সূরা
পারা

Loading verses...

অন্যান্য

অনুবাদ
তেলাওয়াত

সূরা আল বাকারা (البقرة) | বকনা-বাছুর

মাদানী

মোট আয়াতঃ ২৮৬

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

الٓـمّٓ ۚ ١

আলিফ লামমীম।

আলিফ-লাম-মীম

তাফসীরঃ

১. বিভিন্ন সূরার শুরুতে এ রকমের হরফ এভাবেই পৃথক-পৃথকরূপে নাযিল হয়েছিল। এগুলোকে আল-হুরূফুল মুকাত্তাআত (বিচ্ছিন্ন হরফসমূহ) বলে। এগুলোর অর্থ ও মর্ম সম্পর্কে সঠিক কথা এই যে, তা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কারও জানা নেই। এটা আল্লাহ তাআলার কিতাবের এক নিগূঢ় রহস্য। এ নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের কোনও প্রয়োজন নেই। কেননা এর অর্থ বোঝার উপর আকীদা ও আমলের কোনও মাসআলা নির্ভরশীল নয়।

ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ  فِیۡہِ ۚۛ  ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ ٢

যা-লিকাল কিতা-বুলা-রাইবা ফীহি হুদাল লিলমুত্তাকীন।

এটি এমন কিতাব, যার মধ্যে কোনও সন্দেহ নেই। এটা হিদায়াত এমন ভীতি অবলম্বনকারীদের জন্য

তাফসীরঃ

২. অর্থাৎ এ কিতাবের প্রতিটি কথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য। মানব-রচিত কোনও গ্রন্থকে শত ভাগ সন্দেহমুক্ত বলে বিশ্বাস করা যায় না। কেননা মানুষ যত বড় জ্ঞানীই হোক তার জ্ঞানের একটা সীমা আছে। তাছাড়া তার রচনার ভিত্তি হয় তার ব্যক্তিগত ধারণা-ভাবনার উপর। কিন্তু এ কুরআন যেহেতু আল্লাহ তাআলার কিতাব, যার জ্ঞান সীমাহীন এবং শত ভাগ সন্দেহাতীত, তাই এতে কোনও রকম সংশয়-সন্দেহের অবকাশ নেই। যদি কারও মনে সন্দেহ দেখা দেয়, তবে তা তার বুঝের কমতির কারণেই দেখা দেবে, না হয় এ কিতাবের কোনও বিষয় সন্দেহপূর্ণ নয় আদৌ।

الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡغَیۡبِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۙ ٣

আল্লাযীনা ইউ’মিনূনা বিলগাইবি ওয়াইউকীমূনাসসালা-তা ওয়া মিম্মা-রাঝাকনা-হুমইউনফিকূ ন।

যারা অদৃশ্য জিনিসসমূহে ঈমান রাখে এবং সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা-কিছু দিয়েছি, তা থেকে (আল্লাহর সন্তোষজনক কাজে) ব্যয় করে।

তাফসীরঃ

৪. যে সকল লোক কুরআন মাজীদের হিদায়াত ও পথ-নির্দেশ দ্বারা উপকৃত হয়, এ স্থলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম গুণ তো এই যে, তারা গায়ব তথা অদৃশ্য বিষয়াবলীর উপর ঈমান রাখে, যার ব্যাখ্যা উপরে দেওয়া হয়েছে। ঈমান সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ই এর অন্তর্ভুক্ত। এর সারমর্ম হল- আল্লাহ তাআলা যা-কিছু কুরআন মাজীদে বর্ণনা করেছেন কিংবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে ইরশাদ করেছেন সে সবের প্রতি তারা ঈমান ও বিশ্বাস রাখে। দ্বিতীয় জিনিস বলা হয়েছে তারা সালাত কায়েম করে। কায়িক ইবাদতের মধ্যে এটা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় বিষয় হল নিজের অর্থ-সম্পদ থেকে আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় করা। যাকাত-সদকা সবই এর অন্তর্ভুক্ত। এটা আর্থিক ইবাদত।

وَالَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ وَمَاۤ اُنۡزِلَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ  وَبِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ یُوۡقِنُوۡنَ ؕ ٤

ওয়াল্লাযীনা ইউ’মিনূনা বিমাউনঝিলা ইলাইকা ওয়ামাদ উনঝিলা মিন কাবলিকা ওয়াবিল আ-খিরাতি হুম ইউকিনূন।

এবং যারা ঈমান রাখে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং তারা আখিরাতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখে।

তাফসীরঃ

৫. অর্থাৎ তারা বিশ্বাস রাখে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি যে ওহী অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে সত্য এবং তাঁর পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম- হযরত মূসা (আ.) হযরত ঈসা (আ.) প্রমুখের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তাও সত্য ছিল, যদিও পরবর্তীকালের লোকেরা তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেনি, বরং তাতে নানা রকম রদ-বদল ও বিকৃতি সাধন করেছে। এ আয়াতে সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ওহী নাযিলের ক্রমধারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে শেষ হয়ে গেছে। তাঁর পর এমন কোনও ব্যক্তির জন্ম হবে না, যার প্রতি ওহী নাযিল হবে কিংবা যাকে নবী বানানো হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা এ স্থলে কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নাযিলকৃত ওহী এবং তাঁর পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের প্রতি অবতীর্ণ ওহীর কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর পরের কোনও ওহীর কথা উল্লেখ করেননি। যদি তাঁর পরেও নতুন নবী আসার সম্ভাবনা থাকত, যার ওহীর প্রতি ঈমান আনা আবশ্যিক, তবে এ স্থলে তার কথাও উল্লেখ করা হত, যেমন পূর্ববর্তী নবীগণের থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল যে, আপনাদের পর যে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভাগমন হবে, আপনাদের কিন্তু তাঁর প্রতিও ঈমান আনতে হবে (আল-ইমরান ৩ : ৮১ আয়াত)।

اُولٰٓئِکَ عَلٰی ہُدًی مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ٭ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ٥

উলাইকা ‘আলা-হুদাম মিররাব্বিহিম ওয়া উলাইকা হুমুল মুফলিহূন।

এরাই এমন লোক, যারা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সঠিক পথের উপর আছে এবং এরাই এমন লোক, যারা সফলতা লাভকারী।

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ٦

ইন্নাল্লাযীনা কাফারূ ছাওয়াউন‘আলাইহিম আআনযারতাহুম আম লাম তুনযিরহুম লাইউ’মিনূন।

নিশ্চয়ই যে সকল লোক কুফর অবলম্বন করেছে, তাদেরকে আপনি ভয় দেখান বা নাই দেখান উভয়টাই তাদের পক্ষে সমান। তারা ঈমান আনবে না।

তাফসীরঃ

৭. একদল কাফের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নিয়েছিল যে, যত স্পষ্ট দলীল ও উজ্জ্বল নিদর্শনই তাদের সামনে উপস্থিত করা হোক, তারা কখনোই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতে ঈমান আনবে না। এখানে সেই কাফেরদের কথাই বলা হচ্ছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, এরা হচ্ছে সেই সব লোক, যারা কুফরের উপর গোঁ ধরে বসে আছে। সেই ভাব ব্যক্ত করার লক্ষ্যেই তরজমায় ‘কুফর অবলম্বন করেছে’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

خَتَمَ اللّٰہُ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ وَعَلٰی سَمۡعِہِمۡ ؕ  وَعَلٰۤی اَبۡصَارِہِمۡ غِشَاوَۃٌ ۫  وَّلَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ٪ ٧

খাতামাল্লা-হু ‘আলা- কুলূবিহিম ওয়া ‘আলা-ছাম‘ইহিমওয়া‘আলাদ আবসা-রিহিম গিশা-ওয়াতুও ওয়ালাহুম ‘আযা-বুন ‘আজীম।

আল্লাহ তাদের অন্তরে ও তাদের কানে মোহর করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখের উপর পর্দা পড়ে আছে এবং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি।

তাফসীরঃ

৯. এ আয়াতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, জিদ ও হঠকারিতা অত্যন্ত বিপজ্জনক জিনিস। কোনও ব্যক্তি যদি ভুলে, অসাবধানতায় বা এ রকম কোনও কারণে কোনও গলত কাজ করে, তবে তার সংশোধনের আশা থাকে, কিন্তু যে ব্যক্তি কোনও ভুল কাজে জিদ ধরে এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে, কোনও অবস্থাতেই সে তা ছাড়বে না ও সঠিকটা গ্রহণ করবে না, তবে তার সে জিদের পরিণতিতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তার অন্তরে মোহর করে দেওয়া হয়। ফলে তার সত্য কবুলের যোগ্যতাই খতম হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ অবস্থা থেকে রক্ষা করুন। এই ধারণা করার কোনও সুযোগ নেই যে, আল্লাহ তাআলা স্বয়ং যখন তার অন্তরে মোহর করে দিয়েছেন তখন তো সে মাযূর ও অপারগ। কেননা এ মোহর করাটা স্বয়ং তার জিদেরই পরিণতি এবং সত্য না মানার যে সিদ্ধান্ত সে করে নিয়েছে তারই ফল।

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّقُوۡلُ اٰمَنَّا بِاللّٰہِ وَبِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَمَا ہُمۡ بِمُؤۡمِنِیۡنَ ۘ ٨

ওয়া মিনান্না-ছি মাইঁ ইয়াকূলু আ-মান্না- বিল্লা-হি ওয়া বিলইয়াওমিল আ-খিরি ওয়ামা-হুম বিমু’মিনীন।

কিছু লোক এমন আছে, যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান এনেছি, অথচ (প্রকৃতপক্ষে) তারা মুমিন নয়। ১০

তাফসীরঃ

১০. সূরার শুরুতে পাঁচটি আয়াতে মুমিনদের গুণাবলী ও তাদের শুভ পরিণামের কথা বর্ণিত হয়েছে। তারপর দুই আয়াতে যারা প্রকাশ্য কাফের তাদের সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। এবার এখান থেকে তৃতীয় একটি শ্রেণীর অবস্থা তুলে ধরা হচ্ছে, যাদেরকে ‘মুনাফিক’ বলা হয়। এরা প্রকাশ্যে তো নিজেদেরকে ‘মুসলিম’ বলে দাবী করত, কিন্তু আন্তরিকভাবে তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। ২০ নং আয়াত পর্যন্ত দীর্ঘ তেরটি আয়াতের আলোচনা কেবল তাদেরই সম্পর্কে।

یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰہَ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۚ  وَمَا یَخۡدَعُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡفُسَہُمۡ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ ؕ ٩

ইউখা-দি‘ঊনাল্লা-হা ওয়াল্লাযীনা আ-মানূ ওয়ামা- ইয়াখদা‘ঊনা ইল্লাআনফুছাহুম ওয়ামাইয়াশ‘উরূন।

তারা আল্লাহকে এবং যারা (বাস্তবিক) ঈমান এনেছে তাদেরকে ধোঁকা দেয় এবং (সত্য কথা এই যে,) তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। কিন্তু (এ বিষয়ের) কোনও উপলব্ধি তাদের নেই। ১১

তাফসীরঃ

১১. অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তারা আল্লাহ ও মুসলিমদেরকে ধোঁকা দিতে চায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেরা নিজেদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে। কেননা এ ধোঁকার পরিণাম তাদের নিজেদের পক্ষেই অশুভ হবে। তারা মনে করছে, নিজেদেরকে মুসলিমরূপে পরিচয় দিয়ে তারা কুফরের পার্থিব পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে, অথচ আখিরাতে তাদের যে আযাব হবে তা দুনিয়ার আযাব অপেক্ষা কঠিনতর।
১০

فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ مَّرَضٌ ۙ فَزَادَہُمُ اللّٰہُ مَرَضًا ۚ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ ۬ۙ بِمَا کَانُوۡا یَکۡذِبُوۡنَ ١۰

ফী কুলূবিহিম মারাদুন ফাঝা-দাহুমুল্লা-হু মারাদাওূঁ ওয়ালাহুম ‘আযা-বুন আলীমুম বিমা- কা-নূ ইয়াকযিবূন।

তাদের অন্তরে আছে রোগ। আল্লাহ তাদের রোগ আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। ১২ আর তাদের জন্য যন্ত্রণাময় শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে, যেহেতু তারা মিথ্যা বলত।

তাফসীরঃ

১২. পূর্বে ৭নং আয়াতে যা বলা হয়েছিল, এটাও সে রকমেরই কথা। অর্থাৎ প্রথম দিকে এ পথভ্রষ্টতাকে তারা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে নিয়েছিল এবং তাতে স্থিরসংকল্প হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল তাদের অন্তরের একটা ব্যাধি। অতঃপর তাদের জেদের পরিণামে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাধি আরও বৃদ্ধি করে দেন। ফলে বাস্তবিকভাবে তাদের ঈমান আনার তাওফীক হবে না।
১১

وَاِذَا قِیۡلَ لَہُمۡ لَا تُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ ۙ قَالُوۡۤا اِنَّمَا نَحۡنُ مُصۡلِحُوۡنَ ١١

ওয়া ইযা- কীলা লাহুম লা-তুফছিদূফিল আরদিকা-লইন্নামা- নাহনুমুসলিহূন।

যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, ১৩ তারা বলে, আমরা তো শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী। ১৪

তাফসীরঃ

১৩. অর্থাৎ কুফর করো না, আল্লাহর পথে বাধা দিও না এবং তাঁর অবাধ্যতা করো না। বস্তুত আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচার করাই প্রকৃত ফাসাদ। (-অনুবাদক)
১২

اَلَاۤ اِنَّہُمۡ ہُمُ الۡمُفۡسِدُوۡنَ وَلٰکِنۡ لَّا یَشۡعُرُوۡنَ ١٢

আলাইন্নাহুম হুমুল মুফছিদূনা ওয়ালা- কিল্লা- ইয়াশ‘উরূন।

মনে রেখ, এরাই ফাসাদকারী, কিন্তু এর উপলব্ধি তাদের নেই।
১৩

وَاِذَا قِیۡلَ لَہُمۡ اٰمِنُوۡا کَمَاۤ اٰمَنَ النَّاسُ قَالُوۡۤا اَنُؤۡمِنُ کَمَاۤ اٰمَنَ السُّفَہَآءُ ؕ اَلَاۤ اِنَّہُمۡ ہُمُ السُّفَہَآءُ وَلٰکِنۡ لَّا یَعۡلَمُوۡنَ ١٣

ওয়া ইযা-কীলা লাহুম আ-মিনূকামাআ-মানান্না-ছুকা-লআনু’মিনু কামাআমানাছছুফাহাউ ‘আলাইন্নাহুম হুমুছছুফাহাউ ওয়ালা-কিল্লা-ইয়া‘লামূন।

যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরাও সেই রকম ঈমান আন, যেমন অন্য লোকে ঈমান এনেছে। তখন তারা বলে, আমরাও কি সেই রকম ঈমান আনব, যে রকম ঈমান এনেছে নির্বোধ লোকেরা? জেনে রেখ, এরাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না।
১৪

وَاِذَا لَقُوا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قَالُوۡۤا اٰمَنَّا ۚۖ وَاِذَا خَلَوۡا اِلٰی شَیٰطِیۡنِہِمۡ ۙ قَالُوۡۤا اِنَّا مَعَکُمۡ ۙ اِنَّمَا نَحۡنُ مُسۡتَہۡزِءُوۡنَ ١٤

ওয়াইযা- লাকুল্লাযীনা আ-মানূকা-লআ-মান্না-ওয়াইযা- খালাও ইলা-শাইয়াতীনিহিম কা-লূইন্না- মা‘আকুম ইন্নামা নাহনুমুছতাহঝিউন।

যারা ঈমান এনেছে, তাদের সাথে যখন এরা মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি আর যখন নিজেদের শয়তানদের ১৫ সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তোমাদেরই সঙ্গে আছি। আমরা তো কেবল তামাশা করছিলাম।

তাফসীরঃ

১৫. ‘নিজেদের শয়তান’ দ্বারা সেই সকল নেতৃবর্গকে বোঝানো হয়েছে, যারা মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে তাদের প্রধান ও পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা রাখত। (শয়তান শব্দের ধাতুগত অর্থ সত্য ও উত্তম পথ পরিহারকারী। মুনাফিকদের নেতৃবর্গ যেহেতু আন্তরিকভাবে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল তাই আয়াতে তাদেরকে শয়তান বলা হয়েছে। -অনুবাদক)
১৫

اَللّٰہُ یَسۡتَہۡزِئُ بِہِمۡ وَیَمُدُّہُمۡ فِیۡ طُغۡیَانِہِمۡ یَعۡمَہُوۡنَ ١٥

আল্লা-হু ইয়াছতাহঝিউ বিহিম ওয়া ইয়ামুদ্দুহুম ফী তুগইয়া-নিহিম ইয়া‘মাহূন।

আল্লাহ তাদের সাথে তামাশা (-এর আচরণ) করেন এবং তাদেরকে ঢিল দেন, যাতে তারা তাদের অবাধ্যতায় ঘুরপাক খেতে থাকে। ১৬

তাফসীরঃ

১৬. অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের রশি ঢিল করে দিয়েছেন, যদ্দরুণ দুনিয়ায় তারা তাদের ফেরেববাজীর তাৎক্ষণিক শাস্তির সম্মুখীন হচ্ছে না। এ কারণে তারা মনে করছে তাদের কৌশল সফল হয়েছে। ফলে নিজেদের গোমরাহীতে তারা দিন-দিন পাকাপোক্ত হচ্ছে। আসলে তাদেরকে এভাবে পাকাপোক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। পাকড়াও তাদেরকে একবারেই করা হবে এবং সেটা আখিরাতে। আল্লাহ তাআলার এ আচরণ যেহেতু তাদের তামাশারই পরিণাম, তাই বিষয়টিকে ‘আল্লাহ তাদের সাথে তামাশা করেন’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে।
১৬

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ اشۡتَرَوُا الضَّلٰلَۃَ بِالۡہُدٰی ۪ فَمَا رَبِحَتۡ تِّجَارَتُہُمۡ وَمَا کَانُوۡا مُہۡتَدِیۡنَ ١٦

উলাইকাল্লাযীনাশ তারাউদ্দালা-লাতা বিলহুদা-ফামা-রাবিহাত্তিজা-রাতুহুম ওয়ামা কা-নূমুহতাদীন।

এরাই তারা, যারা হিদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহী ক্রয় করেছে। ফলে তাদের ব্যবসায়ে লাভ হয়নি এবং তারা সঠিক পথও পায়নি।
১৭

مَثَلُہُمۡ کَمَثَلِ الَّذِی اسۡتَوۡقَدَ نَارًا ۚ فَلَمَّاۤ اَضَآءَتۡ مَا حَوۡلَہٗ ذَہَبَ اللّٰہُ بِنُوۡرِہِمۡ وَتَرَکَہُمۡ فِیۡ ظُلُمٰتٍ لَّا یُبۡصِرُوۡنَ ١٧

মাছালুহুম কামাছালিল্লাযীছতাওকাদা না-রান ফালাম্মাআদাআত মা-হাওলাহূ যাহাবাল্লা-হু বিনূরিহিম ওয়া তারাকাহুম ফী জুলুমা-তিল লা-ইউবসিরূন।

তাদের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মত, যে আগুন জ্বালালো, ১৭ তারপর যখন সেই আগুন তার আশপাশ আলোকিত করে তুলল, তখন আল্লাহ তাদের আলো কেড়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারের মধ্যে এ অবস্থায় ছেড়ে দিলেন যে, তারা কিছুই দেখতে পায় না।

তাফসীরঃ

১৭. এখান থেকে মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে। ইসলামের সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ সামনে আসা সত্ত্বেও মুনাফিকগণ নিফাক ও কপটতার গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল। আয়াতে ইসলামের সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণকে আগুনের আলোর সাথে তুলনা করা হয়েছে। আগুনের আলোতে যেমন আশপাশের সবকিছু পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, তেমনি ইসলামের দলীল-প্রমাণ দ্বারা তাদের সামনে সত্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তথাপি তারা জিদ ও একগুঁয়েমি করে যেতে থাকে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে সে আলো কেড়ে নেন, যদ্দরুণ তারা দেখার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
১৮

صُمٌّۢ بُکۡمٌ عُمۡیٌ فَہُمۡ لَا یَرۡجِعُوۡنَ ۙ ١٨

সুম্মুম বুকমুন ‘উমইয়ুন ফাহুম লা-ইয়ারজি‘ঊন।

তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরে আসবে না।
১৯

اَوۡ کَصَیِّبٍ مِّنَ السَّمَآءِ فِیۡہِ ظُلُمٰتٌ وَّرَعۡدٌ وَّبَرۡقٌ ۚ یَجۡعَلُوۡنَ اَصَابِعَہُمۡ فِیۡۤ اٰذَانِہِمۡ مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الۡمَوۡتِ ؕ وَاللّٰہُ مُحِیۡطٌۢ بِالۡکٰفِرِیۡنَ ١٩

আও কাসাইয়িবিম মিনাছছামাই ফীহি জুলুমা-তুওঁ ওয়া রা‘দুওঁ ওয়া বারকুইঁ ইয়াজ‘আলূনা আসা-বি‘আহুম ফীআ-যা-নিহিম মিনাসসাওয়া-‘ইকিহাযারাল মাওতি ওয়াল্লা-হু মুহীতূম বিলকা-ফিরীন।

অথবা (ওই মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত এ রকম) ১৮ যেমন আকাশ থেকে বর্ষ্যমান বৃষ্টি, যার মধ্যে আছে অন্ধকার, বজ্র ও বিজলী। তারা বজ্রধ্বনির কারণে মৃত্যুভয়ে নিজেদের কানে আঙ্গুল দেয় এবং আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে ঘেরাও করে রেখেছেন। ১৯

তাফসীরঃ

১৮. প্রথম দৃষ্টান্তটি ছিল সেই সকল মুনাফিকের, যারা ইসলামের সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ সামনে আসা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ বুঝে শুনেই কুফর ও নিফাকের পথ অবলম্বন করেছিল। এবার মুনাফিকদের আরেক শ্রেণীর দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে। এরা ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে দোদুল্যমানতার শিকার ছিল। যখন ইসলামের সত্যতা সম্পর্কিত দলীল-প্রমাণ সামনে আসত তখন তাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হত এবং তখন তারা ইসলামের দিকে অগ্রসর হত। কিন্তু যখন ইসলামী আহকামের দায়িত্ব-কর্তব্য ও হালাল-হারামের বিষয়সমূহ সামনে আসত, তখন নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থের কারণে তারা থেমে যেত। এখানে ইসলামকে এক বর্ষ্যমান বৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আর কুফর ও শিরকের অনিষ্ট ও মন্দত্বের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তাকে অন্ধকারের সাথে এবং কুফর ও শিরকের কারণে যে শাস্তির ধমক দেওয়া হয়েছে, তাকে বজ্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তাছাড়া কুরআন মাজীদে সত্যের যে দলীল-প্রমাণ এবং সত্যের অনুসারীদের জন্য জান্নাতের নিয়ামতরাজির যে সুসংবাদ শোনানো হয়েছে তাকে বিজলীর আলোর সাথে উপমিত করা হয়েছে। যখন এ আলো তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তখন তারা হাঁটা শুরু করে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যখন কু-প্রবৃত্তির অন্ধকার তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে তখন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।
২০

یَکَادُ الۡبَرۡقُ یَخۡطَفُ اَبۡصَارَہُمۡ ؕ  کُلَّمَاۤ اَضَآءَ لَہُمۡ مَّشَوۡا فِیۡہِ ٭ۙ  وَاِذَاۤ اَظۡلَمَ عَلَیۡہِمۡ قَامُوۡا ؕ  وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَذَہَبَ بِسَمۡعِہِمۡ وَاَبۡصَارِہِمۡ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ٪ ٢۰

ইয়াকা-দুল বারকুইয়াখতাফুআবসা-রাহুম কুল্লামাআদাআ লাহুম মাশাও ফীহি ওয়া ইযাআজলামা ‘আলাইহিম কা-মূ ওয়ালাও শাআল্লা-হু লাযাহাবা বিছাম‘ইহিম ওয়া আবসা-রিহিম ; ইন্নাল্লা-হা ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

মনে হয় যেন বিজলী তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেবে। যখনই বিজলী তাদের সামনে আলো দান করে তারা তাতে (সেই আলোতে) চলতে শুরু করে, আবার যখন তা তাদের উপর অন্ধকার বিস্তার করে, তারা দাঁড়িয়ে যায়। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।
২১

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اعۡبُدُوۡا رَبَّکُمُ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ وَالَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ۙ ٢١

ইয়াআইয়ুহান্না-ছু‘বুদূ রাব্বাকুমুল্লাযী খালাকাকুম, ওয়াল্লাযীনা মিন কাবলিকুম লা‘আল্লাকুম তাত্তাকূন।

হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদেরকে, যাতে তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাও।
২২

الَّذِیۡ جَعَلَ لَکُمُ الۡاَرۡضَ فِرَاشًا وَّالسَّمَآءَ بِنَآءً ۪ وَّاَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخۡرَجَ بِہٖ مِنَ الثَّمَرٰتِ رِزۡقًا لَّکُمۡ ۚ فَلَا تَجۡعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا وَّاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ٢٢

আল্লাযী জা‘আলা লাকুমুল আরদা ফিরা-শাওঁ ওয়াছছামাআ বিনাআওঁ ওয়া আনঝালা মিনাছছামাই মাআন ফাআখরাজা বিহী মিনাছছামারা-তি রিঝকাল্লাকুম ফালা-তাজ‘আলূলিল্লা-হি আনদা-দাওঁ ওয়া আনতুম তা‘লামূন।

(সেই প্রতিপালকের), যিনি তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা বানিয়েছেন এবং আকাশকে ছাদ। আর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন। তারপর তার মাধ্যমে তোমাদের জীবিকারূপে ফল-ফলাদি উদগত করেছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কোনও শরীক স্থির করো না- যখন তোমরা (এসব বিষয়) জান। ২০

তাফসীরঃ

২০. ইসলামের সর্বাপেক্ষা বুনিয়াদী আকীদা হল তাওহীদ। এ আয়াতে তারই দাওয়াত দেয়া হয়েছে এবং সংক্ষিপ্তরূপে তার প্রমাণও উপস্থিত করা হয়েছে। আরবগণ স্বীকার করত, নিখিল বিশ্বের অস্তিত্ব দান করা, আকাশমণ্ডল সৃষ্টি করা, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করা এবং তা দ্বারা ফল ও ফসল উৎপন্ন করা- এসব আল্লাহ তাআলারই কাজ। এতদসত্ত্বেও তাদের বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাআলা বহু কাজের দায়-দায়িত্ব দেব-দেবীর উপর ন্যস্ত করেছেন। সেমতে দেব-দেবীগণ নিজ-নিজ কাজে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। কাজেই দেব-দেবীগণ তাদের সাহায্য করবে এই আশায় তারা তাদের পূজা-অর্চনা করত। আল্লাহ তাআলা বলছেন, যখন সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আমিই এবং বিশ্ব জগতের পরিচালনায় যখন আমার কারও থেকে কোনও রকমের সাহায্য গ্রহণের প্রয়োজন নেই, তখন ইবাদত-উপাসনা তো কেবল আমারই করা উচিত। এটাই তো বিবেক-বুদ্ধির দাবি। এ দাবি উপেক্ষা করে অন্য কারও উপাসনা করা কত বড়ই না অবিচার!
২৩

وَاِنۡ کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّنۡ مِّثۡلِہٖ ۪ وَادۡعُوۡا شُہَدَآءَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ٢٣

ওয়া ইন কুনতুম ফী রাইবিম মিম্মা-নাঝঝালনা- ‘আলা-আবদিনা- ফা’তূবিছূরাতিম মিম্মিছলিহী ওয়াদ‘ঊ শুহাদাআকুম মিন দূ নিল্লা-হি ইন কুনতুম সা-দিকীন।

তোমরা যদি এই (কুরআন) সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহে থাক, যা আমি আমার বান্দা (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি নাযিল করেছি, তবে তোমরা এর মত কোনও একটা সূরা বানিয়ে আন। আর সত্যবাদী হলে তোমরা আল্লাহ ছাড়া নিজেদের সাহায্যকারীদের ডেকে নাও।
২৪

فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا وَلَنۡ تَفۡعَلُوۡا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیۡ وَقُوۡدُہَا النَّاسُ وَالۡحِجَارَۃُ ۚۖ اُعِدَّتۡ لِلۡکٰفِرِیۡنَ ٢٤

ফাইল্লাম তাফ‘আলূওয়া লান তাফ‘আলূফাত্তাকুন্না-রাল্লাতী ওয়াকূদুহান্না-ছুওয়াল হিজা-রাতু উ‘ইদ্দাত লিলকা-ফিরীন।

তারপরও যদি তোমরা এ কাজ করতে না পার আর এটা তো নিশ্চিত যে, তোমরা তা কখনও করতে পারবে না, তবে ভয় কর সেই আগুনকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। তা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ২১

তাফসীরঃ

২১. পূর্বের ২১ ও ২২ নং আয়াতে তাওহীদের বর্ণনা ছিল। ইসলামের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আকীদা হল রিসালাত। এবার ২৩ নং আয়াত হতে তার বর্ণনা। এ প্রসঙ্গে আরবের সেই সকল লোকের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে, যারা কুরআনের প্রতি ঈমান না এনে বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অপবাদ দিত যে, তিনি একজন কবি এবং তিনি নিজেই এ কুরআন রচনা করেছেন। তাদেরকে বলা হচ্ছে, এ কুরআনের মত কোনও বাণী যদি মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব হয়, তবে তোমরা যারা অনেক বড় কবি-সাহিত্যিক, সকলে মিলে কুরআনের যে-কোনও একটা সূরার মত একটা সূরা তৈরি করে আন। সাথে সাথে কুরআন এই দাবীও করেছে যে, তোমরা সকলে মিলেও এরূপ সূরা তৈরি করতে পারবে না। আর বাস্তবতা এটাই যে, নিজেদের ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে যে আরবদের অনেক গর্ব ছিল, এই চ্যালেঞ্জের পর তারা সকলেই পরাজয় মানতে বাধ্য হয়। তাদের একজনও এ চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারেনি। বড় বড় কবি-সাহিত্যিক এই ঐশী বাণীর সম্মুখে নতজানু হয়ে বসে পড়ে। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত ও কুরআন মাজীদের সত্যতা দিবালোকের মত সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
২৫

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ کُلَّمَا رُزِقُوۡا مِنۡہَا مِنۡ ثَمَرَۃٍ رِّزۡقًا ۙ قَالُوۡا ہٰذَا الَّذِیۡ رُزِقۡنَا مِنۡ قَبۡلُ ۙ وَاُتُوۡا بِہٖ مُتَشَابِہًا ؕ وَلَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ٭ۙ وَّہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٢٥

ওয়া বাশশিরিল্লাযীনা আ-মানূওয়া‘আমিলুসসালিহা-তি আন্না লাহুম জান্না-তিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু কুল্লামা- রুঝিকূমিনহা- মিন ছামারাতির রিঝকান কা-লূহা-যাল্লাযী রুঝিকনা- মিন কাবলু ওয়া উতূবিহী মুতাশা-বিহাওঁ ওয়া লাহুম ফীহাআঝওয়া-জুম মুতাহহারাতুওঁ ওয়া হুম ফীহা- খা-লিদূ ন।

যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য এমন সব বাগান (প্রস্তুত) রয়েছে, যার নিচে নহর প্রবাহিত থাকবে। ২২ যখনই তাদেরকে তা থেকে রিযক হিসেবে কোনও ফল দেওয়া হবে, তারা বলবে, এটা তো সেটাই, যা আমাদেরকে আগেও দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে এমন রিযকই দেওয়া হবে, যা দেখতে একই রকমের হবে। ২৩ তাদের জন্য সেখানে থাকবে পুতঃপবিত্র স্ত্রী এবং তারা তাতে অনন্তকাল থাকবে।

তাফসীরঃ

২২. এটা ইসলামের তৃতীয় আকীদা অর্থাৎ আখিরাতের প্রতি ঈমানের বর্ণনা। এতে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন অবশ্যম্ভাবী। তখন প্রত্যেককে নিজ কর্মের হিসাব দিতে হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সৎকর্ম করবে সে জান্নাতের অধিকারী হবে। সেখানে কী নিয়ামত লাভ হবে, তার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র এ আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে।
২৬

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَسۡتَحۡیٖۤ اَنۡ یَّضۡرِبَ مَثَلًا مَّا بَعُوۡضَۃً فَمَا فَوۡقَہَا ؕ  فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فَیَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہُ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّہِمۡ ۚ  وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَیَقُوۡلُوۡنَ مَاذَاۤ اَرَادَ اللّٰہُ بِہٰذَا مَثَلًا ۘ  یُضِلُّ بِہٖ کَثِیۡرًا ۙ  وَّیَہۡدِیۡ بِہٖ کَثِیۡرًا ؕ  وَمَا یُضِلُّ بِہٖۤ اِلَّا الۡفٰسِقِیۡنَ ۙ ٢٦

ইন্নাল্লা-হা লা-ইয়াছতাহঈআইঁ ইয়াদরিবা মাছালাম্মা- বা‘ঊদাতান ফামা- ফাওকাহা- ফাআম্মাল্লাযীনা আ-মানূফাইয়া‘লামূনা আন্নাহুল হাক্কুমিররাব্বিহিম ওয়া আম্মাল্লাযীনা কাফারূ ফাইয়াকূলূনা মা-যাআরা-দাল্লা-হু বিহা-যা- মাছালা- । ইউদিল্লুবিহী কাছীরাওঁ ওয়াহদী বিহী কাছীরাওঁ ওয়ামা- ইউদিল্লুবিহীইল্লাল ফা-ছিকীন।

নিশ্চয়ই আল্লাহ (কোনও বিষয়কে স্পষ্ট করার জন্য) কোনও রকমের উদাহরণ দিতে লজ্জাবোধ করেন না, তা মশা (এর মত তুচ্ছ জিনিস) হোক বা তারও উপরে (অধিকতর তুচ্ছ) হোক। ২৪ তবে যারা মুমিন তারা জানে, এ উদাহরণ সত্য, যা তাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে আগত। কিন্তু যারা কাফির তারা বলে, এই (তুচ্ছ) উদাহরণ দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্য কী? (এভাবে) আল্লাহ এ উদাহরণ দ্বারা বহু মানুষকে গোমরাহীতে লিপ্ত করেন এবং বহুজনকে হিদায়াত দান করেন। আর তিনি গোমরাহ করেন কেবল তাদেরকেই, যারা নাফরমান। ২৫

তাফসীরঃ

২৪. কোনও কোনও কাফির কুরআন মাজীদের উপর প্রশ্ন তুলেছিল, এতে মশা, মাছি, মাকড়সা ইত্যাদি দ্বারা উদাহরণ দেওয়া হয়েছে কেন? এটা যদি সত্যিই আল্লাহর কালাম হত, তবে এতে এমন তুচ্ছ জিনিসের উল্লেখ থাকত না। বলাবাহুল্য, এটা এক অবান্তর প্রশ্ন। কেননা উদাহরণ সর্বদা বিষয়ের সাথে সঙ্গতি রেখেই দেওয়া হয়। কোনও ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ জিনিসের উদাহরণ দিতে হলে এমন কোনও জিনিস দ্বারাই দিতে হবে যা ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছতায় তার অনুরূপ। এ রকম করা হলে তা বক্তব্যের ত্রুটি নয়; বরং তার বৈদগ্ধ ও অলংকারপূর্ণতারই দলীল হয়। অবশ্য এটা তো কেবল তাদেরই বুঝে আসার কথা, যারা সত্যের সন্ধানী এবং সত্যের প্রতি বিশ্বাসী। যারা কুফরকেই ধরে রাখবে বলে কসম করে নিয়েছে, তারা তো সর্বদা সব রকম কথাতেই দোষ খুঁজবে। এ কারণেই তারা এ জাতীয় অবান্তর কথাবার্তা বলে থাকে।
২৭

الَّذِیۡنَ یَنۡقُضُوۡنَ عَہۡدَ اللّٰہِ مِنۡۢ بَعۡدِ مِیۡثَاقِہٖ ۪ وَیَقۡطَعُوۡنَ مَاۤ اَمَرَ اللّٰہُ بِہٖۤ اَنۡ یُّوۡصَلَ وَیُفۡسِدُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ ؕ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ٢٧

আল্লাযীনা ইয়ানকুদূ না ‘আহদাল্লা-হি মিম বা‘দি মীছা-কিহী ওয়া ইয়াকতা‘ঊনা মা আমারাল্লাহু বিহীআইঁ ইউসালা ওয়া ইউফছিদূ না ফিল আরদিউলাইকা হুমুল খাছিরূন।

সেই সকল লোক, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতিকে পরিপক্ক করার পরও ভেঙ্গে ফেলে ২৬ এবং আল্লাহ যেই সম্পর্ককে যুক্ত রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে। ২৭ বস্তুত এমন সব লোকই অতি ক্ষতিগ্রস্ত।

তাফসীরঃ

২৬. অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এ প্রতিশ্রুতি দ্বারা ‘আলাস্তু’-এর প্রতিশ্রুতি বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ ‘আমি কি তোমাদের রব্ব নই’- যা সূরা আরাফে বর্ণিত হয়েছে (৭ : ১৭২)। সেখানেই এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এখানে এতটুকু বুঝে নেওয়াই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করার বহু আগে সমস্ত রূহকে একত্র করেন। তারপর তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তখন সকলেই আল্লাহ তাআলার প্রতিপালকত্বের কথা স্বীকার করে নিয়ে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা তাঁর আনুগত্য করবে। এ আয়াতে যে প্রতিশ্রুতিকে পরিপক্ক করার কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ এই যে, প্রতি যুগে আল্লাহ তাআলার রাসূলগণ আসতে থাকেন এবং তারা মানুষকে সেই আদি প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তাআলাই যে সকলের স্রষ্টা ও মালিক তার অনুকূলে দলীল-প্রমাণ প্রদর্শন করতে থাকেন। ফলে সে প্রতিশ্রুতি আরও দৃঢ় ও পরিপক্ক হয়ে ওঠে। এই প্রতিশ্রুতির আরও একটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তা এই যে, এর দ্বারা সেই কর্মগত ও নীরব প্রতিশ্রুতি (Lacit Covenant) বোঝানো হয়েছে, যা প্রতিটি মানুষ তার জন্ম মাত্রই নিজ প্রতিপালকের সঙ্গে করে থাকে। এর উদাহরণ- যে ব্যক্তি যেই দেশে জন্মগ্রহণ করে, সে সেই দেশের নাগরিক হওয়ার সুবাদে এই নীরব প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে যে, সে সে দেশের সকল আইন মেনে চলবে। সে মুখে কিছু না বললেও কোনও দেশে তার জন্মগ্রহণ করাটাই এ প্রতিশ্রুতির স্থলাভিষিক্ত। এভাবেই যে ব্যক্তি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে, সে আপনা আপনিই তার প্রতিপালকের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যায় যে, সে তার হিদায়াত অনুসারে জীবন যাপন করবে। এ প্রতিশ্রুতির জন্য মুখে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। খুব সম্ভব এ কারণেই এর পরপরই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, তোমরা কি করেই বা আল্লাহ তাআলার সাথে কুফরী কর্মপন্থা অবলম্বন কর, অথচ তোমরা ছিলে নিষ্প্রাণ, তারপর তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন’? অর্থাৎ যদি সামান্য একটু চিন্তা কর, তবে ‘কেউ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন’, এই এতটুকু বিষয়ই তোমাদের পক্ষ হতে একটা প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রাখে এবং এর ফলে তাঁর নিয়ামতের স্বীকারোক্তি প্রদান এবং তাঁর প্রদত্ত পথ অবলম্বন তোমাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে যায়। অন্যথায় এটা কেমন বুদ্ধিমত্তা ও কেমন বিচার-বিবেচনার কাজ যে, সৃষ্টি তো করলেন আল্লাহ তাআলা আর আনুগত্য করা হবে অন্য কারও? এই নীরব অঙ্গীকারকে ‘পাকাপোক্ত করা’র দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে তোমাদেরকে অবিরত এই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন। নবীগণ তোমাদের সামনে এমন মজবুত দলীল-প্রমাণ পেশ করেছেন, যা দ্বারা এ প্রতিশ্রুতি আরও পাকাপোক্ত হয়ে গেছে যে, সকল ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করাই মানুষের কর্তব্য।
২৮

کَیۡفَ تَکۡفُرُوۡنَ بِاللّٰہِ وَکُنۡتُمۡ اَمۡوَاتًا فَاَحۡیَاکُمۡ ۚ ثُمَّ یُمِیۡتُکُمۡ ثُمَّ یُحۡیِیۡکُمۡ ثُمَّ اِلَیۡہِ تُرۡجَعُوۡنَ ٢٨

কাইফা তাকফুরূনা বিল্লা-হি ওয়া কুনতুম আমওয়া-তান ফাআহইয়া-কুম ছু ম্মা ইউমীতুকুম, ছু ম্মা ইউহঈকুম ছুম্মা ইলাইহি তুরজা‘ঊন।

তোমরা আল্লাহর সাথে কুফরী কর্মপন্থা কিভাবে অবলম্বন কর, অথচ তোমরা ছিলে নিষ্প্রাণ, অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন। অতঃপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন, অতঃপর তিনি (পুনরায়) তোমাদেরকে জীবিত করবেন, তারপর তোমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাবে।
২৯

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ لَکُمۡ مَّا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا ٭  ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ فَسَوّٰىہُنَّ سَبۡعَ سَمٰوٰتٍ ؕ  وَہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ٪ ٢٩

হুওয়াল্লাযী খালাকালাকুম মা-ফিল আরদিজামী‘আন ছু ম্মাছ তাওয়াইলাছছামাই ফাছাওওয়া-হুন্না ছাব‘আ ছামা-ওয়া-তিওঁ ওয়া হুওয়া বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীম।

তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ২৮ তারপর তিনি আকাশের প্রতি লক্ষ্য করেন এবং তাকে সাত আকাশরূপে সুষ্ঠুভাবে নির্মাণ করেন। আর তিনি প্রত্যেক জিনিসের পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন।

তাফসীরঃ

২৮. এখানে এ বিষয়ের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে যে, সে জগতের যা-কিছু দ্বারা উপকার লাভ করে তা সবই আল্লাহ তাআলার দান। এর প্রত্যেকটি জিনিস আল্লাহ তাআলার তাওহীদ ও একত্বের সাক্ষ্য দেয়। এতদসত্ত্বেও তাঁর সাথে কুফরী কর্মপন্থা অবলম্বন করা কত বড়ই না অকৃতজ্ঞতা! এ আয়াত থেকে ফুকাহায়ে কিরাম মূলনীতি আহরণ করেছেন যে, দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু মৌলিকভাবে হালাল। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও বস্তুর হারাম হওয়ার পক্ষে কোনও দলীল না পাওয়া যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে হালাল মনে করা হবে।
৩০

وَاِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ جَاعِلٌ فِی الۡاَرۡضِ خَلِیۡفَۃً ؕ قَالُوۡۤا اَتَجۡعَلُ فِیۡہَا مَنۡ یُّفۡسِدُ فِیۡہَا وَیَسۡفِکُ الدِّمَآءَ ۚ وَنَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِکَ وَنُقَدِّسُ لَکَ ؕ قَالَ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٣۰

ওয়া ইযকা-লা রাব্বুকা লিলমালইকাতি ইন্নী জা-‘ইলুন ফিল আরদিখালীফাতান কালূআতাজ‘আলুফীহা- মাইঁ ইউফছিদুফীহা- ওয়া ইয়াছফিকু দ দিমাআ ওয়ানাহনু নুছাব্বিহুবিহামদিকা ওয়া নুকাদ্দিছুলাকা কা-লা ইন্নী আ‘লামুমা-লা- তা‘লামূন।

এবং (সেই সময়ের বৃত্তান্ত শোন), যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশতাদেরকে বললেন, আমি পৃথিবীতে এক খলীফা ২৯ বানাতে চাই। তারা বলতে লাগলেন, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে অশান্তি বিস্তার করবে ও খুন-খারাবী করবে, অথচ আমরা আপনার তাসবীহ, হামদ ও পবিত্রতা ঘোষণায় নিয়োজিত ৩০ আছি? আল্লাহ বললেন, আমি এমন সব বিষয় জানি, যা তোমরা জান না।

তাফসীরঃ

২৯. একুশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলার ইবাদত অবশ্য কর্তব্য হওয়ার পক্ষে দলীল দেওয়া হয়েছিল। সে দলীল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সাদামাটা, অথচ বড় শক্তিশালী। বলা হয়েছিল, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত। আটাশ নং আয়াতে এরই ভিত্তিতে কাফিরদের কুফরের কারণে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। এবার মানব সৃষ্টির পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করত সে দলীলকে অধিকতর পরিপক্ক করা হচ্ছে। আয়াতে খলীফা দ্বারা মানুষকে বোঝানো হয়েছে। তাকে খলীফা বলার অর্থ- সে পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম নিজেও পালন করবে এবং নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী অন্যদের দ্বারাও তা পালন করানোর চেষ্টা করবে।
৩১

وَعَلَّمَ اٰدَمَ الۡاَسۡمَآءَ کُلَّہَا ثُمَّ عَرَضَہُمۡ عَلَی الۡمَلٰٓئِکَۃِ ۙ فَقَالَ اَنۡۢبِـُٔوۡنِیۡ بِاَسۡمَآءِ ہٰۤؤُلَآءِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ٣١

ওয়া‘আল্লামা আ-দামাল আছমাআ কুল্লাহা- ছু ম্মা ‘আরাদাহুম ‘আলাল মালাইকাতি ফাকা-লা আম্বিঊনী বিআছমাই হাউলাই ইন কুনতুম সা-দিকীন।

এবং (আল্লাহ) আদমকে সমস্ত নাম ৩১ শিক্ষা দিলেন। তারপর তাদেরকে ফিরিশতাদের সামনে পেশ করলেন এবং (তাদেরকে) বললেন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আমাকে এসব জিনিসের নাম জানাও।

তাফসীরঃ

৩১. ‘নামসমূহ’ দ্বারা সৃষ্টিজগতের যাবতীয় বস্তুর নাম, তাদের বৈশিষ্ট্যাবলী এবং মানুষ যে ক্ষুধা, পিপাসা, সুস্থতা, অসুস্থতা ইত্যাদি অবস্থাসমূহের সম্মুখীন হয়, তার জ্ঞান বোঝানো হয়েছে। হযরত আদম আলাইহিস সালামকে এসব বিষয় শিক্ষা দানের সময় ফিরিশতাগণ উপস্থিত থাকলেও তাদের স্বভাবের ভেতর যেহেতু এসব জিনিসের বুঝ-সমঝ ছিল না, তাই তাদের থেকে যখন এর পরীক্ষা নেওয়া হল, তারা উত্তর দিতে সক্ষম হলেন না। এভাবে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদের দ্বারা কার্যত স্বীকার করিয়ে নিলেন যে, এই নতুন সৃষ্টির দ্বারা তিনি যে কাজ নিতে চান, তা তারা আঞ্জাম দিতে সক্ষম নন। (কেননা খিলাফতের কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য খলিফার ভেতর তার মনিব ও অধিকর্তার গুণ থাকা জরুরি। ফিরিশতাগণ ইবাদতের ক্ষেত্রে অনেক উচ্চস্তরের হলেও মনিবের গুণ অর্থাৎ ইলম ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা অনেক পিছনে। সেই তুলনায় মানুষকে যেহেতু অনেক এগিয়ে রেখেছেন তাই তাকেই খলিফা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এর দ্বারা ইলমের ফযীলতও বোঝা গেল। -(-অনুবাদক)
৩২

قَالُوۡا سُبۡحٰنَکَ لَا عِلۡمَ لَنَاۤ اِلَّا مَا عَلَّمۡتَنَا ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَلِیۡمُ الۡحَکِیۡمُ ٣٢

কা-লূছুবহা-নাকা লা- ‘ইলমা লানা ইল্লা-মা ‘আল্লামতানা-ইন্নাকা আনতাল ‘আলীমুল হাকীম।

তারা বললেন, আপনার সত্তাই পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যতটুকু জ্ঞান দিয়েছেন, তার বাইরে আমরা কিছুই জানি না। ৩২ প্রকৃতপক্ষে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মালিক তো কেবল আপনিই।

তাফসীরঃ

৩২. আয়াতের শব্দাবলী দ্বারা বাহ্যত বোঝা যায়, এসব নাম কেবল হযরত আদম আলাইহিস সালামকেই শেখানো হয়েছিল, এ শিক্ষায় ফিরিশতাগণ শরীক ছিলেন না। এ অবস্থায় তাদেরকে নাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল এ কথার জানান দেওয়ার জন্য যে, আদমকে সৃষ্টি করার দ্বারা যা উদ্দেশ্য তোমাদের মধ্যে তার যোগ্যতাই নেই। তবে এই অবকাশও আছে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালামকে শিক্ষা দান করার সময় ফিরিশতাগণও উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু এসব বোঝার বা স্মরণ রাখার মত যোগ্যতা যেহেতু তাদের ছিল না তাই পরীক্ষাকালে তারা উত্তর দিতে পারেননি। এ অবস্থায় তারা যা বলেছেন তার সারমর্ম এই যে, আপনি আমাদেরকে যে জ্ঞান দান করতে চান এবং যার যোগ্যতা আপনি আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের পক্ষে কেবল তার জ্ঞান অর্জন করাই সম্ভব।
৩৩

قَالَ یٰۤاٰدَمُ اَنۡۢبِئۡہُمۡ بِاَسۡمَآئِہِمۡ ۚ فَلَمَّاۤ اَنۡۢبَاَہُمۡ بِاَسۡمَآئِہِمۡ ۙ قَالَ اَلَمۡ اَقُلۡ لَّکُمۡ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ غَیۡبَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ۙ وَاَعۡلَمُ مَا تُبۡدُوۡنَ وَمَا کُنۡتُمۡ تَکۡتُمُوۡنَ ٣٣

কা-লা ইয়াআ-দামূআম্বি’হুম বিআছমাইহিম ফালাম্মাআম্বাআহুম বিআছমাইহিম কা-লা আলাম আকুল্লাকুম ইন্নী আ‘লামুগাইবাছছামা-ওয়া-তি ওয়ল আরদি, ওয়া আ‘লামুমা- তুবদূ না ওয়ামা- কুনতুম তাকতুমূন।

আল্লাহ বললেন, হে আদম! তুমি তাদেরকে এসব জিনিসের নাম বলে দাও। সুতরাং যখন তিনি তাদেরকে সে সবের নাম বলে দিলেন, তখন আল্লাহ (ফিরিশতাদেরকে) বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, আমি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর রহস্য জানি এবং তোমরা যা-কিছু প্রকাশ কর এবং যা কিছু গোপন কর সেসব সম্পর্কে আমার জ্ঞান আছে?
৩৪

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰی وَاسۡتَکۡبَرَ ٭۫ وَکَانَ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ ٣٤

ওয়া ইযকুলনা- লিলমালাইকাতিছজু দূলিআ-দামা ফাছাজাদূ ইল্লা ইবলীছা আবা-ওয়াছতাকবারা ওয়া কা-না মিনাল কা-ফিরীন।

এবং (সেই সময়ের আলোচনা শোন), যখন আমি ফিরিশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা কর, ৩৩ ফলে তারা সকলে সিজদা করল, কিন্তু ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করল ৩৪ ও দর্পিত আচরণ করল এবং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

তাফসীরঃ

৩৩. ফিরিশতাদের সামনে হযরত আদম আলাইহিস সালামের উচ্চ মর্যাদাকে কাজের মাধ্যমে তুলে ধরা এবং সেই সঙ্গে তাদের পরীক্ষা নেওয়ার লক্ষ্যে তাদেরকে আদেশ করা হল, আদমকে সিজদা কর। এ সিজদা ইবাদতের নয়, বরং সম্মান প্রদর্শনের জন্য ছিল। সম্মান প্রদর্শনমূলক সিজদা পূর্ববর্তী কোনও কোনও শরীয়তে জায়েয ছিল। পরবর্তীতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সম্মানার্থে সিজদা করাকেও কঠোরভাবে নিষেধ করে দেওয়া হয়, যাতে শিরকের আভাস-মাত্র সৃষ্টি হতে না পারে। এ সিজদা করানোর দ্বারা যেন ফিরিশতাদেরকে পরোক্ষ নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল যে, সৃষ্টিজগতের যে সকল বিষয় তাদের এখতিয়ারাধীন করা হয়েছে তা যেন মানুষের জন্য নিয়োজিত করে, যাতে তারা তার সঠিক ব্যবহার করে, না বেঠিক, তা পরীক্ষা করা যায়।
৩৫

وَقُلۡنَا یٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَزَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ وَکُلَا مِنۡہَا رَغَدًا حَیۡثُ شِئۡتُمَا ۪ وَلَا تَقۡرَبَا ہٰذِہِ الشَّجَرَۃَ فَتَکُوۡنَا مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ٣٥

ওয়াকু লনা-ইয়া আ-দামুছকুন আনতা ওয়াঝাওজুকাল জান্নাতা ওয়াকুলা-মিনহা-রাগাদান হাইছুশি’তুমা- ওয়ালা-তাকরাবা- হা-যিহিশশাজারাতা ফাতাকূনা- মিনাজ্জা-লিমীন।

আমি বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে থাক এবং এর যেখান থেকে ইচ্ছা প্রাণ ভরে খাও। কিন্তু ওই গাছের কাছেও যেও না। ৩৫ অন্যথায় তোমরা জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে।

তাফসীরঃ

৩৫. সেটি কোন্ গাছ ছিল? কুরআন মাজীদে এটা স্পষ্ট করা হয়নি। আর এটা জানারও বিশেষ কোনও প্রয়োজন নেই। কেবল এতটুকু জেনে নেওয়াই যথেষ্ট যে, জান্নাতের বৃক্ষরাজির মধ্যে এমন একটা গাছ ছিল, যার ফল খেতে হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও তার স্ত্রীকে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। কোনও কোনও বর্ণনায় বলা হয়েছে, সেটি ছিল গম গাছ। আবার কোনও বর্ণনায় আঙ্গুর গাছও বলা হয়েছে। কিন্তু এসব বর্ণনার মধ্যে এমন একটিও নেই, যার উপর আস্থা রাখা যেতে পারে।
৩৬

فَاَزَلَّہُمَا الشَّیۡطٰنُ عَنۡہَا فَاَخۡرَجَہُمَا مِمَّا کَانَا فِیۡہِ ۪ وَقُلۡنَا اہۡبِطُوۡا بَعۡضُکُمۡ لِبَعۡضٍ عَدُوٌّ ۚ وَلَکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مُسۡتَقَرٌّ وَّمَتَاعٌ اِلٰی حِیۡنٍ ٣٦

ফাআঝাল্লাহুমাশশাইতা-নু‘আনহা- ফাআখরাজাহুমা- মিম্মা-কা-না ফীহি ওয়া কুলনাহ বিতূবা‘দুকুম লিবা‘দিন ‘আদুওউওঁ ওয়া লাকুম ফিল আরদিমুছতাকাররুওঁ ওয়ামাতা-‘উন ইলা-হীন ।

অতঃপর (এই হল যে,) শয়তান তাদেরকে সেখান থেকে টলিয়ে দিল এবং তাঁরা যার (যে সুখের) ভেতর ছিল তা থেকে তাঁদেরকে বের করে ছাড়ল। ৩৬ আমি (আদম, তার স্ত্রী ও ইবলিসকে) বললাম, এখন তোমরা সকলে এখান থেকে বের হয়ে যাও। তোমরা একে অন্যের শত্রু হবে। আর তোমাদের জন্য পৃথিবীতে (স্থিরীকৃত) আছে একটা কাল পর্যন্ত অবস্থান ও কিঞ্চিৎ ভোগ। ৩৭

তাফসীরঃ

৩৬. অর্থাৎ শয়তান তাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে সেই গাছের ফল খেতে প্রস্তুত করে ফেলল। সে বাহানা এই দেখাল যে, এমনিতে এই গাছটি বড়ই উপকারী। কেননা এর ফল খেলে অনন্ত জীবন লাভ হয়। কিন্তু প্রথম দিকে এটা বরদাশত করার মত শারীরিক শক্তি যেহেতু আপনাদের ছিল না, তাই আপনাদেরকে খেতে নিষেধ করা হয়েছিল। এখন তো আপনারা জান্নাতী পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আপনাদের শক্তিও পরিপক্ব হয়ে উঠেছে। কাজেই এখন আর সে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নেই। বিষয়টা আরও বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন- সূরা আরাফ (৭ : ১৯-২৩) ও সূরা তোয়াহা (২০ : ১২০)।
৩৭

فَتَلَقّٰۤی اٰدَمُ مِنۡ رَّبِّہٖ کَلِمٰتٍ فَتَابَ عَلَیۡہِ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ٣٧

ফাতালাক্কা আ-দামুমির রাব্বিহী কালিমা-তিন ফাতা-বা ‘আলাইহি ইন্নাহূ হুওয়াত্তাওওয়া-বুর রাহীম।

অতঃপর আদম স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ হতে (তওবার) কিছু শব্দ শিখে নিল (যা দ্বারা সে তওবা করল) ফলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করলেন। ৩৮ নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৩৮. হযরত আদম আলাইহিস সালাম যখন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন, তখন ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না, আল্লাহ তাআলার কাছে কি শব্দে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। তাই তাঁর মুখ দিয়ে কিছুই বের হচ্ছিল না। আল্লাহ তাআলা তো অন্তর্যামী এবং তিনি পরম দয়ালু ও দাতাও বটে। তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালামের মনের এ অবস্থার কারণে নিজেই তাঁকে তওবার ভাষা শিখিয়ে দিলেন, যা সূরা আরাফে (৭ : ২৩) বর্ণিত আছে এবং তা এরূপ- قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَۤا اَنْفُسَنَا وَاِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ ـ ‘তারা বললো, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের সত্তার প্রতি জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব।’ এভাবে পৃথিবীতে পাঠানোর আগেই মানুষকে আল্লাহ তাআলা শিখিয়ে দিলেন যে, সে যদি কখনও শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে কিংবা ইন্দ্রিয় পরবশতার কারণে কোনও গুনাহ করে ফেলে তবে তার কর্তব্য তৎক্ষণাৎ তওবা করে ফেলা। তওবার জন্য যদিও বিশেষ কোনও শব্দ ও ভাষা ব্যবহার অপরিহার্য নয়, বরং নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা ও পরবর্তীতে অনুরূপ না করার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ পায়- এমন যে-কোনও বাক্য দ্বারাই তওবা হতে পারে, কিন্তু উপরে বর্ণিত বাক্য যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তাআলার শেখানো, তাই এর দ্বারা তওবা করলে তা কবুল হওয়ার বেশি আশা করা যায়। এ স্থলে কয়েকটা কথা বিশেষভাবে বুঝে নেওয়া চাই- ক. যেমনটা পূর্বে ৩০নং আয়াত দ্বারাও পরিস্ফুট হয়েছে, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে পৃথিবীতে নিজ খলীফা বানিয়ে পাঠানোর জন্যই সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু সৃষ্টি করার পর তাকে প্রথমেই পৃথিবীতে না পাঠিয়ে তার আগে জান্নাতে থাকতে দিলেন। তারপর এতকিছু ঘটনা ঘটল। এর উদ্দেশ্য দৃশ্যত এই যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম যাতে জান্নাতের নি‘আমতসমূহ চাক্ষুষ দেখে নিজের আসল ঠিকানা সম্পর্কে ভালভাবে জেনে নিতে পারেন এবং পৃথিবীতে পৌঁছার পর এ ঠিকানা অর্জনে কি রকমের প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে এবং কোন পন্থায় তা থেকে মুক্তি লাভ করা যেতে পারে সে সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারেন। যেহেতু ফিরিশতাগণের বিপরীতে মানুষের স্বভাবের ভেতরই ভাল ও মন্দ উভয়ের যোগ্যতা রাখা হয়েছে, তাই এ বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথিবীতে আসার আগেই এ রকমের একটা অভিজ্ঞতা লাভ করা তার জন্য জরুরী ছিল। খ. নবী যেহেতু মা‘সূম ও নিষ্পাপ হন, ফলে তাঁর দ্বারা কোনও গুনাহের কাজ সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়, তাই হযরত আদম আলাইহিস সালামের এ ভুল মূলত ইজতিহাদী ভুল ছিল (Bonafold_old_ide Mistake) অর্থাৎ চিন্তাগত ভুল। তিনি শয়তানের কুমন্ত্রণার ফলে আল্লাহ তাআলার নির্দেশকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর সীমাবদ্ধ মনে করেছিলেন। অন্যথায় তাঁর পক্ষ হতে সরাসরি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী হওয়ার কল্পনাও করা যায় না। তথাপি একজন নবীর পক্ষে এ জাতীয় ভুলও যেহেতু শোভনীয় ছিল না, তাই কোনও কোনও আয়াতে এটাকে গুনাহ বা সীমালংঘন শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে এবং এজন্য তওবা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আলোচ্য আয়াতে এটাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করে নিয়েছেন। গ. এর দ্বারা মানুষের পাপ সংক্রান্ত খ্রিস্টীয় বিশ্বাস খণ্ডন হয়ে গেছে। খ্রিস্টানদের কথা হল, হযরত আদম আলাইহিস সালামের এ গুনাহ স্থায়ীভাবে মানব প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, যদ্দরুণ প্রতিটি মানব-শিশু মায়ের পেট থেকে পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করে। মানুষের এই সংকট মোচনের লক্ষ্যেই আল্লাহ তাআলার নিজ পুত্রকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে কুরবানী করানোর দরকার পড়েছে, যাতে তাঁর দ্বারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যায়। কুরআন মাজীদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আলাইহিস সালামের তওবা কবুল করে নিয়েছিলেন। ফলে তার সে গুনাহও বাকি থাকেনি এবং তার সন্তানদের মধ্যে সে গুনাহের স্থানান্তরিত হওয়ারও কোনও অবকাশ থাকেনি। তাছাড়া আল্লাহ তাআলার ইনসাফ ভিত্তিক বিধান অনুযায়ী এক ব্যক্তির পাপের বোঝা কখনও অন্যের মাথায় চাপানো হয় না।
৩৮

قُلۡنَا اہۡبِطُوۡا مِنۡہَا جَمِیۡعًا ۚ فَاِمَّا یَاۡتِیَنَّکُمۡ مِّنِّیۡ ہُدًی فَمَنۡ تَبِعَ ہُدَایَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ٣٨

কুলনাহ বিতূমিনহা-জামী‘আন ফাইম্মা- ইয়া’তিইয়ান্নাকুম মিন্নী হুদান ফামান তাবি‘আ হুদা-ইয়া ফালা-খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালা-হুম ইয়াহঝানূন।

আমি বললাম, এবার তোমরা সকলে এখান থেকে নেমে যাও। অতঃপর আমার নিকট থেকে তোমাদের নিকট যদি কোনও হিদায়াত পৌঁছে, তবে যারা আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে, তাদের কোনও ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। ৩৯

তাফসীরঃ

৩৯. অর্থাৎ এই যে জান্নাত থেকে বের হওয়ার দুঃখ নিয়ে তোমাদেরকে পৃথিবীতে যেতে হচ্ছে, সেই জান্নাতে যাতে আবার ফিরে আসতে পার এ লক্ষে হে মানুষ! নবীগণের মাধ্যমে তোমাদেরকে হিদায়াত ও পথ-নির্দেশ দেওয়া হবে। তাদের নির্দেশিত পথে যারা চলবে তাদের কোনও দুর্গতির ভয় থাকবে না। তারা সোজা জান্নাতে প্রবেশ করবে। এবারের প্রবেশ হবে স্থায়ী। তাদের আর জান্নাত থেকে বের হওয়ার কোনও দুঃখ ভোগ করতে হবে না। -(-অনুবাদক)
৩৯

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٪ ٣٩

ওয়াল্লাযীনা কাফারূ ওয়াকাযযাবূবিআ-য়া-তিনাউলাইকা আসহা-বুন্না-রি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।

আর যারা কুফরীতে লিপ্ত হবে এবং আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করবে, তারা জাহান্নামবাসী। তারা সেখানে সর্বদা থাকবে।
৪০

یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَتِیَ الَّتِیۡۤ اَنۡعَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ وَاَوۡفُوۡا بِعَہۡدِیۡۤ اُوۡفِ بِعَہۡدِکُمۡ ۚ وَاِیَّایَ فَارۡہَبُوۡنِ ٤۰

ইয়া-বানী ইছরাঈলাযকুরূনি‘মাতিয়াল্লাতী আন‘আমতু‘আলাইকুম ওয়াআওফূ বি‘আহদি ঊফি বি‘আহদিকুম ওয়াইয়্যা-ইয়া ফারহাবূন।

হে বনী ইসরাঈল! তোমরা আমার সেই নি‘আমত স্মরণ কর, যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছিলাম এবং তোমরা আমার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ কর, তাহলে আমিও তোমাদের সাথে আমার কৃত প্রতিশ্রুতি পূরণ করব। আর তোমরা (অন্য কাউকে নয়; বরং) কেবল আমাকেই ভয় কর। ৪০

তাফসীরঃ

৪০. হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আরেক নাম ইসরাঈল। তাঁর বংশধরদেরকে বনী ইসরাঈল বলা হয়, সমস্ত ইয়াহুদী এবং অধিকাংশ খ্রিস্টান এ বংশের সাথেই সম্পৃক্ত ছিল। মদীনা মুনাওয়ারায় বিপুল সংখ্যক ইয়াহুদী বসবাস করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় পৌঁছে ইয়াহুদীদেরকে যে কেবল ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন তাই নয়; বরং তাদের সঙ্গে শান্তি চুক্তিও সম্পাদন করেছিলেন। এই মাদানী সূরায় আলোচ্য আয়াত থেকে আয়াত নং ১৪৩ পর্যন্ত একাধারে তাদেরই সম্পর্কে আলোচনা। এতে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে বিভিন্ন রকম উপদেশ দেওয়ার সাথে সাথে তাদের উপর্যুপরি দুষ্কৃতি সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে। প্রথমে তাদেরকে স্মরণ করানো হয়েছে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে কত রকম নি‘আমত দান করেছিলেন, যার দাবী ছিল তারা আল্লাহ তাআলার শুকর আদায় করবে এবং তাওরাত গ্রন্থে তাদের থেকে যে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল তা পূরণ করবে। তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল যে, তারা যথাযথভাবে তাওরাতের অনুসরণ করবে এবং আল্লাহ-প্রেরিত প্রত্যেক নবীর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু তারা তাওরাতের অনুসরণ তো করলই না, উল্টো তার মনগড়া ব্যাখ্যা করল এবং তার বিধানাবলীতে নানা রকম রদবদল করল। তাদের এ কর্মপন্থার একটা কারণ এ-ও ছিল যে, তাদের আশঙ্কা ছিল সত্য কবুল করলে তাদের সধর্মীয়রা তাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে পড়বে। তাই এ দুই আয়াতের শেষে তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, মাখলুককে ভয় না করে তাদের উচিত কেবল আল্লাহ তাআলাকেই ভয় করা এবং অন্তরে তাঁর ছাড়া অন্য কারও ভয়কে স্থান না দেওয়া।
৪১

وَاٰمِنُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتُ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَکُمۡ وَلَا تَکُوۡنُوۡۤا اَوَّلَ کَافِرٍۭ بِہٖ ۪ وَلَا تَشۡتَرُوۡا بِاٰیٰتِیۡ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۫ وَّاِیَّایَ فَاتَّقُوۡنِ ٤١

ওয়াআ-মিনূবিমা আনঝালতুমুসাদ্দিকালিল মা- মা‘আকুম ওয়ালা-তাকূনূ আওওয়ালা কা-ফিরিম বিহী ওয়ালা-তাশতারূবিআ-য়া-তী ছামানান কালীলাওঁ ওয়াইয়্যা-ইয়া ফাত্তাকূন।

আর আমি যে বাণী নাযিল করেছি তাতে ঈমান আন, যখন তা তোমাদের কাছে যে কিতাব (তাওরাত) আছে, তার সমর্থকও বটে। আর তোমরাই এর প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। আর আমার আয়াতসমূহকে তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করো না। আর তোমাদের অন্তরে (অন্য কারও নয়) কেবল আমারই ভয়কে স্থিত কর। ৪১

তাফসীরঃ

৪১. বনী ইসরাঈলকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাওরাত ও ইনজীলের যে দাওয়াত ছিল কুরআন মাজীদ সেই দাওয়াত নিয়েই এসেছে এবং তারা যে আসমানী কিতাবের প্রতি বিশ্বাস রাখে কুরআন মাজীদ তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন তো করেই না; বরং দু’ভাবে তার সমর্থন করে থাকে। এক তো এভাবে যে, কুরআন মাজীদ স্বীকার করে, এসব কিতাব আল্লাহ তাআলারই নাযিল করা (পরবর্তীকালের লোকে যে নানাভাবে তাতে রদবদল করেছে, সেটা আলাদা কথা। কুরআন মাজীদ সে রদবদলের প্রকৃতিও স্পষ্ট করে দিয়েছে)। দ্বিতীয়ত তাতে শেষ নবীর আগমন সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, কুরআন মাজীদ তার সত্যতা প্রমাণ করেছে। এর তো দাবী ছিল বনী ইসরাঈল আরব পৌত্তলিকদের আগেই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু হল তার বিপরীত। আরব পৌত্তলিকগণ যেমন দ্রুতগতিতে ইসলাম গ্রহণ করছে, ইয়াহুদীরা ইসলামের প্রতি তেমন গতিসম্পন্ন হচ্ছে না। এভাবে যেন তারা কুরআন মাজীদকে অস্বীকার করার ব্যাপারেই অগ্রগামী থাকছে। এ কারণেই বলা হয়েছে, তোমরাই এর প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। কতক ইয়াহুদীর নীতি ছিল আম-সাধারণের থেকে উৎকোচ নিয়ে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী তাওরাতের ব্যাখ্যা করা, কখনও তাওরাতের বিধান গোপন করা। তাদের এই দুর্নীতির প্রতি ইশারা করে বলা হয়েছে, ‘আমার আয়াতসমূহকে তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করো না, সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং সত্য গোপন করো না।’
৪২

وَلَا تَلۡبِسُوا الۡحَقَّ بِالۡبَاطِلِ وَتَکۡتُمُوا الۡحَقَّ وَاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ٤٢

ওয়ালা-তালবিছুল হাক্কা বিলবা-তিলি ওয়া তাকতুমুল হাক্কা ওয়া আনতুম তা‘লামূন।

এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং সত্যকে গোপনও করো না, যখন (প্রকৃত অবস্থা) তোমরা ভালোভাবে জান।
৪৩

وَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ وَارۡکَعُوۡا مَعَ الرّٰکِعِیۡنَ ٤٣

ওয়া আকীমুস সালা-তা ওয়া আ-তুঝঝাকা-তা ওয়ারকা‘ঊ মা‘আর রা-কি‘ঈন।

এবং তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত আদায় কর ও রুকূ‘কারীদের সাথে রুকূ‘ কর। ৪২

তাফসীরঃ

৪২. বিশেষভাবে রুকূ‘র কথা উল্লেখ করা হয়েছে এজন্য যে, ইয়াহুদীদের সালাতে রুকূ‘ ছিল না।
৪৪

اَتَاۡمُرُوۡنَ النَّاسَ بِالۡبِرِّ وَتَنۡسَوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ وَاَنۡتُمۡ تَتۡلُوۡنَ الۡکِتٰبَ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ٤٤

আতা’মুরূনান্না-ছা বিলবিরবিওয়া তানছাওনা আনফুছাকুম ওয়া আনতুম তাতলূনাল কিতা-বা আফালা-তা‘কিলূন।

তোমরা কি অন্য লোকদেরকে পুণ্যের আদেশ কর আর নিজেদেরকে ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াতও কর। তোমরা কি এতটুকুও বোঝ না? ৪৩

তাফসীরঃ

৪৩. কতক ইয়াহুদী পণ্ডিত মানুষকে বলত, ইসলাম সত্য ধর্ম, কিন্তু নিজেরা তা গ্রহণ করত না। তাদেরকে তিরস্কার করে বলা হয়েছে, এটা কেমন কথা যে, অন্যকে ভালো কাজের আদেশ করছ অথচ নিজেদের বেলায় তা ভুলে থাকছ? যে ব্যক্তি সত্য-সঠিক কথা জানে তার তো তা প্রচার করার সাথে সাথে নিজেরও অনুসরণ করা কর্তব্য। নিজে অনুসরণ না করে কেবল প্রচার দ্বারা মুক্তি পাওয়া যাবে না। বরং তা আরও মসিবতের কারণ হবে। এ আয়াতের শিক্ষা হল, নসীহতকারীকে অবশ্যই নিজ নসীহত অনুযায়ী আমল করতে হবে। ফাসেক ব্যক্তি কাউকে নসীহত করতে পারবে না সেকথা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়।
৪৫

وَاسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَالصَّلٰوۃِ ؕ  وَاِنَّہَا لَکَبِیۡرَۃٌ اِلَّا عَلَی الۡخٰشِعِیۡنَ ۙ ٤٥

ওয়াছতা‘ঈনূ বিসসাবরি ওয়াসসালা-তি ওয়া ইন্নাহা-লাকাবীরাতুন ইল্লা-‘আলাল খা-শি‘ঈন।

এবং সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য লাভ কর। সালাতকে অবশ্যই কঠিন মনে হয়, কিন্তু তাদের পক্ষে (কঠিন) নয়, যারা খুশূ‘ (অর্থাৎ ধ্যান ও বিনয়)-এর সাথে পড়ে।
৪৬

الَّذِیۡنَ یَظُنُّوۡنَ اَنَّہُمۡ مُّلٰقُوۡا رَبِّہِمۡ وَاَنَّہُمۡ اِلَیۡہِ رٰجِعُوۡنَ ٪ ٤٦

আল্লাযীনা ইয়াজুন্নূনা আন্নাহুম মুলা-কূরাব্বিহিম ওয়াআন্নাহুম ইলাইহি রা-জি‘উন।

যারা এ বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখে যে, তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে এবং তাদেরকে তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে।
৪৭

یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَتِیَ الَّتِیۡۤ اَنۡعَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ وَاَنِّیۡ فَضَّلۡتُکُمۡ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ٤٧

ইয়া-বানী ইছরাূঈলাযকুর নি‘মাতিইয়াল্লাতী আন‘আমতু ‘আলাইকুম ওয়াআন্নী ফাদ্দালতুকুম ‘আলাল ‘আ-লামীন।

হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই নি‘আমত স্মরণ কর, যা আমি তোমাদেরকে দান করেছিলাম এবং এটাও (স্মরণ কর) যে, আমি তোমাদেরকে সমগ্র বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।
৪৮

وَاتَّقُوۡا یَوۡمًا لَّا تَجۡزِیۡ نَفۡسٌ عَنۡ نَّفۡسٍ شَیۡئًا وَّلَا یُقۡبَلُ مِنۡہَا شَفَاعَۃٌ وَّلَا یُؤۡخَذُ مِنۡہَا عَدۡلٌ وَّلَا ہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ٤٨

ওয়াত্তাকূইয়াওমাল্লা-তাজঝী নাফুছুন ‘আন নাফছিন শাইআওঁ ওয়ালা-ইউকবালু মিনহা-শাফা‘আতুওঁ ওয়ালা-ইউ’খাযুমিনহা-‘আদলুওঁ ওয়ালা-হুম ইউনসারূন।

এবং সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন কোনও ব্যক্তি কারও কোনও কাজে আসবে না, কারও পক্ষ হতে কোনও সুপারিশ গৃহীত হবে না, কারও থেকে কোনও রকম মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের কোনও রকম সাহায্যও করা হবে না।
৪৯

وَاِذۡ نَجَّیۡنٰکُمۡ مِّنۡ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ یَسُوۡمُوۡنَکُمۡ سُوۡٓءَ الۡعَذَابِ یُذَبِّحُوۡنَ اَبۡنَآءَکُمۡ وَیَسۡتَحۡیُوۡنَ نِسَآءَکُمۡ ؕ وَفِیۡ ذٰلِکُمۡ بَلَآءٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ عَظِیۡمٌ ٤٩

ওয়া ইযনাজ্জাইনা-কুম মিন আ-লি ফির‘আওনা ইয়াছুমূনাকুম ছূআল ‘আযা-বি ইউযাব্বিহুনা আবনাআকুম ওয়াইয়াছতাহইউনা নিছাআকুম ওয়া ফী যা-লিকুম বালাউম মিররাব্বিকুম ‘আজীম।

এবং (সেই সময়কেও স্মরণ কর), যখন আমি তোমাদেরকে ফির‘আউনের লোকজন থেকে মুক্তি দেই, যারা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিচ্ছিল। তোমাদের পুত্রদেরকে যবাহ করে ফেলছিল এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখছিল। ৪৪ আর এই যাবতীয় পরিস্থিতিতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমাদের জন্য ছিল মহা পরীক্ষা।

তাফসীরঃ

৪৪. ফির‘আউন ছিল মিসরের রাজা (আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী তার নাম মিনিফতাহ, শাসনকাল খৃ. পূ. ১২৩৫ থেকে ১২২৪। ইনি দ্বিতীয় রেয়েমসীস [খৃ.পূ. ১২৯০-১২৩৫]-এর পুত্র ও স্থলাভিষিক্ত।) মিসরে বিপুল সংখ্যক ইয়াহুদী বাস করত এবং তারা ফির‘আউনের দাসরূপে জীবন যাপন করত। একবার এক জ্যোতিষী ফির‘আউনের সামনে ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করল যে, এ বছর বনী ইসরাঈলে একটি শিশুর জন্ম হবে, যার হাতে তার রাজত্ব ধ্বংস হবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী শুনে সে ফরমান জারি করল, বনী ইসরাঈলে যত শিশুর জন্ম হবে, সকলকে হত্যা করা হোক, তবে মেয়ে শিশুকে নয়। কেননা বড় হলে তাদের থেকে সেবা নেওয়া যাবে। এভাবে বহু নবজাতককে হত্যা করা হয়। হযরত মূসা আলাইহিস সালামও এ বছরই জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করেন। বিস্তারিত ঘটনা সূরা তোয়াহা ও সূরা কাসাস-এ স্বয়ং কুরআন মাজীদই বর্ণনা করেছে।
৫০

وَاِذۡ فَرَقۡنَا بِکُمُ الۡبَحۡرَ فَاَنۡجَیۡنٰکُمۡ وَاَغۡرَقۡنَاۤ اٰلَ فِرۡعَوۡنَ وَاَنۡتُمۡ تَنۡظُرُوۡنَ ٥۰

ওয়া ইযফারাকনা-বিকুমুল বাহরা ফাআনজাইনা-কুমওয়াআগরাকনাআ-লা ফির ‘আওনা ওয়া আনতুম তানজুরূন।

এবং (স্মরণ কর) যখন আমি তোমাদের জন্য সাগরকে বিদীর্ণ করেছিলাম এবং এভাবে তোমাদের সকলকে রক্ষা করেছিলাম এবং ফির‘আউনের লোকজনকে (সাগরে) নিমজ্জিত করেছিলাম। ৪৫ আর তোমরা এসব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিলে।

তাফসীরঃ

৪৫. এ ঘটনাও উপরিউক্ত সূরা দু’টিতে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
৫১

وَاِذۡ وٰعَدۡنَا مُوۡسٰۤی اَرۡبَعِیۡنَ لَیۡلَۃً ثُمَّ اتَّخَذۡتُمُ الۡعِجۡلَ مِنۡۢ بَعۡدِہٖ وَاَنۡتُمۡ ظٰلِمُوۡنَ ٥١

ওয়াইয ওয়া- ‘আদনা-মূছা আরবা‘ঈনা লাইলাতান ছুম্মাত তাখাযতুমুল ‘ইজলা মিম বা‘দিহী ওয়া আনতুমজা-লিমূন।

এবং (সেই সময়টিও স্মরণ কর), যখন আমি মূসাকে চল্লিশ রাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। অতঃপর তোমরা তার প্রস্থানের পরে (নিজেদের সত্তার উপর) জুলুম করতঃ বাছুরকে মাবূদ বানালে। ৪৬

তাফসীরঃ

৪৬. আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি তূর পাহাড়ে গিয়ে চল্লিশ দিন ইতিকাফ করলে তাকে তাওরাত দান করা হবে। সেমতে তিনি তূর পাহাড়ে চলে গেলেন। তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে যাদুকর সামিরী একটি বাছুর তৈরি করল এবং সেটিকে উপাস্য সাব্যস্ত করে বনী ইসরাঈলকে তার পূজায় লিপ্ত হতে প্ররোচিত করল। এভাবে তারা শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়ল। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন এ খবর পেলেন, তখন অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ফিরে আসলেন এবং বনী ইসরাঈলকে তওবা করতে উৎসাহিত করলেন। তওবার একটা অংশ ছিল এই যে, তাদের মধ্যে যারা এ শিরকের কদর্যতায় জড়িত হয়নি তারা তাতে জড়িতদেরকে হত্যা করবে। সেমতে তাদের বিপুল সংখ্যক লোককে হত্যা করা হল এবং এভাবে তাদের তওবা কবুল হল। ইনশাআল্লাহ সূরা আরাফ ও সূরা তোয়াহায় এসব ঘটনা বিস্তারিতভাবে আসবে।
৫২

ثُمَّ عَفَوۡنَا عَنۡکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ٥٢

ছু ম্মা ‘আফাওনা- ‘আনকুম মিম বা‘দি যা-লিকা লা‘আল্লাকুম তাশকুরূন।

অতঃপর এসব কিছুর পরও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
৫৩

وَاِذۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡکِتٰبَ وَالۡفُرۡقَانَ لَعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ ٥٣

ওয়া ইযআ-তাইনা- মূছাল কিতা-বা ওয়াল ফুরকা-না লা‘আল্লাকুম তাহতাদূন।

এবং (স্মরণ কর) যখন আমি মূসাকে দিলাম কিতাব এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকরণের মাপকাঠি, যাতে তোমরা সঠিক পথে চলে আস।
৫৪

وَاِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِقَوۡمِہٖ یٰقَوۡمِ اِنَّکُمۡ ظَلَمۡتُمۡ اَنۡفُسَکُمۡ بِاتِّخَاذِکُمُ الۡعِجۡلَ فَتُوۡبُوۡۤا اِلٰی بَارِئِکُمۡ فَاقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ ذٰلِکُمۡ خَیۡرٌ لَّکُمۡ عِنۡدَ بَارِئِکُمۡ ؕ فَتَابَ عَلَیۡکُمۡ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ٥٤

ওয়া ইযকা-লা মূছা- লিকাওমিহী ইয়া-কাওমি ইন্নাকুম জালামতুম আনফুছাকুম বিত্তিখা-যিকুমুল ‘ইজলা ফাতূবূ ইলা-বা-রিইকুম ফাকতুলূআনফুছাকুম যা-লিকুম খাইরুল্লাকুম ‘ইনদা বা-রিইকুম ফাতা-বা ‘আলাইকুম ইন্নাহূ হুওয়াত্তাওওয়া-বুররাহীম।

এবং যখন মূসা নিজ সম্প্রদায়কে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে প্রকৃতপক্ষে তোমরা নিজেরা নিজেদের প্রতিই জুলুম করেছ। সুতরাং এখন নিজ সৃষ্টিকর্তার কাছে তওবা কর এবং নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা কর। ৪৭ এটাই তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট তোমাদের পক্ষে শ্রেয়। এভাবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয় তিনিই অতি বড় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৪৭. অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যারা বাছুর পূজা করেনি তারা পূজাকারীদেরকে হত্যা কর। কারও মতে বনী ইসরাঈলের কিছুসংখ্যক বাছুরের পূজা করেছিল, কিছুসংখ্যক পূজা করেনি বটে, কিন্তু পূজারীদেরকে বারণও করেনি, আর কিছুসংখ্যক পূজা তো করেইনি এবং যারা পূজা করেছিল তাদেরকে বাধাও দিয়েছিল। এদের মধ্যে দ্বিতীয় দলকে হুকুম করা হয় যাতে তারা প্রথম দলকে হত্যা করে, যাতে নিহত হওয়ার দ্বারা প্রথম দলের এবং তাদেরকে হত্যা করার দ্বারা দ্বিতীয় দলের তওবা হয়ে যায়। তৃতীয় দলের এ ব্যাপারে তওবার দরকার ছিল না। -(-অনুবাদক)
৫৫

وَاِذۡ قُلۡتُمۡ یٰمُوۡسٰی لَنۡ نُّؤۡمِنَ لَکَ حَتّٰی نَرَی اللّٰہَ جَہۡرَۃً فَاَخَذَتۡکُمُ الصّٰعِقَۃُ وَاَنۡتُمۡ تَنۡظُرُوۡنَ ٥٥

ওয়া ইয কুলতুমইয়া-মূছা- লান নু’মিনা লাকা হাত্তা- নারাল্লা-হা জাহরাতান ফা-আখাযাতকুমুসসা-‘ইকাতুওয়া আনতুম তানজুরূন।

আর যখন তোমরা বলেছিলে, হে মূসা! আমরা কিছুতেই তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আল্লাহকে নিজেদের চোখে প্রকাশ্যে দেখতে পাব। এর পরিণামে বজ্র এসে তোমাদেরকে এমনভাবে পাকড়াও করল যে, তোমরা কেবল তাকিয়েই থাকলে।
৫৬

ثُمَّ بَعَثۡنٰکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَوۡتِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ٥٦

ছু ম্মা বা‘আছনা-কুম মিম বা‘দি মাওতিকুম লা‘আল্লাকুম তাশকুরূন।

অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের মৃত্যুর পর নতুন জীবন দান করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। ৪৮

তাফসীরঃ

৪৮. হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন তূর পাহাড় হতে তাওরাত নিয়ে ফিরলেন, তখন বনী ইসরাঈল তাকে বলল, আল্লাহ তাআলা যে সত্যিই আমাদেরকে এ কিতাব অনুসরণ করতে বলেছেন তা আমরা কিভাবে বিশ্বাস করতে পারি? প্রথমে তাদের উপর প্রমাণ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আল্লাহ তাআলা সরাসরি তাদেরকে সম্ভাষণ করে তাওরাত অনুসরণ করার হুকুম দিলেন। কিন্তু তারা বলতে লাগল, যতক্ষণ আল্লাহকে আমরা নিজ চোখে না দেখব, ততক্ষণ বিশ্বাস করব না। এই ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের কারণে তাদের উপর বজ্রপাত হল। ফলে এক বর্ণনা অনুযায়ী তারা মারা গেল এবং অন্য বর্ণনা অনুযায়ী তারা অচেতন হয়ে পড়ল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পুনরায় জীবিত করেন। বিস্তারিত সূরা আরাফে আসবে ইনশাআল্লাহ।
৫৭

وَظَلَّلۡنَا عَلَیۡکُمُ الۡغَمَامَ وَاَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکُمُ الۡمَنَّ وَالسَّلۡوٰی ؕ کُلُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا رَزَقۡنٰکُمۡ ؕ وَمَا ظَلَمُوۡنَا وَلٰکِنۡ کَانُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ یَظۡلِمُوۡنَ ٥٧

ওয়াজাল্লালনা-‘আলাইকুমুল গামা-মা ওয়া আনঝালনা-‘আলাইকুমুল মান্না ওয়াছছালওয়া- কুলূমিন তাইয়িবা-তি মা-রাঝাকনা-কুম ওয়ামা-জালামূনা- ওয়ালা-কিন কানূআনফুছাহুম ইয়াজলিমূন।

এবং আমি তোমাদেরকে মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি মান্ন্ ও সালওয়া অবতীর্ণ করলাম (ও বললাম), যে পবিত্র রিযক আমি তোমাদেরকে দান করলাম, তা (আগ্রহভরে) খাও। ৪৯ আর তারা (এসব নাফরমানী করে) আমার কিছু ক্ষতি করেনি; বরং তারা নিজেদের সত্তার উপরই জুলুম করতে থাকে।

তাফসীরঃ

৪৯. সূরা আলে-ইমরানে আসবে যে, বনী ইসরাঈল জিহাদের একটি আদেশ অমান্য করেছিল, যার শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে সিনাই মরুভূমিতে আটকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই শাস্তিকালীন সময়েও আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি নানা রকম নিয়ামত বর্ষণ করেছিলেন। এ স্থলে তা বিবৃত হচ্ছে। মরুভূমিতে যেহেতু তাদের মাথার উপর কোনও ছাদ ছিল না, প্রচণ্ড খরতাপে তাদের খুব কষ্ট হচ্ছিল, তা থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তাআলা তাদের উপর একখণ্ড মেঘ নিয়োজিত করে দেন, যা তাদেরকে নিরবচ্ছিন্ন ছায়া দিয়ে যাচ্ছিল। এ মরুভূমিতে কোনও খাদ্যদ্রব্যও ছিল না। আল্লাহ তাআলা গায়ব থেকে তাদের জন্য মান্ন ও সালওয়ারূপে উৎকৃষ্ট খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। কোনও বর্ণনা অনুযায়ী ‘মান্ন্’ হল তুরান্জ (প্রাকৃতিক চিনি বিশেষ, যা শিশিরের মত পড়ে তৃণাদির উপর জমাট বেঁধে যায়)। সেই এলাকায় এটা প্রচুর পরিমাণে নাযিল করা হত। আর ‘সালওয়া’ হল বটের (তিতির জাতীয় পাখি)। বনী ইসরাঈল যেসব জায়গায় অবস্থান করত, তার আশেপাশে এ পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে এসে পড়ত এবং কেউ ধরতে চাইলে তারা মোটেই আত্মরক্ষার চেষ্টা করত না। বনী ইসরাঈল এসব নিয়ামতের চরম অসম্মান করল এবং এভাবে তারা নিজ সত্তার উপরই জুলুম করল।
৫৮

وَاِذۡ قُلۡنَا ادۡخُلُوۡا ہٰذِہِ الۡقَرۡیَۃَ فَکُلُوۡا مِنۡہَا حَیۡثُ شِئۡتُمۡ رَغَدًا وَّادۡخُلُوا الۡبَابَ سُجَّدًا وَّقُوۡلُوۡا حِطَّۃٌ نَّغۡفِرۡ لَکُمۡ خَطٰیٰکُمۡ ؕ وَسَنَزِیۡدُ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٥٨

ওয়াইযকুলনাদখুলূ হা-যিহিল কারইয়াতা ফাকুলূমিনহা-হাইছুশি’তুম রাগাদাওঁ ওয়াদখুলূল বা-বা ছুজ্জাদাওঁ ওয়া কূলূহিত্তাতুন্নাগফিরলাকুম খাতা-ইয়া-কুম ওয়া ছানাঝীদুল মুহছিনীন।

এবং (সেই কথাও স্মরণ কর) যখন আমি বলেছিলাম, ওই জনপদে প্রবেশ কর এবং তার যেখান থেকে ইচ্ছা প্রাণ ভরে খাও। আর (জনপদের) প্রবেশদ্বার দিয়ে নতশিরে প্রবেশ করবে আর বলতে থাকবে, (হে আল্লাহ!) আমরা আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। (এভাবে) আমি তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করব এবং পুণ্যবানদেরকে আরও বেশি (সওয়াব) দেব।
৫৯

فَبَدَّلَ الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا قَوۡلًا غَیۡرَ الَّذِیۡ قِیۡلَ لَہُمۡ فَاَنۡزَلۡنَا عَلَی الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا رِجۡزًا مِّنَ السَّمَآءِ بِمَا کَانُوۡا یَفۡسُقُوۡنَ ٪ ٥٩

ফাবাদ্দালাল্লাযীনা জালামূ কাওলান গাইরাল্লাযীকীলা লাহুম ফাআনঝালনা- ‘আলাল্লাযীনা জালামূ রিজঝাম্মিনাছছামাই বিমা- কা-নূইয়াফছুকূন।

কিন্তু যারা জুলুম করেছিল তাদেরকে যা বলা হয়েছিল, তাকে বদলে ফেলল অন্য কথায়। ৫০ ফলে তারা যে নাফরমানী করে আসছিল তার শাস্তিস্বরূপ আমি এ জালিমদের উপর আসমান থেকে শাস্তি অবতীর্ণ করলাম।

তাফসীরঃ

৫০. সিনাই মরুভূমিতে যখন দীর্ঘদিন কেটে গেল এবং মান্ন্ ও সালওয়া খেতে খেতে বিতৃষ্ণা ধরে গেল, তখন বনী ইসরাঈল দাবী জানাল, আমরা একই রকম খাবার খেয়ে থাকতে পারব না। আমরা ভূমিতে উৎপন্ন তরি-তরকারি খেতে চাই। সামনে ৬১নং আয়াতে তাদের এ দাবীর কথা বর্ণিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, তাদের এ চাহিদাও পূর্ণ করা হল। ঘোষণা করে দেওয়া হল, এবার তোমাদেরকে মরুভূমির ছন্নছাড়া অবস্থা হতে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। সামনে একটি জনপদ আছে, সেখানে চলে যাও। তবে জনপদটির প্রবেশদ্বার দিয়ে নিজেদের কৃত গুনাহের জন্য লজ্জা প্রকাশার্থে মাথা নত করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে প্রবেশ কর। সেখানে নিজেদের চাহিদা মত যে-কোনও হালাল খাদ্য খেতে পারবে। কিন্তু সে জালিমরা আবারও টেড়া মানসিকতার প্রমাণ দিল। শহরে প্রবেশকালে মাথা নত করবে কি, উল্টো বুক টান করে প্রবেশ করল এবং ক্ষমা প্রার্থনার জন্য যে ভাষা তাদেরকে শেখানো হয়েছিল তাকে তামাশায় পরিণত করে তার কাছাকাছি এমন স্লোগান দিতে দিতে প্রবেশ করল যার উদ্দেশ্য মশকারা ছাড়া কিছুই ছিল না। ক্ষমা প্রার্থনার জন্য তাদেরকে তো শেখানো হয়েছিল- حِطَّةٌ (হে আল্লাহ! আমাদের পাপ মোচন কর), কিন্তু তারা এর পরিবর্তে স্লোগান দিচ্ছিল حِنْطَةٌ ‘গম চাই, গম’।
৬০

وَاِذِ اسۡتَسۡقٰی مُوۡسٰی لِقَوۡمِہٖ فَقُلۡنَا اضۡرِبۡ بِّعَصَاکَ الۡحَجَرَ ؕ فَانۡفَجَرَتۡ مِنۡہُ اثۡنَتَا عَشۡرَۃَ عَیۡنًا ؕ قَدۡ عَلِمَ کُلُّ اُنَاسٍ مَّشۡرَبَہُمۡ ؕ کُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا مِنۡ رِّزۡقِ اللّٰہِ وَلَا تَعۡثَوۡا فِی الۡاَرۡضِ مُفۡسِدِیۡنَ ٦۰

ওয়া ইযিছতাছকা-মূছা- লিকাওমিহী ফাকুলনাদরিব্বি‘আসা-কাল হাজারা ফানফাজারাত মিনহুছনাতা- ‘আশরাতা ‘আইনান কাদ ‘আলিমা কুল্লুউনা-ছিম মাশরাবাহুম কুলূওয়াশরাবূমির রিঝকিল্লা-হি ওয়ালা-তা‘ছাও ফিল আরদিমুফছিদীন।

এবং (সেই সময়ের কথাও স্মরণ কর) যখন মূসা নিজ সম্প্রদায়ের জন্য পানি প্রার্থনা করল। তখন আমি বললাম, তোমার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত কর। সুতরাং তা থেকে বারটি প্রস্রবণ উৎসারিত হল। ৫১ প্রত্যেক গোত্র নিজ পানি গ্রহণের স্থান জেনে নিল। (আমি বললাম) আল্লাহ প্রদত্ত রিযক খাও ও পান করো এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করো না।

তাফসীরঃ

৫১. এ ঘটনাও সেই সময়ের, যখন বনী ইসরাঈল ‘তীহ’ (সিনাই) মরুভূমিতে আটকে পড়েছিল। সেখানে পানির কোনও ব্যবস্থা ছিল না। আল্লাহ তাআলা একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবে পাথর থেকে বারটি ঝর্নাধারা প্রবাহিত করে দেন। হযরত ইয়াকুব (ইসরাঈল) আলাইহিস সালামের বার পুত্র ছিল। প্রত্যেক পুত্রের সন্তানগণ একটি স্বতন্ত্র গোত্রের রূপ নেয়। এভাবে বনী ইসরাঈল বার গোত্রে বিভক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক গোত্রের জন্য আলাদা প্রস্রবণ চালু করেছিলেন, যাতে কোনও কলহ সৃষ্টি হতে না পারে।
৬১

وَاِذۡ قُلۡتُمۡ یٰمُوۡسٰی لَنۡ نَّصۡبِرَ عَلٰی طَعَامٍ وَّاحِدٍ فَادۡعُ لَنَا رَبَّکَ یُخۡرِجۡ لَنَا مِمَّا تُنۡۢبِتُ الۡاَرۡضُ مِنۡۢ بَقۡلِہَا وَقِثَّآئِہَا وَفُوۡمِہَا وَعَدَسِہَا وَبَصَلِہَا ؕ  قَالَ اَتَسۡتَبۡدِلُوۡنَ الَّذِیۡ ہُوَ اَدۡنٰی بِالَّذِیۡ ہُوَ خَیۡرٌ ؕ  اِہۡبِطُوۡا مِصۡرًا فَاِنَّ لَکُمۡ مَّا سَاَلۡتُمۡ ؕ  وَضُرِبَتۡ عَلَیۡہِمُ الذِّلَّۃُ وَالۡمَسۡکَنَۃُ ٭  وَبَآءُوۡ بِغَضَبٍ مِّنَ اللّٰہِ ؕ  ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ بِاٰیٰتِ اللّٰہِ وَیَقۡتُلُوۡنَ النَّبِیّٖنَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ ؕ  ذٰلِکَ بِمَا عَصَوۡا وَّکَانُوۡا یَعۡتَدُوۡنَ ٪ ٦١

ওয়া ইযকুলতুম ইয়া-মূছা-লান নাসবিরা ‘আলা- তা‘আ-মিওঁ ওয়া-হিদিন ফাদ‘উলানারাব্বাকা ইউখরিজলানা- মিম্মা-তুমবিতুল আরদুমিম বাকলিহা- ওয়াকিছছাইহা-ওয়াফূমিহা- ওয়া‘আদাছিহা-ওয়া বাসালিহা-; কা-লা আতাছতাবদিলূনাল্লাযী হুওয়া আদনাবিল্লাযী হুওয়া খাইরুন ইহবিতূমিসরান ফাইন্না লাকুম মা- ছাআলতুম ওয়া দুরিবাত ‘আলাইহিমুযযিল্লাতু ওয়ালমাছকানাতু ওয়াবাউ বিগাদাবিম মিনাল্লা-হি যা-লিকা বিআন্নাহুম কা-নূইয়াকফুরূনা বিআ-য়া-তিল্লা-হি ওয়া ইয়াকতুলূনান্নাবিইঈনা বিগাইরিল হাক্কিযা-লিকা বিমা-‘আসাও ওয়া কা-নূইয়া‘তাদূ ন।

এবং (সেই সময়ের কথাও স্মরণ কর) যখন তোমরা বলেছিলে, হে মূসা! আমরা একই খাবারে সবর করতে পারব না। সুতরাং স্বীয় প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের জন্য ভূমিজাত দ্রব্য হতে কিছু উৎপন্ন করেন অর্থাৎ জমির তরকারি, কাঁকড়, গম, ডাল, ও পিঁয়াজ। মূসা বলল, যে খাবার উৎকৃষ্ট ছিল, তোমরা কি তাকে এমন জিনিস দ্বারা পরিবর্তন করতে চাচ্ছ, যা নিকৃষ্ট? (ঠিক আছে,) কোনও নগরে গিয়ে অবতরণ কর। (সেখানে) তোমরা যা চেয়েছ সেসব জিনিস পেয়ে যাবে। ৫২ আর তাদের (ইয়াহুদীদের) উপর লাঞ্ছনা ও অসহায়ত্বের ছাপ মেরে দেওয়া হল এবং তারা আল্লাহর গযব নিয়ে ফিরল। তা এ কারণে যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করত এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তা এ কারণে যে, তারা নাফরমানী করেছিল এবং তারা অত্যধিক সীমালংঘন করত।

তাফসীরঃ

৫২. পূর্বে ৪৫নং টীকায় যা লেখা হয়েছে, এটাই সে ঘটনা।
৬২

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَادُوۡا وَالنَّصٰرٰی وَالصّٰبِئِیۡنَ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۪ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ٦٢

ইন্নাল্লাযীনা আ-মানূওয়াল্লাযীনা হা-দূওয়ান্নাসা-রা- ওয়াসসা-বিঈনা মান আ-মানা বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়া‘আমিলা সা-লিহান ফালাহুম আজরুহুম ‘ইনদা রাব্বিহিম ওয়ালা- খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালা-হুম ইয়াহঝানূন।

(সার কথা,) মুসলিম হোক বা ইয়াহুদী, খ্রিস্টান হোক বা সাবী, যে-কেউ আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, তারা আল্লাহর নিকট নিজ প্রতিদানের উপযুক্ত হবে এবং তাদের কোনও ভয় থাকবে না আর তারা কোনও দুঃখেও ভুগবে না। ৫৩

তাফসীরঃ

৫৩. বনী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহরাজি ও তাদের অবাধ্যতা সম্পর্কিত আলোচনার মাঝখানে এ আয়াতে তাদের একটা মিথ্যা ধারণা রদ করা হয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, কেবল তাদের বংশই আল্লাহ তাআলার মনোনীত ও প্রিয় বান্দা। তাদের খান্দানের বাইরে অন্য কোনও মানুষ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ লাভের উপযুক্ত নয়। (আজও ইয়াহুদীরা এরূপ বিশ্বাসই পোষণ করে থাকে। এ কারণেই ইয়াহুদী ধর্ম মূলত একটি বংশভিত্তিক ধর্ম। এ বংশের বাইরে কোনও লোক যদি এ ধর্ম গ্রহণ করতে চায়, তবে প্রথমত তার সে সুযোগই নেই, আর যদি গ্রহণ করেও নেয়, তবে ইয়াহুদী বংশীয় কোনও ব্যক্তি যেসব অধিকার ভোগ করে থাকে, সে তা ভোগ করতে পারে না)। এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ‘সত্য’ কোনও বংশের একচেটিয়া ব্যাপার নয়। মূল বিষয় হচ্ছে ঈমান ও সৎকর্ম। যে ব্যক্তিই আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান আনয়ন ও সৎকর্মের মৌলিক শর্তাবলী পূরণ করবে, সে-ই আল্লাহ তাআলার নিকট পুরস্কারের হকদার হবে, তাতে পূর্বে সে যে ধর্ম ও বংশের সাথেই সম্পৃক্ত থাকুক। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান ছাড়া কিছু সংখ্যক নক্ষত্র পূজক লোকও আরবে বাস করত। তাদেরকে ‘সাবী’ বলা হত। তাই এ আয়াতে তাদেরও নাম নেওয়া হয়েছে। প্রকাশ থাকে যে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন বলতে তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নকেও বোঝায়। সুতরাং মুক্তি লাভের জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনাও জরুরী। পূর্বে ৪০-৪১ নং আয়াতে এ কারণেই সমস্ত বনী ইসরাঈলকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আরও দ্র. কুরআন মাজীদ ৫ : ৬৫-৬৮; ৭ : ১৫৫-১৫৭।
৬৩

وَاِذۡ اَخَذۡنَا مِیۡثَاقَکُمۡ وَرَفَعۡنَا فَوۡقَکُمُ الطُّوۡرَ ؕ خُذُوۡا مَاۤ اٰتَیۡنٰکُمۡ بِقُوَّۃٍ وَّاذۡکُرُوۡا مَا فِیۡہِ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ٦٣

ওয়া ইযআখাযনা-মীছা-কাকুম ওয়া রাফা‘না-ফাওকাকুমুত্তূরা; খুযূমাআ-তাইনা-কুম বিকুওওয়াতিওঁ ওয়াযকুরূমা-ফীহি লা‘আল্লাকুম তাত্তাকূন।

এবং (সেই সময়ের কথাও স্মরণ কর) যখন আমি তোমাদের থেকে (তাওরাতের অনুসরণ সম্পর্কে) প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম এবং তূর পাহাড়কে তোমাদের উপর উত্তোলন করে ধরেছিলাম (আর বলেছিলাম যে,) আমি তোমাদেরকে যা (যে কিতাব) দিয়েছি, তা শক্ত করে ধর ৫৪ এবং তাতে যা (লেখা) আছে তা স্মরণ রাখ, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।

তাফসীরঃ

৫৪. হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাওরাত নিয়ে আসলে বনী ইসরাঈল লক্ষ্য করে দেখল তার কোনও কোনও বিধান বেশ কঠিন। তাই তারা তা থেকে বাঁচার অজুহাত খুঁজতে শুরু করল। প্রথমে তারা বলল, আল্লাহ তাআলা স্বয়ং আমাদের বলে দিন যে, তাওরাত মানা আমাদের জন্য অপরিহার্য। তাদের এ দাবী যদিও অযৌক্তিক ছিল, তথাপি প্রমাণ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে এটা মেনে নেওয়া হল। সুতরাং তাদের মধ্য থেকে সত্তর জন লোককে বাছাই করে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সাথে তূর পাহাড়ে পাঠানো হল (যেমন সূরা আরাফের (৭ : ১৫৫) নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে)। আল্লাহ তাআলা সরাসরি তাদেরকে তাওরাত মেনে চলার হুকুম দিলেন। অতঃপর তারা যখন ফিরে আসল, তখন নিজ সম্প্রদায়ের সামনে আল্লাহ তাআলার সে হুকুমের কথা তো স্বীকার করল, কিন্তু নিজেদের পক্ষ থেকে একটা কথা যোগ করে দিল। তারা বলল, আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, তোমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু মেনে চলবে; যা পারবে না আমি তা ক্ষমা করে দেব। সুতরাং তাওরাতের যে নির্দেশই তাদের দৃষ্টিতে কিছুটা কঠিন মনে হত, তারা বাহানা তৈরি করে বলত, এটাও সেই ছাড় দেওয়া নির্দেশসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তূর পাহাড়কে তাদের মাথার উপর তুলে ধরে বললেন, তাওরাতের সমুদয় বিধান মেনে নাও। তাদের যখন আশংকা হল, পাহাড়টিকে তাদের উপর ছেড়ে দেওয়া হতে পারে, তখন তারা তাওরাত মানার ও সে অনুযায়ী আমল করার প্রতিশ্রুতি দিল। এ আয়াতে সে ঘটনার প্রতিই ইশারা করা হয়েছে। তূর পাহাড়কে তাদের মাথার উপর তুলে ধরাটা প্রকৃত ও বাচ্যার্থেও সম্ভব। অর্থাৎ পাহাড়টিকে তার স্থান থেকে উৎপাটিত করে তাদের মাথার উপরে ঝুলিয়ে ধরা হয়েছিল। হাফেজ ইবনে জারীর (রহ.) বহু তাবিঈ হতে এরূপ বর্ণনা করেছেন। বলাবাহুল্য, আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতা হিসেবে এটা কিছু কঠিন কাজ নয়। আবার এমনও হতে পারে যে, এমন কোনও পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, যদ্দরুণ তাদের মনে হয়েছিল পাহাড়টি বুঝি তাদের উপর পতিত হবে, যেমন হয়ত তখন প্রচণ্ড ভূমিকম্প দেখা দিয়েছিল। ফলে তাদের ধারণা হয়েছিল পাহাড়টি উৎপাটিত হয়ে তাদের উপর পড়বে। সুতরাং এ ঘটনা সম্পর্কে সূরা আরাফে বর্ণিত হয়েছে, وَإِذْ نَتَقْنَا الْجَبَلَ فَوْقَهُمْ كَأَنَّهُ ظُلَّةٌ وَظَنُّوْا أَنَّهُ وَاقِعٌ بِهِمْ আরাফ (৭ : ১৭১)। এতে نتق শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যার এক অর্থ সজোরে নাড়ানো (দেখুন আল-কামূস ও মুফরাদাতুল কুরআন)। সুতরাং আয়াতটির এরূপ অর্থও করা যেতে পারে যে, ‘যখন আমি পাহাড়কে তাদের উপর সজোরে এমনভাবে নাড়াতে থাকি যে, তাদের মনে হচ্ছিল সেটি তাদের উপর পতিত হবে। প্রকাশ থাকে যে, কাউকে চাপ সৃষ্টি করে ঈমান আনতে বাধ্য করা যায় না বটে, কিন্তু কেউ যদি ঈমান আনার পর নাফরমানী করে, তবে সেজন্য তাকে শাস্তি দেওয়া এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে হুকুম মানতে প্রস্তুত করা মোটেই অসঙ্গত নয়। বনী ইসরাঈল যেহেতু আগেই ঈমান এনেছিল, তাই আল্লাহর আযাবের ভয় দেখিয়ে তাদেরকে আনুগত্য করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
৬৪

ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ ۚ فَلَوۡلَا فَضۡلُ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ وَرَحۡمَتُہٗ لَکُنۡتُمۡ مِّنَ الۡخٰسِرِیۡنَ ٦٤

ছু ম্মা তাওয়াল্লাইতুম মিম বা‘দি যা-লিকা, ফালাও লা-ফাদলুল্লা-হি ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুহূ লাকুনতুম মিনাল খা-ছিরীন।

এসব কিছুর পর তোমরা পুনরায় (সঠিক পথ থেকে) ফিরে গেলে। যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না হত, তবে তোমরা অবশ্যই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে।
৬৫

وَلَقَدۡ عَلِمۡتُمُ الَّذِیۡنَ اعۡتَدَوۡا مِنۡکُمۡ فِی السَّبۡتِ فَقُلۡنَا لَہُمۡ کُوۡنُوۡا قِرَدَۃً خٰسِئِیۡنَ ۚ ٦٥

ওয়া লাকাদ ‘আলিমতুমুল্লাযীনা‘তাদাও মিনকুম ফিছছাবতি ফাকুলনা-লাহুম কূনূকিরাদাতান খা-ছিঈন।

এবং তোমরা নিজেদের সেই সকল লোককে ভাল করেই জান, যারা শনিবার বিষয়ে সীমালংঘন করেছিল। ফলে আমি তাদেরকে বলেছিলাম, তোমরা ধিকৃত বানরে পরিণত হও। ৫৫

তাফসীরঃ

৫৫. আরবী ও হিব্রু ভাষায় শনিবারকে ‘সাবত’ বলে। ইয়াহুদীদের জন্য ‘সাবত’কে পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ দিন সাব্যস্ত করা হয়েছিল। এ দিন তাদের জন্য আয়-রোজগারমূলক তৎপরতা নিষিদ্ধ ছিল। এস্থলে যে ইয়াহুদীদের কথা বলা হচ্ছে তারা (খুব সম্ভব হযরত দাঊদ আলাইহিস সালামের আমলে) কোনও সাগর উপকূলে বাস করত ও মৎস্য শিকার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের জন্য শনিবার দিন মাছ ধরা নিষেধ ছিল। কিন্তু প্রথম দিকে তারা কিছুটা ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে চাইল এবং পরের দিকে তারা প্রকাশ্যেই মাছ ধরা শুরু করে দিল। কিছু সংখ্যক নেককার লোক তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তাতে তারা নিবৃত্ত হল না। পরিশেষে তাদের উপর আযাব আসল এবং তাদের আকৃতি বিকৃত করে বানর বানিয়ে দেওয়া হল। এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সূরা আরাফে আসছে। (৭ : ১৬৩-১৬৬)
৬৬

فَجَعَلۡنٰہَا نَکَالًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡہَا وَمَا خَلۡفَہَا وَمَوۡعِظَۃً لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ٦٦

ফাজা‘আলনা-হা-নাকা-লালিলমা-বাইনাইয়াদাইহা-ওয়ামা-খালফাহা ওয়ামাও‘ইজাতালিললমুত্তাকীন।

অতঃপর আমি এ ঘটনাকে সেই কালের ও তার পরবর্তী কালের লোকদের জন্য দৃষ্টান্ত এবং যারা ভয় করে তাদের জন্য উপদেশ গ্রহণের মাধ্যমে বানিয়ে দেই।
৬৭

وَاِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِقَوۡمِہٖۤ اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تَذۡبَحُوۡا بَقَرَۃً ؕ قَالُوۡۤا اَتَتَّخِذُنَا ہُزُوًا ؕ قَالَ اَعُوۡذُ بِاللّٰہِ اَنۡ اَکُوۡنَ مِنَ الۡجٰہِلِیۡنَ ٦٧

ওয়া ইযকা-লা মূছা- লিকাওমিহী ইন্নাল্লা-হা ইয়া’মুরূকুম আন তাযবাহুবাকারাতান কা-লূআতাত্তাখিযুনা হুঝুওয়ান কা-লা আ‘ঊযুবিল্লা-হি আন আকূনা মিনাল জা-হিলীন।

এবং (সেই সময়ের কথাও স্মরণ কর), যখন মূসা নিজ সম্প্রদায়কে বলেছিল, আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গাভী যবাহ করতে আদেশ করছেন। তারা বলল, আপনি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? ৫৬ মূসা বলল, আমি আল্লাহর কাছে (এমন) অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে পানাহ চাই (যারা ঠাট্টাস্বরূপ মিথ্যা কথা বলে)

তাফসীরঃ

৫৬. সামনে ৭২নং আয়াতে আসছে যে, এ হুকুম দেওয়া হয়েছিল এক নিহত ব্যক্তির হত্যাকারী সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে। তাই বনী ইসরাঈল এটাকে ঠাট্টা মনে করেছিল। তাদের বুঝে আসছিল না, গাভী যবাহের দ্বারা হত্যাকারীকে জানা যাবে কিভাবে।
৬৮

قَالُوا ادۡعُ لَنَا رَبَّکَ یُبَیِّنۡ لَّنَا مَا ہِیَ ؕ قَالَ اِنَّہٗ یَقُوۡلُ اِنَّہَا بَقَرَۃٌ لَّا فَارِضٌ وَّلَا بِکۡرٌ ؕ عَوَانٌۢ بَیۡنَ ذٰلِکَ ؕ فَافۡعَلُوۡا مَا تُؤۡمَرُوۡنَ ٦٨

কা-লুদ‘উলানা- রাব্বাকা ইউবাইয়িল্লানা- মা-হিয়া কা-লা ইন্নাহূ ইয়াকূলুইন্নাহাবাকারাতুল লা-ফা-রিদুওঁ ওয়ালা-বিকরুন ‘আওয়া-নুম বাইনা যা-লিকা ফাফ‘আলূ মা-তু’মারূন।

তারা বলল, আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য আবেদন করুন, তিনি যেন আমাদেরকে স্পষ্ট করে বলে দেন, সে গাভীটি কেমন হবে। সে বলল, আল্লাহ বলছেন, সেটি অতি বয়স্ক হবে না এবং অতি বাচ্চাও নয়- (বরং) উভয়ের মাঝামাঝি হবে। সুতরাং তোমাদেরকে যে আদেশ করা হয়েছে তা এখন পালন কর।
৬৯

قَالُوا ادۡعُ لَنَا رَبَّکَ یُبَیِّنۡ لَّنَا مَا لَوۡنُہَا ؕ قَالَ اِنَّہٗ یَقُوۡلُ اِنَّہَا بَقَرَۃٌ صَفۡرَآءُ ۙ فَاقِعٌ لَّوۡنُہَا تَسُرُّ النّٰظِرِیۡنَ ٦٩

কালুদ‘উ লানা- রাব্বাকা ইউবাইয়িল্লানা-মা-লাওনুহা- কা-লা ইন্নাহূ ইয়াকূলুইন্নাহাবাকারাতুন সাফরাউ ফা-কি‘উল্লাওনুহা- তাছুররুন্না-জিরীন।

তারা বলল, আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে আবেদন করুন, তিনি যেন আমাদেরকে স্পষ্ট করে বলে দেন, তার রং কী হবে? মূসা বলল, আল্লাহ বলছেন, তা এমন গাঢ় হলুদ বর্ণের হবে, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে দেয়।
৭০

قَالُوا ادۡعُ لَنَا رَبَّکَ یُبَیِّنۡ لَّنَا مَا ہِیَ ۙ اِنَّ الۡبَقَرَ تَشٰبَہَ عَلَیۡنَا ؕ وَاِنَّاۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰہُ لَمُہۡتَدُوۡنَ ٧۰

কা-লুদ‘উলানা-রাববকা ইউবাইয়িল্লানা- মা-হিয়া ইন্নাল বাকারা তাশা-বাহা ‘আলাইনা-ওয়া ইন্না ইনশাআল্লা-হু লামুহতাদূ ন।

তারা (আবার) বলল, আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে আবেদন করুন, তিনি যেন আমাদেরকে স্পষ্ট করে দেন, সে গাভীটি কেমন হবে? গাভীটি তো আমাদেরকে সন্দেহে ফেলে দিয়েছে। আল্লাহ চাইলে আমরা অবশ্যই সেটির দিশা পেয়ে যাব।
৭১

قَالَ اِنَّہٗ یَقُوۡلُ اِنَّہَا بَقَرَۃٌ لَّا ذَلُوۡلٌ تُثِیۡرُ الۡاَرۡضَ وَلَا تَسۡقِی الۡحَرۡثَ ۚ  مُسَلَّمَۃٌ لَّا شِیَۃَ فِیۡہَا ؕ  قَالُوا الۡـٰٔنَ جِئۡتَ بِالۡحَقِّ ؕ  فَذَبَحُوۡہَا وَمَا کَادُوۡا یَفۡعَلُوۡنَ ٪ ٧١

কা-লা ইন্নাহূ, ইয়াকূলুইন্নাহা-বাকারাতুল্লা- যালূলুন তুছীরুল আরদা ওয়ালা-তাছকিল হারছা মুছাল্লামাতুল লা-শিয়াতা ফীহা- কা-লুল আ-না জি’তা বিলহাক্কি ফাযাবাহুহা-ওয়ামা-কা-দূইয়াফ‘আলূন।

মূসা বলল, আল্লাহ বলছেন, সেটি এমন গাভী, যা জমি কর্ষণে ব্যবহৃত নয় এবং যা ক্ষেতে পানিও দেয় না। সম্পূর্ণ সুস্থ, যাতে কোনও দাগ নেই। তারা বলল, হ্যাঁ এবার আপনি যথাযথ দিশা নিয়ে এসেছেন। অতঃপর তারা সেটি যবাহ করল, যদিও মনে হচ্ছিল না তারা তা করতে পারবে। ৫৭

তাফসীরঃ

৫৭. অর্থাৎ প্রথমে যখন তাদেরকে গাভী যবাহ করার হুকুম দেওয়া হয়েছিল, তখন বিশেষ কোনও গাভীর কথা বলা হয়নি। কাজেই তখন যে-কোনও একটা গাভী যবাহ করলেই হুকুম পালন হয়ে যেত, কিন্তু তারা অহেতুক খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দিল। পরিণামে আল্লাহ তাআলাও নিত্য-নতুন শর্ত আরোপ করতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত সেসব শর্ত মোতাবেক গাভী খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে গেল। এক পর্যায়ে উপলব্ধি করা যাচ্ছিল তারা বুঝি এমন গাভী তালাশ করে যবাহ করতে সক্ষমই হবে না। এ ঘটনার ভেতর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, অহেতুক অপ্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের পেছনে পড়া ঠিক নয়। যে বিষয় যতটুকু সাদামাটা হয়, তাকে সেরূপ সাদামাটাভাবেই আমল করা উচিত।
৭২

وَاِذۡ قَتَلۡتُمۡ نَفۡسًا فَادّٰرَءۡتُمۡ فِیۡہَا ؕ  وَاللّٰہُ مُخۡرِجٌ مَّا کُنۡتُمۡ تَکۡتُمُوۡنَ ۚ ٧٢

ওয়া ইযকাতালতুম নাফছান ফাদ্দা-রা’তুম ফীহা- ওয়াল্লা-হু মুখরিজুম মা-কুনতুম তাকতুমূন।

এবং (স্মরণ কর) যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে, তারপর তোমরা তার ব্যাপারে একে অন্যের উপর দোষ চাপাচ্ছিলে। আর তোমরা যা গোপন করছিলে আল্লাহ সে রহস্য প্রকাশ করবার ছিলেন।
৭৩

فَقُلۡنَا اضۡرِبُوۡہُ بِبَعۡضِہَا ؕ کَذٰلِکَ یُحۡیِ اللّٰہُ الۡمَوۡتٰی ۙ وَیُرِیۡکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ ٧٣

ফাকুলনাদরিবূহু ব্বিা‘দিহা- কাযা-লিকা ইউহইল্লা-হুল মাওতা- ওয়া ইউরীকুম আ-য়া-তিহী লা‘আল্লাকুম তা‘কিলূন।

অতঃপর আমি বললাম, তাকে (নিহতকে) তার (গাভীর) একটা অংশ দ্বারা আঘাত কর। ৫৮ এভাবেই আল্লাহ মৃতদেরকে জীবিত করেন এবং তোমাদেরকে নিজ (কুদরতের) নিদর্শনাবলী দেখান, যাতে তোমরা বুঝতে পার।

তাফসীরঃ

৫৮. ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহে প্রকাশ যে, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি মীরাছের লোভে তার ভাইকে হত্যা করল এবং তার লাশ সড়কের উপর ফেলে রাখল। তারপর ঘাতক নিজেই হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে মোকদ্দমা দায়ের করল এবং ঘাতককে গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়ার দাবী জানাল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তাদেরকে একটি গাভী যবাহ করতে বললেন, যেমন আয়াতে বিবৃত হয়েছে। গাভীটি যবাহ করা হলে তিনি বললেন, এর একটা অঙ্গ দ্বারা লাশকে আঘাত কর। তাহলে সে জীবিত হয়ে তার খুনীর নাম বলে দেবে। সুতরাং তাই হল এবং এভাবে খুনীর মুখোশ খুলে গেল ও তাকে গ্রেফতার করা হল। তাকে খুঁজে বের করার এই যে পন্থা অবলম্বন করা হল, এর একটা ফায়দা তো এই যে, এর ফলে খুনীর ছল-চাতুরি করার পথ বন্ধ হয়ে গেল। দ্বিতীয়ত আল্লাহ তাআলা যে মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন, তার একটি বাস্তব নমুনা দেখিয়ে সেই সকল লোকের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হল, যারা মৃত্যুর পর পুনর্জীবনকে অসম্ভব মনে করছিল। সম্ভবত এ ঘটনার পর থেকেই বনী ইসরাঈলের মধ্যে এই রীতি চালু হয়েছে যে, যদি কেউ নিহত হয় এবং তার হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া না যায়, তবে একটি গাভী যবাহ করে তার রক্তে হাত ধোয়া হয় এবং কসম করা হয় যে, আমরা তাকে হত্যা করিনি। বাইবেলের দ্বিতীয় বিবরণে (১২:১-৮) এর উল্লেখ রয়েছে।
৭৪

ثُمَّ قَسَتۡ قُلُوۡبُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ فَہِیَ کَالۡحِجَارَۃِ اَوۡ اَشَدُّ قَسۡوَۃً ؕ وَاِنَّ مِنَ الۡحِجَارَۃِ لَمَا یَتَفَجَّرُ مِنۡہُ الۡاَنۡہٰرُ ؕ وَاِنَّ مِنۡہَا لَمَا یَشَّقَّقُ فَیَخۡرُجُ مِنۡہُ الۡمَآءُ ؕ وَاِنَّ مِنۡہَا لَمَا یَہۡبِطُ مِنۡ خَشۡیَۃِ اللّٰہِ ؕ وَ مَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ ٧٤

ছু ম্মা কাছাত কুলূবুকুম মিম বা‘দি যা-লিকা ফাহিয়া কাল হিজা-রাতি আও আশাদ্দু কাছওয়াতাওঁ ওয়াইন্না মিনাল হিজা-রাতি লামা-ইয়াতাফাজ্জারু মিনহুল আনহা-রু ওয়াইন্না মিনহা-লামা-ইয়াশশাক্কাকু ফাইয়াখরুজুমিনহুল মাউ ওয়া ইন্না মিনহা-লামা-ইয়াহবিতুমিন খাশইয়াতিল্লা-হি ওয়ামাল্লা-হু বিগা-ফিলিন ‘আম্মা-তা‘মালূন।

এসব কিছুর পর তোমাদের অন্তর আবার শক্ত হয়ে গেল, এমনকি তা হয়ে গেল পাথরের মত; বরং তার চেয়েও বেশি শক্ত। (কেননা) পাথরের মধ্যে কিছু তো এমনও আছে, যা থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয়, তার মধ্যে কিছু এমন আছে যা ফেটে যায় এবং তা থেকে পানি নির্গত হয়, আবার তার মধ্যে এমন (পাথর)-ও আছে, যা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে। ৫৯ আর (এর বিপরীতে) তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অনবহিত নন।

তাফসীরঃ

৫৯. অর্থাৎ কখনও পাথর থেকে ঝর্নাধারা বের হয়ে আসে, যেমন বনী ইসরাঈল নিজেদের চোখেই দেখতে পেয়েছিল, কিভাবে পাথরের এক চাঁই থেকে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়েছিল (দেখুন ২ : ৬০)। অনেক সময় অত বেশি পানি বের না হলেও পাথর বিদীর্ণ হয়ে অল্প-বিস্তর পানি নিঃসৃত হয়। আবার কিছু পাথর আল্লাহর ভয়ে কেঁপে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের দিল্ এমনই শক্ত যে, একদম গলে না। একটা কাল তো এমন ছিল যখন নিষ্প্রাণ পাথর কিভাবে ভয় পেতে পারে তা কিছু লোকের বুঝে আসত না, কিন্তু কুরআন মাজীদ কয়েক জায়গায় এ বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আমরা আপাতদৃষ্টিতে যেসব জিনিসকে নিষ্প্রাণও অনুভূতিহীন মনে করি, তার মধ্যেও কিছু না কিছু অনুভূতি আছে। দেখুন সূরা বনী ইসরাঈল (১৭ : ৪৪) ও সূরা আহযাব (৩৩ : ২৭)। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যখন বলছেন, কিছু পাথর আল্লাহর ভয়ে প্রকম্পিত হয়, তখন তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। বর্তমানে তো বিজ্ঞান ক্রমশ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে যে, জড় পদার্থের ভেতরেও বর্ধন ও অনুভূতির কিছু না কিছু যোগ্যতা রয়েছে।
৭৫

اَفَتَطۡمَعُوۡنَ اَنۡ یُّؤۡمِنُوۡا لَکُمۡ وَقَدۡ کَانَ فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ یَسۡمَعُوۡنَ کَلٰمَ اللّٰہِ ثُمَّ یُحَرِّفُوۡنَہٗ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا عَقَلُوۡہُ وَہُمۡ یَعۡلَمُوۡنَ ٧٥

আফাতাতমা‘ঊনা আইঁ ইউ’মিনূ লাকুম ওয়া কাদ কা-না ফারীকুম মিনহুম ইয়াছমা‘ঊনা কালা-মাল্লা-হি ছুম্মা ইউহাররিফূনাহু মিম বা‘দি মা- ‘আকালূহু ওয়া হুম ইয়া‘লামূন।

(হে মুসলিমগণ!) এখনও কি তোমরা এই আশা কর যে, তোমাদের কথায় তারা ঈমান আনবে? অথচ তাদের মধ্যে একটি দল এমন ছিল, যারা আল্লাহর কালাম শুনত। অতঃপর তা ভালোভাবে বোঝার পরও জেনে-শুনে তাতে বিকৃতি ঘটাত।
৭৬

وَاِذَا لَقُوا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قَالُوۡۤا اٰمَنَّا ۚۖ وَاِذَا خَلَا بَعۡضُہُمۡ اِلٰی بَعۡضٍ قَالُوۡۤا اَتُحَدِّثُوۡنَہُمۡ بِمَا فَتَحَ اللّٰہُ عَلَیۡکُمۡ لِیُحَآجُّوۡکُمۡ بِہٖ عِنۡدَ رَبِّکُمۡ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ٧٦

ওয়া ইযা-লাকুল্লাযীনা আ-মানূ কা-লুআ-মান্না- ওয়াইযা-খালা-বা‘দুহুম ইলা-বা‘দিন কা-লূ আতুহাদ্দিছূনাহুম বিমা- ফাতাহাল্লা-হু ‘আলাইকুম লিইউহাজ্জূকুম বিহী ‘ইনদারাব্বিকুম আফালা-তা‘কিলূন।

যখন এরা তাদের (সেই মুসলিমদের) সাথে মিলিত হয়, যারা আগেই ঈমান এনেছে, তখন (মুখে) বলে দেয়, আমরা (-ও) ঈমান এনেছি। আবার এরা যখন নিভৃতে একে অন্যের সাথে মিলিত হয়, তখন (পরস্পরে একে অন্যকে) বলে, তোমরা কি তাদেরকে (মুসলিমদেরকে) সেই সব কথা বলে দিচ্ছ, যা আল্লাহ তোমাদের কাছে প্রকাশ করেছেন? তবে তো তারা (মুসলিমগণ) তোমাদের প্রতিপালকের কাছে গিয়ে সেগুলোকে তোমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণরূপে পেশ করবে! ৬০ তোমাদের কি এতটুকু বুদ্ধিও নেই?

তাফসীরঃ

৬০. তাওরাতে শেষ নবী সম্পর্কে যে সব ভবিষ্যদ্বাণীর উল্লেখ ছিল তার প্রত্যেকটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হুবহু মিলে যেত। মুসলিমদের সামনে নিজেকে মুসলিমরূপে পরিচয় দিত- এমন কোনও কোনও মুনাফিক ইয়াহুদী সে সব ভবিষ্যদ্বাণী মুসলিমদেরকে শোনাত। এ কারণে অন্যান্য ইয়াহুদীরা তাদেরকে নিভৃতে তিরস্কার করত। বলত, মুসলিমগণ এসব ভবিষ্যদ্বাণী জেনে ফেললে কিয়ামতের দিন এগুলোকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। আর তখন আমাদের কাছে কোনও জবাব থাকবে না। বলাবাহুল্য, এটা ছিল তাদের চরম নির্বুদ্ধিতা। কেননা মুসলিমদের থেকে এসব ভবিষ্যদ্বাণী গোপন করতে পারলেও আল্লাহ তাআলার থেকে তো তা গোপন করা সম্ভব ছিল না।
৭৭

اَوَلَا یَعۡلَمُوۡنَ اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا یُسِرُّوۡنَ وَمَا یُعۡلِنُوۡنَ ٧٧

আওয়ালা-ইয়া‘লামূনা আন্নাল্লা-হা ইয়া‘লামুমা-ইউছিররূনা ওয়ামা-ইউ‘লিনূন।

এসব লোক কি (যারা এ রকম কথা বলে,) জানে না যে, তারা যে সব কথা গোপন করে ও যা প্রকাশ করে সবই আল্লাহ জানেন?
৭৮

وَمِنۡہُمۡ اُمِّیُّوۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ الۡکِتٰبَ اِلَّاۤ اَمَانِیَّ وَاِنۡ ہُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ ٧٨

ওয়া মিনহুম উম্মিইয়ূনা লা-ইয়া‘লামূনাল কিতা-বা ইল্লা আমা-নিইইয়া ওয়াইনহুম ইল্লা-ইয়াজু ন্নূন।

তাদের মধ্যে কিছু লোক আছে নিরক্ষর, যারা কিতাব (তাওরাত)-এর কোনও জ্ঞান তো রাখে না, তবে কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা পুষে রেখেছে। তারা কেবল অমূলক ধারণাই করে।
৭৯

فَوَیۡلٌ لِّلَّذِیۡنَ یَکۡتُبُوۡنَ الۡکِتٰبَ بِاَیۡدِیۡہِمۡ ٭ ثُمَّ یَقُوۡلُوۡنَ ہٰذَا مِنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ لِیَشۡتَرُوۡا بِہٖ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ؕ فَوَیۡلٌ لَّہُمۡ مِّمَّا کَتَبَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ وَوَیۡلٌ لَّہُمۡ مِّمَّا یَکۡسِبُوۡنَ ٧٩

ফাওয়াইলুল লিল্লাযীনা ইয়াকতুবূনাল কিতা-বা বিআইদীহিম ছু ম্মা ইয়াকূলূনা হা-যা-মিন ‘ইনদিল্লা-হি লিইয়াশতারূ বিহী ছামানান কালীলান ফাওয়াইলুল্লাহুম মিম্মা-কাতাবাত আইদিহিম ওয়া ওয়াইলুল্লাহুম মিম্মা-ইয়াকছিবূন।

সুতরাং ধ্বংস সেই সকল লোকের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, তারপর (মানুষকে) বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে, যাতে তার মাধ্যমে কিঞ্চিত আয়-রোজগার করতে পারে। ৬১ সুতরাং তাদের হাত যা রচনা করেছে সে কারণেও তাদের জন্য ধ্বংস এবং তারা যা উপার্জন করেছে, সে কারণেও তাদের জন্য ধ্বংস।

তাফসীরঃ

৬১. কুরআন মাজীদ এ স্থলে আলোচনার ক্রমবিন্যাস করেছে এভাবে যে, প্রথমে ইয়াহুদীদের সেইসব উলামার অবস্থা তুলে ধরেছে, যারা জেনেশুনে তাওরাতের মধ্যে রদবদল করত। তারপর সেইসব অজ্ঞ-নিরক্ষর ইয়াহুদী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যারা তাওরাতের কোনও জ্ঞান রাখত না; বরং উপরিউক্ত আলেমগণ তাদেরকে মিথ্যা আশার মধ্যে ভুলিয়ে রেখেছিল। তারা তাদেরকে বলে রেখেছিল যে, সমস্ত ইয়াহুদী আল্লাহর প্রিয়পাত্র। সর্বাবস্থায়ই তারা জান্নাতে যাবে। এ শ্রেণীর লোকের জ্ঞান বলতে কেবল এসব মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষাই ছিল। তাদের এসব ধারণার ভিত্তি যেহেতু ছিল তাদের আলেমদের দীনী অপব্যাখ্যা, তাই ৭৯ নং আয়াতে বিশেষভাবে সেই অপব্যাখ্যাকারী ধর্মবেত্তাদের ধ্বংস ও সর্বনাশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৮০

وَقَالُوۡا لَنۡ تَمَسَّنَا النَّارُ اِلَّاۤ اَیَّامًا مَّعۡدُوۡدَۃً ؕ قُلۡ اَتَّخَذۡتُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ عَہۡدًا فَلَنۡ یُّخۡلِفَ اللّٰہُ عَہۡدَہٗۤ اَمۡ تَقُوۡلُوۡنَ عَلَی اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٨۰

ওয়াকা-লূলান তামাছ ছানান্না-রু ইল্লা আইইয়া-মাম মা‘দূদাতান কুল আত্তাখাযতুম ‘ইনদাল্লা-হি ‘ আহদান ফালাইঁ ইউখলিফাল্লা-হু ‘আহদাহূ আম তাকূলূনা ‘আলাল্লা-হি মা-লা-তা‘লামূন।

ইয়াহুদীরা বলে, আগুন কখনই আমাদেরকে গণা-গুণতি কয়েক দিনের বেশি স্পর্শ করবে না। আপনি তাদেরকে বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহর পক্ষ হতে কোনও প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছ, ফলে আল্লাহ তাঁর সে প্রতিশ্রুতির বিপরীত কাজ করবেন না, না কি তোমরা আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করছ, যে সম্পর্কে তোমাদের কোনও খবর নেই?
৮১

بَلٰی مَنۡ کَسَبَ سَیِّئَۃً وَّاَحَاطَتۡ بِہٖ خَطِیۡٓــَٔتُہٗ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٨١

বালা- মান কাছাবা ছাইয়িআতাওঁ ওয়া আহা-তাত বিহী খাতীআতুহূ ফাউলাইকা আসহা-বুন্না-রি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।

(আগুন তোমাদেরকে কেন স্পর্শ করবে না,) অবশ্যই (করবে), যেসব লোক পাপ কামায় এবং তার পাপ তাকে বেষ্টন করে ফেলে, ৬২ তারাই জাহান্নামবাসী। তারা সর্বদা সেখানে থাকবে।

তাফসীরঃ

৬২. পাপের দ্বারা তাদের বেষ্টিত হওয়ার অর্থ এই যে, তারা এমন কোনও গুনাহে লিপ্ত হবে, যার পর আখিরাতে কোনও সৎকর্ম কাজে আসবে না। এরূপ গুনাহ হল কুফর ও শিরক।
৮২

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٪ ٨٢

ওয়াল্লাযীনা আ-মানূ ওয়া‘আমিলুসসা-লিহা-তি উলাইকা আসহা-বুল জান্নাতি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।

যেসব লোক ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারা জান্নাতবাসী। তারা সর্বদা সেখানে থাকবে।
৮৩

وَاِذۡ اَخَذۡنَا مِیۡثَاقَ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ لَا تَعۡبُدُوۡنَ اِلَّا اللّٰہَ ۟ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا وَّذِی ‌الۡقُرۡبٰی وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَقُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا وَّاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ ٨٣

ওয়াইযআখাযনা-মীছা-কা বানীইছরাঈলা লা-তা‘ বুদূ না ইল্লাল্লা-হা ওয়া বিলওয়া-লিদাইনি ইহছা-নাওঁ ওয়া যিলকুরবা- ওয়ালইয়াতা-মা-ওয়ালমাছা-কীনি ওয়াকূলূ লিন্না-ছি হুছনাওঁ ওয়া আকীমুসসালা-তা ওয়া আ-তুঝঝাকা-তা ছু ম্মা তাওয়াল্লাইতুম ইল্লা-কালীলাম মিনকুম ওয়া আনতুম মু‘রিদূন।

এবং (সেই সময়ের কথা স্মরণ কর) যখন আমি বনী ইসরাঈলের থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না, পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে এবং আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথেও। আর মানুষের সাথে ভালো কথা বলবে, সালাত কায়েম করবে ও যাকাত দেবে। (কিন্তু) পরে তোমাদের মধ্য হতে অল্প কিছু লোক ছাড়া বাকি সকলে (সেই প্রতিশ্রুতি থেকে) বিরুদ্ধভাবাপন্ন হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে।
৮৪

وَاِذۡ اَخَذۡنَا مِیۡثَاقَکُمۡ لَا تَسۡفِکُوۡنَ دِمَآءَکُمۡ وَلَا تُخۡرِجُوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ مِّنۡ دِیَارِکُمۡ ثُمَّ اَقۡرَرۡتُمۡ وَاَنۡتُمۡ تَشۡہَدُوۡنَ ٨٤

ওয়া ইয আখাযনা-মীছা-কাকুম লা-তাছফিকূনা দিমাআকুম ওয়ালা-তুখরিজূনা আনফুছাকুম মিন দিয়া-রিকুম ছু ম্মা আকরারতুম ওয়া আনতুম তাশহাদূন।

এবং (স্মরণ কর) যখন আমি তোমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম যে, তোমরা একে অন্যের রক্ত বহাবে না এবং আপন লোকদেরকে নিজেদের ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কার করবে না। অতঃপর তোমরা তা স্বীকার করেছিলে এবং তোমরা নিজেরা তার সাক্ষী।
৮৫

ثُمَّ اَنۡتُمۡ ہٰۤـؤُلَآءِ تَقۡتُلُوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ وَتُخۡرِجُوۡنَ فَرِیۡقًا مِّنۡکُمۡ مِّنۡ دِیَارِہِمۡ ۫ تَظٰہَرُوۡنَ عَلَیۡہِمۡ بِالۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ؕ وَاِنۡ یَّاۡتُوۡکُمۡ اُسٰرٰی تُفٰدُوۡہُمۡ وَہُوَ مُحَرَّمٌ عَلَیۡکُمۡ اِخۡرَاجُہُمۡ ؕ اَفَتُؤۡمِنُوۡنَ بِبَعۡضِ الۡکِتٰبِ وَتَکۡفُرُوۡنَ بِبَعۡضٍ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَنۡ یَّفۡعَلُ ذٰلِکَ مِنۡکُمۡ اِلَّا خِزۡیٌ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَیَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یُرَدُّوۡنَ اِلٰۤی اَشَدِّ الۡعَذَابِ ؕ وَمَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ ٨٥

ছু ম্মা আনতুম হাউলাই তাকতুলূনা আনফুছাকুম ওয়াতুখরিজূনা ফারীকাম মিনকুম মিন দিয়া-রিহিম তাজা-হারূনা ‘আলাইহিম বিলইছমি ওয়াল‘উদওয়া-নি ওয়াইয়ঁ ইয়া’তূকুম উছা-রা-তুফা-দূ হুম ওয়া হুওয়া মুহাররামুন ‘আলাইকুম ইখরা-জুহুম আফাতু’মিনূনা ব্বিা‘দিল কিতা-বি ওয়া তাকফুরূনা ব্বিা‘দিন ফামা-জাঝাউ মাইঁ ইয়াফ‘আলুযা-লিকা মিনকুম ইল্লা-খিঝইয়ুন ফিল হায়া-তিদ্দুনইয়া-ওয়া ইয়াওমাল কিয়া-মাতি ইউরাদ্দূনা ইলা আশাদ্দিল ‘আযা-বি ওয়ামাল্লা-হু বিগা-ফিলিন ‘আম্মা-তা‘মালূন।

অতঃপর (আজ) তোমরাই সেই লোক, যারা আপন লোকদেরকে হত্যা করছ এবং নিজেদেরই মধ্য হতে কিছু লোককে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছ এবং পাপ ও সীমালংঘনে লিপ্ত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে (তাদের শত্রুদের) সাহায্য করছ। তারা যদি (শত্রুদের হাতে) কয়েদী হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তবে তোমরা মুক্তিপণ দিয়ে তাদেরকে ছাড়িয়ে নাও। অথচ তাদেরকে (ঘর-বাড়ি হতে) বের করাই তোমাদের জন্য হারাম ছিল। ৬৩ তবে কি তোমরা কিতাবের (অর্থাৎ তাওরাতের) কিছু অংশে ঈমান রাখ এবং কিছু অংশ অস্বীকার কর? তাহলে বল, তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কী হতে পারে যে, পার্থিব জীবনে তাদের জন্য থাকবে লাঞ্ছনা আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠিনতর আযাবের দিকে? তোমরা যা-কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন নন।

তাফসীরঃ

৬৩. এর প্রেক্ষাপট এই যে, মদীনা মুনাওয়ারায় ইয়াহুদীদের দু’টি গোত্র বাস করত। একটি বনু কুরায়জা, অপরটি বনু নাযীর। অপর দিকে পৌত্তলিকদেরও দু’টি গোত্র ছিল। একটি বনু আউস, অপরটি বনু খাযরাজ। আউস গোত্র ছিল বনু কুরায়জার মিত্র এবং খাযরাজ গোত্র ছিল বনু নাযীরের মিত্র। যখন আউস ও খাযরাজের মধ্যে কলহ দেখা দিত, তখন বনু কুরায়জা আউসের এবং বনু নাযীর খাযরাজ গোত্রের সহযোগিতা করত। এর ফলে ইয়াহুদী গোত্র দু’টি একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে যেত এবং যুদ্ধে যেমন আউস ও খাযরাজের লোক মারা পড়ত তেমনি বনু কুরায়জা ও বনু নাযীরের লোকও কতল হত, এমনকি অনেক সময় তারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ত্যাগ করতেও বাধ্য হত। এভাবে বনু কুরায়জা ও বনু নাযীর গোত্রদ্বয় যদিও ইয়াহুদী ছিল, কিন্তু তারা একে অন্যের শত্রুর সহযোগিতা করে মূলত একে অন্যের হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির কাজেই অংশীদার হত। অবশ্য তারা এটা করত যে, শত্রুর হাতে কোনও ইয়াহুদী বন্দী হলে তারা সকলে মিলে তার মুক্তিপণ আদায় করত ও তাকে ছাড়িয়ে আনত। তারা এর কারণ বর্ণনা করত যে, তাওরাত আমাদেরকে হুকুম দিয়েছে, কোনও ইয়াহুদী শত্রুর হাতে বন্দী হলে আমরা যেন তার মুক্তির ব্যবস্থা করি। কুরআন মাজীদ বলছে, যে তাওরাত এই হুকুম দিয়েছে, সেই তাওরাত তো এই হুকুমও দিয়েছিল যে, তোমরা একে অন্যকে হত্যা করবে না এবং একে অন্যকে ঘর-বাড়ি থেকে উৎখাত করবে না। এসব আদেশ অমান্য করলে আর কেবল মুক্তিপণ দেওয়ার আদেশকে মান্য করলে! এই তো তোমাদের তাওরাত অনুসরণের নমুনা!
৮৬

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ اشۡتَرَوُا الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا بِالۡاٰخِرَۃِ ۫  فَلَا یُخَفَّفُ عَنۡہُمُ الۡعَذَابُ وَلَا ہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ٪ ٨٦

উলাইকাল্লাযীনাশ তারাউল হায়া-তাদ্দুনইয়া-বিলআ-খিরাতি ফালা- ইউখাফফাফু ‘আনহুমুল ‘আযা-বু ওয়া লাহুম ইউনসারূন।

এরাই তারা, যারা আখিরাতের বিনিময়ে পার্থিব জীবনকে ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং তাদের শাস্তি কিছুমাত্র লাঘব করা হবে না এবং তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না।
৮৭

وَلَقَدۡ اٰتَیۡنَا مُوۡسَی الۡکِتٰبَ وَقَفَّیۡنَا مِنۡۢ بَعۡدِہٖ بِالرُّسُلِ ۫ وَاٰتَیۡنَا عِیۡسَی ابۡنَ مَرۡیَمَ الۡبَیِّنٰتِ وَاَیَّدۡنٰہُ بِرُوۡحِ الۡقُدُسِ ؕ اَفَکُلَّمَا جَآءَکُمۡ رَسُوۡلٌۢ بِمَا لَا تَہۡوٰۤی اَنۡفُسُکُمُ اسۡتَکۡبَرۡتُمۡ ۚ فَفَرِیۡقًا کَذَّبۡتُمۡ ۫ وَفَرِیۡقًا تَقۡتُلُوۡنَ ٨٧

ওয়ালাকাদ আ-তাইনা-মূছাল কিতা-বা ওয়া কাফফাইনা-মিম বা‘দিহী বিররুছুলি ওয়াআতাইনা-ঈছাবনা মারইয়ামাল বাইয়িনা-তি ওয়া আইয়াদনা-হুবিরূহিলকুদুছি আফাকুল্লামা-জাআকুম রাছূলুম বিমা-লা-তাহওয়াআনফুছুকুমুছতাকবারতুম, ফাফারীকান কাযযাবতুম ওয়া ফারীকান তাকতুলূন।

নিশ্চয়ই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে পাঠিয়েছি, আর মারয়ামের পুত্র ঈসাকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী দিয়েছি এবং রুহুল কুদসের মাধ্যমে তাকে শক্তিশালী করেছি। ৬৪ অতঃপর এটা কেমন আচরণ যে, যখনই কোনও রাসূল তোমাদের কাছে এমন কোন বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যা তোমাদের মনের চাহিদা সম্মত নয়, তখনই তোমরা দম্ভ দেখিয়েছ? অতএব কতক (নবী)-কে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছ এবং কতককে হত্যা করছ।

তাফসীরঃ

৬৪. ‘রূহুল কুদস’-এর শাব্দিক অর্থ ‘পবিত্র আত্মা’। কুরআন মাজীদে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের জন্য এ উপাধি ব্যবহৃত হয়েছে (সূরা নাহল ১৬ : ১০২)। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে তিনি এভাবে সাহায্য করতেন যে, শত্রুদের থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি তাঁর সাথে সাথে থাকতেন।
৮৮

وَقَالُوۡا قُلُوۡبُنَا غُلۡفٌ ؕ بَلۡ لَّعَنَہُمُ اللّٰہُ بِکُفۡرِہِمۡ فَقَلِیۡلًا مَّا یُؤۡمِنُوۡنَ ٨٨

ওয়া কা-লূকূলূবুনা-গুলফুন বাল্লা‘আনাহুমুল্লা-হু বিকুফরিহিম ফাকালীলাম মা-ইউমিনূন।

আর এসব লোক বলে, আমাদের অন্তর আচ্ছাদনের ভেতর। ৬৫ কখনও নয়; বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন। এ কারণে তারা অল্পই ঈমান আনে। ৬৬

তাফসীরঃ

৬৫. তাদের এ বাক্যের এক ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে যে, এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য ছিল অহমিকা প্রকাশ। তারা বলতে চাইত, তাদের অন্তরের উপর এক ধরনের নিরোধ-আবরণ আছে, যদ্দরুণ কোনও গলত কথা তাদের অন্তরে পৌঁছাতে পারে না। আবার এমন ব্যাখ্যাও হতে পারে যে, এর দ্বারা তারা মুসলিমদেরকে নিজেদের থেকে নিরাশ করতে চাইত। এ উদ্দেশ্যে তারা ঠাট্টা করে বলত, তোমরা মনে করে নাও আমাদের অন্তরে গিলাফ লাগানো আছে। কাজেই তোমরা আমাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার ফিকির করো না।
৮৯

وَلَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَکَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ ٨٩

ওয়ালাম্মা- জাআহুম কিতা-বুম মিন ‘ইনদিল্লা-হি মুসাদ্দিকুল লিমা- মা ‘আহুম ওয়া কা-নূ মিন কাবলু ইয়াছতাফতিহূনা ‘আলাল্লাযীনা কাফারূ ফালাম্মা- জাআহুম মা‘আরাফূ কাফারূ বিহী ফালা‘নাতুল্লা-হি ‘আলাল কা-ফিরীন।

যখন তাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে এমন কিতাব (অর্থাৎ কুরআন) আসল, যা তাদের কাছে (পূর্ব থেকে) যা আছে, তার (অর্থাৎ তাওরাতের) সমর্থন করে (তখন তাদের আচরণ লক্ষ্য করে দেখ), যদিও পূর্বে এরা কাফিরদের (অর্থাৎ পৌত্তলিকদের) বিরুদ্ধে (এ কিতাবের মাধ্যমে) আল্লাহর কাছে বিজয় প্রার্থনা করত, ৬৭ কিন্তু যখন সেই জিনিস আসল, যাকে তারা চিনতে পেরেছিল, তখন তাকে অস্বীকার করে বসল। সুতরাং এমন কাফিরদের প্রতি আল্লাহর লানত।

তাফসীরঃ

৬৭. পৌত্তলিকদের সাথে ইয়াহুদীদের যখন কোনও যুদ্ধ হত বা বিতর্ক দেখা দিত, তখন তারা দু‘আ করত, হে আল্লাহ! আপনি তাওরাতে যে শেষ নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন, তাকে শীঘ্র পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা তার সাথে মিলে পৌত্তলিকদের উপর জয়ী হতে পারি। কিন্তু যখন সেই নবী (মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শুভাগমন হল, তখন তারা এই ঈর্ষার কবলে পড়ল যে, তাকে বনী ইসরাঈলের মধ্যে না পাঠিয়ে বনী ইসমাঈলে কেন পাঠানো হল? তারা জানত শেষ নবীর যে সকল আলামত তাওরাতে বর্ণিত হয়েছে, সবই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। এতদসত্ত্বেও তারা তাঁকে মানতে অস্বীকার করল।
৯০

بِئۡسَمَا اشۡتَرَوۡا بِہٖۤ اَنۡفُسَہُمۡ اَنۡ یَّکۡفُرُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ بَغۡیًا اَنۡ یُّنَزِّلَ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ عَلٰی مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ۚ فَبَآءُوۡ بِغَضَبٍ عَلٰی غَضَبٍ ؕ وَلِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ ٩۰

বি’ছামাশ তারাও বিহী আনফুছাহুম আইঁ ইয়াকফুরূবিমা আনঝালাল্লা-হু বাগইয়ান আইঁ ইউনাঝঝিলাল্লা-হু মিন ফাদলিহী ‘আলা-মাইঁ ইয়াশাউ মিন ‘ইবা-দিহী ফাবাউ বিগাদিন ‘আলা-গাদাবিন ওয়া লিলকা-ফিরীনা ‘আযা-বুম মুহীন।

কতই না নিকৃষ্ট সে মূল্য, যার বিনিময়ে তারা নিজেদের আত্মাকে বিক্রি করেছে। তা এই যে, তারা আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবকে কেবল এই অন্তর্জ্বালার কারণে অস্বীকার করছে যে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহের কোনও অংশ (অর্থাৎ ওহী) নিজ বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা কেন নাযিল করবেন? সুতরাং তারা (তাদের এ অন্তর্দাহের কারণে) গযবের উপর গযব নিয়ে ফিরল। ৬৮ বস্তুত কাফিরগণ লাঞ্ছনাকর শাস্তিরই উপযুক্ত।

তাফসীরঃ

৬৮. অর্থাৎ এক গযবের উপযুক্ত হয়েছিল তাদের কুফুরীর কারণে। আর তাদের উপর দ্বিতীয় গযব পতিত হল তাদের হিংসা-বিদ্বেষের কারণে।
৯১

وَاِذَا قِیۡلَ لَہُمۡ اٰمِنُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ قَالُوۡا نُؤۡمِنُ بِمَاۤ اُنۡزِلَ عَلَیۡنَا وَیَکۡفُرُوۡنَ بِمَا وَرَآءَہٗ ٭ وَہُوَ الۡحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَہُمۡ ؕ قُلۡ فَلِمَ تَقۡتُلُوۡنَ اَنۡۢبِیَآءَ اللّٰہِ مِنۡ قَبۡلُ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ٩١

ওয়া ইযা-কীলা লাহুম আ-মিনূ বিমাআনঝালাল্লা-হু কা-লূ নু’মিনু বিমাউনঝিলা ‘আলাইনা-ওয়া ইয়াকফুরূনা বিমা- ওয়ারাআহূ ওয়া হুওয়াল হাক্কুমুসাদ্দিকালিল মা- মা‘আহুম কুল ফালিমা তাকতুলূনা আম্বিয়াআল্লা-হি মিন কাবলুইন কুনতুম মু’মিনীন।

যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যে কালাম নাযিল করেছেন তার প্রতি ঈমান আন, তখন তারা বলে, আমরা তো (কেবল) সেই কালামের উপরই ঈমান রাখব, যা আমাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে (অর্থাৎ তাওরাত)। আর এছাড়া (অন্যান্য যত আসমানী কিতাব আছে, সে) সব কিছুকে তারা অস্বীকার করে। অথচ তাও সত্য এবং তা তাদের কাছে যে কিতাব আছে, তার সমর্থনও করে। (হে নবী) তুমি তাদের বলে দাও, তোমরা যদি বাস্তবিকই (তাওরাতের উপর) ঈমান রাখতে তবে পূর্বে আল্লাহর নবীগণকে হত্যা করছিলে কেন?
৯২

وَلَقَدۡ جَآءَکُمۡ مُّوۡسٰی بِالۡبَیِّنٰتِ ثُمَّ اتَّخَذۡتُمُ الۡعِجۡلَ مِنۡۢ بَعۡدِہٖ وَاَنۡتُمۡ ظٰلِمُوۡنَ ٩٢

ওয়া লাকাদ জাআকুম মূছা- বিলবাইয়িনা-তি ছু ম্মাত্তাখাযতুমুল ‘ইজলা মিম বা‘দিহী ওয়া আনতুম জা-লিমূন।

আর স্বয়ং মূসা উজ্জ্বল নিদর্শনাবলীসহ তোমাদের কাছে এসেছিল। অতঃপর তোমরা তার পশ্চাতে এই অবিচারে লিপ্ত হলে যে, তোমরা বাছুরকে মাবুদ বানিয়ে নিলে।
৯৩

وَاِذۡ اَخَذۡنَا مِیۡثَاقَکُمۡ وَرَفَعۡنَا فَوۡقَکُمُ الطُّوۡرَ ؕ خُذُوۡا مَاۤ اٰتَیۡنٰکُمۡ بِقُوَّۃٍ وَّاسۡمَعُوۡا ؕ قَالُوۡا سَمِعۡنَا وَعَصَیۡنَا ٭ وَاُشۡرِبُوۡا فِیۡ قُلُوۡبِہِمُ الۡعِجۡلَ بِکُفۡرِہِمۡ ؕ قُلۡ بِئۡسَمَا یَاۡمُرُکُمۡ بِہٖۤ اِیۡمَانُکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ٩٣

ওয়া ইযআখাযনা- মীছা-কাকুম ওয়া রাফা‘না- ফাওকাকুমুত্তূরা খুযূমা আ-তাইনা-কুম বিকুওওয়াতিওঁ ওয়াছমা‘উ কা-লূছামি‘না ওয়া ‘আসাইনা- ওয়া উশরিবূফী কুলূবিহিমুল ‘ইজলা বিকুফরিহিম কুল বি’ছামা-ইয়া’মুরুকুম বিহী ঈমা-নুকুম ইন কুনতুম মু’মিনীন।

এবং (সেই সময়ের কথা স্মরণ কর) যখন আমি তোমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিলাম এবং তোমাদের উপর তূর (পাহাড়)কে উত্তোলন করলাম (এবং বললাম) আমি তোমাদেরকে যা-কিছু দিয়েছি তা শক্ত করে ধর। এবং (যা-কিছু বলা হয়, তা) শোন। ৬৯ তারা (মুখে) বলল, শুনলাম এবং (অন্তরে বলল), অমান্য করলাম। (প্রকৃতপক্ষে) তাদের কুফরের অশুভ পরিণামে তাদের অন্তরে বাছুর জেঁকে বসেছিল। আপনি (তাদেরকে) বলে দিন, তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক, তবে তোমাদের ঈমান তোমাদেরকে যে বিষয়ের নির্দেশ দেয় তা কতই না মন্দ!

তাফসীরঃ

৬৯. এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে এ সূরারই ৬৩নং আয়াতের টীকায় বর্ণিত হয়েছে। আর বাছুরের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ৫৩নং আয়াতের টীকায়।
৯৪

قُلۡ اِنۡ کَانَتۡ لَکُمُ الدَّارُ الۡاٰخِرَۃُ عِنۡدَ اللّٰہِ خَالِصَۃً مِّنۡ دُوۡنِ النَّاسِ فَتَمَنَّوُا الۡمَوۡتَ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ٩٤

কুল ইন কা-নাত লাকুমুদ্দা-রুল আ-খিরাতু ‘ইনদাল্লা-হি খা-লিসাতাম মিন দূনিন্না-ছি ফাতামান্নাউল মাওতা ইন কুনতুম সা-দিকীন।

আপনি (তাদেরকে) বলে দিন, আল্লাহর নিকট আখিরাতের নিবাস যদি অপরাপর মানুষ ব্যতীত কেবল তোমাদেরই জন্য নির্দিষ্ট হয় (যেমন তোমরা বলছ), তবে তোমরা মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করে দেখাও- যদি তোমরা সত্যবাদী হও।
৯৫

وَلَنۡ یَّتَمَنَّوۡہُ اَبَدًۢا بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ ٩٥

ওয়া লাইঁ ইয়াতামান্নাওহু আবাদাম বিমা- কাদ্দামাত আইদীহিম ওয়াল্লা-হু ‘আলীমুম বিজ্জা-লিমীন।

কিন্তু (আমি বলে দিচ্ছি), তারা তাদের যে কৃতকর্ম সামনে পাঠিয়েছে, সে কারণে কখনও এরূপ আকাঙ্ক্ষা করবে না। ৭০ আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।

তাফসীরঃ

৭০. এটাও ছিল কুরআন মাজীদের পক্ষ হতে একটি চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নেওয়া তাদের জন্য কিছুমাত্র কঠিন ছিল না। তারা অবলীলায় অন্ততপক্ষে মুখে মুখে হলেও প্রকাশ্যে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করে দেখাতে পারত, কিন্তু তারা সে ধৃষ্টতা দেখায়নি। কেননা তারা জানত, এ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। কাজেই এরূপ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলে তা তৎক্ষণাৎ তাদেরকে কবরে পৌঁছে দেবে।
৯৬

وَلَتَجِدَنَّہُمۡ اَحۡرَصَ النَّاسِ عَلٰی حَیٰوۃٍ ۚۛ  وَمِنَ الَّذِیۡنَ اَشۡرَکُوۡا ۚۛ  یَوَدُّ اَحَدُہُمۡ لَوۡ یُعَمَّرُ اَلۡفَ سَنَۃٍ ۚ  وَمَا ہُوَ بِمُزَحۡزِحِہٖ مِنَ الۡعَذَابِ اَنۡ یُّعَمَّرَ ؕ  وَاللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ ٪ ٩٦

ওয়ালাতাজিদান্নাহুম আহরাসান্না-ছি ‘আলা- হায়া-তিওঁ ওয়া মিনাল্লাযীনা আশরাকূ ইয়াওয়াদ্দু আহাদুহুম লাও ইউ‘আম্মারু আলফা ছানাতিওঁ ওয়ামা-হুওয়া বিমুঝাহঝিহিহী মিনাল ‘আযা-বি আইঁ ইউ‘আম্মারা ওয়াল্লা-হু বাসীরুম বিমা-ইয়া‘মালূন।

(বরং) নিশ্চয়ই তুমি বেঁচে থাকার প্রতি তাদেরকে অন্যান্য মানুষ অপেক্ষা বেশি লোভাতুর পাবে- এমনকি মুশরিকদের চেয়েও বেশি। তাদের একেক জন কামনা করে যদি এক হাজার বছর আয়ু লাভ করত, অথচ দীর্ঘায়ু লাভ তাকে আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আর তারা যা-কিছুই করছে আল্লাহ তা ভালোভাবে দেখছেন।
৯৭

قُلۡ مَنۡ کَانَ عَدُوًّا لِّجِبۡرِیۡلَ فَاِنَّہٗ نَزَّلَہٗ عَلٰی قَلۡبِکَ بِاِذۡنِ اللّٰہِ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَہُدًی وَّبُشۡرٰی لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ ٩٧

কুল মান কা-না‘আদুওওয়ালিল জিবরীলা ফাইন্নাহূনাঝঝালাহূ ‘আলা-কালবিকা বিইযনিল্লা-হি মুসাদ্দিকাল লিমা-বাইনা ইয়াদাইহি ওয়া হুদাওঁ ওয়াবুশরা- লিলমু’মিনীন।

(হে নবী) বলে দিন, কোনও ব্যক্তি যদি জিবরাঈলের শত্রু হয়, ৭১ তবে (হোক না!) সে তো আল্লাহর অনুমতিক্রমেই এ কালাম তোমার অন্তরে অবতীর্ণ করেছে, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থন করে এবং যা ঈমানদারদের জন্য সাক্ষাৎ হিদায়াত ও সুসংবাদ।

তাফসীরঃ

৭১. কোনও কোনও ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিল, আপনার কাছে যিনি ওহী নিয়ে আসেন সেই জিবরাঈলকে আমরা আমাদের শত্রু মনে করি। কেননা তিনি আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন কঠিন বিধান নিয়ে আসতেন। আপনার কাছে যদি অন্য কোনও ফিরিশতা ওহী নিয়ে আসত তবে আমরা বিবেচনা করতে পারতাম। তাদের এ কথার জবাবেই আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়। জবাবের সারমর্ম এই যে, হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তো কেবল বার্তাবাহক। তিনি যা কিছু আনেন তা আল্লাহ তাআলার হুকুমেই আনেন। সুতরাং তার প্রতি শত্রুতা পোষণের যুক্তিসঙ্গত কোনও কারণ নেই এবং তার কারণে আল্লাহ তাআলার কালামকে প্রত্যাখ্যান করারও কোনও অর্থ নেই। (বরং তিনি যেহেতু আল্লাহর বার্তাবাহক, তাই তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করলে তা আল্লাহরই প্রতি শত্রুতা পোষণের নামান্তর হবে)।
৯৮

مَنۡ کَانَ عَدُوًّا لِّلّٰہِ وَمَلٰٓئِکَتِہٖ وَرُسُلِہٖ وَجِبۡرِیۡلَ وَمِیۡکٰىلَ فَاِنَّ اللّٰہَ عَدُوٌّ لِّلۡکٰفِرِیۡنَ ٩٨

মান কা-না ‘আদুওওয়াল লিল্লা-হি ওয়ামালাইকাতিহী ওয়া রুছুলিহী ওয়াজিবরীলা ওয়ামীকা-লা ফাইন্নাল্লা-হা ‘আদুওউলিললকা-ফিরীন।

যদি কোনও ব্যক্তি আল্লাহর, তাঁর ফিরিশতাদের, তাঁর রাসূলগণের এবং জিবরাঈল ও মিকাঈলের শত্রু হয়, তবে (সে শুনে রাখুক) আল্লাহ কাফিরদের শত্রু।
৯৯

وَلَقَدۡ اَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ اٰیٰتٍۭ بَیِّنٰتٍ ۚ وَمَا یَکۡفُرُ بِہَاۤ اِلَّا الۡفٰسِقُوۡنَ ٩٩

ওয়া লাকাদ আনঝালনাইলাইকা আ-য়া-তিম বাইয়িনা-তিওঁ ওয়ামা-ইয়াকফুরু বিহা ইল্লাল ফা-ছিকূন।

নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি এমন সব আয়াত নাযিল করেছি, যা সত্যকে পরিস্ফুটকারী, আর সেগুলোকে অস্বীকার করে কেবল অবাধ্যরাই।
১০০

اَوَکُلَّمَا عٰہَدُوۡا عَہۡدًا نَّبَذَہٗ فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ ؕ بَلۡ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ١۰۰

আওয়া কুল্লামা- ‘আ-হাদূ‘আহদান নাবাযাহূ ফারীকুম মিনহুম বাল আকছারুহুম লা-ইউ’মিনূন।

(তা এটা কেমন আচরণ যে,) যখনই তারা কোনও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সর্বদা তাদের একটি দল তা ভেঙ্গে ছুড়ে ফেলেছে; বরং তাদের অধিকাংশেই ঈমান আনে না।
১০১

وَلَمَّا جَآءَہُمۡ رَسُوۡلٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ نَبَذَ فَرِیۡقٌ مِّنَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ ٭ۙ  کِتٰبَ اللّٰہِ وَرَآءَ ظُہُوۡرِہِمۡ کَاَنَّہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ۫ ١۰١

ওয়া লাম্মা-জাআহুম রাছূলুম মিন ‘ইনদিল্লা-হি মুসাদ্দিকুল্লিমা-মা‘আহুম নাবাযা ফারীকুম মিনাল্লাযীনা ঊতুল কিতা-বা কিতা-বাল্লা-হি ওয়ারাআ জুহূরিহিম কাআন্নাহুম লাইয়া‘লামূন।

আর যখন তাদের নিকট আল্লাহর তরফ থেকে এক রাসূল আসল, যে তাদের নিকট যা আছে (অর্থাৎ তাওরাত) তার সমর্থন করছিল, তখন কিতাবীদের মধ্য হতে একটি দল আল্লাহর কিতাব (তাওরাত ও ইনজীল)কে এভাবে পেছনে নিক্ষেপ করল, যেন তারা কিছু জানতই না (অর্থাৎ তাতে শেষ নবী সম্পর্কে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল তা যেন জানতই না)।
১০২

وَاتَّبَعُوۡا مَا تَتۡلُوا الشَّیٰطِیۡنُ عَلٰی مُلۡکِ سُلَیۡمٰنَ ۚ وَمَا کَفَرَ سُلَیۡمٰنُ وَلٰکِنَّ الشَّیٰطِیۡنَ کَفَرُوۡا یُعَلِّمُوۡنَ النَّاسَ السِّحۡرَ ٭ وَمَاۤ اُنۡزِلَ عَلَی الۡمَلَکَیۡنِ بِبَابِلَ ہَارُوۡتَ وَمَارُوۡتَ ؕ وَمَا یُعَلِّمٰنِ مِنۡ اَحَدٍ حَتّٰی یَقُوۡلَاۤ اِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَۃٌ فَلَا تَکۡفُرۡ ؕ فَیَتَعَلَّمُوۡنَ مِنۡہُمَا مَا یُفَرِّقُوۡنَ بِہٖ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَزَوۡجِہٖ ؕ وَمَا ہُمۡ بِضَآرِّیۡنَ بِہٖ مِنۡ اَحَدٍ اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ ؕ وَیَتَعَلَّمُوۡنَ مَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡ ؕ وَلَقَدۡ عَلِمُوۡا لَمَنِ اشۡتَرٰىہُ مَا لَہٗ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنۡ خَلَاقٍ ۟ؕ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡا بِہٖۤ اَنۡفُسَہُمۡ ؕ لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ ١۰٢

ওয়াত্তাবা‘উ মা-তাতলুশশাইয়া-তীনু‘আলা- মুলকি ছুলাইমা-না ওয়ামা-কাফারা ছুলাইমা-নু ওয়ালা- কিন্নাশশাইয়া-তীনা কাফারূ ইউ‘আলিলমূনান্না-ছাছছিহরা ওয়ামা উনঝিলা ‘আলাল মালাকাইনি ব্বিা-বিলা হা-রূতা ওয়ামা-রূতা ওয়ামা- ইউ‘আলিলমা-নি মিন আহাদিন হাত্তা-ইয়াকূলা ইন্নামা-নাহনুফিতনাতুন ফালা-তাকফুর ফাইয়াতা‘আল্লামূনা মিনহুমা- মা-ইউফাররিকূনা বিহী বাইনাল মারই ওয়াঝাওজিহী ওয়ামা-হুম বিদাররীনা বিহী মিন আহাদিন ইল্লা- বিইযনিল্লা-হি ওয়াইয়াতা‘আল্লামূনা মা-ইয়াদুররুহুম ওয়ালাইয়ানফা‘উহুম ওয়ালাকাদ ‘আলিমূলামানিশতারা-হু মা-লাহূফিল আ-খিরাতি মিন খালাকিওঁ ওয়ালাবি’ছা মা-শারাও বিহী আনফুছাহুম লাও কা-নূইয়া‘লামূন।

আর তারা (বনী ইসরাঈল) সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর শাসনামলে শয়তানগণ যা-কিছু (মন্ত্র) পড়ত তার পেছনে পড়ে গেল। সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) কোন কুফর করেনি। অবশ্য শয়তানগণ মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরীতে লিপ্ত হয়েছিল। ৭২ তাছাড়া (বনী ইসরাঈল) বাবিল শহরে হারূত ও মারূত নামক ফিরিশতাদ্বয়ের প্রতি যা নাযিল হয়েছিল ৭৩ তার পেছনে পড়ে গেল। এ ফিরিশতাদ্বয় কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনও তালীম দিত না, যতক্ষণ না বলে দিত, আমরা কেবলই পরীক্ষাস্বরূপ (প্রেরিত হয়েছি)। সুতরাং তোমরা (যাদুর পেছনে পড়ে) কুফরী অবলম্বন করো না। তথাপি তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত, (তবে প্রকাশ থাকে যে,) তারা তার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারও কোন ক্ষতি সাধন করতে পারত না। ৭৪ (কিন্তু) তারা এমন জিনিস শিখত, যা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল এবং উপকারী ছিল না। আর তারা এটাও ভালো করে জানত যে, যে ব্যক্তি তার খরিদ্দার হবে আখিরাতে তার কোনও হিস্যা থাকবে না। বস্তুত তারা যার বিনিময়ে নিজেদেরকে বিক্রি করেছে তা অতি মন্দ। যদি তাদের (এ বিষয়ের প্রকৃত) জ্ঞান থাকত! ৭৫

তাফসীরঃ

৭২. এ আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা ইয়াহুদীদের আরেকটি দুষ্কর্মের প্রতি ইশারা করেছেন। তা এই যে, যাদু-টোনার পেছনে পড়া শরীআতে সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। বিশেষত যাদুর মন্ত্রসমূহে যদি শিরকী কথাবার্তা থাকে, তবে সে যাদু কুফরের নামান্তর। হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের আমলে কিছু শয়তান, যাদের মধ্যে জিন ও মানুষ উভয়ই থাকতে পারে, কতক ইয়াহুদীকে ফুসলানি দিল যে, হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের রাজত্বের (খৃস্টপূর্ব ৯৯০-৯৩০) সকল রহস্য যাদুর মধ্যে নিহিত। তোমরা যদি যাদু শিক্ষা কর, তবে তোমাদেরও বিস্ময়কর ক্ষমতা অর্জিত হবে। সুতরাং তারা যাদুর তালীম নিতে ও তা কাজে লাগাতে শুরু করে দিল। অথচ যাদু শেখা যে কেবল অবৈধ ছিল তাই নয়, বরং তার কোনও কোনও পদ্ধতি ছিল কুফরী পর্যায়ের। ইয়াহুদীরা দ্বিতীয় মহাপাপ করেছিল এই যে, তারা খোদ হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামকেই একজন যাদুকর সাব্যস্ত করেছিল এবং তাঁর সম্পর্কে প্রচার করেছিল, তিনি শেষ জীবনে মূর্তিপূজা শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে এসব অপবাদমূলক কাহিনী তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহেও জুড়ে দিয়েছিল, যা বাইবেলে আজও পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। বাইবেলে এখনও পর্যন্ত তাঁর মুরতাদ হওয়ার বিবরণ বিদ্যমান (দ্র. ১-বাদশানামা ১১:১-২১)। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক। কুরআন মাজীদের এ আয়াতে হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের প্রতি আরোপিত এ ন্যাক্কারজনক অপবাদকে খণ্ডন করা হয়েছে। এর দ্বারা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, কুরআন মাজীদ সম্পর্কে যারা অপবাদ দিত যে, ‘এটা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের কিতাব থেকে আহরিত’, তাদের সে অপবাদ কতটা মিথ্যা! এ স্থলে কুরআন মাজীদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইয়াহুদী ও নাসারাদের কিতাবসমূহকে রদ করছে। সত্য কথা হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এমন কোনও মাধ্যম ছিল না, যা দ্বারা তিনি নিজে ইয়াহুদীদের কিতাবে কী লেখা আছে তা জেনে নেবেন। এটা জানার জন্য তাঁর কাছে কেবল ওহীরই সূত্র ছিল। সুতরাং এ আয়াত তাঁর ওহীপ্রাপ্ত নবী হওয়ার সুস্পষ্ট দলীল। এর দ্বারা তিনি ইয়াহুদীদের কিতাবে হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের প্রতি কি ধরনের অপবাদ আরোপ করা হয়েছে সে কথা জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং অতি দৃঢ়তার সাথে তা খণ্ডনও করেছেন।
১০৩

وَلَوۡ اَنَّہُمۡ اٰمَنُوۡا وَاتَّقَوۡا لَمَثُوۡبَۃٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ خَیۡرٌ ؕ  لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ ٪ ١۰٣

ওয়া লাও আন্নাহুম আ-মানূ ওয়াত্তাকাও লামাছূবাতুম মিন ‘ইনদিল্লা-হি খাইরুল লাও কা-নূ ইয়া‘লামূন।

এবং (এর বিপরীতে) তারা যদি ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আল্লাহর পক্ষ হতে প্রাপ্তব্য সওয়াব নিঃসন্দেহে অনেক উৎকৃষ্ট। যদি তাদের (এ সত্য সম্পর্কে প্রকৃত) জ্ঞান থাকত!
১০৪

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَقُوۡلُوۡا رَاعِنَا وَقُوۡلُوا انۡظُرۡنَا وَاسۡمَعُوۡا ؕ وَلِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ١۰٤

ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ লা-তাকূলূরা-‘ইনা- ওয়া কূলুনজু রনা- ওয়াছমা‘ঊ ওয়া লিলকা-ফিরীনা ‘আযা-বুন আলীম।

হে ঈমানদারগণ! (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে) ‘রা‘ইনা’ বলো না; বরং ‘উনজুরনা’ বলো ৭৬ এবং শ্রবণ করো। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাময় শাস্তি।

তাফসীরঃ

৭৬. মদীনায় বসবাসকারী ইয়াহুদীদের একটি দল ছিল অতিশয় দুষ্ট। তারা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাত করত, তখন তাকে লক্ষ্য করে বলত ‘রাইনা’ (رَاعِنَا)। আরবীতে এর অর্থ ‘আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখুন’। এ হিসেবে শব্দটিতে কোনও দোষ নেই এবং এর মধ্যে বেআদবীরও কিছু নেই। কিন্তু ইয়াহুদীদের ধর্মীয় ভাষা হিব্রুতে এরই কাছাকাছি একটি শব্দ অভিশাপ ও গালি অর্থে ব্যবহৃত হত। তাছাড়া এ শব্দটিকেই যদি “ع” এর দীর্ঘ উচ্চারণে পড়া হয়, তবে رَاعِيْنَا হয়ে যায়, যার অর্থ ‘আমাদের রাখাল’। মোটকথা ইয়াহুদীদের আসল উদ্দেশ্য ছিল শব্দটিকে মন্দ অর্থে ব্যবহার করা। কিন্তু আরবীতে যেহেতু বাহ্যিকভাবে শব্দটিতে কোনও দোষ ছিল না, তাই কতিপয় সরলপ্রাণ মুসলিমও শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়। এতে ইয়াহুদীরা বড় খুশী হত এবং ভেতরে ভেতরে মুসলিমদের নিয়ে মজা করত। তাই এ আয়াতে মুসলিমদেরকে তাদের এ দুষ্কর্ম সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদেরকে এ শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এ শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে যে, যে শব্দের ভেতর কোনও মন্দ অর্থের অবকাশ থাকে বা যা দ্বারা ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকে, সে রকম শব্দ ব্যবহার করা সমীচীন নয়। পরবর্তী আয়াতে এ সকল হঠকারিতাপূর্ণ আচরণের আসল কারণও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তা এই যে, নবুওয়াতের মহা নিয়ামত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেন দান করা হল সেজন্য তারা ঈর্ষান্বিত ছিল। সেই ঈর্ষার কারণেই তারা এসব করে থাকে।
১০৫

مَا یَوَدُّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ وَلَا الۡمُشۡرِکِیۡنَ اَنۡ یُّنَزَّلَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ خَیۡرٍ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ یَخۡتَصُّ بِرَحۡمَتِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ ذُو الۡفَضۡلِ الۡعَظِیۡمِ ١۰٥

মা-ইয়াওয়াদ্দুল্লাযীনা কাফারূ মিন আহলিল কিতা-বি ওয়ালাল মুশরিকীনা আইঁ ইউনাঝঝালা ‘আলাইকুম মিন খাইরিম মির রাব্বিকুম ওয়াল্লা-হু ইয়াখতাসসু বিরাহমাতিহী মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু যুল ফাদলিল ‘আজীম।

কাফির ব্যক্তিবর্গ, তা কিতাবীদের অন্তর্ভুক্ত হোক বা মুশরিকদের, পছন্দ করে না, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমাদের প্রতি কোনও কল্যাণ অবতীর্ণ হোক। অথচ আল্লাহ যাকে চান স্বীয় রহমতের দ্বারা বিশিষ্ট করে নেন এবং আল্লাহ মহা অনুগ্রহের মালিক।
১০৬

مَا نَنۡسَخۡ مِنۡ اٰیَۃٍ اَوۡ نُنۡسِہَا نَاۡتِ بِخَیۡرٍ مِّنۡہَاۤ اَوۡ مِثۡلِہَا ؕ اَلَمۡ تَعۡلَمۡ اَنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ١۰٦

মা-নানছাখ মিন আ-য়াতিন আও নুনছিহা- না’তি বিখাইরিম মিনহাআও মিছলিহা- আলাম তা‘লাম আন্নাল্লা-হা ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

আমি যখনই কোনও আয়াত মানসূখ (রহিত) করি বা তা ভুলিয়ে দেই, তখন তার চেয়ে উত্তম বা সে রকম (আয়াত) আনয়ন ৭৭ করি। তোমরা কি জান না, আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতা রাখেন?

তাফসীরঃ

৭৭. এটা আল্লাহ তাআলার শাশ্বত রীতি যে, তিনি প্রত্যেক যুগে সেই যুগের পরিস্থিতি অনুসারে শাখাগত বিধানাবলীতে রদ-বদল করে থাকেন। যদিও তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত ইত্যাদি দীনের মৌলিক আকীদাসমূহ সকল যুগে একই রকম থেকেছে, কিন্তু বাস্তব আমল ও কর্মগত যে সকল বিধান হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে দেওয়া হয়েছিল, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সময়ে তার কতককে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমলে তার মধ্যে আরও বেশি রদ-বদল করা হয়েছে। এমনিভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রথমে যখন নবুওয়াত দান করা হয়, তখন তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রমের সামনে অনেকগুলো ধাপ ছিল, যা অতিক্রম করা ছাড়া সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না। সেই সঙ্গে মুসলিমদের সম্মুখেও নানা রকমের সঙ্কট বিদ্যমান ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা বিধি-বিধান দানের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক পন্থা অবলম্বন করেন। কখনও কোনও ক্ষেত্রে একটি বিধান দিয়েছেন। পরে আবার সেখানে অন্য বিধান এসে গেছে, যেমন কিবলার বিধানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সামনে ১১৫নং আয়াতে এর কিছুটা বিবরণ আসবে। শাখাগত বিধানাবলীতে এ জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনকে পরিভাষায় ‘নাসখ’ বলা হয় (যে বিধানকে পরিবর্তন করা হয় তাকে ‘মানসূখ’ এবং পরিবর্তে যা দেওয়া হয় তাকে ‘নাসিখ’ বলা হয়)। কাফিরগণ, বিশেষত ইয়াহুদীরা প্রশ্ন তুলেছিল যে, সকল বিধানই যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তখন তার মধ্যে এসব রদ-বদল কেন? এ আয়াত তাদের সে প্রশ্নের উত্তরে নাযিল হয়েছে। উত্তরের সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তাআলা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্বীয় হিকমত ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী এসব রদ-বদল করে থাকেন। আর যে বিধানই মানসূখ বা রহিত করা হয় তদস্থলে এমন বিধান দেওয়া হয়, যা পরিবর্তিত পরিস্থিতির পক্ষে বেশি উপযোগী ও অধিকতর ভালো। অন্ততপক্ষে তা পূর্ববর্তী বিধানের সমান ভালো তো অবশ্যই হয়।
১০৭

اَلَمۡ تَعۡلَمۡ اَنَّ اللّٰہَ لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ وَمَا لَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مِنۡ وَّلِیٍّ وَّلَا نَصِیۡرٍ ١۰٧

আলাম তা‘লাম আন্নাল্লা-হা লাহমুলকুছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আর দিওয়ামা-লাকুম মিন দূনিল্লা-হি মিওঁ ওয়ালিইয়িওঁ ওয়ালা-নাসীর।

তুমি কি জান না আল্লাহ তাআলা এমন সত্তা যে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব কেবল তাঁরই এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনও অভিভাবক নেই এবং সাহায্যকারীও নেই?
১০৮

اَمۡ تُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ تَسۡـَٔلُوۡا رَسُوۡلَکُمۡ کَمَا سُئِلَ مُوۡسٰی مِنۡ قَبۡلُ ؕ وَمَنۡ یَّتَبَدَّلِ الۡکُفۡرَ بِالۡاِیۡمَانِ فَقَدۡ ضَلَّ سَوَآءَ السَّبِیۡلِ ١۰٨

আম তুরীদূ না আন তাছআলূ রাছূলাকুম কামা-ছুইলা মূছা-মিন কাবলু ওয়া মাইঁ ইয়াতাবাদ্দালিল কুফরা বিলঈমা-নি ফাকাদ্দাল্লা ছাওয়াআছছাবীল।

তোমরা কি তোমাদের রাসূলকে সেই রকমের প্রশ্ন করতে চাও, যেমন প্রশ্ন পূর্বে মূসাকে করা হয়েছিল? ৭৮ যে ব্যক্তি ঈমানের পরিবর্তে কুফর অবলম্বন করে, নিশ্চয়ই সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

তাফসীরঃ

৭৮. যে সকল ইয়াহুদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনার পরিবর্তে তাকে নানা রকম প্রশ্ন দ্বারা উত্যক্ত করতে সচেষ্ট ছিল; তাদের সাথে সাথে মুসলিমদেরকেও এ আয়াতে সবক দেওয়া হচ্ছে যে, ইয়াহুদীরা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের প্রতি ঈমান আনা সত্ত্বেও তাকে নানা রকম অবান্তর প্রশ্ন করত ও অযৌক্তিক দাবী-দাওয়া পেশ করত। তোমরা এরূপ করো না।
১০৯

وَدَّ کَثِیۡرٌ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ لَوۡ یَرُدُّوۡنَکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ اِیۡمَانِکُمۡ کُفَّارًا ۚۖ حَسَدًا مِّنۡ عِنۡدِ اَنۡفُسِہِمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمُ الۡحَقُّ ۚ فَاعۡفُوۡا وَاصۡفَحُوۡا حَتّٰی یَاۡتِیَ اللّٰہُ بِاَمۡرِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ١۰٩

ওয়াদ্দা কাছীরুম মিন আহলিল কিতা-বি লাও ইয়ারুদ্দূনাকুম মিম বা‘দি ঈমা-নিকুম কুফফা-রান হাছাদাম মিন ‘ইনদি আনফুছিহিম মিম বা‘দি মা-তাবাইইয়ানা লাহুমুল হাক্কু ফা‘ফূ ওয়াসফাহূহাত্তা- ইয়া’তিয়াল্লা-হু বিআমরিহী ইন্নাল্লা-হা ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

(হে মুসলিমগণ!) কিতাবীদের অনেকেই তাদের কাছে সত্য পরিস্ফুট হওয়ার পরও তাদের অন্তরের ঈর্ষাবশত কামনা করে, যদি তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনার পর পুনরায় কাফির বানিয়ে দিতে পারত! সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর ও উপেক্ষা কর, যাবৎ না আল্লাহ নিজ ফায়সালা পাঠিয়ে দেন। ৭৯ নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান।

তাফসীরঃ

৭৯. অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ না আসা পর্যন্ত ইয়াহুদীদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ কর। পরিশেষে হি. ৪র্থ সালে (খৃ. ৬২৫) তাদের মদীনার আশপাশ থেকে উৎখাত করার আদেশ দেওয়া হয়। -অনুবাদক
১১০

وَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ وَمَا تُقَدِّمُوۡا لِاَنۡفُسِکُمۡ مِّنۡ خَیۡرٍ تَجِدُوۡہُ عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ١١۰

ওয়া আকীমুসসালা-তা ওয়া আ-তুঝঝাকা-তা ওয়ামা- তুকাদ্দিমূ লিআনফুছিকুম মিন খাইরিন তাজিদূ হু ‘ইনদাল্লা-হি ইন্নাল্লা-হা বিমা-তা‘মালূনা বাসীর।

এবং সালাত কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর এবং (স্মরণ রেখ), তোমরা যে-কোনও সৎকর্ম নিজেদের কল্যাণার্থে সম্মুখে প্রেরণ করবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যে-কোনও কাজ কর আল্লাহ তা দেখছেন।
১১১

وَقَالُوۡا لَنۡ یَّدۡخُلَ الۡجَنَّۃَ اِلَّا مَنۡ کَانَ ہُوۡدًا اَوۡ نَصٰرٰی ؕ تِلۡکَ اَمَانِیُّہُمۡ ؕ قُلۡ ہَاتُوۡا بُرۡہَانَکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ١١١

ওয়া কা-লূ লাইঁ ইয়াদখুলাল জান্নাতা ইল্লা-মান কা-না হূদান আও নাসা-রা- তিলকা আমা নিইয়ুহুম কূল হা-তূ বুরহা-নাকুম ইন কুনতুম সা-দিকীন।

এবং তারা (ইয়াহুদী ও নাসারাগণ) বলে, জান্নাতে ইয়াহুদী ও নাসারাগণ ছাড়া অন্য কেউ কখনও প্রবেশ করবে না। ৮০ এসব তাদের আকাঙ্ক্ষা মাত্র। আপনি তাদেরকে বলে দিন তোমরা যদি (তোমাদের এ দাবীতে) সত্যবাদী হও, তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর।

তাফসীরঃ

৮০. অর্থাৎ ইয়াহুদীরা বলে, কেবল ইয়াহুদীরাই জান্নাতে যাবে আর খ্রিস্টানরা বলে, কেবল খ্রিস্টানরাই জান্নাতে যাবে।
১১২

بَلٰی ٭  مَنۡ اَسۡلَمَ وَجۡہَہٗ لِلّٰہِ وَہُوَ مُحۡسِنٌ فَلَہٗۤ اَجۡرُہٗ عِنۡدَ رَبِّہٖ ۪  وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ٪ ١١٢

বালা- মান আছলামা ওয়াজহাহূ লিল্লা-হি ওয়া হুওয়া মুহছিনুন ফালাহূ আজরুহু ‘ইনদা রাব্বিহী ওয়ালা- খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালা-হুম ইয়াহঝানূন।

কেন নয়? (নিয়ম তো এই যে,) যে ব্যক্তিই নিজ চেহারা আল্লাহর সামনে নত করবে এবং সে সৎকর্মশীলও হবে, সে নিজ প্রতিপালকের কাছে তার প্রতিদান পাবে। আর এরূপ লোকদের কোনও ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
১১৩

وَقَالَتِ الۡیَہُوۡدُ لَیۡسَتِ النَّصٰرٰی عَلٰی شَیۡءٍ ۪ وَّقَالَتِ النَّصٰرٰی لَیۡسَتِ الۡیَہُوۡدُ عَلٰی شَیۡءٍ ۙ وَّہُمۡ یَتۡلُوۡنَ الۡکِتٰبَ ؕ کَذٰلِکَ قَالَ الَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ مِثۡلَ قَوۡلِہِمۡ ۚ فَاللّٰہُ یَحۡکُمُ بَیۡنَہُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ فِیۡمَا کَانُوۡا فِیۡہِ یَخۡتَلِفُوۡنَ ١١٣

ওয়াকা-লাতিল ইয়াহূদূ লাইছাতিন নাসা-রা- ‘আলা- শাইয়িওঁ ওয়াকা-লাতিন নাসা-রা-লাইছাতিল ইয়াহূদূ ‘আলা শাইয়িওঁ ওয়া হুম ইয়াতলূনাল কিতা-বা কাযা-লিকা কা-লাল্লাযীনা লা-ইয়া‘লামূনা মিছলা কাওলিহিম ফাল্লা-হু ইয়াহকুমুবাইনাহুম ইয়াওমাল কিয়া-মাতি ফীমা-কানূ ফীহি ইয়াখতালিফূন।

ইয়াহুদীরা বলে, খ্রিস্টানদের (ধর্মের) কোনও ভিত্তি নেই এবং খ্রিস্টানরা বলে, ইয়াহুদীদের (ধর্মের) কোনও ভিত্তি নেই। অথচ এরা সকলে (আসমানী) কিতাব পড়ে। অনুরূপ (সেই মুশরিকগণ) যাদের কোনও (আসমানী) জ্ঞান নেই, তারাও এদের (কিতাবীদের) মত কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে। সুতরাং তারা যে বিষয়ে মতবিরোধ করছে আল্লাহই কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে সে বিষয়ে ফায়সালা করবেন।
১১৪

وَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنۡ مَّنَعَ مَسٰجِدَ اللّٰہِ اَنۡ یُّذۡکَرَ فِیۡہَا اسۡمُہٗ وَسَعٰی فِیۡ خَرَابِہَا ؕ اُولٰٓئِکَ مَا کَانَ لَہُمۡ اَنۡ یَّدۡخُلُوۡہَاۤ اِلَّا خَآئِفِیۡنَ ۬ؕ لَہُمۡ فِی الدُّنۡیَا خِزۡیٌ وَّلَہُمۡ فِی الۡاٰخِرَۃِ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ١١٤

ওয়ামান আজলামু মিম্মাম মানা‘আ মাছা-জিদাল্লা-হি আইঁ ইউযকারা ফীহাছমুহূওয়া ছা‘আ-ফী খারা-বিহা- উলাইকা মা-কা-না লাহুম আইঁ উয়াদখুলূহাইল্লা-খাইফীন লাহুম ফিদ্দুনইয়া-খিঝয়ুউঁ ওয়া লাহুম ফিল আ-খিরাতি ‘আযা-বুন ‘আজীম।

সেই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম আর কে আছে, যে আল্লাহর মসজিদসমূহে আল্লাহর নাম নিতে বাধা প্রদান করে এবং তাকে বিরান করার চেষ্টা করে? এরূপ লোকের তো ভীত-বিহ্বল না হয়ে তাতে প্রবেশ করাই সঙ্গত নয়। ৮১ তাদের জন্য দুনিয়ায় রয়েছে লাঞ্ছনা এবং তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে মহা শাস্তি।

তাফসীরঃ

৮১. পূর্বে ইয়াহুদী, নাসারা ও আরব মুশরিক- এ তিনও সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ তিনও সম্প্রদায় কোনও না কোনও কালে এবং কোনও না কোনও রূপে আল্লাহ তাআলার ইবাদতখানাসমূহের মর্যাদা নষ্ট করেছে। উদাহরণত খ্রিস্টান সম্প্রদায় বাদশাহ তায়তূসের (Titus খৃ. ৩৯-৮১) আমলে বায়তুল মুকাদ্দাসের উপর আক্রমণ করে তাতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। বাদশাহ আবরাহা, যে কিনা নিজেকে একজন খ্রিস্টান বলে দাবী করত, বাইতুল্লাহর উপর হামলা চালিয়ে তাকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছে। মক্কার মুশরিকগণ মুসলিমদেরকে মসজিদুল হারামে সালাত আদায়ে বাধা প্রদান করত। আর ইয়াহুদীরা বাইতুল্লাহর পবিত্রতা অস্বীকার করে কার্যত মানুষকে তার অভিমুখী হওয়া থেকে নিবৃত্ত করেছিল। কুরআন মাজীদ বলছে, এক দিকে তো এসব সম্প্রদায়ের প্রত্যেকটির দাবী হচ্ছে, কেবল তারাই জান্নাতে প্রবেশের হকদার, অন্যদিকে তাদের অবস্থা এই যে, তারা আল্লাহর ইবাদতে বাধা প্রদান কিংবা ইবাদতখানাসমূহকে ধ্বংস করার তৎপরতায় লিপ্ত। এ আয়াতের পরবর্তী বাক্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। তার বাহ্যিক অর্থ তো এই যে, তাদের তো উচিত ছিল আল্লাহর ঘরে অত্যন্ত বিনীত ও ভীত অবস্থায় প্রবেশ করা; দর্পিতভাবে তাকে বিরান করা বা মানুষকে তার ভেতর ইবাদত করতে বাধা দেওয়া কিছুতেই সমীচীন ছিল না। এতদসঙ্গে এর ভেতর এই সূক্ষ্ম ইশারাও থাকতে পারে যে, অচিরেই সে দিন আসবে, যখন এই অহংকারী লোকেরা, যারা মানুষকে আল্লাহর ঘরে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, সত্যপন্থীদের সামনে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত হবে। এমনকি সত্যপন্থীদের যেসব স্থানে প্রবেশে বাধা দেয়, সে সকল স্থানে তাদের নিজেদেরই ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রবেশ করতে হবে। সুতরাং মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসী কাফিরদের এ রকম পরিস্থিতিরই সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
১১৫

وَلِلّٰہِ الۡمَشۡرِقُ وَالۡمَغۡرِبُ ٭ فَاَیۡنَمَا تُوَلُّوۡا فَثَمَّ وَجۡہُ اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ١١٥

ওয়া লিল্লা-হিল মাশরিকু ওয়াল মাগরিবু ফাআইনামা-তুওয়াললূ ফাছাম্মা ওয়াজহুল্লা-হি ইন্নাল্লা-হা ওয়া-ছি‘উন ‘আলীম।

পূর্ব ও পশ্চিম সব আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা যে দিকেই মুখ ফেরাবে সেটা আল্লাহরই দিক। ৮২ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বব্যাপী ও সর্বজ্ঞ।

তাফসীরঃ

৮২. উপরে যে তিনটি সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে কিবলা নিয়েও বিরোধ ছিল। কিতাবীগণ বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা মনে করত আর মুশরিকগণ বাইতুল্লাহকে। মুসলিমগণও বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে সালাত আদায় করত আর এটা ইয়াহুদীদের অপছন্দ ছিল। মুসলিমদেরকে একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা বানানোর হুকুম দেওয়া হলে ইয়াহুদীরা এই বলে সন্তোষ প্রকাশ করল যে, দেখ মুসলিমগণ আমাদের কথা মানতে বাধ্য হয়ে গেছে। তারপর আবার বাইতুল্লাহকে চূড়ান্তরূপে কিবলা বানিয়ে দেওয়া হল। দ্বিতীয় পারার শুরুতে ইনশাআল্লাহ এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসবে। এ আয়াত দৃশ্যত সেই সময় নাযিল হয়েছিল যখন মুসলিমগণ বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করত। জানানো উদ্দেশ্য, কোনও দিকই সত্তাগতভাবে কোনও রকম মর্যাদা ও পবিত্রতার ধারক নয়। পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁরই হুকুম বরদার, আল্লাহ তাআলা কোনও এক দিকে সীমাবদ্ধ নন। তিনি সর্বত্র উপস্থিত। সুতরাং তিনি যে দিকেই মুখ করার হুকুম দেন, বান্দার কাজ সে হুকুম তামিল করা। এ কারণেই কোনও লোক যদি এমন স্থানে থাকে, যেখানে কিবলা ঠিক কোন দিকে তা নির্ণয় করা সম্ভব হয় না, সে ব্যক্তি নিজ অনুমানের ভিত্তিতে যে দিককে কিবলা মনে করে সালাত আদায় করবে তার সালাত সহীহ হয়ে যাবে। এমনকি পরে যদি জানা যায় সে যে দিকে ফিরে সালাত আদায় করেছে কিবলা সে দিকে ছিল না, তবু তার সালাত পুনরায় আদায় করার প্রয়োজন নেই। কেননা সে ব্যক্তি নিজ সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার হুকুম তামিল করেছে। বস্তুত কোনও স্থান বা কোনও দিক যে মর্যাদাসম্পন্ন হয়, তা আল্লাহ তাআলার হুকুমের কারণেই হয়। সুতরাং কিবলা নির্দিষ্টকরণের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা যদি নিজ হুকুম পরিবর্তন করে থাকেন, তবে তাতে কোনও সম্প্রদায়ের হার-জিতের কোনও প্রশ্ন নেই। এ রদ-বদল মূলত এ বিষয়টা স্পষ্ট করার জন্যই করা হচ্ছে যে, কোনও দিকই সত্তাগতভাবে পবিত্র ও কাঙ্খিত নয়। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তাআলার হুকুম পালন। ভবিষ্যতে আল্লাহ তাআলা যদি পুনরায় বাইতুল্লাহর দিকে ফেরার হুকুম দেন, তবে তা বিস্ময় বা আপত্তির কোনও কারণ হওয়া উচিত নয়।
১১৬

وَقَالُوا اتَّخَذَ اللّٰہُ وَلَدًا ۙ سُبۡحٰنَہٗ ؕ بَلۡ لَّہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ کُلٌّ لَّہٗ قٰنِتُوۡنَ ١١٦

ওয়াকা-লুত্তাখাযাল্লা-হু ওয়ালাদান ছুবহা-নাহূ বাল লাহূ মা-ফিছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদিকুল্লুল লাহূকা-নিতূন।

তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন, (অথচ) তাঁর সত্তা (এ জাতীয় জিনিস থেকে) পবিত্র; বরং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা তাঁরই। সকলেই তাঁর অনুগত।
১১৭

بَدِیۡعُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ وَاِذَا قَضٰۤی اَمۡرًا فَاِنَّمَا یَقُوۡلُ لَہٗ کُنۡ فَیَکُوۡنُ ١١٧

বাদী‘উছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আর দিওয়া ইযা-কাদাআমরান ফাইন্নামা-ইয়াকূলু লাহূ কুন ফাইয়াকূন।

তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের অস্তিত্বদাতা। তিনি যখন কোনও বিষয়ের ফায়সালা করেন তখন কেবল এতটুকু বলেন যে, ‘হয়ে যাও’, অমনি তা হয়ে যায়। ৮৩

তাফসীরঃ

৮৩. খ্রিস্টান সম্প্রদায় হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলার পুত্র বলে। ইয়াহুদীদের একটি দলও হযরত উযায়ের আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র বলত। অন্য দিকে মক্কার মুশরিকগণ ফিরিশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলত। এ আয়াত তাদের সকলের ধারণা খণ্ডন করছে। বোঝানো হচ্ছে যে, সন্তানের প্রয়োজন তো কেবল তার, যে অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। আল্লাহ তাআলার এমন কোনও মুখাপেক্ষিতা নেই। কেননা তিনি নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা ও মালিক। কোনও কাজে তাঁর কারও সাহায্য গ্রহণের দরকার হয় না। এ অবস্থায় তিনি সন্তানের মুখাপেক্ষী হবেন কেন? এ দলীলকেই যুক্তিবিদ্যার ঢঙে এভাবে পেশ করা যায় যে, প্রত্যেক সন্তান তার পিতার অংশ হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক ‘সমগ্র’ তার অংশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা যেহেতু সব রকমের মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তাই তাঁর সত্তা অবিভাজ্য (বাসীত), যার কোনও অংশের প্রয়োজন নেই। সুতরাং তাঁর প্রতি সন্তান আরোপ করা তাকে মুখাপেক্ষী সাব্যস্ত করারই নামান্তর।
১১৮

وَقَالَ الَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ لَوۡلَا یُکَلِّمُنَا اللّٰہُ اَوۡ تَاۡتِیۡنَاۤ اٰیَۃٌ ؕ کَذٰلِکَ قَالَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ مِّثۡلَ قَوۡلِہِمۡ ؕ تَشَابَہَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ ؕ قَدۡ بَیَّنَّا الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یُّوۡقِنُوۡنَ ١١٨

ওয়া কা-লাল্লাযীনা লা-ইয়া‘লামূনা লাওলা-ইউকালিলমুনাল্লা-হু আও তা’তীনা আ-য়াতুন কাযা-লিকা কালাল্লাযীনা মিন কাবলিহিম মিছলা কাওলিহিম তাশা-বাহাত কূলূবুহুম কাদ বাইইয়ান্নাল আ-য়া-তি লিকাওমিইঁ ইঊকিনূন।

যেসব লোক জ্ঞান রাখে না, তারা বলে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে (সরাসরি) কথা বলেন না কেন? কিংবা আমাদের কাছে কোনও নিদর্শন আসে না কেন? এমনিভাবে তাদের পূর্বে যেসব লোক গত হয়েছে, তারাও তাদের কথার মত কথা বলত। তাদের সকলের অন্তর পরস্পর সদৃশ। প্রকৃতপক্ষে যে সব লোক বিশ্বাস করতে চায়, তাদের জন্য পূর্বেই আমি নিদর্শনাবলী স্পষ্ট করে দিয়েছি।
১১৯

اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ بِالۡحَقِّ بَشِیۡرًا وَّنَذِیۡرًا ۙ وَّلَا تُسۡئَلُ عَنۡ اَصۡحٰبِ الۡجَحِیۡمِ ١١٩

ইন্নাআরছালনা-কা বিলহাক্কি বাশীরাওঁ ওয়ানাযীরাওঁ ওয়ালা-তুছআলু‘আন আসহাবিল জাহীম।

(হে নবী!) নিশ্চয়ই আমি তোমাকে সত্যসহ এভাবে প্রেরণ করেছি যে, তুমি (জান্নাতের) সুসংবাদ দেবে এবং (জাহান্নাম সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শন করবে। যেসব লোক (স্বেচ্ছায়) জাহান্নাম (এর পথ) বেছে নিয়েছে, তাদের সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।
১২০

وَلَنۡ تَرۡضٰی عَنۡکَ الۡیَہُوۡدُ وَلَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَہُمۡ ؕ  قُلۡ اِنَّ ہُدَی اللّٰہِ ہُوَ الۡہُدٰی ؕ  وَلَئِنِ اتَّبَعۡتَ اَہۡوَآءَہُمۡ بَعۡدَ الَّذِیۡ جَآءَکَ مِنَ الۡعِلۡمِ ۙ  مَا لَکَ مِنَ اللّٰہِ مِنۡ وَّلِیٍّ وَّلَا نَصِیۡرٍ ؔ ١٢۰

ওয়ালান তারদা-‘আনকাল ইয়াহূদু ওয়ালান নাসা-রা-হাত্তা-তাত্তাবি‘আ মিল্লাতাহুম কূল ইন্না হুদাল্লা-হি হুওয়াল হুদা-ওয়ালাইনিত্তাবা‘তা আহওয়াআহুম বা‘দাল্লাযী জাআকা মিনাল ‘ইলমি মা-লাকা মিনাল্লা-হি মিওঁ ওয়ালিইয়ূওঁ ওয়ালা-নাসীর।

ইয়াহুদী ও নাসারা তোমার প্রতি কিছুতেই খুশী হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবে। বলে দাও, প্রকৃত হিদায়াত তো আল্লাহরই হিদায়াত। তোমার কাছে (ওহীর মাধ্যমে) যে জ্ঞান এসেছে, তার পরও যদি তুমি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তবে আল্লাহর থেকে রক্ষা করার জন্য তোমার কোনও অভিভাবক থাকবে না এবং সাহায্যকারীও না। ৮৪

তাফসীরঃ

৮৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও কাফিরদের খেয়াল-খুশী অনুযায়ী চলবেন- এটা যদিও সম্পূর্ণ অকল্পনীয় বিষয় ছিল, তথাপি এস্থলে সেই অসম্ভব বিষয়কেই সম্ভব ধরে নিয়ে কথা বলা হয়েছে। আর এর উদ্দেশ্য এই মূলনীতি শিক্ষা দেওয়া যে, আল্লাহ তাআলার নিকট কোনও ব্যক্তির গুরুত্ব ও মর্যাদা তার ব্যক্তিসত্তার কারণে নয়। ব্যক্তির গুরুত্ব ও মর্যাদা হয় আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের কারণে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কেবল এ কারণে যে, তিনি ছিলেন আল্লাহ তাআলার সর্বাপেক্ষা অনুগত বান্দা।
১২১

اَلَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَتۡلُوۡنَہٗ حَقَّ تِلَاوَتِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ ؕ  وَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِہٖ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ٪ ١٢١

আল্লাযীনা আ-তাইনা-হুমুল কিতা-বা ইয়াতলূনাহূ হাক্কা তিলা-ওয়াতিহী উলাইকা ইউ’মিনূনা বিহী ওয়া মাইঁ ইয়াকফুর বিহী ফাউলাইকা হুমুল খা-ছিরূন।

যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা যখন তা তিলাওয়াত করে, যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত তখন তারাই তার প্রতি (প্রকৃত) ঈমান রাখে। ৮৫ আর যারা তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত লোক।

তাফসীরঃ

৮৫. বনী ইসরাঈলের মধ্যে যদিও বেশির ভাগ লোক অবাধ্য ও অহংকারী ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে অনেক মুখলিস ও নিষ্ঠাবান লোকও ছিল। তারা তাওরাত ও ইনজীল কেবল পড়েই শেষ করত না; বরং তার দাবী অনুযায়ী কাজ করত। তারা প্রতিটি সত্য কথা গ্রহণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল। সুতরাং যখন তাদের কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত পৌঁছল, তখন তারা কোনরূপ হঠকারিতা ছাড়া অকুণ্ঠচিত্তে তা গ্রহণ করে নিল। এ আয়াতে সেই সকল লোকের প্রশংসা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সবক দেওয়া হয়েছে যে, কোনও আসমানী কিতাব তিলাওয়াতের দাবী হচ্ছে তার সমস্ত হুকুম মনে-প্রাণে স্বীকার করে নিয়ে তা তামিল করা। প্রকৃতপক্ষে তাওরাতের প্রতি বিশ্বাসী লোক তারাই, যারা তার বিধানাবলী পালনে ব্রতী থাকে এবং সে অনুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনে।
১২২

یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَتِیَ الَّتِیۡۤ اَنۡعَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ وَاَنِّیۡ فَضَّلۡتُکُمۡ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ١٢٢

ইয়া-বানী ইছরাঈলাযকুরূ নি‘মাতিইয়াল্লাতী আন‘আমতু ‘আলাইকুম ওয়া আন্নী ফাদ্দালতুকুম ‘আলাল ‘আ-লামীন।

হে বনী ইসরাঈল! তোমরা আমার সেই নিয়ামত স্মরণ কর, যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছিলাম এবং এ বিষয়টি (-ও স্মরণ কর) যে, আমি জগতসমূহের মধ্যে তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।
১২৩

وَاتَّقُوۡا یَوۡمًا لَّا تَجۡزِیۡ نَفۡسٌ عَنۡ نَّفۡسٍ شَیۡئًا وَّلَا یُقۡبَلُ مِنۡہَا عَدۡلٌ وَّلَا تَنۡفَعُہَا شَفَاعَۃٌ وَّلَا ہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ١٢٣

ওয়াত্তাকূ ইয়াওমাল্লা-তাজঝী নাফছুন ‘আন নাফছিন শাইআওঁ ওয়ালা-ইউকবালু মিনহা‘আদলুওঁ ওয়ালা-তানফা‘উহা-শাফা-‘আতুওঁ ওয়ালা-হুম ইউনসারূন।

এবং সেই দিনকে ভয় কর, যে-দিন কেউ কারও কোনও কাজে আসবে না, কারও থেকে কোনওরূপ মুক্তিপণ গৃহীত হবে না, কোনও সুপারিশ কারও উপকার করবে না এবং তারা কোনও সাহায্যও লাভ করবে না। ৮৬

তাফসীরঃ

৮৬. বনী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ তাআলার নানা রকম নিয়ামত ও তার বিপরীতে তাদের নিরবচ্ছিন্ন অবাধ্যতার যে বিবরণ পূর্ব থেকে চলে আসছে, ৪৭ ও ৪৮ নং আয়াতে তার সূচনা করা হয়েছিল এ আয়াতে ব্যবহৃত শব্দাবলীর কাছাকাছি শব্দ দ্বারা। তারপর সবগুলো ঘটনা বিস্তারিতভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর হিতোপদেশমূলক ভাষায় আবার সে কথাই উল্লেখ করা হচ্ছে। বোঝানো হচ্ছে যে, এসব বিষয় স্মরণ করানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে তোমাদের কল্যাণ কামনা। সুতরাং এসব ঘটনা দ্বারা তোমাদের উচিত এর লক্ষ্যবস্তুতে উপনীত হওয়া। তথা এর থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হওয়া।
১২৪

وَاِذِ ابۡتَلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ رَبُّہٗ بِکَلِمٰتٍ فَاَتَمَّہُنَّ ؕ قَالَ اِنِّیۡ جَاعِلُکَ لِلنَّاسِ اِمَامًا ؕ قَالَ وَمِنۡ ذُرِّیَّتِیۡ ؕ قَالَ لَا یَنَالُ عَہۡدِی الظّٰلِمِیۡنَ ١٢٤

ওয়াইযিবতালাইবরা-হীমা রাব্বুহূ বিকালিমা-তিন ফাআতাম্মাহুন্না কা-লা ইন্নী জা‘ইলুকা লিন্না-ছি ইমা-মান কা-লা ওয়া মিন যুররিইইয়াতী কা-লা লা-ইয়ানা-লু ‘আহদিজ্জা-লিমীন।

এবং (সেই সময়কে স্মরণ কর), যখন ইবরাহীমকে তাঁর প্রতিপালক কয়েকটি বিষয় দ্বারা পরীক্ষা করলেন এবং সে তা সব পূরণ করল। আল্লাহ (তাকে) বললেন, আমি তোমাকে সমস্ত মানুষের ইমাম বানাতে চাই। ইবরাহীম বলল, আমার সন্তানদের মধ্য হতে? আল্লাহ বললেন, আমার (এ) প্রতিশ্রুতি জালিমদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ৮৭

তাফসীরঃ

৮৭. এখান থেকে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কিছু বৃত্তান্ত ও ঘটনা শুরু হচ্ছে। পেছনের আয়াতসমূহের সাথে দু’ভাবে এর গভীর সম্পর্ক আছে। একটি এভাবে যে, ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও আরব পৌত্তলিক- পূর্বোক্ত এ তিনও সম্প্রদায় হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে নিজেদের ইমাম ও নেতা মনে করত। তবে প্রত্যেক সম্প্রদায় দাবী করত, তিনি তাদেরই ধর্মের সমর্থক ছিলেন। সুতরাং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার করে দেওয়া জরুরী ছিল। কুরআন মাজীদ এ স্থলে জানাচ্ছে, এ তিন সম্প্রদায়ের কোনওটির ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসের সাথে তাঁর কিছুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। তার সমগ্র জীবন ব্যয় হয়েছে তাওহীদের প্রচারকার্যে। এ পথে তাকে অনেক বড়-বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাতে তিনি শতভাগ উত্তীর্ণ হন। দ্বিতীয় বিষয় এই যে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দুই পুত্র ছিল- হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। হযরত ইসহাক আলাইহিস সালামেরই পুত্র ছিলেন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম, যার অপর নাম ইসরাঈল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগে নবুওয়াতের সিলসিলা তাঁরই আওলাদ তথা বনী ইসরাঈলের মধ্যে চলে আসছিল। এ কারণে তারা মনে করত, দুনিয়ার নেতৃত্ব দানের অধিকার কেবল তাদের জন্যই সংরক্ষিত। অন্য কোনও বংশে এমন কোনও নবীর আগমন সম্ভবই নয়, যার অনুসরণ করা তাদের জন্য অপরিহার্য হবে। কুরআন মাজীদ এস্থলে তাদের সে ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করেছে। কুরআন মাজীদ স্পষ্ট করে দিয়েছে, দীনী নেতৃত্ব কোনও বংশের মৌরুসী অধিকার নয়। খোদ হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকেই একথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিভিন্ন পন্থায় পরীক্ষা করেন এবং একথা প্রমাণ হয়ে যায় যে, তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ের ত্যাগ স্বীকার করে আল্লাহ তাআলার প্রতিটি হুকুম পালনের জন্য সদা প্রস্তুত; তাওহীদী আকীদায় বিশ্বাসের দরুণ তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তিনি দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। স্ত্রী ও নবজাতক পুত্রকে মক্কার মরু উপত্যকায় রেখে আসার হুকুম দেওয়া হলে সে হুকুমও পালন করেন। এভাবে তিনি অকুণ্ঠ চিত্তে একের পর এক ত্যাগ স্বীকার করতে থাকেন। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে বসানোর ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি নিজ সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তাদের মধ্যে যারা জালিম তথা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে নিজ সত্তার প্রতি অবিচারকারী হবে, তারা এ মর্যাদার হকদার হবে না। বনী ইসরাঈলকে যুগের পর যুগ নানাভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তাতে প্রমাণিত হয়েছে, তারা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবতার দীনী নেতৃত্ব দানের উপযুক্ত নয়। তাই শেষ নবীকে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অপর পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশে পাঠানো হয়েছে। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর জন্য দু‘আ করেছিলেন যে, তাঁকে যেন মক্কাবাসীদের মধ্যে পাঠানো হয়। দীনী নেতৃত্ব যেহেতু স্থানান্তরিত হয়েছে, তাই কিবলাকেও পরিবর্তন করে বাইতুল্লাহ শরীফকে স্থির করে দেওয়া হয়েছে, যা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেছিলেন। এই যোগসূত্রে সামনে কাবা ঘর নির্মাণের ঘটনা বর্ণনা করা হচ্ছে। এখান থেকে ১৫২ নং আয়াত পর্যন্ত যে আলোচনা-ধারা আসছে তাকে এই প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হবে।
১২৫

وَاِذۡ جَعَلۡنَا الۡبَیۡتَ مَثَابَۃً لِّلنَّاسِ وَاَمۡنًا ؕ وَاتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰہٖمَ مُصَلًّی ؕ وَعَہِدۡنَاۤ اِلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ اَنۡ طَہِّرَا بَیۡتِیَ لِلطَّآئِفِیۡنَ وَالۡعٰکِفِیۡنَ وَالرُّکَّعِ السُّجُوۡدِ ١٢٥

ওয়াইয জা‘আলনাল বাইতা মাছা-বাতাল লিন্না-ছি ওয়াআমনাওঁ ওয়াত্তাখিযূ মিম্মাকা-মি ইবরা-হীমা মুসাল্লাওঁ ওয়া‘আহিদনা ইলা ইবরা-হীমা ওয়াইছমা-‘ঈলা আন তাহহিরা বাইতিয়া লিত্তাইফীনা ওয়াল ‘আ-কিফীনা ওয়াররুক্কা‘ইছছুজূদ।

এবং (সেই সময়কে স্মরণ কর) যখন আমি বাইতুল্লাহকে পরিণত করি মানুষের বারবার ফিরে আসার জায়গা এবং পরিপূর্ণ নিরাপত্তার স্থানে। ৮৮ তোমরা ‘মাকামে ইবরাহীম’ কে সালাতের স্থান বানিয়ে নাও। ৮৯ এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে হুকুম করি, তোমরা আমার ঘরকে সেই সকল লোকের জন্য পবিত্র কর, যারা (এখানে) তাওয়াফ করবে, ইতিকাফ করবে এবং রুকূ‘ ও সিজদা আদায় করবে।

তাফসীরঃ

৮৮. মাকামে ইবরাহীম সেই পাথরের নাম, যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বাইতুল্লাহ শরীফ নির্মাণ করেছিলেন। সে পাথরটি আজও সংরক্ষিত আছে। যে-কোনও ব্যক্তি বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করবে তাকে হুকুম দেওয়া হয়েছে যে, সাত পাক সমাপ্ত হওয়ার পর সে মাকামে ইবরাহীমের সামনে দাঁড়িয়ে বাইতুল্লাহ শরীফের অভিমুখী হবে এবং দু’ রাকাআত সালাত আদায় করবে। তাওয়াফের এ দু’ রাকাআত এ জায়গায় আদায় করাই উত্তম।
১২৬

وَاِذۡ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ رَبِّ اجۡعَلۡ ہٰذَا بَلَدًا اٰمِنًا وَّارۡزُقۡ اَہۡلَہٗ مِنَ الثَّمَرٰتِ مَنۡ اٰمَنَ مِنۡہُمۡ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ قَالَ وَمَنۡ کَفَرَ فَاُمَتِّعُہٗ قَلِیۡلًا ثُمَّ اَضۡطَرُّہٗۤ اِلٰی عَذَابِ النَّارِ ؕ وَبِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ ١٢٦

ওয়াইযকা-লা ইবরা-হীমু রাব্বিজ‘আল হা-যা-বালাদান আ-মিনাওঁ ওয়ারঝুকআহলাহূ মিনাছছামারা-তি মান আ-মানা মিনহুম বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি কা-লা ওয়ামান কাফারা ফাইমাত্তি‘উহূ কালীলান ছুম্মা আদতাররুহূইলা-‘আযা-বিন্না-রি ওয়াবি’ছাল মাসীর।

এবং (সেই সময়কেও স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! এটাকে এক নিরাপদ নগর বানিয়ে দাও এবং এর বাসিন্দাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান আনবে তাদেরকে বিভিন্ন রকম ফলের রিযক দান কর। আল্লাহ বললেন, এবং যে ব্যক্তি কুফর অবলম্বন করবে তাকেও আমি কিছু কালের জন্য জীবন ভোগের সুযোগ দেব, (কিন্তু) তারপর তাকে হিঁচড়ে নিয়ে যাব জাহান্নামের শাস্তির দিকে এবং তা নিকৃষ্টতম ঠিকানা।
১২৭

وَاِذۡ یَرۡفَعُ اِبۡرٰہٖمُ الۡقَوَاعِدَ مِنَ الۡبَیۡتِ وَاِسۡمٰعِیۡلُ ؕ رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ١٢٧

ওয়া ইয ইয়ারফা‘উ ইবরা-হীমুল কাওয়া‘ইদা মিনাল বাইতি ওয়াইছমা-‘ঈলু রাব্বানা-তাকাব্বাল মিন্না-ইন্নাকা আনতাছ ছামী‘উল ‘আলীম।

এবং (সেই সময়ের কথা চিন্তা কর) যখন ইবরাহীম বাইতুল্লাহর ভিত উঁচু করছিল ৯০ এবং ইসমাঈলও (তার সাথে শরীক ছিল এবং তারা বলছিল) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ হতে (এ সেবা) কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি এবং কেবল আপনিই সব কিছু শোনেন ও সবকিছু জানেন।

তাফসীরঃ

৯০. বাইতুল্লাহকে কাবা ঘরও বলা হয়। হযরত আদম আলাইহিস সালামের সময়ই এ ঘর নির্মিত হয় এবং তখন থেকেই মানুষ আল্লাহর ঘর হিসাবে এর মর্যাদা দিয়ে আসছে। এক সময় ঘরখানি কালের আবর্তনে বিলীন হয়ে যায়। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আমলে তার চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট ছিল না। তাই তাঁকে নতুন করে প্রাচীন ভিতের উপর সেটি নির্মাণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওহী মারফত সে ভিত জানিয়ে দিয়েছিলেন। এ কারণেই কুরআন মাজীদ বলছে, ‘তিনি বাইতুল্লাহর ভিত উঁচু করছিলেন; একথা বলছে না যে, বাইতুল্লাহ নির্মাণ করছিলেন।
১২৮

رَبَّنَا وَاجۡعَلۡنَا مُسۡلِمَیۡنِ لَکَ وَمِنۡ ذُرِّیَّتِنَاۤ اُمَّۃً مُّسۡلِمَۃً لَّکَ ۪ وَاَرِنَا مَنَاسِکَنَا وَتُبۡ عَلَیۡنَا ۚ اِنَّکَ اَنۡتَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ١٢٨

রাব্বানা-ওয়াজা‘আলনা-মুছলিমাইনি লাকা ওয়ামিন যুররিইইয়াতিনা-উম্মাতাম মুছলিমাতাল্লাকা ওয়া আরিনা-মানা-ছিকানা-ওয়াতুব ‘আলাইনা-ইন্নাকা আনতাত্তাওওয়া-বুর রাহীম।

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আপনার একান্ত অনুগত বানিয়ে নিন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্যেও এমন উম্মত সৃষ্টি করুন, যারা আপনার একান্ত অনুগত হবে এবং আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি এবং কেবল আপনিই ক্ষমাপ্রবণ (এবং) অতিশয় দয়ার মালিক।
১২৯

رَبَّنَا وَابۡعَثۡ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِکَ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَیُزَکِّیۡہِمۡ ؕ  اِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ٪ ١٢٩

রাব্বানা ওয়াব‘আছফীহিম রাছূলাম মিনহুম ইয়াতলূ‘আলাইহিম আ-য়া-তিকা ওয়া ইউ‘আলিলমুহুমুল কিতা-বা ওয়াল হিকমাতা ওয়াইউঝাক্কীহিম ইন্নাকা আনতাল ‘আঝীঝুল হাকীম।

হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্যে এমন একজন রাসূলও প্রেরণ করুন, যে তাদেরই মধ্য হতে হবে এবং যে তাদের সামনে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে। ৯১ নিশ্চয়ই আপনার এবং কেবল আপনারই সত্তা এমন, যাঁর ক্ষমতা পরিপূর্ণ, প্রজ্ঞাও পরিপূর্ণ।

তাফসীরঃ

৯১. হৃদয় থেকে উৎসারিত এ দু’আর যে কি তাছির হতে পারে তা তরজমা দ্বারা অন্য কোনও ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তরজমা দ্বারা কেবল তার মর্মটুকুই আদায় করা যায়। এস্থলে তাঁর সে দু‘আ বর্ণনা করার বহুবিধ উদ্দেশ্য রয়েছে। এক উদ্দেশ্য এ বিষয়টা দেখানো যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম তাঁদের মহত্তর কোনও কাজের কারণেও অহমিকা দেখান না; বরং আল্লাহ তাআলার সামনে আরও বেশি বিনয় ও নমনীয়তা প্রকাশ করেন। তাঁরা নিজেদের কৃতিত্ব প্রচারে লিপ্ত হন না; বরং কার্য সম্পাদনে যে ভুল-ত্রুটি ঘটার অবকাশ থাকে, তজ্জন্য তওবা ও ইস্তিগফারে লিপ্ত হন। দ্বিতীয়ত তাঁদের প্রতিটি কাজ হয় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। তাই তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর ফিকির না করে বরং আল্লাহ তাআলার কাছে কবুলিয়াতের দু‘আ করেন। তৃতীয়ত এটা প্রকাশ করাও উদ্দেশ্য যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভাগমনের বিষয়টা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু‘আর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এভাবে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামই এ প্রস্তাবনা রেখেছিলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেন হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশে পাঠানো হয়; হযরত ইসরাঈল আলাইহিস সালামের বংশে তথা বনী ইসরাঈলের মধ্যে নয়। এ দু‘আয় হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের যবানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহও ব্যক্ত করা হয়েছে। কুরআন মাজীদের কয়েকটি স্থানে সে সকল উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে। তার ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ এ সূরারই ১৫১ নং আয়াতে আসবে।
১৩০

وَمَنۡ یَّرۡغَبُ عَنۡ مِّلَّۃِ اِبۡرٰہٖمَ اِلَّا مَنۡ سَفِہَ نَفۡسَہٗ ؕ وَلَقَدِ اصۡطَفَیۡنٰہُ فِی الدُّنۡیَا ۚ وَاِنَّہٗ فِی الۡاٰخِرَۃِ لَمِنَ الصّٰلِحِیۡنَ ١٣۰

ওয়া মাইঁ ইয়ারগাবু‘আম মিল্লাতি ইবরা-হীমা ইল্লা-মান ছাফিহা নাফছাহু ওয়ালাকাদিসতাফাইনা-হু ফিদ্দুনইয়া-ওয়া ইন্নাহূ ফিল আ-খিরাতি লামিনাসসা-লিহীন।

যে ব্যক্তি নিজেকে নির্বোধ সাব্যস্ত করেছে, সে ছাড়া আর কে ইবরাহীমের পথ পরিহার করে? বাস্তবতা তো এই যে, আমি দুনিয়ায় তাকে (নিজের জন্য) বেছে নিয়েছি, আর আখিরাতে সে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
১৩১

اِذۡ قَالَ لَہٗ رَبُّہٗۤ اَسۡلِمۡ ۙ قَالَ اَسۡلَمۡتُ لِرَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ١٣١

ইযকা-লা লাহূ রাব্বুহূ আছলিম কা-লা আছলামতু লিল্লাহি রাব্বিল ‘আ-লামীন।

যখন তাঁর প্রতিপালক তাঁকে বললেন, ‘আনুগত্যে নতশির হও’, ৯২ তখন সে (সঙ্গে সঙ্গে) বলল, আমি রাব্বূল আলামীনের (প্রতিটি হুকুমের) সামনে মাথা নত করলাম।

তাফসীরঃ

৯২. কুরআন মাজীদ এস্থলে ‘আনুগত্যে নতশির হওয়া’-এর জন্য ‘ইসলাম’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘ইসলাম’-এর শাব্দিক অর্থ মাথা নত করা এবং কারও পরিপূর্ণ আনুগত্য করা। আমাদের দীনের নামও ইসলাম। এ নাম এজন্যই রাখা হয়েছে যে, এর দাবী হল- মানুষ তার প্রতিটি কথা ও কাজে আল্লাহ তাআলারই অনুগত হয়ে থাকবে। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যেহেতু শুরু থেকেই মুমিন ছিলেন, তাই এস্থলে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য তাঁকে ঈমান আনার আদেশ দেওয়া ছিল না। আর এ কারণেই ‘ইসলাম গ্রহণ কর’ তরজমা করা হয়নি। অবশ্য পরবর্তী আয়াতে সন্তানদের উদ্দেশ্যে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের যে অসিয়ত উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে ‘ইসলাম’-এর ভেতর উভয় মর্মই দাখিল; সত্য দীনের প্রতি ঈমান আনাও এবং তারপর আল্লাহ তাআলার হুকুমের প্রতি আনুগত্যও। তাই সেখানে ‘মুসলিম’ শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে।
১৩২

وَوَصّٰی بِہَاۤ اِبۡرٰہٖمُ بَنِیۡہِ وَیَعۡقُوۡبُ ؕ  یٰبَنِیَّ اِنَّ اللّٰہَ اصۡطَفٰی لَکُمُ الدِّیۡنَ فَلَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَاَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ ؕ ١٣٢

ওয়া ওয়াসসা-বিহাইবরা-হীমু বানীহি ওয়াইয়া‘কূবু ইয়া-বানিইইয়া ইন্নাল্লা-হাসতাফা-লাকুমুদ্দীনা ফালা-তামূতুন্না ইল্লা-ওয়া আনতুম মুছলিমূন।

ইবরাহীম তাঁর সন্তানদেরকে এ কথারই অসিয়ত করল এবং ইয়াকুবও (তাঁর সন্তানদেরকে) যে, হে আমার পুত্রগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দীন মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমাদের মৃত্যু যেন এ অবস্থায়ই আসে যখন তোমরা মুসলিম থাকবে।
১৩৩

اَمۡ کُنۡتُمۡ شُہَدَآءَ اِذۡ حَضَرَ یَعۡقُوۡبَ الۡمَوۡتُ ۙ اِذۡ قَالَ لِبَنِیۡہِ مَا تَعۡبُدُوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِیۡ ؕ قَالُوۡا نَعۡبُدُ اِلٰہَکَ وَاِلٰـہَ اٰبَآئِکَ اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ وَاِسۡحٰقَ اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚۖ وَّنَحۡنُ لَہٗ مُسۡلِمُوۡنَ ١٣٣

আম কুনতুম শুহাদাআ ইযহাদারা ইয়া‘কূবাল মাওতু ইযকা-লা লিবানীহি মাতা‘বুদূ না মিম বা‘দী কা-লূনা‘বুদু ইলা-হাকা ওয়া ইলা-হা আ-বাইকা ইবরা-হীমা ওয়া ইছমা-‘ঈলা ওয়াইছহা-কা ইলা-হাওঁ ওয়া-হিদাওঁ ওয়ানাহনু লাহূ মুছলিমূন।

তোমরা নিজেরা কি সেই সময় উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যুক্ষণ এসে গিয়েছিল, ৯৩ যখন সে তার পুত্রদের বলেছিল, আমার পর তোমরা কার ইবাদত করবে? তারা সকলে বলেছিল, আমরা সেই এক আল্লাহরই ইবাদত করব, যিনি আপনার মাবুদ এবং আপনার বাপ-দাদা ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকেরও মাবুদ। আমরা কেবল তাঁরই অনুগত।

তাফসীরঃ

৯৩. কতক ইয়াহুদী বলত, হযরত ইয়াকুব (ইসরাঈল) আলাইহিস সালাম নিজ মৃত্যুকালে পুত্রদেরকে অসিয়ত করেছিলেন যে, তারা যেন ইয়াহুদী ধর্মে অবিচল থাকে। এ আয়াত তারই জবাব। এ আয়াতকে সূরা আলে ইমরানের ৬৫ নং আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে বিষয়টা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে যায়।
১৩৪

تِلۡکَ اُمَّۃٌ قَدۡ خَلَتۡ ۚ لَہَا مَا کَسَبَتۡ وَلَکُمۡ مَّا کَسَبۡتُمۡ ۚ وَلَا تُسۡـَٔلُوۡنَ عَمَّا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ١٣٤

তিলকা উম্মাতুন কাদ খালাত লাহা-মা-কাছাবাত ওয়া লাকুম মা-কাছাবতুম ওয়ালা-তুছআলূনা ‘আম্মা-কা-নূইয়া‘মালূন।

তারা ছিল একটি উম্মত, যা গত হয়েছে। তারা যা-কিছু অর্জন করেছে তা তাদেরই এবং তোমরা যা-কিছু অর্জন করেছ তা তোমাদেরই। তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে না যে, তারা কি কাজ করত।
১৩৫

وَقَالُوۡا کُوۡنُوۡا ہُوۡدًا اَوۡ نَصٰرٰی تَہۡتَدُوۡا ؕ قُلۡ بَلۡ مِلَّۃَ اِبۡرٰہٖمَ حَنِیۡفًا ؕ وَمَا کَانَ مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ١٣٥

ওয়া কা-লূ কূনূ হূদান আও নাসা-রা তাহতাদূ কূল বাল মিল্লাতা ইবরা-হীমা হানীফাওঁ ওয়ামা-কা-না মিনাল মুশরিকীন।

এবং তারা (ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা মুসলিমদেরকে) বলে, তোমরা ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান হয়ে যাও, তবে সঠিক পথ পেয়ে যাবে। বলে দাও, বরং (আমরা তো) ইবরাহীমের দীন (মেনে চলব), যিনি যথাযথ সরল পথের উপর ছিলেন। তিনি সেই সব লোকের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, যারা (আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে) শরীক করত।
১৩৬

قُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا بِاللّٰہِ وَمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡنَا وَمَاۤ اُنۡزِلَ اِلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ وَاِسۡحٰقَ وَیَعۡقُوۡبَ وَالۡاَسۡبَاطِ وَمَاۤ اُوۡتِیَ مُوۡسٰی وَعِیۡسٰی وَمَاۤ اُوۡتِیَ النَّبِیُّوۡنَ مِنۡ رَّبِّہِمۡ ۚ لَا نُفَرِّقُ بَیۡنَ اَحَدٍ مِّنۡہُمۡ ۫ۖ وَنَحۡنُ لَہٗ مُسۡلِمُوۡنَ ١٣٦

কুলূ আ-মান্না-বিল্লা-হি ওয়ামাউনঝিলা ইলাইনা-ওয়ামা-উনঝিলা ইলাইবরা-হীমা ওয়াইছমা-ঈলা ওয়াইছহা-কা ওয়াইয়া‘কূবা ওয়াল আছবাতিওয়ামা ঊতিইয়া মূছাওয়া‘ঈছা-ওয়ামা ঊতিইয়ান নাবিইয়ূনা মির রাব্বিহিম লা-নুফাররিকু বাইনা আহাদিম মিনহুম ওয়ানাহনু লাহূ মুছলিমূন।

(হে মুসলিমগণ!) বলে দাও যে, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সেই বাণীর প্রতিও, যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে এবং তার প্রতিও, যা ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁদের সন্তানদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং তার প্রতিও, যা মূসা ও ঈসাকে দেওয়া হয়েছিল এবং তার প্রতিও, যা অন্যান্য নবীগণকে তাঁদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে দেওয়া হয়েছিল। আমরা এই নবীগণের মধ্যে কোনও পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁরই (এক আল্লাহরই) অনুগত। ৯৪

তাফসীরঃ

৯৪. অর্থাৎ আমরা সকল রাসূল ও সমস্ত কিতাবে বিশ্বাস রাখি এবং সকলকেই সত্য ও আপন-আপনকালে অনুসরণীয় মনে করি। আমরা আল্লাহর বাধ্যগত, তিনি যখন যে নবী পাঠান এবং তার মাধ্যমে যে বিধান দেন তাকে শিরোধার্য মনে করি। কিন্তু কিতাবীগণ তাদের নিজ-নিজ ধর্ম ছাড়া অন্যসব ধর্মকে ও অন্য সকল নবীকে প্রত্যাখ্যান করে এবং রহিত হওয়া সত্ত্বেও নিজ ধর্মকেই আঁকড়ে ধরে রাখে। অথচ তাদের আপন আপন নবী ও কিতাবের শিক্ষা অনুযায়ী উচিত ছিল- শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পর তাঁর প্রতিও ঈমান আনা এবং পুরানো শরীআত ছেড়ে দিয়ে তাঁর আনীত শরীয়াতেরই অনুসরণ করা, যেহেতু তিনিই সর্বশেষ ও সার্বজনীন নবী, তাঁর মাধ্যমে নবুওয়াতের সিলসিলা সমাপ্ত হয়ে গেছে’, তাঁর পর নতুন কোনও নবী এবং নতুন কোনও কিতাব ও শরীআত আসার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং এখন ইহুদী-খৃস্টান, আরব-অনারব নির্বিশেষে সারা বিশ্বের সমস্ত মানুষের জন্য ফরয তাঁর প্রতি ঈমান এনে তাঁর শরীআত মেনে চলা। -অনুবাদক
১৩৭

فَاِنۡ اٰمَنُوۡا بِمِثۡلِ مَاۤ اٰمَنۡتُمۡ بِہٖ فَقَدِ اہۡتَدَوۡا ۚ  وَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَاِنَّمَا ہُمۡ فِیۡ شِقَاقٍ ۚ  فَسَیَکۡفِیۡکَہُمُ اللّٰہُ ۚ  وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ؕ ١٣٧

ফাইন আ-মানূ বিমিছলি মাআ-মানতুম বিহী ফাকাদিহ তাদাও ওয়াইন তাওয়াল্লাও ফাইন্নামা-হুম ফী শিকা-কিন ফাছাইয়াকফীকাহুমুল্লা-হু ওয়াহুয়াছছামী‘উল ‘আলীম।

অতঃপর তারাও যদি সে রকম ঈমান আনে যেমন তোমরা ঈমান এনেছ, তবে তারা সঠিক পথ পেয়ে যাবে। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তারা মূলত শত্রুতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং শীঘ্রই আল্লাহ তোমার সাহায্যার্থে তাদের দেখে নেবেন এবং তিনি সকল কথা শোনেন ও সবকিছু জানেন।
১৩৮

صِبۡغَۃَ اللّٰہِ ۚ وَمَنۡ اَحۡسَنُ مِنَ اللّٰہِ صِبۡغَۃً ۫ وَّنَحۡنُ لَہٗ عٰبِدُوۡنَ ١٣٨

সিবগাতাল্লা-হি ওয়ামান আহছানুমিনাল্লা-হি সিবগাতাওঁ ওয়ানাহনুলাহু ‘আবিদূ ন।

(হে মুসলিমগণ! বলে দাও, আমাদের উপর তো) আল্লাহ নিজ রং আরোপ করেছেন। কে আছে, যে আল্লাহ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট রং আরোপ করতে পারে? আর আমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করি। ৯৫

তাফসীরঃ

৯৫. এতে খ্রিস্টানদের ‘বাপটাইজ’ (তরিকাবন্দী) প্রথার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। বাপটাইজ করানোকে ‘ইসতিবাগ’ (রং মাখানো)-ও বলা হয়। কোনও ব্যক্তিকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেওয়ার সময় রঙিন পানিতে গোসল করানো হয়। তাদের ধারণা, এতে তার সত্তায় খ্রিস্ট ধর্মের রং লেগে যায়। এভাবে নবজাতক শিশুকেও বাপটাইজ করানো হয়। কেননা তাদের বিশ্বাস মতে প্রতিটি শিশু মায়ের পেট থেকে পাপী হয়েই জন্ম নেয়। বাপটাইজ না করানো পর্যন্ত সে গুনাহগারই থেকে যায় এবং সে ইয়াসূ মাসীহের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত)-এর হকদার হয় না। কুরআন মাজীদ ইরশাদ করছে- মাথামু-হীন এই ধারণার কোনও ভিত্তি নেই। কোনও রঙে যদি রঙিন হতেই হয়, তবে আল্লাহ তাআলার রং তথা খাঁটি তাওহীদকে অবলম্বন কর। এর চেয়ে উত্তম কোনও রং নেই।
১৩৯

قُلۡ اَتُحَآجُّوۡنَنَا فِی اللّٰہِ وَہُوَ رَبُّنَا وَرَبُّکُمۡ ۚ  وَلَنَاۤ اَعۡمَالُنَا وَلَکُمۡ اَعۡمَالُکُمۡ ۚ  وَنَحۡنُ لَہٗ مُخۡلِصُوۡنَ ۙ ١٣٩

কুলআতুহাজ্জূনানা-ফিল্লা-হি ওয়াহুওয়া রাব্বুনা-ওয়ারাব্বুকুম ওয়ালানাআ‘মা-লূনা-ওয়ালাকুম আ‘মা-লুকুম ওয়ানাহনূ লাহূ মুখলিসূন।

বলে দাও, তোমরা কি আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের সাথে বিতর্ক করছ? অথচ তিনি আমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক তবে (এটা অন্য কথা যে,) আমাদের কর্ম আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য, আর আমরা তো (আমাদের ইবাদতকে) তাঁরই জন্য খালেস করে নিয়েছি। ৯৬

তাফসীরঃ

৯৬. অর্থাৎ তোমরা কি এই দাবিতে আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের সাথে বিবাদ করছ যে, তোমরা তাঁর সন্তান ও প্রিয়পাত্র, কাজেই তাঁর নবী কেবল তোমাদের মধ্যেই পাঠানোর কথা অন্যদের মধ্যে নয়, তার রহমত লাভের উপযুক্ত কেবল তোমরাই অন্য কেউ নয় এবং জান্নাতেও যাবে কেবল তোমরা অন্য কেউ নয়? প্রকৃত পক্ষে এটা তোমাদের অবান্তর দাবি ও অযৌক্তিক তর্ক। কেননা তিনি আমাদেরও রব, তোমাদেরও রব। তাঁর বান্দা হিসেবে আমরা সকলেই সমান। বান্দা হিসেবে আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, যে কারণে এসব মর্যাদা কেবল তোমরাই লাভ করবে। বরং এ বিষয়টা কেবলই তাঁর এখতিয়ারাধীন। তিনি যে কাউকেই বিশেষ কোন সম্মান দিতে পারেন। হ্যাঁ তাঁর নীতি হল বান্দার কর্ম অনুযায়ী সম্মান ও মর্যাদা দান করা। সুতরাং তোমাদেরকে মর্যাদা দান করা না করার ব্যাপারে যেমন তোমাদের কর্ম বিবেচ্য হবে, তেমনি আমাদের ক্ষেত্রেও একই রকম বিবেচনা করা হবে। প্রত্যেকে আপন-আপন কর্মের ফল ভোগ করবে। তোমরা নিজেরাই চিন্তা কর তোমরা কেমন আমল করছ। তওহীদের বিষয়টাই দেখ, নবীগণ আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করার শিক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও তোমরা উভয় সম্প্রদায় শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়েছ, কিন্তু আমাদেরকে দেখ, আলহামদুলিল্লাহ আমরা আমাদের আকীদা-বিশ্বাসেও সর্বপ্রকার শিরককে পরিহার করে চলছি এবং আমাদের সমস্ত আমলও খালেস আল্লাহরই জন্য করছি। আমরা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করছি না। এতদসত্ত্বেও এটা কেমন কথা যে, তাঁর রহমত লাভের অধিকার তোমাদেরই জন্য সংরক্ষিত। আর আমরা তা থেকে বঞ্চিত থাকব? -অনুবাদক
১৪০

اَمۡ تَقُوۡلُوۡنَ اِنَّ اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ وَاِسۡحٰقَ وَیَعۡقُوۡبَ وَالۡاَسۡبَاطَ کَانُوۡا ہُوۡدًا اَوۡ نَصٰرٰی ؕ قُلۡ ءَاَنۡتُمۡ اَعۡلَمُ اَمِ اللّٰہُ ؕ وَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنۡ کَتَمَ شَہَادَۃً عِنۡدَہٗ مِنَ اللّٰہِ ؕ وَمَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ ١٤۰

আম তাকূলূনা ইন্না ইবরা-হীমা ওয়াইছমা-‘ঈলা ওয়াইছহা-কাওয়া ইয়া‘কূবা ওয়াল আছবা-তা কা-নূ হূদান আও নাসা-রা-কুল আআনতুম ‘আলামুআমিল্লা-হু ওয়ামান আজলামু মিম্মান কাতামা শাহা-দাতান ‘ইনদাহূ মিনাল্লা-হি ওয়ামাল্লা-হু বিগা-ফিলিন ‘আম্মা-তা‘মালূন।

তোমরা কি বল, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁদের বংশধরগণ ইয়াহুদী বা নাসারা ছিল? (হে মুসলিমগণ! তাদেরকে) বলে দাও, তোমরাই কি বেশি জান, না আল্লাহ? আর সেই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় জালেম আর কে হতে পারে, যে তার নিকট আল্লাহ হতে যে সাক্ষ্য পৌঁছেছে তা গোপন করে? ৯৭ তোমরা যা-কিছু কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ গাফেল নন।

তাফসীরঃ

৯৭. অর্থাৎ এই বাস্তবতা মূলত তারাও জানে যে, এ সকল নবী খালেস তাওহীদের শিক্ষা দিতেন এবং তাদের ভিত্তিহীন আকীদা-বিশ্বাসের সঙ্গে এ পুণ্যাত্মাদের কোনও সম্পর্ক ছিল না। খোদ তাদের কিতাবেই এ সত্য সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। তাতে শেষনবী সম্পর্কিত সুসংবাদও লেখা রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের নিকট আগত সাক্ষ্যের মর্যাদা রাখে, কিন্তু এ জালিমগণ তা গোপন করে রেখেছে।
১৪১

تِلۡکَ اُمَّۃٌ قَدۡ خَلَتۡ ۚ  لَہَا مَا کَسَبَتۡ وَلَکُمۡ مَّا کَسَبۡتُمۡ ۚ  وَلَا تُسۡـَٔلُوۡنَ عَمَّا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ٪ ١٤١

তিলকা উম্মাতুন কাদ খালাত লাহা-মা-কাছাবাত ওয়া লাকুম মা-কাছাব তুম ওয়ালা-তুছআলূনা ‘আম্মা-কা-নূ ইয়া‘মালূন।

(যাই হোক) তারা ছিল একটি উম্মত, যা বিগত হয়েছে। তারা যা-কিছু অর্জন করেছে তা তাদের, আর যা-কিছু তোমরা অর্জন করেছ তা তোমাদের। তারা কী কাজ করত তা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে না।
১৪২

سَیَقُوۡلُ السُّفَہَآءُ مِنَ النَّاسِ مَا وَلّٰىہُمۡ عَنۡ قِبۡلَتِہِمُ الَّتِیۡ کَانُوۡا عَلَیۡہَا ؕ قُلۡ لِّلّٰہِ الۡمَشۡرِقُ وَالۡمَغۡرِبُ ؕ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ ١٤٢

ছাইয়াকূলুছ ছুফাহাউ মিনান্না-ছি মা-ওয়াল্লা-হুম ‘আন কিবলাতিহিমুল্লাতী কা-নূ ‘আলাইহা-কুল লিল্লা-হিল মাশরিকু ওয়াল মাগরিবু ইয়াহদী মাইঁ ইয়াশাউ ইলা-সিরা-তিম মুছতাকীম।

অচিরেই নির্বোধ লোকেরা বলবে, সেটা কী জিনিস, যা এদেরকে (মুসলিমদেরকে) তাদের সেই কিবলা থেকে অন্য দিকে মুখ ফিরাতে উদ্বুদ্ধ করল, যার অভিমুখী তারা এ যাবৎ ছিল? আপনি বলে দিন, পূর্ব ও পশ্চিম সব আল্লাহরই। তিনি যাকে চান সরল পথের হিদায়াত দান করেন। ৯৮

তাফসীরঃ

৯৮. এখান থেকে কিবলা পরিবর্তন ও তা থেকে সৃষ্ট মাসাইল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হচ্ছে। ঘটনার প্রেক্ষাপট এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা মুকাররমায় থাকাকালে বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে সালাত আদায় করতেন। মদীনা মুনাওয়ারায় আসার পর তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করতে আদেশ দেওয়া হয়। তিনি প্রায় সতের মাস সে আদেশ পালন করতে থাকেন। অতঃপর পুনরায় বাইতুল্লাহকেই কিবলা বানিয়ে দেওয়া হয়। সামনে ১৪৪ নং আয়াতে কিবলা পরিবর্তনের এ আদেশ বর্ণিত হয়েছে। আলোচ্য আয়াত ভবিষ্যদ্বাণী করছে যে, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ এ পরিবর্তনের কারণে হইচই শুরু করে দেবে। অথচ যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান রাখে এ সত্যের জন্য তাদের কোনও দলীল-প্রমাণের দরকার পড়ে না যে, বিশেষ কোনও দিককে কিবলা স্থির করার অর্থ আল্লাহ সেই দিকে অবস্থান করছেন- এমন নয়। তিনি তো সকল দিকে ও সর্বত্রই আছেন। পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ সকল দিক তাঁরই সৃষ্টি। তবে সামগ্রিক কল্যাণ বিবেচনায় বিশেষ একটা দিক স্থির করে দেওয়া সমীচীন ছিল, যে দিকে ফিরে সমস্ত মুমিন আল্লাহ তাআলার ইবাদত করবে। তাই আল্লাহ তাআলা স্বয়ং নিজ হিকমত অনুযায়ী একটা দিক ঠিক করে দেন। আর তার অর্থ এ নয় যে, সেই বিশেষ দিকটি সত্তাগতভাবে পবিত্র ও কাঙ্খিত। কোনও কিবলা বা দিকের যদি কোনও মর্যাদা লাভ হয়ে থাকে, তবে কেবল আল্লাহ তাআলার হুকুমের কারণেই তা লাভ হয়েছে। সুতরাং তিনি স্বীয় প্রজ্ঞা অনুযায়ী যখন চান ও যে দিককে চান কিবলা স্থির করতে পারেন। একজন মুমিনের জন্য সরল পথ এটাই যে, সে এই সত্য উপলব্ধি করত আল্লাহর প্রতিটি আদেশ শিরোধার্য করে নেবে। আয়াতের শেষে যে সরল পথের হিদায়াত দানের কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা এই সত্যের উপলব্ধিকেই বোঝানো হয়েছে।
১৪৩

وَکَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَہِیۡدًا ؕ وَمَا جَعَلۡنَا الۡقِبۡلَۃَ الَّتِیۡ کُنۡتَ عَلَیۡہَاۤ اِلَّا لِنَعۡلَمَ مَنۡ یَّتَّبِعُ الرَّسُوۡلَ مِمَّنۡ یَّنۡقَلِبُ عَلٰی عَقِبَیۡہِ ؕ وَاِنۡ کَانَتۡ لَکَبِیۡرَۃً اِلَّا عَلَی الَّذِیۡنَ ہَدَی اللّٰہُ ؕ وَمَا کَانَ اللّٰہُ لِیُضِیۡعَ اِیۡمَانَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِالنَّاسِ لَرَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ ١٤٣

ওয়া কাযা-লিকা জা‘আলনা-কুম উম্মাতাওঁ ওয়াছাতাল লিতাকূনূ শুহাদাআ ‘আলান্না-ছি ওয়া ইয়াকূনার রাছূলু‘আলাইকুম শাহীদাওঁ ওয়ামা-জা‘আলনাল কিবলাতাল্লাতী কুনতা ‘আলাইহা ইল্লা-লিনা‘লামা মাইঁ ইয়াত্তাবি‘উররাছূলা মিম্মাইঁ ইয়ানকালিবু‘আলা-‘আকিবাইহি ওয়া ইন কা-নাত লাকাবীরাতান ইল্লা-‘আলাল্লাযীনা হাদাল্লা-হু ওয়ামা-কা-নাল্লাহু লিইউদী‘আ ঈমা-নাকুম ইন্নাল্লা-হা বিন্না-ছি লারাঊফুররাহীম।

(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্যান্য লোক সম্পর্কে সাক্ষী হও এবং রাসূল হন তোমাদের পক্ষে সাক্ষী। ৯৯ পূর্বে তুমি যে কিবলার অনুসারী ছিলে, আমি তা অন্য কোনও কারণে নয়; বরং কেবল এ কারণেই স্থির করেছিলাম যে, আমি দেখতে চাই- কে রাসূলের আদেশ মানে আর কে তার পিছন দিকে ফিরে যায়, ১০০ সন্দেহ নেই এ বিষয়টা বড় কঠিন, তবে আল্লাহ যাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন, তাদের পক্ষে (মোটেই কঠিন) না। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমান নিস্ফল করে দেবেন। ১০১ বস্তুত আল্লাহ মানুষের প্রতি অতি মমতাবান, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

৯৯. অর্থাৎ এই আখেরী যামানায় যেমন অন্যান্য সকল দিকের পরিবর্তে কেবল কাবার দিককে কিবলা হওয়ার মর্যাদা দান করেছি এবং তোমাদেরকে তা মনে-প্রাণে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছি, তদ্রূপ আমি অন্যান্য উম্মতের বিপরীতে তোমাদেরকে সর্বাপেক্ষা মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ উম্মত বানিয়েছি (তাফসীরে কাবীর)। সুতরাং এ উম্মতকে এমন বাস্তবসম্মত বিধানাবলী দেওয়া হয়েছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার সঠিক দিক-নির্দেশ করতে সক্ষম। এ আয়াতে মধ্যপন্থী উম্মতের এ বিশেষত্বও বর্ণনা করা হযেছে যে, কিয়ামতের দিন এ উম্মতকে অন্যান্য নবী-রাসূলের সাক্ষী হিসেবে পেশ করা হবে। বুখারী শরীফের এক হাদীসে এর ব্যাখ্যা এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন পূর্ববতী নবীগণের উম্মতের মধ্যে যারা কাফির ছিল, তারা তাদের কাছে নবী-রাসূল পৌঁছার বিষয়টিকে সরাসরি অস্বীকার করবে, তখন উম্মতে মুহাম্মাদী নবীগণের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে যে, তাঁরা নিজ-নিজ উম্মতের কাছে আল্লাহ তাআলার বার্তা পৌঁছে দিয়ে রিসালাতের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন। যদিও আমরা তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। কিন্তু আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী দ্বারা অবগত হয়ে এ বিষয়টা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর তাঁর কথার উপর আমাদের বিশ্বাস আমাদের চাক্ষুষ দেখা অপেক্ষাও দৃঢ়। অপর দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের এ সাক্ষ্যকে তসদীক করবেন। কোনও কোনও মুফাসসির উম্মতে মুহাম্মাদীর সাক্ষী হওয়ার বিষয়টাকে এভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, এ স্থলে সাক্ষ্য (শাহাদাত) দ্বারা সত্যের প্রচার বোঝানো উদ্দেশ্য। এ উম্মত সমগ্র মানবতার কাছে সত্যের বার্তা সেভাবেই পৌঁছে দেবে, যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে পৌঁছিয়েছিলেন। আপন-আপন স্থানে উভয় ব্যাখ্যাই সঠিক এবং উভয়ের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্বও নেই। (মধ্যপন্থী হওয়ার অর্থ এমন সরল পথের অনুসারী, যাতে কোনও রকম বক্রতা নেই। অর্থাৎ যার বিধানাবলী সব রকম প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত এবং নরম ও চরমের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত -অনুবাদক)।
১৪৪

قَدۡ نَرٰی تَقَلُّبَ وَجۡہِکَ فِی السَّمَآءِ ۚ فَلَنُوَلِّیَنَّکَ قِبۡلَۃً تَرۡضٰہَا ۪ فَوَلِّ وَجۡہَکَ شَطۡرَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ؕ وَحَیۡثُ مَا کُنۡتُمۡ فَوَلُّوۡا وُجُوۡہَکُمۡ شَطۡرَہٗ ؕ وَاِنَّ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ لَیَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہُ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّہِمۡ ؕ وَمَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا یَعۡمَلُوۡنَ ١٤٤

কাদ নারা-তাকাল্লুবা ওয়াজহিকা ফিছছামাই ফালানুওয়ালিলয়ান্নাকা কিবলাতান তারদাহা-ফাওয়ালিল ওয়াজহাকা শাতরাল মাছজিদিল হারা-মি ওয়া হাইছুমা-কুনতুম ফাওয়াললূ উজূহাকুম শাতরাহূ ওয়া ইন্নাল্লাযীনা ঊতুল কিতা-বা লাইয়া‘লামূনা আন্নাহুল হাক্কুমির রাব্বিহিম ওয়ামাল্লা-হু বিগা-ফিলিন ‘আম্মা-ইয়া‘মালূন।

(হে নবী!) আমি তোমার চেহারাকে বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সুতরাং যে কিবলাকে তুমি পছন্দ কর আমি শীঘ্রই সে দিকে তোমাকে ফিরিয়ে দেব। ১০২ সুতরাং এবার মসজিদুল হারামের দিকে নিজের চেহারা ফেরাও। এবং (ভবিষ্যতে) তোমরা যেখানেই থাক (সালাত আদায়কালে) নিজের চেহারা সে দিকেই ফেরাবে। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তারা জানে এটাই সত্য, যা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসেছে। ১০৩ আর তারা যা-কিছু করছে আল্লাহ সে সম্বন্ধে উদাসীন নন।

তাফসীরঃ

১০২. অর্থাৎ কিতাবীগণ ভালো করেই জানে কিবলা পরিবর্তনের যে হুকুম দেওয়া হয়েছে তা বিলকুল সত্য। তার এক কারণ তো এই যে, তারা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে মানত এবং তিনিই যে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মক্কা মুকাররমায় পবিত্র কাবা নির্মাণ করেছিলেন এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ছিল; বরং কোনও কোনও ঐতিহাসিক লিখেছেন (হযরত ইসহাক আলাইহিস সালামসহ) হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সকল সন্তানের কিবলাই ছিল পবিত্র কাবা (এ বিষয়ে আরও জানার জন্য দেখুন মাওলানা হামীদুদ দীন ফারাহী রচিত ‘যাবীহ কৌওন হ্যায়’, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৮)
১৪৫

وَلَئِنۡ اَتَیۡتَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ بِکُلِّ اٰیَۃٍ مَّا تَبِعُوۡا قِبۡلَتَکَ ۚ  وَمَاۤ اَنۡتَ بِتَابِعٍ قِبۡلَتَہُمۡ ۚ  وَمَا بَعۡضُہُمۡ بِتَابِعٍ قِبۡلَۃَ بَعۡضٍ ؕ  وَلَئِنِ اتَّبَعۡتَ اَہۡوَآءَہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَکَ مِنَ الۡعِلۡمِ ۙ  اِنَّکَ اِذًا لَّمِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ۘ ١٤٥

ওয়ালা ইন আতাইতাল্লাযীনা ঊতূল কিতা-বা বিকুল্লি আ-য়াতিম মা-তাবি‘ঊ কিবলাতাকা ওয়ামা আনতা বিতা-বি‘ইন কিবলাতাহুম ওয়ামা-বা‘দুহুম বিতা-বি‘ইন কিবলাতা বা‘দিওঁ ওয়ালাইনিত্তাবা‘তা আহওয়াআহুম মিম বা‘দি মা-জাআকা মিনাল ‘ইলমি ইন্নাকা ইযাল্লামিনাজ্জা-লিমীন।

যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তুমি যদি তাদের কাছে সব রকমের নিদর্শনও নিয়ে আস, তবুও তারা তোমার কিবলা অনুসরণ করবে না। তুমিও তাদের কিবলা অনুসরণ করার নও, আর তাদের পরস্পরেও একে অন্যের কিবলা অনুসরণ করার নয়। ১০৪ তোমার নিকট জ্ঞান আসার পরও যদি তুমি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তবে তখন অবশ্যই জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে।

তাফসীরঃ

১০৪. ইয়াহুদীরা বাইতুল মুকাদ্দাসকে নিজেদের কিবলা মানত আর খ্রিস্টানগণ বাইতুল লাহম (বেথেলহেম)-কে, যেখানে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
১৪৬

اَلَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَعۡرِفُوۡنَہٗ کَمَا یَعۡرِفُوۡنَ اَبۡنَآءَہُمۡ ؕ  وَاِنَّ فَرِیۡقًا مِّنۡہُمۡ لَیَکۡتُمُوۡنَ الۡحَقَّ وَہُمۡ یَعۡلَمُوۡنَ ؔ ١٤٦

আল্লাযীনা আ-তাইনা-হুমুল কিতা-বা ইয়া‘রিফূনাহূ কামা ইয়া‘রিফূনা আবনাূআহুম ওয়া ইন্না ফারীকাম মিনহুম লাইয়াকতুমূনাল হাক্কা ওয়াহুম ইয়া‘লামূন।

যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা তাকে (এতটা ভালোভাবে) চেনে যেমন চেনে নিজেদের সন্তানদেরকে। ১০৫ নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে কিছু লোক জেনে-শুনে সত্য গোপন করে।

তাফসীরঃ

১০৫. এর এক অর্থ হতে পারে- তারা কাবার কিবলা হওয়ার বিষয়টাকে ভালোভাবেই জানত, যেমন উপরে বলা হয়েছে। আবার এই অর্থও হতে পারে যে, পূর্বের নবীগণের কিতাবসমূহে যে রাসূলের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, নবী মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই যে সেই রাসূল এটা তারা ভালো করেই জানত, কিন্তু জিদ ও হঠকারিতার কারণে তা স্বীকার করে না।
১৪৭

اَلۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّکَ فَلَا تَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡمُمۡتَرِیۡنَ ٪ ١٤٧

আলহাক্কু মির রাব্বিকা ফালা-তাকূনান্না মিনাল মুমতারীন।

আর সত্য সেটাই, যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসেছে। সুতরাং কিছুতেই সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
১৪৮

وَلِکُلٍّ وِّجۡہَۃٌ ہُوَ مُوَلِّیۡہَا فَاسۡتَبِقُوا الۡخَیۡرٰتِ ؕ؃ اَیۡنَ مَا تَکُوۡنُوۡا یَاۡتِ بِکُمُ اللّٰہُ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ١٤٨

ওয়া লিকুল্লিওঁ বিজহাতুন হুওয়া মুওয়াললীহা-ফাছতাবিকূল খাইরা-তি আইনা মা-তাকূনূ ইয়া’তি বিকুমুল্লা-হু জামী‘আন ইন্নাল্লা-হা ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই একটি কিবলা আছে, যে দিকে তারা মুখ করে। সুতরাং তোমরা সৎকর্মে একে অন্যের অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা কর। তোমরা যেখানেই থাক, আল্লাহ তোমাদের সকলকে (নিজের নিকট) নিয়ে আসবেন। ১০৬ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।

তাফসীরঃ

১০৬. যারা কিবলা পরিবর্তনের কারণে আপত্তি করছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ চূড়ান্ত করার পর মুসলিমদেরকে হিদায়াত দেওয়া হচ্ছে যে, প্রতিটি ধর্মের লোক নিজেদের জন্য আলাদা কিবলা স্থির করে রেখেছে। কাজেই ইহকালে তাদের সকলকে বিশেষ একটি কিবলার অনুসারী বানানো তোমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সুতরাং তাদের সাথে কিবলা সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত না হয়ে বরং তোমাদের উচিত নিজেদের কাজে লেগে পড়া। নিজেদের সে কাজ হল আমলনামায় যত বেশি সম্ভব পুণ্য সঞ্চয় করা। তোমরা এ কাজে একে অন্যের উপরে থাকার চেষ্টা কর। শেষ পরিণাম তো হবে এই যে, আল্লাহ তাআলা সমস্ত ধর্মাবলম্বীদেরকে নিজের কাছে ডেকে নেবেন এবং তখন তাদের সকলের হুজ্জত খতম হয়ে যাবে। সেখানে সকলেরই কিবলা একটিই হয়ে যাবে। কেননা তখন সকলে আল্লাহ তাআলার সামনে তাঁরই অভিমুখী হয়ে দাঁড়ানো থাকবে।
১৪৯

وَمِنۡ حَیۡثُ خَرَجۡتَ فَوَلِّ وَجۡہَکَ شَطۡرَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ؕ وَاِنَّہٗ لَلۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ وَمَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ ١٤٩

ওয়ামিন হাইছু খারাজতা ফাওয়ালিল ওয়াজহাকা শাতরাল মাছজিদিল হারা-মি ওয়া ইন্নাহূলালহাক্কুমির রাব্বিকা ওয়ামাল্লা-হু বিগা-ফিলিন ‘আম্মা-তা‘মালূন।

আর তুমি যেখান থেকেই (সফরের জন্য) বের হও না কেন, (সালাতের সময়) নিজের মুখ মসজিদুল হারামের দিকে ফেরাও। নিশ্চয়ই এটাই সত্য, যা তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে এসেছে। ১০৭ আর তোমরা যা-কিছু কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ অনবহিত নন।

তাফসীরঃ

১০৭. আল্লাহ তাআলা আলোচ্য আয়াতসমূহে মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরানোর নির্দেশকে তিনবার পুনরুক্ত করেছেন। এর দ্বারা এক তো নির্দেশের গুরুত্ব ও তাকীদ বোঝানো উদ্দেশ্য; দ্বিতীয়ত এটাও স্পষ্ট করে দেওয়া উদ্দেশ্য যে, কিবলামুখো হওয়ার হুকুম কেবল বাইতুল্লাহ শরীফের সামনে থাকাকালীন অবস্থায়ই প্রযোজ্য নয়; বরং যখন মক্কা মুকাররমার বাইরে থাকবে তখনও একই হুকুম এবং কখনও দূরে কোথাও চলে গেলে তখনও এটা সমান পালনীয়। এ স্থলে আল্লাহ তাআলা شطر (দিক) শব্দ ব্যবহার করে ইঙ্গিত করে দিয়েছেন যে, কাবামুখী হওয়ার জন্য কাবার একদম সোজাসুজি হওয়া জরুরী নয়, বরং দিকটা কাবার হলেই যথেষ্ট; তাতেই হুকুম পালন হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে মানুষের দায়িত্ব এতটুকুই যে, সে তার সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট মাধ্যম ব্যবহার করে দিক নির্ণয় করবে। এতটুকু করলেই তার সালাত জায়েয হয়ে যাবে।
১৫০

وَمِنۡ حَیۡثُ خَرَجۡتَ فَوَلِّ وَجۡہَکَ شَطۡرَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ؕ  وَحَیۡثُ مَا کُنۡتُمۡ فَوَلُّوۡا وُجُوۡہَکُمۡ شَطۡرَہٗ ۙ  لِئَلَّا یَکُوۡنَ لِلنَّاسِ عَلَیۡکُمۡ حُجَّۃٌ ٭ۙ  اِلَّا الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا مِنۡہُمۡ ٭  فَلَا تَخۡشَوۡہُمۡ وَاخۡشَوۡنِیۡ ٭  وَلِاُتِمَّ نِعۡمَتِیۡ عَلَیۡکُمۡ وَلَعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ ۙۛ ١٥۰

ওয়ামিন হাইছু খারাজতা ফাওয়ালিল ওয়াজহাকা শাতরাল মাছজিদিল হারা-মি ওয়া হাইছুমা-কুনতুম ফাওয়াললূ উজূহাকুম শাতরাহূ লিআল্লা-ইয়াকূনা লিন্না-ছি ‘আলাইকুম হুজ্জাতুন ইল্লাল্লাযীনা জালামূ মিনহুম ফালা-তাখশাওহুম ওয়াখশাওনী ওয়ালিউতিম্মা নি‘মাতী ‘আলাইকুম ওয়া লা‘আল্লাকুম তাহতাদূ ন।

এবং তুমি যেখান থেকেই বের হও না কেন, মসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফেরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের মুখ সে দিকেই রেখ, যাতে তোমাদের বিরুদ্ধে মানুষের কোনও প্রমাণ পেশের সুযোগ না থাকে; ১০৮ অবশ্য তাদের মধ্যে যারা জুলুম করতে অভ্যস্ত (তারা কখনও ক্ষান্ত হবে না) তাদের কোনও ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় কর। আর যাতে তোমাদের প্রতি আমি নিজ অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করে দেই এবং যাতে তোমরা হিদায়াত লাভ কর।

তাফসীরঃ

১০৮. এর অর্থ হল- যতদিন বায়তুল মুকাদ্দাস কিবলা ছিল ইয়াহুদীরা হুজ্জত করত যে, আমাদের দীন সত্য বলেই তো ওরা আমাদের কিবলা অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছে। অন্য দিকে মক্কার মুশরিকরা বলত, মুসলিমগণ নিজেদেরকে তো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অনুসারী বলে দাবী করে, অথচ তারা ইবরাহীমী কিবলা পরিত্যাগ করতঃ তাঁর থেকে গুরুতরভাবে বিমুখ হয়ে গিয়েছে। এখন কিবলা পরিবর্তনের যে উদ্দেশ্য ছিল তা যখন অর্জিত হয়ে গেছে এবং এর পর মুসলিমগণ স্থায়ীভাবে কাবাকে কিবলা গণ্য করে তারই অনুসরণ করতে থাকবে, তখন আর প্রতিপক্ষের কোনও রকম হুজ্জতের সুযোগ থাকল না। অবশ্য যে সকল তর্কপ্রবণ লোক সব কিছুতেই আপত্তি তুলবে বলে কসম করে নিয়েছে, তাদের মুখ তো কেউ বন্ধ করতে পারবে না। তা তারা আপত্তি করতে থাকুক। তাদেরকে মুসলিমদের কোনও ভয় করার প্রয়োজন নেই। মুসলিমগণ তো ভয় করবে কেবল আল্লাহ তাআলাকে, অন্য কাউকে নয়।
১৫১

کَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡکُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡکُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡکُمۡ اٰیٰتِنَا وَیُزَکِّیۡکُمۡ وَیُعَلِّمُکُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَیُعَلِّمُکُمۡ مَّا لَمۡ تَکُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ ؕۛ ١٥١

কামাআরছালনা-ফীকুম রাছূলাম মিনকুম ইয়াতলূ‘আলাইকুম আ-য়া-তিনা-ওয়া ইউঝাক্কীকুম ওয়া ইউ‘আলিলমুকুমুল কিতা-বা ওয়াল হিকমাতা ওয়া ইউ‘আলিলমুকুম মা-লাম তাকূনূতা‘লামূন।

(এ অনুগ্রহ ঠিক সেই রকমই) যেমন আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছি তোমাদেরই মধ্য হতে, যে তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পরিশুদ্ধ করে, তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমতের তালীম ১০৯ দেয় এবং তোমাদেরকে এমন সব বিষয় শিক্ষা দেয় যা তোমরা জানতে না।

তাফসীরঃ

১০৯. কাবা নির্মাণকালে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দু’টি দু‘আ করেছিলেন। এক. আমার বংশধরদের মধ্যে এমন একটি উম্মত সৃষ্টি করুন, যারা আপনার পরিপূর্ণ আনুগত্য করবে। দুই. তাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করুন (দেখুন আয়াত ১২৮-১২৯)। আল্লাহ তাআলা প্রথম দু‘আটি এভাবে কবুল করেন যে, উম্মতে মুহাম্মাদীকে একটি মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ উম্মতরূপে সৃষ্টি করেছেন (দেখুন আয়াত ১৪৩)। এবার আল্লাহ তাআলা বলছেন, আমি যেমন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু‘আ কবুল করে তোমাদের প্রতি এই অনুগ্রহ করেছি যে, তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি এবং স্থায়ীভাবে তোমাদেরকে মানবতার পথ-প্রদর্শনের দায়িত্ব দিয়েছি, যার একটি উল্লেখযোগ্য আলামত হল কাবাকে স্থায়ীভাবে তোমাদের কিবলা বানিয়ে দেওয়া, তেমনিভাবে আমি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দ্বিতীয় দু‘আও কবুল করেছি, সেমতে নবী মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমাদের মধ্যে প্রেরণ করেছি, যিনি সেই সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার জন্য চেয়েছিলেন। তার মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্য হল আয়াত তিলাওয়াতের দায়িত্ব পালন। এর দ্বারা জানা গেল, কুরআন মাজীদের আয়াত তেলাওয়াত করাও একটি স্বতন্ত্র পুণ্যের কাজ ও কাম্য বস্তু, তা অর্থ না বুঝেই তিলাওয়াত করা হোক না কেন! কেননা কুরআন মাজীদের অর্থ শিক্ষা দানের বিষয়টি সামনে একটি পৃথক দায়িত্বরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল কুরআন মাজীদের শিক্ষা দান করার দায়িত্ব পালন। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক শিক্ষাদান ব্যতিরেকে কুরআন মাজীদ যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব নয়। কেবল তরজমা পড়ার দ্বারা কুরআনের সঠিক মর্ম অনুধাবন করা যেতে পারে না। আরববাসী তো আরবী ভাষা ভালোভাবেই জানত। তাদেরকে তরজমা শেখানোর জন্য কোনও শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল না। তথাপি যখন তাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে কুরআনের তালীম নিতে হয়েছে, তখন অন্যদের জন্য তো কুরআন বোঝার জন্য নববী ধারার তালীম গ্রহণ আরও বেশি প্রয়োজন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তৃতীয় দায়িত্ব বলা হয়েছে ‘হিকমত’-এর শিক্ষা দান। এর দ্বারা জানা গেল যে, প্রকৃত হিকমত ও জ্ঞান সেটাই, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন। এর দ্বারা কেবল তাঁর হাদীসসমূহের ‘হুজ্জত’ (প্রামাণিক মর্যাদাসম্পন্ন) হওয়াই বুঝে আসছে না; বরং আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাঁর কোনও নির্দেশ যদি কারও নিজ বুদ্ধি-বিবেচনা অনুযায়ী যুক্তিসম্মত মনে না হয়, তবে সেক্ষেত্রে তার বুদ্ধি-বিবেচনাকে মাপকাঠি মনে করা হবে না; বরং মাপকাঠি ধরা হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশকেই। তাঁর চতুর্থ দায়িত্ব বলা হয়েছে এই যে, তিনি মানুষকে পরিশুদ্ধ করবেন। এর দ্বারা তাঁর বাস্তব প্রশিক্ষণদানকে বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি সাহাবায়ে কিরামের আখলাক-চরিত্র ও অভ্যন্তরীণ গুণাবলীকে পঙ্কিল ভাবাবেগ ও অনুচিত চাহিদা থেকে মুক্ত করত: তাদেরকে উন্নত বৈশিষ্ট্যাবলীতে বিমন্ডিত করে তোলেন। এর দ্বারা জানা গেল, মানুষের আত্মিক সংশোধনের জন্য কুরআন-সুন্নাহর কেবল পুঁথিগত বিদ্যাই যথেষ্ট নয়; বরং সে বিদ্যাকে নিজ জীবনে প্রতিফলিত করার বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণ জরুরী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে নিজ সাহচর্যে রেখে তাঁদেরকে বাস্তব প্রশিক্ষণ দান করেছেন, তারপর সাহাবীগণ তাবিঈদেরকে এবং তাবিঈগণ তাবে তাবিঈনকে এভাবেই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এভাবে প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার এ ধারা শত-শত বছর ধরে চলে আসছে। অভ্যন্তরীণ আখলাক চরিত্রের এ প্রশিক্ষণ যে জ্ঞানের আলোকে দেওয়া হয় তাকে ‘ইলমুল ইহসান ও তাযকিয়া বলা হয। ‘তাসাওউফ’-ও মূলত এ জ্ঞানেরই নাম ছিল, যদিও এক শ্রেণীর অযোগ্যের হাতে পড়ে এ মহান বিদ্যায় অনেক সময় ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণ ঘটেছে, কিন্তু তার মূল এই তাযকিয়া (পরিশুদ্ধকরণ)-ই, যার কথা কুরআন মাজীদের এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। বস্তুত তাসাওউফের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করার মত লোক সব যুগেই বর্তমান ছিল, যারা সে অনুযায়ী আমল করে নিজেদের জীবনকে উৎকর্ষমণ্ডিত করেছেন এবং যথারীতি তা করে যাচ্ছেন।
১৫২

فَاذۡکُرُوۡنِیۡۤ اَذۡکُرۡکُمۡ وَاشۡکُرُوۡا لِیۡ وَلَا تَکۡفُرُوۡنِ ٪ ١٥٢

ফাযকুরূনী আযকুরকুম ওয়াশকুরূলী ওয়ালা-তাকফুরূন।

সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব আর আমার শুকর আদায় কর, আমার অকৃতজ্ঞতা করো না।
১৫৩

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَالصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ ١٥٣

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুছতা‘ঈনূ বিসসাবরি ওয়াসসালা-তি; ইন্নাল্লা-হা মা‘আসসাবিরীন।

হে মুমিনগণ! সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য লাভ কর। ১১০ নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে আছেন।

তাফসীরঃ

১১০. এ সূরার ৪০নং আয়াত থেকে বনী ইসরাঈল সম্পর্কে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল তা খতম হয়ে গেছে। শেষে মুসলিমদেরকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন নিরর্থক বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত না হয়; বরং তার পরিবর্তে নিজেদের দীন অনুযায়ী যত সম্ভব বেশি আমল করতে যত্নবান থাকে। সে হিসেবেই এখন ইসলামের বিভিন্ন আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা শুরু হচ্ছে। আলোচনার সূচনা করা হয়েছে সবরের প্রতি গুরুত্বারোপ দ্বারা। কেননা এটা সেই সময়ের কথা, যখন মুসলিমগণকে নিজেদের দীনের অনুসরণ ও তার প্রচারকার্যে শত্রুদের পক্ষ হতে নানা রকম বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। তাতে বহুবিধ কষ্ট-ক্লেশ ভোগ করতে হচ্ছিল। অনেক সময় আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে শাহাদতও বরণ করতে হয়েছে কিংবা আগামীতে তা বরণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই মুসলিমগণকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে যে, সত্য দীনের পথে এ জাতীয় পরীক্ষা তো আসবেই। একজন মুমিনের কাজ হল আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার প্রতি সন্তুষ্ট থেকে সবর ও ধৈর্য প্রদর্শন করে যাওয়া। প্রকাশ থাকে যে, দুঃখ-কষ্টে কাঁদা সবরের পরিপন্থী নয়। কেননা ব্যথা পেলে চোখের পানি ফেলা মানব প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। তাই শরীয়ত এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। যে কান্না অনিচ্ছাকৃত আসে তাও সবরহীনতা নয়। সবরের অর্থ হল, দুঃখ-বেদনা সত্ত্বেও আল্লাহর প্রতি কোনও অভিযোগ না তোলা; বরং আল্লাহ তাআলার ফায়সালার প্রতি বুদ্ধিগতভাবে সন্তুষ্ট থাকা। এর দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় অপারেশন দ্বারা। ডাক্তার অপারেশন করলে মানুষের কষ্ট হয়। অনেক সময় সে কষ্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে চিৎকারও করে ওঠে, কিন্তু ডাক্তার কেন অপারেশন করছে এজন্য তার প্রতি তার কোনও অভিযোগ থাকে না। কেননা তার বিশ্বাস আছে, সে যা কিছু করছে তার প্রতি সহানুভূতি ও তার কল্যাণার্থে করছে।
১৫৪

وَلَا تَقُوۡلُوۡا لِمَنۡ یُّقۡتَلُ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتٌ ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ وَّلٰکِنۡ لَّا تَشۡعُرُوۡنَ ١٥٤

ওয়ালা-তাকূলূ লিমাইঁ ইউকতালুফী ছাবীলিল্লা-হি আমওয়া-তুন বাল আহইয়াউওঁ ওয়ালা-কিল্লা-তাশ‘উরূন।

আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা (তাদের জীবিত থাকার বিষয়টা) উপলব্ধি করতে পার না।
১৫৫

وَلَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَالۡجُوۡعِ وَنَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَنۡفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ؕ  وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ ۙ ١٥٥

ওয়ালানাবলুওয়ান্নাকুম বিশাইয়িম মিনাল খাওফি ওয়ালজূ‘ই ওয়ানাকসিম মিনাল আমওয়া-লি ওয়াল আনফুছি ওয়াছছামারা-তি ওয়া বাশশিরিসসা-বিরীন।

আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনও) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়।
১৫৬

الَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَصَابَتۡہُمۡ مُّصِیۡبَۃٌ ۙ  قَالُوۡۤا اِنَّا لِلّٰہِ وَاِنَّاۤ اِلَیۡہِ رٰجِعُوۡنَ ؕ ١٥٦

আল্লাযীনা ইযাআসা-বাতহুম মুসীবাতুন কা-লূইন্না-লিল্লা-হি ওয়াইন্না-ইলাইহি রাজি‘ঊন।

যারা তাদের কোনও মুসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে, ‘আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। ১১১

তাফসীরঃ

১১১. এ বাক্যের ভেতর প্রথমত এই সত্যের স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, আমরা সকলেই যেহেতু আল্লাহর মালিকানাধীন তাই আমাদের ব্যাপারে তাঁর যে-কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার আছে। আবার আমরা যেহেতু তাঁরই, আর কেউ নিজের জিনিসের অমঙ্গল চায় না তাই আমাদের সম্পর্কে তাঁর যে-কোনও ফায়সালা আমাদের কল্যাণার্থেই হবে; হতে পারে তাৎক্ষণিকভাবে সে কল্যাণ আমাদের বুঝে আসছে না। দ্বিতীয়ত এর মধ্যে এই সত্যেরও প্রকাশ রয়েছে যে, একদিন আমাকেও আল্লাহ তাআলার কাছে সেই জায়গায় যেতে হবে যেখানে আমার আত্মীয় বা প্রিয়জন চলে গেছে। কাজেই এ বিচ্ছেদ সাময়িক, স্থায়ী নয়। আর আমি যখন তাঁর কাছে ফিরে যাব তখন এই আঘাত বা কষ্টের কারণে ইনশাআল্লাহ সওয়াবও লাভ করব। অন্তরে যদি এ বিশ্বাস থাকে, তবে এটাই হয় সবর, তাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ুক না কেন!
১৫৭

اُولٰٓئِکَ عَلَیۡہِمۡ صَلَوٰتٌ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ وَرَحۡمَۃٌ ۟ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُہۡتَدُوۡنَ ١٥٧

উলাইকা ‘আলাইহিম সালাওয়া-তুম মির রাব্বিহিম ওয়ারাহমাতুওঁ ওয়া উলাইকা হুমুল মুহতাদূ ন।

এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং এরাই আছে হিদায়াতের উপর।
১৫৮

اِنَّ الصَّفَا وَالۡمَرۡوَۃَ مِنۡ شَعَآئِرِ اللّٰہِ ۚ فَمَنۡ حَجَّ الۡبَیۡتَ اَوِ اعۡتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِ اَنۡ یَّطَّوَّفَ بِہِمَا ؕ وَمَنۡ تَطَوَّعَ خَیۡرًا ۙ فَاِنَّ اللّٰہَ شَاکِرٌ عَلِیۡمٌ ١٥٨

ইন্নাসসাফা-ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আ-ইরিল্লা-হি ফামান হাজ্জাল বাইতা আবি‘তামারা ফালা-জুনা-হা ‘আলাইহি আইঁ ইয়াত্তাওওয়াফা বিহিমা-ওয়ামান তাতাওওয়া‘আ খাইরান ফাইন্নাল্লা-হা শাকিরুন ‘আলীম।

নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তিই বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে বা উমরা করবে তার জন্য এ দুটোর প্রদক্ষিণ করাতে কোনও গুনাহ নেই। ১১২ কোনও ব্যক্তি স্বত:স্ফূর্তভাবে কোনও কল্যাণকর কাজ করলে আল্লাহ অবশ্যই গুণগ্রাহী (এবং) সর্বজ্ঞ।

তাফসীরঃ

১১২. সাফা ও মারওয়া মক্কা মুকাররমার দু’টি পাহাড়। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্ত্রী হাজেরা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে কোলের শিশুপুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামসহ মক্কায় ছেড়ে গেলে হাজেরা (রাযি.) পানির সন্ধানে এ দুই পাহাড়ে ছোটাছুটি করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা হজ্জ ও উমরাহ আদায়ে এ দুই পাহাড়ে সা‘ঈ (ছোটাছুটি) করাকে ওয়াজিব করেছেন। সা‘ঈ করা ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও এখানে যে ‘কোন গুনাহ নেই’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তার কারণ, জাহিলী যুগে এ পাহাড় দু’টিতে দু’টি মূর্তি স্থাপিত ছিল। মুশরিকরা সেদুটিকে সম্মান করত এবং মনে করত, সা‘ঈর উদ্দেশ্য তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। মক্কা বিজয়ের পর যদিও মূর্তি দু‘টিকে অপসারণ করা হয়েছিল, তথাপি সাহাবীদের মধ্যে কারও কারও সন্দেহ হয়েছিল, এ দুই পাহাড়ে দৌড়ানো যেহেতু সে যুগেরই আলামত তাই এটা করলে গুনাহ হতে পারে। আয়াতে তাদের সেই সন্দেহ দূর করা হয়েছে।
১৫৯

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلۡنَا مِنَ الۡبَیِّنٰتِ وَالۡہُدٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا بَیَّنّٰہُ لِلنَّاسِ فِی الۡکِتٰبِ ۙ  اُولٰٓئِکَ یَلۡعَنُہُمُ اللّٰہُ وَیَلۡعَنُہُمُ اللّٰعِنُوۡنَ ۙ ١٥٩

ইন্নাল্লাযীনা ইয়াকতুমূনা মা-আনঝালনা-মিনাল বাইয়িনা-তি ওয়াল হুদা-মিম বা‘দি মা-বাইয়ান্না-হু লিন্না-ছি ফিল কিতা-বি উলাইকা ইয়াল ‘আনুহুমুল্লা-হু ওয়া ইয়াল‘আনুহুমুল্লা-‘ইনূন।

নিশ্চয়ই যারা আমার নাযিলকৃত উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী ও হিদায়াতকে গোপন করে, যদিও আমি কিতাবে তা মানুষের জন্য সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছি, ১১৩ তাদের প্রতি আল্লাহ লানত বর্ষণ করেন এবং অন্যান্য লানতকারীগণও লানত বর্ষণ করে।

তাফসীরঃ

১১৩. এর দ্বারা সেই ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে পূর্বেকার কিতাবসমূহে প্রদত্ত সুসংবাদসমূহ গোপন করত।
১৬০

اِلَّا الَّذِیۡنَ تَابُوۡا وَاَصۡلَحُوۡا وَبَیَّنُوۡا فَاُولٰٓئِکَ اَتُوۡبُ عَلَیۡہِمۡ ۚ وَاَنَا التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ١٦۰

ইল্লাল্লাযীনা তা-বূ ওয়াআসলাহূওয়া বাইয়ানূ ফাউলাইকা আতূবু‘আলাইহিম ওয়া আনাত তাওওয়া-বুর রাহীম।

তবে যারা তাওবা করেছে, নিজেদেরকে সংশোধন করেছে এবং (গোপন করা বিষয়গুলো) সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছে, আমি তাদের তাওবা কবুল করে থাকি। বস্তুত আমি অতিশয় তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
১৬১

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ اُولٰٓئِکَ عَلَیۡہِمۡ لَعۡنَۃُ اللّٰہِ وَالۡمَلٰٓئِکَۃِ وَالنَّاسِ اَجۡمَعِیۡنَ ۙ ١٦١

ইন্নাল্লাযীনা কাফারূ ওয়া মা-তূ ওয়াহুম কুফফা-রুন উলাইকা ‘আলাইহিম লা‘নাতুল্লা-হি ওয়াল মালাইকাতি ওয়ান্না-ছি আজমা‘ঈন।

নিশ্চয়ই যারা কুফর অবলম্বন করেছে এবং কাফির অবস্থায়ই মারা গেছে, তাদের প্রতি আল্লাহর, ফিরিশতাদের এবং সমস্ত মানুষের লানত।
১৬২

خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ۚ لَا یُخَفَّفُ عَنۡہُمُ الۡعَذَابُ وَلَا ہُمۡ یُنۡظَرُوۡنَ ١٦٢

খা-লিদীনা ফীহা-লা-ইউখাফফাফু‘আনহুমুল ‘আযা-বুওয়ালা-হুম ইউনজারূন।

তারা সে লানতের মধ্যে স্থায়ীভাবে থাকবে। তাদের থেকে শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হবে না।
১৬৩

وَاِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ  لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الرَّحۡمٰنُ الرَّحِیۡمُ ٪ ١٦٣

ওয়া ইলা-হুকুম ইলা-হুওঁ ওয়া-হিদুল লা ইলা-হা ইল্লা-হুওয়ার রাহমা-নূর রাহীম।

তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ, তিনি ছাড়া অন্য কোনও মাবুদ নেই। তিনি সকলের প্রতি দয়াবান, পরম দয়ালু।
১৬৪

اِنَّ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَاخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَالنَّہَارِ وَالۡفُلۡکِ الَّتِیۡ تَجۡرِیۡ فِی الۡبَحۡرِ بِمَا یَنۡفَعُ النَّاسَ وَمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ مِنَ السَّمَآءِ مِنۡ مَّآءٍ فَاَحۡیَا بِہِ الۡاَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِہَا وَبَثَّ فِیۡہَا مِنۡ کُلِّ دَآبَّۃٍ ۪ وَّتَصۡرِیۡفِ الرِّیٰحِ وَالسَّحَابِ الۡمُسَخَّرِ بَیۡنَ السَّمَآءِ وَالۡاَرۡضِ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّعۡقِلُوۡنَ ١٦٤

ইন্না ফী খালকিছছামা-ওয়াতি ওয়াল আর দিওয়াখতিলা-ফিল্লাইলি ওয়ান্নাহা-রি ওয়াল ফুলকিল্লাতী তাজরী ফিল বাহরি বিমা-ইয়ানফা‘উন্না-ছা ওয়ামাআনঝালাল্লা-হু মিনাছছামাই মিম্মাইন ফাআহইয়া-বিহিল আরদা বা‘দা মাওতিহা ওয়া বাছছা ফীহামিন কুল্লি দাব্বাতিওঁ ওয়া তাসরীফির রিয়া-হিওয়াছছাহা-বিল মুছাখখারি বাইনাছ ছামাই ওয়াল আরদিলাআ-য়া-তিল লিকাওমিইঁ ইয়া‘কিলূন।

নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃজনে, রাত দিনের একটানা আবর্তনে, সেই সব নৌযানে যা মানুষের উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগরে বয়ে চলে, সেই পানিতে যা আল্লাহ আকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন এবং তার মাধ্যমে ভূমিকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করেছেন ও তাতে সর্বপ্রকার জীব-জন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং সেই মেঘমালাতে যা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে আজ্ঞাবহ হয়ে সেবায় নিয়োজিত আছে, বহু নিদর্শন আছে সেই সব লোকের জন্য যারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। ১১৪

তাফসীরঃ

১১৪. আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বিশ্ব-জগতের এমন সব অভিজ্ঞানের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যা আমাদের চোখের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যৌক্তিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, সেগুলো আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও একত্বের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশ বহন করে। প্রতিদিন দেখতে দেখতে আমাদের চোখ যেহেতু তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তাই তাতে আমাদের কাছে বিস্ময়কর কিছু অনুভূত হয় না। নচেৎ তার একেকটি বস্তু এমন বিস্ময়কর বিশ্ব-ব্যবস্থার অংশ, যার সৃজন আল্লাহ তাআলার অপার কুদরত ছাড়া মহা বিশ্বের আর কোনও শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। আসমান-যমীনের সৃষ্টিরাজি নিরবধি যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, চন্দ্র-সূর্য যেভাবে এক বাঁধাধরা সময়সূচি অনুযায়ী দিবা-রাত্র পরিভ্রমণরত আছে, অফুরন্ত পানির ভাণ্ডার সাগর যেভাবে নৌযানের মাধ্যমে স্থলভাগের বিভিন্ন অংশকে পরস্পর জুড়ে রাখছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী স্থান থেকে স্থানান্তরে পৌঁছে দিচ্ছে এবং মেঘ ও বায়ু যেভাবে মানুষের জীবন-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেয়, তাতে এসব বস্তু সম্পর্কে কেবল আকাট মূর্খই এটা ভাবতে পারে যে, এগুলো কোনও স্রষ্টা ছাড়া আপনা-আপনিই অস্তিত্ব লাভ করেছে। আরব মুশরিকগণও স্বীকার করত, এ বিশ্বজগত আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি। তবে সেই সাথে তারা এ বিশ্বাসও রাখত যে, এসব কাজে কয়েকজন দেব-দেবী তাঁর সাহায্যকারী রয়েছে। কুরআন মাজীদ বলছে, যেই সত্তার শক্তি এত বিশাল যে, তিনি অন্যের কোনও অংশীদারিত্ব ছাড়াই এ বিস্ময়কর মহাজগত সৃষ্টি করেছেন, ছোট ছোট কাজে তাঁর কোনও শরীক বা সহযোগীর দরকার হবে কেন? সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের বুদ্ধি-বিবেচনাকে কাজে লাগাবে, সে জগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যেই আল্লাহ তাআলার একত্বের সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখতে পাবে।
১৬৫

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّتَّخِذُ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اَنۡدَادًا یُّحِبُّوۡنَہُمۡ کَحُبِّ اللّٰہِ ؕ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَشَدُّ حُبًّا لِّلّٰہِ ؕ وَ لَوۡ یَرَی الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡۤا اِذۡ یَرَوۡنَ الۡعَذَابَ ۙ اَنَّ الۡقُوَّۃَ لِلّٰہِ جَمِیۡعًا ۙ وَّاَنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعَذَابِ ١٦٥

ওয়া মিনান্নাছি মাইঁ ইয়াত্তাখিযুমিন দূ নিল্লা-হি আনদা-দাই ইউহিববূনাহুম কাহুব্বিল্লা-হি ওয়াল্লাযীনা আ-মানূ আশাদ্দু হুব্বাল লিল্লা-হি ওয়া লাও ইয়ারাল্লাযীনা জালামূ ইয ইয়ারাওনাল ‘আযা-বা আন্নাল কুওওয়াতা লিল্লা-হি জামী‘আও ওয়া আন্নাল্লাহা শাদীদুল ‘আযা-ব।

এবং (এতদসত্ত্বেও) মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে (তাঁর প্রভুত্বে) অংশীদার সাব্যস্ত করে, যাদেরকে তারা ভালোবাসে আল্লাহর ভালোবাসার মত। তবে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকেই সর্বাপেক্ষা বেশি ভালোবাসে। হায়! এ জালিমগণ (দুনিয়ায়) যখন কোনও শাস্তি প্রত্যক্ষ করে, তখনই যদি বুঝত যে, সমস্ত শক্তি আল্লাহরই এবং (আখিরাতে) আল্লাহর আযাব হবে সুকঠিন!
১৬৬

اِذۡ تَبَرَّاَ الَّذِیۡنَ اتُّبِعُوۡا مِنَ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡا وَرَاَوُا الۡعَذَابَ وَتَقَطَّعَتۡ بِہِمُ الۡاَسۡبَابُ ١٦٦

ইয তাবাররা আল্লাযীনাত্তুবি‘ঊ মিনাল্লাযীনাত্তাবা‘ঊ ওয়ারাআউল ‘আযা-বা ওয়াতাকাত্তা‘আত বিহিমুল আছবা-ব।

(সেই সময়টি হবে এমন) যখন অনুসৃতগণ তাদের অনুসরণকারীদের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দেবে এবং তারা সকলে আযাব দেখতে পাবে এবং তাদের পারস্পরিক সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে।
১৬৭

وَقَالَ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡا لَوۡ اَنَّ لَنَا کَرَّۃً فَنَتَبَرَّاَ مِنۡہُمۡ کَمَا تَبَرَّءُوۡا مِنَّا ؕ  کَذٰلِکَ یُرِیۡہِمُ اللّٰہُ اَعۡمَالَہُمۡ حَسَرٰتٍ عَلَیۡہِمۡ ؕ  وَمَا ہُمۡ بِخٰرِجِیۡنَ مِنَ النَّارِ ٪ ١٦٧

ওয়া কা-লাল্লাযীনাত্তাবা‘ঊ লাও আন্না লানা-কাররাতান ফানাতাবাররাআ মিনহুম কামা-তাবাররাঊ মিন্না-কাযা-লিকা ইউরীহিমুল্লা-হু আ‘মা-লাহুম হাছারা-তিন ‘আলাইহিম; ওয়ামা-হুম বিখা-রিজীনা মিনান্না-র।

আর যারা (তাদের অর্থাৎ নেতৃবর্গের) অনুসরণ করত তারা বলবে, হায়! একবার যদি আমাদের (দুনিয়ায়) ফিরে যাওয়ার সুযোগ হত, তবে আমরাও তাদের (অর্থাৎ নেতৃবর্গের) সঙ্গে এভাবেই সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করতাম, যেমন তারা আমাদের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করেছে। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে দেখাবেন যে, তাদের কার‌্যাবলী (আজ) তাদের জন্য সম্পূর্ণ মনস্তাপে পরিণত হয়েছে। ১১৫ আর তারা কোনও অবস্থায়ই জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।

তাফসীরঃ

১১৫. অর্থাৎ মুশরিকগণ যখন দেখবে, আল্লাহর আযাব সামনে উপস্থিত আর এই কঠিন সময়ে তাদের নেতৃবর্গ ও তাদের উপাস্যগণ তাদেরকে পরিত্যক্ত করেছে, তখন যেমন দুনিয়ায় তাদের অনুসরণ ও উপাসনা করার কারণে আক্ষেপ হবে, তেমনি আল্লাহ তা‘আলা তাদের যাবতীয় আমলকেই তাদের জন্য আক্ষেপের বিষয়ে পরিণত করবেন। কেননা, হজ্জ, উমরা, দান-খয়রাত ইত্যাদি ভালো কাজসমূহ করে থাকলে শিরকের কারণে তো তার সবই প্রত্যাখ্যাত হয়ে যাবে, অন্যদিকে শিরকসহ আরও যত গুনাহের কাজ করেছে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। এভাবে ভালো-মন্দ সব কাজই তাদের আক্ষেপের কারণ হয়ে যাবে। -অনুবাদক, তাফসীরে উছমানী অবলম্বনে
১৬৮

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ١٦٨

ইয়া আইয়ূহান্না-ছু কুলূ মিম্মা-ফিলআরদি হালা-লান তাইয়িাবাওঁ ওয়ালা-তাত্তাবি‘ঊ খুতুওয়া-তিশশাইতা-নি ইন্নাহু লাকুম ‘আদুওউম্মুম মুবীন।

হে মানুষ! পৃথিবীতে যা-কিছু হালাল, উৎকৃষ্ট বস্তু আছে তা খাও ১১৬ এবং শয়তানের পদচিহ্ন ধরে চলো না। নিশ্চিত জান, সে তোমাদের এক প্রকাশ্য শত্রু।

তাফসীরঃ

১১৬. আরব পৌত্তলিকদের একটি গোমরাহী ছিল এই যে, তারা কোনরূপ আসমানী শিক্ষা ছাড়াই মনগড়াভাবে বিভিন্ন বস্তুকে হালাল-হারাম সাব্যস্ত করে রেখেছিল। যেমন মৃত বস্তু খাওয়া তাদের নিকট জায়েয ছিল। আবার বহু হালাল জীবকে তারা নিজেদের পক্ষে হারাম করে রেখেছিল। ইনশাআল্লাহ সূরা আনআমে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসবে। তাদের সেই গোমরাহীর খণ্ডনে এ আয়াত নাযিল হয়েছে।
১৬৯

اِنَّمَا یَاۡمُرُکُمۡ بِالسُّوۡٓءِ وَالۡفَحۡشَآءِ وَاَنۡ تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ١٦٩

ইন্নামা-ইয়া’মুরুকুম বিছছূ ই ওয়াল ফাহশা-ই ওয়া আনতাকূলূ‘আলাল্লা-হি মা-লা-তা‘লামূন।

সে তো তোমাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ করতে এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলতেই আদেশ করে, যা তোমরা জান না। ১১৭

তাফসীরঃ

১১৭. অর্থাৎ আদেশ করে যে, শর‘ঈ বিধিবিধান ও মাসলা-মাসায়েল নিজেদের পক্ষ থেকে তৈরি করে নাও, এমনকি আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও কুরআন-সুন্নাহের বিপরীতে মনগড়া মতামত প্রকাশ-প্রচার কর ও সেই অনুযায়ী চল (তাফসীরে উছমানী অবলম্বনে)। -(-অনুবাদক)
১৭০

وَاِذَا قِیۡلَ لَہُمُ اتَّبِعُوۡا مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ قَالُوۡا بَلۡ نَتَّبِعُ مَاۤ اَلۡفَیۡنَا عَلَیۡہِ اٰبَآءَنَا ؕ اَوَلَوۡ کَانَ اٰبَآؤُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ شَیۡئًا وَّلَا یَہۡتَدُوۡنَ ١٧۰

ওয়াইযা-কীলা লাহুমুত্তাবি‘ঊ মাআনঝালাল্লা-হু কা-লু বাল নাত্তাবি‘ঊ মা আলফাইনা ‘আলাইহি আ-বাআনা-আওয়ালাও কা-না আ-বাউহুম লা-ইয়া‘কিলূনা শাইআওঁ ওয়ালা-ইয়াহতাদূন।

যখন তাদেরকে (কাফিরদেরকে) বলা হয়, আল্লাহ যে বাণী নাযিল করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, না, আমরা তো কেবল সে সকল বিষয়েরই অনুসরণ করব, যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি। আচ্ছা! যখন তাদের বাপ-দাদা (দ্বীনের) কিছুমাত্র বুঝ-সমঝ রাখত না, আর তারা কোনও (ঐশী) হিদায়াতও লাভ করেনি, তখনও কি (তাদের অনুসরণ করা উচিত)? ১১৮

তাফসীরঃ

১১৮. বোঝা যাচ্ছে, পূর্বপুরুষগণ যদি আসমানী হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং সে সম্পর্কে ভালো জ্ঞান-বুদ্ধি রাখে, তবে সেই হিদায়াতের অধিকারী হওয়ার লক্ষ্যে তাদের অনুসরণ দূষণীয় নয়। সুতরাং এ আয়াত মাযহাবের ইমামগণের অনুসরণকে নিষিদ্ধ করছে না। -(-অনুবাদক)
১৭১

وَمَثَلُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا کَمَثَلِ الَّذِیۡ یَنۡعِقُ بِمَا لَا یَسۡمَعُ اِلَّا دُعَآءً وَّنِدَآءً ؕ صُمٌّۢ بُکۡمٌ عُمۡیٌ فَہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ ١٧١

ওয়া মাছালুল্লাযীনা কাফারূ কামাছালিলযী ইয়ান‘ইকু বিমা-লা-ইয়াছমা‘ঊ ইল্লা-দু‘আআওঁ ওয়া নিদাআন সুম্মুম বুকমুন ‘উমইউন ফাহুম লা-ইয়া‘কিলূন।

যারা কুফর অবলম্বন করেছে, (সত্যের দাওয়াতের ব্যাপারে) তাদের দৃষ্টান্ত ঠিক এ রকম, যেমন কোনও ব্যক্তি এমন কিছুকে (পশুকে) ডাকে, যা হাঁক-ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনে না। তারা বধির, মূক, অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বোঝে না। ১১৯

তাফসীরঃ

১১৯. অর্থাৎ তারা সত্য শোনে না, সত্য বলে না এবং সত্যের পথ দেখে না। কাজেই শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা পশুর মত। পশুর মতই তারা ভালো-মন্দে পার্থক্য করতে পারে না। এ অবস্থায় তাদেরকে যে ব্যক্তি ঈমানের দিকে ডাকে, তার ডাক হবে পশুকে ডাকার মত, যে কেবল শব্দই শোনে, কিন্তু তার মর্ম বোঝে না। -(-অনুবাদক)
১৭২

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُلُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا رَزَقۡنٰکُمۡ وَاشۡکُرُوۡا لِلّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ اِیَّاہُ تَعۡبُدُوۡنَ ١٧٢

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ কুলূ মিন তাইয়িবা-তি মা-রাযাকনা-কুম ওয়াশকুরূ লিল্লা-হি ইন কুনতুম ইয়্যা-হু তা‘বুদূন।

হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে যে উৎকৃষ্ঠ বস্তুসমূহ দিয়েছি, তা থেকে (যা ইচ্ছা) খাও এবং আল্লাহর শুকর আদায় কর- যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করে থাক।
১৭৩

اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَیۡکُمُ الۡمَیۡتَۃَ وَالدَّمَ وَلَحۡمَ الۡخِنۡزِیۡرِ وَمَاۤ اُہِلَّ بِہٖ لِغَیۡرِ اللّٰہِ ۚ فَمَنِ اضۡطُرَّ غَیۡرَ بَاغٍ وَّلَا عَادٍ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ١٧٣

ইন্নামা-হাররামা ‘আলাইকুমুল মাইতাতা ওয়াদ্দামা ওয়া লাহমাল খিনঝীরি ওয়ামা উহিল্লা বিহী লিগাইরিল্লা-হি ফামানিদতুররা গাইরা বা-গিওঁ ওয়ালা-‘আ-দিন ফালা-ইছমা ‘আলাইহি ইনাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

তিনি তো তোমাদের জন্য কেবল মৃত জন্তু, রক্ত ও শুকরের গোশত হারাম করেছেন এবং সেই জন্তুও, যার প্রতি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম উচ্চারণ করা হয়। ১২০ হ্যাঁ, কোনও ব্যক্তি যদি চরম অনন্যোপায় অবস্থায় থাকে (ফলে এসব বস্তু হতে কিছু খেয়ে নেয়) আর তার উদ্দেশ্য মজা ভোগ করা না হয় এবং সে (প্রয়োজনের) সীমা অতিক্রমও না করে, তবে তার কোনও গুনাহ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১২০. এ আয়াতে সমস্ত হারাম জিনিসের তালিকা দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য কেবল একথা জানানো যে, তোমরা যে সব জন্তুকে হারাম মনে করে বসে আছ, আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে হারাম করেননি। তোমরা অযথা আল্লাহ তাআলার উপর তার নিষিদ্ধতাকে চাপিয়ে দিয়েছ। অপর দিকে এমন কিছু বস্তুও রয়েছে, যেগুলোকে তোমরা হারাম মনে কর না, অথচ আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে হারাম করেছেন। হারাম সেগুলো নয়, যেগুলোকে তোমরা হারাম মনে করছ; বরং হারাম সেইগুলো যেগুলোকে তোমরা হালাল মনে করে বসে আছ।
১৭৪

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ مِنَ الۡکِتٰبِ وَیَشۡتَرُوۡنَ بِہٖ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۙ اُولٰٓئِکَ مَا یَاۡکُلُوۡنَ فِیۡ بُطُوۡنِہِمۡ اِلَّا النَّارَ وَلَا یُکَلِّمُہُمُ اللّٰہُ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَلَا یُزَکِّیۡہِمۡ ۚۖ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ١٧٤

ইন্নাল্লাযীনা ইয়াকতুমূনা মা আনঝালাল্লা-হু মিনাল কিতা-বি ওয়া ইয়াশতারূনা বিহী ছামানান কালীলান উলাইকা মা-ইয়া’কুলূনা ফী বুতূনিহিম ইল্লান্না-রা ওয়ালাইউকালিলমুহুমুল্লা-হু ইয়াওমাল কিয়া-মাতি ওয়ালা-ইউঝাক্কীহিম ওয়া লাহুম ‘আযা-বুন আলীম।

প্রকৃতপক্ষে যারা আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবকে গোপন করে এবং তার বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই ভরে না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না, আর তাদের জন্য আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।
১৭৫

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ اشۡتَرَوُا الضَّلٰلَۃَ بِالۡہُدٰی وَالۡعَذَابَ بِالۡمَغۡفِرَۃِ ۚ فَمَاۤ اَصۡبَرَہُمۡ عَلَی النَّارِ ١٧٥

উলাইকাল্লাযীনাশতারাউদ্দালা-লাতা বিলহুদা-ওয়াল ‘আযা-বা বিলমাগফিরাতি ফামাআসবারাহুম ‘আলান্না-র।

এরাই তারা, যারা হিদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহী এবং মাগফিরাতের পরিবর্তে আযাব ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং (ভেবে দেখ) জাহান্নামের আগুন সহ্য করার জন্য তারা কতই না ধৈর্যশীল!
১৭৬

ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰہَ نَزَّلَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ ؕ  وَاِنَّ الَّذِیۡنَ اخۡتَلَفُوۡا فِی الۡکِتٰبِ لَفِیۡ شِقَاقٍۭ بَعِیۡدٍ ٪ ١٧٦

যা-লিকা বিআন্নাল্লা-হা নাঝঝলাল কিতা-বা বিলহাক্কিওয়া ইন্নাল্লাযীনাখ তালাফূ ফিল কিতা-বি লাফী শিকা-কিম বা‘ঈদ।

তা এ কারণে যে, আল্লাহ সত্যসম্বলিত কিতাব নাযিল করেছেন, আর যারা কিতাবের ব্যাপারে মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে তারা জেদাজেদিতে বহু দূর চলে গেছে। ১ #%২১%#

তাফসীরঃ

১২১. অর্থাৎ তারা যে হিদায়াতের বদলে গোমরাহী এবং মাগফিরাতের বদলে আযাব ক্রয় করেছে তার প্রমাণ, অথবা আখিরাতে যে তাদেরকে উপরে বর্ণিত শাস্তিসমূহ ভোগ করতে হবে তার কারণ এই যে, তারা সত্যসম্বলিত এ কিতাবের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এতে নানা রকম মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং শত্রুতায় বহুদূর চলে গেছে বা সত্য পথ থেকে বহুদূরে চলে গেছে। -অনুবাদক (তাফসীরে উছমানী অবলম্বনে)।
১৭৭

لَیۡسَ الۡبِرَّ اَنۡ تُوَلُّوۡا وُجُوۡہَکُمۡ قِبَلَ الۡمَشۡرِقِ وَالۡمَغۡرِبِ وَلٰکِنَّ الۡبِرَّ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَالۡمَلٰٓئِکَۃِ وَالۡکِتٰبِ وَالنَّبِیّٖنَ ۚ وَاٰتَی الۡمَالَ عَلٰی حُبِّہٖ ذَوِی الۡقُرۡبٰی وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنَ وَابۡنَ السَّبِیۡلِ ۙ وَالسَّآئِلِیۡنَ وَفِی الرِّقَابِ ۚ وَاَقَامَ الصَّلٰوۃَ وَاٰتَی الزَّکٰوۃَ ۚ وَالۡمُوۡفُوۡنَ بِعَہۡدِہِمۡ اِذَا عٰہَدُوۡا ۚ وَالصّٰبِرِیۡنَ فِی الۡبَاۡسَآءِ وَالضَّرَّآءِ وَحِیۡنَ الۡبَاۡسِ ؕ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُتَّقُوۡنَ ١٧٧

লাইছাল বিররা আন তুওয়াললূ উজূহাকুম কিবালাল মাশরিকিওয়াল মাগরিবি ওয়ালা-কিন্নাল বিররা মান আ-মানা বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়াল মালাইকাতি ওয়াল কিতা-বি ওয়ান্নাবিইয়ীনা ওয়া আ-তাল মা-লা ‘আলা-হুব্বিহী যাবিল কুরবা-ওয়াল ইয়াতামা-ওয়ালমাছা-কীনা ওয়াবনাছছাবীলি ওয়াছছাইলীনা ওয়াফিররিকা-বি ওয়া আকা-মাসসালা-তা ওয়া আ-তাঝঝাকা-তা ওয়ালমূফূনা বি‘আহদিহিম ইযা-‘আ-হাদূ ওয়াসসা-বিরীনা ফিল বা’ছাই ওয়াদ্দাররাই ওয়া হীনালবা’ছি উলাইকাল্লাযীনা সাদাকূওয়া উলাউকা হুমুল মুত্তাকূন।

পুণ্য তো কেবল এটাই নয় যে, তোমরা নিজেদের চেহারা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে; ১২২ বরং পুণ্য হল (সেই ব্যক্তির কার‌্যাবলী), যে ঈমান রাখে আল্লাহর, শেষ দিনের ও ফিরিশতাদের প্রতি এবং (আল্লাহর) কিতাব ও নবীগণের প্রতি। আর আল্লাহর ভালোবাসায় নিজ সম্পদ দান করে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির ও সওয়ালকারীদেরকে এবং দাসমুক্তিতে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং যারা কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণে যত্নবান থাকে এবং সঙ্কটে, কষ্টে ও যুদ্ধকালে ধৈর্যধারণ করে। এরাই তারা, যারা সাচ্চা (নামে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত) এবং এরাই মুত্তাকী।

তাফসীরঃ

১২২. একথা বলা হচ্ছে সেই কিতাবীদেরকে লক্ষ্য করে, যারা কিবলা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু করে দিয়েছিল যেন দীনের ভেতর এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনও বিষয় নেই। মুসলিমদেরকে বলা হচ্ছে, কিবলার বিষয়টাকে যতটুকু স্পষ্ট করার দরকার ছিল তা করা হয়েছে। এবার তোমাদের উচিত, দীনের অন্যান্য জরুরী বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া। আর কিতাবীদেরকেও বলে দেওয়া চাই যে, কিবলার বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনায় লিপ্ত হওয়া অপেক্ষা দরকারী বিষয় হল, নিজ ঈমানকে দুরস্ত করে নেওয়া এবং নিজের ভেতর সেই সকল গুণ আনয়ন করা যা ঈমানেরই দাবী। কুরআন মাজীদ এ প্রসঙ্গে সৎকর্মের বিভিন্ন শাখার বিবরণ দিয়েছে এবং ইসলামী আইনের নানা দিক তুলে ধরেছে। সামনে এক-এক করে তা আসছে।
১৭৮

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِصَاصُ فِی الۡقَتۡلٰی ؕ اَلۡحُرُّ بِالۡحُرِّ وَالۡعَبۡدُ بِالۡعَبۡدِ وَالۡاُنۡثٰی بِالۡاُنۡثٰی ؕ فَمَنۡ عُفِیَ لَہٗ مِنۡ اَخِیۡہِ شَیۡءٌ فَاتِّبَاعٌۢ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَاَدَآءٌ اِلَیۡہِ بِاِحۡسَانٍ ؕ ذٰلِکَ تَخۡفِیۡفٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَرَحۡمَۃٌ ؕ فَمَنِ اعۡتَدٰی بَعۡدَ ذٰلِکَ فَلَہٗ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ١٧٨

ইয়াআইয়ূহাল্লাযীনা আ-মানূ কুতিবা ‘আলাইকুমুল কিসা-সু ফিলকাতলা- আলহুররু বিলহুররি ওয়াল ‘আবদু বিল‘আবদি ওয়াল উনছা-বিলউনছা-ফামান ‘উফিয়া লাহু মিন আখীহি শাইউন ফাত্তিবা-‘উম বিলমা‘রূফি ওয়া আদাউন ইলাইহি বিইহছানিন যা-লিকা তাখফীফুম মিররাব্বিকুম ওয়া রাহমাতুন ফামানি‘তাদা-বা‘দা যা-লিকা ফালাহু ‘আযা-বুন আলীম।

হে মুমিনগণ! যাদেরকে (ইচ্ছাকৃত অন্যায়ভাবে) হত্যা করা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি কিসাস (-এর বিধান) ফরয করা হয়েছে- স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, গোলামের বদলে গোলাম, নারীর বদলে নারী (-কেই হত্যা করা হবে)। ১২৩ অতঃপর হত্যাকারীকে যদি তার ভাই (নিহতের অলি)-এর পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা করা হয়, ১২৪ তবে ন্যায়ানুগভাবে (রক্তপণ) দাবী করার অধিকার (অলির) আছে। আর উত্তমরূপে তা আদায় করা (হত্যাকারীর) কর্তব্য। এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এক লঘুকরণ এবং একটি রহমত। এরপরও কেউ সীমালংঘন করলে সে যন্ত্রণাময় শাস্তির উপযুক্ত। ১২৫

তাফসীরঃ

১২৩. কিসাস অর্থ সম-পরিমাণ বদলা নেওয়া। এ আয়াতে আদেশ করা হয়েছে, কোনও ব্যক্তিকে যদি ইচ্ছাকৃত অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় এবং হত্যাকারীর অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে নিহতের ওয়ারিশের এ অধিকার থাকে যে, সে হত্যাকারী থেকে কিসাস গ্রহণের দাবী তুলবে। জাহিলী যুগেও কিসাস গ্রহণ করা হত, কিন্তু তাতে ইনসাফ রক্ষা করা হত না। তারা মানুষের মধ্যে নিজেদের ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী বিভিন্ন স্তর সৃষ্টি করে রেখেছিল, আর সে হিসেবে নিুস্তরের কোনও লোক উচ্চস্তরের কাউকে হত্যা করলে ওয়ারিশগণ হত্যাকারীর পরিবর্তে তার গোত্রের এমন কাউকে হত্যা করতে চাইত যে মর্যাদায় নিহতের সমান। যদি কোনও গোলাম স্বাধীন কোনও ব্যক্তিকে হত্যা করত, তবে গোলামের পরিবর্তে একজন স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যা করার দাবি জানাত। এমনিভাবে হত্যাকারী নারী এবং নিহত পুরুষ হলে বলা হত, সেই নারীর পরিবর্তে একজন পুরুষকে হত্যা করা হবে। পক্ষান্তরে হত্যাকারী যদি নিহত ব্যক্তি অপেক্ষা উচ্চস্তরের লোক হত, যেমন হত্যাকারী পুরুষ এবং নিহত নারী, তবে হত্যাকারীর গোত্র বলত, আমাদের কোনও নারীকে হত্যা কর; পুরুষ হত্যাকারীর থেকে কিসাস নেওয়া যাবে না। আলোচ্য আয়াত জাহিলী যুগের এই অন্যায় প্রথার বিলোপ সাধন করেছে এবং ঘোষণা করে দিয়েছে, প্রাণ সকলেরই সমান। সর্বাবস্থায় হত্যাকারীর থেকেই কিসাস নেওয়া হবে, তাতে সে পুরুষ হোক বা নারী এবং স্বাধীন ব্যক্তি হোক বা গোলাম।
১৭৯

وَلَکُمۡ فِی الۡقِصَاصِ حَیٰوۃٌ یّٰۤاُولِی الۡاَلۡبَابِ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ١٧٩

ওয়ালাকুম ফিল কিসা-সি হায়া-তুঁই ইয়াঊলিল আলবা-বি লা‘আল্লাকুম তাত্তাকূন।

এবং হে বুদ্ধিমানেরা! কিসাসের ভেতর তোমাদের জন্য রয়েছে জীবন (রক্ষার ব্যবস্থা)। আশা করা যায় তোমরা (এর বিরুদ্ধাচরণ) পরিহার করবে।
১৮০

کُتِبَ عَلَیۡکُمۡ اِذَا حَضَرَ اَحَدَکُمُ الۡمَوۡتُ اِنۡ تَرَکَ خَیۡرَۨا ۚۖ  الۡوَصِیَّۃُ لِلۡوَالِدَیۡنِ وَالۡاَقۡرَبِیۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ  حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ ؕ ١٨۰

কুতিবা ‘আলাইকুম ইযা-হাদারা আহাদাকুমুল মাওতু ইন তারাকা খাইরানিল ওয়াসিইইয়াতু লিলওয়া-লিদাইনি ওয়াল আকরাবীনা বিলমা‘রূফি হাক্কান ‘আলাল মুত্তাকীন।

তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে যে, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অর্থ-সম্পদ রেখে যায়, তবে যখন তার মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হবে, তখন নিজ পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে ন্যায়সঙ্গতভাবে ওসিয়ত করবে। ১২৬ এটা মুত্তাকীদের অবশ্য কর্তব্য।

তাফসীরঃ

১২৬. মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদে যখন ওয়ারিশদের অংশ নির্দিষ্ট ছিল না, সেই সময় এ আয়াত নাযিল হয়। তখন মায়্যিতের পুত্রই সমুদয় সম্পদ লাভ করত। এ আয়াতে বিধান দেওয়া হয়েছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার মৃত্যুকালে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে ওসিয়ত করে যেতে হবে এবং স্পষ্ট করে দিতে হবে, তার সম্পদে কে কতটুকু অংশ পাবে। পরবর্তীতে সূরা নিসায় (৪ : ১১-৪১) ওয়ারিশগণের তালিকা ও তাদের প্রাপ্য অংশ স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তারপর আর এ আয়াতে যে ওসিয়তের কথা বলা হয়েছে তা ফরয থাকেনি। অবশ্য কারও যদি কোনও রকমের দেনা থাকে, তবে এখনও সে সম্পর্কে ওসিয়ত করে যাওয়া ফরয। তাছাড়া যে সকল লোক শরীয়তের বিধান অনুযায়ী ওয়ারিশ হয় না, তাদের অনুকূলে পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের ভেতর ওসিয়ত করা এখনও জায়েয আছে।
১৮১

فَمَنۡۢ بَدَّلَہٗ بَعۡدَمَا سَمِعَہٗ فَاِنَّمَاۤ اِثۡمُہٗ عَلَی الَّذِیۡنَ یُبَدِّلُوۡنَہٗ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ؕ ١٨١

ফামাম বাদ্দালাহু বা‘দা মা-ছামি‘আহূ ফাইন্নামা-ইছমুহূ ‘আলাল্লাযীনা ইউবাদ্দিলূনাহূ ইন্নাল্লা-হা ছামীউন ‘আলীম।

যে ব্যক্তি সে ওসিয়ত শোনার পর তাতে কোনও রদ-বদল করবে, তার গুনাহ তাদের উপরই বর্তাবে যারা তাতে রদ-বদল করবে। ১২৭ নিশ্চয়ই আল্লাহ (সবকিছু) শোনেন ও জানেন।

তাফসীরঃ

১২৭. অর্থাৎ যে সকল লোক মুমূর্ষু ব্যক্তির মুখ থেকে কোনও ওসিয়ত শুনেছে, তাদের পক্ষে সে ওসিয়তে কোনও রকমের কম-বেশি করা কিছুতেই জায়েয নয়। তার পরিবর্তে তাদের কর্তব্য, ওসিয়তকারী যা বলেছে ঠিক সেই অনুযায়ী কাজ করা।
১৮২

فَمَنۡ خَافَ مِنۡ مُّوۡصٍ جَنَفًا اَوۡ اِثۡمًا فَاَصۡلَحَ بَیۡنَہُمۡ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٪ ١٨٢

ফামান খা-ফা মিম্মূছিন জানাফান আও ইছমান ফাআসলাহা বাইনাহুম ফালা ইছমা ‘আলাইহি ইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

হাঁ কারও যদি আশংকা হয়, ওসিয়তকারী অন্যায় পক্ষপাতিত্ব বা গুনাহের কাজ করবে আর সে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে মীমাংসা করে দেয় তবে তার কোনও গুনাহ হবে না। ১২৮ নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১২৮. অর্থাৎ কোনও ওসিয়তকারী যদি বেইনসাফী করতে চায় আর কেউ তাকে বুঝিয়ে-সমঝিয়ে মরার আগে সেই ওসিয়ত সংশোধন করে দিতে প্রস্তুত করে, তা জায়েয হবে।
১৮৩

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ۙ ١٨٣

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ কুতিবা ‘আলাইকুমসসিয়া-মু কামা-কুতিবা ‘আলাল্লাযীনা মিন কাবলিকুম লা‘আল্লাকুম তাত্তাকূন।

হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়।
১৮৪

اَیَّامًا مَّعۡدُوۡدٰتٍ ؕ فَمَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ مَّرِیۡضًا اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ ؕ وَعَلَی الَّذِیۡنَ یُطِیۡقُوۡنَہٗ فِدۡیَۃٌ طَعَامُ مِسۡکِیۡنٍ ؕ فَمَنۡ تَطَوَّعَ خَیۡرًا فَہُوَ خَیۡرٌ لَّہٗ ؕ وَاَنۡ تَصُوۡمُوۡا خَیۡرٌ لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ١٨٤

আইয়া-মাম্মা‘দূদা-তিন ফামান কা-না মিনকুম মারীদান আও ‘আলা-ছাফারিন ফা‘ইদ্দাতুম মিন আইয়া-মিন উখারা ওয়া ‘আলাল্লাযীনা ইউতীকূনাহূ ফিদইয়াতুন তা‘আ-মু মিছকীনিন ফামান তাতাওওয়া‘আ খাইরান ফাহুওয়া খাইরুল্লাহূ ওয়া আন তাসূমূ খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম তা‘লামূন।

গণা-গুনতি কয়েক দিন (রোযা রাখতে হবে)। তারপরও যদি তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য সময়ে সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে। যারা এর শক্তি রাখে, তারা একজন মিসকীনকে খাবার খাইয়ে (রোযার) ফিদয়া আদায় করতে পারবে। ১২৯ এছাড়া কেউ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন পুণ্যের কাজ করে, তবে তার পক্ষে তা শ্রেয়। আর তোমাদের যদি সমঝ থাকে, তবে রোযা রাখাই তোমাদের জন্য বেশি ভালো।

তাফসীরঃ

১২৯. প্রথম দিকে যখন রোযা ফরয করা হয়, তখন এই সুবিধাও দেওয়া হয়েছিল যে, কোনও ব্যক্তি রোযা না রেখে তার পরিবর্তে ফিদয়া দিতে পারবে। পরবর্তীতে ১৮৫ নং আয়াত নাযিল হয়, যা সামনে আসছে। সে আয়াত এ সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয় এবং চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হয় যে, যে ব্যক্তিই রমযান মাস পাবে তাকে অবশ্যই রোযা রাখতে হবে। অবশ্য যারা অতি বৃদ্ধ, রোযা রাখার শক্তি নেই এবং ভবিষ্যতে রোযা রাখার মত শক্তি ফিরে আসারও কোনও আশা নেই, তাদের জন্য এ সুবিধা এখনও বাকি রাখা হয়েছে।
১৮৫

شَہۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡہِ الۡقُرۡاٰنُ ہُدًی لِّلنَّاسِ وَبَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡہُدٰی وَالۡفُرۡقَانِ ۚ فَمَنۡ شَہِدَ مِنۡکُمُ الشَّہۡرَ فَلۡیَصُمۡہُ ؕ وَمَنۡ کَانَ مَرِیۡضًا اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ ؕ یُرِیۡدُ اللّٰہُ بِکُمُ الۡیُسۡرَ وَلَا یُرِیۡدُ بِکُمُ الۡعُسۡرَ ۫ وَلِتُکۡمِلُوا الۡعِدَّۃَ وَلِتُکَبِّرُوا اللّٰہَ عَلٰی مَا ہَدٰىکُمۡ وَلَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ١٨٥

শাহরু রামাদা-নাল্লাযীউনঝিলা ফীহিল কুরআ-নু হুদাল লিন্না-ছি ওয়া বাইয়িনা-তিম মিনাল হুদা-ওয়াল ফুরকা-নি ফামান শাহিদা মিনকুমুশশাহরা ফালইয়াসুমহু ওয়া মান কা-না মারীদান আও ‘আলা-ছাফারিন ফা‘ইদ্দাতুম মিন আইয়া-মিন উখারা-ইউরীদুল্লা-হু বিকুমুল ইউছরা ওয়ালা-ইউরীদুবিকুমুল ‘উছরা ওয়ালিতুকমিলুল ‘ইদ্দাতা ওয়া লিতুকাব্বিরুল্লা-হা ‘আলা-মা-হাদা-কুম ওয়া লা‘আল্লাকুম তাশকরূন।

রমযান মাস- যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য (আদ্যোপান্ত) হিদায়াত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন এ সময় অবশ্যই রোযা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তবে অন্য দিনে সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের পক্ষে যা সহজ সেটাই চান, তোমাদের জন্য জটিলতা চান না, এবং (তিনি চান) যাতে তোমরা রোযার সংখ্যা পূরণ করে নাও এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে পথ দেখিয়েছেন, সেজন্য আল্লাহর তাকবীর পাঠ কর ১৩০ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

তাফসীরঃ

১৩০. রমাযান শেষ হওয়া মাত্র ঈদুল ফিতরের নামাযে যে তাকবীর বলা হয়, তার প্রতি এ আয়াতে এক সূক্ষ্ম ইশারা পাওয়া যায়।
১৮৬

وَاِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ۙ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لِیۡ وَلۡیُؤۡمِنُوۡا بِیۡ لَعَلَّہُمۡ یَرۡشُدُوۡنَ ١٨٦

ওয়া ইযা-ছাআলাকা ‘ইবা-দী ‘আন্নী ফাইন্নী কারীবুন উজীবুদা‘ওয়াতাদ্দা-‘ই ইযা-দা‘আ-নি ফালইয়াছতাজীবূলী ওয়াল ইউ’মিনূ বী লা‘আল্লাহুম ইয়ারশুদূন।

(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি। ১৩১ সুতরাং তারাও আমার কথা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করুক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে এসে যায়।

তাফসীরঃ

১৩১. রমাযান সম্পর্কিত আলোচনার মাঝখানে এ আয়াত আনার উদ্দেশ্য এই হয়ে থাকবে যে, উপরে রমাযানের সংখ্যা পূরণ করার কথা বলা হয়েছিল। তার দ্বারা কারও ধারণা জন্মাতে পারত যে, রমাযান চলে যাওয়ার পর হয়ত আল্লাহ তাআলার সাথে সেই নৈকট্য বাকি থাকবে না, যা রমাযানে ছিল। এ আয়াত সে ধারণা রদ করে দিয়েছে এবং পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা প্রতি মুহূর্তে নিজ বান্দার কাছে থাকেন এবং তিনি তার ডাক শোনেন।
১৮৭

اُحِلَّ لَکُمۡ لَیۡلَۃَ الصِّیَامِ الرَّفَثُ اِلٰی نِسَآئِکُمۡ ؕ ہُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّہُنَّ ؕ عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ کُنۡتُمۡ تَخۡتَانُوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ فَتَابَ عَلَیۡکُمۡ وَعَفَا عَنۡکُمۡ ۚ فَالۡـٰٔنَ بَاشِرُوۡہُنَّ وَابۡتَغُوۡا مَا کَتَبَ اللّٰہُ لَکُمۡ ۪ وَکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَکُمُ الۡخَیۡطُ الۡاَبۡیَضُ مِنَ الۡخَیۡطِ الۡاَسۡوَدِ مِنَ الۡفَجۡرِ ۪ ثُمَّ اَتِمُّوا الصِّیَامَ اِلَی الَّیۡلِ ۚ وَلَا تُبَاشِرُوۡہُنَّ وَاَنۡتُمۡ عٰکِفُوۡنَ ۙ فِی الۡمَسٰجِدِ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَقۡرَبُوۡہَا ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ اٰیٰتِہٖ لِلنَّاسِ لَعَلَّہُمۡ یَتَّقُوۡنَ ١٨٧

উহিল্লা লাকুম লাইলাতাসসিয়া-মিররাফাছুইলা-নিছাইকুম হুন্না লিবা-ছুল্লাকুম ওয়া আনতুম লিবা-ছুল লাহুন্না ‘আলিমাল্লা-হু আন্নাকুম কুনতুম তাখতা-নূনা আনফুছাকুম ফাতাবা ‘আলাইকুম ওয়া ‘আফা- ‘আনকুম ফালআ-না বা-শিরূহুন্না ওয়াবতাগূ মা-কাতাবাল্লা-হু লাকুম ওয়া কুলূ ওয়াশরাবূ হাত্তা-ইয়াতাবাইয়ানা লাকুমুল খাইতুল আবইয়াদুমিনাল খাইতিল আছওয়াদি মিনাল ফাজরি ছু ম্মা আতিম্মুস সিয়া-মা ইলাল্লাইলি ওয়ালাতুবা-শিরূহুন্না ওয়া আনতুম ‘আ-কিফূনা ফিল মাছা-জিদি তিলকা হুদূদুল্লা-হি ফালাতাকরাবূহা-কাযা-লিকা ইউবাইয়িনুল্লা-হু আ-য়া-তিহী লিন্না-ছি লা‘আল্লাহুম ইয়াত্তাকূন।

রোযার রাতে তোমাদের জন্য হালাল করে দেওয়া হয়েছে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস। তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাক। আল্লাহ জানতেন, তোমরা নিজেদের সাথে খেয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়েছেন এবং তোমাদের ত্রুটি ক্ষমা করেছেন। ১৩২ সুতরাং এখন তোমরা তাদের সাথে সহবাস কর এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা-কিছু লিখে রেখেছেন তা সন্ধান কর। ১৩৩ আর যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে পৃথক হয়ে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা খাও ও পান কর। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর। আর তাদের সাথে (স্ত্রীদের সাথে) সহবাস করো না, যখন তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত থাক। এসব আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা। সুতরাং তোমরা এগুলোর নিকটে যেও না। এভাবে আল্লাহ মানুষের সামনে স্বীয় নিদর্শনাবলী স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।

তাফসীরঃ

১৩২. অধিকাংশ তাফসীরবিদ এর ব্যাখ্যা এই করেছেন যে, স্ত্রীর সাথে সহবাসকালে সেই সন্তান লাভের নিয়ত থাকা চাই, যা আল্লাহ তাআলা তাকদীরে লিখে রেখেছেন। কোনও কোনও মুফাসসির এই ব্যাখ্যাও করেছেন যে, সহবাসকালে কেবল সেই আনন্দই কামনা করা চাই যা আল্লাহ তাআলা জায়েয করেছেন। যে-কোন নাজায়েয পন্থা তথা বিকৃত ও স্বভাব-বিরুদ্ধ পন্থা পরিহার করা অবশ্য কর্তব্য।
১৮৮

وَلَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَتُدۡلُوۡا بِہَاۤ اِلَی الۡحُکَّامِ لِتَاۡکُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ وَاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ٪ ١٨٨

ওয়ালা-তা’কূলূআমওয়া-লাকুম বাইনাকুম বিলবা-তিলি ওয়াতুদ লূবিহাইলাল হুক্কা-মি লিতা’কুলূ ফারীকাম মিন আমওয়া-লিন্না-ছি বিলইছমি ওয়া আনতুম তা‘লামুন।

তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং বিচারকের কাছে সে সম্পর্কে এই উদ্দেশ্যে মামলা রুজু করো না যে, মানুষের সম্পদ থেকে কোনও অংশ জেনে শুনে পাপের পথে গ্রাস করবে।
১৮৯

یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡاَہِلَّۃِ ؕ قُلۡ ہِیَ مَوَاقِیۡتُ لِلنَّاسِ وَالۡحَجِّ ؕ وَلَیۡسَ الۡبِرُّ بِاَنۡ تَاۡتُوا الۡبُیُوۡتَ مِنۡ ظُہُوۡرِہَا وَلٰکِنَّ الۡبِرَّ مَنِ اتَّقٰی ۚ وَاۡتُوا الۡبُیُوۡتَ مِنۡ اَبۡوَابِہَا ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ١٨٩

ইয়াছআলূনাকা ‘আনিল আহিল্লাতি কুল হিয়া মাওয়া-কীতু লিন্না-ছি ওয়ালহাজ্জি ওয়া লাইছাল বিররু বিআন তা’তুল বুয়ূতা মিন জুহুরিহা-ওয়ালা-কিন্নালবিররা মানিত্তাকা-ওয়া’তুল বুয়ূতা মিন আবওয়া-বিহা-ওয়াত্তাকুল্লা-হা লা‘আল্লাকুম তুফলিহুন।

লোকে আপনার কাছে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি তাদেরকে বলে দিন, এটা মানুষের (বিভিন্ন কাজ-কর্মের) এবং হজ্জের সময় নির্ধারণ করার জন্য। আর এটা কোনও পুণ্য নয় যে, তোমরা ঘরে তার পেছন দিক থেকে প্রবেশ করবে। ১৩৪ বরং কেউ তাকওয়া অবলম্বন করলে সেটাই পুণ্য। তোমরা ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ কর এবং আল্লাহকে ভয় করে চল, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পার।

তাফসীরঃ

১৩৪. আরবের কিছু লোকের নিয়ম ছিল, হজ্জের ইহরাম বাঁধার পর কোনও প্রয়োজনে বাড়ি ফিরে আসতে হলে তারা বাড়ির সাধারণ দরজা দিয়ে প্রবেশ করাকে জায়েয মনে করত না। এক্ষেত্রে তারা বাড়ির পেছন দিক থেকে প্রবেশ করত। এ কারণে যদি পেছন দিকের দেয়াল ভাঙ্গার প্রয়োজন হত, তাতেও দ্বিধাবোধ করত না। এ আয়াত তাদের সে কুসংস্কারকে ভিত্তিহীন সাব্যস্ত করছে।
১৯০

وَقَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ وَلَا تَعۡتَدُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ١٩۰

ওয়া কা-তিলূ ফী ছাবীলিল্লা-হিল্লাযীনা ইউকা-তিলূনাকুম ওয়ালা-তা‘তাদূ ইন্নাল্লা-হা লা-ইউহিব্বুল মু‘তাদীন।

যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তোমরা আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ কর, তবে সীমালংঘন করো না। নিশ্চিত জেন, আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের ভালোবাসেন না। ১৩৫

তাফসীরঃ

১৩৫. এ আয়াত সেই সময় নাযিল হয়, যখন মক্কার মুশরিকগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণকে হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে উমরা আদায়ে বাধা দিয়েছিল এবং চুক্তি হয়েছিল যে, পরবর্তী বছর এসে তাঁরা উমরা করবেন। পরবর্তী বছর উমরার ইচ্ছা করা হলে কতিপয় সাহাবীর মনে আশঙ্কা দেখা দেয়, মক্কার মুশরিকগণ চুক্তি ভঙ্গ করে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দেবে না তো? তেমন কিছু ঘটলে মুসলিমগণ সংকটে পড়ে যাবে। কেননা হারামের সীমানায় এবং বিশেষত যূ-কা‘দা মাসে তারা কিভাবে যুদ্ধ করবে? কেননা এ মাসে তো যুদ্ধ-বিগ্রহ জায়েয নয়। এ আয়াত নির্দেশনা দিল যে, নিজেদের পক্ষ থেকে তো যুদ্ধ শুরু করবে না। তবে কাফিরগণ যদি চুক্তি ভঙ্গ করতঃ নিজেরাই যুদ্ধ শুরু করে দেয়, তবে সেক্ষেত্রে মুসলিমদের জন্য যুদ্ধ জায়েয। তারা যদি হারামের সীমানা ও পবিত্র মাসের পবিত্রতাকে উপেক্ষা করে হামলা চালিয়ে বসে, তবে মুসলিমদের জন্যও তাদের সে সীমালংঘনের বদলা নেওয়া জায়েয হয়ে যাবে।
১৯১

وَاقۡتُلُوۡہُمۡ حَیۡثُ ثَقِفۡتُمُوۡہُمۡ وَاَخۡرِجُوۡہُمۡ مِّنۡ حَیۡثُ اَخۡرَجُوۡکُمۡ وَالۡفِتۡنَۃُ اَشَدُّ مِنَ الۡقَتۡلِ ۚ وَلَا تُقٰتِلُوۡہُمۡ عِنۡدَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ حَتّٰی یُقٰتِلُوۡکُمۡ فِیۡہِ ۚ فَاِنۡ قٰتَلُوۡکُمۡ فَاقۡتُلُوۡہُمۡ ؕ کَذٰلِکَ جَزَآءُ الۡکٰفِرِیۡنَ ١٩١

ওয়াকতুলূহুম হাইছু ছাকিফতুমূহুম ওয়া আখরিজূহুম মিন হাইছুআখরাজূকুম ওয়াল ফিতনাতু আশাদ্দু মিনাল কাতলি ওয়ালা-তুকা-তিলূহুম ‘ইনদাল মাছজিদিল হারা-মি হাত্তা-ইউকা-তিলূকুম ফীহি ফাইন কা-তালূকুম ফাকতুলূহুম কাযা-লিকা জাঝাউল কা-ফিরীন।

তোমরা তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে সেই স্থান থেকে বের করে দাও, যেখান থেকে তারা তোমাদের বের করেছিল। বস্তুত ফিতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ! ১৩৬ আর তোমরা মসজিদুল হারামের নিকট তাদের সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করো না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা সেখানে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে, হাঁ তারা যদি (সেখানে) যুদ্ধ শুরু করে তবে তোমরা তাদেরকে হত্যা করতে পার। এরূপ কাফিরদের শাস্তি সেটাই।

তাফসীরঃ

১৩৬. কুরআন মাজীদে ‘ফিতনা’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তার মধ্যে একটি অর্থ হল জুলুম ও অত্যাচার। এখানে সম্ভবত সে অর্থ বোঝানই উদ্দেশ্য। মক্কার মুশরিকগণ মুসলিমদেরকে তাদের দীন থেকে ফেরানোর জন্য চরম অন্যায় ও ন্যাক্কারজনক কঠোরতা অবলম্বন করেছিল। সুতরাং এস্থলে দৃশ্যত এটাই বোঝানো হচ্ছে যে, হত্যা করা মূলত যদিও কোনও ভালো কাজ নয় কিন্তু ফিতনা তার চেয়ে আরও মন্দ কাজ। যেখানে হত্যা ছাড়া ফিতনার দুয়ার বন্ধ করা সম্ভব হয় না, সেখানে তা করা ছাড়া উপায় কি?
১৯২

فَاِنِ انۡتَہَوۡا فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ١٩٢

ফাইনিন তাহাও ফাইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

অতঃপর তারা যদি নিরস্ত হয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
১৯৩

وَقٰتِلُوۡہُمۡ حَتّٰی لَا تَکُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّیَکُوۡنَ الدِّیۡنُ لِلّٰہِ ؕ فَاِنِ انۡتَہَوۡا فَلَا عُدۡوَانَ اِلَّا عَلَی الظّٰلِمِیۡنَ ١٩٣

ওয়া কা-তিলূহুম হাত্তা-লা-তাকূনা ফিতনাতুওঁ ওয়া ইয়াকূনাদ্দীনু লিল্লা-হি ফাইনিন তাহাও ফালা-‘উদওয়া-না ইল্লা-‘আলাজ্জা-লিমীন।

তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাক, যতক্ষণ না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন আল্লাহর হয়ে যায়। ১৩৭ অতঃপর তারা যদি ক্ষান্ত হয়, তবে জালিমরা ছাড়া অন্য কারও প্রতি কোনও কঠোরতা নয়।

তাফসীরঃ

১৩৭. এস্থলে এ বিষয়টি বুঝে রাখা উচিত যে, শরীয়তে জিহাদের উদ্দেশ্য কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা নয়। এ কারণেই সাধারণ অবস্থায় কেউ যদি কুফরেই অবিচল থাকতে চায়, তবে সে জিয্য়ার মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের আইন-কানুনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তা থাকতে পারে। জাযিরাতুল আরবের বিষয়টা আলাদা। কেননা এটা এমন দেশ, যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সরাসরি পাঠানো হয়েছে এবং যেখানকার লোকে তার মুজিযাসমূহ চাক্ষুষ দেখেছে ও তাঁর শিক্ষা সরাসরি শুনেছে। এরূপ লোক ঈমান না আনলে পূর্বেকার নবীগণের আমলে তো ব্যাপক আযাবের মাধ্যমে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমলে যেহেতু সে রকম আযাব স্থগিত রাখা হয়েছে, তাই আদেশ করা হয়েছে, জাযিরাতুল আরবে কোনও কাফির নাগরিক হিসেবে বাস করতে পারবে না। এখানে তার জন্য তিনটি উপায়ই আছে হয় ইসলাম গ্রহণ করবে, নয়ত জাযিরাতুল আরব ত্যাগ করে চলে যাবে অথবা যুদ্ধে কতল হয়ে যাবে।
১৯৪

اَلشَّہۡرُ الۡحَرَامُ بِالشَّہۡرِ الۡحَرَامِ وَالۡحُرُمٰتُ قِصَاصٌ ؕ فَمَنِ اعۡتَدٰی عَلَیۡکُمۡ فَاعۡتَدُوۡا عَلَیۡہِ بِمِثۡلِ مَا اعۡتَدٰی عَلَیۡکُمۡ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ مَعَ الۡمُتَّقِیۡنَ ١٩٤

আশশাহরুল হারা-মু বিশশাহরিল হারা-মি ওয়াল হুরুমা-তুকিসা-সুন ফামানি‘তাদা‘আলাইকুম ফা‘তাদূ ‘আলাইহি বিমিছলি মা‘তাদা-‘আলাইকুম ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া‘লামু আন্নাল্লা-হা মা‘আল মুত্তাকীন।

পবিত্র মাসের বদলা পবিত্র মাস, আর পবিত্রতার ক্ষেত্রেও বদলার বিধান প্রযোজ্য। ১৩৮ সুতরাং কেউ যদি তোমাদের প্রতি জুলুম করে, তবে তোমরাও তার জুলুমের বদলা নিতে পার সেই পরিমাণে, যেমন জুলুম সে তোমাদের প্রতি করেছে। আর আল্লাহকে ভয় করে চলো এবং জেনে রেখ, আল্লাহ তাদেরই সঙ্গে থাকেন, যারা (নিজেদের অন্তরে তাঁর) ভয় রাখে।

তাফসীরঃ

১৩৮. অর্থাৎ কেউ যদি পবিত্র মাসের মর্যাদা পদদলিত করে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে রত হয়, তবে তোমরা তার থেকে প্রতিশোধ নিতে পার।
১৯৫

وَاَنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَلَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡکُمۡ اِلَی التَّہۡلُکَۃِ ۚۖۛ وَاَحۡسِنُوۡا ۚۛ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ١٩٥

ওয়া আনফিকূফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়ালা-তুলকূবিআইদীকুম ইলাত্তাহলুকাতি ওয়া আহছিনূ ইন্নাল্লা-হা ইউহিব্বুল মুহছিনীন।

আর আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় কর এবং নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। ১৩৯ এবং সৎকর্ম অবলম্বন কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।

তাফসীরঃ

১৩৯. ইশারা করা হচ্ছে যে, তোমরা যদি জিহাদে অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য কর এবং সে কারণে জিহাদের লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তবে সেটা হবে নিজ পায়ে কুঠারাঘাত করার নামান্তর। কেননা তার পরিণামে শত্রু শক্তি সঞ্চয় করে তোমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
১৯৬

وَاَتِمُّوا الۡحَجَّ وَالۡعُمۡرَۃَ لِلّٰہِ ؕ  فَاِنۡ اُحۡصِرۡتُمۡ فَمَا اسۡتَیۡسَرَ مِنَ الۡہَدۡیِ ۚ  وَلَا تَحۡلِقُوۡا رُءُوۡسَکُمۡ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡہَدۡیُ مَحِلَّہٗ ؕ  فَمَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ مَّرِیۡضًا اَوۡ بِہٖۤ اَذًی مِّنۡ رَّاۡسِہٖ فَفِدۡیَۃٌ مِّنۡ صِیَامٍ اَوۡ صَدَقَۃٍ اَوۡ نُسُکٍ ۚ  فَاِذَاۤ اَمِنۡتُمۡ ٝ  فَمَنۡ تَمَتَّعَ بِالۡعُمۡرَۃِ اِلَی الۡحَجِّ فَمَا اسۡتَیۡسَرَ مِنَ الۡہَدۡیِ ۚ  فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ ثَلٰثَۃِ اَیَّامٍ فِی الۡحَجِّ وَسَبۡعَۃٍ اِذَا رَجَعۡتُمۡ ؕ  تِلۡکَ عَشَرَۃٌ کَامِلَۃٌ ؕ  ذٰلِکَ لِمَنۡ لَّمۡ یَکُنۡ اَہۡلُہٗ حَاضِرِی الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ؕ  وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ٪ ١٩٦

ওয়া আতিম্মুল হাজ্জা ওয়াল ‘উমরাতা লিল্লা-হি ফাইন উহসিরতুম ফামাছ তাইছারা মিনাল হাদয়ি ওয়ালা-তাহলিকূরুঊছাকুম হাত্তা-ইয়াবলুগাল হাদইউ মাহিল্লা-হূ ফামান কা-না মিনকুম মারীদান আও বিহীআযাম মির রা’ছিহী ফাফিদইয়াতুম মিন সিয়া-মিন আও সাদাকাতিন আও নুছুকিন ফাইযা-আমিনতুম ফামান তামাত্তা‘আ বিল ‘উমরাতি ইলাল হাজ্জি ফামাছতাইছারা মিনাল হাদয়ি ফামাল্লাম ইয়াজিদ ফাসিয়া-মু ছালা-ছাতি আইয়া-মিন ফিল হাজ্জি ওয়া ছাব‘আতিন ইযা-রাজা‘তুম তিলকা ‘আশারাতুন কা-মিলাতুন যা-লিকা লিমাল্লাম ইয়াকুন আহলুহূহা-দিরিল মাছজিদিল হারা-মি ওয়াত্তাকূল্লা-হা ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা শাদীদুল ‘ইকা-ব।

এবং আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরা পূর্ণ কর। হাঁ তোমাদেরকে যদি বাধা দেওয়া হয়, তবে যে কুরবানী সম্ভব হয় (তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন কর)। ১৪০ আর নিজেদের মাথা ততক্ষণ পর্যন্ত কামিও না, যতক্ষণ না কুরবানী নিজ জায়গায় পৌঁছে যায়। হাঁ তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে বা তার মাথায় ক্লেশ দেখা দেয়, তবে সে রোযা বা সাদাকা কিংবা কুরবানীর ফিদয়া দেবে। ১৪১ তারপর যখন তোমরা নিরাপদ হয়ে যাবে, তখন যে ব্যক্তি হজ্জের সাথে উমরার সুবিধাও ভোগ করবে, সে (আল্লাহর উদ্দেশ্যে পেশ করবে) যে কুরবানী সহজলভ্য হয়। আর কারও যদি সে সামর্থ্য না থাকে, তবে সে হজ্জের দিনে তিনটি রোযা রাখবে এবং সাতটি (রোযা রাখবে) সেই সময়, যখন তোমরা (বাড়িতে) প্রত্যাবর্তন করবে। এভাবে মোট দশটি রোযা হবে। ১৪২ এ বিধান সেই সব লোকের জন্য, যাদের পরিবারবর্গ মসজিদুল হারামের নিকটে বাস করে না। ১৪৩ আর আল্লাহকে ভয় করে চলো এবং জেনে রেখ, আল্লাহর আযাব সুকঠিন।

তাফসীরঃ

১৪০. অর্থাৎ কেউ যখন হজ্জ বা উমরার ইহরাম বেঁধে ফেলবে, তখন হজ্জ বা উমরার কাজ সমাপণ না করা পর্যন্ত ইহরাম খোলা জায়েয হবে না। তবে কেউ যদি নিরুপায় হয়ে যায়, ফলে ইহরাম বাঁধার পর মক্কায় পৌঁছা সম্ভব না হয়, তার কথা ভিন্ন। খোদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সাহাবীগণকে নিয়ে তিনি উমরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু যখন হুদায়বিয়ায় পৌঁছান, তখন মক্কার মুশরিকরা তাঁকে সেখানে আটকে দেয়। ফলে তিনি আর সামনে অগ্রসর হতে পারেননি। তখনই এই আয়াত নাযিল হয়। আয়াতে এরূপ পরিস্থিতিতে এই সমাধান দেওয়া হয়েছে যে, এরূপ অবস্থায় কুরবানী করে ইহরাম খোলা যেতে পারে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে এ কুরবানী হারামের সীমানার মধ্যে হতে হবে, যেমন পরবর্তী বাক্যে বলা হয়েছে, ‘নিজেদের মাথা ততক্ষণ পর্যন্ত কামিও না, যতক্ষণ না কুরবানী নিজ জায়গায় পৌঁছে যায়। অতঃপর যেই হজ্জ বা উমরার ইহরাম বেঁধেছিল তার কাযা করাও জরুরী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরের বছর এ উমরার কাযা করেছিলেন।
১৯৭

اَلۡحَجُّ اَشۡہُرٌ مَّعۡلُوۡمٰتٌ ۚ فَمَنۡ فَرَضَ فِیۡہِنَّ الۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوۡقَ ۙ وَلَا جِدَالَ فِی الۡحَجِّ ؕ وَمَا تَفۡعَلُوۡا مِنۡ خَیۡرٍ یَّعۡلَمۡہُ اللّٰہُ ؕؔ وَتَزَوَّدُوۡا فَاِنَّ خَیۡرَ الزَّادِ التَّقۡوٰی ۫ وَاتَّقُوۡنِ یٰۤاُولِی الۡاَلۡبَابِ ١٩٧

আলহাজ্জু আশহুরুম মা‘লূমা-তুন ফামান ফারাদাফীহিন্নাল হাজ্জা ফালা-রাফাছা ওয়ালা-ফুছূকা ওয়ালা-জিদা-লা ফিল হাজ্জি ওয়ামা-তাফ‘আলূ মিন খাইরিইঁ ইয়া‘লাম হুল্লা-হু ওয়া তাঝাওওয়াদূ ফাইন্না খাইরাঝঝা-দিত্তাকওয়া-ওয়াত্তাকূনি ইয়া ঊলিল আলবা-ব।

হজ্জের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে (ইহরাম বেঁধে) নিজের উপর হজ্জ অবধারিত করে নেয়, সে হজ্জের সময়ে কোন অশ্লীল কথা বলবে না, কোন গুনাহ করবে না এবং ঝগড়াও নয়। তোমরা যা-কিছু সৎকর্ম করবে আল্লাহ তা জানেন। আর (হজ্জের সফরে) পথ খরচা সাথে নিয়ে নিয়ো। বস্তুত তাকওয়াই উৎকৃষ্ট অবলম্বন। ১৪৪ আর হে বুদ্ধিমানেরা! তোমরা আমাকে ভয় করে চলো।

তাফসীরঃ

১৪৪. কোনও কোনও লোক হজ্জে রওয়ানা হওয়ার সময় সাথে পথ খরচা রাখত না। তারা বলত, আমরা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে হজ্জ করব। কিন্তু পথে যখন খাওয়ার দরকার পড়ত, তখন অনেক সময় মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়ে যেত। এ আয়াত বলছে, তাওয়াক্কুলের অর্থ এ নয় যে, মানুষ হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবে; বরং উপায় অবলম্বন করাই শরীয়তের শিক্ষা। আর সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট পাথেয় হল তাকওয়া অর্থাৎ এমন পাথেয় যার মাধ্যমে মানুষ অন্যের সামনে হাত পাতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
১৯৮

لَیۡسَ عَلَیۡکُمۡ جُنَاحٌ اَنۡ تَبۡتَغُوۡا فَضۡلًا مِّنۡ رَّبِّکُمۡ ؕ فَاِذَاۤ اَفَضۡتُمۡ مِّنۡ عَرَفٰتٍ فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ عِنۡدَ الۡمَشۡعَرِ الۡحَرَامِ ۪ وَاذۡکُرُوۡہُ کَمَا ہَدٰىکُمۡ ۚ وَاِنۡ کُنۡتُمۡ مِّنۡ قَبۡلِہٖ لَمِنَ الضَّآلِّیۡنَ ١٩٨

লাইছা ‘আলাইকুম জুনা-হুন আন তাবতাগূ ফাদলাম মিররাব্বিকুম ফাইযাআফাদতুম মিন ‘আরাফা-তিন ফাযকুরুল্লা-হা ‘ইনদাল মাশ‘আরিল হারা-মি ওয়াযকুরুহু কা-মাহাদা-কুম ওয়া ইন কুনতুম মিন কাবলিহী লামিনাদ্দাল্লীন।

তোমরা (হজ্জের সময়ে ব্যবসা বা মজুর খাটার মাধ্যমে) স্বীয় প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করলে তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই। ১৪৫ অতঃপর তোমরা যখন আরাফাত থেকে রওয়ানা হবে, তখন মাশআরুল হারামের নিকট (যা মুযদালিফায় অবস্থিত) আল্লাহর যিকির করো। আর তার যিকির তোমরা সেভাবেই করবে, যেভাবে তিনি তোমাদেরকে হিদায়াত করেছেন, ১৪৬ আর এর আগে তোমরা বিলকুল অজ্ঞ ছিলে।

তাফসীরঃ

১৪৫. হজ্জের সময় আরাফাত থেকে এসে মুযদালিফায় রাত কাটাতে হয় এবং সূর্যোদয়ের আগে ভোরে সেখানে উকূফ (অবস্থান) করতে হয়। তখন আল্লাহ তাআলার যিকির করা হয় ও তাঁর কাছে দু‘আ করা হয়। জাহিলী যুগেও আরবগণ আল্লাহর যিকির করত, কিন্তু তার সাথে নিজেদের দেব-দেবীদের যিকিরও যুক্ত করত। এ আয়াতে বলা হচ্ছে যে, মুমিনের যিকির কেবল আল্লাহ তাআলার জন্যই হওয়া চাই, যেমন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ ও হিদায়াত করেছেন।
১৯৯

ثُمَّ اَفِیۡضُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَفَاضَ النَّاسُ وَاسۡتَغۡفِرُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ١٩٩

ছু ম্মা আফীদূ মিন হাইছুআফা-দান্না-ছুওয়াছতাগফিরুল্লা-হা ইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

তাছাড়া (একথাও স্মরণ রেখ যে,) তোমরা সেই স্থান থেকেই রওয়ানা হবে, যেখান থেকে অন্যান্য লোক রওয়ানা হয়। ১৪৭ আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১৪৭. জাহিলী যুগে আরবগণ নিয়ম তৈরি করেছিল যে, ৯ই যুলহিজ্জা সমস্ত মানুষ তো আরাফাতে উকূফ করত, কিন্তু কুরাইশ ও হুম্স নামে অভিহিত হারামের আশপাশের কিছু গোত্র আরাফাতে না গিয়ে মুযদালিফায় অবস্থান করত। তারা বলত, আমরা হারামের বাসিন্দা। আরাফাত যেহেতু হারামের সীমানার বাইরে, তাই আমরা সেখানে যাব না। ফলে অন্যান্য লোককে তো ৯ই যুলহিজ্জার দিন আরাফাতে কাটানোর পর রাতে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে হত, কিন্তু কুরাইশ ও তার অনুসারী গোত্রসমূহ আগে থেকেই মুযদালিফায় থাকত এবং তাদের আরাফায় আসতে হত না, এ আয়াত তাদের সে রীতি বাতিল করে দিয়েছে এবং কুরাইশের লোকদেরকেও হুকুম দিয়েছে, তারা যেন অন্যদের মত আরাফাতে উকূফ করে এবং তাদের সাথেই রওয়ানা হয়ে মুযদালিফায় আসে।
২০০

فَاِذَا قَضَیۡتُمۡ مَّنَاسِکَکُمۡ فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ کَذِکۡرِکُمۡ اٰبَآءَکُمۡ اَوۡ اَشَدَّ ذِکۡرًا ؕ فَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّقُوۡلُ رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا وَمَا لَہٗ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنۡ خَلَاقٍ ٢۰۰

ফাইযা-কাদাইতুম মানা-ছিকাকুম ফাযকুরুল্লা-হা কাযিকরিকুম আ-বাআকুম আও আশাদ্দা যিকরান ফামিনান্না-ছি মাইঁ ইয়াকূলু রাব্বানাআ-তিনা-ফিদ্দুনইয়া-ওয়ামা-লাহু ফিল আ-খিরাতি মিন খালা-ক।

তোমরা যখন হজ্জের কার্যাবলী শেষ করবে, তখন আল্লাহকে সেইভাবে স্মরণ করবে, যেভাবে নিজেদের বাপ-দাদাকে স্মরণ করে থাক; বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ করবে। ১৪৮ কিছু লোক তো এমন আছে, যারা (দু‘আয় কেবল) বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যাণ দান কর, আর আখিরাতে তাদের কোনও অংশ নেই।

তাফসীরঃ

১৪৮. জাহিলী যুগের আরও একটি রেওয়াজ ছিল হজ্জের মৌলিক কার্যাবলী শেষ করার পর যখন তারা মিনায় একত্র হত, তখন কিছু লোক সম্পূর্ণ একটা দিন নিজেদের বাপ-দাদার প্রশংসা ও গৌরবগাঁথা বর্ণনা করে কাটিয়ে দিত। এ আয়াতে তাদের সেই রসমের প্রতিই ইশারা করা হয়েছে। আবার কিছু লোক দু‘আ তো করত, কিন্তু তারা যেহেতু আখিরাতে বিশ্বাস করত না তাই তাদের দু‘আ কেবল দুনিয়ার কল্যাণ প্রার্থনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। পরবর্তী বাক্যে জানানো হয়েছে যে, একজন মুমিনের কর্তব্য, দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানের মঙ্গল কামনা করা।
২০১

وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّقُوۡلُ رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّفِی الۡاٰخِرَۃِ حَسَنَۃً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ ٢۰١

ওয়া মিনহুম মাইঁ ইয়াকূলুরাব্বানাআ-তিনা-ফিদ্দুনইয়া-হাছানাতাওঁ ওয়া ফিল আ-খিরাতি হাছানাতাওঁ ওয়া কিনা-‘আযা-বান্না-র।

আবার তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দান কর দুনিয়ায়ও কল্যাণ এবং আখিরাতেও কল্যাণ এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা কর। ১৪৯

তাফসীরঃ

১৪৯. অর্থাৎ যারা সমঝদার মুমিন, তারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানের কল্যাণ প্রার্থনা করে। কল্যাণ প্রার্থনার এ বাক্যটি অতি পূর্ণাঙ্গ। দুনিয়ার কল্যাণ হচ্ছে সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও নিরাপত্তা, স্বস্তিপূর্ণ দাম্পত্য, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ রিযক ইত্যাদি, আর আখিরাতের কল্যাণ হল কবরের শান্তি, সহজ হিসাব, জাহান্নাম থেকে মুক্তি, জান্নাত লাভ ইত্যাদি। এ সংক্ষিপ্ত দু‘আর মধ্যে সবই এসে গেছে। -অনুবাদক
২০২

اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ نَصِیۡبٌ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ سَرِیۡعُ الۡحِسَابِ ٢۰٢

উলাইকা লাহুম নাসীবুম মিম্মা-কাছাবূ ওয়াল্লা-হু ছারী‘উল হিছা-ব।

এরা এমন লোক, যারা তাদের অর্জিত কর্মের অংশ (সওয়াব রূপে) লাভ করবে। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।
২০৩

وَاذۡکُرُوا اللّٰہَ فِیۡۤ اَیَّامٍ مَّعۡدُوۡدٰتٍ ؕ فَمَنۡ تَعَجَّلَ فِیۡ یَوۡمَیۡنِ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ۚ وَمَنۡ تَاَخَّرَ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ۙ لِمَنِ اتَّقٰی ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ اِلَیۡہِ تُحۡشَرُوۡنَ ٢۰٣

ওয়াযকুরুল্লা-হা ফীআইয়া-মিম মা‘দূদা-তিন ফামান তা‘আজ্জালা ফী ইয়াওমাইনি ফালা-ইছমা ‘আলাইহি ওয়ামান তাআখখারা ফালা-ইছমা ‘আলাইহি লিমানিত্তাকা- ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া‘লামূআন্নাকুম ইলাইহি তুহশারূন।

এবং তোমরা আল্লাহকে গনা-গুণতি কয়েক দিন (যখন তোমরা মিনায় অবস্থানরত থাক) স্মরণ করতে থাক। অতঃপর যে ব্যক্তি তাড়াতাড়ি করে দু’দিনেই চলে যাবে, তার কোনও গুনাহ নেই এবং যে ব্যক্তি (এক দিন) পরে যাবে তারও কোনও গুনাহ নেই। ১৫০ এটা তার জন্য, যে তাকওয়া অবলম্বন করে। তোমরা সকলে আল্লাহভীতি অবলম্বন কর এবং বিশ্বাস রাখ যে, তোমাদের সকলকে তাঁরই কাছে নিয়ে একত্র করা হবে।

তাফসীরঃ

১৫০. মিনায় তিন দিন কাটানো সুন্নত এবং এ সময়ে জামারাতে পাথর নিক্ষেপ ওয়াজিব। তবে ১২ তারিখের পর মিনা থেকে চলে আসা জায়েয। ১৩ তারিখ পর্যন্ত থাকা জরুরী নয়। কেউ থাকতে চাইলে ১৩ তারিখে পাথর নিক্ষেপ করে চলে আসতে পারে।
২০৪

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یُّعۡجِبُکَ قَوۡلُہٗ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَیُشۡہِدُ اللّٰہَ عَلٰی مَا فِیۡ قَلۡبِہٖ ۙ وَہُوَ اَلَدُّ الۡخِصَامِ ٢۰٤

ওয়া মিনান্না-ছি মাই ইউ‘জিবুকা কাওলুহূ ফিল হায়া-তিদ্দুনইয়া-ওয়া ইউশহিদুল্লা-হা ‘আলামা-ফী কালবিহী ওয়াহুওয়া আলাদ্দুল খিসা-ম।

এবং মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কে যার কথা তোমাকে মুগ্ধ করে, আর তার অন্তরে যা আছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে সাক্ষীও বানায়, অথচ সে (তোমার) শত্রুদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা কট্টর।
২০৫

وَاِذَا تَوَلّٰی سَعٰی فِی الۡاَرۡضِ لِیُفۡسِدَ فِیۡہَا وَیُہۡلِکَ الۡحَرۡثَ وَالنَّسۡلَ ؕ وَاللّٰہُ لَا یُحِبُّ الۡفَسَادَ ٢۰٥

ওয়া ইযা-তাওয়াল্লা-ছা‘আ-ফিল আরদিলিইউফছিদা ফীহা-ওয়া ইউহলিকাল হারছা ওয়ান্নাছলা ওয়াল্লা-হু লা-ইউহিব্বুল ফাছা-দ।

সে যখন উঠে চলে যায়, তখন যমীনে তার দৌড়-ঝাপ হয় এই উদ্দেশ্যে যে, সে তাতে অশান্তি ছড়াবে এবং ফসল ও (জীব-জন্তুর) বংশ নিপাত করবে, অথচ আল্লাহ অশান্তি সৃষ্টি পছন্দ করেন না। ১৫১

তাফসীরঃ

১৫১. কোনও কোনও রিওয়ায়াতে আছে, আখনাস ইবনে শারীক নামক এক ব্যক্তি মদীনা মুনাওয়ারায় এসেছিল এবং সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বড় মনোমুগ্ধকর কথাবার্তা বলল এবং আল্লাহকে সাক্ষী রেখে নিজের ঈমান আনার কথা প্রকাশ করল, কিন্তু যখন ফিরে গেল তখন পথে সে মুসলিমদের ফসলে অগ্নিসংযোগ করল এবং তাদের গবাদি পশু যবাহ করে ফেলল। তার প্রতি লক্ষ্য করেই এ আয়াত নাযিল হয়েছিল, যদিও এটা সব রকমের মুনাফিকের জন্যই প্রযোজ্য।
২০৬

وَاِذَا قِیۡلَ لَہُ اتَّقِ اللّٰہَ اَخَذَتۡہُ الۡعِزَّۃُ بِالۡاِثۡمِ فَحَسۡبُہٗ جَہَنَّمُ ؕ وَلَبِئۡسَ الۡمِہَادُ ٢۰٦

ওয়াইযা-কীলা লাহুত্তাকিল্লা-হা আখাযাতহুল ‘ইঝঝাতু বিলইছমি ফাহাছবহু জাহান্নামু ওয়ালাবি’ছাল মিহা-দ।

যখন তাকে বলা হয় আল্লাহকে ভয় কর, তখন আত্মাভিমান তাকে আরও বেশি গুনাহে প্ররোচিত করে। সুতরাং এমন ব্যক্তির জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট হবে এবং তা অতি মন্দ বিছানা।
২০৭

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡرِیۡ نَفۡسَہُ ابۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ رَءُوۡفٌۢ بِالۡعِبَادِ ٢۰٧

ওয়া মিনান্না-ছি মাইঁ ইয়াশরী নাফছাহুব তিগাআ মারদা-তিল্লাহি ওয়াল্লা-হু রাঊফুম বিল‘ইবা-দ।

এবং (অপর দিকে) মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজ প্রাণকে বিক্রি করে দেয়। ১৫২ আল্লাহ (এরূপ) বান্দাদের প্রতি অতি দয়ালু।

তাফসীরঃ

১৫২. এর দ্বারা সেই সকল সাহাবীর কথা বলা হয়েছে, যারা ইসলামের জন্য নিজেদের প্রাণ বিকিয়ে দিয়েছিলেন। মুফাসসিরগণ এ রকম কয়েকজন সাহাবীর ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
২০৮

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ٢۰٨

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুদ খুলূ ফিছছিলমি কাফফাতাওঁ ওয়ালা-তাত্তাবি‘ঊ খুতুওয়া-তিশশাইতা-নি ; ইন্নাহু লাকুম ‘আদুওউম মুবীন।

হে মুমিনগণ! ইসলামে সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। ১৫৩ নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

তাফসীরঃ

১৫৩. যে সকল ইয়াহুদী ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদের কতিপয় চেয়েছিল ইয়াহুদী ধর্মের কিছু কাজ আগের মতই পালন করবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়। নির্দেশ দেওয়া হয় যে, দেহমনে, চিন্তা-চেতনায় এবং বিশ্বাস ও কর্মে সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর। কুরআন-সুন্নাহয় তোমাদেরকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। কাজেই কেবল তারই অনুসরণ কর। এর বাইরে অন্য কোনও ধর্ম ও মতবাদ থেকে কিছু গ্রহণ করা বা মনগড়া রীতি-নীতি, বিদ‘আত, কুসংস্কার ইত্যাদি অনুসরণ করার মানসিক দুর্বলতা সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেল। -অনুবাদক
২০৯

فَاِنۡ زَلَلۡتُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡکُمُ الۡبَیِّنٰتُ فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٢۰٩

ফাইন ঝালালতুম মিম বা‘দি মা-জাআতকুমুল বাইয়িনা-তু ফা‘লামূআন্নাল্লা-হা, ‘আঝীঝুন হাকীম।

তোমাদের কাছে যে উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী এসেছে তারপরও যদি তোমরা (সঠিক পথ থেকে) স্খলিত হও, তবে মনে রেখ, আল্লাহ মহা ক্ষমতাবান (ও) প্রজ্ঞাময়। ১৫৪

তাফসীরঃ

১৫৪. বিশেষভাবে এ দুটো গুণ উল্লেখ করার উদ্দেশ্য এই যে, যেহেতু আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা পরিপূর্ণ, তাই তিনি যে-কোনও সময়ে তোমাদের দুষ্কর্মের শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু যেহেতু তার জ্ঞান-প্রজ্ঞাও পরিপূর্ণ, তাই তিনি স্বীয় প্রজ্ঞা অনুযায়ী স্থির করে রাখেন, কাকে কখন এবং কতটুকু শাস্তি দিতে হবে। সুতরাং এ কাফিরদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না বলে তারা যে স্থায়ীভাবে শাস্তি থেকে বেঁচে গেছে, এরূপ মনে করা চরম নির্বুদ্ধিতা।
২১০

ہَلۡ یَنۡظُرُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیَہُمُ اللّٰہُ فِیۡ ظُلَلٍ مِّنَ الۡغَمَامِ وَالۡمَلٰٓئِکَۃُ وَقُضِیَ الۡاَمۡرُ ؕ  وَاِلَی اللّٰہِ تُرۡجَعُ الۡاُمُوۡرُ ٪ ٢١۰

হাল ইয়ানজুরূনা ইল্লা-আইঁয়া’তিয়াহুমুল্লা-হু ফী জুলালিম মিনাল গামা-মি ওয়ালমালাইকাতু ওয়া কুদিয়াল আমরু ওয়া ইলাল্লা-হি তুর জা‘উল উমূর।

তারা (কাফিরগণ ঈমান আনার জন্য) কি এছাড়া আর কোনও জিনিসের অপেক্ষা করছে যে, আল্লাহ স্বয়ং মেঘের চাঁদোয়ায় তাদের সামনে এসে উপস্থিত হবেন এবং ফিরিশতাগণও (তাঁর সাথে থাকবে), আর সকল বিষয়ে মীমাংসা করে দেওয়া হবে? ১৫৫ অথচ সকল বিষয় শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

তাফসীরঃ

১৫৫. বিভিন্ন কাফির বিশেষত মদীনার ইয়াহুদীগণ এ ধরনের দাবী-দাওয়া পেশ করত যে, আল্লাহ তাআলা নিজে আমাদের দৃষ্টির সামনে এসে আমাদেরকে সরাসরি কেন ঈমান আনার হুকুম দিচ্ছেন না? এ আয়াত তার জবাব দিচ্ছে। জবাবের সারমর্ম এই যে, দুনিয়া মূলত পরীক্ষার জায়গা। এখানে পরীক্ষা নেওয়া হয় যে, মানুষ নিজ বুদ্ধি-বিবেচনা কাজে লাগিয়ে এবং বিশ্ব জগতে ছড়িয়ে থাকা সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলীর আলোকে আল্লাহ তাআলার তাওহীদ ও রাসূলগণের রিসালাতের প্রতি ঈমান আনে কি না। এ কারণেই এ পরীক্ষায় প্রকৃত মূল্য গায়বে ঈমানের। আল্লাহ তাআলাকে যদি সরাসরি দেখা যায়, তবে পরীক্ষা হল কোথায়? আল্লাহ তাআলার নীতি হচ্ছে গায়বের জিনিসমমূহ যদি মানুষ চাক্ষুষ দেখে ফেলে, তখন আর তার ঈমান গ্রহণযোগ্য হয় না। এ কারণেই গায়বী জিনিসসমূহ প্রত্যক্ষ করানো হয় না। তবে যখন এ জগতকে খতম করে শাস্তি ও পুরস্কার দানের সময় এসে যাবে, তখন কোনও কোনও গায়বী জিনিস চাক্ষুষ দেখানো হবে। আয়াতে ‘মীমাংসা করে দেওয়া’এর দ্বারা এটাই বোঝানো হয়েছে।
২১১

سَلۡ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ کَمۡ اٰتَیۡنٰہُمۡ مِّنۡ اٰیَۃٍۭ بَیِّنَۃٍ ؕ وَمَنۡ یُّبَدِّلۡ نِعۡمَۃَ اللّٰہِ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡہُ فَاِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ٢١١

ছাল বানীইছরাঈলা কাম আ-তাইনা-হুম মিন আ-য়াতিম বাইয়িনাতিওঁ ওয়া মাইঁ ইউবাদ্দিল নি‘মাতাল্লা-হি মিম বা‘দি মা-জাআতহু ফাইন্নাল্লা-হা শাদীদুল ‘ইকা-ব।

বনী ইসরাঈলকে জিজ্ঞেস কর, তাদেরকে আমি কত সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছিলাম। যে ব্যক্তি তার নিকট আল্লাহর নিয়ামত এসে যাওয়ার পর তা পরিবর্তন করে ফেলে, (তার মনে রাখা উচিত যে,) আল্লাহর শাস্তি বড় কঠিন। ১৫৬

তাফসীরঃ

১৫৬. আল্লাহর ‘নি‘আমত বলতে তাঁর নিদর্শনাবলী বোঝানো হয়েছে। বস্তুত তা আল্লাহ তা‘আলার অতি বড় নি‘আমত, যেহেতু তা গোমরাহী থেকে মুক্তি ও হিদায়াতের কারণ। বনী ইসরাঈল তা পরিবর্তন করেছিল এভাবে যে, আল্লাহ তা‘আলা তো তা প্রকাশ করেছিলেন তাদের হিদায়াতের কারণ হিসেবে, কিন্তু তারা তাকে নিজেদের পথভ্রষ্টতার ‘কারণ’ বানিয়ে ফেলে। অথবা এর অর্থ, তাদের কিতাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর দীনের সত্যতা সম্পর্কে যেসব আয়াত ছিল, তা তারা পরিবর্তন ও বিকৃত করে ফেলেছিল। তাছাড়া নি’আমতের পরিবর্তন বলতে নি‘আমতের অকৃতজ্ঞতাকেও বোঝায়। ইয়াহুদীরা পদে-পদেই আল্লাহপ্রদত্ত নি‘আমতের অকৃতজ্ঞতা করত, যেমনটা এ সূরার বিভিন্ন স্থানে বিবৃত হয়েছে, সামনেও বিভিন্ন সূরায় আসবে। (কাশশাফ) -অনুবাদক
২১২

زُیِّنَ لِلَّذِیۡنَ کَفَرُوا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا وَیَسۡخَرُوۡنَ مِنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۘ وَالَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا فَوۡقَہُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَرۡزُقُ مَنۡ یَّشَآءُ بِغَیۡرِ حِسَابٍ ٢١٢

ঝুইয়িনা লিল্লাযীনা কাফারুল হায়া-তুদ্দুনইয়া-ওয়া ইয়াছখারূনা মিনাল্লাযীনা আ-মানূ। ওয়াল্লাযী নাত্তাকাও ফাওকাহুম ইয়াওমাল কিয়া-মাতি ওয়াল্লা-হু ইয়ারঝুকুমাইঁ ইয়াশাউ বিগাইরি হিছা-ব।

যারা কুফর অবলম্বন করেছে তাদের জন্য পার্থিব জীবনকে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক করে তোলা হয়েছে। তারা মুমিনদেরকে উপহাস করে, অথচ যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে তারা কিয়ামতের দিন তাদের চেয়ে কত উপরে থাকবে। আল্লাহ যাকে চান অপরিমিত রিযক দান করেন। ১৫৭

তাফসীরঃ

১৫৭. এ বাক্যটি মূলত কাফিরদের একটা মিথ্যা দাবীর জবাব। তারা বলত, আল্লাহ তাআলা যেহেতু আমাদেরকে প্রচুর অর্থ-সম্পদ দিচ্ছেন তাই এটা প্রমাণ করে, তিনি আমাদের বিশ্বাস ও কর্মের উপর অসন্তুষ্ট নন। জবাব দেওয়া হয়েছে এই যে, দুনিয়ায় অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য কারও সত্যপন্থী হওয়ার প্রমাণ বহন করে না। পার্থিব রিযিকের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে আলাদা নিয়ম-নীতি স্থিরীকৃত রয়েছে। এখানে আল্লাহ তাআলা যাকে চান অপরিমিত অর্থ-সম্পদ দিয়ে দেন, তাতে হোক না সে ঘোরতর কাফির।
২১৩

کَانَ النَّاسُ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً ۟ فَبَعَثَ اللّٰہُ النَّبِیّٖنَ مُبَشِّرِیۡنَ وَمُنۡذِرِیۡنَ ۪ وَاَنۡزَلَ مَعَہُمُ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ لِیَحۡکُمَ بَیۡنَ النَّاسِ فِیۡمَا اخۡتَلَفُوۡا فِیۡہِ ؕ وَمَا اخۡتَلَفَ فِیۡہِ اِلَّا الَّذِیۡنَ اُوۡتُوۡہُ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡہُمُ الۡبَیِّنٰتُ بَغۡیًۢا بَیۡنَہُمۡ ۚ فَہَدَی اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لِمَا اخۡتَلَفُوۡا فِیۡہِ مِنَ الۡحَقِّ بِاِذۡنِہٖ ؕ وَاللّٰہُ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ ٢١٣

কা-নান্না-ছু উম্মাতাওঁ ওয়া-হিদাতান ফাবা‘আছাল্লা-হুন্নাবিইয়ীনা মুবাশশিরীনা ওয়া মুনযিরীনা ওয়া আনঝালা মা‘আহুমুল কিতা-বা বিলহাক্কিলিইয়াহকুমা বাইনান্না-ছি ফীমাখ তালাফূ ফীহি ওয়ামাখ তালাফা ফীহি ইল্লাল্লাযীনা ঊতূহু মিম বা‘দি মাজাআতহুমুল বাইয়িনা-তুবাগইয়াম বাইনাহুম ফাহাদাল্লা-হুল্লাযীনা আ-মানূ লিমাখতালাফূ ফীহি মিনাল হাক্কিবিইযনিহী ওয়াল্লা-হু ইয়াহদী মাইঁ ইয়াশাউ ইলাসিরা-তিম মুছতাকীম।

(শুরুতে) সমস্ত মানুষ একই দীনের অনুসারী ছিল। তারপর (যখন তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিল তখন) আল্লাহ নবী পাঠালেন, (সত্যপন্থীদের জন্য) সুসংবাদদাতা ও (মিথ্যাশ্রয়ীদের জন্য) ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে। আর তাদের সাথে সত্যসম্বলিত কিতাব নাযিল করলেন, যাতে তা মানুষের মধ্যে সেই সব বিষয়ে মীমাংসা করে দেয়, যা নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ ছিল। আর (পরিতাপের বিষয় হল) অন্য কেউ নয়; বরং যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তারাই তাদের কাছে সমুজ্জ্বল নিদর্শনাবলী আসার পরও কেবল পারস্পরিক রেষারেষির কারণে তাতেই (সেই কিতাবেই) মতভেদ সৃষ্টি করল। অতঃপর যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদেরকে তারা যে বিষয়ে মতভেদ করত, সে বিষয়ে নিজ ইচ্ছায় সঠিক পথে পৌঁছে দেন। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে সরল-সঠিক পথে পৌঁছে দেন।
২১৪

اَمۡ حَسِبۡتُمۡ اَنۡ تَدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ وَلَمَّا یَاۡتِکُمۡ مَّثَلُ الَّذِیۡنَ خَلَوۡا مِنۡ قَبۡلِکُمۡ ؕ مَسَّتۡہُمُ الۡبَاۡسَآءُ وَالضَّرَّآءُ وَزُلۡزِلُوۡا حَتّٰی یَقُوۡلَ الرَّسُوۡلُ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَعَہٗ مَتٰی نَصۡرُ اللّٰہِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ نَصۡرَ اللّٰہِ قَرِیۡبٌ ٢١٤

আম হাছিবতুম আন তাদখুলুল জান্নাতা ওয়া লাম্মা-ইয়া’তিকুম মাছালুল্লাযীনা খালাও মিন কাবলিকুম মাছছাতহুমুল বা’ছাউ ওয়াদ্দাররাউ ওয়াঝুলঝিলূ হাত্তা-ইয়াকূলার রাছূলু ওয়াল্লাযীনা আ-মানূমা‘আহূ মাতা-নাসরুল্লা-হি আলা-ইন্না নাসরাল্লা-হি কারীব।

(হে মুসলিমগণ!) তোমরা কি মনে করেছ, তোমরা জান্নাতে (এমনিতেই) প্রবেশ করবে, অথচ এখনও পর্যন্ত তোমাদের উপর সেই রকম অবস্থা আসেনি, যেমনটা এসেছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। তাদেরকে স্পর্শ করেছিল অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্ট এবং তাদেরকে করা হয়েছিল প্রকম্পিত, এমনকি রাসূল এবং তাঁর ঈমানদার সঙ্গীগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? মনে রেখ, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।
২১৫

یَسۡـَٔلُوۡنَکَ مَاذَا یُنۡفِقُوۡنَ ۬ؕ قُلۡ مَاۤ اَنۡفَقۡتُمۡ مِّنۡ خَیۡرٍ فَلِلۡوَالِدَیۡنِ وَالۡاَقۡرَبِیۡنَ وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَابۡنِ‌ السَّبِیۡلِ ؕ وَمَا تَفۡعَلُوۡا مِنۡ خَیۡرٍ فَاِنَّ اللّٰہَ بِہٖ عَلِیۡمٌ ٢١٥

ইয়াছআলূনাকা মা-যা ইউনফিকূনা কুল মাআনফাকতুম মিন খাইরিন ফালিলওয়া-লিদাইনি ওয়াল আকরাবীনা ওয়াল ইয়াতা-মা-ওয়াল মাছা-কীনি ওয়াবনিছছাবীলি ওয়ামাতাফ‘আলূমিন খাইরিন ফাইন্নাল্লা-হা বিহী ‘আলীম।

লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য) তারা কী ব্যয় করবে? আপনি বলে দিন, তোমরা যে সম্পদই ব্যয় কর তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য হওয়া চাই। আর তোমরা কল্যাণকর যে কাজই কর না কেন, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত।
২১৬

کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِتَالُ وَہُوَ کُرۡہٌ لَّکُمۡ ۚ  وَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ۚ  وَعَسٰۤی اَنۡ تُحِبُّوۡا شَیۡئًا وَّہُوَ شَرٌّ لَّکُمۡ ؕ  وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٪ ٢١٦

কুতিবা ‘আলাইকুমুল কিতা-লুওয়া হুওয়া কুরহুল্লাকুম ওয়া ‘আছা-আন তাকরাহূ শাইআওঁ ওয়া হুওয়া খাইরুল্লাকুম ওয়া ‘আছাআন তুহিববূ শাইআওঁ ওয়া হুওয়া শাররুল্লাকুম ওয়াল্লা-হু ইয়া‘লামুওয়া আনতুম লা-তা‘লামূন।

তোমাদের প্রতি (শত্রুর সাথে) যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, আর তোমাদের কাছে তা অপ্রিয়। এটা তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক। আর এটাও সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে পছন্দ কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মন্দ। আর (প্রকৃত বিষয় তো) আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। ১৫৮

তাফসীরঃ

১৫৮. কি চমৎকার নির্দেশনা! চিন্তা-চেতনায় এ শিক্ষা জাগরুক রাখলে জীবন বড় শান্তিময় হতে পারে। অনেক সময়ই মানুষ কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করে ও তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, কিন্তু কোন কারণে যদি তা ব্যর্থ হয়, মন খারাপ করে ও হতাশ হয়ে বসে পড়ে। আবার অনেক সময় কোন একটা বিষয় তার কাছে অপ্রীতিকর মনে হয় এবং তা থেকে বাঁচার জন্য সবরকম চেষ্টা করে, কিন্তু বাস্তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টির সম্মুখীন তাকে হতেই হয়। তখনও সে ভেঙ্গে পড়ে। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তোমার প্রকৃত কল্যাণ ও অকল্যাণ কিসে তা তুমি জান না, আল্লাহ তাআলা জানেন। তুমি যা কামনা করছ বাস্তবে তা তোমার জন্য দুঃখজনকও হতে পারে, আর যা অপছন্দ করছ তা হতে পারে প্রভূত সুফলবাহী। কাজেই এর ফয়সালা আল্লাহ তাআলারই উপর ছেড়ে দাও। সর্বান্তকরণে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চল এবং নিয়তি অনুযায়ী যা ঘটে তাতে খুশি থাক। অনেক সময়ই বাস্তব কল্যাণ তোমার দৃষ্টির আড়ালে থাকে বলে তুমি বুঝতে পার না। তা না-ই বোঝ, হাসিল হওয়াটাই বড় কথা। অন্ততপক্ষে এই সান্তনা তো লাভ করতেই পার যে, তোমার কাঙ্খিত জিনিস না পাওয়া আর অনাকাঙ্খিত বিষয় দেখা দেওয়ার ফলে তুমি যে সবর করবে, আখিরাতে সে জন্য মহাপুরস্কার আছেই। সুতরাং জিহাদসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ মূলমন্ত্র মাথায় রেখ। (-অনুবাদক)
২১৭

یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الشَّہۡرِ الۡحَرَامِ قِتَالٍ فِیۡہِ ؕ قُلۡ قِتَالٌ فِیۡہِ کَبِیۡرٌ ؕ وَصَدٌّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَکُفۡرٌۢ بِہٖ وَالۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ٭ وَاِخۡرَاجُ اَہۡلِہٖ مِنۡہُ اَکۡبَرُ عِنۡدَ اللّٰہِ ۚ وَالۡفِتۡنَۃُ اَکۡبَرُ مِنَ الۡقَتۡلِ ؕ وَلَا یَزَالُوۡنَ یُقَاتِلُوۡنَکُمۡ حَتّٰی یَرُدُّوۡکُمۡ عَنۡ دِیۡنِکُمۡ اِنِ اسۡتَطَاعُوۡا ؕ وَمَنۡ یَّرۡتَدِدۡ مِنۡکُمۡ عَنۡ دِیۡنِہٖ فَیَمُتۡ وَہُوَ کَافِرٌ فَاُولٰٓئِکَ حَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٢١٧

ইয়াছআলূনাকা আনিশশাহরিল হারা-মি কিতা-লিন ফীহি কুল কিতা-লুন ফীহি কাবীরুওঁ ওয়াসাদ্দুন ‘আন ছাবীলিল্লা-হি ওয়া কুফরুম বিহী ওয়াল মাছজিদিল হারা-মি ওয়া ইখরা-জুআহলিহী মিনহু আকবারু ‘ইনদাল্লা-হি ওয়াল ফিতনাতুআকবারু মিনাল কাতলি ওয়া লা-ইঝা-লূনা ইউকা-তিলূনাকুম হাত্তা-ইয়ারুদ্দূকুম ‘আন দীনিকুম ইনিছতাতা‘ঊ ওয়া মাইঁ ইয়ারতাদিদ মিনকুম ‘আন দীনিহী ফাইয়ামুত ওয়া হুওয়া কা-ফিরুন ফউলাইকা হাবিতাত আ‘মা-লুহুম ফিদ্দুনইয়া-ওয়াল আ-খিরাতি ওয়া উলাইকা আসহা-বুন্নারি হুম ফীহা-খা-লিদুন।

লোকে আপনাকে মর্যাদাপূর্ণ মাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? ১৫৯ আপনি বলে দিন, তাতে যুদ্ধ করা মহাপাপ, কিন্তু (মানুষকে) আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখা, তার বিরুদ্ধে কুফুরী পন্থা অবলম্বন করা, মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং তার বাসিন্দাদেরকে তা থেকে বের করে দেওয়া আল্লাহর নিকট আরও বড় পাপ। আর ফিতনা তো হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর। তারা (কাফিরগণ) ক্রমাগত তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকবে, এমনকি পারলে তারা তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফেরাতে চেষ্টা করবে। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ নিজ দীন পরিত্যাগ করে, তারপর কাফির অবস্থায় মারা যায়, তবে এরূপ লোকের কর্ম দুনিয়া ও আখিরাতে বৃথা যাবে। তারাই জাহান্নামী। তারা সেখানেই সর্বদা থাকবে।

তাফসীরঃ

১৫৯. সূরা তাওবায় ( ৯ : ৩৬) চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম’ তথা মর্যাদাপূর্ণ মাস বলা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাখ্যা করে বলেন, এ চার মাস হচ্ছে রজব, যু-কা‘দা, যুল-হিজ্জা ও মুহাররম। এসব মাসে যুদ্ধ করা নিষেধ। অবশ্য কোনও শত্রু যদি এ সময় হামলা করে বসে, তবে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আছে। একবার এক সফরে একদল মুশরিকের সঙ্গে কতিপয় সাহাবীর সংঘর্ষ লেগে যায়। তাতে আমর ইবনুল হায্রামী নামক এক মুশরিক মুসলিমদের হাতে নিহত হয়। এ ঘটনাটি ঘটেছিল ২৯ জুমাদাল উখরার সন্ধ্যাকালে। কিন্তু সেই ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর পরই রজবের চাঁদ উঠে যায়। কিন্তু এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুশরিকগণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেয়। তারা বলতে থাকে যে, মুসলিমগণ মর্যাদাপূর্ণ মাসেরও কোনও পরওয়া করে না। তাদের সে প্রোপাগান্ডার পরিপ্রেক্ষিতেই আলোচ্য আয়াত নাযিল হয়। আয়াতে যা বলা হয়েছে তার সারমর্ম এই যে, এক তো আমর ইবনুল হায্রামী নিহত হয়েছে একটি ভুল বোঝাবুঝির ভিত্তিতে। জেনেশুনে মর্যাদাপূর্ণ মাসে তাকে হত্যা করা হয়নি, অথচ যারা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিয়েছে তারা তো এর চেয়ে আরও কত কঠিন অপরাধ করে বসে আছে। তারা মানুষকে মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেয় শুধু তাই নয়; বরং যারা সত্যিকার অর্থে মসজিদুল হারামে ইবাদত করার উপযুক্ত, তাদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন করে তাদের জীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছে, ফলে তারা সেখান থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তদুপরি তারা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কুফরের নীতি অবলম্বন করেছে।
২১৮

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٢١٨

ইন্নাল্লাযীনা আ-মানূ ওয়াল্লাযীনা হা-জারূওয়া জা-হাদূফী ছাবীলিল্লা-হি উলাইকা ইয়ারজূনা রাহমাতাল্লা-হি ওয়াল্লা-হু গাফূরুর রাহীম।

(অপর দিকে) যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা নিঃসন্দেহে আল্লাহর রহমতের আশাবাদী। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
২১৯

یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡخَمۡرِ وَالۡمَیۡسِرِ ؕ  قُلۡ فِیۡہِمَاۤ اِثۡمٌ کَبِیۡرٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ ۫  وَاِثۡمُہُمَاۤ اَکۡبَرُ مِنۡ نَّفۡعِہِمَا ؕ  وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ مَاذَا یُنۡفِقُوۡنَ ۬ؕ  قُلِ الۡعَفۡوَ ؕ  کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّکُمۡ تَتَفَکَّرُوۡنَ ۙ ٢١٩

ইয়াছআলূনাকা ‘আনিল খামরি ওয়াল মাইছিরি কুল ফীহিমা ইছমুন কাবীরুওঁ ওয়া মানাফি‘উ লিন্না-ছি ওয়া ইছমুহুমাআকবারু মিন নাফ‘ইহিমা-ওয়া ইয়াছআলূনাকা মা যা-ইউনফিকূনা কুল্লি ‘আফওয়া কাযা-লিকা ইউবাইয়িনুল্লা-হু লাকুমুল আ-য়াতি লা‘আল্লাকুম তাতাফাক্কারুন।

(অপর দিকে) যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারা নিঃসন্দেহে আল্লাহর রহমতের আশাবাদী। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।লোকে আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দু’টোর মধ্যে মহা পাপও রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে। আর এ দু’টোর পাপ তার উপকার অপেক্ষা গুরুতর। ১৬০ লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে) তারা কী ব্যয় করবে? আপনি বলে দিন, যা (তোমাদের প্রয়োজনের) অতিরিক্ত। ১৬১ আল্লাহ এভাবেই তোমাদের জন্য স্বীয় বিধানাবলী সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা করতে পার

তাফসীরঃ

১৬০. কোনও কোনও সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা দান-সদকার সওয়াব শুনে নিজেদের সমুদয় পুঁজি সদকা করে দেন। এমনকি নিজের ও পরিবারবর্গের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখেননি। ফলে ঘরের লোকজন অভুক্ত দিন কাটায়। এ আয়াত জানিয়ে দিয়েছে যে, দান-খয়রাত সেটাই সঠিক, যা নিজের ও পরিবারবর্গের জরুরত পূর্ণ করার পর করা হবে। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদীসে গুরুত্বের সাথে ইরশাদ করেন যে, দান-সদকা এ পরিমাণ হওয়া চাই, যাতে ঘরের লোকজন অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে পড়ে।
২২০

فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡیَتٰمٰی ؕ قُلۡ اِصۡلَاحٌ لَّہُمۡ خَیۡرٌ ؕ وَاِنۡ تُخَالِطُوۡہُمۡ فَاِخۡوَانُکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ الۡمُفۡسِدَ مِنَ الۡمُصۡلِحِ ؕ وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَاَعۡنَتَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٢٢۰

ফিদ্দুনইয়া-ওয়াল আ-খিরাতি ওয়া ইয়াছআলূনাকা ‘আনিলইয়াতা-মা কুলইসলাহুল্লাহুম খাইরুওঁ ওয়া ইন তুখা-লিতূহুম ফাইখওয়া-নুকুম ওয়াল্লা-হু ইয়া‘লামুল মুফছিদা মিনাল মুসলিহিওয়ালাও শাআল্লা-হু লাআ‘নাতাকুম ইন্নাল্লা-হা ‘আঝীঝুন হাকীম।

দুনিয়া সম্পর্কেও এবং আখিরাত সম্পর্কেও। এবং লোকে আপনাকে ইয়াতীমদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন যে, তাদের কল্যাণ কামনা উত্তম। তোমরা যদি তাদের সাথে মিলেমিশে থাক, তবে (কোনও অসুবিধা নেই। কেননা) তারা তো তোমাদের ভাই-ই বটে। আর আল্লাহ ভালো করে জানেন, কে অনর্থ সৃষ্টিকারী আর কে সমাধানকারী। আল্লাহ চাইলে তোমাদেরকে সংকটে ফেলতে পারতেন। ১৬২ নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা ক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

১৬২. কুরআন মাজীদ যখন ইয়াতীমের সম্পদ গ্রাস করার ব্যাপারে কঠিন সতর্কবাণী শোনাল (সূরা নিসা ৪ : ২, ১০) তখন যে সকল সাহাবীর তত্ত্বাবধানে ইয়াতীম ছিল তারা তাদের ব্যাপারে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন শুরু করে দিলেন। এমনকি তাঁরা ইয়াতীমদের খাবার পৃথক রান্না করতেন এবং আলাদাভাবেই তাদেরকে খাওয়াতেন। ফলে তাদের কিছু খাবার বেঁচে থাকলে তা নষ্ট হয়ে যেত। এতে যেমন কষ্ট বেশি হত তেমনি ক্ষতিও হত। এ আয়াত স্পষ্ট করে দিল যে, মূল উদ্দেশ্য হল ইয়াতীমদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখা। অভিভাবকদেরকে জটিলতায় ফেলা উদ্দেশ্য নয়। সুতরাং একত্রে তাদের খাবার রান্না করাতে এবং একত্রে খাওয়ানোতে কোনও অসুবিধা নেই। শর্ত হল, তাদের সম্পদ থেকে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে তাদের খাওয়ার খরচ উসূল করতে হবে। যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু কম-বেশি হয়েও যায়, তা ক্ষমাযোগ্য। হাঁ জেনে-শুনে তাদের ক্ষতি করা যাবে না। কে ইনসাফ ও কল্যাণকামিতার পরিচয় দেয় আর কার নিয়ত খারাপ, আল্লাহ তাআলা তা ভালো করেই জানেন।
২২১

وَلَا تَنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ  وَلَاَمَۃٌ مُّؤۡمِنَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکَۃٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَتۡکُمۡ ۚ  وَلَا تُنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَتّٰی یُؤۡمِنُوۡا ؕ  وَلَعَبۡدٌ مُّؤۡمِنٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَکُمۡ ؕ  اُولٰٓئِکَ یَدۡعُوۡنَ اِلَی النَّارِ ۚۖ  وَاللّٰہُ یَدۡعُوۡۤا اِلَی الۡجَنَّۃِ وَالۡمَغۡفِرَۃِ بِاِذۡنِہٖ ۚ  وَیُبَیِّنُ اٰیٰتِہٖ لِلنَّاسِ لَعَلَّہُمۡ یَتَذَکَّرُوۡنَ ٪ ٢٢١

ওয়া লা-তানকিহুল মুশরিকা-তি হাত্তা-ইউ’মিন্না ওয়া লাআমাতুম মু’মিনাতুন খাইরুম মিম মুশরিকাতিওঁ ওয়ালাও আ‘জাবাতকুম ওয়ালা-তুনকিহুল মুশরিকীনা হাত্তা-ইউমিনূ ওয়ালা ‘আবদুম মু’মিনুন খাইরুম মিম মুশরিকিওঁ ওয়া লাও আ‘জাবাকুম উলাইকা ইয়াদ‘ঊনা ইলান্না-রি ওয়াল্লা-হু ইয়াদ‘ঊইলাল জান্নাতি ওয়াল মাগফিরাতি বিইযনিহী ওয়া ইউবাইয়িনুআ-য়া-তিহী লিন্না-ছি লা‘আল্লাহুম ইয়াতাযাক্কারুন।

মুশরিক নারীগণ যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান না আনে ততক্ষণ তাদেরকে বিবাহ করো না। নিশ্চয়ই একজন মুমিন দাসী যে-কোনও মুশরিক নারী অপেক্ষা শ্রেয়, যদিও সেই মুশরিক নারী তোমাদের মুগ্ধ করে। আর নিজেদের নারীদের বিবাহ মুশরিক পুরুষদের সাথে সম্পন্ন করো না যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। নিশ্চয়ই একজন মুমিন গোলাম যে-কোন মুশরিক পুরুষ অপেক্ষা শ্রেয় যদিও সেই মুশরিক পুরুষ তোমাদের মুগ্ধ করে। তারা সকলে তো জাহান্নামের দিকে ডাকে, যখন আল্লাহ নিজ হুকুমে জান্নাত ও মাগফিরাতের দিকে ডাকেন এবং তিনি স্বীয় বিধানাবলী মানুষের জন্য সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
২২২

وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡمَحِیۡضِ ؕ قُلۡ ہُوَ اَذًی ۙ فَاعۡتَزِلُوا النِّسَآءَ فِی الۡمَحِیۡضِ ۙ وَلَا تَقۡرَبُوۡہُنَّ حَتّٰی یَطۡہُرۡنَ ۚ فَاِذَا تَطَہَّرۡنَ فَاۡتُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ اَمَرَکُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ التَّوَّابِیۡنَ وَیُحِبُّ الۡمُتَطَہِّرِیۡنَ ٢٢٢

ওয়া ইয়াছআলূনাকা ‘আনিল মাহীদি কুল হুওয়া আযান ফা‘তাঝিলুন্নিছাআ ফিল মাহীদি ওয়ালা-তাকরাবূহুন্না হাত্তা-ইয়াতহুরনা ফাইযা-তাতাহহারনা ফা’তূহুন্না মিন হাইছুআমারাকুমুল্লা-হু ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুত্তাওওয়া-বীনা ওয়াইউহিব্বুল মুতাতাহহিরীন।

লোকে আপনার কাছে হায়য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, তা অশুচি। সুতরাং হায়যের সময় স্ত্রীদের থেকে পৃথক থেক এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পবিত্র না হয়, ততক্ষণ তাদের কাছে যেয়ো না (অর্থাৎ সহবাস করো না)। হাঁ যখন তারা পবিত্র হয়ে যাবে, তখন তাদের কাছে সেই পন্থায় যাবে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই সকল লোককে ভালোবাসেন, যারা তাঁর দিকে বেশি বেশি রুজু করে এবং ভালোবাসেন তাদেরকে, যারা বেশি বেশি পাক-পবিত্র থাকে।
২২৩

نِسَآؤُکُمۡ حَرۡثٌ لَّکُمۡ ۪ فَاۡتُوۡا حَرۡثَکُمۡ اَنّٰی شِئۡتُمۡ ۫ وَقَدِّمُوۡا لِاَنۡفُسِکُمۡ ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ مُّلٰقُوۡہُ ؕ وَبَشِّرِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ٢٢٣

নিছাউকুম হারছুল্লাকুম ফা’তূহারছাকুম আন্না-শি’তুম ওয়া কাদ্দিমূ লিআনফুছিকুম ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া‘লামূ আন্নাকুম মুলা-কূহু ওয়া বাশশিরিল মু’মিনীন।

তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র। সুতরাং নিজেদের শস্যক্ষেত্রে যেখান থেকে ইচ্ছা যাও ১৬৩ এবং নিজের জন্য (উৎকৃষ্ট কর্ম) সম্মুখে প্রেরণ কর এবং আল্লাহকে ভয় করে চলো আর জেনে রেখ, তোমরা অবশ্যই তাঁর সঙ্গে মিলিত হবে এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ শোনাও।

তাফসীরঃ

১৬৩. এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক তাৎপর্যপূর্ণ রূপকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর আনন্দঘন মুহূর্ত সম্পর্কে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রথমত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, স্বামী-স্ত্রীর এই মিলন কেবল সুখ ভোগের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত নয়; বরং একে মানব প্রজন্মের উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যম মনে করা উচিত। একজন কৃষক যেমন নিজ শস্যক্ষেত্রে বীজ বপণ করে এবং তাতে তার উদ্দেশ্য থাকে ফসল ফলানো, তেমনিভাবে এ কাজও মূলত মানব-প্রজন্মকে স্থায়ী করার একটি মাধ্যম। দ্বিতীয়ত জানানো হয়েছে যে, এটাই যখন মিলনের আসল উদ্দেশ্য তখন তা নারী দেহের সেই অংশেই হওয়া উচিত, যা এর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। পেছনের যে অংশকে এ কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি, স্বভাব-প্রকৃতির বিপরীত তাকে বিকৃত যৌনাচারের জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। তৃতীয় বিষয় এই জানানো হয়েছে যে, নারীদেহের সামনের যে অংশকে এ কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তা ব্যবহার করার জন্য পন্থা যে-কোনওটাই অবলম্বন করা যেতে পারে। ইয়াহুদীদের ধারণা ছিল, সে অঙ্গকে ব্যবহার করার জন্য কেবল একটা পদ্ধতিই জায়েয অর্থাৎ সম্মুখ দিক থেকে ব্যবহার করা। মিলন যদি সামনের অঙ্গেই হয়, কিন্তু তা করা হয় পেছন দিক থেকে, তবে তাদের মতে তা জায়েয ছিল না। তাদের ধারণা ছিল, তাতে ট্যারা চোখের সন্তান জন্ম নেয়। এ আয়াত তাদের সে ভুল ধারণা খণ্ডন করেছে।
২২৪

وَلَا تَجۡعَلُوا اللّٰہَ عُرۡضَۃً لِّاَیۡمَانِکُمۡ اَنۡ تَبَرُّوۡا وَتَتَّقُوۡا وَتُصۡلِحُوۡا بَیۡنَ النَّاسِ ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ٢٢٤

ওয়ালা-তাজ‘আলুল্লা-হা ‘উরদাতাল লিআইমা-নিকুম আন তাবাররূওয়াতাত্তাকূওয়াতুসলিহু বাইনান্না-ছি ওয়াল্লা-হু ছামী‘উন ‘আলীম।

এবং তোমরা নিজেদের শপথসমূহে আল্লাহ (-এর নাম) কে পুণ্য ও তাকওয়ার কাজসমূহ থেকে এবং মানুষের মধ্যে আপোস রফা করানো থেকে বিরত থাকার উপলক্ষ বানিও না। ১৬৪ আল্লাহ সবকিছু শোনেন, জানেন।

তাফসীরঃ

১৬৪. অনেক সময় মানুষ সাময়িক উত্তেজনাবশে কসম খেয়ে বসে যে, আমি অমুক কাজ করব না, অথচ সেটি পুণ্যের কাজ। যেমন একবার হযরত মিসতাহ (রাযি.)-এর দ্বারা একটি ভুল কাজ হয়ে গিয়েছিল। ফলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) কসম করেছিলেন যে, তিনি আর কখনও তাকে আর্থিক সাহায্য করবেন না। এমনিভাবে রূহুল মাআনীতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাযি.) নিজ ভগ্নিপতি সম্পর্কে কসম করেছিলেন, তার সঙ্গে কখনও কথা বলবেন না এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে তার আপোসরফা করিয়ে দেবেন না। আলোচ্য আয়াত এ জাতীয় কসম করতে নিষেধ করছে। কেননা এতে আল্লাহ তাআলার নাম ভুল ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। সহীহ হাদীসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কেউ এ রকম অনুচিত কসম করলে তার উচিত কসম ভেঙ্গে ফেলা ও তার কাফফারা দেওয়া।
২২৫

لَا یُؤَاخِذُکُمُ اللّٰہُ بِاللَّغۡوِ فِیۡۤ اَیۡمَانِکُمۡ وَلٰکِنۡ یُّؤَاخِذُکُمۡ بِمَا کَسَبَتۡ قُلُوۡبُکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ ٢٢٥

লা-ইউআ-খিযু কুমুল্লা-হু বিল্লাগবিফী আইমা-নিকুম ওয়ালা-কিই ইউআ-খিযু কুম বিমাকাছাবাত কুলূবুকুম ওয়াল্লা-হু গাফরুন হালীম।

তোমাদের লাগব কসমের কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে ধরবেন না। ১৬৫ কিন্তু যে কসম তোমরা তোমাদের মনের ইচ্ছাক্রমে করেছ সেজন্য তিনি তোমাদেরকে ধরবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১৬৫. ‘লাগব কসম’ দু’ প্রকার। এক তো সেই কসম যা কসমের ইচ্ছায় করা হয় না; বরং যা কথার একটা মুদ্রারূপে মুখে এসে পড়ে, বিশেষত আরবদের মধ্যে এর বহুল প্রচলন ছিল। তারা কথায় কথায় وَاللهِ (আল্লাহর কসম) বলে দিত। দ্বিতীয় প্রকারের লাগব হল সেই কসম, যা মানুষ অনেক সময় পেছনের কোনও ঘটনা সম্পর্কে করে থাকে, আর তার ধারণা অনুযায়ী তা সত্য, মিথ্যা বলার কোনও ইচ্ছা তার থাকে না, কিন্তু পরে ধরা পড়ে যে, কসম করে সে যে কথা বলেছিল তা আসলে সঠিক ছিল না। এ উভয় প্রকারের কসমকেই লাগব বলা হয়। এ আয়াত জানাচ্ছে যে, এ জাতীয় কসমে কোনও গুনাহ নেই। অবশ্য মানুষের উচিত, কসম করার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং এ জাতীয় কসমও এড়িয়ে চলা।
২২৬

لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ٢٢٦

লিল্লাযীনা ইউ’লূনা মিন্নিছাইহিম তারাব্বুসু আরবা‘আতি আশহুরিন ফাইন ফাউ ফাইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।

যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ঈলা করে (অর্থাৎ তাদের কাছে না যাওয়ার কসম করে) তাদের জন্য রয়েছে চার মাসের অবকাশ। ১৬৬ সুতরাং যদি তারা (এর মধ্যে কসম ভেঙ্গে) ফিরে আসে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১৬৬. আরবদের মধ্যে এই অন্যায় প্রথা চালু ছিল যে, কসম করে বলত সে তার স্ত্রীর কাছে যাবে না। ফলে স্ত্রী অনির্দিষ্ট কালের জন্য ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে থাকত; সে স্ত্রী হিসেবে তার ন্যায্য অধিকারও পেত না, আবার অন্যত্র বিবাহও করতে পারত না। এরূপ কসমকে ঈলা বলে। এ আয়াতে আইন করে দেওয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ঈলা করবে, সে চার মাসের ভেতর কসম ভেঙ্গে কাফফারা আদায় করবে এবং স্ত্রীর সঙ্গে যথারীতি দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল করবে। যদি তা না করে তবে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটবে। পরের আয়াতে যে বলা হয়েছে, ‘যদি তারা তালাকেরই সংকল্প করে নেয়’ তার অর্থ এটাই যে, যদি চার মাসের মধ্যে কসম ভঙ্গ না করে এবং এভাবে মেয়াদ উত্তীর্ণ করে ফেলে, তবে বিবাহ আপনা আপনিই খতম হয়ে যাবে।
২২৭

وَاِنۡ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَاِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ٢٢٧

ওয়া ইন ‘আঝামুত্তালা-কা ফাইন্নাল্লা-হা ছামী‘উন ‘আলীম।

আর তারা যদি তালাকেরই সংকল্প করে নেয়, তবে আল্লাহ সবকিছু শোনেন, জানেন।
২২৮

وَالۡمُطَلَّقٰتُ یَتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ ثَلٰثَۃَ قُرُوۡٓءٍ ؕ  وَلَا یَحِلُّ لَہُنَّ اَنۡ یَّکۡتُمۡنَ مَا خَلَقَ اللّٰہُ فِیۡۤ اَرۡحَامِہِنَّ اِنۡ کُنَّ یُؤۡمِنَّ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ  وَبُعُوۡلَتُہُنَّ اَحَقُّ بِرَدِّہِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ اِنۡ اَرَادُوۡۤا اِصۡلَاحًا ؕ  وَلَہُنَّ مِثۡلُ الَّذِیۡ عَلَیۡہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۪  وَلِلرِّجَالِ عَلَیۡہِنَّ دَرَجَۃٌ ؕ  وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٪ ٢٢٨

ওয়াল মুতাল্লাকা-তুইয়াতারাব্বাসনা বিআনফুছিহিন্না ছালা-ছাতা কুরূইওঁ ওয়ালা-ইয়াহিল্লুলাহুন্না আইয়াকতুম না মা-খালাকাল্লা-হু ফী আরহা-মিহিন্না ইন কুন্না ইউ’মিন্না বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি ওয়া বু‘ঊলাতুহুন্না আহাক্কুবিরাদ্দিহিন্না ফী যা-লিকা ইন আরা-দূ ইসলা-হাওঁ ওয়া লাহুন্না মিছলুল্লাযী ‘আলাইহিন্না বিলমা‘রূফি ওয়া লিররিজা-লি ‘আলাইহিন্না দারাজাতুওঁ ওয়াল্লা-হু ‘আঝীঝুন হাকীম।

যে নারীদের তালাক দেওয়া হয়েছে, তারা তিন বার হায়েয আসা পর্যন্ত নিজেদেরকে প্রতীক্ষায় রাখবে। ১৬৭ আর তারা যদি আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে, তবে আল্লাহ তাদের গর্ভাশয়ে যা-কিছু (ভ্রুণ বা হায়য) সৃষ্টি করেছেন তা গোপন করা তাদের পক্ষে বৈধ হবে না। তাদের স্বামীগণ যদি পরিস্থিতি ভালো করতে চায়, তবে এ মেয়াদের মধ্যে তাদেরকে (নিজেদের স্ত্রীত্বে) ওয়াপস গ্রহণের অধিকার তাদের রয়েছে। আর স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে। অবশ্য তাদের উপর পুরুষদের এক স্তরের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। ১৬৮ আল্লাহ পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

১৬৭. জাহিলী যুগে নারীর কোনও অধিকার স্বীকৃত ছিল না। এ আয়াত জানাচ্ছে যে, স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই একের উপর অন্যের অধিকার রয়েছে। অবশ্য এটা অনস্বীকার্য যে, জীবন চলার পথে আল্লাহ তাআলা স্বামীকে কর্তা ও তত্ত্বাবধায়ক বানিয়ে দিয়েছেন, যেমন সূরা নিসায় (৪ : ৩৪) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এ হিসেবে তার এক পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
২২৯

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ ٢٢٩

আত্তালা-কুমার রাতা-নি ফাইমছা-কুম বিমা‘রূফিন আও তাছরীহুম বিইহছা-নিওঁ ওয়ালা-ইয়াহিল্লুলাকুম আন তা’খুযূমিম্মা আ-তাইতুমূহুন্না শাইআন ইল্লাআইঁ ইয়াখাফা আল্লা-ইউকীমা-হুদূদাল্লা-হি ফাইন খিফতুম আল্লা-ইউকীমা-হুদাল্লা-হি ফালা-জুনা-হা ‘আলাইহিমা-ফীমাফতাদাতবিহী তিলকা হুদূদুল্লা-হি ফালা-তা‘তাদূ হা-ওয়ামাইইয়াতা‘আদ্দা হুদূদাল্লা-হি ফাউলাইকা হুমুজ্জা-লিমূন।

তালাক (বেশির বেশি) দু’বার হওয়া চাই। অতঃপর (স্বামীর জন্য দু’টি পথই খোলা আছে) : হয়ত নীতিসম্মতভাবে (স্ত্রীকে) রেখে দেবে (অর্থাৎ তালাক প্রত্যাহার করে নেবে), অথবা উৎকৃষ্ট পন্থায় তাকে ছেড়ে দেবে (অর্থাৎ প্রত্যাহার না করে বরং ইদ্দত শেষ করতে দেবে)। আর (হে স্বামীগণ!) তোমরা তাদেরকে (স্ত্রীগণকে) যা-কিছু দিয়েছ, (তালাকের বদলে) তা ফেরত নেওয়া তোমাদের পক্ষে হালাল নয়। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা বোধ করে যে, তারা (বিবাহ বহাল রাখা অবস্থায়) আল্লাহর স্থিরীকৃত সীমা কায়েম রাখতে সক্ষম হবে না, তবে ভিন্ন কথা। ১৬৯ সুতরাং তোমরা যদি আশংকা কর, তারা আল্লাহর সীমা প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারবে না, তবে তাদের জন্য এতে কোনও গুনাহ নেই যে, স্ত্রী মুক্তিপণ দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবে। এটা আল্লাহর স্থিরীকৃত সীমা। সুতরাং তোমরা এসব লংঘন করো না। যারা আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে তারা বড়ই জালিম।

তাফসীরঃ

১৬৯. আয়াতে এক নির্দেশ তো এই দেওয়া হয়েছে যে, তালাক যদি দিতেই হয় তবে সর্বোচ্চ দুই তালাক দেওয়া উচিত। কেননা এ অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক বহাল রাখার সুযোগ থাকে, যেহেতু তখন ইদ্দত চলাকালে তালাক প্রত্যাহার করে নেওয়ার অধিকার স্বামীর থাকে এবং ইদ্দতের পর উভয়ে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে নতুন মোহরানায় নতুনভাবে বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু তিন তালাক দিয়ে ফেললে এ উভয় পথ বন্ধ হয়ে যায়, যেমন পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে সম্পর্ক বহাল করার কোনও পথই খোলা থাকে না। দ্বিতীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই যে, স্বামী তালাক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিক বা সম্পর্কচ্ছেদের, উভয় অবস্থায়ই ব্যাপারটা সুন্দরভাবে সদাচরণের সাথে সম্পন্ন করা চাই। সাধারণ অবস্থায় স্বামীর পক্ষে এটা হালাল নয় যে, সে তালাকের বদলে মোহরানা ফেরত দেওয়ার বা মাফ করে দেওয়ার দাবী জানাবে। হাঁ স্ত্রীর পক্ষ থেকেই যদি তালাক চাওয়া হয় এবং সেটা স্বামীর পক্ষ হতে কোনও জুলুমের কারণে না হয়, বরং অন্য কোনও কারণে হয়, যেমন স্ত্রী স্বামীকে পছন্দ করতে পারছে না, আর এ কারণে উভয়ের আশঙ্কা হয় তারা স্বচ্ছন্দভাবে বৈবাহিক দায়িত্ব-কর্তব্য আদায় করতে পারবে না, তবে এ অবস্থায় এটা জায়েয রাখা হয়েছে যে, স্ত্রী আর্থিক বিনিময় হিসেবে পূর্ণ মোহরানা বা তার অংশবিশেষ স্বামীকে ওয়াপস করবে কিংবা এখনও পর্যন্ত তা আদায় না হয়ে থাকলে তা মাফ করে দেবে (পরিভাষায় এটাকে ‘খুলা’ বলে)।
২৩০

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ٢٣۰

ফাইন তাল্লাকাহা-ফালা-তাহিল্লু লাহূ মিম বা‘দুহাত্তা-তানকিহা ঝাওজান গাইরাহূ ফাইন তাল্লাকাহা-ফালা-জুনা-হা ‘আলাইহিমা-আই ইয়াতারা-জা‘আইন জান্না-আইঁ ইউকীমা-হুদূদাল্লা-হি ওয়া তিলকা হুদূদুল্লা-হি ইউবাইয়িনুহা-লিকাওমিইঁ ইয়া‘লামূন।

অতঃপর সে (স্বামী) যদি (তৃতীয়) তালাক দিয়ে দেয় তবে সে (তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী) তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনও স্বামীকে বিবাহ করবে। অতঃপর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে তালাক দিয়ে দেয়, তবে তাদের জন্য এতে কোনও গুনাহ নেই যে, তারা (নতুন বিবাহের মাধ্যমে) পুনরায় একে অন্যের কাছে ফিরে আসবে শর্ত হল, তাদের প্রবল ধারণা থাকতে হবে যে, (এবার) তারা আল্লাহর সীমা কায়েম রাখতে পারবে। এসব আল্লাহর স্থিরীকৃত সীমা, যা তিনি জ্ঞানবান লোকদের জন্য স্পষ্টরূপে বর্ণনা করছেন।
২৩১

وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ سَرِّحُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ ۪  وَلَا تُمۡسِکُوۡہُنَّ ضِرَارًا لِّتَعۡتَدُوۡا ۚ  وَمَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ  وَلَا تَتَّخِذُوۡۤا اٰیٰتِ اللّٰہِ ہُزُوًا ۫  وَّاذۡکُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ وَمَاۤ اَنۡزَلَ عَلَیۡکُمۡ مِّنَ الۡکِتٰبِ وَالۡحِکۡمَۃِ یَعِظُکُمۡ بِہٖ ؕ  وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ٪ ٢٣١

ওয়া ইযা-তাল্লাকতুমুন নিছাআ ফাবালাগনা আজালাহুন্না ফাআমছিকূহুন্না বিমা‘রূফিন আও ছাররিহুহুন্না বিমা‘রূফিওঁ ওয়ালা-তুম ছিকূহুন্না দিরা-রাল লিতা‘তাদূ ওয়া মাইঁ ইয়াফ‘আল যা-লিকা ফাকাদ জালামা নাফছাহূ ওয়ালা-তাত্তাখিযূআ-য়া-তিল্লা-হি হুঝুওয়াও ওয়াযকুরূ নি‘মাতাল্লা-হি ‘আলাইকুম ওয়ামা-আনঝালা ‘আলাইকুম মিনাল কিতা-বি ওয়াল হিকমাতি ইয়া‘ইজু কুম বিহী ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা বিকুল্লি শাইইন ‘আলীম।

যখন তোমরা নারীদেরকে তালাক দিয়ে দাও, তারপর তারা তাদের ইদ্দতের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন হয় তাদেরকে ন্যায়সঙ্গতভাবে (নিজ স্ত্রীত্বে) রেখে দেবে, নয়ত তাদেরকে ন্যায়সঙ্গতভাবে ছেড়ে দেবে। তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার লক্ষ্যে এজন্য আটকে রেখ না যে, তাদের প্রতি জুলুম করতে পারবে। ১৭০ যে ব্যক্তি এরূপ করবে, সে স্বয়ং নিজ সত্তার প্রতিই জুলুম করবে। তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে তামাশারূপে গ্রহণ করো না। ১৭১ আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন এবং তোমাদেরকে উপদেশ দানের লক্ষ্যে তোমাদের প্রতি যে কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন তা স্মরণ রেখ। আর আল্লাহকে ভয় করে চলো এবং জেনে রেখ, আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবগত।

তাফসীরঃ

১৭০. অর্থাৎ আয়াতে প্রদত্ত বিধানাবলী যথা বিবাহ, তালাক, ঈলা, খুলা ইত্যাদি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কল্যাণকর বিধান। কাজেই এগুলো নিয়ে ছল-চাতুরি বা এগুলোকে অসদুদ্দেশ্যে ব্যবহার করো না, যেমন তালাক দেওয়ার পর আবার স্ত্রীকে ফেরত গ্রহণ করলে তাকে নির্যাতন করার লক্ষ্যে। কিংবা বিবাহ করার পর বললে, আমার বিবাহ করা উদ্দেশ্য ছিল না, কেবল ফুর্তি করছিলাম অথবা তালাক দিয়ে বললে, ঠাট্টা করছিলাম। এরূপ করা আয়াতকে নিয়ে তামাশা করার নামান্তর। সুতরাং এরূপ পন্থা পরিহার করে আল্লাহর আয়াতসমূহকে খাঁটি মনে অনুসরণ কর। হাদীছে আছে, তিনটি জিনিস ঠাট্টাচ্ছলে করলেও তা সত্যিকার হয়ে যায় বিবাহ, তালাক ও রাজ‘আত (তালাকের পর পুনঃগ্রহণ)। রূহুল মা‘আনী, তাফসীরে উছমানী -অনুবাদক
২৩২

وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ اَنۡ یَّنۡکِحۡنَ اَزۡوَاجَہُنَّ اِذَا تَرَاضَوۡا بَیۡنَہُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ ذٰلِکَ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِکُمۡ اَزۡکٰی لَکُمۡ وَاَطۡہَرُ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٢٣٢

ওয়া ইযা-তাল্লাকতুমুন্নিছাআ ফাবালাগনা আজালাহুন্না ফালা-তা‘দুলূহুন্না আইঁ ইয়ানকিহনা আঝওয়া-জাহুন্না ইযা-তারা-দাও বাইনাহুম বিলমা‘রূফি যা-লিকা ইঊ‘আজুবিহী মান কা-না মিনকুম ইয়ুমিনুবিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি যা-লিকুম আঝকা-লাকুম ওয়াআতহারু ওয়াল্লাহু ইয়া‘লামুওয়া আনতুম লা-তা‘লামুন।

তোমরা যখন নারীদেরকে তালাক দেবে, তারপর তারা ইদ্দত পূর্ণ করবে, তখন (হে অভিভাবকেরা!) তোমরা তাদেরকে এ কাজে বাধা দিয়ো না যে, তারা তাদের (প্রথম) স্বামীদেরকে (পুনরায়) বিবাহ করবে যদি তারা পরস্পরে ন্যায়সম্মতভাবে একে অন্যের প্রতি রাজি হয়ে যায়। ১৭২ এর দ্বারা তোমাদের মধ্যে সেই সব লোককে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে। এটাই তোমাদের পক্ষে বেশি শুদ্ধ ও পবিত্র পন্থা। আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।

তাফসীরঃ

১৭২. অনেক সময় তালাকের পর ইদ্দত পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর শিক্ষা লাভ হত, ফলে তারা নতুনভাবে জীবন শুরু করার জন্য পরস্পরে পুনরায় বিবাহ সম্পন্ন করতে চাইত। যেহেতু তালাক তিনটি হত না, তাই শরীয়তে নতুন বিবাহ জায়েযও ছিল এবং স্ত্রীও তাতে সম্মত থাকত, কিন্তু তার আত্মীয়-স্বজন নিজেদের কাল্পনিক অহমিকার কারণে তাকে তার প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধা দিত। এ আয়াত তাদের সে ভ্রান্ত রসমকে অবৈধ সাব্যস্ত করছে।
২৩৩

وَالۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ؕ وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ لَا تُکَلَّفُ نَفۡسٌ اِلَّا وُسۡعَہَا ۚ لَا تُضَآرَّ وَالِدَۃٌۢ بِوَلَدِہَا وَلَا مَوۡلُوۡدٌ لَّہٗ بِوَلَدِہٖ ٭ وَعَلَی الۡوَارِثِ مِثۡلُ ذٰلِکَ ۚ فَاِنۡ اَرَادَا فِصَالًا عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡہُمَا وَتَشَاوُرٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا ؕ وَاِنۡ اَرَدۡتُّمۡ اَنۡ تَسۡتَرۡضِعُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِذَا سَلَّمۡتُمۡ مَّاۤ اٰتَیۡتُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ٢٣٣

ওয়াল ওয়া-লিদা-তু ইউরদি না আওলা-দাহুন্না হাওলাইনি কা-মিলাইনি লিমান আরা-দা আই ইউতিম্মাররাদা-‘আতাওঁ ওয়া আলাল মাওলূদি লাহু রিঝকুহুন্না ওয়া কিছওয়াতুহুন্না বিলমা‘রূফি লা-তুকাল্লাফুনাফছুন ইল্লা-উছ‘আহা-লা-তুদাররা ওয়া-লিদাতুম বিওয়ালাদিহা-ওয়ালা-মাওলূদুল্লাহু বিওয়ালাদিহি ওয়া ‘আলাল ওয়া-রিছিমিছলুযালিকা ফাইন আরা-দা-ফিসা-লান ‘আন তারা-দিম মিনহুমা-ওয়াতাশা-উরিন ফালাজুনা-হা ‘আলাইহিমা- ওয়া ইন আরাত্তুম আন তাছতারদি‘ঊ আওলা-দাকুম ফালা-জুনাহা ‘আলাইকুম ইযা-ছাল্লামতুম মাআ-তাইতুম বিলমা‘রূফি ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা বিমা-তা‘মালূনা বাসীর।

মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’ বছর দুধ পান করাবে। (এ সময়কাল) তাদের জন্য, যারা দুধ পান করানোর মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়। সন্তান যে পিতার, তার কর্তব্য ন্যায়সম্মতভাবে মায়েদের খোরপোষের ভার বহন করা। ১৭৩ (হাঁ) কাউকে তার সামর্থ্যরে বাইরে ক্লেশ দেওয়া হয় না। মাকে তার সন্তানের কারণে কষ্ট দেওয়া যাবে না এবং পিতাকেও তার সন্তানের কারণে নয়। ১৭৪ অনুরূপ দায়িত্ব ওয়ারিশের উপরও রয়েছে। ১৭৫ অতঃপর তারা (পিতা-মাতা) পারস্পরিক সম্মতি ও পরামর্শক্রমে (দু’ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই) যদি দুধ ছাড়াতে চায়, তবে তাতেও তাদের কোনও গুনাহ নেই। তোমরা যদি তোমাদের সন্তানদেরকে (কোন ধাত্রীর) দুধ পান করাতে চাও, তাতেও তোমাদের কোনও গুনাহ নেই যদি তোমরা ধার্যকৃত পারিশ্রমিক (ধাত্রীমাতাকে) ন্যায়ভাবে আদায় কর এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো এবং জেনে রেখ, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ ভালোভাবে দেখছেন।

তাফসীরঃ

১৭৩. তালাক সংক্রান্ত বিধানাবলীর মাঝখানে শিশুর দুধ পান করানোর বিষয়টা উল্লেখ করা হয়েছে এ হিসেবে যে, অনেক সময় এটাও পিতা-মাতার মধ্যে কলহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এ স্থলে যে আহকাম বর্ণিত হয়েছে, তা তালাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাধারণভাবে সর্বাবস্থায়ই প্রযোজ্য। এ স্থলে প্রথমে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দুধ সর্বোচ্চ দু’ বছর পর্যন্ত পান করানো যায়। অতঃপর মায়ের দুধ ছাড়ানো অবশ্য কর্তব্য। দ্বিতীয়ত বলা হয়েছে, পিতা-মাতা শিশুর পক্ষে ভালো মনে করলে দু’বছরের আগেও দুধ ছাড়াতে পারে। দু’ বছর পূর্ণ করা ওয়াজিব নয়। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, দুগ্ধদানকারিণী মায়ের খোরপোষ তার স্বামী তথা শিশুর পিতাকে বহন করতে হবে। বিবাহ কায়েম থাকলে তো বিবাহের কারণেই এটা বহন করা তার উপর ওয়াজিব হয়। আর তালাক হয়ে গেলে ইদ্দতের ভেতর দুধ পান করানো মায়ের উপর ওয়াজিব। এক্ষেত্রেও তার খোরপোষ তালাকদাতা স্বামীকেই বহন করতে হবে। ইদ্দতের পর খোরপোষ না পেলেও দুধ পান করানোর কারণে তালাকপ্রাপ্তা মা পারিশ্রমিক দাবী করতে পারবে।
২৩৪

وَالَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَیَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّعَشۡرًا ۚ فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا فَعَلۡنَ فِیۡۤ اَنۡفُسِہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ ٢٣٤

ওয়াল্লাযীনা ইউতাওয়াফফাওনা মিনকুমওয়া ইয়াযারূনা আঝওয়া-জাইঁ ইয়াতারাব্বাসনা বিআনফুছিহিন্না আরবা‘আতা আশহুরিওঁ ওয়া‘আশরান ফাইযা-বালাগনা আজালাহুন্না ফালা-জুনা-হা ‘আলাইকুম ফীমা-ফা‘আলনা ফীআনফুছিহিন্না বিলমা‘রূফি ওয়াল্লা-হু বিমা-তা‘মালূনা খাবীর।

তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় ও স্ত্রী রেখে যায়, তাদের সে স্ত্রীগণ নিজেদেরকে চার মাস দশ দিন প্রতীক্ষায় রাখবে। অতঃপর তারা যখন নিজ ইদ্দত (-এর মেয়াদ)-এ পৌঁছে যাবে, তখন তারা নিজেদের ব্যাপারে ন্যায়সম্মতভাবে যা-কিছু করবে (যেমন দ্বিতীয় বিবাহ), তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই। তোমরা যা-কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।
২৩৫

وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِہٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَکۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ  عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ سَتَذۡکُرُوۡنَہُنَّ وَلٰکِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡہُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ  وَلَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّکَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡکِتٰبُ اَجَلَہٗ ؕ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُ ۚ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ ٪ ٢٣٥

ওয়ালা-জুনা-হা ‘আলাইকুম ফীমা-‘আররাদতুম বিহী মিন খিতবাতিন নিছাই আও আকনানতুম ফী-আনফুছিকুম ‘আলিমাল্লা-হু আন্নাকুম ছাতাযকুরূনাহুন্না ওয়ালা-কিল্লাতুওয়া-‘ইদূ হুন্না ছিররান ইল্লাআন তাকূলূ কাওলাম মা‘রূফাওঁ ওয়ালা-তা‘ঝিমূ ‘উকদাতান নিকা-হিহাত্তা-ইয়াবলুগাল কিতা-বুআজালাহূ ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা ইয়া‘লামুমা-ফী আনফুছিকুম ফাহযারূহু ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা গাফুরুন হালীম।

এবং (ইদ্দতের ভেতর) তোমরা যদি নারীদেরকে ইশারা-ইঙ্গিতে বিবাহের প্রস্তাব দাও অথবা (তাদেরকে বিবাহ করার ইচ্ছা) নিজ অন্তরে গোপন রাখ, তবে তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা অন্তরে তাদেরকে (বিবাহ করার) কল্পনা করবে। তবে তাদেরকে বিবাহ করার দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতি দিয়ো না। হাঁ ন্যায়সম্মতভাবে কোন কথা বললে ১৭৬ সেটা ভিন্ন কথা। আর ইদ্দতের নির্দিষ্ট মেয়াদ উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহের আকদ পাকা করার ইচ্ছাও করো না। স্মরণ রেখ, তোমাদের অন্তরে যা-কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তাঁকে ভয় করে চলো এবং স্মরণ রেখ, আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

তাফসীরঃ

১৭৬. যে নারী ইদ্দত পালন করছে তাকে পরিষ্কার ভাষায় বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া কিংবা এ কথা পাকা করে নেওয়া যে, ইদ্দতের পর তুমি কিন্তু আমাকেই বিবাহ করবে, সম্পূর্ণ নাজায়েয। অবশ্য আয়াতে এমন কোনও ইশারা-ইঙ্গিত করাকে জায়েয রাখা হয়েছে, যা দ্বারা সে নারী বুঝতে পারে যে, ইদ্দতের পর বিবাহের প্রস্তাব দেওয়াই এ ব্যক্তির উদ্দেশ্য। যেমন এতটুকু বলে দেওয়া যে, আমিও কোনও উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধান করছি।
২৩৬

لَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡہُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ۚۖ وَّمَتِّعُوۡہُنَّ ۚ عَلَی الۡمُوۡسِعِ قَدَرُہٗ وَعَلَی الۡمُقۡتِرِ قَدَرُہٗ ۚ مَتَاعًۢا بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ ٢٣٦

লা-জুনা-হা ‘আলাইকুম ইন তাল্লাকতুমুন্নিছাআ মা-লাম তামাছছূহুন্না আও তাফরিদূ লাহুন্না ফারীদাতাওঁ ওয়ামাত্তি‘ঊহুন্না ‘আলাল মূছি‘ই কাদারুহূ ওয়া ‘আলাল মুকতিরি কাদারুহু মাতা-‘আম বিলমা‘রূফি হাক্কান ‘আলাল মুহছিনীন।

এতেও তোমাদের কোন গুনাহ নেই যে, তোমরা স্ত্রীদেরকে এমন সময়ে তালাক দেবে যে, তখনও পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করনি এবং তাদের মোহরও ধার্য করনি। (এরূপ অবস্থায়) তোমরা তাদেরকে (কিছু) উপহার দিয়ো ১৭৭ সচ্ছল ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এবং অসচ্ছল ব্যক্তি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী। উত্তম পন্থায় এ উপঢৌকন দিয়ো। এটা সৎকর্মশীলদের প্রতি এক অত্যাবশ্যকীয় করণীয়।

তাফসীরঃ

১৭৭. বিবাহের সময় স্বামী-স্ত্রী যদি মোহর ধার্য না করে, তারপর উভয়ের মধ্যে নিভৃত সাক্ষাতের সুযোগ আসার আগেই তালাক হয়ে যায়, তবে এ অবস্থায় মোহর আদায় করা স্বামীর উপর ওয়াজিব নয় বটে, কিন্তু অন্ততপক্ষে এক জোড়া কাপড় দেওয়া ওয়াজিব। অতিরিক্ত কিছু উপঢৌকন দিলে আরও ভালো। (পরিভাষায় এ উপঢৌকনকে ‘মুতআ’ বলে)। বিবাহের সময় যদি মোহর ধার্য করা হয়ে থাকে, অতঃপর নিভৃত সাক্ষাতের আগেই তালাক হয়ে যায়, তবে অর্ধেক মোহর দেওয়া ওয়াজিব হয়।
২৩৭

وَاِنۡ طَلَّقۡتُمُوۡہُنَّ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَمَسُّوۡہُنَّ وَقَدۡ فَرَضۡتُمۡ لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً فَنِصۡفُ مَا فَرَضۡتُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ یَّعۡفُوۡنَ اَوۡ یَعۡفُوَا الَّذِیۡ بِیَدِہٖ عُقۡدَۃُ النِّکَاحِ ؕ وَاَنۡ تَعۡفُوۡۤا اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی ؕ وَلَا تَنۡسَوُا الۡفَضۡلَ بَیۡنَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ٢٣٧

ওয়া ইন তাল্লাকতুমূহুন্না মিন কাবলি আন তামাছছূহুন্না ওয়াকাদ ফারাদতুম লাহুন্না ফারীদাতান ফানিসফুমা-ফারাদতুম ইল্লাআই ইয়া‘ফূনা আও ইয়া‘ফুওয়াল্লাযী বিয়াদিহী ‘উকদাতন নিকা-হিওয়া আন তা‘ফূআকরাবুলিত্তাকওয়া-ওয়ালা-তানছাউল ফাদলা বাইনাক ুম ইন্নাল্লা-হা বিমা-তা‘মালূনা বাসীর।

তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করার আগেই যদি তালাক দাও এবং তোমরা (বিবাহকালে) তাদের জন্য মোহর ধার্য করে থাক, তবে যে পরিমাণ মোহর ধার্য করেছিলে তার অর্ধেক (দেওয়া ওয়াজিব), অবশ্য স্ত্রীগণ যদি ছাড় দেয় (এবং অর্ধেক মোহরও দাবী না করে) অথবা যার হাতে বিবাহের গ্রন্থি (অর্থাৎ স্বামী), সে যদি ছাড় দেয় (এবং পূর্ণ মোহর দিয়ে দেয়), তবে ভিন্ন কথা। যদি তোমরা ছাড় দাও, তবে সেটাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী। আর পরস্পর ঔদার্যপূর্ণ আচরণ ভুলে যেয়ো না। তোমরা যা-কিছুই কর, আল্লাহ তা নিশ্চিত দেখছেন।
২৩৮

حٰفِظُوۡا عَلَی الصَّلَوٰتِ وَالصَّلٰوۃِ الۡوُسۡطٰی ٭ وَقُوۡمُوۡا لِلّٰہِ قٰنِتِیۡنَ ٢٣٨

হা-ফিজূ‘আলাসসালাওয়া-তি ওয়াসসালা-তিল উছতা-ওয়াকূমূলিল্লা-হি কানিতীন।

তোমরা নামাযসমূহের প্রতি পুরোপুরি যত্নবান থেক এবং (বিশেষভাবে) মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি ১৭৮ এবং আল্লাহর সামনে আদবের সাথে অনুগত হয়ে দাঁড়িয়ো।

তাফসীরঃ

১৭৮. ১৫৩ নং আয়াত থেকে ইসলামী আকায়েদ ও আহকামের যে বর্ণনা শুরু হয়েছিল (সে আয়াতের অধীনে আমাদের টীকা দেখুন), তা এবার শেষ হতে যাচ্ছে। ১৫৩ নং আয়াতে সে বর্ণনার সূচনা হয়েছিল সালাতের প্রতি গুরুত্বারোপ দ্বারা। এবার উপসংহারে পুনরায় সালাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধের কঠিন অবস্থায়ও সম্ভাব্যতার সর্বশেষ পর্যায় পর্যন্ত সালাতের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। ‘মধ্যবর্তী নামায’ দ্বারা আসরের নামায বোঝানো হয়েছে। তার বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ, সাধারণত লোকে এ সময় নিজ কাজ-কর্ম গোছাতে ব্যস্ত থাকে। ফলে সালাত আদায়ে গাফলতি হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে।
২৩৯

فَاِنۡ خِفۡتُمۡ فَرِجَالًا اَوۡ رُکۡبَانًا ۚ فَاِذَاۤ اَمِنۡتُمۡ فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ کَمَا عَلَّمَکُمۡ مَّا لَمۡ تَکُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ ٢٣٩

ফাইন খিফতুম ফারিজা-লান আও রুকবা-নান ফাইযা-আমিনতুম ফাযকুরুল্লা-হা কামা‘আল্লামাকুম মা-লাম তাকূনূ তা‘লামূন।

তোমরা যদি (শত্রুর) ভয় কর, তবে দাঁড়িয়ে বা আরোহী অবস্থায় (নামায পড়ে নিয়ো)। ১৭৯ অতঃপর তোমরা যখন নিরাপদ অবস্থা লাভ কর, তখন আল্লাহর যিকির সেইভাবে কর যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যে সম্পর্কে তোমরা অনবগত ছিলে।

তাফসীরঃ

১৭৯. যুদ্ধ অবস্থায় যখন যথারীতি সালাত আদায় করার সুযোগ হয় না, তখন দাঁড়িয়ে ইশারায় সালাত আদায়ের অনুমতি আছে। তবে চলন্ত অবস্থায় সালাত আদায় বৈধ নয়। যদি দাঁড়ানোর সুযোগ না হয়, তবে সালাত কাযা করাও জায়েয।
২৪০

وَالَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَیَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا ۚۖ وَّصِیَّۃً لِّاَزۡوَاجِہِمۡ مَّتَاعًا اِلَی الۡحَوۡلِ غَیۡرَ اِخۡرَاجٍ ۚ فَاِنۡ خَرَجۡنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡ مَا فَعَلۡنَ فِیۡۤ اَنۡفُسِہِنَّ مِنۡ مَّعۡرُوۡفٍ ؕ وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٢٤۰

ওয়াল্লাযীনা ইউতাওয়াফফাওনা মিনকুম ওয়া ইয়াযারূনা আঝওয়াজাওঁ ওয়াসিইইয়াতাল লিআঝওয়া-জিহিম মাতা‘আন ইলাল হাওলি গাইরা ইখরা-জিন ফাইন খারাজনা ফালাজুনা-হা ‘আলাইকুম ফী মা-ফা‘আলনা ফীআনফুছিহিন্না মিম্মা‘রূফিওঁ ওয়াল্লা-হু ‘আঝীঝুন হাকীম।

তোমাদের মধ্যে যাদের মৃত্যু হয়ে যায় এবং স্ত্রী রেখে যায়, তারা যেন (মৃত্যুকালে) স্ত্রীদের অনুকূলে ওসিয়ত করে যায় যে, তারা এক বছর পর্যন্ত (পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে খোরপোষ গ্রহণের) সুবিধা ভোগ করবে এবং তাদেরকে (স্বামীগৃহ থেকে) বের করা যাবে না। ১৮০ হাঁ, তারা নিজেরাই যদি বের হয়ে যায়, তবে নিজেদের ব্যাপারে তারা বিধিমত যা করবে, তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই। আল্লাহ মহাক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

১৮০. শেষ দিকে তালাক সম্পর্কিত যে মাসাইলের আলোচনা চলছিল, তার একটি পরিশেষ এ স্থলে উল্লেখ করা হচ্ছে। বিষয়টি তালাকপ্রাপ্তা নারীদের অধিকার সম্পর্কিত। জাহিলী যুগে বিধবার ইদ্দত হত এক বছর। ইসলাম সে মেয়াদ কমিয়ে চার মাস দশ দিন করে দিয়েছে (দ্র. আয়াত ২ : ২৩৪)। এ আয়াত যখন নাযিল হয়, তখনও পর্যন্ত মীরাছের আহকাম নাযিল হয়নি। উপরে ১৮০ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, মৃত্যুপথ যাত্রীর কর্তব্য, তার সম্পদ থেকে কোন আত্মীয় কতটুকু পাবে সে সম্পর্কে ওসিয়ত করে যাওয়া। এ আয়াতে সে নীতি অনুসারেই বলা হচ্ছে যে, যদিও বিধবার ইদ্দত চার মাস দশ দিন, কিন্তু তার স্বামীর উচিত স্ত্রী সম্পর্কে এই ওসিয়ত করে যাওয়া যে, তাকে যেন এক বছর পর্যন্ত তার সম্পদ থেকে খোরপোষ দেওয়া হয় এবং তাকে যেন তার ঘরে থাকারও সুযোগ দেওয়া হয়। অবশ্য সে নিজেই যদি তার এ হক ছেড়ে দেয় এবং চার মাস দশ দিন পর স্বামীর ঘর থেকে বের হয়ে যায়, তবে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু চার মাস দশ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে তার জন্য স্বামীগৃহ ত্যাগ করা জায়েয নয়। পরবর্তী বাক্যে যে বলা হয়েছে, ‘হাঁ সে নিজেই যদি বের হয়ে যায়, তবে নিজের ব্যাপারে সে বিধিমত যা-কিছুই করবে তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই; তাতে বিধিমত বলতে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, সে ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর বের হতে পারবে, তার আগে নয়। তবে এ সমস্ত বিধান মীরাছের আহকাম নাযিল হওয়ার আগে ছিল। যখন সূরা নিসায় মীরাছের বিধান এসে গেছে এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে স্ত্রীর অংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, তখন এক বছরের খোরপোষ ও স্বামীগৃহে অবস্থানের হক রহিত হয়ে গেছে।
২৪১

وَلِلۡمُطَلَّقٰتِ مَتَاعٌۢ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ ٢٤١

ওয়ালিল মুতাল্লাকা-তি মাতা-‘উম বিলমা‘রূফি হাক্কান ‘আলাল মুত্তাকীন।

তালাকপ্রাপ্তাদেরকে বিধিমত ফায়দা দান মুত্তাকীদের উপর তাদের অধিকার। ১৮১

তাফসীরঃ

১৮১. তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকে ‘ফায়দা দান’-এর যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এটা অতি ব্যাপক। ইদ্দতকালীন খোরপোষ যেমন এর অন্তর্ভুক্ত, তেমনি মোহরানা পরিশোধ করা না হয়ে থাকলে তাও এর মধ্যে পড়ে। তাছাড়া পূর্বে ২৩৬ নং আয়াতে যে উপঢৌকনের কথা বলা হয়েছে, তাও এর মধ্যে শামিল রয়েছে। বিবাহে যদি মোহরানা ধার্য করা না হয় এবং নিভৃত সাক্ষাতের আগেই তালাক হয়ে যায়, তখন উপঢৌকন দেওয়া ওয়াজিব, কিন্তু যখন মোহরানা ধার্য থাকে, তখন তা (উপঢৌকন) দেওয়া ওয়াজিব না হলেও মুস্তাহাব বটে। কাজেই তাকে মোহরানার সাথে কিছু উপঢৌকনও দেওয়া চাই। এসব বিধান দ্বারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তালাক দেওয়া কিছু ভালো কাজ নয়। যখন অন্য কোনও উপায় বাকি না থাকে, কেবল তখনই তালাক দেওয়ার চিন্তা করা যায়। অতঃপর যখন তালাক দেওয়া হবে, তখন দাম্পত্য সম্পর্কের অবসানও ভদ্রোচিত, ঔদার্য ও সম্মানজনকভাবে শান্ত-সংযত পরিবেশে ঘটানো উচিত, শত্রুতামূলক পরিবেশে নয়।
২৪২

کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ ٪ ٢٤٢

কাযা-লিকা ইউবাইয়িনুল্লা-হু লাকুম আ-য়া-তিহী লা‘আল্লাকুম তা‘কিলূন।

এভাবেই আল্লাহ স্বীয় বিধানাবলী তোমাদের কাছে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।
২৪৩

اَلَمۡ تَرَ اِلَی الَّذِیۡنَ خَرَجُوۡا مِنۡ دِیَارِہِمۡ وَہُمۡ اُلُوۡفٌ حَذَرَ الۡمَوۡتِ ۪ فَقَالَ لَہُمُ اللّٰہُ مُوۡتُوۡا ۟ ثُمَّ اَحۡیَاہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَذُوۡ فَضۡلٍ عَلَی النَّاسِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَشۡکُرُوۡنَ ٢٤٣

আলাম তারা ইলাল্লাযীনা খারাজূ মিন দিয়া-রিহিম ওয়া হুম উলূফুন হাযারাল মাওতি ফাকা-লা লাহুমুল্লা-হু মূতূ ছু ম্মা আহইয়া-হুম; ইন্নাল্লা-হা লাযূ ফাদলিন ‘আলান্নাছি ওয়ালা-কিন্না আকছারান্না-ছি লা-ইয়াশকুরূন।

তুমি কি তাদের অবস্থা জান না, যারা মৃত্যু হতে বাঁচার জন্য নিজেদের ঘর-বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল এবং তারা সংখ্যায় ছিল হাজার-হাজার? অতঃপর আল্লাহ তাদের বললেন, মরে যাও। তারপর তিনি তাদের জীবিত করলেন। ১৮২ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মানুষের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।

তাফসীরঃ

১৮২. এখান থেকে ২৬০ আয়াত পর্যন্ত দু’টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করা। কিন্তু মুনাফিক ও ভীরু প্রকৃতির লোক যেহতু মৃত্যুকে বড় ভয় পেত তাই তারা যুদ্ধে যেতে গড়িমসি করত, যে কারণে একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। তার সারমর্ম এই যে, জীবন ও মৃত্যু আল্লাহ তাআলারই হাতে। তিনি চাইলে যুদ্ধ ছাড়াও মৃত্যু দিতে পারেন এবং চাইলে ঘোরতর লড়াইয়ের ভেতরও প্রাণ রক্ষা করতে পারেন। বরং তার এ ক্ষমতাও রয়েছে যে, মৃত্যুর পরও তিনি মানুষকে জীবিত করতে পারেন। তাঁর এ ক্ষমতার সাধারণ প্রকাশ তো আখিরাতেই ঘটবে, কিন্তু এ দুনিয়াতেও তিনি জগতকে এমন কিছু নমুনা দেখিয়ে দিয়েছেন, যাতে মৃত লোককে আবার জীবিত করে তোলা হয়েছে। তার একটি দৃষ্টান্ত দেখানো হয়েছে এ আয়াতে (২৪৩)। তাছাড়া ২৫৩নং আয়াতে ইশারা করা হয়েছে যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে আল্লাহ তাআলা কয়েকজন মৃত লোককে জীবন দান করেছেন। এমনিভাবে ২৫৮নং আয়াতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও নমরূদের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে, যাতে দেখানো হয়েছে মৃত্যু ও জীবন দানের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। চতুর্থ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ২৫৯নং আয়াতে। তাতে হযরত উযায়র (আ.)-এর ঘটনা দেখানো হয়েছে। তারপরে ২৬০নং আয়াতে পঞ্চম ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে আরজ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা মৃতকে কিভাবে জীবিত করেন তা তিনি দেখতে চান। বর্তমান আয়াত (নং ২৪৩)-এ যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, কুরআন মাজীদে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। কেবল এতটুকু বলা হয়েছে যে, কোনও এক কালে একটি সম্প্রদায় মৃত্যু থেকে বাঁচার লক্ষ্যে নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিল। তাদের সংখ্যা ছিল হাজার-হাজার। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই তাদের মৃত্যু ঘটান। তারপর আবার তাদেরকে জীবিত করে দেখিয়ে দেন, মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোনও ব্যক্তি যদি আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করে কোনও কৌশলের আশ্রয় নেয়, তবে এর কোনও নিশ্চয়তা নেই যে, ঠিকই সে মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। যত বড় কৌশলই গ্রহণ করুক, তারপরও আল্লাহ তাআলা তাকে মৃত্যুর স্বাদ চাখাতে পারেন। এসব লোক কারা ছিল? কোন কালের ছিল? সেটা কি ছিল যে কারণে তারা মৃত্যু ভয়ে পালাচ্ছিল? এসব বিষয়ে কুরআন মাজীদে কিছু বলা হয়নি। বলা হয়নি এ কারণে যে, কুরআন মাজীদ তো কোন ইতিহাসগ্রন্থ নয়। এতে যেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তার উদ্দেশ্য কেবল কোন বিষয়ে সবক দেওয়া। তাই আকছার ঘটনার সেই অংশই বর্ণিত হয়, যার দ্বারা সেই সবক লাভ হয়। এ ঘটনার যতটুকু বর্ণিত হয়েছে তা দ্বারা উপরে বর্ণিত সবক লাভ হয়ে যায়। অবশ্য কুরআন মাজীদ যে ভঙ্গিতে ঘটনার প্রতি ইশারা করেছে তা দ্বারা অনুমান করা যায়, সে কালে এ ঘটনা মানুষের মধ্যে বিখ্যাত ও সুবিদিত ছিল। আয়াতের শুরুতে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ‘তুমি কি তাদের অবস্থা জান না”? এটা নির্দেশ করে, ঘটনাটি তখন প্রসিদ্ধ ছিল। সুতরাং হাফেজ ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এস্থলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) ও কয়েকজন তাবিঈ থেকে কয়েকটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন, যা দ্বারা জানা যায়, এটা বনী ইসরাঈলের ঘটনা। তারা সংখ্যায় হাজার-হাজার হওয়া সত্ত্বেও শত্রুর মুকাবিলা করতে সাহস পায়নি। উল্টো তারা প্রাণ ভয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। অথবা তারা প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে এলাকা ছেড়েছিল। তারা যে স্থানকে নিরাপদ ভূমি মনে করেছিল, সেখানে পৌঁছামাত্র আল্লাহ তাআলার হুকুমে তাদের মৃত্যু এসে যায়। অনেক পরে যখন তাদের অস্থিরাজি জ্বরাজীর্ণ হয়ে যায় তখন হযরত হিযকীল আলাইহিস সালাম সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে আদেশ করলেন, তিনি যেন সে অস্থিরাজিকে লক্ষ্য করে ডাক দেন। তিনি ডাক দেওয়া মাত্র অস্থিসমূহে প্রাণ সঞ্চার হয় এবং পূর্ণ মানব আকৃতিতে তারা জীবিত হয়ে ওঠে। হযরত হিযকীল আলাইহিস সালামের এ ঘটনা বর্তমান বাইবেলেও বর্ণিত রয়েছে (দেখুন হিযকীল ৩৭:১-১৫)। কাজেই অসম্ভব নয় যে, মদীনায় এ ঘটনা ইয়াহুদীদের মাধ্যমে প্রচার লাভ করেছিল। ঘটনার উপরিউক্ত বিবরণ নির্ভরযোগ্য হোক বা না হোক, এতটুকু কথা তো কুরআন মাজীদের আয়াত দ্বারা সরাসরি ও সুস্পষ্টরূপে জানা যায় যে, তাদেরকে সত্যিকারের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হয়েছিল। আমাদের এ যুগের কোনও কোনও গ্রন্থকার মৃত লোকের জীবিত হওয়াকে অযৌক্তিক মনে করত এ আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন যে, আয়াতে মৃত্যু দ্বারা রাজনৈতিক ও চারিত্রিক মৃত্যু বোঝানো হয়েছে আর দ্বিতীয়বার জীবিত করার অর্থ হচ্ছে রাজনৈতিক বিজয়। কিন্তু এ জাতীয় ব্যাখ্যা এক তো কুরআন মাজীদের সুস্পষ্ট শব্দাবলীর সাথে খাপ খায় না, দ্বিতীয়ত এটা আরবী ভাষাশৈলী ও কুরআনী বর্ণনাভঙ্গীর সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সোজা-সাপ্টা কথা এই যে, আল্লাহ তাআলার অপার শক্তির উপর ঈমান থাকলে এ জাতীয় ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। সুতরাং এ রকম দূর-দূরান্তের ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন কি? বিশেষত এখান থেকে ২৬০নং আয়াত পর্যন্ত যে আলোচনা পরম্পরা চলছে, যার সারমর্ম পূর্বে বলা হয়েছে, সে আলোকে এস্থলে মৃত্যু ও জীবনের প্রকৃত অর্থই উদ্দিষ্ট হওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত।
২৪৪

وَقَاتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ٢٤٤

ওয়াকা-তিলূ ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়া‘লামূ আন্নাল্লা-হা ছামী‘উন ‘আলীম।

এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর এবং জেনে রাখ, আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও সবকিছু জানেন।
২৪৫

مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یُقۡرِضُ اللّٰہَ قَرۡضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَہٗ لَہٗۤ اَضۡعَافًا کَثِیۡرَۃً ؕ وَاللّٰہُ یَقۡبِضُ وَیَبۡصُۜطُ ۪ وَاِلَیۡہِ تُرۡجَعُوۡنَ ٢٤٥

মান যাল্লাযী ইউকরিদুল্লা-হা কারদান হাছানান ফাইউদা-‘ইফাহূলাহুআদ‘আ ফান কাছীরাতাওঁ ওয়াল্লা-হু ইয়াকবিদুওয়া ইয়াবছুতুওয়াইলাইহি তুরজা‘ঊন।

কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম পন্থায় ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার কল্যাণে তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন? ১৮৩ আল্লাহই সংকট সৃষ্টি করেন এবং তিনিই স্বচ্ছলতা দান করেন, আর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

তাফসীরঃ

১৮৩. আল্লাহ তাআলাকে ঋণ দেওয়ার অর্থ তাঁর পথে খরচ করা। গরীবদেরকে সাহায্য করা যেমন এর অন্তর্ভুক্ত, তেমনি জিহাদের ক্ষেত্রসমূহে ব্যয় করাও। একে ঋণ বলা হয়েছে রূপকার্থে। কেননা এর বিনিময় দেওয়া হবে সওয়াবরূপে। ‘উত্তম পন্থা’-এর অর্থ ইখলাসের সাথে আল্লাহ তাআলাকে খুশী করার মানসে দান করা। মানুষকে দেখানো কিংবা পার্থিব প্রতিদান লাভ উদ্দেশ্য হবে না। যদি জিহাদের জন্য বা গরীবদের সাহায্য করার জন্য ঋণও দেওয়া হয়, তবে তাতে কোনরূপ সুদের দাবী না থাকা। কাফিরগণ তাদের সামরিক প্রয়োজনে সুদে ঋণ নিত। মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রথমত তারা যেন ঋণ না দিয়ে বরং চাঁদা দেয়। অগত্যা যদি ঋণ দেয়, তবে মূল অর্থের বেশি দাবী না করে। কেননা যদিও দুনিয়ায় তারা সুদ পাবে না, কিন্তু আল্লাহ তাআলা আখিরাতে তার যে সওয়াব দেবেন তা আসলের চেয়ে বহুগুণ বেশি হবে। এরূপ ব্যয় করলে অর্থ-সম্পদ কমে যাওয়ার যে খতরা থাকে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, সংকট ও সচ্ছলতা আল্লাহরই হাতে। আল্লাহর দীনের জন্য যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ ব্যয় করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সংকটের সম্মুখীন করবেন না যদি সে তা আল্লাহর হুকুম মোতাবেক ব্যয় করে থাকে।
২৪৬

اَلَمۡ تَرَ اِلَی الۡمَلَاِ مِنۡۢ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ مِنۡۢ بَعۡدِ مُوۡسٰی ۘ اِذۡ قَالُوۡا لِنَبِیٍّ لَّہُمُ ابۡعَثۡ لَنَا مَلِکًا نُّقَاتِلۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ قَالَ ہَلۡ عَسَیۡتُمۡ اِنۡ کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِتَالُ اَلَّا تُقَاتِلُوۡا ؕ قَالُوۡا وَمَا لَنَاۤ اَلَّا نُقَاتِلَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَقَدۡ اُخۡرِجۡنَا مِنۡ دِیَارِنَا وَاَبۡنَآئِنَا ؕ فَلَمَّا کُتِبَ عَلَیۡہِمُ الۡقِتَالُ تَوَلَّوۡا اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ ٢٤٦

আলাম তারা ইলাল মালাই মিমবানী ইছরাঈলা মিম বা‘দি মূছা-। ইযকা-লূ লিনাবিইয়িল্লাহুমুব ‘আছলানা-মালিকান্নুকা-তিল ফী ছাবীলিল্লা-হি কা-লা হাল ‘আছাইতুম ইন কুতিবা ‘আলাইকুমুল কিতা-লুআল্লা-তুকা-তিলূ কা-লূওয়ামা লানাআল্লা-নুকা-তিলা ফী ছাবীলিল্লা-হি ওয়া কাদ উখরিজনা-মিন দিয়া-রিনা-ওয়া আবনাইনা ফালাম্মা কুতিবা ‘আলাইহিমুল কিতা-লুতাওয়াল্লাও ইল্লা-কালীলাম মিনহুম ওয়াল্লাহু ‘আলীমুম বিজ্জা-লিমীন।

তুমি কি মূসা পরবর্তী বনী ইসরাঈলের সেই দলের ঘটনা জান না, যখন তারা তাদের এক নবীকে বলেছিল, আমাদের জন্য একজন বাদশাহ নিযুক্ত করে দিন, যাতে (তার পতাকা তলে) আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। ১৮৪ নবী বললেন, তোমাদের দ্বারা এমন ঘটা অসম্ভব কি যে, যখন তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হবে, তখন আর তোমরা যুদ্ধ করবে না? তারা বলল, আমাদের এমন কি কারণ থাকতে পারে যে, আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব না, অথচ আমাদেরকে আমাদের ঘর-বাড়ি ও আমাদের সন্তান-সন্ততিদের থেকে বের করে দেওয়া হয়েছ? অতঃপর (এটাই ঘটল যে,) যখন তাদের প্রতি যুদ্ধ ফরয করা হল, তাদের মধ্যকার অল্প কিছু লোক ছাড়া বাকি সকলে পেছনে ফিরে গেল। আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত।

তাফসীরঃ

১৮৪. এস্থলে নবী বলে হযরত সামুয়েল আলাইহিস সালামকে বোঝানো হয়েছে। তাকে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের আনুমানিক সাড়ে তিনশ বছর পর নবী করে পাঠানো হয়েছিল। সূরা মায়েদায় আছে (৫ : ২৪), ফির‘আউনের কবল থেকে মুক্তি লাভের পর হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলকে আমালিকা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ডাক দিয়েছিলেন। কেননা আমালিকা সম্প্রদায় বনী ইসরাঈলের দেশ ফিলিস্তিনকে দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু বনী ইসরাঈল যুদ্ধ করতে সাফ অস্বীকার করল। তার শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে সিনাই মরুভূমিতে আটকে দেওয়া হয়। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম সে মরুভূমিতেই ইন্তিকাল করেন। পরবর্তীকালে হযরত ইউশা আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে ফিলিস্তীনের একটি বড় এলাকায় তাদের বিজয় অর্জিত হয়। হযরত ইউশা আলাইহিস সালাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের তত্ত্বাবধান করতে থাকেন। তিনি তাদের বিবাদ-বিসংবাদের মীমাংসার জন্য বিচারক নিযুক্ত করে দিতেন, কিন্তু তাদের কোনও বাদশাহ বা শাসনকর্তা ছিল না এবং এ অবস্থায়ই প্রায় তিনশ’ বছর তাদের অতিবাহিত হয়ে যায়। এ সময় গোত্রপতি এবং হযরত ইউশা আলাইহিস সালামের দেওয়া ব্যবস্থা অনুযায়ী কাযী বা বিচারকই তাদের নিয়ন্ত্রণ করত। তাই এ কালকে ‘কাযীদের যুগ’ বলা হত। বাইবেলের ‘কাজীগণ’ শীর্ষক অধ্যায়ে এ কালেরই ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। গোটা জাতির একক কোনও শাসক না থাকার কারণে আশপাশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তরফ থেকে তাদের উপর একের পর এক হামলা চলতে থাকত। সবশেষে ফিলিস্তিনের পৌত্তলিক সম্প্রদায় আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করে ফেলে এবং তাদের বরকতপূর্ণ সিন্দুকও লুট করে নিয়ে যায়। এ সিন্দুকে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম ও হযরত হারুন আলাইহিস সালামের বিভিন্ন স্মৃতি সংরক্ষিত ছিল। আরও ছিল তাওরাতের কপি ও আসমানী খাদ্য ‘মান্ন’-এর নমুনা। যুদ্ধকালে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে বনী ইসরাঈল এ সিন্দুকটি তাদের সম্মুখভাগে রাখত। এ পরিস্থিতিতে সামুয়েল নামক তাদের এক বিচারপতিকে নবুওয়াত দান করা হয়। তার কালেও ফিলিস্তিনীদের উপর যথারীতি জুলুম-নিপীড়ন চলতে থাকে। শেষে বনী ইসরাঈল তাঁর কাছে আবেদন রাখল, তিনি যেন তাদের জন্য কাউকে বাদশাহ মনোনীত করেন। সেমতে তালূতকে তাদের বাদশাহ বানিয়ে দেওয়া হয়, যার ঘটনা এস্থলে বর্ণিত হচ্ছে। বাইবেলের দু’টি পুস্তক হযরত সামুয়েল আলাইহিস সালামের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। তার প্রথম অধ্যায়ে বনী ইসরাঈলের পক্ষ হতে বাদশাহ নিযুক্তি সম্পর্কিত আবেদনের কথাও উল্লেখ আছে।
২৪৭

وَقَالَ لَہُمۡ نَبِیُّہُمۡ اِنَّ اللّٰہَ قَدۡ بَعَثَ لَکُمۡ طَالُوۡتَ مَلِکًا ؕ قَالُوۡۤا اَنّٰی یَکُوۡنُ لَہُ الۡمُلۡکُ عَلَیۡنَا وَنَحۡنُ اَحَقُّ بِالۡمُلۡکِ مِنۡہُ وَلَمۡ یُؤۡتَ سَعَۃً مِّنَ الۡمَالِ ؕ قَالَ اِنَّ اللّٰہَ اصۡطَفٰىہُ عَلَیۡکُمۡ وَزَادَہٗ بَسۡطَۃً فِی الۡعِلۡمِ وَالۡجِسۡمِ ؕ وَاللّٰہُ یُؤۡتِیۡ مُلۡکَہٗ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ٢٤٧

ওয়া কা-লা লাহুম নাবিইয়ুহুম ইন্নাল্লা-হা কাদ বা ‘আছা লাকুম তা-লূতা মালিকান কালূআন্না-ইয়াকূনু লাহুল মুলকু‘আলাইনা-ওয়া নাহনুআহাক্কুবিলমুলকি মিনহু ওয়ালাম ইউ’তা ছা‘আতাম মিনাল মা-লি কা-লা ইন্নাল্লা-হাসতাফা-হু ‘আলাইকুম ওয়াঝা-দাহু বাছতাতান ফিল‘ইলমি ওয়াল জিছমি ওয়াল্লা-হু ইউ’তী মুলকাহু মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু ওয়া-ছি‘উন ‘আলীম।

তাদের নবী তাদেরকে বলল, আল্লাহ তোমাদের জন্য তালূতকে বাদশাহ করে পাঠিয়েছেন। তারা বলতে লাগল, তার কি করে আমাদের উপর বাদশাহী লাভ হতে পারে, যখন তার বিপরীতে আমরাই বাদশাহীর বেশি হকদার? তাছাড়া তার তো আর্থিক স্বচ্ছলতাও লাভ হয়নি। নবী বলল, আল্লাহ তাকে তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং জ্ঞান ও শরীরের দিক থেকে তাকে (তোমাদের অপেক্ষা) সমৃদ্ধি দান করেছেন। আল্লাহ তাঁর রাজত্ব যাকে ইচ্ছা দান করে থাকেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।
২৪৮

وَقَالَ لَہُمۡ نَبِیُّہُمۡ اِنَّ اٰیَۃَ مُلۡکِہٖۤ اَنۡ یَّاۡتِیَکُمُ التَّابُوۡتُ فِیۡہِ سَکِیۡنَۃٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَبَقِیَّۃٌ مِّمَّا تَرَکَ اٰلُ مُوۡسٰی وَاٰلُ ہٰرُوۡنَ تَحۡمِلُہُ الۡمَلٰٓئِکَۃُ ؕ  اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیَۃً لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ٪ ٢٤٨

ওয়াকা-লা লাহুম নাবিইয়ুহুম ইন্না আ-য়াতা মুলকিহী আই ইয়া’তিয়াকুমুত্তা-বূতু ফীহি ছাকীনাতুম মির রাব্বিকুম ওয়া বাকিইইয়াতুম মিম্মা-তারাকা আ-লুমূছা-ওয়া আ-লু হা-রূনা তাহমিলুহুমুল মালাইকাতু ইন্না ফী যা-লিকা লাআ-য়াতাল্লাকুম ইন কুনতুম মু’মিনীন।

তাদেরকে তাদের নবী আরও বলল, তালূতের বাদশাহীর আলামত এই যে, তোমাদের কাছে সেই সিন্দুক (ফিরে) আসবে, যার ভেতর তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রশান্তির উপকরণ এবং মূসা ও হারুন যা-কিছু রেখে গেছে তার কিছু অবশেষ রয়েছে। ফিরিশতাগণ সেটি বয়ে আনবে। ১৮৫ তোমরা মুমিন হয়ে থাকলে তার মধ্যে তোমাদের জন্য অনেক বড় নিদর্শন রয়েছে।

তাফসীরঃ

১৮৫. বনী ইসরাইল যখন তালূতকে বাদশাহ মানতে অস্বীকার করল এবং তাঁর বাদশাহীর সপক্ষে কোনও নিদর্শন দাবী করল, তখন আল্লাহ তাআলা হযরত সামুয়েল আলাইহিস সালামকে দিয়ে বলালেন, তালূত যে আল্লাহর পক্ষ থেকেই মনোনীত তার একটি নিদর্শন হল অসদোদী সম্প্রদায়ের লোকেরা যে বরকতপূর্ণ সিন্দুকটি লুট করে নিয়ে গিয়েছিল, তালূতের আমলে ফিরিশতাগণ সেটি তোমাদের কাছে বয়ে আনবে। ইসরাঈলী রিওয়ায়াত মোতাবেক আল্লাহ তাআলা এক্ষেত্রে যা করেছিলেন তা এই যে, অসদোদীগণ সিন্দুকটি তাদের এক মন্দিরে নিয়ে রেখেছিল, কিন্তু এর পর থেকে তারা নানা রকম বিপদ-আপদে আক্রান্ত হতে থাকে। কখনও দেখত, তাদের প্রতিমা উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। কখনও মহামারি দেখা দিত। কখনও ইঁদুরের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ত। পরিশেষে তাদের জ্যোতিষীগণ তাদেরকে পরামর্শ দিল যে, এসব বিপদের মূল কারণ ওই সিন্দুক। শীঘ্র ওটি সরিয়ে ফেল। সুতরাং তারা সিন্দুকটি একটি গরুর গাড়িতে তুলে দিয়ে গরুদেরকে শহরের বাইরের দিকে হাঁকিয়ে দিল। বাইবেলে এ কথার উল্লেখ নেই যে, ফিরিশতারা সিন্দুকটি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কুরআন মাজীদে একথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। বাইবেলের এ বর্ণনাকে যদি সঠিক বলে ধরা হয় যে, তারা নিজেরাই সিন্দুকটি বের করে দিয়েছিল, তবে বলা যেতে পারে গরুর গাড়ি সেটি শহরের বাইরে নিয়ে ফেলেছিল, আর ফিরিশতাগণ সেটি সেখান থেকে তুলে নিয়ে বনী ইসরাঈলের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। এমনও হতে পারে যে, গরুর গাড়িতে তোলার ঘটনাটাই সঠিক নয়; বরং ফিরিশতাগণ সেটি সরাসরিই তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
২৪৯

فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوۡتُ بِالۡجُنُوۡدِ ۙ قَالَ اِنَّ اللّٰہَ مُبۡتَلِیۡکُمۡ بِنَہَرٍ ۚ فَمَنۡ شَرِبَ مِنۡہُ فَلَیۡسَ مِنِّیۡ ۚ وَمَنۡ لَّمۡ یَطۡعَمۡہُ فَاِنَّہٗ مِنِّیۡۤ اِلَّا مَنِ اغۡتَرَفَ غُرۡفَۃًۢ بِیَدِہٖ ۚ فَشَرِبُوۡا مِنۡہُ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡہُمۡ ؕ فَلَمَّا جَاوَزَہٗ ہُوَ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَعَہٗ ۙ قَالُوۡا لَا طَاقَۃَ لَنَا الۡیَوۡمَ بِجَالُوۡتَ وَجُنُوۡدِہٖ ؕ قَالَ الَّذِیۡنَ یَظُنُّوۡنَ اَنَّہُمۡ مُّلٰقُوا اللّٰہِ ۙ کَمۡ مِّنۡ فِئَۃٍ قَلِیۡلَۃٍ غَلَبَتۡ فِئَۃً کَثِیۡرَۃًۢ بِاِذۡنِ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ ٢٤٩

ফালাম্মা-ফাসালা তা-লূতু বিলজুনূদি কা-লা ইন্নাল্লা-হা মুবতালীকুম বিনাহারিন ফামান শারিবা মিনহু ফালাইছা মিন্নী ওয়া মাল্লাম ইয়াত‘আমহু ফাইন্নাহু মিন্নী-ইল্লা-মানিগতারাফা গুরফাতাম বিয়াদিহী ফাশারিবূ মিনহু ইল্লা-কালীলাম মিনহুম ফালাম্মা-জা-ওয়াঝাহু হুওয়া ওয়াল্লাযীনা আ-মানূ মা‘আহু কা-লূ লা-তা-কাতালানাল ইয়াওমা বিজা-লূতা ওয়া জুনূদিহী কালাল্লাযীনা ইয়াজুন্নূনা আন্নাহুম মুলা-কুল্লা-হি কাম মিন ফিআতিন কালীলাতিন, গালাবাত ফিআতান কাছীরাতাম বিইযনিল্লা-হি ওয়াল্লা-হু মা‘আসসা-বিরীন।

অতঃপর তালূত যখন সৈন্যদের সাথে রওয়ানা হল, তখন সে (সৈন্যদেরকে) বলল, আল্লাহ একটি নদীর দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন। যে ব্যক্তি সে নদীর পানি পান করবে, সে আমার লোক নয়। আর যে তা আস্বাদন করবে না, সে আমার লোক। অবশ্য কেউ নিজ হাত দ্বারা এক আঁজলা ভরে নিলে কোনও দোষ নেই। ১৮৬ তারপর (এই ঘটল যে,) তাদের অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া বাকি সকলে নদী থেকে (প্রচুর) পানি পান করল। সুতরাং যখন সে (তালূত) এবং তার সঙ্গের মুমিনগণ নদীর ওপারে পৌঁছল, তখন তারা (যারা তালূতের আদেশ মানেনি) বলতে লাগল, আজ জালূত ও তার সৈন্যদের সাথে লড়াই করার কোনও শক্তি আমাদের নেই। (কিন্তু) যাদের বিশ্বাস ছিল যে, তারা অবশ্যই আল্লাহর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হবে, তারা বলল, এমন কত ছোট দলই না রয়েছে, যারা আল্লাহর হুকুমে বড় দলের উপর জয়যুক্ত হয়েছে! আর আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন, যারা সবরের পরিচয় দেয়।

তাফসীরঃ

১৮৬. এটা ছিল জর্ডান নদী। সৈন্যদের মধ্যে কতজন এমন আছে, যারা অধিনায়কের আনুগত্যের খাতিরে এমনকি নিজেদের স্বভাবগত চাহিদাকেও বিসর্জন দিতে পারে, সম্ভবত সেটা দেখার জন্য এভাবে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। কেননা এ জাতীয় যুদ্ধে এরূপ পরিপক্ক ও নিঃশর্ত আনুগত্যই দরকার। তা না হলে জয়লাভ করা সম্ভব হয় না।
২৫০

وَلَمَّا بَرَزُوۡا لِجَالُوۡتَ وَجُنُوۡدِہٖ قَالُوۡا رَبَّنَاۤ اَفۡرِغۡ عَلَیۡنَا صَبۡرًا وَّثَبِّتۡ اَقۡدَامَنَا وَانۡصُرۡنَا عَلَی الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِیۡنَ ؕ ٢٥۰

ওয়া লাম্মা-বারাঝূ লিজা-লূতা ওয়াজুনূদিহী কা-লূরাব্বানা-আফরিগ আলাইনা-সাবরাওঁ ওয়া ছাব্বিত আকদা-মানা-ওয়ানসুরনা-‘আলাল কাওমিল কা-ফরীন।

তারা যখন জালূত ও তার সৈন্যদের মুখোমুখি হল, তখন তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর সবরের গুণ ঢেলে দাও এবং আমাদেরকে অবিচল-পদ রাখ, আর কাফির সম্প্রদায়ের উপর আমাদেরকে সাহায্য ও বিজয় দান কর।
২৫১

فَہَزَمُوۡہُمۡ بِاِذۡنِ اللّٰہِ ۟ۙ وَقَتَلَ دَاوٗدُ جَالُوۡتَ وَاٰتٰىہُ اللّٰہُ الۡمُلۡکَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَعَلَّمَہٗ مِمَّا یَشَآءُ ؕ وَلَوۡلَا دَفۡعُ اللّٰہِ النَّاسَ بَعۡضَہُمۡ بِبَعۡضٍ ۙ لَّفَسَدَتِ الۡاَرۡضُ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ ذُوۡ فَضۡلٍ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ٢٥١

ফাহাঝামূহুম বিইযনিল্লা-হি ওয়াকাতালা দা-ঊদু জা-লূতা ওয়া আ-তা-হুল্লা-হুল মুলকা ওয়াল হিকমাতা ওয়া‘আল্লামাহু মিম্মা-ইয়াশাউ ওয়া লাওলা-দাফ‘উল্লা-হিন্না-ছা বা‘দাহুম ব্বিা‘দিল লাফাছাদাতিল আরদুওয়া লা-কিন্নাল্লা-হা যূফাদলিন ‘আলাল ‘আ-লামীন।

সুতরাং আল্লাহর হুকুমে তারা তাদেরকে (জালূতের বাহিনীকে) পরাভূত করল এবং দাঊদ জালূতকে হত্যা করল। ১৮৭ এবং আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং তিনি যে জ্ঞান চাইলেন তাকে দান করলেন। আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের কতকের মাধ্যমে কতককে প্রতিহত না করতেন, তবে পৃথিবী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত। কিন্তু আল্লাহ জগতসমূহের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল।

তাফসীরঃ

১৮৭. জালূত ছিল শত্রু সৈন্যের মধ্যে এক বিশালাকায় পালোয়ান। বাইবেলে সামুয়েল (আলাইহিস সালাম)-এর নামে যে প্রথম অধ্যায় আছে, তাতে বর্ণিত হয়েছে যে, সে কয়েক দিন পর্যন্ত বনী ইসরাঈলকে লক্ষ্য করে চ্যালেঞ্জ দিতে থাকে ‘কে আছে তার সাথে লড়াই করতে পারে?’ কিন্তু কারই তার সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হওয়ার হিম্মত হল না। হযরত দাঊদ আলাইহিস সালাম তখন ছিলেন উঠতি নওজোয়ান। যুদ্ধে তার তিন ভাই শরীক ছিল। তিনি সবার ছোট হওয়ায় বৃদ্ধ পিতার সেবায় থেকে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর যখন কয়েক দিন গত হয়ে গেল, তখন পিতা তাকে তার ভাইদের খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য রণক্ষেত্রে পাঠাল। তিনি ময়দানে গিয়ে দেখেন, জালূত অবিরাম চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে যাচ্ছে এবং কেউ তার সাথে লড়বার জন্য ময়দানে নামছে না। এ অবস্থা দেখে তার আত্মাভিমান জেগে উঠল। তিনি তালূতের কাছে অনুমতি চাইলেন যে, জালূতের সাথে লড়বার জন্য তিনি ময়দানে যেতে চান। তাঁর বয়সের স্বল্পতা দেখে প্রথম দিকে তালূত ও অন্যান্যদের মনে দ্বিধা লাগছিল। শেষ পর্যন্ত তার পীড়াপীড়ির কারণে অনুমতি লাভ হল। তিনি জালূতের সামনে গিয়ে আল্লাহর নাম নিলেন এবং একটা পাথর তুলে তার কপাল বরাবর নিক্ষেপ করলেন। পাথরটি তার মাথার ভেতর ঢুকে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তারপর দাঊদ আলাইহিস সালাম তার কাছে গিয়ে তার তরবারি দ্বারাই তার শিরোেদ করলেন (১ সামুয়েল, পরিচ্ছেদ ১৭)। এ পর্যন্ত বাইবেলে ও কুরআন মাজীদের বর্ণনায় কোনও দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু এরপর বাইবেলে বলা হয়েছে, তালুত (বা মাউল) হযরত দাঊদ আলাইহিস সালামের জনপ্রিয়তার কারণে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে বাইবেলে তার সম্পর্কে নানা রকম অবিশ্বাস্য কিচ্ছা-কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। খুব সম্ভব, এসব বনী ইসরাঈলের যে অংশ শুরু থেকেই তালূতের বিরোধী ছিল, তাদের অপপ্রচার। কুরআন মাজীদ যে ভাষায় তালূতের প্রশংসা করেছে, তাতে হিংসা-বিদ্বেষের মত ব্যাধি তার মধ্যে থাকার কথা নয়। যা হোক, জালূত নিধনের কৃতিত্ব প্রদর্শন করার কারণে হযরত দাঊদ আলাইহিস সালাম এমন জনপ্রিয়তা লাভ করলেন যে, পরবর্তীতে তিনি বনী ইসরাঈলের বাদশাহীও লাভ করেন। তদুপরি আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুওয়াতের মর্যাদায়ও ভূষিত করেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যার সত্তায় একই সঙ্গে নবুওয়াত ও বাদশাহী উভয়ের সম্মিলন ঘটে।
২৫২

تِلۡکَ اٰیٰتُ اللّٰہِ نَتۡلُوۡہَا عَلَیۡکَ بِالۡحَقِّ ؕ وَاِنَّکَ لَمِنَ الۡمُرۡسَلِیۡنَ ٢٥٢

তিলকা আ-য়া-তুল্লা-হি নাতলূহা-‘আলাইকা বিলহাক্কিওয়া ইন্নাকা লামিনাল মুরছালীন।

এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার সামনে যথাযথভাবে পড়ে শোনাচ্ছি এবং নিশ্চয়ই আপনি যাদেরকে রাসূল করে পাঠানো হয়েছে তাদের অন্তর্ভুক্ত। ১৮৮

তাফসীরঃ

১৮৮. এ ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তাআলা এটাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের একটি নিদর্শন সাব্যস্ত করেন। অর্থাৎ তাঁর মুবারক মুখে এসব আয়াতের উচ্চারণ তার রাসূল হওয়ারই প্রমাণ বহন করে। কেননা, এসব ঘটনা জানার জন্য ওহী ছাড়া তাঁর অন্য কোনও মাধ্যম ছিল না। ‘যথাযথভাবে’ শব্দটি ব্যবহার করে সম্ভবত ইশারা করা উদ্দেশ্য যে, কিতাবীগণ এসব ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে যে বাড়াবাড়ি করেছে ও মনগড়া কাহিনী প্রচার করে দিয়েছে, কুরআন মাজীদ তা হতে মুক্ত থেকে কেবল সঠিক বিষয়ই বর্ণনা করে থাকে।
২৫৩

تِلۡکَ الرُّسُلُ فَضَّلۡنَا بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ۘ  مِنۡہُمۡ مَّنۡ کَلَّمَ اللّٰہُ وَرَفَعَ بَعۡضَہُمۡ دَرَجٰتٍ ؕ  وَاٰتَیۡنَا عِیۡسَی ابۡنَ مَرۡیَمَ الۡبَیِّنٰتِ وَاَیَّدۡنٰہُ بِرُوۡحِ الۡقُدُسِ ؕ  وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ مَا اقۡتَتَلَ الَّذِیۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِہِمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡہُمُ الۡبَیِّنٰتُ وَلٰکِنِ اخۡتَلَفُوۡا فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ کَفَرَ ؕ  وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ مَا اقۡتَتَلُوۡا ۟  وَلٰکِنَّ اللّٰہَ یَفۡعَلُ مَا یُرِیۡدُ ٪ ٢٥٣

তিলকার রুছুলুফাদ্দালনা-বা‘দাহুম ‘আলা-বা‘দ। মিনহুম মান কাল্লামাল্লা-হু ওয়া রাফা‘আ বা‘দাহুম দারাজা-তিওঁ ওয়া আ-তাইনা-‘ঈছাবনা মারইয়ামাল বাইয়িনা-তি ওয়া আই ইয়াদনা-হু বিরূহিল কুদুছি ওয়ালাও শাআল্লা-হু মাকতাতালাল্লাযীনা মিম বা‘দিহিম মিম বা‘দি মা-জাআতহুমুল বাইয়িনা-তুওয়ালা-কিনিখ তালাফূ ফামিনহুম মান আমানা ওয়া মিনহুম মান কাফারা ওয়ালাও শাআল্লা-হু মাকতাতালূ ওয়ালা-কিন্নাল্লাহা ইয়াফ‘আলুমা-ইউরীদ।

এই যে রাসূলগণ, (যাদেরকে আমি মানুষের ইসলাহের জন্য পাঠিয়েছি) তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাদের মধ্যে কেউ এমন আছে, যার সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে তিনি বহু উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। ১৮৯ আর আমি মারয়ামের পুত্র ঈসাকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী দিয়েছি ও রূহুল-কুদসের মাধ্যমে তার সাহায্য করেছি। ১৯০ আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তাদের পরবর্তীকালের মানুষ তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী এসে যাওয়ার পর আত্মকলহে লিপ্ত হত না। কিন্তু তারা মতবিরোধে লিপ্ত হল। তাদের মধ্যে কিছু তো এমন, যারা ঈমান এনেছে এবং কিছু এমন, যারা কুফর অবলম্বন করেছে। আল্লাহ চাইলে তারা আত্মকলহে লিপ্ত হত না। কিন্তু আল্লাহ সেটাই করেন যা তিনি চান। ১৯১

তাফসীরঃ

১৮৯. অর্থাৎ অল্প-বিস্তর ফযীলত তো বহু নবীরই একের উপর অন্যের অর্জিত রয়েছে, কিন্তু অন্যান্য নবীর উপর কোনও কোনও নবীর অনেক বেশি ফযীলত রয়েছে। এর দ্বারা সূক্ষ্মভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
২৫৪

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡفِقُوۡا مِمَّا رَزَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ یَوۡمٌ لَّا بَیۡعٌ فِیۡہِ وَلَا خُلَّۃٌ وَّلَا شَفَاعَۃٌ ؕ وَالۡکٰفِرُوۡنَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ ٢٥٤

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ আনফিকূমিম্মা-রাঝাকনা-কুম মিন কাবলি আইঁ ইয়া’তিইয়া ইয়াওমুল্লা-বাই‘উন ফীহি ওয়ালা-খুল্লাতুওঁ ওয়ালা-শাফা-‘আতুওঁ ওয়াল কা-ফিরূনা হুমুজ্জা-লিমূন।

হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে সেই দিন আসার আগেই (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর, যেদিন কোনও বেচাকেনা থাকবে না, কোনও বন্ধুত্ব (কাজে আসবে) না এবং কোনও সুপারিশও না। ১৯২ আর যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারাই জালিম।

তাফসীরঃ

১৯২. এর দ্বারা কিয়ামতের দিনকে বোঝানো হয়েছে।
২৫৫

اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ۬ۚ لَا تَاۡخُذُہٗ سِنَۃٌ وَّلَا نَوۡمٌ ؕ لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَہٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِہٖ ؕ یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡہِمۡ وَمَا خَلۡفَہُمۡ ۚ وَلَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِہٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ۚ وَسِعَ کُرۡسِیُّہُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ ۚ وَلَا یَـُٔوۡدُہٗ حِفۡظُہُمَا ۚ وَہُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ ٢٥٥

আল্লা-হু লাইলা-হা ইল্লা-হুওয়া আল হাইয়ুল কাইয়ূমু লা-তা’খুযুহূ ছিনাতুওঁ ওয়ালা-নাওমুন লাহূ মা-ফিছ ছামা-ওয়া-তি ওয়ামা-ফিল আরদি মান যাল্লাযী ইয়াশফা‘উ ‘ইনদাহূইল্লা-বিইযনিহী ইয়া‘লামুমা-বাইনা আইদীহিম ওয়ামা-খালফাহুম ওয়ালা-ইউহ ীতূনা বিশাইইম মিন ‘ইলমিহীইল্লা-বিমা-শাআ ওয়াছি‘আ কুরছিইয়ুহুছ ছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ওয়ালা-ইয়াঊদুহু হিফজু হুমা-ওয়া হুওয়াল ‘আলিইয়ূল ‘আজীম।

আল্লাহ তিনি, যিনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই, যিনি চিরঞ্জীব, (সমগ্র সৃষ্টির) নিয়ন্ত্রক, যাঁর কখনও তন্দ্রা পায় না এবং নিদ্রাও নয়, আকাশমণ্ডলে যা-কিছু আছে (তাও) এবং পৃথিবীতে যা-কিছু আছে (তাও) সব তাঁরই। কে আছে, যে তাঁর সমীপে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে? তিনি সকল বান্দার পূর্ব-পশ্চাৎ সকল অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত। তারা তাঁর জ্ঞানের কোনও বিষয় নিজ আয়ত্তে নিতে পারে না কেবল সেই বিষয় ছাড়া, যা তিনি নিজে ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসী আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। আর এ দু’টোর তত্ত্বাবধানে তাঁর বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না এবং তিনি অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও মহিমাময়। ১৯৩

তাফসীরঃ

১৯৩. এ আয়াতকে আয়াতুল কুরসী বলা হয়। এতে আল্লাহ তাআলার তাওহীদ এবং তার মহিমান্বিত কয়েকটি গুণের বর্ণনা আছে। এর দ্বারা মহাবিশ্বে তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, একচ্ছত্র প্রভুত্ব ও সর্বব্যাপী জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা লাভ হয়। এর দাবি হল, মানুষ কেবল তাঁরই প্রতি চরম ও নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করবে এবং বিনাবাক্যে তার যাবতীয় বিধান শিরোধার্য করবে আর বিশ্বাস রাখবে, তাঁর বিধানাবলীর মধ্যেই মানুষের সত্যিকার ও সার্বিক কল্যাণ নিহিত। এ আয়াতটি অতি মর্যাদাপূর্ণ। হযরত উবাঈ ইবনে কা‘ব (রাযি.) বর্ণিত একটি হাদীছ দ্বারা জানা যায়, এটি কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম আয়াত। বিভিন্ন হাদীছে আয়াতটির বহু ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। -অনুবাদক
২৫৬

لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ۟ۙ قَدۡ تَّبَیَّنَ الرُّشۡدُ مِنَ الۡغَیِّ ۚ فَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِالطَّاغُوۡتِ وَیُؤۡمِنۡۢ بِاللّٰہِ فَقَدِ اسۡتَمۡسَکَ بِالۡعُرۡوَۃِ الۡوُثۡقٰی ٭ لَا انۡفِصَامَ لَہَا ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ٢٥٦

লাইকরা-হা ফিদ্দীনি কাততাবাইইয়ানার রুশদু মিনাল গাইয়ি ফামাইঁ ইয়াকফুর বিত্তা-গূতি ওয়া ইউ’মিমবিল্লা-হি ফাকাদিছ তামছাকা বিল‘উরওয়াতিল উছকা লানফিসা-মা লাহা-ওয়াল্লা-হু ছামী‘উন ‘আলীম।

দীনের বিষয়ে কোনও জবরদস্তি নেই। হিদায়াতের পথ গোমরাহী থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। এর পর যে ব্যক্তি তাগুতকে ১৯৪ অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, সে এক মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরল, যা ভেঙ্গে যাওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই। আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও সবকিছু জানেন।

তাফসীরঃ

১৯৪. ‘তাগুত’-এর আভিধানিক অর্থ সীমালঙ্ঘনকারী। মুশরিকদের দেব-দেবী ও প্রতিমাকে এবং আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত ও বিভ্রান্তকারী সবকিছুকেই তাগুত বলে। -অনুবাদক
২৫৭

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَوۡلِیٰٓـُٔہُمُ الطَّاغُوۡتُ ۙ  یُخۡرِجُوۡنَہُمۡ مِّنَ النُّوۡرِ اِلَی الظُّلُمٰتِ ؕ  اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٪ ٢٥٧

আল্লা-হু ওয়ালিইয়ূল্লাযীনা আ-মানূ ইউখরিজুহুম মিনাজ্জু লুমা-তি ইলান নূরি ওয়াল্লাযীনা কাফারুআওলিয়াউহুমুত্তা-গুতু ইউখরিজূনাহুম মিনান নূরি ইলাজ্জুলুমা-তি উলাইকা আসহা-বুন্না-রি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।

আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন। আর যারা কুফর অবলম্বন করেছে তাদের অভিভাবক শয়তান, যারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যায়। তারা সকলে অগ্নিবাসী। তারা সর্বদা তাতেই থাকবে।
২৫৮

اَلَمۡ تَرَ اِلَی الَّذِیۡ حَآجَّ اِبۡرٰہٖمَ فِیۡ رَبِّہٖۤ اَنۡ اٰتٰىہُ اللّٰہُ الۡمُلۡکَ ۘ  اِذۡ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ رَبِّیَ الَّذِیۡ یُحۡیٖ وَیُمِیۡتُ ۙ  قَالَ اَنَا اُحۡیٖ وَاُمِیۡتُ ؕ  قَالَ اِبۡرٰہٖمُ فَاِنَّ اللّٰہَ یَاۡتِیۡ بِالشَّمۡسِ مِنَ الۡمَشۡرِقِ فَاۡتِ بِہَا مِنَ الۡمَغۡرِبِ فَبُہِتَ الَّذِیۡ کَفَرَ ؕ  وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ۚ ٢٥٨

আলাম তারা ইলাল্লাযী হাজ্জা ইবরা-হীমা ফী রাব্বিহীআন আ-তা-হুল্লা-হুল মুলক । ইযকা-লা ইবরা-হীমু রাব্বিইয়াল্লাযী ইউহয়ী ওয়া ইউমীতু কা-লা আনা উহঈ ওয়াউমীতু কা-লা ইবরা-হীমু ফাইন্নাল্লা-হা ইয়া’তী বিশশামছি মিনাল মাশরিকি ফা’তি বিহা- মিনাল মাগরিবি ফাবুহিতাল্লাযী কাফারা ওয়াল্লা-হু লা ইয়াহদিল কাওমাজ্জা-লিমীন।

তুমি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা চিন্তা করেছ, যাকে আল্লাহ রাজত্ব দান করার কারণে সে নিজ প্রতিপালকের (অস্তিত্ব) সম্পর্কে ইবরাহীমের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়? যখন ইবরাহীম বলল, আমার প্রতিপালক তিনিই, যিনি জীবনও দান করেন এবং মৃত্যুও! তখন সে বলতে লাগল, আমিও জীবন দেই এবং মৃত্যু ১৯৫ ঘটাই! ইবরাহীম বলল, আচ্ছা! তা আল্লাহ তো সূর্যকে পূর্ব থেকে উদিত করেন, তুমি তা পশ্চিম থেকে উদিত কর তো! এ কথায় সে কাফির নিরুত্তর হয়ে গেল। আর আল্লাহ (এরূপ) জালিমদেরকে হিদায়াত করেন না।

তাফসীরঃ

১৯৫. বাবেলের বাদশাহ নমরূদের কথা বলা হচ্ছে। সে নিজেকে খোদা বলে দাবী করত। তার দাবী ‘আমি জীবন ও মৃত্যু দান করি’-এর অর্থ ছিল, আমি বাদশাহ হওয়ার কারণে যাকে ইচ্ছা করি তার প্রাণনাশ করতে পারি এবং যাকে ইচ্ছা করি মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা করে দেই ও তাকে মুক্তি দান করি। আর এভাবে আমি তার জীবন দান করি। বলাবাহুল্য, তার এ জবাব মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। কেননা আলোচনা জীবন ও মৃত্যুর উপকরণ সম্পর্কে নয়, বরং তার সৃষ্টি সম্পর্কে হচ্ছিল। কিন্তু হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দেখলেন, সে মৃত্যু ও জীবনের সৃষ্টি কাকে বলে সেটাই বুঝতে পারছে না অথবা সে কূটতর্কে লিপ্ত হয়েছে। অগত্যা তিনি এমন একটা কথা বললেন, যার কোনও উত্তর নমরূদের কাছে ছিল না। কিন্তু লা জওয়াব হয়ে যে সত্য কবুল করে নেবে তা নয়; বরং উল্টো সে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে প্রথমে বন্দী করল, তারপর তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিল, যা সূরা আম্বিয়া (২১ : ৬৮-৭১), সূরা আনকাবূত (২৯ : ২৪) ও সূরা সাফফাত (৩৭ : ৯৭)- এ বর্ণিত হয়েছে।
২৫৯

اَوۡ کَالَّذِیۡ مَرَّ عَلٰی قَرۡیَۃٍ وَّہِیَ خَاوِیَۃٌ عَلٰی عُرُوۡشِہَا ۚ قَالَ اَنّٰی یُحۡیٖ ہٰذِہِ اللّٰہُ بَعۡدَ مَوۡتِہَا ۚ فَاَمَاتَہُ اللّٰہُ مِائَۃَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَہٗ ؕ قَالَ کَمۡ لَبِثۡتَ ؕ قَالَ لَبِثۡتُ یَوۡمًا اَوۡ بَعۡضَ یَوۡمٍ ؕ قَالَ بَلۡ لَّبِثۡتَ مِائَۃَ عَامٍ فَانۡظُرۡ اِلٰی طَعَامِکَ وَشَرَابِکَ لَمۡ یَتَسَنَّہۡ ۚ وَانۡظُرۡ اِلٰی حِمَارِکَ وَلِنَجۡعَلَکَ اٰیَۃً لِّلنَّاسِ وَانۡظُرۡ اِلَی الۡعِظَامِ کَیۡفَ نُنۡشِزُہَا ثُمَّ نَکۡسُوۡہَا لَحۡمًا ؕ فَلَمَّا تَبَیَّنَ لَہٗ ۙ قَالَ اَعۡلَمُ اَنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ٢٥٩

আও কাল্লাযী মাররা ‘আলা-কারইয়াতিওঁ ওয়াহিয়া খা-বিয়াতুন ‘আলা-‘উরুশিহা-কা-লা আন্না-ইউহয়ী হা-যিহিল্লা-হু বা‘দা মাওতিহা-ফাআমাতাহুল্লা-হু মিআতা ‘আমিন ছু ম্মা বা‘আছাহু কা-লা কাম লাবিছতা কা-লা লাবিছতুইয়াওমান আও বা‘দা ইয়াওমিন কা-লা ‘বাল্লাবিছতা মিআতা ‘আ-মিন ফানজু র ইলা-তা‘আ-মিকা ওয়াশারা-বিকা লাম ইয়াতাছান্নাহু ওয়ানজু র ইলা-হিমা-রিকা ওয়া লিনাজ‘আলাকা আয়াতাল লিন্না-ছি ওয়ানজু র ইলাল ‘ইজা-মি কাইফা নুনশিঝুহা- ছু ম্মা নাকছূহা-লাহমান ফালাম্মা-তাবাইয়ানা লাহু কালা আ‘লামুআন্নাল্লা-হা ‘আলা-কুল্লি শাইইন কাদীর।

অথবা (তুমি) সেই রকম ব্যক্তি (-এর ঘটনা) সম্পর্কে (চিন্তা করেছ), যে একটি বসতির উপর দিয়ে এমন এক সময় গমন করছিল, যখন তা ছাদ উল্টে (থুবড়ে) পড়ে রয়েছিল। ১৯৬ সে বলল, আল্লাহ এ বসতিকে এর মৃত্যুর পর কিভাবে জীবিত করবেন? অনন্তর আল্লাহ তাকে একশ’ বছরের জন্য মৃত্যু দান করলেন এবং তারপর তাকে জীবিত করলেন। (অতঃপর) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কত কাল যাবৎ (এ অবস্থায়) থেকেছ? সে বলল, এক দিন বা এক দিনের কিছু অংশ! আল্লাহ বললেন, না, বরং তুমি (এভাবে) একশ’ বছর থেকেছ। এবার নিজ পানাহার সামগ্রীর প্রতি লক্ষ্য করে দেখ তা একটুও পচেনি। আবার (অন্যদিকে) নিজ গাধাটিকে দেখ, (পচে গলে তার কী অবস্থা হয়েছে)। (আমি এটা করেছি) এজন্য যে, আমি তোমাকে মানুষের জন্য (নিজ কুদরতের) একটি নিদর্শন বানাতে চাই এবং (এবার নিজ গাধার) অস্থিসমূহ দেখ, আমি কিভাবে সেগুলোকে উত্থিত করি এবং তাতে গোশতের পোশাক পরাই। সুতরাং যখন সত্য তার সামনে সুস্পষ্ট হয়ে গেল, তখন সে বলে উঠল, আমার বিশ্বাস আছে আল্লাহ সব বিষয়ে ক্ষমতা রাখেন।

তাফসীরঃ

১৯৬. ২৫৯ ও ২৬০নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন দু’টি ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যাতে তিনি তাঁর দু’জন খাস বান্দাকে দুনিয়াতেই মৃতকে জীবিত করার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করিয়েছেন। প্রথম ঘটনায় একটি জনবসতির কথা বলা হয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তার সমস্ত বাসিন্দা মারা গিয়েছিল এবং ঘর-বাড়ি ছাদসহ মাটিতে মিশে গিয়েছিল। সেখান দিয়ে এক ব্যক্তি পথ চলছিল। বসতির বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে সে মনে মনে চিন্তা করল, আল্লাহ তাআলা এই গোটা বসতিকে কিভাবে জীবিত করবেন! বস্তুত তার এ চিন্তাটি কোনও রকম সন্দেহপ্রসূত ছিল না, বরং এটা ছিল তার বিস্ময়ের প্রকাশ। আল্লাহ তাআলা তাকে যেভাবে নিজ ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করিয়েছিলেন, তা আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই ব্যক্তি কে ছিলেন? এই জনবসতিটি কোথায় ছিল? কুরআন মাজীদ এ বিষয়ে কিছু বলেনি এবং এমন কোনও নির্ভরযোগ্য রিওয়ায়াতও নেই, যা দ্বারা নিশ্চিতভাবে এসব বিষয় নিরূপণ করা যাবে। কেউ কেউ বলেছেন, এ জনপদটি ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস এবং এটা সেই সময়ের ঘটনা, যখন বুখত নাস্সার হামলা চালিয়ে গোটা জনপদটিকে ধ্বংস করে ফেলেছিল। আর এই ব্যক্তি ছিলেন হযরত উযায়র আলাইহিস সালাম কিংবা হযরত আরমিয়া আলাইহিস সালাম। কিন্তু এটাই যে সঠিক তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অবশ্য এটা অনুসন্ধান করারও কোনও প্রয়োজন নেই। এর অনুসন্ধানে পড়া ছাড়াও কুরআন মাজীদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। তবে এই ব্যক্তি যে একজন নবী ছিলেন তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই জানা যায়। কেননা প্রথমত এ আয়াতে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে কথোপকথন করেছেন। তাছাড়া এ জাতীয় ঘটনা নবীদের সাথেই ঘটে থাকে। সামনের ১৯৭নং টীকা দেখুন।
২৬০

وَاِذۡ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ رَبِّ اَرِنِیۡ کَیۡفَ تُحۡیِ الۡمَوۡتٰی ؕ  قَالَ اَوَلَمۡ تُؤۡمِنۡ ؕ  قَالَ بَلٰی وَلٰکِنۡ لِّیَطۡمَئِنَّ قَلۡبِیۡ ؕ  قَالَ فَخُذۡ اَرۡبَعَۃً مِّنَ الطَّیۡرِ فَصُرۡہُنَّ اِلَیۡکَ ثُمَّ اجۡعَلۡ عَلٰی کُلِّ جَبَلٍ مِّنۡہُنَّ جُزۡءًا ثُمَّ ادۡعُہُنَّ یَاۡتِیۡنَکَ سَعۡیًا ؕ  وَاعۡلَمۡ اَنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ٪ ٢٦۰

ওয়া ইযকা-লা ইবরা-হীমু রাব্বি আরিনী কাইফা তুহয়িলমাওতা-কা-লা আওয়ালাম তু’মিন কা-লা বালা- ওয়ালা-কিল লিইয়াতমাইন্না কালবী কা-লা ফাখুয আরবা‘আতাম মিনাত্তাইরি ফাসুরহুন্না ইলাইকা ছুম্মাজ‘আল ‘আলা-কুল্লি জাবালিম মিনহুন্না জুঝআন ছুম্মাদ ‘উহুন্না ইয়া তীনাকা ছা‘ইয়াওঁ ওয়া‘লাম আন্নাল্লা-হা ‘আঝীঝূন হাকীম।

এবং (সেই সময়ের বিবরণ শোন) যখন ইবরাহীম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি মৃতকে কিভাবে জীবিত করবেন আমাকে তা দেখান। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস করছ না? বলল, বিশ্বাস কেন করব না? কিন্তু (এ আগ্রহ প্রকাশ করেছি এজন্য যে,) যাতে আমার অন্তর পরিপূর্ণ প্রশান্তি লাভ করে। ১৯৭ আল্লাহ বললেন, আচ্ছা, চারটি পাখি ধর এবং সেগুলোকে তোমার পোষ মানিয়ে নাও। তারপর (সেগুলোকে যবাহ করে) তার একেক অংশ একেক পাহাড়ে রেখে দাও। তারপর তাদেরকে ডাক দাও। সবগুলো তোমার কাছে ছুটে চলে আসবে। ১৯৮ আর জেনে রেখ, আল্লাহ তাআলা মহাক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়।

তাফসীরঃ

১৯৭. এই প্রশ্নোত্তরের দ্বারা আল্লাহ তাআলা এ কথা পরিষ্কার করে দিলেন যে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এ ফরমায়েশ কোনও সন্দেহের কারণে ছিল না। আল্লাহ তাআলার অসীম শক্তির উপর তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু চোখে দেখার বিষয়টিই অন্য কিছু হয়ে থাকে। তাতে যে কেবল অধিকতর প্রশান্তি লাভ হয় তাই নয়; তারপর মানুষ অন্যদেরকে বলতে পারে, আমি যা বলছি দলীল-প্রমাণ দ্বারা সে সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল হওয়া ছাড়াও তা নিজ চোখে দেখে বলছি।
২৬১

مَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ کَمَثَلِ حَبَّۃٍ اَنۡۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِیۡ کُلِّ سُنۡۢبُلَۃٍ مِّائَۃُ حَبَّۃٍ ؕ وَاللّٰہُ یُضٰعِفُ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ٢٦١

মাছালুল্লাযীনা ইউনফিকূনা আমওয়া-লাহুম ফী ছাবীলিল্লা-হি কামাছালি হাব্বাতিন আমবাতাত ছাব‘আ ছানা-বিলা ফী কুল্লি ছুমবুলাতিম মিআতুহাব্বাতিওঁ ওয়াল্লা-হু ইউদা‘ইফু লিামইঁ ইয়াশাূউ ওয়াল্লা-হু ওয়া-ছি‘উন ‘আলীম।

যারা আল্লাহর পথে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত এ রকম যেমন একটি শস্য দানা সাতটি শীষ উদগত করে (এবং) প্রতিটি শীষে একশ’ দানা জন্মায়। ১৯৯ আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন (সওয়াবে) কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় (এবং) সর্বজ্ঞ।

তাফসীরঃ

১৯৯. অর্থাৎ আল্লাহর পথে খরচ করলে সাতশ’ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা যাকে চান তাকে আরও অনেক বেশি দেন। প্রকাশ থাকে যে, কুরআন মাজীদে আল্লাহর পথে ব্যয় করার কথা বারবার বলা হয়েছে। এর দ্বারা এমন যে-কোন অর্থব্যয়কে বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য ব্যয় করা হয়। যাকাত, সাদাকা ও দান-খয়রাত সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
২৬২

اَلَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ثُمَّ لَا یُتۡبِعُوۡنَ مَاۤ اَنۡفَقُوۡا مَنًّا وَّلَاۤ اَذًی ۙ لَّہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ٢٦٢

আল্লাযীনা ইউনফিকূনা আমওয়া-লাহুম ফী ছাবীলিল্লা-হি ছুম্মা লা-ইউতবি‘ঊনা মাআনফাকূমান্নাওঁ ওয়ালাআযাল লাহুম আজরুহুম ‘ইনদা রাব্বিহিম ওয়ালা-খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালা-হুম ইয়াহঝানুন।

যারা নিজ সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, আর ব্যয় করার পর খোঁটা দেয় না এবং কোনরূপ কষ্টও দেয় না, তারা নিজ প্রতিপালকের কাছে তাদের সওয়াব পাবে। তাদের কোনও ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। ২০০

তাফসীরঃ

২০০. অর্থাৎ সওয়াব কম হওয়ার কোনও ভয় থাকবে না এবং অপরিমিত সওয়াব প্রত্যক্ষ করার পর পার্থিব বিত্ত-বৈভবের জন্য কোনও দুঃখও তারা বোধ করবে না। -অনুবাদক
২৬৩

قَوۡلٌ مَّعۡرُوۡفٌ وَّمَغۡفِرَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ صَدَقَۃٍ یَّتۡبَعُہَاۤ اَذًی ؕ وَاللّٰہُ غَنِیٌّ حَلِیۡمٌ ٢٦٣

কাওলুম মা‘রূফুওঁ ওয়া মাগফিরাতুন খাইরুম মিন সাদাকাতিইঁ ইয়াতবা‘উহাআযা-ওয়াল্লা-হু গানিউয়ুন হালীম।

উত্তম কথা বলে দেওয়া ও ক্ষমা করা সেই সদাকা অপেক্ষা শ্রেয়, যার পর কোনও কষ্ট দেওয়া হয়। ২০১ আল্লাহ অতি বেনিয়ায, অতি সহনশীল।

তাফসীরঃ

২০১. অর্থাৎ কোনও সওয়ালকারী যদি কারও কাছে চায় এবং সে কোনও কারণে দিতে না পারে, তবে তার উচিত নম্র ভাষায় তার কাছে ক্ষমা চাওয়া। আর সে যদি অনুচিত পীড়াপীড়ি করে, সেজন্য তাকে ক্ষমা করা। আর এই কর্মপন্থা সেই দান অপেক্ষা বহু শ্রেয়, যে দানের পর খোটা দেওয়া হয় কিংবা অপমান করে কষ্ট দেওয়া হয়।
২৬৪

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ ٢٦٤

ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ লা-তুবতিলূ সাদাকা-তিকুম বিলমান্নি ওয়ালআযা-কাল্লাযী ইউনফিকু মা-লাহূ রিআআন্না-ছি ওয়ালা-ইউমিনুবিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ফামাছালুহূকামাছালি সাফওয়া-নিন ‘আলাইহি তুরা-বুন ফাআসা-বাহু ওয়া-বিলুন ফাতারাকাহূ সালদান লা-ইয়াকদিরূনা ‘আলা-শাইইম মিম্মা-কাছাবূ ওয়াল্লা-হু লাইয়াহদিল কাওমাল কা-ফিরীন।

হে মুমিনগণ! খোটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের সদাকাকে সেই ব্যক্তির মত নষ্ট করো না, যে নিজের সম্পদ ব্যয় করে মানুষকে দেখানোর জন্য এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে না। সুতরাং তার দৃষ্টান্ত এ রকম যেমন এক মসৃণ পাথরের উপর মাটি জমে আছে, অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ে এবং তা (সেই মাটিকে ধুয়ে নিয়ে যায় এবং) সেটিকে (পুনরায়) মসৃণ পাথর বানিয়ে দেয়। ২০২ এরূপ লোক যা উপার্জন করে, তার কিছুমাত্র তারা হস্তগত করতে পারে না। আর আল্লাহ (এরূপ) কাফিরদেরকে হিদায়াতে উপনীত করেন না।

তাফসীরঃ

২০২. বড় পাথরের উপর মাটি জমলে তার উপর কোনও জিনিস বপণ করার আশা করা যেতে পারে, কিন্তু বৃষ্টি যদি মাটিকে ধুয়ে নিয়ে যায়, তবে মসৃণ পাথর কোনও চাষাবাদের উপযুক্ত থাকে না। এভাবে দান-খয়রাত দ্বারা আখিরাতে সওয়াব পাওয়ার আশা থাকে, কিন্তু সে দান-খয়রাত যদি করা হয় মানুষকে দেখানোর ইচ্ছায় এবং তারপর খোঁটাও দেওয়া হয়, তবে তা দান-খয়রাতকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফলে সওয়াবের কোনও আশা থাকে না।
২৬৫

وَمَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمُ ابۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ اللّٰہِ وَتَثۡبِیۡتًا مِّنۡ اَنۡفُسِہِمۡ کَمَثَلِ جَنَّۃٍۭ بِرَبۡوَۃٍ اَصَابَہَا وَابِلٌ فَاٰتَتۡ اُکُلَہَا ضِعۡفَیۡنِ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یُصِبۡہَا وَابِلٌ فَطَلٌّ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ٢٦٥

ওয়া মাছালুল্লাযীনা ইউনফিকূনা আমওয়া-লাহুমুব তিগাআ মারদা-তিল্লা-হি ওয়া তাছবীতাম মিন আনফুছিহিম কামাছালি জান্নাতিম বিরাবওয়াতিন আসা-বাহা-ওয়া-বিলুন ফাআ-তাত উকুলাহা-দি‘ফাইনি ফাইল্লাম ইউসিবহা-ওয়া-বিলুন ফাতাল্লুওঁ ওয়াল্লাহু বিমা-তা‘মালূনা বাসীর।

আর যারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং নিজেদের মধ্যে পরিপক্বতা আনয়নের জন্য, ২০৩ তাদের দৃষ্টান্ত এ রকম যেমন কোনও টিলার উপর একটি বাগান রয়েছে, তার উপর প্রবল বৃষ্টিপাত হল, ফলে তা দ্বিগুণ ফল জন্মাল। যদি তাতে প্রবল বৃষ্টি নাও পড়ে, তবে হালকা বৃষ্টিও (তার জন্য যথেষ্ট)। আর তোমরা যা-কিছু কর, আল্লাহ তা অতি উত্তমরূপে দেখেন।

তাফসীরঃ

২০৩. অর্থ-সম্পদের মোহ মানুষের স্বভাবজাত। তাই তা ব্যয় করা অন্যসব ইবাদত অপেক্ষা বেশি কঠিন। এতে মনের উপর অত্যন্ত চাপ পড়ে। সে চাপকে উপেক্ষা করে আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করতে থাকলে এক পর্যায়ে মন ঈমানী চেতনার সামনে বশ্যতা স্বীকার করে। ফলে ঈমান-আমলে দৃঢ়তা ও পরিপক্কতা লাভ সহজ হয়ে ওঠে। -অনুবাদক
২৬৬

اَیَوَدُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ تَکُوۡنَ لَہٗ جَنَّۃٌ مِّنۡ نَّخِیۡلٍ وَّاَعۡنَابٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۙ  لَہٗ فِیۡہَا مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ ۙ  وَاَصَابَہُ الۡکِبَرُ وَلَہٗ ذُرِّیَّۃٌ ضُعَفَآءُ ۪ۖ  فَاَصَابَہَاۤ اِعۡصَارٌ فِیۡہِ نَارٌ فَاحۡتَرَقَتۡ ؕ  کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّکُمۡ تَتَفَکَّرُوۡنَ ٪ ٢٦٦

আইয়াওয়াদ্দুআহাদুকুম আন তাকূনা লাহু জান্নাতুম মিন নাখীলিওঁ ওয়া আ‘না-বিন তাজরী মিন তাহতিহাল আনহা-রু লাহু ফীহা-মিন কুল্লিছছামারা-তি ওয়া আসা-বাহুল কিবারু ওয়ালাহু যুররিইইয়াতুন দু‘আফাউ ফাআসা-বাহা ই‘সা-রুন ফীহি না-রুন ফাহতারাকাত কাযা-লিকা ইউবাইয়িনুল্লা-হু লাকুমুল আ-য়া-তি ল‘আল্লাকুম তাতাফাক্কারূন।

তোমাদের মধ্যে কেউ কি এটা পছন্দ করবে যে, তার খেজুর ও আঙ্গুরের একটা বাগান থাকবে, যার পাদদেশ দিয়ে নদী-নালা প্রবাহিত থাকবে (এবং) তা থেকে আরও বিভিন্ন রকমের ফল তার অর্জিত হবে, অতঃপর সে বার্ধক্য-কবলিত হবে আর তার থাকবে দুর্বল সন্তান-সন্ততি, এ অবস্থায় অকস্মাৎ এক অগ্নিক্ষরা ঝড় এসে সে বাগানে আঘাত হানবে, ফলে গোটা বাগান ভস্মিভূত হয়ে যাবে? ২০৪ এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় আয়াতসমূহ পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর।

তাফসীরঃ

২০৪. দান-খয়রাত নষ্ট করার এটা দ্বিতীয় উদাহরণ। অগ্নিপূর্ণ ঝড় যেভাবে সবুজ-শ্যামল বাগানকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে ফেলে, তেমনিভাবে মানুষকে দেখানোর জন্য দান করলে বা দান করার পর খোটা দিলে কিংবা অন্য কোনওভাবে গরীব মানুষকে কষ্ট দিলে তাতে দান-খয়রাতের বিশাল সওয়াব বরবাদ হয়ে যায়।
২৬৭

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡفِقُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا کَسَبۡتُمۡ وَمِمَّاۤ اَخۡرَجۡنَا لَکُمۡ مِّنَ الۡاَرۡضِ ۪ وَلَا تَیَمَّمُوا الۡخَبِیۡثَ مِنۡہُ تُنۡفِقُوۡنَ وَلَسۡتُمۡ بِاٰخِذِیۡہِ اِلَّاۤ اَنۡ تُغۡمِضُوۡا فِیۡہِ ؕ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَنِیٌّ حَمِیۡدٌ ٢٦٧

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ আনফিকূমিন তাইয়িবা-তি মা-কাছাবতুম ওয়া মিম্মাআখরাজনা-লাকুম মিনাল আরদিওয়ালা-তাইয়াম্মামুল খাবীছা মিনহু তুনফিকূনা ওয়া লাছতুম বিআ-খিযীহি ইল্লাআন তুগমিদূ ফীহি ওয়া‘লামূআন্নাল্লা-হা গানিইয়ুন হামীদ।

হে মুমিনগণ! তোমরা যা-কিছু উপার্জন করেছ এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা-কিছু উৎপন্ন করেছি, তার উৎকৃষ্ট জিনিসসমূহ থেকে একটি অংশ (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর। আর এরূপ মন্দ জিনিস (আল্লাহর নামে) দেওয়ার নিয়ত করো না যা (অন্য কেউ তোমাদেরকে দিলে ঘৃণার কারণে) তোমরা চক্ষু বন্ধ না করে তা গ্রহণ করবে না। মনে রেখ, আল্লাহ বেনিয়ায, সর্বপ্রকার প্রশংসা তাঁরই দিকে ফেরে।
২৬৮

اَلشَّیۡطٰنُ یَعِدُکُمُ الۡفَقۡرَ وَیَاۡمُرُکُمۡ بِالۡفَحۡشَآءِ ۚ  وَاللّٰہُ یَعِدُکُمۡ مَّغۡفِرَۃً مِّنۡہُ وَفَضۡلًا ؕ  وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ ۖۙ ٢٦٨

আশশাইতা-নুইয়া‘ইদুকুমুল ফাকরা ওয়া ইয়া’মরুকুম বিলফাহশাই ওয়াল্লা-হু ইয়া‘ইদুকুম মাগফিরাতাম মিনহু ওয়া ফাদলাওঁ ওয়াল্লা-হু ওয়া-ছি‘উন ‘আলীম।

শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে অশ্লীলতার আদেশ করে, আর আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
২৬৯

یُّؤۡتِی الۡحِکۡمَۃَ مَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّؤۡتَ الۡحِکۡمَۃَ فَقَدۡ اُوۡتِیَ خَیۡرًا کَثِیۡرًا ؕ وَمَا یَذَّکَّرُ اِلَّاۤ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ ٢٦٩

ইউ’তিল হিকমাতা মাইঁ ইয়াশাউ ওয়া মাইঁ ইউ’তাল হিকমাতা ফাকাদ ঊতিয়া খাইরান কাছীরাওঁ ওয়ামা-ইয়াযযাক্কারু ইল্লাউলুল আলবা-ব।

তিনি যাকে চান জ্ঞানবত্তা দান করেন, আর যাকে জ্ঞানবত্তা দান করা হল, তার বিপুল পরিমাণে কল্যাণ লাভ হল। উপদেশ তো কেবল তারাই গ্রহণ করে, যারা বুদ্ধির অধিকারী।
২৭০

وَمَاۤ اَنۡفَقۡتُمۡ مِّنۡ نَّفَقَۃٍ اَوۡ نَذَرۡتُمۡ مِّنۡ نَّذۡرٍ فَاِنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُہٗ ؕ وَمَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ ٢٧۰

ওয়ামাআনফাকতুম মিন নাফাকাতিন আও নাযারতুম মিন নাযরিন ফাইন্নাল্লা-হা ইয়া‘লামুহু ওয়ামা-লিজ্জা-লিমীনা মিন আনসা-র।

তোমরা যা-কিছু ব্যয় কর বা যে মানতই মান, আল্লাহ তা জানেন। আর জালিমগণ কোনও রকমের সাহায্যকারী পাবে না।
২৭১

اِنۡ تُبۡدُوا الصَّدَقٰتِ فَنِعِمَّا ہِیَ ۚ وَاِنۡ تُخۡفُوۡہَا وَتُؤۡتُوۡہَا الۡفُقَرَآءَ فَہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ؕ وَیُکَفِّرُ عَنۡکُمۡ مِّنۡ سَیِّاٰتِکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ ٢٧١

ইন তুবদুসসাদাকা-তি ফানি‘ইমমা-হিয়া ওয়া ইন তুখফূহা-ওয়া তু’তূহাল ফুকারাআ ফাহুওয়া খাইরুল্লাকুম ওয়া ইউকাফফিরু ‘আনকুম মিন ছাইয়িআ-তিকুম ওয়াল্লা-হু বিমা-তা‘মালূনা খাবীর।

তোমরা দান-সদাকা যদি প্রকাশ্যে দাও, সেও ভালো, আর যদি তা গোপনে গরীবদেরকে দান কর তবে তা তোমাদের পক্ষে কতই না শ্রেয়! এবং আল্লাহ তোমাদের মন্দকর্মসমূহের প্রায়শ্চিত্ত করে দেবেন। বস্তুত আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।
২৭২

لَیۡسَ عَلَیۡکَ ہُدٰىہُمۡ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ خَیۡرٍ فَلِاَنۡفُسِکُمۡ ؕ وَمَا تُنۡفِقُوۡنَ اِلَّا ابۡتِغَآءَ وَجۡہِ اللّٰہِ ؕ وَمَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ خَیۡرٍ یُّوَفَّ اِلَیۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ ٢٧٢

লাইছা ‘আলাইকা হুদা-হুম ওয়ালা-কিন্নাল্লা-হা ইয়াহদী মাইঁ ইয়াশাূউ ওয়ামা-তুনফিকূ মিন খাইরিন ফালিআনফুছিকুম ওয়ামা-তুনফিকূনা ইল্লাবতিগাআ ওয়াজহিল্লা-হি ওয়ামা-তুনফিকূমিন খাইরিয়ঁ ইউওয়াফফা ইলাইকুম ওয়া আনতুম লা-তুজলামূন।

(হে নবী!) তাদেরকে (কাফিরদেরকে) সঠিক পথে আনয়ন করা আপনার দায়িত্ব নয়। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান সঠিক পথে আনয়ন করেন। ২০৫ তোমরা যে সম্পদই ব্যয় কর তা তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণার্থে হয়ে থাকে, আর তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্যে ব্যয় কর না। আর তোমরা যে সম্পদই ব্যয় করবে, তোমাদেরকে তা পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না।

তাফসীরঃ

২০৫. কোনও কোনও আনসারী সাহাবীর কিছু গরীব আত্মীয়-স্বজন ছিল, কিন্তু তারা কাফির ছিল বলে তারা তাদের সাহায্য করতেন না। তারা অপেক্ষায় ছিলেন, কবে তারা ইসলাম গ্রহণ করবে আর তখন তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। কোনও কোনও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, খোদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তাদেরকে এরূপ পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাযিল হয় (রুহুল মাআনী)। এভাবে মুসলিমদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের ইসলাম গ্রহণের দায়-দায়িত্ব তোমাদের উপর বর্তায় না। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা যদি ওই সকল গরীব কাফিরের পেছনেও অর্থ ব্যয় কর, তবুও তোমরা তার পুরোপুরি সওয়াব পাবে।
২৭৩

لِلۡفُقَرَآءِ الَّذِیۡنَ اُحۡصِرُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ لَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ ضَرۡبًا فِی الۡاَرۡضِ ۫  یَحۡسَبُہُمُ الۡجَاہِلُ اَغۡنِیَآءَ مِنَ التَّعَفُّفِ ۚ  تَعۡرِفُہُمۡ بِسِیۡمٰہُمۡ ۚ  لَا یَسۡـَٔلُوۡنَ النَّاسَ اِلۡحَافًا ؕ  وَمَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ خَیۡرٍ فَاِنَّ اللّٰہَ بِہٖ عَلِیۡمٌ ٪ ٢٧٣

লিলফুকারাইল্লাযীনা উহসিরূ ফী ছাবীলিল্লা-হি লা-ইয়াছতাতী‘ঊনা দারবান ফিল আরদিইয়াহছাবুহুমুল জা-হিলুআগনিয়াআ মিনাত্তা‘আফফুফি তা‘রিফুহুম বিছীমাহুম লা-ইয়াছআলূন্না-ছা ইলাহা-ফাওঁ ওয়ামা-তুনফিকূমিন খাইরিন ফাইন্নাল্লা-হা বিহী ‘আলীম।

(আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিশেষভাবে) উপযুক্ত সেই সকল গরীব, যারা নিজেদেরকে আল্লাহর পথে এভাবে আবদ্ধ করে রেখেছে যে, (অর্থের সন্ধানে) তারা ভূমিতে চলাফেরা করতে পারে না। তারা যেহেতু (অতি সংযমী হওয়ার কারণে কারও কাছে) সওয়াল করে না, তাই অনবগত লোকে তাদেরকে বিত্তবান মনে করে। তুমি তাদের চেহারার আলামত দ্বারা তাদেরকে (অর্থাৎ তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা) চিনতে পারবে। (কিন্তু) তারা মানুষের কাছে না-ছোড় হয়ে সওয়াল করে না। ২০৬ তোমরা যে সম্পদই ব্যয় কর, আল্লাহ তা ভালো করেই জানেন।

তাফসীরঃ

২০৬. হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে, এ আয়াত ‘আসহাবে সুফফা’ সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। ‘আসহাবে সুফফা’ বলা হয় সেই সকল সাহাবীকে, যারা দীনী ইলম শেখার জন্য নিজেদের জীবন ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে মসজিদে নববী সংলগ্ন চত্বরে পড়ে থাকতেন। দীনী ইলম শেখায় নিয়োজিত থাকার কারণে জীবিকা সংগ্রহের সুযোগ পেতেন না। তাই বলে যে তারা মানুষের কাছে হাত পাততেন তাও নয়। দারিদ্র্যের সকল কষ্ট হাসিমুখে বরণ করে নিতেন। এ আয়াত জানাচ্ছে, অর্থ সাহায্য লাভের বেশি উপযুক্ত তারাই, যারা সমগ্র উম্মতের কল্যাণ সাধনের মহতি উদ্দেশ্যে কোথাও আবদ্ধ হয়ে থাকে এবং নিদারুণ কষ্ট-ক্লেশ সত্ত্বেও কারও সামনে নিজ প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করে না। ২৬১ নং আয়াত থেকে ২৭৪ নং আয়াত পর্যন্ত দান-সদাকার ফযীলত ও তার বিধানাবলী বর্ণিত হয়েছে। সামনে এর বিপরীত বিষয় তথা সুদ সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছে। দান-সদকা মানুষের দানশীল চরিত্রের আলামত, আর সুদ হচ্ছে কৃপণতা ও বিষয়াসক্তির পরিচায়ক।
২৭৪

اَلَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ بِالَّیۡلِ وَالنَّہَارِ سِرًّا وَّعَلَانِیَۃً فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۚ  وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ؔ ٢٧٤

আল্লাযীনা ইউনফিকূনা আমওয়া-লাহুম বিল্লাইলি ওয়ান্নাহা-রি ছিররাওঁ ওয়া‘আলা-নিইয়াতান ফালাহুম আজরুহুম ‘ইনদা রাব্বিহিম ওয়ালা-খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালা-হুম ইয়াহঝানূন।

যারা নিজেদের সম্পদ দিনে ও রাতে ব্যয় করে প্রকাশ্যেও এবং গোপনেও, তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে নিজেদের সওয়াব পাবে এবং তাদের কোনও ভয় থাকবে না আর তারা কোনও দুঃখও পাবে না।
২৭৫

اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُہُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ فَمَنۡ جَآءَہٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ فَانۡتَہٰی فَلَہٗ مَا سَلَفَ ؕ وَاَمۡرُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ٢٧٥

আল্লাযীনা ইয়া’কুলুনার রিবা-লা-ইয়াকূমূনা ইল্লা-কামা-ইয়াকূমুল্লাযী ইয়াতাখাব্বাতুহুশশাইতা-নুমিনাল মাছছি যা-লিকা বিআন্নাহুম কা-লূ ইন্নামাল বাই‘উ মিছলূর রিবা-। ওয়া আহাল্লাল্লা-হুল বাই‘আ ওয়া হাররামার রিবা-ফামান জাআহু মাওইজাতুম মির রাব্বিহী ফানতাহা-ফালাহু মা-ছালাফা ওয়া আমরুহু ইলাল্লা-হি ওয়া মান ‘আ-দা ফাউলাইকা আসহা-বুন্না-রি হুম ফীহা-খা-লিদূ ন।

যারা সুদ খায়, (কিয়ামতের দিন) তারা সেই ব্যক্তির মত উঠবে, শয়তান যাকে স্পর্শ দ্বারা পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এটা এজন্য হবে যে, তারা বলেছিল, ‘ব্যবসাও তো সুদেরই মত। ২০৭ অথচ আল্লাহ বিক্রিকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে উপদেশ-বাণী এসে গেছে, সে যদি (সুদী কারবার হতে) নিবৃত্ত হয়, তবে অতীতে যা-কিছু হয়েছে তা তারই। ২০৮ আর তার (অভ্যন্তরীণ অবস্থার) ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে। আর যে ব্যক্তি পুনরায় (সে কাজই) করল, ২০৯ তো এরূপ লোক জাহান্নামী হবে। তারা তাতেই সর্বদা থাকবে।

তাফসীরঃ

২০৭. কোন ঋণের উপর যে অতিরিক্ত অর্থ ধার্য করা হয় তাকে ‘রিবা’ বা সুদ বলে। মুশরিকরা বলত, আমরা যেমন কোনও পণ্য বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করি এবং শরীয়ত তাকে হালাল করেছে, তেমনি ঋণ দিয়ে যদি মুনাফা অর্জন করি তাতে অসুবিধা কী? তাদের সে প্রশ্নের জবাব তো ছিল এই যে, ব্যবসায়-পণ্যের উদ্দেশ্যই হচ্ছে তা বিক্রি করে মুনাফা হাসিল করা। পক্ষান্তরে টাকা-পয়সা এ উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি যে, তাকে ব্যবসায়-পণ্য বানিয়ে তা দ্বারা মুনাফা অর্জন করা হবে। টাকা-পয়সা হল বিনিময়ের মাধ্যম। প্রয়োজনীয় সামগ্রী যাতে এর মাধ্যমে বেচাকেনা করা যায় সে লক্ষ্যেই এর সৃষ্টি। মুদ্রার বিনিময়ে মুদ্রার লেনদেন করে তাকে মুনাফা অর্জনের মাধ্যম বানানো হলে তাতে নানা রকম অনিষ্ট ও অনর্থ জন্ম নেয় (এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টে ‘রিবা’ সম্পর্কে আমি যে রায় লিখেছিলাম, তা দেখা যেতে পারে। ‘সুদ পর তারীখী ফয়সালা’ নামে তার উর্দূ তরজমাও প্রকাশ করা হয়েছে)। কিন্তু এস্থলে আল্লাহ তাআলা বিক্রি ও সুদের মধ্যকার পার্থক্য বর্ণনার পরিবর্তে এক শাসকসুলভ জবাব দিয়েছেন। বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা যখন বিক্রিকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন, তখন আল্লাহ তাআলার কাছে এর তাৎপর্য ও দর্শন জানতে চাওয়া এবং তা না জানা পর্যন্ত হুকুম তামিল না করার ভাব দেখানো একজন বান্দার কাজ হতে পারে না। প্রকৃত ব্যাপার হল আল্লাহ তাআলার প্রতিটি হুকুমের ভেতর নিঃসন্দেহে কোনও না কোনও হিকমত নিহিত থাকে, কিন্তু সে হিকমত যে প্রত্যেকেরই বুঝে আসবে এটা অবধারিত নয়। কাজেই আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান থাকলে প্রথমেই তাঁর হুকুম শিরোধার্য করে নেওয়া উচিত। তারপর কেউ যদি অতিরিক্ত প্রশান্তি লাভের জন্য হিকমত ও রহস্য অনুধাবনের চেষ্টা করে, তাতে কোনও দোষ নেই। দোষ হচ্ছে সেই হিকমত উপলব্ধি করার উপর হুকুম পালনকে মূলতবী রাখা, যা কোনও মুমিনের কর্মপন্থা হতে পারে না।
২৭৬

یَمۡحَقُ اللّٰہُ الرِّبٰوا وَیُرۡبِی الصَّدَقٰتِ ؕ وَاللّٰہُ لَا یُحِبُّ کُلَّ کَفَّارٍ اَثِیۡمٍ ٢٧٦

ইয়ামহাকুল্লা-হুর রিবা-ওয়া ইউরবিসসাদাকা-তি ওয়াল্লা-হু লা-ইউহিব্বু কুল্লা কাফফা-রিন আছীম।

আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদাকাকে বর্ধিত করেন। আর আল্লাহ এমন প্রতিটি লোককে অপছন্দ করেন যে নাশোকর, পাপিষ্ঠ।
২৭৭

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ لَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ٢٧٧

ইন্নাল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি ওয়া আকা-মুসসালা-তা ওয়া আ-তাউঝঝাকা-তা লাহুম আজরুহুম ‘ইনদা রাব্বিহিম ওয়ালা-খাওফুন ‘আলাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহঝানূন।

(হাঁ) যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান। তাদের কোনও ভয় থাকবে না এবং তারা কোনও দুঃখও পাবে না।
২৭৮

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَذَرُوۡا مَا بَقِیَ مِنَ الرِّبٰۤوا اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ٢٧٨

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানুত্তাকুল্লা-হা ওয়াযারু মা-বাকিয়া মিনার রিবাইন কুনতুম মু’মিনীন।

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাক, তবে সুদের যে অংশই (কারও কাছে) অবশিষ্ট রয়ে গেছে, তা ছেড়ে দাও।
২৭৯

فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا فَاۡذَنُوۡا بِحَرۡبٍ مِّنَ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ۚ وَاِنۡ تُبۡتُمۡ فَلَکُمۡ رُءُوۡسُ اَمۡوَالِکُمۡ ۚ لَا تَظۡلِمُوۡنَ وَلَا تُظۡلَمُوۡنَ ٢٧٩

ফাইল্লাম তাফ‘আলূ ফা’যানু বিহারবিম মিনাল্লা-হি ওয়ারাছূলিহী ওয়া ইন তুবতুম ফালাকুম রুঊছুআমওয়া-লিকুম লা-তাজলিমূনা ওয়ালা-তুজলামূন।

তবুও যদি তোমরা (তা) না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। আর তোমরা যদি (সুদ থেকে) তাওবা কর, তবে তোমাদের মূল পুঁজি তোমাদের প্রাপ্য। তোমরাও (কারও প্রতি) জুলুম করবে না এবং তোমাদের প্রতিও জুলুম করা হবে না।
২৮০

وَاِنۡ کَانَ ذُوۡ عُسۡرَۃٍ فَنَظِرَۃٌ اِلٰی مَیۡسَرَۃٍ ؕ وَاَنۡ تَصَدَّقُوۡا خَیۡرٌ لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ٢٨۰

ওয়া ইন কা-না যূ‘উছরাতিন ফানাযিরাতুন ইলা-মাইছারাতিওঁ ওয়া আন তাসাদ্দাকূ খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম তা‘লামূন।

এবং কোনও (দেনাদার) ব্যক্তি যদি অসচ্ছল হয়, তবে সচ্ছলতা লাভ পর্যন্ত (তাকে) অবকাশ দিতে হবে। আর যদি সদাকাই করে দাও, তবে তোমাদের পক্ষে সেটা অধিকতর শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর।
২৮১

وَاتَّقُوۡا یَوۡمًا تُرۡجَعُوۡنَ فِیۡہِ اِلَی اللّٰہِ ٭۟  ثُمَّ تُوَفّٰی کُلُّ نَفۡسٍ مَّا کَسَبَتۡ وَہُمۡ لَا یُظۡلَمُوۡنَ ٪ ٢٨١

ওয়াত্তাকূইয়াওমান তুরজা‘ঊনা ফীহি ইলাল্লা-হি ছু ম্মা তুওয়াফফা-কুল্লু নাফছিম মা-কাছাবাত ওয়াহুম লা-ইউজলামূন।

এবং তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যখন তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে যা সে অর্জন করেছে, আর তাদের প্রতি কোনও জুলুম করা হবে না।
২৮২

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا تَدَایَنۡتُمۡ بِدَیۡنٍ اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی فَاکۡتُبُوۡہُ ؕ وَلۡیَکۡتُبۡ بَّیۡنَکُمۡ کَاتِبٌۢ بِالۡعَدۡلِ ۪ وَلَا یَاۡبَ کَاتِبٌ اَنۡ یَّکۡتُبَ کَمَا عَلَّمَہُ اللّٰہُ فَلۡیَکۡتُبۡ ۚ وَلۡیُمۡلِلِ الَّذِیۡ عَلَیۡہِ الۡحَقُّ وَلۡیَتَّقِ اللّٰہَ رَبَّہٗ وَلَا یَبۡخَسۡ مِنۡہُ شَیۡئًا ؕ فَاِنۡ کَانَ الَّذِیۡ عَلَیۡہِ الۡحَقُّ سَفِیۡہًا اَوۡ ضَعِیۡفًا اَوۡ لَا یَسۡتَطِیۡعُ اَنۡ یُّمِلَّ ہُوَ فَلۡیُمۡلِلۡ وَلِیُّہٗ بِالۡعَدۡلِ ؕ وَاسۡتَشۡہِدُوۡا شَہِیۡدَیۡنِ مِنۡ رِّجَالِکُمۡ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَکُوۡنَا رَجُلَیۡنِ فَرَجُلٌ وَّامۡرَاَتٰنِ مِمَّنۡ تَرۡضَوۡنَ مِنَ الشُّہَدَآءِ اَنۡ تَضِلَّ اِحۡدٰىہُمَا فَتُذَکِّرَ اِحۡدٰىہُمَا الۡاُخۡرٰی ؕ وَلَا یَاۡبَ الشُّہَدَآءُ اِذَا مَا دُعُوۡا ؕ وَلَا تَسۡـَٔمُوۡۤا اَنۡ تَکۡتُبُوۡہُ صَغِیۡرًا اَوۡ کَبِیۡرًا اِلٰۤی اَجَلِہٖ ؕ ذٰلِکُمۡ اَقۡسَطُ عِنۡدَ اللّٰہِ وَاَقۡوَمُ لِلشَّہَادَۃِ وَاَدۡنٰۤی اَلَّا تَرۡتَابُوۡۤا اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ تِجَارَۃً حَاضِرَۃً تُدِیۡرُوۡنَہَا بَیۡنَکُمۡ فَلَیۡسَ عَلَیۡکُمۡ جُنَاحٌ اَلَّا تَکۡتُبُوۡہَا ؕ وَاَشۡہِدُوۡۤا اِذَا تَبَایَعۡتُمۡ ۪ وَلَا یُضَآرَّ کَاتِبٌ وَّلَا شَہِیۡدٌ ۬ؕ وَاِنۡ تَفۡعَلُوۡا فَاِنَّہٗ فُسُوۡقٌۢ بِکُمۡ ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ وَیُعَلِّمُکُمُ اللّٰہُ ؕ وَاللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ٢٨٢

ইয়া আইয়ূহাল্লাযীনা আ-মানূইযা-তাদা-ইয়ানতুম বিদাইনিন ইলা-আজালিম মুছাম্মান ফাকতুবূহু ওয়ালইয়াকতুব বাইনাকুম কা-তিবুম বিল‘আদলি ওয়ালা-ইয়া’বা কাতিবুন আইঁ ইয়াকতুবা কামা-‘আল্লামাহুল্লা-হু ফালইয়াকতুব ওয়াল ইউমলিলিল্লাযী ‘আলাইহিল হাক্কুওয়াল ইয়াত্তাকিল্লা-হা রাব্বাহূওয়ালা-ইয়াবখাছ মিনহু শাইআন ফাইন কা-নাল্লাযী আলাইহিল হাক্কুছাফীহান আও দা‘ঈফান আও লা-ইয়াছতাতী‘উ আই ইউমিল্লা হুওয়া ফাল ইউমলিল ওয়ালিইইয়ুহু বিল‘আদলি ওয়াছতাশহিদূ শাহীদাইনি মিররিজা-লিকুম ফাইল্লাম ইয়াকূনা রাজুলাইনি ফারাজুলুওঁ ওয়ামরাআতা-নি মিম্মান তারদাওনা মিনাশ শুহাদাই আন তাদিল্লা ইহদা -হুমা ফাতুযাককিরা ইহদা-হুমাল উখরা ওয়ালা-ইয়া’বাশশুহাদাউ ইযা-মা দু‘ঊ ওয়ালা-তাছআমূ আন তাকতুবূহু ছাগীরান আও কাবীরান ইলা আজালিহী যা-লিকুম আকছাতু‘ইনদাল্লা-হি ওয়াআকওয়ামুলিশশাহা-দাতি ওয়াআদনা আল্লা-তারতা-বূইল্লা আন তাকূনা তিজারাতান হা-দিরাতান তুদীরূনাহা-বাইনাকুম ফালাইছা ‘আলাইকুম জুনা-হুন আল্লাতাকতুবূহা-ওয়াআশহিদূ ইযা-তাবা-ইয়া‘তুম ওয়ালা-ইউদাররা কা-তিবুওঁ ওয়ালা-শাহীদুওঁ ওয়া ইন তাফ‘আলূফাইষর নযধু -হরহ ওঅষ'সকুম ওয়াত্তাকুল্লা-হা ওয়া ইউ‘আলিলমুকুমুল্লা-হু ওয়াল্লা-হু বিকুল্লি শাইইন ‘আলীম।

হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কোনও ঋণের কারবার কর, তখন তা লিখে নাও। তোমাদের মধ্যে কোনও লেখক যেন ন্যায়নিষ্ঠভাবে (তা) লিখে দেয়। যে ব্যক্তি লিখতে জানে, সে যেন লিখতে অস্বীকার না করে। আল্লাহ যখন তাকে এটা শিক্ষা দিয়েছেন, তখন তার লেখা উচিত। হক যার উপর সাব্যস্ত হচ্ছে, সে যেন (তা) লেখায়। আর সে যেন তার প্রতিপালককে ভয় করে এবং তাতে (সেই হকের মধ্যে) কিছু না কমায়। ২১০ যার উপর হক সাব্যস্ত হচ্ছে, সে যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল হয় অথবা (অন্য কোনও কারণে লেখার বিষয়) লেখাতে সক্ষম না হয়, তবে তার অভিভাবক যেন ন্যায্যভাবে (তা) লেখায়। আর নিজেদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জনকে সাক্ষী বানাবে। যদি দু’জন পুরুষ উপস্থিত না থাকে, তবে একজন পুরুষ ও দু’জন স্ত্রীলোক সেই সকল সাক্ষীদের মধ্য হতে, যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর, যাতে স্ত্রীলোকদের মধ্য হতে একজন ভুলে গেলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। সাক্ষীদেরকে যখন (সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য) ডাকা হবে, তখন তারা যেন অস্বীকার না করে। যে কারবার মেয়াদের সাথে সম্পৃক্ত তা ছোট হোক বা বড়, লিখতে বিরক্ত হয়ো না। এ বিষয়টি আল্লাহর নিকট অধিকতর ইনসাফসম্মত এবং সাক্ষ্যকে প্রতিষ্ঠিত রাখার পক্ষে বেশি সহায়ক এবং তোমাদের মধ্যে যাতে (ভবিষ্যতে) সন্দেহ দেখা না দেয় তার (নিশ্চয়তা বিধানের) নিকটতর। হাঁ, তোমরা তোমাদের মধ্যে যে ব্যবসার নগদ লেনদেন কর, তবে তা না লেখালে তোমাদের কোনও অসুবিধা নেই। যখন বেচাকেনা করবে তখন সাক্ষী রাখবে। যে লেখবে তাকে কোনও কষ্ট দেওয়া যাবে না এবং সাক্ষীকেও নয়। তোমরা যদি (তা) কর তবে তোমাদের পক্ষ হতে তা অবাধ্যতা হবে। তোমরা অন্তরে আল্লাহর ভয় রেখ। আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দান করেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।

তাফসীরঃ

২১০. এটা কুরআন মাজীদের সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ আয়াত। সুদ নিষিদ্ধ করার পর এ আয়াতে বাকী লেনদেনের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সমস্ত কারবার যাতে সুষ্ঠুভাবে ও স্বচ্ছতার সাথে হয়, এটাই তার উদ্দেশ্য। কারও কাছে যদি কারও প্রাপ্য বা দেনা সাব্যস্ত হয়, তবে তার এমনভাবে তা লেখা বা লেখানো উচিত, যাতে কারবারের ধরন পরিষ্কার হয়ে যায়। সমস্ত কথা তাতে স্পষ্ট থাকা চাই এবং অন্যের হক মারার জন্য কোনও রকম কাটছাঁটের আশ্রয় না নেওয়া চাই।
২৮৩

وَاِنۡ کُنۡتُمۡ عَلٰی سَفَرٍ وَّلَمۡ تَجِدُوۡا کَاتِبًا فَرِہٰنٌ مَّقۡبُوۡضَۃٌ ؕ  فَاِنۡ اَمِنَ بَعۡضُکُمۡ بَعۡضًا فَلۡیُؤَدِّ الَّذِی اؤۡتُمِنَ اَمَانَتَہٗ وَلۡیَتَّقِ اللّٰہَ رَبَّہٗ ؕ  وَلَا تَکۡتُمُوا الشَّہَادَۃَ ؕ  وَمَنۡ یَّکۡتُمۡہَا فَاِنَّہٗۤ اٰثِمٌ قَلۡبُہٗ ؕ  وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ عَلِیۡمٌ ٪ ٢٨٣

ওয়া ইন কুনতুম ‘আলা-ছাফারিওঁ ওয়ালাম তাজিদূকা-তিবান ফারিহা-নুম মাকবূদাতুন ফাইন আমিনা বা‘দুকুম বা‘দান ফালইউআদ্দিল্লাযী’তুমিনা আমা-নাতাহু ওয়াল ইয়াত্তাকিল্লাহা রাব্বাহূ ওয়ালা-তাকতুমুশশাহা-দাতা ওয়া মাইঁ ইয়াকতুমহা-ফাইন্নাহুআছিমুন কালবুহু ওয়াল্লা-হু বিমা-তা‘মালূন ‘আলীম।

তোমরা যদি সফরে থাক এবং তখন কোনও লেখক না পাও, তবে (আদায়ের নিশ্চয়তা স্বরূপ) বন্ধক গ্রহণ করা যাবে। অবশ্য তোমরা যদি একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস রাখ, তবে যার প্রতি বিশ্বাস রাখা হয়েছে, সে যেন নিজ আমানত (যথাযথভাবে) আদায় করে দেয় এবং আল্লাহকে ভয় করে যিনি তার প্রতিপালক। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করবে না। যে তা গোপন করবে তার অন্তর পাপী। ২১১ তোমরা যে-কাজই কর না কেন, আল্লাহ সে সম্বন্ধে পূর্ণ অবগত।

তাফসীরঃ

২১১. বিশেষভাবে অন্তরকে পাপী বলার কারণ, সাক্ষ্য গোপন রাখার কাজটি মূলত অন্তরের দ্বারাই হয়। তাতে প্রকাশ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের তেমন সংশ্লিষ্টতা থাকে না। সেই সঙ্গে এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে, সাক্ষ্য গোপন করা একটি গুরুতর পাপ। এ মহাপাপ সে-ই করতে পারে, যার অন্তর পাপকবলিত হয়ে গেছে। সুতরাং এ পাপ পরিহার করার সাথে সাথে আত্মার সংশোধনের প্রতিও বিশেষ নজর দেওয়া চাই। (-অনুবাদক)
২৮৪

لِلّٰہِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَاِنۡ تُبۡدُوۡا مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ اَوۡ تُخۡفُوۡہُ یُحَاسِبۡکُمۡ بِہِ اللّٰہُ ؕ فَیَغۡفِرُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَیُعَذِّبُ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَاللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ٢٨٤

লিল্লা-হি মা ফিছ ছামা-ওয়া-তি ওয়ামা-ফিল আরদিওয়া ইন তুবদূমা-ফীআনফুছিকুম আও তুখফূহু ইউহা-ছিবকুম বিহিল্লা-হু ফাইয়াগফিরু লি মাইঁ ইয়াশাউ ওয়া ইউ‘আযযিবু মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

যা-কিছু আছে আকাশমণ্ডলে এবং যা-কিছু আছে পৃথিবীতে, সব আল্লাহরই। তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা তোমরা প্রকাশ কর বা গোপন কর, আল্লাহ তোমাদের থেকে তার হিসাব নেবেন। ২১২ অতঃপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।

তাফসীরঃ

২১২. সামনে ২৮৬ নং আয়াতের প্রথম বাক্যে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, মানুষের অন্তরে তার ইচ্ছার বাইরে যেসব ভাবনা দেখা দেয়, তাতে তার কোনও গুনাহ নেই। সুতরাং এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, মানুষ তার অন্তরে জেনে শুনে যে ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা পোষণ করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহের যে সংকল্প করে, তার হিসাব নেওয়া হবে।
২৮৫

اٰمَنَ الرَّسُوۡلُ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡہِ مِنۡ رَّبِّہٖ وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ ؕ کُلٌّ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَمَلٰٓئِکَتِہٖ وَکُتُبِہٖ وَرُسُلِہٖ ۟ لَا نُفَرِّقُ بَیۡنَ اَحَدٍ مِّنۡ رُّسُلِہٖ ۟ وَقَالُوۡا سَمِعۡنَا وَاَطَعۡنَا ٭۫ غُفۡرَانَکَ رَبَّنَا وَاِلَیۡکَ الۡمَصِیۡرُ ٢٨٥

আ-মানাররাছূলু বিমাউনঝিলা ইলাইহি মির রাব্বিহী ওয়াল মু’মিনূনা কুল্লুন আ-মানা বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহী ওয়া কুতুবিহী ওয়া রুছুলিহী লা-নুফাররিকুবাইনা আহাদিম মির রুছুলিহী ওয়া কা-লূ ছামি‘না ওয়াআতা‘না গুফরা-নাকা রাব্বানা-ওয়া ইলাইকাল মাসীর।

রাসূল (অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাতে ঈমান এনেছে, যা তাঁর উপর তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে নাযিল করা হয়েছে এবং (তাঁর সাথে) মুমিনগণও। তাঁরা সকলে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে। (তারা বলে,) আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোনও পার্থক্য করি না (যে, কারও প্রতি ঈমান আনব এবং কারও প্রতি আনব না)। এবং তাঁরা বলে, আমরা (আল্লাহ ও রাসূলের বিধানসমূহ মনোযোগ সহকারে) শুনেছি এবং তা (খুশীমনে) পালন করছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার মাগফিরাতের ভিখারী, আর আপনারই কাছে আমাদের প্রত্যাবর্তন।
২৮৬

لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا وُسۡعَہَا ؕ  لَہَا مَا کَسَبَتۡ وَعَلَیۡہَا مَا اکۡتَسَبَتۡ ؕ  رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَاۤ اِنۡ نَّسِیۡنَاۤ اَوۡ اَخۡطَاۡنَا ۚ  رَبَّنَا وَلَا تَحۡمِلۡ عَلَیۡنَاۤ اِصۡرًا کَمَا حَمَلۡتَہٗ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِنَا ۚ  رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلۡنَا مَا لَا طَاقَۃَ لَنَا بِہٖ ۚ  وَاعۡفُ عَنَّا ٝ  وَاغۡفِرۡ لَنَا ٝ  وَارۡحَمۡنَا ٝ  اَنۡتَ مَوۡلٰىنَا فَانۡصُرۡنَا عَلَی الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِیۡنَ ٪ ٢٨٦

লা-ইউকালিলফুল্লা-হু নাফছান ইল্লা-উছ‘আহা-লাহা-মা কাছাবাত ওয়া ‘আলাইহা-মাকতাছাবাত রাব্বানা-লা-তুআ-খিযনা ইন নাছীনা-আও আখতা’না-রাব্বানা ওয়ালা-তাহমিল ‘আলাইনা-ইসরান কামা-হামালতাহূ আলাল্লাযীনা মিন কাবলিনা-রাব্বানা-ওয়ালা তুহাম্মিলনা-মা-লা-তা-কাতা লানা-বিহী ওয়া‘ফু‘আন্না-ওয়াগফিরলানা-ওয়ারহামনা-আনতা মাওলা-না-ফানসুরনা-‘আলাল কাওমিল কা-ফিরীন।

আল্লাহ কারও উপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব অর্পণ করেন না। তার কল্যাণ হবে সে কাজেই যা সে স্বেচ্ছায় করে এবং তার ক্ষতিও হবে সে কাজেই, যা সে স্বেচ্ছায় করে। (হে মুসলিমগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে এই দু‘আ কর যে,) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোনও ভুল-ত্রুটি হয়ে যায় তবে সেজন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করো না, যেমন তা অর্পণ করেছিলে আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর এমন ভার চাপিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের (ত্রুটিসমূহ) মার্জনা কর, আমাদের ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য কর। ২১৩

তাফসীরঃ

২১৩. সূরা বাকারার শেষ আয়াত দু’টি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এক হাদীছে আছে, এ আয়াত দু’টি আরশের নিচের এক গুপ্তভাণ্ডার থেকে দেওয়া হয়েছে, যা অন্য কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি (বুখারী, মুসলিম)। অপর এক হাদীছে আছে, যে ব্যক্তি রাতে এ দুই আয়াত পড়ে তার জন্য এ দুটি যথেষ্ট। (বুখারী, মুসলিম) -অনুবাদক
সূরা আল বাকারা | মুসলিম বাংলা