গিনিপিগ পালন করা, বিক্রি করা এবং খাওয়া জায়েজ কি না?
প্রশ্নঃ ১৬৮২৩৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, গিনিপিগ পালন করা, বিক্রি করা জায়েজ নাকি হারাম? এটা কি খাওয়া যায়? হালাল না হারাম? আমি শুনলাম এটা নাকি অনুচিত।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামে যেসব প্রাণী ক্ষতিকর নয়, সেগুলো খাঁচায় বা ঘরে রেখে লালন-পালন করার অনুমতি রয়েছে। তবে শর্ত হলো, তাদের সময়মতো পর্যাপ্ত খাবার-পানি দিতে হবে এবং কোনো ধরনের কষ্ট দেওয়া যাবে না।
হাদিস শরিফে এসেছে, সাহাবি হযরত আবু উমাইর (রা.) একটি ছোট পাখি (নুগাইর) খাঁচায় পুষতেন। পাখিটি মারা গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে রসিকতা করেছিলেন। ইমাম বুখারি (রহ.) এই হাদিস দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, পাখির কষ্ট না দিয়ে খাঁচায় আটকে রাখা জায়েজ।
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْسَنَ النَّاسِ خُلُقًا، وَكَانَ لِي أَخٌ يُقَالُ لَهُ أَبُو عُمَيْرٍ... فَكَانَ يَقُولُ: يَا أَبَا عُمَيْرٍ، مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟
অর্থ: হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম (সা.) মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। আমার একটি ছোট ভাই ছিল, যাকে আবু উমাইর বলা হতো। আল্লাহর রাসুল (সা.) তার নিকট এলে (রসিকতা করে) বলতেন, "হে আবু উমাইর! নুগাইর (পাখিটি) কী করল?" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬১২৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২১৫০)।
বিপরীতপক্ষে, প্রাণীকে খাবার না দিয়ে কষ্ট দিলে গুনাহগার হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ سَجَنَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ، فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ، لاَ هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَلاَ سَقَتْهَا...
অর্থ: "এক নারীকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেওয়া হয়েছিল, যেটিকে সে বন্দি করে রেখেছিল যতক্ষণ না সেটি মারা যায়। সে তাকে খাবার ও পানি দেয়নি..." (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ২৪৮২)।
গিনিপিগের লালনপালন ও ব্যবসার বিধান
যেহেতু গিনিপিগ একটি নিরীহ প্রাণী এবং এটি ঘরোয়া পরিবেশে উপকার বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে পালন করা জায়েজ, তাই ফিকহে হানাফি অনুযায়ী এর কেনা-বেচা এবং এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হালাল। ইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, যেসব বিষয়ের মধ্যে মানুষের কোনো না কোনো বৈধ উপকারিতা (منفعة) রয়েছে, তার ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ।
বিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থ 'বাদায়েউস সানায়ে'-তে বলা হয়েছে:
وَيَجُوزُ بَيْعُ كُلِّ ذِي مِخْلَبٍ مِنْ الطَّيْرِ مُعَلَّمًا كَانَ أَوْ غَيْرَ مُعَلَّمٍ بِلَا خِلَافٍ. وَأَمَّا بَيْعُ كُلِّ ذِي نَابٍ مِنْ السِّبَاعِ سِوَى الْخِنْزِيرِ كَالْكَلْبِ، وَالْفَهْدِ، وَالْأَسَدِ وَالنَّمِرِ، وَالذِّئْبِ، وَالْهِرِّ، وَنَحْوِهَا فَجَائِزٌ عِنْدَ أَصْحَابِنَا، …… ثُمَّ عِنْدَنَا: لَا فَرْقَ بَيْنَ الْمُعَلَّمِ، وَغَيْرِ الْمُعَلَّمِ فِي رِوَايَةِ الْأَصْلِ فَيَجُوزَ بَيْعُهُ كَيْفَ مَا كَانَ …… (وَلَنَا) : أَنَّ الْكَلْبَ مَالٌ، فَكَانَ مَحَلًّا لِلْبَيْعِ كَالصَّقْرِ، وَالْبَازِي، وَالدَّلِيلُ عَلَى أَنَّهُ مَالٌ أَنَّهُ مُنْتَفَعٌ بِهِ حَقِيقَةً مُبَاحٌ الِانْتِفَاعُ بِهِ شَرْعًا عَلَى الْإِطْلَاقِ فَكَانَ مَالًا، وَلَا شَكَّ أَنَّهُ مُنْتَفَعٌ بِهِ حَقِيقَةً، وَالدَّلِيلُ عَلَى أَنَّهُ مُبَاحٌ الِانْتِفَاعُ بِهِ شَرْعًا عَلَى الْإِطْلَاقِ أَنَّ الِانْتِفَاعَ بِهِ بِجِهَةِ الْحِرَاسَةِ، وَالِاصْطِيَادِ مُطْلَقٌ شَرْعًا فِي الْأَحْوَالِ كُلِّهَا فَكَانَ مَحَلًّا لِلْبَيْعِ؛ لِأَنَّ الْبَيْعَ إذَا صَادَفَ مَحَلًّا مُنْتَفَعًا بِهِ حَقِيقَةً مُبَاحَ الِانْتِفَاعُ بِهِ عَلَى الْإِطْلَاقِ مَسَّتْ الْحَاجَةُ إلَى شَرْعِهِ؛
বাদায়েউস সানায়ে: ৪/৩৩৪)।
দ্রষ্টব্য: গিনিপিগ মলমূত্র ত্যাগের ক্ষেত্রে কিছুটা অসচেতন হওয়ায় এদের খাঁচা দ্রুত নোংরা হয়। ঘরে রাখলে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ওলামায়ে কেরাম ঘরের ভেতরে বা ইনডোরে এটি পালন করা অনুচিত বা পরিহার করা উত্তম বলে থাকেন।
গিনিপিগের মাংস খাওয়ার বিধান
অধিকাংশ ফিকহী মতানুযায়ী, গিনিপিগের মাংস খাওয়া হারাম বা অবৈধ। গিনিপিগ মূলত 'খাবাইস' বা নোংরা ও ঘৃণিত বালাই (Rodent/ইঁদুরজাতীয়) প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য সমস্ত পবিত্র ও ভালো জিনিস হালাল করেছেন এবং সমস্ত অপবিত্র ও নোংরা জিনিসকে হারাম করেছেন:
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
অর্থ: "আর তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহকে হালাল করেন এবং অপবিত্র ও নোংরা বস্তুসমূহকে তাদের ওপর হারাম করেন।" (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৫৭)।
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব 'আল-হিদায়া' -তে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে,
قال: "ويكره أكل الضبع والضب والسلحفاة والزنبور والحشرات كلها" أما الضبع فلما ذكرنا، وأما الضب فلأن النبي ﵊ "نهى عائشة ﵂ حين سألته عن أكله". … ، والزنبور من المؤذيات. والسلحفاة من خبائث الحشرات ولهذا لا يجب على المحرم بقتله شيء، وإنما تكره الحشرات كلها استدلالا بالضب لأنه منها. قال: "ولا يجوز أكل الحمر الأهلية والبغال" لما روى خالد بن الوليد ﵁ أن النبي ﷺ: "نهى عن لحوم الخيل والبغال والحمير" وعن علي ﵁: "أن النبي ﵊ أهدر المتعة وحرم لحوم الحمر الأهلية يوم خيبر"
(ইমাম কুদুরী রহ.) বলেন: "হায়েনা, দব্ব (মরুভূমির গোসাপ), কচ্ছপ, ভিমরুল এবং জমিনের সমস্ত কীট-পতঙ্গ ও ছোট প্রাণী (হাশারাত) খাওয়া মাকরূহ (তাহরিমি বা হারাম)।"
আর (হায়েনা ও দব্ব মাকরূহ হওয়ার কারণ হলো)— হায়েনা মাকরূহ হওয়ার কারণ তো আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। আর ‘দব্ব’ মাকরূহ হওয়ার কারণ হলো, নবী কারীম ﷺ-এর নিকট যখন হযরত আয়েশা (রা.) এটি খাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তখন তিনি তাকে এটি খেতে নিষেধ করেছিলেন ….।
আর ভিমরুল হলো কষ্টদায়ক (বালাই) প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত। এবং কচ্ছপ হলো ‘খাবাইস’ বা নোংরা ও ঘৃণিত কীট-পতঙ্গের অন্তর্ভুক্ত; আর এই কারণেই ইহরাম অবস্থায় কোনো ব্যক্তি এটি হত্যা করলে তার ওপর কোনো দণ্ড বা জরিমানা (জাজা) ওয়াজিব হয় না।
আর জমিনের সমস্ত কীট-পতঙ্গ ও ছোট প্রাণী (الحشرات كلها) খাওয়া মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে ‘দব্ব’ এর ওপর কিয়াস বা অনুমান করে দলিল পেশ করা হয়েছে; কেননা এটিও (দব্ব) সেগুলোরই (কীট-পতঙ্গ/হাশারাত) অন্তর্ভুক্ত।
(ইমাম কুদুরী রহ.) বলেন: "গৃহপালিত গাধা এবং খচ্চরের মাংস খাওয়া জায়েজ নয়।" কেননা হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই নবী কারীম ﷺ ঘোড়া, খচ্চর এবং গাধার মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। এবং হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই নবী কারীম ﷺ খায়বারের যুদ্ধের দিন মুতা বিবাহ বাতিল ঘোষণা করেছেন এবং গৃহপালিত গাধার মাংস হারাম করেছেন। (হিদায়া/শামেলা ভার্সন)
দ্রষ্টব্য: এই ইবারতে থাকা "والجُشَرَات كُلُّها" (জমিনের সমস্ত কীট-পতঙ্গ/ছোট প্রাণী)-এর আলোকেই গিনিপিগ, হ্যামস্টার বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাংস খাওয়া হানাফি মাজহাবে হারাম বা অবৈধ সাব্যস্ত হয়। তবে খরগোশ এই নিয়মের বাইরে, কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর যুগে খরগোশের মাংস খাওয়ার বৈধতা হাদিস দ্বারা সরাসরি প্রমাণিত)।
সিদ্ধান্ত:
গিনিপিগ শখের বশে (যত্ন নেওয়ার শর্তে) খাঁচায় পুষতে পারবেন এবং এর ব্যবসাও করতে পারবেন। তবে এটি ইঁদুরজাতীয় বালাই (Rodent) হওয়ায় ইসলামের খাদ্য তালিকায় হালাল নয়, তাই এটি খাওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ (হারাম)।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন