আখেরাতে দুনিয়াবি মাহরাম সম্পর্কের স্বরূপ ও মর্যাদা
প্রশ্নঃ ১৬৯৩৯১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি এবং আমার দুধবোন যদি জান্নাতি হই, তবে সেখানে কি সে আমার দুধবোন থাকবে? নাকি তাকে সেখানে বিয়ে করা জায়েজ হবে (কারণ ফিকহি নির্দেশ তো শুধু পৃথিবীতে)। যেহেতু জান্নাতিরা যা চাইবে তাই পাবে। তবে কি শুধু পৃথিবীতে দুধবোন হিসেবে থাকবে! আমি তাকে জান্নাতেও দুধবোন হিসেবে পেতে চাই। এটা নিয়ে সে মনোক্ষুণ্ণ হয়।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রথমত, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
আয়াত:
وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَاتَّبَعَتۡہُمۡ ذُرِّیَّتُہُمۡ بِاِیۡمَانٍ اَلۡحَقۡنَا بِہِمۡ ذُرِّیَّتَہُمۡ وَمَاۤ اَلَتۡنٰہُمۡ مِّنۡ عَمَلِہِمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ ؕ کُلُّ امۡرِیًٴۢ بِمَا کَسَبَ رَہِیۡنٌ
অর্থ: “যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তান-সন্ততিগণ ঈমানের ক্ষেত্রে তাদের অনুগামী হয়েছে, আমি তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে তাদের সাথে মিলিয়ে দেব এবং তাদের কর্ম হতে কিছুমাত্র হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের বিনিময়ে বন্ধক রয়েছে।” (সূরা আত-তূর, আয়াত: ২১)
আয়াতের লিংক: https://muslimbangla.com/sura/52/tafsir/21
আয়াত:
جَنّٰتُ عَدۡنٍ یَّدۡخُلُوۡنَہَا وَمَنۡ صَلَحَ مِنۡ اٰبَآئِہِمۡ وَاَزۡوَاجِہِمۡ وَذُرِّیّٰتِہِمۡ وَالۡمَلٰٓئِکَۃُ یَدۡخُلُوۡنَ عَلَیۡہِمۡ مِّنۡ کُلِّ بَابٍ
অর্থ: “(অর্থাৎ) স্থায়ীভাবে অবস্থানের সেই উদ্যানসমূহ, যার ভেতর তারা নিজেরাও প্রবেশ করবে এবং তাদের বাপ-দাদাগণ, স্ত্রীগণ ও সন্তানদের মধ্যে যারা নেককার হবে, তারাও। আর (তাদের অভ্যর্থনার জন্য) ফেরেশতাগণ তাদের নিকট প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে...” (সূরা আর-রা'দ, আয়াত: ২৩)
আয়াতের লিংক: https://muslimbangla.com/sura/13/tafsir/23
এ আয়াত দুটি থেকে এতটুকু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তানগণ যদি জান্নাতে যাওয়ার উপযুক্ত হন, তবে দুনিয়াবি সম্পর্কের নিরিখেই তারা জান্নাতে একত্রিত হবেন। এখানে দুধ-সম্পর্কের কথা আলাদাভাবে বলা হয়নি ঠিকই, কিন্তু রাসূল (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে আমরা এর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাই,
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ»
অর্থ: “বংশগত সম্পর্কের কারণে যেসব নারী হারাম হয়, দুধ-সম্পর্কের কারণেও সেসব নারী হারাম হয়।” (সহীহ বুখারী: ২৬৪৫; সহীহ মুসলিম: ১৪৪৪)
অর্থাৎ, দুধবোন হওয়া কেবল পৃথিবীর কোনো প্রশাসনিক বা কাগুজে বিধান নয়; বরং এটি শরিয়ত স্বীকৃত একটি স্থায়ী মাহরাম-সম্পর্ক, যা রক্তের সম্পর্কের মতোই পবিত্র ও সম্মানজনক। রক্তের সম্পর্কগুলো যেমন জান্নাতে অটুট থাকবে, দুধ-সম্পর্কও তার পবিত্রতা নিয়ে জান্নাতে অটুট থাকবে, এমনটাই বোঝা যায়।
অপরদিকে, জান্নাতে মুমিনদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা থাকবে, সে ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে,
আয়াত:
﴿وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ﴾
অর্থ: “সেখানে তোমাদের মন যা চাইবে, তা-ই তোমাদের জন্য থাকবে এবং তোমরা যা দাবি করবে, তা-ও তোমাদের দেওয়া হবে।” (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩১)
আয়াত:
﴿لَهُمْ فِيهَا مَا يَشَاءُونَ﴾
অর্থ: “তাদের জন্য সেখানে থাকবে তারা যা চাইবে।” (সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৫)
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, দুনিয়ায় যেটি হারাম, জান্নাতে সেটি হালাল হয়ে যাবে। বরং জান্নাত এমন স্থান, যেখানে মানুষের অন্তর থেকে অশুভ, নোংরা ও স্বভাববিরুদ্ধ আকাঙ্ক্ষা দূর করে দেওয়া হবে। জান্নাতে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে না, যা মানুষের মনে কষ্ট দেয় বা মনোক্ষুণ্ণ করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“সেখানে তাদের অন্তরে কোনো গ্লানি বা ক্ষোভ থাকলে আমি তা বের করে দেব, তারা ভাই ভাই হয়ে মুখোমুখি আসনে বসবে।” (সূরা হিজর, আয়াত: ৪৭)
কুরআনে বলা হয়েছে, জান্নাতিরা যা চাইবে তা-ই পাবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জান্নাতে মানুষের মনে ফিতরাত-বিরোধী (স্বভাববিরুদ্ধ) বা অপবিত্র কোনো ইচ্ছা জাগ্রত হবে। জান্নাতে প্রবেশের আগেই আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরকে সব ধরনের পঙ্কিলতা, কদর্যতা ও রুচিহীনতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র করে দেবেন। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ যেমন দুনিয়াতে কখনোই নিজের আপন মা বা আপন বোনকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করতে পারে না, তেমনি দুধবোনের ক্ষেত্রেও এমন কোনো ইচ্ছা জান্নাতে কারো মনে উদয় হবে না। জান্নাতিদের চাওয়া-পাওয়াগুলো হবে সর্বোচ্চ পবিত্র, রুচিশীল এবং মানবীয় মর্যাদার অনুকূল।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন