মৃত্যুবার্ষিকীর খাবার খেলে অন্তর মরে যায়
প্রশ্নঃ ১৬৮৪৯০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মৃত্যুবার্ষিকীর খাবার খেলে নাকি অন্তর মরে যায় এটা কতটুকু সত্য কোরআন ও হাদিস দ্বারা জানতে চাচ্ছি
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
মৃত্যুবার্ষিকীর খাবার বা মৃত ব্যক্তির খাবার খেলে অন্তর মরে যায় (طعام الميت يميت القلب)—এটি কোনো কুরআন বা হাদিসের বক্তব্য নয়; বরং এটি অভিজ্ঞতালব্ধ একটি প্রবাদ ও আলেমদের একটি সতর্কবাণী।
তবে কুরআন, হাদিস এবং ফিকাহ শাস্ত্রের দৃষ্টিতে মৃত্যুবার্ষিকী, চল্লিশা বা কুলখানির নামে আনুষ্ঠানিক খাবারের আয়োজন করা এবং তা ভক্ষণ করার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অপছন্দনীয়তা রয়েছে।
আমাদের সমাজে অনেকেই এই কথাটিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস মনে করে বর্ণনা করেন। কিন্তু মুহাদ্দিসীনদের গবেষণা অনুযায়ী, হাদিসের কোনো কিতাবে এমন কোনো সহিহ বা জয়িফ হাদিস নেই।
সুবিখ্যাত হাদিস বিশারদ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) তাঁর ‘ফাতাওয়ায়ে আযীযিয়্যাহ’ (পৃ. ২০২)-তে স্পষ্ট লিখেছেন—এটি কোনো হাদিস নয়, বরং বুজুর্গ ও ওলামায়ে কেরামের একটি অভিজ্ঞতালব্ধ উক্তি।
বুজুর্গরা কেন বলেছেন, "অন্তর মরে যায়"?
বুজুর্গগণ এই কথাটি রূপক অর্থে আধ্যাত্মিক ক্ষতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন। কারণ:
১. বিদআতের অন্ধকার: মৃত্যুবার্ষিকী, ৩ দিন, ৭ দিন বা ৪০ দিন নির্দিষ্ট করে খাবারের আনুষ্ঠানিক ভোজ করা শরিয়তে বিদআত। আর বিদআতী ও বরকতহীন খাবার খেলে অন্তরের তাকওয়া ও ইবাদতের স্বাদ নষ্ট হয়ে অন্তর রুক্ষ (দিল মুর্দা) হয়ে যায়।
২. সদকার খাবারের অপব্যবহার: মৃত ব্যক্তির নামে কিছু খাওয়ালে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘সদকা’। আর নফল সদকার খাবারের প্রকৃত হকদার হলো সমাজের গরিব-অসহায় ও মিসকিনরা। অথচ মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় বড় ধনী ব্যক্তিরা স্রেফ মাংস-পোলাও খাওয়ার লোভে হাজির হয়। ধনীদের জন্য এমন খাবার খাওয়া অন্তরে লোভ ও অন্ধকারের সৃষ্টি করে।
মৃত্যুবার্ষিকী ও শোকের খাবারের বিষয়ে কুরআন ও হাদিস কী বলে?
ক. সাহাবায়ে কেরামের চোখে শোকের বাড়ির খাবার ছিল নিষিদ্ধ:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রিয় সাহাবী হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাজালী (রা.) বর্ণনা করেন,
«كُنَّا نَعُدُّ الِاجْتِمَاعَ إِلَى أَهْلِ الْمَيِّتِ وَصَنِيعَةَ الطَّعَامِ بَعْدَ دَفْنِهِ مِنَ النِّيَاحَةِ»
অর্থ: আমরা সাহাবায়ে কেরাম মৃত ব্যক্তির বাড়িতে লোক জমায়েত হওয়া এবং দাফনের পর তাদের পক্ষ থেকে খাবারের আয়োজন করাকে নিষিদ্ধ ‘বিলাপ’ (জাহেলি শোক প্রকাশ)-এর সমতুল্য মনে করতাম। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬১২)
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/26903
খ. সুন্নাহ কী?
