সন্তানকে ত্যাজ্য করা এবং হেবা করে ফেরত নেওয়ার জায়েজ?
প্রশ্নঃ ১৬৯৫১০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, বাবা যদি তার সম্পত্তি থেকে কোনো সম্পত্তি তার কোনো সন্তান কে পূর্ণ ভাবে হেবা করে দেয়, অতঃপর ওই সন্তান বাবার অবাধ্য হয়, তাহলে কি সম্পত্তি বাবার কাছে ফিরে আসবে সেইম কাজ করার পরে যদি সন্তানকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেয়, তাহলে কি সম্পত্তি বাবার অধীনে ফিরে আসবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
কাউকে কোনো কিছু হেবা-দান-গিফট করার পর তার ফেরত নেওয়া যায় না। শরীয়তে এটাকে অত্যন্ত গর্হিত কাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি দান করার পর তা ফেরত নেয়, সে ওই কুকুরের মতো যে বমি করে আবার তা খায়।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। https://muslimbangla.com/hadith/2445 হানাফী ফকীহদের মতে, দান ফেরত নেওয়া ইসলামের একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ এবং এটি সবার জন্যই প্রযোজ্য।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি খেলাফতের সময় ফয়সালা দিয়েছিলেন:
"যে ব্যক্তি তার কোনো নিকটাত্মীয়কে (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন সন্তান) কোনো কিছু হেবা করে দেয়, তার জন্য তা আর ফেরত নেওয়ার অধিকার নেই।" (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, কিতাবুল হেবা) হাদিস নং ২১৭৫৮
নির্ভরযোগ্য ও গ্রহনযোগ্য মতানুসারে বাবা তার সন্তানকে কোনো সম্পত্তি পূর্ণভাবে হেবা করার পর—সন্তান অবাধ্য বা খারাপ আচরণ করলেও—যদি সম্পত্তি ইতিমধ্যে সন্তানের হস্তগত বা দখলভুক্ত হয়ে থাকে তাহলে বাবা সেই সম্পত্তি ফেরত নিতে পারেন না।
হানাফী ফিকহের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণিক কিতাব 'الهداية في شرح بداية المبتدي-তে ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগিনানী (র.) স্পষ্ট লিখেছেন:
" "وإن وهب هبة لذي رحم محرم منه فلا رجوع فيها" لقوله ﵊: "إذا كانت الهبة لذي رحم محرم منه لم يرجع فيها"؛ ولأن المقصود فيها صلة الرحم وقد حصل "وكذلك ما وهب أحد الزوجين للآخر"؛ لأن المقصود فيها الصلة كما في القرابة، وإنما ينظر إلى هذا المقصود وقت العقد، حتى لو تزوجها بعدما وهب لها فله الرجوع، ولو أبانها بعدما وهب فلا رجوع. " كتاب الهبة باب الرجوع في الهبة (المكتبة الشاملة)
অনুবাদ: "আর যদি কেউ এমন কোনো আত্মীয়কে দান করে যার সাথে তার বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ (মাহরাম), তবে সে তা আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। এর কারণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: 'যখন দান এমন আত্মীয়কে করা হয় যার সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।' তাছাড়া এর আরেকটি কারণ হলো, এই দানের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, যা দান করার মাধ্যমেই ইতোমধ্যে অর্জিত হয়ে গেছে। তদ্রূপ স্বামী-স্ত্রীর একজন অপরজনকে যা দান করে, তাও আর ফেরত নেওয়া যাবে না। কারণ আত্মীয়তার সম্পর্কের মতো এখানেও মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করা। আর এই উদ্দেশ্যটি মূলত দান বা চুক্তি সম্পাদনের সময়ের ওপর ভিত্তি করে ধর্তব্য হবে। ফলে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে কোনো কিছু দান করার পর তাকে বিয়ে করে, তবে সে উক্ত দান ফেরত নিতে পারবে (যেহেতু দানের সময় তারা স্বামী-স্ত্রী ছিল না)। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী থাকাকালীন দান করার পর যদি তাদের বিচ্ছেদ ঘটে, তবে সে তা আর ফেরত নিতে পারবে না।"(কিতাবুল হেবা, বাবুর রুজু ফিল হেবা, শামেলা ভার্সন)
ইমাম ইবনে নুজাইম আল-মিসরী (র.) البحر الرائق شرح كنز الدقائق- কিতাবে হেবা ফেরত না নেওয়ার ৭টি প্রধান প্রতিবন্ধকতা (موانع الرجوع) আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন
(قوله والقاف القرابة فلو وهب لذي رحم محرم منه لا يرجع) لحديث الحاكم مرفوعا «إذا كانت الهبة لذي رحم محرم لم يرجع فيها» وصححه وقال على شرط الشيخين ومفهوم شرطه أنها إذا كانت لغير محرم فله الرجوع
ক্বাফ' অক্ষর দ্বারা 'কারাবাত' বা আত্মীয়তা বোঝানো হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি এমন কোনো আত্মীয়কে দান করে যার সাথে তার বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ (মাহরাম), তবে সে তা আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না) এর প্রমাণ হলো ইমাম হাকিম কর্তৃক মারফূ সূত্রে বর্ণিত হাদীস—'যখন দান কোনো মাহরাম আত্মীয়কে করা হয়, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।' ইমাম হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং শর্তানুযায়ী এটি বুখারী ও মুসলিমের মানদণ্ড উত্তীর্ণ। (কিতাবুল হেবা, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ১১৭/শামেলা ভার্সন)
উপমহাদেশের হানাফী ফিকহের সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ 'ফাতাওয়া হিন্দিয়া' (الفتاوى الهندية)-তে বলা হয়েছে:
"وَمِنْهَا الْقَرَابَةُ النَّسَبِيَّةُ فِي مَحْرَمٍ فَلَا رُجُوعَ فِي الْهِبَةِ لِلْوَلَدِ وَإِنْ سَفَلَ وَلِلْآبَاءِ وَالْأُمَّهَاتِ وَإِنْ عَلَوْا... هَكَذَا فِي الْكَافِي" (কিতাবুল হেবা, অধ্যায়: ৫, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৮৫)
সম্মানিত দীনি ভাই!
পিতা তার কোনো সন্তানকে ত্যাজ্য করা বা মৃত্যুর সময় অসিয়তের মাধ্যমে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হারাম এবং কবিরা গুনাহ। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই যাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করা হয় কিংবা যাকে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অসিয়ত করা হয়, সে কোনোভাবেই তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। হাদিস শরিফে এসেছে, আনাস রাযি. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন,
مَنْ فَرَّ مِنْ مِيرَاثِ وَارِثِهِ، قَطَعَ اللَّهُ مِيرَاثَهُ مِنَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে ব্যক্তি ওয়ারিসকে মিরাস থেকে বঞ্চিত করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের মিরাস থেকে বঞ্চিত করবেন।’ (ইবনে মাজাহ ২৭০৩)
তবে যদি বাবা তার জীবদ্দশায় এবং সুস্থ থাকা অবস্থায় যে কাউকে তার সমুদয় সম্পত্তি লিখে দেয় তাহলে মৃত্যুর পর যাকে সম্পদ লিখে দেয়া হয়েছে, সে ছাড়া আর কেউ উক্ত সম্পদের হকদার হবে না। বাকি অন্যদেরকে ঠকানোর উদ্দেশ্য সমুদয় সম্পদ লিখে দিলে কাজটি প্রয়োগ হয়ে গেলেও উক্ত বাবা গোনাহগার হবে। তাফসীরে বায়যাবী (১/৭)-তে এসেছে,
والمالك هو المتصرف فى الأعيان المملوكة كيف شاء
বস্তুর মালিক বস্তুতে যেভাবে ইচ্ছে হস্তক্ষেপ করেতে পারে।
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي عَدِيٍّ عَنْ حُسَيْنٍ عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ قَالَ حَدَّثَنِي طَاوُسٌ عَنْ ابْنِ عُمَرَ وَابْنِ عَبَّاسٍ يَرْفَعَانِ الْحَدِيثَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ يُعْطِي عَطِيَّةً ثُمَّ يَرْجِعُ فِيهَا إِلَّا الْوَالِدَ فِيمَا يُعْطِي وَلَدَهُ وَمَثَلُ الَّذِي يُعْطِي عَطِيَّةً ثُمَّ يَرْجِعُ فِيهَا كَمَثَلِ الْكَلْبِ أَكَلَ حَتَّى إِذَا شَبِعَ قَاءَ ثُمَّ عَادَ فِي قَيْئِهِ
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন