিনা-তি জান্না-তিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু খা-লিদীনা ফীহা-ওয়া মাছা-কিনা তাইয়িবাতান ফী জান্না-তি ‘আদনিওঁ ওয়া রিদওয়ানুম মিনাল্লা-হি আকবারু যা-লিকা হুওয়াল ফাওঝুল ‘আজীম।

আল্লাহ মুমিন নর ও মুমিন নারীদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এমন উদ্যানরাজির, যার তলদেশে নহর বহমান থাকবে। তাতে তারা সর্বদা থাকবে এবং এমন উৎকৃষ্ট বাসস্থানের, যা রয়েছে সতত সজীব জান্নাতে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ, (যা জান্নাতবাসীগণ লাভ করবে)। এটাই মহা সাফল্য।
৭৩

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ جَاہِدِ الۡکُفَّارَ وَالۡمُنٰفِقِیۡنَ وَاغۡلُظۡ عَلَیۡہِمۡ ؕ وَمَاۡوٰىہُمۡ جَہَنَّمُ ؕ وَبِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ ٧٣

ইয়াআইয়ুহান্নাবিইয়ুজা-হিদিল কুফফা-রা ওয়াল মুনা-ফিকীনা ওয়াগলুজ‘আলাইহিম ওয়া মা’ওয়া-হুম জাহান্নামু ওয়া বি’ছাল মাসীর।

হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের সাথে জিহাদ কর ৬৪ এবং তাদের প্রতি কঠোর হও। তাদের ঠিকানা জাহান্নাম আর তা অতি মন্দ ঠিকানা।

তাফসীরঃ

৬৪. ‘জিহাদ’-এর মূল অর্থ, চেষ্টা, মেহনত ও পরিশ্রম করা। দ্বীনের হেফাজত ও প্রতিরক্ষার জন্য এ মেহনত সশস্ত্র সংগ্রাম রূপেও হতে পারে এবং মৌখিক দাওয়াত ও তাবলীগ, আলোচনা-পর্যালোচনা ও তর্ক-বিতর্কের পন্থায়ও হতে পারে। যারা প্রকাশ্য কাফের, তাদের সাথে জিহাদ দ্বারা এখানে প্রথমোক্ত অর্থই বোঝানো হয়েছে। আর মুনাফিকদের সাথে জিহাদ দ্বারা দ্বিতীয় অর্থ উদ্দেশ্য। মুনাফিকরা যেহেতু মুখে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করত তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের অপতৎপরতা সত্ত্বেও হুকুম দেন যে, দুনিয়ায় তাদের সাথে মুসলিমদের মতই ব্যবহার করতে হবে। সুতরাং তাদের সাথে জিহাদের অর্থ হবে মৌখিক জিহাদ। আর তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার অর্থ, কথাবার্তায় তাদের কোনও খাতির না করা এবং তাদের দ্বারা শাস্তিযোগ্য কোন অপরাধ ঘটলে তাদেরকে ক্ষমা না করা।
৭৪

یَحۡلِفُوۡنَ بِاللّٰہِ مَا قَالُوۡا ؕ وَلَقَدۡ قَالُوۡا کَلِمَۃَ الۡکُفۡرِ وَکَفَرُوۡا بَعۡدَ اِسۡلَامِہِمۡ وَہَمُّوۡا بِمَا لَمۡ یَنَالُوۡا ۚ وَمَا نَقَمُوۡۤا اِلَّاۤ اَنۡ اَغۡنٰہُمُ اللّٰہُ وَرَسُوۡلُہٗ مِنۡ فَضۡلِہٖ ۚ فَاِنۡ یَّتُوۡبُوۡا یَکُ خَیۡرًا لَّہُمۡ ۚ وَاِنۡ یَّتَوَلَّوۡا یُعَذِّبۡہُمُ اللّٰہُ عَذَابًا اَلِیۡمًا ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۚ وَمَا لَہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مِنۡ وَّلِیٍّ وَّلَا نَصِیۡرٍ ٧٤

ইয়াহলিফূনা বিল্লা-হি মা-কা-লূ ওয়া লাকাদ কা-লূকালিমাতাল কুফরি ওয়া কাফারূ বা‘দা ইছলা-মিহিম ওয়া হাম্মূবিমা-লাম ইয়ানা-লূ ওয়া মা-নাকামূইল্লাআন আগনাহুমুল্লা-হু ওয়া রাছূলুহূমিন ফাদলিহী ফাইয়ঁইয়াতূবূইয়াকুখাইরাল্লাহুম ওয়াইয়ঁ ইয়াতাওয়াল্লাও ইউ‘আযযিবহুমুল্লা-হু ‘আযা-বান আলীমান ফিদদুনইয়া-ওয়াল আখিরাতি ওয়ামা-লাহুম ফিলআরদিমিওঁ ওয়ালিওয়িওঁ ওয়ালা-নাসীর।

তারা আল্লাহর কসম করে যে, তারা কিছু বলেনি। অথচ তারা কুফরী কথা বলেছে ৬৫ এবং তারা নিজেদের ইসলাম গ্রহণের পর কুফর অবলম্বন করেছে এবং ৬৬ তারা এমন কাজ করার ইচ্ছা করেছিল, যাতে তারা সফলতা লাভ করতে পারেনি। ৬৭ আল্লাহ ও তার রাসূল যে তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে বিত্তবান করেছিলেন, তারা তারই বদলা দিয়েছে। ৬৮ এখন তারা তাওবা করলে তা তাদের পক্ষে মঙ্গল হবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাময় শাস্তি দিবেন এবং ভূপৃষ্ঠে তাদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না।

তাফসীরঃ

৬৫. মুনাফিকদের একটা খাসলত ছিল যে, তারা তাদের নিজেদের বৈঠক ও মজলিসে ঠিকই কাফেরসুলভ কথাবার্তা বলত। কিন্তু এ সম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলে সাফ অস্বীকার করত এবং কসম করত যে, আমরা এমন কথা বলিনি। একবার মুনাফিকদের সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে চরম ধৃষ্টতামূলক উক্তি করেছিল। এমনই কথা, যা উচ্চারণ করাও কঠিন। সেই সঙ্গে এটাও বলেছিল যে, আমরা যখন মদীনায় পৌঁছব, তখন আমাদের মধ্যকার সম্মানী ও শক্তিশালী লোকেরা নিম্ন শ্রেণীর লোকদেরকে মদীনা থেকে বের করে দেবে। খোদ কুরআন মাজীদেও তার এ কথা উদ্ধৃত হয়েছে (দেখুন, সূরা মুনাফিকুন ৬৩ : ৮)। কিন্তু যখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল, সে তা অস্বীকার করল এবং কসম করল যে, আমি এটা বলিনি (রূহুল মাআনী ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির প্রমূখের বরাতে)।
৭৫

وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ عٰہَدَ اللّٰہَ لَئِنۡ اٰتٰىنَا مِنۡ فَضۡلِہٖ لَنَصَّدَّقَنَّ وَلَنَکُوۡنَنَّ مِنَ الصّٰلِحِیۡنَ ٧٥

ওয়া মিনহুমঁমান ‘আ-হাদাল্লা-হা লাইন আ-তা-না-মিন ফাদলিহী লানাসসাদ্দাকান্না ওয়া লানাকূনান্না মিনাসসা-লিহীন।

তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিল যে, তিনি যদি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে দান করেন, তবে আমরা অবশ্যই সদকা করব এবং নিঃসন্দেহে আমরা সৎলোকদের অন্তর্ভুক্ত হব।
৭৬

فَلَمَّاۤ اٰتٰہُمۡ مِّنۡ فَضۡلِہٖ بَخِلُوۡا بِہٖ وَتَوَلَّوۡا وَّہُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ ٧٦

ফালাম্মাআ-তা-হুম মিন ফাদলিহী বাখিলূবিহী ওয়া তাওয়াল্লাওঁ ওয়াহুম মু‘রিদূন।

কিন্তু আল্লাহ যখন তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে দান করলেন, তখন তারা তাতে কার্পণ্য করল এবং মুখ ফিরিয়ে চলে গেল। ৬৯

তাফসীরঃ

৬৯. হযরত আবু উমামা রাযিয়াল্লাহু আনহুর এক বর্ণনায় আছে, সালাবা নামক জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে আরজ করল, আপনি দোয়া করুন, আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে ধনী বানিয়ে দেন। তিনি প্রথমে তাকে বুঝালেন যে, বেশী ধনবান হওয়াকে তো আমি নিজের জন্যও পছন্দ করি না। কিন্তু সে পীড়াপীড়ি করতে থাকল এবং এই ওয়াদাও করল যে, আমি ধনবান হলে সকল হকদারকে তাদের হক আদায় করে দেব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে এই প্রাজ্ঞজনোচিত কথা বললেন, দেখ, যেই অল্প সম্পদের শুকর আদায় করতে পারবে, সেটা ওই বেশি সম্পদ অপেক্ষা শ্রেয়, যার শুকর আদায় করতে পারবে না। কিন্তু তথাপি সে পীড়াপীড়ি করতে লাগল। অগত্যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন। ফলে বাস্তবিকই সে ধনবান হয়ে গেল। তার মূল সম্পদ ছিল গবাদি পশু। তা অল্প দিনের ভেতর এত বেড়ে গেল যে, তার দেখাশোনায় ব্যস্ত থাকার ফলে নামায ছুটে যেতে লাগল। সে এক পর্যায়ে তার পশুগুলো নিয়ে মদীনা মুনাওয়ারার বাইরে গিয়ে থাকতে শুরু করল। কেননা ভিতরে তার স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। প্রথম দিকে তো জুমুআর দিন মসজিদে আসত। কিন্তু এক পর্যায়ে জুমুআয় আসাও ছেড়ে দিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিনিধি যখন তার কাছে যাকাত আদায়ের জন্য গেল, তখন সে যাকাত নিয়েও পরিহাস করল এবং টালবাহানা করে তাকে ফেরত পাঠাল। এ আয়াতে সেই ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে। (রূহুল মাআনী, তাবারানী ও বায়হাকীর বরাতে)।
৭৭

فَاَعۡقَبَہُمۡ نِفَاقًا فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ اِلٰی یَوۡمِ یَلۡقَوۡنَہٗ بِمَاۤ اَخۡلَفُوا اللّٰہَ مَا وَعَدُوۡہُ وَبِمَا کَانُوۡا یَکۡذِبُوۡنَ ٧٧

ফাআ‘কাবাহুম নিফা-কান ফী কুলূবিহিম ইলা-ইয়াওমি ইয়ালকাওনাহূবিমাআখলাফুল্লা-হা মা-ওয়া‘আদূহু ওয়া বিমা-কা-নূইয়াকযিবূন।

সুতরাং আল্লাহ শাস্তি হিসেবে তাদের অন্তরে কপটতা স্থিত করে দিলেন সেই দিন পর্যন্ত, যে দিন তারা আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে। কেননা তারা আল্লাহর সঙ্গে যে ওয়াদা করেছিল, তা রক্ষা করল না এবং তারা মিথ্যা বলত।
৭৮

اَلَمۡ یَعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ سِرَّہُمۡ وَنَجۡوٰىہُمۡ وَاَنَّ اللّٰہَ عَلَّامُ الۡغُیُوۡبِ ۚ ٧٨

আলাম ইয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা ইয়া‘লামুছিররাহুম ওয়া নাজওয়া-হুম ওয়া আন্নাল্লা-হা ‘আল্লামুল গুইঊব।

তাদের কি জানা ছিল না যে, আল্লাহ তাদের (সমস্ত) গুপ্ত বিষয় এবং তাদের কানাকানি সম্পর্কে অবগত এবং আল্লাহ্ অদৃশ্যের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞাত?
৭৯

اَلَّذِیۡنَ یَلۡمِزُوۡنَ الۡمُطَّوِّعِیۡنَ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ فِی الصَّدَقٰتِ وَالَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ اِلَّا جُہۡدَہُمۡ فَیَسۡخَرُوۡنَ مِنۡہُمۡ ؕ سَخِرَ اللّٰہُ مِنۡہُمۡ ۫ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ٧٩

আল্লাযীনা ইয়ালমিঝূনাল মুত্তাওবি‘ঈনা মিনাল মু’মিনীনা ফিসসাদাকা-তি ওয়াল্লাযীনা লা-ইয়াজিদূ না ইল্লা-জুহদাহুম ফাইয়াছখারূনা মিনহুম ছাখিরাল্লা-হু মিনহুম ওয়া লাহুম ‘আযা-বুন আলীম।

(এসব মুনাফিক তো এমন), যারা মু’মিনদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকাকারীদেরকে দোষারোপ করে এবং তাদেরকেও, যারা নিজ শ্রম (লব্ধ অর্থ) ছাড়া কিছুই পায় না। ৭০ এ কারণে তারা তাদেরকে উপহাস করে। আল্লাহও তাদের উপহাস করেন। ৭১ তাদের জন্য যন্ত্রণাময় শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে।

তাফসীরঃ

৭০. প্রকৃত অর্থে ‘উপহাস করা’ শব্দটি আল্লাহ তা‘আলার জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি এর ঊর্ধ্বে ও এর থেকে পবিত্র। সুতরাং এস্থলে উপহাস করা দ্বারা উপহাস করার শাস্তি বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তারা যে উপহাস করছে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সেজন্য শাস্তি দান করবেন। আল্লাহ তাআলার জন্য শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে অলংকার শাস্ত্রের মুশাকালা [পাশাপাশি অবস্থানের কারণে একটি বিষয়কে অপরটির শব্দে ব্যক্তকরণমূলক অলংকার]-এর ভিত্তিতে।
৮০

اِسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ اَوۡ لَا تَسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ ؕ  اِنۡ تَسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ سَبۡعِیۡنَ مَرَّۃً فَلَنۡ یَّغۡفِرَ اللّٰہُ لَہُمۡ ؕ  ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ کَفَرُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ؕ  وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ ٪ ٨۰

ইছতাগফির লাহুম আও লা-তাছতাগফির লাহুম ইন তাছতাগফির লাহুম ছাব‘ঈনা মাররাতান ফালাই ইয়াগফিরাল্লা-হু লাহুম যা-লিকা বিআন্নাহুম কাফারূবিল্লা-হি ওয়া রাছূলিহী ওয়াল্লা-হু লা-ইয়াহদিল কাওমাল ফা-ছিকীন।

(হে নবী!) তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর একই কথা। তুমি যদি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবু আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। তা এ কারণে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে। আল্লাহ অবাধ্য লোকদেরকে হিদায়াতপ্রাপ্ত করেন না।
৮১

فَرِحَ الۡمُخَلَّفُوۡنَ بِمَقۡعَدِہِمۡ خِلٰفَ رَسُوۡلِ اللّٰہِ وَکَرِہُوۡۤا اَنۡ یُّجَاہِدُوۡا بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَقَالُوۡا لَا تَنۡفِرُوۡا فِی الۡحَرِّ ؕ قُلۡ نَارُ جَہَنَّمَ اَشَدُّ حَرًّا ؕ لَوۡ کَانُوۡا یَفۡقَہُوۡنَ ٨١

ফারিহাল মুখাল্লাফূনা বিমাক‘আদিহিম খিলা-ফা রাছূলিল্লা-হি ওয়া কারিহূআইঁ ইউজাহিদূ বিআমওয়া-লিহিম ওয়া আনফুছিহিম ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়া কা-লূলা-তানফিরূফিল হাররি কুল না-রু জাহান্নামা আশাদ্দুহাররাল লাও কা-নুইয়াফকাহূন।

যাদেরকে (তাবুক যুদ্ধ হতে) পিছনে থাকতে দেওয়া হয়েছিল, তারা রাসূলুল্লাহর যাওয়ার পর (নিজ গৃহে) বসে থাকাতে আনন্দ লাভ করল। আর আল্লাহর পথে নিজেদের জান-মাল দ্বারা জিহাদ করা তাদের কাছে নাপছন্দ ছিল। তারা বলেছিল, এই গরমে বের হয়ো না। বল, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন তীব্রতর। যদি তারা বুঝত!
৮২

فَلۡیَضۡحَکُوۡا قَلِیۡلًا وَّلۡیَبۡکُوۡا کَثِیۡرًا ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ ٨٢

ফালইয়াদহাকূকালীলাওঁ ওয়াল ইয়াবকূকাছীরান জাঝাআম বিমা-কা-নূ ইয়াকছিবূন।

সুতরাং তারা (দুনিয়ায়) কিঞ্চিৎ হেসে নিক। অতঃপর তারা (আখিরাতে) অনেক কাঁদবে, তারা যা-কিছু অর্জন করেছে তার প্রতিফলস্বরূপ।
৮৩

فَاِنۡ رَّجَعَکَ اللّٰہُ اِلٰی طَآئِفَۃٍ مِّنۡہُمۡ فَاسۡتَاۡذَنُوۡکَ لِلۡخُرُوۡجِ فَقُلۡ لَّنۡ تَخۡرُجُوۡا مَعِیَ اَبَدًا وَّلَنۡ تُقَاتِلُوۡا مَعِیَ عَدُوًّا ؕ اِنَّکُمۡ رَضِیۡتُمۡ بِالۡقُعُوۡدِ اَوَّلَ مَرَّۃٍ فَاقۡعُدُوۡا مَعَ الۡخٰلِفِیۡنَ ٨٣

ফাইওঁ ওাজা‘আকাল্লা-হু ইলা-তাইফাতিম মিনহুম ফাছতা’যানূকা লিলখুরূজি ফাকুল লান তাখরুজূমা‘ইয়া আবাদাওঁ ওয়া লান তুকা-তিলূমা‘ইয়া ‘আদুওওয়ান ইন্নাকুম রাদীতুম বিল কু‘ঊদি আওওয়ালা মাররাতিন ফাক‘উদূমা‘আল খা-লিফীন।

(হে নবী!) এরপর আল্লাহ তোমাকে তাদের কোনও দলের কাছে ফিরিয়ে আনলে এবং তারা তোমার কাছে (অন্য কোনও জিহাদে) বের হওয়ার অনুমতি চাইলে তাদেরকে বলে দেবে, ‘তোমরা আর কখনও আমার সঙ্গে বের হতে পারবে না’ এবং আমার সাথে মিলে কখনও কোনও শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবে না। তোমরা তো প্রথমবার বসে থাকতে পছন্দ করেছিলে। সুতরাং এখনও তাদের সঙ্গে বসে থাক, যারা (কোনও ওজরের কারণে) পিছনে থাকে।
৮৪

وَلَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنۡہُمۡ مَّاتَ اَبَدًا وَّلَا تَقُمۡ عَلٰی قَبۡرِہٖ ؕ اِنَّہُمۡ کَفَرُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَمَاتُوۡا وَہُمۡ فٰسِقُوۡنَ ٨٤

ওয়ালা-তুসালিল ‘আলাআহাদিম মিনহুম মা-তা আবাদাওঁ ওয়ালা-তাকুম ‘আলা-কাবরিহী ইন্নাহুম কাফারূবিল্লা-হি ওয়া রাছূলিহী ওয়ামা-তূওয়াহুম ফা-ছিকূ ন।

(হে নবী!) তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) মধ্য হতে কেউ মারা গেলে তুমি তার প্রতি (জানাযার) নামায পড়বে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেও না। ৭২ তারা তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং তারা পাপিষ্ঠ অবস্থায় মারা গেছে।

তাফসীরঃ

৭২. এ আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে সহীহ বুখারী ও অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ (রাযি.) ছিলেন একজন খাঁটি মুসলিম। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মুনাফিকী প্রকাশ পেলেও সে প্রকাশ্যে যেহেতু নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করত, তাই বাহ্যত তার সাথে মুসলিমদের মতই আচরণ করা হত। তার যখন মৃত্যু হল, তখন তার পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাযি.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তাঁকে জানাযা পড়ানোর জন্য অনুরোধ করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তির প্রতিই বড় দয়ালু ছিলেন। সুতরাং তিনি তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করলেন এবং তাঁর পিতার জানাযা পড়ানোর জন্য চলে গেলেন। এদিকে হযরত উমর (রাযি.) তাঁকে এই ঘোর মুনাফিকের জানাযা না পড়ানোর অনুরোধ জানালেন এবং এর সপক্ষে পূর্ববর্তী আয়াতের বরাত দিলেন, যাতে বলা হয়েছে, ‘তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর উভয়ই সমান। তুমি যদি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবু আল্লাহ তাদেরক ক্ষমা করবেন না (আয়াত নং ৮০)। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমাকে তো এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে যে, আমি চাইলে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি। সুতরাং আমি তার জন্য সত্তর বারেরও বেশি ক্ষমাপ্রার্থনা করব। কাজেই তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জানাযা পড়ালেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাযিল হয় এবং তাঁকে মুনাফিকদের জানাযার নামায পড়াতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কখনও কোনও মুনাফিকের জানাযার নামায পড়াননি।
৮৫

وَلَا تُعۡجِبۡکَ اَمۡوَالُہُمۡ وَاَوۡلَادُہُمۡ ؕ اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ اَنۡ یُّعَذِّبَہُمۡ بِہَا فِی الدُّنۡیَا وَتَزۡہَقَ اَنۡفُسُہُمۡ وَہُمۡ کٰفِرُوۡنَ ٨٥

ওয়ালা-তু‘জিবকা আমওয়া-লুহুম ওয়াআওলা-দুহুম ইন্নামা-ইউরীদুল্লা-হু আইঁ ইউ‘আযযিবাহুম বিহা-ফিদদুনইয়া-ওয়া তাঝহাকা আনফুছুহুম ওয়া হুম কা-ফিরূন।

তাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি (-এর প্রাচুর্য) দেখে তোমার বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তো এসব জিনিস দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান ৭৩ এবং (আরও চান) যেন কাফির অবস্থায়ই তাদের প্রাণপাত হয়।

তাফসীরঃ

৭৩. এর জন্য পেছনে ৫৫নং আয়াতের টীকা দেখুন।
৮৬

وَاِذَاۤ اُنۡزِلَتۡ سُوۡرَۃٌ اَنۡ اٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَجَاہِدُوۡا مَعَ رَسُوۡلِہِ اسۡتَاۡذَنَکَ اُولُوا الطَّوۡلِ مِنۡہُمۡ وَقَالُوۡا ذَرۡنَا نَکُنۡ مَّعَ الۡقٰعِدِیۡنَ ٨٦

ওয়া ইযাউনঝিলাত ছূরাতুনআনআ-মিনূবিল্লা-হি ওয়া জা-হিদূমা‘আ রাছূলিহিছ তা’যানাকা উলুততাওলি মিনহুম ওয়া কা-লূযারনা-নাকুম মা‘আল কা-‘ইদীন।

‘আল্লাহর প্রতি ঈমান আন ও তাঁর রাসূলের সঙ্গী হয়ে জিহাদ কর’এ মর্মে যখন কোন সূরা নাযিল হয়, তখন তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে, তারা তোমার কাছে অব্যাহতি চায় এবং বলে, যারা (ঘরে) বসে আছে, আমাদেরকেও তাদের সঙ্গে থাকতে দিন।
৮৭

رَضُوۡا بِاَنۡ یَّکُوۡنُوۡا مَعَ الۡخَوَالِفِ وَطُبِعَ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ فَہُمۡ لَا یَفۡقَہُوۡنَ ٨٧

রাদূ বিআইঁ ইয়াকূনূমা‘আল খাওয়া-লিফি ওয়া তুবি‘আ আলা-কুলূবিহিম ফাহুম লাইয়াফকাহূন।

তারা পেছনে থেকে যাওয়া নারীদের সঙ্গে থাকাতেই আনন্দ বোধ করে। তাদের অন্তরে মোহর করে দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা অনুধাবন করে না (যে, তারা আসলে কী করছে!)।
৮৮

لٰکِنِ الرَّسُوۡلُ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَعَہٗ جٰہَدُوۡا بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ ؕ وَاُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡخَیۡرٰتُ ۫ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ٨٨

লা-কিনির রাছূলুওয়াল্লাযীনা আ-মানূমা‘আহূজা-হাদূবিআমওয়া-লিহিম ওয়া আনফুছিহিম ওয়া উলাইকা লাহুমুল খাইরা-তু ওয়া উলাইকা হুমুল মুফলিহূন।

কিন্তু রাসূল এবং যে সকল লোক তার সঙ্গে ঈমান এনেছে, তারা নিজেদের জান-মাল দ্বারা জিহাদ করেছে। তাদেরই জন্য সর্বপ্রকার কল্যাণ এবং তারাই কৃতকার্য।
৮৯

اَعَدَّ اللّٰہُ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ  ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ٪ ٨٩

আ‘আদ্দাল্লা-হু লাহুম জান্না-তিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু খা-লিদীনা ফীহা-যালিকাল ফাওঝুল ‘আজীম।

আল্লাহ তাদের জন্য এমন সব উদ্যান তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান, যাতে তারা সর্বদা থাকবে। তাই মহাসাফল্য।
৯০

وَجَآءَ الۡمُعَذِّرُوۡنَ مِنَ الۡاَعۡرَابِ لِیُؤۡذَنَ لَہُمۡ وَقَعَدَ الَّذِیۡنَ کَذَبُوا اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ سَیُصِیۡبُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ٩۰

ওয়া জাআল মু‘আযযিরূনা মিনাল আ‘রা-বি লিইউ’যানা লাহুম ওয়া কা‘আদাল্লাযীনা কাযাবুল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূ ছাইউসীবুল্লাযীনা কাফারূমিনহুম ‘আযা-বুন আলীম।

আর দেহাতীদের মধ্য থেকেও অজুহাত প্রদর্শনকারীরা আসল, যেন তাদেরকে (জিহাদ থেকে) অব্যাহতি দেওয়া হয়। ৭৪ আর (এভাবে) যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে মিথ্যা বলেছিল, তারা বসে থাকল। ৭৫ তাদের মধ্যে যারা (সম্পূর্ণরূপে) কুফর অবলম্বন করেছে তাদের জন্য যন্ত্রণাময় শাস্তি রয়েছে।

তাফসীরঃ

৭৪. অর্থাৎ যারা আল্লাহ ও রাসূলের কাছে নিজেদের মুমিন বলে দাবি করেছিল, অথচ সে দাবি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা, তারা আদৌ ঈমান আনেনি। তারা জিহাদেও যায়নি এবং না যাওয়ার পক্ষে কোন ওযরও দেখায়নি। অর্থাৎ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাবূক থেকে ফিরে এলে একদল বেদুঈন মুনাফিক তো তাঁর কাছে এসে বিভিন্ন বানোয়াট অজুহাত পেশ করতে লাগল যে, আমরা এই-এই সমস্যার কারণে যুদ্ধে যেতে পারিনি। আরেকদল মিথ্যা ঈমানের দাবিদার যুদ্ধে তো যায়ই নি, আবার কেন যায়নি, সে কারণ দর্শাতেও আসেনি। নিশ্চিন্তে ঘরে বসে থাকল। (-অনুবাদক)
৯১

لَیۡسَ عَلَی الضُّعَفَآءِ وَلَا عَلَی الۡمَرۡضٰی وَلَا عَلَی الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ مَا یُنۡفِقُوۡنَ حَرَجٌ اِذَا نَصَحُوۡا لِلّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ؕ  مَا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ مِنۡ سَبِیۡلٍ ؕ  وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ۙ ٩١

লাইছা ‘আলাদদু‘আফাই ওয়ালা-‘আলাল মারদা-ওয়ালা-‘আলাল্লাযীনা লা-ইয়াজিদূ নামা-ইউনফিকূ না হারাজুন ইযা-নাসাহূলিল্লা-হি ওয়া রাছূলিহী মা-‘আলাল মুহছিনীনা মিন ছাবীলিওঁ ওয়াল্লা-হু গাফূরুর রাহীম।

দুর্বল লোকদের (জিহাদে না যাওয়াতে) কোনও গুনাহ নেই এবং পীড়িত ও সেই সকল লোকেরও নয়, যাদের কাছে খরচ করার মত কিছু নেই, যদি তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অকৃত্রিম থাকে। সৎ লোকদের সম্পর্কে কোনও অভিযোগ নেই। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
৯২

وَّلَا عَلَی الَّذِیۡنَ اِذَا مَاۤ اَتَوۡکَ لِتَحۡمِلَہُمۡ قُلۡتَ لَاۤ اَجِدُ مَاۤ اَحۡمِلُکُمۡ عَلَیۡہِ ۪  تَوَلَّوۡا وَّاَعۡیُنُہُمۡ تَفِیۡضُ مِنَ الدَّمۡعِ حَزَنًا اَلَّا یَجِدُوۡا مَا یُنۡفِقُوۡنَ ؕ ٩٢

ওয়ালা-‘আলাল্লাযীনা ইযা-মাআতাওকা লিতাহমিলাহুম কুলতা লাআজিদুমাআহমিলুকুম ‘আলাইহি তাওয়াল্লাওঁ ওয়া আ‘ইঊনুহুম তাফীদুমিনাদ দাম‘ই হাঝানান আল্লা-ইয়াজিদূমা-ইউনফিকূ ন ।

সেই সকল লোকেরও (কোনও গুনাহ) নেই, যাদের অবস্থা এই যে, তুমি তাদের জন্য কোন বাহনের ব্যবস্থা করবে যখন এই আশায় তারা তোমার কাছে আসল আর তুমি বললে, আমার কাছে তো তোমাদেরকে দেওয়ার মত কোন বাহন নেই, তখন তাদের কাছে খরচ করার মত কিছু না থাকার দুঃখে তারা এভাবে ফিরে গেল যে, তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। ৭৬

তাফসীরঃ

৭৬. বিভিন্ন রিওয়ায়াতে আছে, এঁরা সকলে ছিলেন আনসারী সাহাবী, যেমন হযরত সালিম ইবনে উমায়ের, হযরত উলবা ইবনে যায়েদ, হযরত আবদুর রহমান ইবনে কাব, হযরত আমর ইবনুল হাম্মাম, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল, হযরত হারমী ইবনে আবদুল্লাহ ও হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম আজমাঈন। তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তারা নিখাদ আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এবং সেজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সওয়ারীর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন বললেন, আমার কাছে তো কোনও সওয়ারী নেই, তখন তারা কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেলেন (রূহুল মাআনী)।
৯৩

اِنَّمَا السَّبِیۡلُ عَلَی الَّذِیۡنَ یَسۡتَاۡذِنُوۡنَکَ وَہُمۡ اَغۡنِیَآءُ ۚ رَضُوۡا بِاَنۡ یَّکُوۡنُوۡا مَعَ الۡخَوَالِفِ ۙ وَطَبَعَ اللّٰہُ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ فَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٩٣

ইন্নামাছছাবীলু‘আলাল লাযীনা ইয়াছতা’যিনূনাকা ওয়াহুম আগনিয়াউ রাদূ বিআইঁ ইয়াকূনূমা‘আল খাওয়া-লিফি ওয়া তাবা‘আল্লা-হু ‘আলা-কুলূবিহিম ফাহুম লাইয়া‘লামূন।

অভিযোগ তো আছে তাদের সম্পর্কে, যারা ধনবান হওয়া সত্ত্বেও তোমার কাছে অব্যাহতি চায়। পেছনে অবস্থানকারী নারীদের সঙ্গে থাকাতে তারা খুশী। আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর করে দিয়েছেন। ফলে তারা (প্রকৃত সত্য) জানে না।
৯৪

یَعۡتَذِرُوۡنَ اِلَیۡکُمۡ اِذَا رَجَعۡتُمۡ اِلَیۡہِمۡ ؕ قُلۡ لَّا تَعۡتَذِرُوۡا لَنۡ نُّؤۡمِنَ لَکُمۡ قَدۡ نَبَّاَنَا اللّٰہُ مِنۡ اَخۡبَارِکُمۡ ؕ وَسَیَرَی اللّٰہُ عَمَلَکُمۡ وَرَسُوۡلُہٗ ثُمَّ تُرَدُّوۡنَ اِلٰی عٰلِمِ الۡغَیۡبِ وَالشَّہَادَۃِ فَیُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ ٩٤

ইয়া‘তাযিরূনা ইলাইকুম ইযা-রাজা‘তুম ইলাইহিম কুল লা-তা‘তাযিরূ লান নু’মিনা লাকুম কাদ নাব্বাআনাল্লা-হু মিন আখবা-রিকুম ওয়া ছাইয়ারাল্লা-হু ‘আমালাকুম ওয়া রাছূলুহু ছুম্মা তুরাদ্দূনা ইলা-‘আ-লিমিল গাইবি ওয়াশশাহা-দাতি ফাইউনাব্বিউকুম বিমাকুনতুম তা‘মালূন।

(হে মুসলিমগণ!) তোমরা যখন (তাবুক থেকে) তাদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তারা তোমাদের কাছে (নানা রকম) অজুহাত পেশ করবে। (হে নবী! তাদেরকে) বলে দিয়ো, তোমরা অজুহাত পেশ করো না, আমরা কিছুতেই তোমাদের কথা বিশ্বাস করব না। আল্লাহ তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে আমাদেরকে ভালোভাবে অবগত করেছেন। আর ভবিষ্যতে আল্লাহও তোমাদের কাজকর্ম দেখবেন এবং তাঁর রাসূলও। ৭৭ অতঃপর তোমাদেরকে সেই সত্তার সামনে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, যিনি গুপ্ত ও প্রকাশ্য যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞাত। অতঃপর তোমরা যা-কিছু করছিলে সে সম্পর্কে তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।

তাফসীরঃ

৭৭. অর্থাৎ দেখবেন, তোমরা তোমাদের মুনাফিকসুলভ তৎপরতাই চালিয়ে যাচ্ছ, না তা থেকে তাওবা করে খাঁটি মুমিন হয়ে গেছ।
৯৫

سَیَحۡلِفُوۡنَ بِاللّٰہِ لَکُمۡ اِذَا انۡقَلَبۡتُمۡ اِلَیۡہِمۡ لِتُعۡرِضُوۡا عَنۡہُمۡ ؕ فَاَعۡرِضُوۡا عَنۡہُمۡ ؕ اِنَّہُمۡ رِجۡسٌ ۫ وَّمَاۡوٰىہُمۡ جَہَنَّمُ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ ٩٥

ছাইয়াহলিফূনা বিল্লা-হি লাকুম ইযান কালাবতুম ইলাইহিম লিতু‘রিদূ‘আনহুম ফাআ‘রিদূ ‘আনহুম ইন্নাহুম রিজছুওঁ ওয়ামা’ওয়া-হুম জাহান্নামু জাঝাআম বিমা কা-নূইয়াকছিবূন।

তোমরা যখন তাদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তারা তোমাদের সামনে আল্লাহর কসম করবে, যাতে তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর। সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করো। ৭৮ নিশ্চয়ই তারা (আপদমস্তক) অপবিত্র। আর তারা যা অর্জন করছে তজ্জন্য তাদের ঠিকানা জাহান্নাম।

তাফসীরঃ

৭৮. এখানে উপেক্ষা করার অর্থ তাদের কথা শোনার পর তা অগ্রাহ্য করা এবং তৎক্ষণাৎ তাদেরকে কোন শাস্তিও না দেওয়া আর তাদের ওজর গ্রহণের ওয়াদাও না করা কিংবা ক্ষমার ঘোষণা না দেওয়া। এ নীতি অবলম্বনের কারণ পরবর্তী আয়াতে এই বলা হয়েছে যে, মুনাফিকীর কারণে তারা আপদমস্তক অপবিত্র। তাদের অজুহাত মিথ্যা হওয়ার কারণে তা তাদেরকে পবিত্র করার শক্তি রাখে না। শেষে তাদেরকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
৯৬

یَحۡلِفُوۡنَ لَکُمۡ لِتَرۡضَوۡا عَنۡہُمۡ ۚ فَاِنۡ تَرۡضَوۡا عَنۡہُمۡ فَاِنَّ اللّٰہَ لَا یَرۡضٰی عَنِ الۡقَوۡمِ الۡفٰسِقِیۡنَ ٩٦

ইয়াহলিফূনা লাকুম লিতারদাও ‘আনহুম ফাইন তারদাও ‘আনহুম ফাইন্নাল্লা-হা লাইয়ারদা-‘আনিল কাওমিল ফা-ছিকীন।

তোমরা যাতে তাদের প্রতি খুশী হয়ে যাও সেজন্য তারা তোমাদের সামনে কসম করবে, অথচ তোমরা তাদের প্রতি খুশী হলেও আল্লাহ (এরূপ) অবাধ্য লোকদের প্রতি খুশী হবেন না।
৯৭

اَلۡاَعۡرَابُ اَشَدُّ کُفۡرًا وَّنِفَاقًا وَّاَجۡدَرُ اَلَّا یَعۡلَمُوۡا حُدُوۡدَ مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ عَلٰی رَسُوۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ٩٧

আলআ‘রা-বুআশাদ্দূকুফরাওঁ ওয়ানিফা-কাওঁ ওয়াআজদারু আল্লা-ইয়া‘লামূহুদূদা মাআনঝালাল্লা-হু ‘আলা-রাছূলিহী ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।

দেহাতী (মুনাফিক)-গণ কুফর ও কপটতায় কঠোরতর এবং (অন্যদের অপেক্ষা) তারা এ বিষয়ের বেশি উপযুক্ত যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি যে দীন অবতীর্ণ করেছেন তার বিধানাবলী সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে। ৭৯ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৭৯. অর্থাৎ মুনাফিকী ছাড়াও তাদের একটা দোষ হল, তারা মদীনা মুনাওয়ারার মুসলিমদের সাথে মেলামেশাও করে না যে, শরীয়তের বিধানাবলী জানতে পারবে। ফলে দীন ও দীনের সামগ্রিক শিক্ষা হতে বঞ্চিত থেকে অজ্ঞতা ও অশিষ্টতার ভেতর তারা বেড়ে ওঠে। যে কারণে কুফর ও মুনাফিকীতে মদীনার মুনাফিকদের চেয়ে তারা বেশি কঠোর এবং কুফরী কথাবার্তায় বেশি বেপরোয়া হয়ে থাকে। (-অনুবাদক)
৯৮

وَمِنَ الۡاَعۡرَابِ مَنۡ یَّتَّخِذُ مَا یُنۡفِقُ مَغۡرَمًا وَّیَتَرَبَّصُ بِکُمُ الدَّوَآئِرَ ؕ عَلَیۡہِمۡ دَآئِرَۃُ السَّوۡءِ ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ٩٨

ওয়া মিনাল আ‘রা-বি মাইঁ ইয়াত্তাখিযুমা-ইউনফিকু মাগরামাওঁ ওয়া ইয়াতারাব্বাসু বিকুমু দ দাওয়াইরা ‘আলাইহিম দাইরাতুছছাওই ওয়াল্লা-হু ছামী‘উন আলীম।

সেই দেহাতীদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা (আল্লাহর নামে) ব্যয়িত অর্থকে এক জরিমানা গণ্য করে ৮০ এবং তোমাদের ব্যাপারে কালচক্রের অপেক্ষা করে, ৮১ (অথচ প্রকৃত ব্যাপার হল,) নিকৃষ্টতম কালচক্র তাদেরই উপর গড়িয়েছে। আল্লাহ সকল কথা শোনেন, সবকিছু জানেন।

তাফসীরঃ

৮০. অর্থাৎ তাদের একান্ত কামনা মুসলিমগণ কোনও মুসিবতের চক্রে পতিত হোক। তাহলে শরীয়তের যে সব বিধান তাদের দৃষ্টিতে কঠিন মনে হয়, সে ব্যাপারে তারা স্বাধীন হয়ে যেতে পারবে। বিশেষত তাবুকের যুদ্ধকালে তারা বড় আশা করছিল, এবার যেহেতু বিশাল রোমান শক্তির সাথে মুসলিমদের মুকাবিলা হতে যাচ্ছে, তাই যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে রোমানদের হাতে এবার তাদের চূড়ান্ত পতন ঘটবে। আল্লাহ তাআলা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেরা মুনাফিকীর চক্রে নিপতিত আছে, যা তাদেরকে দুনিয়া আখিরাত উভয় স্থানে লাঞ্ছিত করে ছাড়বে।
৯৯

وَمِنَ الۡاَعۡرَابِ مَنۡ یُّؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَیَتَّخِذُ مَا یُنۡفِقُ قُرُبٰتٍ عِنۡدَ اللّٰہِ وَصَلَوٰتِ الرَّسُوۡلِ ؕ  اَلَاۤ اِنَّہَا قُرۡبَۃٌ لَّہُمۡ ؕ  سَیُدۡخِلُہُمُ اللّٰہُ فِیۡ رَحۡمَتِہٖ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٪ ٩٩

ওয়া মিনাল আ‘রা-বি মাইঁ ইউ’মিনুবিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়া ইয়াত্তাখিযুমাইউনফিকু কুরুবা-তিন ‘ইনদাল্লা-হি ওয়া সালাওয়া-তিররাছূলি আলাইন্নাহা কুরবাতুল্লাহুম ছাইউদখিলুহুমুল্লা-হু ফী রাহমাতিহী ইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

ওই দেহাতীদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে এবং (আল্লাহর নামে) যা-কিছু ব্যয় করে, তাকে আল্লাহর নৈকট্য ও রাসূলের দোয়া লাভের মাধ্যম মনে করে। নিশ্চয়ই, এটা তাদের জন্য নৈকট্য লাভের মাধ্যম। আল্লাহ তাদেরকে নিজ রহমতের ভেতর দাখিল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
১০০

وَالسّٰبِقُوۡنَ الۡاَوَّلُوۡنَ مِنَ الۡمُہٰجِرِیۡنَ وَالۡاَنۡصَارِ وَالَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُمۡ بِاِحۡسَانٍ ۙ رَّضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡہُ وَاَعَدَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ تَحۡتَہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ١۰۰

ওয়াছছা-বিকূনাল আওওয়ালূনা মিনাল মুহা-জিরীনা ওয়াল আনসা-রি ওয়াল্লাযীনাততাবা‘ঊহুম বিইহ ছা-নির রাদিয়াল্লা-হু ‘আনহুম ওয়ারাদূ ‘আনহু ওয়া আ‘আদ্দালাহুম জান্না-তিন তাজরী তাহতাহাল আনহা-রু খা-লিদীনা ফীহাআবাদান যা-লিকাল ফাওঝুল ‘আজীম।

মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা ঈমানে প্রথমে অগ্রগামী হয়েছে এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন উদ্যানরাজি তৈরি করে রেখেছেন, যার তলদেশে নহর বহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। এটাই মহা সাফল্য।
১০১

وَمِمَّنۡ حَوۡلَکُمۡ مِّنَ الۡاَعۡرَابِ مُنٰفِقُوۡنَ ؕۛ  وَمِنۡ اَہۡلِ الۡمَدِیۡنَۃِ ۟ۛؔ  مَرَدُوۡا عَلَی النِّفَاقِ ۟  لَا تَعۡلَمُہُمۡ ؕ  نَحۡنُ نَعۡلَمُہُمۡ ؕ  سَنُعَذِّبُہُمۡ مَّرَّتَیۡنِ ثُمَّ یُرَدُّوۡنَ اِلٰی عَذَابٍ عَظِیۡمٍ ۚ ١۰١

ওয়া মিম্মান হাওলাকুম মিনাল আ‘রা-বি মুনা-ফিকূনা ওয়া মিন আহলিল মাদীনাতি মারাদূ‘আলাননিফা-কি লা-তা‘লামুহুম নাহনুনা‘লামুহুম ছানু‘আযযিবুহুম মাররাতাইনি ছুম্মা ইউরাদ্দূনা ইলা-‘আযা-বিন ‘আজীম।

তোমাদের আশেপাশে যে সকল দেহাতী আছে, তাদের মধ্যেও মুনাফিক আছে এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও, ৮২ তারা মুনাফিকীতে (এতটা) সিদ্ধ (যে,) তুমি তাদেরকে জান না, আমি তাদেরকে জানি। আমি তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব। ৮৩ অতঃপর তাদেরকে এক মহা শাস্তির দিকে তাড়িয়ে নেওয়া হবে।

তাফসীরঃ

৮২. ‘দু’বার শাস্তি দান’-এর ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। সঠিক অর্থ তো আল্লাহ তাআলাই জানেন। তবে বাহ্যত যা বুঝে আসে সে হিসেবে এক শাস্তি তো এই যে, তারা মুসলিমদের পরাস্ত ও পর্যুদস্ত হওয়ার যে আশা করছিল, তা পূরণ হয়নি; বরং মুসলিমগণ তাবুকের যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদেই ফিরে এসেছেন। মুনাফিকদের পক্ষে এটা ছিল এক অসহ্য অন্তর্জ্বালা। সুতরাং তাদের জন্য এটা এক বড় শাস্তি। দ্বিতীয় শাস্তি হল তাদের মুনাফিকীর মুখোশ খুলে যাওয়া, যার ফলে দুনিয়াতেই তাদেরকে লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছে।
১০২

وَاٰخَرُوۡنَ اعۡتَرَفُوۡا بِذُنُوۡبِہِمۡ خَلَطُوۡا عَمَلًا صَالِحًا وَّاٰخَرَ سَیِّئًا ؕ عَسَی اللّٰہُ اَنۡ یَّتُوۡبَ عَلَیۡہِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ١۰٢

ওয়া আ-খারূনা‘তারাফুবিযুনূবিহিম খালাতূ‘আমালান সা-লিহাওঁ ওয়া আ-খারা ছাইয়িআন ‘আছাল্লা-হু আইঁ ইয়াতূবা ‘আলাইহিম ইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

অপর কিছু লোক এমন, যারা নিজেদের দোষ স্বীকার করেছে। তারা এক সৎকাজের সাথে অন্য অসৎকাজ মিলিয়ে ফেলেছে। ৮৪ আশা করা যায় আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন। ৮৫ নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৮৪. মুনাফিকগণ তো নিজেদের মুনাফিকীর কারণে তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি; আর এ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কেই আলোচনা চলছিল। কিন্তু অকৃত্রিম মুমিনদের মধ্যেও এমন কিছু লোক ছিল, যারা অলসতার কারণে জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী তারা ছিলেন মোট দশজন। তাদের মধ্যে সাতজন নিজেদের অলসতার কারণে এতটাই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়েছিলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাবুক থেকে ফেরার আগেই তারা নিজেরা নিজেদেরকে শাস্তি দেওয়ার সংকল্প নিয়ে ফেলেন। এতদুদ্দেশ্যে তারা মসজিদে নববীতে গিয়ে নিজেদেরকে খুঁটির সাথে বেঁধে ফেললেন এবং বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে ক্ষমা না করবেন এবং নিজ হাতে আমাদেরকে খুলে না দেবেন, ততক্ষণ আমরা এভাবেই বাঁধা থাকব। অবশেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে আসলেন। তাদেরকে বাঁধা অবস্থায় দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী? তাঁকে বৃত্তান্ত জানানো হল। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ পর্যন্ত খোলার হুকুম না দেন ততক্ষণ আমিও তাদেরকে খুলব না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাযিল হয় এবং তাদের তাওবা কবুল করা হয়। ফলে তাদের বাঁধনও খুলে দেওয়া হয়। সেই সাতজনের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু লুবাবা আনসারী (রাযি.)। তাঁর নামে মসজিদে নববীতে এখনও একটি স্তম্ভ আছে, যাকে ‘উসতুওয়ানা আবু লুবাবা’ বলা হয়। এক রিওয়ায়াতে আছে, তিনি নিজেকে খুঁটির সাথে বেঁধেছিলেন সেই সময়, যখন বনু কুরাইজার ব্যাপারে তাঁর দ্বারা একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হাফেজ ইবনে জারীর (রহ.) এ বর্ণনাকেই বেশি সঠিক সাব্যস্ত করেছেন যে, ঘটনাটি তাবুক যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত এবং সে সম্পর্কেই এ আয়াত নাযিল হয়েছে (দেখুন, ইবনে জারীর, তাফসীর ১১ খণ্ড, ১২-১৬ পৃ.)। অবশিষ্ট যে তিনজন তাবুকের যুদ্ধে শরীক হননি, তাদের আলোচনা সামনে ১০৬ নং আয়াতে আসছে। এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কারও দ্বারা কোনও গুনাহ হয়ে গেলে তার হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বরং সে তাওবার প্রতি মনোযোগী হবে। এমনিভাবে সে যুক্তি-তর্ক দিয়ে নিজেকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করবে না; বরং সর্বতোভাবে লজ্জা ও অনুশোচনা প্রকাশ করবে। এরূপ লোকদেরকে আল্লাহ তাআলা আশান্বিত করেছেন যে, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন।
১০৩

خُذۡ مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ صَدَقَۃً تُطَہِّرُہُمۡ وَتُزَکِّیۡہِمۡ بِہَا وَصَلِّ عَلَیۡہِمۡ ؕ اِنَّ صَلٰوتَکَ سَکَنٌ لَّہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ١۰٣

খুযমিন আমওয়া-লিহিম সাদাকাতান তুতাহহিরুহুম ওয়া তুঝাক্কীহিম বিহা-ওয়া সালিল ‘আলাইহিম ইন্না সালা-তাকা ছাকানুল্লাহুম ওয়াল্লা-হু ছামী‘উন ‘আলীম।

(হে নবী!) তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ কর, যার মাধ্যমে তুমি তাদেরকে পবিত্র ও বরকতপূর্ণ করবে এবং ৮৬ তাদের জন্য দোয়া কর। নিশ্চয়ই তোমার দোয়া তাদের পক্ষে প্রশান্তিদায়ক। আল্লাহ সব কথা শোনেন, সবকিছু জানেন।

তাফসীরঃ

৮৬. চরম অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে যারা নিজেদেরকে খুটির সাথে বেঁধে ফেলেছিলেন, যখন আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল করলেন এবং তাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হল, তখন তাঁরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজেদের সম্পদ সদকা করতে মনস্থ করলেন এবং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে এনে পেশ করলেন। তিনি প্রথমে বললেন, আমাকে তোমাদের থেকে কোনও সম্পদ গ্রহণের হুকুম দেওয়া হয়নি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছে এবং তাকে সদকা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়াতে সদকার দু’টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। (এক) সদকা মন্দ চরিত্র ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের পক্ষে সহায়ক হয় এবং (খ) সদকা দ্বারা মানুষের সৎকার্যে বরকত ও উন্নতি লাভ হয়। প্রকাশ থাকে যে, এ আয়াত যদিও একটি বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল, কিন্তু এর ভাষা যেহেতু সাধারণ, তাই এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কিরামের ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে যে, এ আয়াতেরই আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনায়ক তার জনগণ থেকে যাকাত উসূল করার এবং যথাযথ খাতে তা ব্যয় করার অধিকার সংরক্ষণ করে। আর এ কারণেই হযরত সিদ্দীকে আকবার (রাযি.) নিজ খেলাফত আমলে যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন।
১০৪

اَلَمۡ یَعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ ہُوَ یَقۡبَلُ التَّوۡبَۃَ عَنۡ عِبَادِہٖ وَیَاۡخُذُ الصَّدَقٰتِ وَاَنَّ اللّٰہَ ہُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ١۰٤

আলাম ইয়া‘লামূ আন্নাল্লা-হা হুওয়া ইয়াকবালুত তাওবাতা ‘আন ‘ইবা-দিহী ওয়া ইয়া’খুযুসসাদাকা-তি ওয়া আন্নাল্লা-হা হুওয়াত তাওওয়া-বুর রাহীম।

তাদের কি জানা নেই যে, আল্লাহই তো নিজ বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সদকাও গ্রহণ করেন এবং আল্লাহই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু?
১০৫

وَقُلِ اعۡمَلُوۡا فَسَیَرَی اللّٰہُ عَمَلَکُمۡ وَرَسُوۡلُہٗ وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ ؕ  وَسَتُرَدُّوۡنَ اِلٰی عٰلِمِ الۡغَیۡبِ وَالشَّہَادَۃِ فَیُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ ۚ ١۰٥

ওয়া কুলি‘মালূফাছাইয়ারাল্লা-হু ‘আমালাকুম ওয়া রাছূলুহূওয়াল মু’মিনূনা ওয়া ছাতুরাদ্দূনা ইলা-‘আ-লিমিল গাইবি ওয়াশশাহা-দাতি ফাইউনাব্বিউকুম বিমা-কুনতুম তা‘লামূন।

এবং (তাদেরকে) বল, তোমরা আমল করতে থাক। আল্লাহ তোমাদের আমল দেখবেন এবং তাঁর রাসূল ও (অন্যান্য) মুমিনগণও। অতঃপর তোমাদেরকে সেই সত্তার কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, যিনি গুপ্ত ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। তারপর তিনি তোমরা যা করতে তা তোমাদেরকে অবহিত করবেন। ৮৭

তাফসীরঃ

৮৭. এ আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে যে, তাওবার পরও কারও নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা ঠিক নয়। বরং আগামীতে নিজের কার্যকলাপ যাতে সংশোধন হয়ে যায়, সে ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া উচিত।
১০৬

وَاٰخَرُوۡنَ مُرۡجَوۡنَ لِاَمۡرِ اللّٰہِ اِمَّا یُعَذِّبُہُمۡ وَاِمَّا یَتُوۡبُ عَلَیۡہِمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ١۰٦

ওয়া আ-খারুনা মুরজাওনা লিআমরিল্লা-হি ইম্মা-ইউ‘আযযিবুহুম ওয়া ইম্মা-ইয়াতূব ‘আলাইহিম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।

এবং অপর কিছু লোক রয়েছে, যাদের সম্পর্কে ফায়সালা মুলতবি রাখা হয়েছে আল্লাহর হুকুমের জন্য। আল্লাহ হয়ত তাদেরকে শাস্তি দেবেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করবেন। ৮৮ আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

৮৮. যেই দশজন সাহাবী বিনা ওজরে কেবল অলসতাবশত তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছিলেন, তাদের সাতজনের বৃত্তান্ত তো পেছনে বর্ণিত হয়েছে। এবার বাকি তিনজনের অবস্থা বর্ণিত হচ্ছে। এ তিনজন হলেন হযরত কাব ইবনে মালিক (রাযি.), হযরত হেলাল ইবনে উমাইয়া (রাযি.) ও হযরত মুরারা ইবনে রাবী (রাযি.)। তারা অনুতপ্ত তো হয়েছিলেন, কিন্তু হযরত আবু লুবাবা (রাযি.) ও তার সাথীগণ যে দ্রুততার সাথে তাওবা করেছিলেন, তারা অতটা দ্রুত করেননি এবং তাঁদের অনুরূপ পন্থাও তাঁরা অবলম্বন করেননি। সুতরাং তারা যখন ক্ষমা প্রার্থনার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পৌঁছলেন, তখন তিনি তাদের ব্যাপারে ফায়সালা মূলতবী রাখলেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোনও হুকুম না আসে ততক্ষণের জন্য হুকুম দিলেন, মুসলিমগণ যেন সামাজিকভাবে তাদেরকে বয়কট করে চলে। সুতরাং পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত তাদেরকে বয়কট করে রাখা হল। অতঃপর তাদের তাওবা কবুল হল। সামনে ১১৮ নং আয়াতে তা বিস্তারিত আসছে।
১০৭

وَالَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا مَسۡجِدًا ضِرَارًا وَّکُفۡرًا وَّتَفۡرِیۡقًۢا بَیۡنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَاِرۡصَادًا لِّمَنۡ حَارَبَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ مِنۡ قَبۡلُ ؕ وَلَیَحۡلِفُنَّ اِنۡ اَرَدۡنَاۤ اِلَّا الۡحُسۡنٰی ؕ وَاللّٰہُ یَشۡہَدُ اِنَّہُمۡ لَکٰذِبُوۡنَ ١۰٧

ওয়াল্লাযীনাত তাখাযূ মাছজিদান দিরা-রাওঁ ওয়া কুফরাওঁ ওয়া তাফরীকাম বাইনাল মু’মিনীনা ওয়া ইরসা-দাল লিমান হা-রাবাল্লা-হা ওয়া রাছূলাহূমিন কাবলু ওয়ালাইয়াহলিফুন্না ইন আরাদনাইল্লাল হুছনা- ওয়াল্লা-হু ইয়াশহাদুইন্নাহুম লাকাযিবূন।

এবং (কিছু লোক এমন), যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে (মুসলিমদের) ক্ষতিসাধন করা, কুফরী কথাবার্তা বলা, মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে যে ব্যক্তি যুদ্ধ করেছে, ৮৯ তার জন্য একটি ঘাঁটির ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে। তারা অবশ্যই কসম করবে যে, আমরা সদুদ্দেশ্যেই এটা করেছি। কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয়ই তারা মিথ্যুক।

তাফসীরঃ

৮৯. এবার একদল চরম কুচক্রি মুনাফিক সম্পর্কে আলোচনা। তারা এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের ভিত্তিতে মসজিদের নামে এক ইমারত নির্মাণ করেছিল। ঘটনার বিবরণ এই যে, মদীনা মুনাওয়ারার খাযরাজ গোত্রে আবু আমির নামে এক লোক ছিল। সে খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিল এবং সেই শিক্ষা মত সংসার বিমুখতা ও বৈরাগ্যের জীবন যাপন করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভাগমনের আগে মদীনা মুনাওয়ারার মানুষ তাকে খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। মদীনা মুনাওয়ারায় আগমনের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকেও সত্য দীনের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু সে সত্য গ্রহণ তো করলই না, উল্টো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিজের প্রতিপক্ষ জ্ঞান করল এবং সে হিসেবে তাঁর শত্রুতায় বদ্ধপরিকর হয়ে গেল। বদরের যুদ্ধ থেকে শুরু করে হুনায়নের যুদ্ধ পর্যন্ত মক্কার কাফেরদের সঙ্গে যত যুদ্ধ হয়েছে, তার সব ক’টিতেই সে কাফেরদের সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে। পরিশেষে হুনায়নের যুদ্ধেও যখন মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হল, তখন সে শাম চলে গেল এবং সেখান থেকে মদীনা মুনাওয়ারার মুনাফিকদেরকে চিঠি লিখল যে, আমি চেষ্টা করছি, যাতে রোমের বাদশাহ মদীনা মুনাওয়ারায় হামলা চালায় এবং মুসলিমদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কিন্তু এর সফলতার জন্য তোমাদেরও কাজ করতে হবে। তোমরা নিজেদেরকে সংঘটিত কর, যাতে আক্রমণ করলে ভিতর থেকে তোমরা তার সহযোগিতা করতে পার। সে এই পরামর্শও দিল যে, তোমরা মসজিদের নামে একটা স্থাপনা তৈরি কর, যা বিদ্রোহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। গোপনে সেখানে অস্ত্র-শস্ত্রও মজুদ করবে। তোমাদের পারস্পরিক শলা-পরামর্শও সেখানেই করবে। আর আমার পক্ষ থেকে কোন দূত গেলে তাকেও সেখানেই থাকতে দেবে। সুতরাং মুনাফিকগণ কুবা এলাকায় একটি ইমারত তৈরি করল। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমীপে আরজ করল, আমাদের মধ্যে বহু কমজোর লোক আছে। কুবার মসজিদ তাদের পক্ষে দূর হয়ে যায়। তাই তাদের সুবিধার্থে আমরা এই মসজিদটি তৈরি করেছি। আপনি কোনও এক সময় এসে এখানে নামায পড়ুন, যাতে আমরা বরকত লাভ করতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তাবুক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, এখন তো আমি তাবুক যাচ্ছি। ফেরার পথে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলে আমি সেখানে গিয়ে নামায পড়ব। কিন্তু তাবুক থেকে ফেরার সময় তিনি যখন মদীনা মুনাওয়ারার কাছাকাছি পৌঁছলেন, তখন ‘যূ-আওয়ান’ নামক স্থানে এ আয়াত নাযিল হয় এবং এর দ্বারা তার সামনে তথাকথিত ওই মসজিদের মুখোশ খুলে দেওয়া হয়। আর তাকে নিষেধ করে দেওয়া হয়, যেন তাতে নামায না পড়েন। তিনি তখনই মালিক ইবনে দুখশুম ও মা‘ন ইবনে আদী রাযিয়াল্লাহু আনহুমা এই দুই সাহাবীকে মসজিদ নামের সে ঘাঁটিটি ধ্বংস করার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সুতরাং তারা গিয়ে সেটি জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিলেন। (ইবনে জারীর, তাফসীর)
১০৮

لَا تَقُمۡ فِیۡہِ اَبَدًا ؕ لَمَسۡجِدٌ اُسِّسَ عَلَی التَّقۡوٰی مِنۡ اَوَّلِ یَوۡمٍ اَحَقُّ اَنۡ تَقُوۡمَ فِیۡہِ ؕ فِیۡہِ رِجَالٌ یُّحِبُّوۡنَ اَنۡ یَّتَطَہَّرُوۡا ؕ وَاللّٰہُ یُحِبُّ الۡمُطَّہِّرِیۡنَ ١۰٨

লা-তাকুম ফীহি আবাদাল লামাছজিদুন উছছিছা ‘আলাততাকওয়া-মিন আওওয়ালি ইয়াওমিন আহাক্কুআন তাকূমা ফীহি ফীহি রিজা-লুইঁ ইউহিববূনা আইঁ ইয়াতাতাহহারু ওয়াল্লা-হু ইউহিব্বুল মুতাতাহহিরীন।

(হে নবী!) তুমি তাতে (অর্থাৎ তথাকথিত ওই মসজিদে) কখনও (নামাযের জন্য) দাঁড়াবে না। যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে, সেটাই তোমার দাঁড়ানোর বেশি উপযুক্ত। ৯০ তাতে এমন লোক আছে, যারা পাক-পবিত্রতাকে বেশি পছন্দ করে। আল্লাহ পাক-পবিত্র লোকদের পছন্দ করেন।

তাফসীরঃ

৯০. এর দ্বারা কুবার মসজিদ ও মসজিদে নববী উভয়ই বোঝানো হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা মুকাররামা থেকে হিজরত করে আসেন এবং কুবা পল্লীতে চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন, সেই সময় তিনি সেখানে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। কুবার সেই মসজিদটিই ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম মসজিদ। কুবা থেকে মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছার পর তিনি মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করেন। এ উভয় মসজিদেরই ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল তাকওয়া ও আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উপর। এ মসজিদের ফযীলত বলা হয়েছে যে, এর মুসল্লীগণ পাক-সাফের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখে। দেহের বাহ্যিক পবিত্রতা যেমন এর অন্তর্ভুক্ত, তেমনি আমল-আখলাকের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতাও।
১০৯

اَفَمَنۡ اَسَّسَ بُنۡیَانَہٗ عَلٰی تَقۡوٰی مِنَ اللّٰہِ وَرِضۡوَانٍ خَیۡرٌ اَمۡ مَّنۡ اَسَّسَ بُنۡیَانَہٗ عَلٰی شَفَا جُرُفٍ ہَارٍ فَانۡہَارَ بِہٖ فِیۡ نَارِ جَہَنَّمَ ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ١۰٩

আফামান আছছাছা বুনইয়া-নাহূ‘আলা-তাকওয়া-মিনাল্লা-হি ওয়া রিদাওয়া-নিন খাইরুন আম্মান আছছাআ বুনইয়া-নাহূ‘আলা-শাফা-জুরুফিন হা-রিন ফানহা-রা বিহী ফী না-রি জাহান্নামা ওয়াল্লা-হু লা-ইয়াহদিল কাওমাজ্জা-লিমীন।

আচ্ছা, সেই ব্যক্তি উত্তম, যে আল্লাহ ভীতি ও তাঁর সন্তুষ্টির উপর নিজ গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছে, না সেই ব্যক্তি, যে তার গৃহের ভিত্তি স্থাপন করে এক খাদের পতনোন্মুখ কিনারায়, ৯১ ফলে সেটি তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়? আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হিদায়াতপ্রাপ্ত করেন না।

তাফসীরঃ

৯১. কুরআন মাজীদে এস্থলে جرف শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এটা কোন ভূমি, টিলা বা পাহাড়ের সেই অংশকে বলে, যার তলদেশ পানির ঢল ও স্রোতে ক্ষয়ে গিয়ে খোঁড়ল মত হয়ে গেছে। ফলে উপরের মাটি যে-কোন সময় ধসে যেতে পারে।
১১০

لَا یَزَالُ بُنۡیَانُہُمُ الَّذِیۡ بَنَوۡا رِیۡبَۃً فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ اِلَّاۤ اَنۡ تَقَطَّعَ قُلُوۡبُہُمۡ ؕ  وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ٪ ١١۰

লা-ইঝা-লুবুনইয়া-নুহুমুল্লাযী বানাও রীবাতান ফী কুলূবিহিম ইল্লা-আন তাকাত্তা‘আ কুলূবুহুম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুন হাকীম।

তারা যে ইমারত তৈরি করেছিল, তা তাদের অন্তরে নিরন্তর সন্দেহ হয়ে থাকবে, যে পর্যন্ত না তাদের অন্তর ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। ৯২ আল্লাহ পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী, পরিপূর্ণ হিকমতের অধিকারী।

তাফসীরঃ

৯২. মুনাফিকরা যে ইমারত তৈরি করেছিল, সে সম্পর্কে ১০৭ নং আয়াতে জানানো উদ্দেশ্য ছিল যে, তারা সেটি তৈরি করেছিল মসজিদের নামে। তাদের দাবী ছিল সেটি মসজিদ। এ কারণেই সেখানে ইমারতটির জন্য মসজিদ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু এ আয়াতে সেটির স্বরূপ উন্মোচন করা হয়েছে। তাই এখানে সেটিকে ইমারত বলা হয়েছে, মসজিদ বলা হয়নি। কেননা বাস্তবে সেটি মসজিদ ছিলই না। তার প্রতিষ্ঠাতাগণ মূলত কাফের ছিল এবং প্রতিষ্ঠাও করেছিল ইসলামের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে। এ কারণেই সেটিকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও মুসলিম মসজিদ নির্মাণ করলে তা জ্বালানো জায়েয হয় না। এ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ইমারতটি তাদের অন্তরে নিরন্তর সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকবে’। এর অর্থ, সেটি ভস্মিভূত করার ফলে মুনাফিকদের কাছেও এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তাদের ষড়যন্ত্রের বিষয়টা মুসলিমদের কাছে ফাঁস হয়ে গেছে। সুতরাং তারা নিজেদের ভবিষ্যত সম্পর্কে সর্বদা সন্দেহে নিপতিত থাকবে যে, না জানি মুসলিমগণ আমাদের সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করে! তাদের এই সংশয়জনিত অবস্থার অবসান কেবল সেই সময়ই হবে, যখন তাদের অন্তর ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে, অর্থাৎ তাদের মৃত্যু ঘটবে।
১১১

اِنَّ اللّٰہَ اشۡتَرٰی مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اَنۡفُسَہُمۡ وَاَمۡوَالَہُمۡ بِاَنَّ لَہُمُ الۡجَنَّۃَ ؕ یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ فَیَقۡتُلُوۡنَ وَیُقۡتَلُوۡنَ ۟ وَعۡدًا عَلَیۡہِ حَقًّا فِی التَّوۡرٰىۃِ وَالۡاِنۡجِیۡلِ وَالۡقُرۡاٰنِ ؕ وَمَنۡ اَوۡفٰی بِعَہۡدِہٖ مِنَ اللّٰہِ فَاسۡتَبۡشِرُوۡا بِبَیۡعِکُمُ الَّذِیۡ بَایَعۡتُمۡ بِہٖ ؕ وَذٰلِکَ ہُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ١١١

ইন্নাল্লা-হাশতারা-মিনাল মু’মিনীনা আনফুছাহুম ওয়া আমওয়া-লাহুম বিআন্না লাহুমুলজান্নাতা ইউকা-তিলূনা ফী ছাবীলিল্লা-হি ফাইয়াকতুলূনা ওয়া ইউকতালূনা ওয়া‘দান আলাইহি হাককান ফিততাওরা-তি ওয়াল ইনজীলি ওয়াল কুরআ-নি ওয়া মান আওফাবি‘আহদিহী মিনাল্লা-হি ফাছতাবশিরূ ব্বিাই‘ইকুমুল্লাযী বা-ইয়া‘তুম বিহী ওয়া যা-লিকা হুওয়াল ফাওঝুল ‘আজীম।

বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ খরিদ করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে-এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। ফলে হত্যা করে ও নিহতও হয়। এটা এক সত্য প্রতিশ্রুতি, যার দায়িত্ব আল্লাহ তাওরাত ও ইনজীলেও নিয়েছেন এবং কুরআনেও। আল্লাহ অপেক্ষা বেশি প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যে সওদা করেছ, সেই সওদার জন্য তোমরা আনন্দিত হও এবং এটাই মহা সাফল্য।
১১২

اَلتَّآئِبُوۡنَ الۡعٰبِدُوۡنَ الۡحٰمِدُوۡنَ السَّآئِحُوۡنَ الرّٰکِعُوۡنَ السّٰجِدُوۡنَ الۡاٰمِرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَالنَّاہُوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَالۡحٰفِظُوۡنَ لِحُدُوۡدِ اللّٰہِ ؕ وَبَشِّرِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ١١٢

আত্তাইবূনাল ‘আ-বিদূ নাল হা-মিদূ নাছছা-ইহুনার রা-কি‘ঊনাছছা-জিদূ নাল আ-মিরূনা বিলামা‘রূফি ওয়ান্না-হুনা ‘আনিল মুনকারি ওয়াল হা-ফিজূনা লিহুদূ দিল্লা-হি ওয়া বাশশিরিল মু’মিনীন।

(যারা এই সফল সওদা করেছে, তারা কারা? তারা) তাওবাকারী, (আল্লাহর) ইবাদতকারী, তাঁর প্রশংসাকারী, সওম পালনকারী, ৯৩ রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশদাতা ও অন্যায় কাজে বাধাদানকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী। ৯৪ (হে নবী!) এরূপ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও।

তাফসীরঃ

৯৩. কুরআন মাজীদের বহু স্থানে ‘আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা’ ও তা সংরক্ষণ করার নির্দেশ বর্ণিত আছে। এ শব্দাবলী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর প্রেক্ষাপট এই যে, আল্লাহ তাআলা যত বিধান দিয়েছেন, তার প্রত্যেকটির কিছু সীমারেখা আছে। সেই সীমারেখার ভেতর থেকেই যদি তা পালন করা হয়, তবে সঠিক হয় ও পুণ্যের কাজ হিসেবে গণ্য হয়। পক্ষান্তরে যদি কোন কাজে সীমারেখা ডিঙিয়ে যাওয়া হয়, তবে সেই কাজই অপছন্দনীয় এমনকি কখনও তা গুনাহের কাজ হিসেবে গণ্য হয়। উদাহরণত আল্লাহ তাআলার ইবাদত একটি বড় সওয়াবের কাজ, কিন্তু কেউ যদি ইবাদতে এতটা মগ্ন হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ তাআলা বান্দাদের যে সকল হক তার উপর আরোপ করেছেন, তা উপেক্ষিত হয়, তবে সেই ইবাদতও অবৈধ হয়ে যায়। তাহাজ্জুদের নামায অনেক বড় সওয়াবের কাজ, কিন্তু কেউ যদি এ নামায পড়তে গিয়ে অন্যদের ঘুম নষ্ট করে, তবে তা নাজায়েয হয়ে যায়। এমনিভাবে পিতা-মাতার সেবার উপরে কোনও নফল ইবাদত নেই, কিন্তু কেউ যদি এ কারণে স্ত্রী ও সন্তানদের হক পদদলিত করতে শুরু করে, তবে সে খেদমত গুনাহে পরিণত হয়। খুব সম্ভব এ কারণেই অনেকগুলো নেক কাজ বর্ণনা করার পর এ আয়াতের শেষে সীমারেখা সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে যে, তারা ওই সমস্ত নেক কাজ তার নির্ধারিত সীমারেখার ভেতর থেকে আঞ্জাম দেয়। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সেসব সীমারেখা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কথা ও কাজ দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। আর তা শেখার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে কোনও আল্লাহওয়ালার সাহচর্যে থাকা এবং তার কর্মপন্থা দেখে সে সকল সীমারেখা উপলব্ধি করা ও নিজ জীবনে তা রূপায়নের চেষ্টা করা।
১১৩

مَا کَانَ لِلنَّبِیِّ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡ یَّسۡتَغۡفِرُوۡا لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ وَلَوۡ کَانُوۡۤا اُولِیۡ قُرۡبٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمۡ اَنَّہُمۡ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ ١١٣

মা-কা-না লিন্নাবিইয়ি ওয়াল্লাযীনা আ-মানূআইঁ ইয়াছতাগফিরূ লিলমুশরিকীনা ওয়ালাও কানূউলী কুরবা-মিম বা‘দি মা-তাবাইইয়ানা লাহুম আন্নাহুম আসহা-বুল জাহীম।

এটা নবী ও মুমিনদের পক্ষে শোভনীয় নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তাতে তারা আত্মীয়-স্বজনই হোক না কেন, যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, তারা জাহান্নামী। ৯৫

তাফসীরঃ

৯৫. বুখারী ও মুসলিম শরীফে এ আয়াতের শানে নুযুল বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিব যদিও তার ভরপুর সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন, কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। মৃত্যুকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে কালিমা পাঠ করে মুসলিম হয়ে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু তখন আবু জাহলসহ উপস্থিত কুরায়শ নেতৃবর্গ তাকে ইসলাম গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে এবং বাপদাদার ধর্মে অবিচলিত থাকার প্ররোচনা দেয়। ফলে তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডাকে সাড়া দান হতে বিরত থাকেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেছিলেন, আমাকে যতক্ষণ পর্যন্ত নিষেধ করা না হয় ততক্ষণ আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয় এবং এর দ্বারা তাকে আবু তালিবের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। তাছাড়া তাফসীরে তাবারী প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, কতিপয় মুসলিম তাদের মুশরিক বাপ-দাদাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তো নিজ পিতার মাগফিরাত কামনা করেছিলেন, সুতরাং আমরাও তা করতে পারি। তখন এ আয়াত নাযিল হয়।
১১৪

وَمَا کَانَ اسۡتِغۡفَارُ اِبۡرٰہِیۡمَ لِاَبِیۡہِ اِلَّا عَنۡ مَّوۡعِدَۃٍ وَّعَدَہَاۤ اِیَّاہُ ۚ فَلَمَّا تَبَیَّنَ لَہٗۤ اَنَّہٗ عَدُوٌّ لِّلّٰہِ تَبَرَّاَ مِنۡہُ ؕ اِنَّ اِبۡرٰہِیۡمَ لَاَوَّاہٌ حَلِیۡمٌ ١١٤

ওয়া মা-কানাছতিগফা-রু ইবরা-হীমা লিআবীহি ইল্লা-‘আম মাও ‘ইদাতিওঁ ওয়া‘আদহাইইয়া-হু ফালাম্মা-তাবাইইয়ানা লাহূআন্নাহূ‘আদুওউল লিল্লা-হি তাবাররাআমিনহু ইন্না ইবরা-হীমা লা আওওয়া-হুন হালীম।

আর ইবরাহীম নিজ পিতার জন্য যে মাগফিরাতের দোয়া করেছিলেন, তার কারণ এছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, সে তাকে (পিতাকে) এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ৯৬ পরে যখন তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর দুশমন, তখন সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। ৯৭ ইবরাহীম তো অত্যধিক উহ্-আহকারী ৯৮ ও বড় সহনশীল ছিল।

তাফসীরঃ

৯৬. হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে তাঁর পিতার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন, তা সূরা মারয়াম (১৯ : ৪৭) ও সূরা মুমতাহানায় (৬০ : ৪) বর্ণিত আছে; আর সে অনুযায়ী দোয়া করার কথা বর্ণিত রয়েছে সূরা শুআরায় (২৬ : ৮৬)।
১১৫

وَمَا کَانَ اللّٰہُ لِیُضِلَّ قَوۡمًۢا بَعۡدَ اِذۡ ہَدٰىہُمۡ حَتّٰی یُبَیِّنَ لَہُمۡ مَّا یَتَّقُوۡنَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ١١٥

ওয়া মা-কা-নাল্লা-হু লিইউদিল্লা কাওমাম বা‘দা ইযহাদা-হুম হাত্তা-ইউবাইয়িনা লাহুম মা-ইয়াত্তাকূন্না ইন্নাল্লা-হা বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীম।

আল্লাহ এমন নন যে, কোনও সম্প্রদায়কে হিদায়াত করার পর গোমরাহ করে দেবেন, যাবৎ না তাদের কাছে স্পষ্ট করে দেন যে, তারা কোন কোন বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে। ৯৯ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।

তাফসীরঃ

৯৯. অর্থাৎ কোনও মুশরিকের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা জায়েয নয়এ মর্মে যেহেতু এ পর্যন্ত সুস্পষ্ট কোনও নির্দেশ ছিল না, তাই এর আগে যারা কোনও মুশরিকের জন্য ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, তাদেরকে পাকড়াও করা হবে না।
১১৬

اِنَّ اللّٰہَ لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ یُحۡیٖ وَیُمِیۡتُ ؕ وَمَا لَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مِنۡ وَّلِیٍّ وَّلَا نَصِیۡرٍ ١١٦

ইন্নাল্লা-হা লাহূমুলকুছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদি ইউহয়ী ওয়া ইউমীতু ওয়া মা লাকুম মিন দূ নিল্লা-হি মিওঁ ওয়ালিইয়িওঁ ওয়ালা-নাসীর।

নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই অধিকারে। তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনও অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।
১১৭

لَقَدۡ تَّابَ اللّٰہُ عَلَی النَّبِیِّ وَالۡمُہٰجِرِیۡنَ وَالۡاَنۡصَارِ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُ فِیۡ سَاعَۃِ الۡعُسۡرَۃِ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا کَادَ یَزِیۡغُ قُلُوۡبُ فَرِیۡقٍ مِّنۡہُمۡ ثُمَّ تَابَ عَلَیۡہِمۡ ؕ  اِنَّہٗ بِہِمۡ رَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ ۙ ١١٧

লাকাততা-বাল্লা-হু ‘আলান্নাবিইয়ি ওয়াল মুহা-জিরীনা ওয়াল আনসা-রিল্লাযীনাত তাবা‘ঊহু ফী ছা-‘আতিল ‘উছরাতি মিম বা‘দি মা-কা-দা ইয়াঝীগু কুলূবুফারীকিম মিনহুম ছুম্মা তাবা ‘আলাইহিম ইন্নাহূবিহিমি রাঊফুর রাহীম।

নিশ্চয়ই আল্লাহ সদয় দৃষ্টি দিয়েছেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে থেকেছিল, ১০০ যখন তাদের একটি দলের অন্তর টলে যাওয়ার উপক্রম করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তাদের প্রতি সদয় হলেন। নিশ্চয়ই তিনি তাদের প্রতি মেহেরবান, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১০০. এতক্ষণ মুনাফিকদের নিন্দা এবং যে সকল মুসলিম অলসতার কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছিল, তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। এবার সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের প্রশংসা করা হচ্ছে, যারা চরম কঠিন পরিস্থিতিতেও হাসিমুখে তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যেও অধিকাংশ ছিলেন এমন, যাদের অন্তরে জিহাদের জযবা ও হুকুম পালনের আগ্রহ ছিল অদম্য, যে কারণে তারা সেই কঠিন পরিস্থিতিকে একদম আমলে নেননি। অবশ্য তাদের মধ্যে এমন কতিপয়ও ছিলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে প্রথম দিকে তাদের অন্তরে কিছুটা দোটানা ভাব দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। শেষ পর্যন্ত তারাও মন-প্রাণ দিয়ে অভিযানে শরীক হয়ে যান। এই দ্বিতীয় শ্রেণী সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যখন তাদের একটি দলের অন্তর টলে যাওয়ার উপক্রম করেছিল।’
১১৮

وَّعَلَی الثَّلٰثَۃِ الَّذِیۡنَ خُلِّفُوۡا ؕ  حَتّٰۤی اِذَا ضَاقَتۡ عَلَیۡہِمُ الۡاَرۡضُ بِمَا رَحُبَتۡ وَضَاقَتۡ عَلَیۡہِمۡ اَنۡفُسُہُمۡ وَظَنُّوۡۤا اَنۡ لَّا مَلۡجَاَ مِنَ اللّٰہِ اِلَّاۤ اِلَیۡہِ ؕ  ثُمَّ تَابَ عَلَیۡہِمۡ لِیَتُوۡبُوۡا ؕ  اِنَّ اللّٰہَ ہُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ٪ ١١٨

ওয়া ‘আলাছছালা-ছাতিল্লাযীনা খুলিলফূ হাত্তা-ইযা-দা-কাত ‘আলাইহিমুল আরদু বিমা-রাহুবাত ওয়াদা-কাত ‘আলাইহিম আনফুছুহুম ওয়া জান্নূআল্লা-মালজাআ মিনাল্লাহি ইল্লাইলাইহি ছু ম্মা তা-বা ‘আলাইহিম লিইয়াতূবূ ইন্নাল্লা-হু হুওয়াততাওওয়া-বুর রাহীম।

এবং সেই তিন জনের প্রতিও (আল্লাহ সদয় হলেন), যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত মূলতবি রাখা হয়েছিল। ১০১ যে পর্যন্ত না এ পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল, তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠল এবং তারা উপলব্ধি করল, আল্লাহর (ধরা) থেকে খোদ তাঁর আশ্রয় ছাড়া কোথাও আশ্রয় পাওয়া যাবে না, ১০২ পরে আল্লাহ তাদের প্রতি দয়াপরবশ হলেন, যাতে তারা তারই দিকে রুজু করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১০১. ১০৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল যে, এ তিনজন সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুকুম দিয়েছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনও নির্দেশ না আসে, ততক্ষণ মুসলিমগণ তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করে চলবে। ফলে দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন তাদেরকে এভাবে কাটাতে হয় যে, কোনও মুসলিম তাদের সঙ্গে কথা বলত না এবং অন্য কোনও রকমের যোগাযোগ ও লেনদেন করত না। তাদের অন্যতম হযরত কাব ইবনে মালিক (রাযি.) সেই সময়কার যে অবস্থা বর্ণনা করেছেন, সহীহ বুখারীর একটি দীর্ঘ রিওয়ায়াতে তা বিশদভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর সে বর্ণনা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। কী কিয়ামত যে তখন তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে তিনি তার চিত্র তুলে ধরেছেন, বস্তুত সে হাদীসটি তাদের ঈমানী চেতনা ও মানসিক অবস্থার অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও সালংকার বিবৃতি। সম্পূর্ণ হাদীসটি এখানে উদ্ধৃত করা কঠিন। অবশ্য মাআরিফুল কুরআনে তার বিশদ তরজমা উল্লেখ করা হয়েছে। আগ্রহী পাঠক সেখানে দেখে নিতে পারেন। এ আয়াতে তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি ইশারা করা হয়েছে।
১১৯

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَکُوۡنُوۡا مَعَ الصّٰدِقِیۡنَ ١١٩

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুত্তাকুল্লা-হা ওয়াকূনূমা‘আসসা-দিকীন।

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক। ১০৩

তাফসীরঃ

১০৩. সেই তিন মহাত্মার ঘটনা থেকে যা শিক্ষা লাভ হয়, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা নিজেদের দোষ গোপন করার লক্ষ্যে মুনাফিকদের মত মিথ্যা ছল-ছুতা খাড়া করেননি; বরং যা সত্য ছিল তাই অকপটে প্রকাশ করেছেন। বলে দিয়েছেন, তাদের কোনও ওজর ছিল না। তাদের এই সত্যবাদিতার বরকতে আল্লাহ তাআলা যে কেবল তাদের তাওবা কবুল করেছেন তাই নয়; বরং কুরআন মাজীদে সত্যবাদী মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে কিয়ামত পর্যন্ত তাদেরকে অমরত্ব দান করেছেন। এ আয়াতে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে, মানুষের উচিত এমন সত্যনিষ্ঠ লোকের সাহচর্য অবলম্বন করা, যারা মুখেও সত্য বলে এবং কাজেও সততার পরিচয় দেয়।
১২০

مَا کَانَ لِاَہۡلِ الۡمَدِیۡنَۃِ وَمَنۡ حَوۡلَہُمۡ مِّنَ الۡاَعۡرَابِ اَنۡ یَّتَخَلَّفُوۡا عَنۡ رَّسُوۡلِ اللّٰہِ وَلَا یَرۡغَبُوۡا بِاَنۡفُسِہِمۡ عَنۡ نَّفۡسِہٖ ؕ  ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ لَا یُصِیۡبُہُمۡ ظَمَاٌ وَّلَا نَصَبٌ وَّلَا مَخۡمَصَۃٌ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَلَا یَطَـُٔوۡنَ مَوۡطِئًا یَّغِیۡظُ الۡکُفَّارَ وَلَا یَنَالُوۡنَ مِنۡ عَدُوٍّ نَّیۡلًا اِلَّا کُتِبَ لَہُمۡ بِہٖ عَمَلٌ صَالِحٌ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ لَا یُضِیۡعُ اَجۡرَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ۙ ١٢۰

মা-কা-না লিআহলিল মাদীনাতি ওয়া মান হাওলাহুম মিনাল আ‘রা-বি আইঁ ইয়াতাখাল্লাফূ ‘আর রাছূলিল্লা-হি ওয়ালা-ইয়ারগাবূবিআনফুছিহিম ‘আন নাফছিহী যা-লিকা বিআন্নাহুম লা-ইউসীবুহুম জামাঊওঁ ওয়ালা-নাসাবুওঁ ওয়ালা-মাখমাসাতুন ফী ছাবীলিল্লাহি ওয়লা ইয়াতাঊনা মাওতিআইঁ ইয়াগিজুল কুফফারা ওয়ালা ইয়ানালূনা মিন ‘আদুবিন নাইলান ইল্লা কুতিবা লাহুম বিহী ‘আমালুন সা-লিহুন ইন্নাল্লা-হা লা-ইউদী‘উ আজারাল মহছিনীন।

মদীনাবাসী ও তাদের আশপাশের দেহাতীদের পক্ষে এটা জায়েয ছিল না যে, তারা আল্লাহর রাসূলের (অনুগামী হওয়া) থেকে পিছিয়ে থাকবে এবং এটাও জায়েয ছিল না যে, তারা নিজেদের জীবনকে প্রিয় মনে করে তার (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) জীবন সম্পর্কে চিন্তামুক্ত হয়ে বসে থাকবে। এটা এ কারণে যে, আল্লাহর পথে তাদের (অর্থাৎ মুজাহিদদের) যে পিপাসা, ক্লান্তি ও ক্ষুধার কষ্ট দেখা দেয় অথবা তারা কাফেরদের ক্রোধ সঞ্চার করে এমন যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে তারা যে সফলতা অর্জন করে, তাতে তাদের জন্য (তাদের আমলনামায়) অবশ্যই সৎকর্ম লেখা হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।
১২১

وَلَا یُنۡفِقُوۡنَ نَفَقَۃً صَغِیۡرَۃً وَّلَا کَبِیۡرَۃً وَّلَا یَقۡطَعُوۡنَ وَادِیًا اِلَّا کُتِبَ لَہُمۡ لِیَجۡزِیَہُمُ اللّٰہُ اَحۡسَنَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ١٢١

ওয়ালা-ইউনফিকূ না নাফাকাতান সাগীরাতাওঁ ওয়ালা- কাবীরাতাওঁ ওয়ালা- ইয়াকতা‘ঊনা ওয়া-দিয়ান ইল্লা-কুতিবা লাহুম লিইয়াজঝিয়াহুমুল্লা-হু আহছানা মা-কা-নূইয়া‘মালূন।

তাছাড়া তারা (আল্লাহর পথে) যা কিছু ব্যয় করে, সে ব্যয় অল্প হোক বা বেশি এবং তারা যে-কোন উপত্যকাই অতিক্রম করে, তা সবই (তাদের আমলনামায় পুণ্য হিসেবে) লেখা হয়, যাতে আল্লাহ তাদেরকে (এরূপ প্রতিটি আমলের বিনিময়ে) এমন প্রতিদান দিতে পারেন, যা তাদের উৎকৃষ্ট আমলের জন্য নির্ধারিত আছে। ১০৪

তাফসীরঃ

১০৪. অর্থাৎ মুজাহিদদের এসব কাজের মধ্যে কোনও কোনওটি তুচ্ছ মনে হলেও সওয়াব দেওয়া হবে তাদের উৎকৃষ্ট কাজের অনুরূপ। (প্রকাশ থাকে যে, কুরআন মাজীদে احسن শব্দটিকে আমলের বিশেষণরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ কেউ একে ‘জাযা’ বা প্রতিদানের বিশেষণও সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু আল্লামা আবু হায়্যান ‘আল-বাহরুল মুহীত’ গ্রন্থে ব্যাকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে এর উপর যে আপত্তি তুলেছেন তার কোন সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। আল্লামা আলুসী (রহ.)-ও আপত্তিটি উল্লেখ করে তার সমর্থনই করেছেন। সুতরাং এ স্থলে আয়াতটির তরজমা মাদারিকুত তানযীলে বর্ণিত তাফসীর অনুসারেই করা হয়েছে।
১২২

وَمَا کَانَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لِیَنۡفِرُوۡا کَآفَّۃً ؕ  فَلَوۡلَا نَفَرَ مِنۡ کُلِّ فِرۡقَۃٍ مِّنۡہُمۡ طَآئِفَۃٌ لِّیَتَفَقَّہُوۡا فِی الدِّیۡنِ وَلِیُنۡذِرُوۡا قَوۡمَہُمۡ اِذَا رَجَعُوۡۤا اِلَیۡہِمۡ لَعَلَّہُمۡ یَحۡذَرُوۡنَ ٪ ١٢٢

ওয়ামা-কা-নাল মু’মিনূনা লিইয়ানফিরু কাফফাতান ফালাওলা-নাফারা মিন কুল্লি ফিরকাতিম মিনহুম তাইফাতুল লিইয়াতাফাক্কাহূফিদদীনি ওয়ালিইউনযিরূ কাওমাহুম ইযা-রাজা‘উইলাইহিম লা‘আল্লাহুম ইয়াহযারূন।

মুসলিমদের পক্ষে এটাও সমীচীন নয় যে, তারা (সর্বদা) সকলে এক সঙ্গে (জিহাদে) বের হয়ে যাবে। ১০৫ সুতরাং তাদের প্রতিটি বড় দল থেকে একটি অংশ কেন (জিহাদে) বের হয় না, যাতে (যারা জিহাদে যায়নি) তারা দীনের উপলব্ধি অর্জনের চেষ্টা করে এবং সতর্ক করে তাদের কওম (-এর সেই সব লোক)কে, লোককে (যারা জিহাদে গিয়েছে,) যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে, ১০৬ ফলে তারা (গুনাহ থেকে) সতর্ক থাকবে।

তাফসীরঃ

১০৫. অর্থাৎ তারা যেসব বিধান শিখেছে, মুজাহিদদেরকে তা অবহিত করবে, যেমন এই কাজ ওয়াজিব, ওই কাজ গুনাহ ইত্যাদি।
১২৩

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قَاتِلُوا الَّذِیۡنَ یَلُوۡنَکُمۡ مِّنَ الۡکُفَّارِ وَلۡیَجِدُوۡا فِیۡکُمۡ غِلۡظَۃً ؕ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ مَعَ الۡمُتَّقِیۡنَ ١٢٣

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূকা-তিলুল্লাযীনা ইয়ালূনাকুম মিনাল কুফফা-রি ওয়াল ইয়াজিদূফীকুম গিলজাতাওঁ ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা মা‘আল মুত্তাকীন।

হে মুমিনগণ! কাফেরদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। ১০৭ তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা দেখতে পায়। ১০৮ জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।

তাফসীরঃ

১০৭. অর্থাৎ আত্মীয়তার কারণে তোমাদের অন্তরে তাদের প্রতি যেন এমন নমনীয় ভাব সৃষ্টি না হয়, যা জিহাদের দায়িত্ব পালনে অন্তরায় হতে পারে। এমনিভাবে তারা যেন তোমাদের ভেতর কোনওরূপ দুর্বলতা দেখতে না পায়; বরং তোমরা যে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সেটাই যেন উপলব্ধি করে।
১২৪

وَاِذَا مَاۤ اُنۡزِلَتۡ سُوۡرَۃٌ فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّقُوۡلُ اَیُّکُمۡ زَادَتۡہُ ہٰذِہٖۤ اِیۡمَانًا ۚ فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فَزَادَتۡہُمۡ اِیۡمَانًا وَّہُمۡ یَسۡتَبۡشِرُوۡنَ ١٢٤

ওয়া ইযা-মা উনঝিলাত ছূরাতুন ফামিনহুম মাইঁ ইয়াকূলুআইয়ুকুম ঝা-দাতহু হা-যিহী ঈমানান ফাআম্মাল্লাযীনা আ-মানূফাঝা-দাতহুম ঈমা-নাওঁ ওয়াহুম ইয়াছতাবশিরূন।

যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) কেউ কেউ বলে, এ সূরাটি তোমাদের মধ্যে কার কার ঈমান বৃদ্ধি করেছে? ১০৯ যারা (সত্যিকারের) ঈমান এনেছে, এ সূরা বাস্তবিকই তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা (এতে) আনন্দিত হয়।

তাফসীরঃ

১০৯. এ কথা বলে মুনাফিকরা সূরা আনফালে বর্ণিত একটা কথাকে ব্যঙ্গ করত। তাতে বলা হয়েছিল, মুমিনদের সামনে যখন কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় (৮ : ২)। (তারা বলত, এতে তোমাদের কার ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে? এটা বলত কুরআনকে অবজ্ঞা করে। যেন বলতে চাইত, এতে এমন কি বস্তু আছে, যা বিশ্বাস করতে হবে এবং এটা এমন কি প্রমাণ সরবরাহ করে, যে কারণে ঈমান বৃদ্ধি পাবে? -অনুবাদক)
১২৫

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ مَّرَضٌ فَزَادَتۡہُمۡ رِجۡسًا اِلٰی رِجۡسِہِمۡ وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کٰفِرُوۡنَ ١٢٥

ওয়াআম্মাল্লাযীনা ফী কুলূবিহিম মারাদুন ফাঝা-দাতহুম রিজছান ইলা-রিজছিহিম ওয়ামা-তূ ওয়াহুম কা-ফিরূন।

আর যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, এ সূরা তাদের কলুষের সাথে আরও কলুষ যুক্ত করে ১১০ এবং তাদের মৃত্যুও ঘটে কাফের অবস্থায়

তাফসীরঃ

১১০. অর্থাৎ কুফর ও মুনাফিকীর কলুষ-কালিমা তো আগেই তাদের মধ্যে ছিল। এবার নতুন আয়াতকে অস্বীকার ও বিদ্রূপ করার ফলে সেই কলুষে মাত্রা যোগ হল।
১২৬

اَوَلَا یَرَوۡنَ اَنَّہُمۡ یُفۡتَنُوۡنَ فِیۡ کُلِّ عَامٍ مَّرَّۃً اَوۡ مَرَّتَیۡنِ ثُمَّ لَا یَتُوۡبُوۡنَ وَلَا ہُمۡ یَذَّکَّرُوۡنَ ١٢٦

আওয়ালা-ইয়ারাওনা আন্নাহুম ইউফতানূনা ফী কুল্লি ‘আমিম মাররাতান আও মাররাতাইনি ছু ম্মা লা-ইয়াতূবূনা ওয়ালা-হুম ইয়াযযাক্কারূন।

তারা কি লক্ষ্য করে না, প্রতি বছর তারা দু’-একবার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়? ১১১ তথাপি তারা তাওবা করে না এবং তারা উপদেশও গ্রহণ করে না।

তাফসীরঃ

১১১. মুনাফিকদের উপর প্রতি বছরই কোনও না কোনও বিপদ আসত। কখনও তাদের আকাঙ্ক্ষা ও পরিকল্পনার বিপরীতে মুসলিমদের বিজয় অর্জিত হত, কখনও তাদের নিজেদের কোনও গোমর ফাঁস হয়ে যেত, কখনও রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হত এবং কখনও অভাব-অনটনের শিকার হত। আল্লাহ তাআলা বলেন, এসব বিপদই তাদেরকে সতর্ক করার জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনও কিছু থেকেই তারা শিক্ষা নেয় না।
১২৭

وَاِذَا مَاۤ اُنۡزِلَتۡ سُوۡرَۃٌ نَّظَرَ بَعۡضُہُمۡ اِلٰی بَعۡضٍ ؕ ہَلۡ یَرٰىکُمۡ مِّنۡ اَحَدٍ ثُمَّ انۡصَرَفُوۡا ؕ صَرَفَ اللّٰہُ قُلُوۡبَہُمۡ بِاَنَّہُمۡ قَوۡمٌ لَّا یَفۡقَہُوۡنَ ١٢٧

ওয়া ইযা-মাউনঝিলাত ছূরাতুন নাজারা বা‘দুহুম ইলা-বা‘দিন হাল ইয়ারা-কুম মিন আহাদিন ছু ম্মান সারাফূ সারাফাল্লা-হু কুলূবাহুম বিআন্নাহুম কাওমুল লা-ইয়াফকাহূন।

এবং যখনই কোনও সূরা নাযিল হয়, তখন তারা একে অন্যের দিকে তাকায় (এবং ইশারায় একে অন্যকে বলে), তোমাদেরকে কেউ দেখছে না তো? তারপর তারা (সেখান থেকে) সটকে পড়ে। ১১২ আল্লাহ তাদের অন্তর ঘুরিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু তারা অনুধাবন করে না।

তাফসীরঃ

১১২. আসল কথা, আল্লাহ তাআলার কালামের প্রতি তাদের ছিল চরম বিদ্বেষ। তাই তাদের কামনা ও চেষ্টা থাকত, যাতে কখনও তা শোনার অবকাশ না আসে। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মজলিসে যখন নতুন কোন সূরা তিলাওয়াত করতেন, তখন তারা পালানোর চেষ্টা করত। কিন্তু সকলের সম্মুখ দিয়ে উঠে গেলে পাছে তাদের গোমর ফাঁস হয়ে যায়, তাই একে অন্যকে চোখের ইশারায় বলত, এমন কোনও সুযোগ খোঁজ, যখন কোনও মুসলিম তোমাদেরকে দেখছে না আর সেই অবকাশে চুপিসারে উঠে যাও।
১২৮

لَقَدۡ جَآءَکُمۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ عَزِیۡزٌ عَلَیۡہِ مَا عَنِتُّمۡ حَرِیۡصٌ عَلَیۡکُمۡ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ رَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ ١٢٨

লাকাদ জাআকুমরাছূলুমমিনআনফুছিকুম ‘আঝীঝুন‘আলাইহিমা-‘আনিত্তুম হারীসুন ‘আলাইকুম বিল মু’মিনীন রাঊফুর রাহীম।

(হে মানুষ!) তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। তোমাদের যে-কোনও কষ্ট তার জন্য অতি পীড়াদায়ক। সে সতত তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত সদয়, পরম দয়ালু।
১২৯

فَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَقُلۡ حَسۡبِیَ اللّٰہُ ۫٭ۖ  لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ  عَلَیۡہِ تَوَکَّلۡتُ وَہُوَ رَبُّ الۡعَرۡشِ الۡعَظِیۡمِ ٪ ١٢٩

ফাইন তাওয়াল্লাও ফাকুল হাছবিয়াল্লা-হু লাইলা-হুওয়া ‘আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া হুওয়া রাব্বুল ‘আরশিল ‘আজীম।

তারপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে (হে রাসূল! তাদেরকে) বলে দাও, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তারই উপর আমি ভরসা করেছি এবং তিনি মহা আরশের মালিক।