মৃত ব্যক্তির পরিবার যখন শোকে কাতর, তখন উল্টো তাদের ওপর রান্নাবান্নার বোঝা না চাপিয়ে প্রতিবেশীদের দায়িত্ব তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর শাহাদাতের পর বলেছিলেন,
«اصْنَعُوا لِآلِ جَعْفَرٍ طَعَامًا؛ فَإِنَّهُ قَدْ أَتَاهُمْ أَمْرٌ يَشْغَلُهُمْ»
তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খাবারের ব্যবস্থা কর, কারণ তাদের ওপর এমন মুসিবত এসেছে যা তাদের রান্নাবান্না থেকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে। (সুনানে তিরমিযী: ৯৯৮; আবু দাউদ: ৩১৩২)
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/30635
গ. এতিমের হক নষ্ট হওয়ার কুরআনিক সতর্কতা:
অনেক সময় দেখা যায় মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ওয়ারিশদের মধ্যে নাবালেগ এতিম সন্তান থাকে। তাদের অংশ বণ্টন না করে সেই টাকা দিয়ে যদি মৃত্যুবার্ষিকী বা চল্লিশার ভোজ করা হয়, তবে তা কুরআনের ভাষায় পেটে আগুন খাওয়ার শামিল,
﴿إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا﴾
নিশ্চয় যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের ধন-সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা তো নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করছে। (সূরা আন-নিসা: ১০)
ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার ফতোয়ায়ে শামীতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে,
«وَيُكْرَهُ اتِّخَاذُ الضِّيَافَةِ مِنْ الطَّعَامِ مِنْ أَهْلِ الْمَيِّتِ؛ لِأَنَّهُ شُرِعَ فِي السُّرُورِ لَا فِي الشُّرُورِ، وَهِيَ بِدْعَةٌ مُسْتَقْبَحَةٌ»
অর্থ: মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে মানুষকে খাবারের দাওয়াত (জিয়াফত) দেওয়া মাকরূহ ও অপছন্দনীয়। কারণ দাওয়াত ও ভোজের আয়োজন করা হয় আনন্দের মুহূর্তে, শোক বা বিপদের মুহূর্তে নয়। আর (শোকের বাড়ির এই আয়োজন) একটি নিকৃষ্ট বিদআত।
এজন্য মৃত ব্যক্তির জন্য সুন্নাহসম্মত উপায় হলো, লোকদেখানো ভোজ না করে গোপনে গরিব-মিসকিনদের দান-সদকা করা এবং তাদের মাগফিরাতের জন্য নিয়মিত দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।
وَيُكْرَهُ اتِّخَاذُ الضِّيَافَةِ مِنْ الطَّعَامِ مِنْ أَهْلِ الْمَيِّتِ لِأَنَّهُ شُرِعَ فِي السُّرُورِ لَا فِي الشُّرُورِ، وَهِيَ بِدْعَةٌ مُسْتَقْبَحَةٌ: وَرَوَى الْإِمَامُ أَحْمَدُ وَابْنُ مَاجَهْ بِإِسْنَادٍ صَحِيحٍ عَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ ” كُنَّا نَعُدُّ الِاجْتِمَاعَ إلَى أَهْلِ الْمَيِّتِ وَصُنْعَهُمْ الطَّعَامَ مِنْ النِّيَاحَةِ “. اهـ. وَفِي الْبَزَّازِيَّةِ: وَيُكْرَهُ اتِّخَاذُ الطَّعَامِ فِي الْيَوْمِ الْأَوَّلِ وَالثَّالِثِ وَبَعْدَ الْأُسْبُوعِ وَنَقْلُ الطَّعَامِ إلَى الْقَبْرِ فِي الْمَوَاسِمِ، وَاِتِّخَاذُ الدَّعْوَةِ لِقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ وَجَمْعُ الصُّلَحَاءِ وَالْقُرَّاءِ لِلْخَتْمِ أَوْ لِقِرَاءَةِ سُورَةِ الْأَنْعَامِ أَوْ الْإِخْلَاصِ (رد المحتار، كتاب الصلاة، باب صلاة الجنازة، مطلب فى كراهة الضيافة من اهل الميت-3/148)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন