কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে চাকরি করার শরয়ী বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৮১৬৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার এক প্রতিবেশী কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে চাকরী করেন।উনাদের এই উপার্জন কি হালাল?উনারা কিছু দিলে কি নেওয়া যাবে?উনাদকে কোয়ান্টাম থেকে ফেরানোর জন্য একটা বই দিতে চাই।কোন বইটা দিলে ভালো হবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার প্রশ্নের মূল উত্তরটি দেওয়ার আগে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্পর্কে সংক্ষেপে শরঈ বিশ্লেষণ করছি, যাতে উত্তরটি বুঝতে সহজ হয়।
১. এর মূল কাঠামো অমুসলিম তপস্যা-পদ্ধতি থেকে ধার করা
মেডিটেশন ও যোগব্যায়ামের পেছনের দার্শনিক কাঠামো মূলত হাজার বছর আগের হিন্দু-বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও খ্রিস্টান পাদ্রীদের যোগ-সাধনার আধুনিক রূপ, যাকে "মেডিটেশন" বা "Science of Living" নাম দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। কেবল শারীরিক কসরতের উদ্দেশ্যে, কোনো অনৈসলামিক আকীদা বা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ছাড়া যোগব্যায়াম করা মূলনীতিগতভাবে নাজায়েজ নয়, কিন্তু এর পেছনে জড়িয়ে থাকা শিরকী আকীদাসমূহী মূল সমস্যার জায়গা।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী প্রাসঙ্গিক:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
অর্থ : হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোন কওমের (সম্প্রদায়ের) অনুসরণ-অনুকরন করবে, সে তাদের দলভুক্ত হবে।
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নংঃ ৪০৩১
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/18336
অমুসলিম ধর্মীয় সাধনার কাঠামো ধার করে তা "বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি" নাম দিয়ে প্রচার করা মুসলমানদের সাথে এক ধরনের ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা।
২. "অন্তর্গুরু" ধারণাটি আকীদাগতভাবে বিপজ্জনক
তাদের ভাষ্যমতে মেডিটেশনের লক্ষ্য নিজের "অন্তর্গুরু" বা "অন্তরের আমি"-র সাথে সংযোগ স্থাপন, যাকে তারা "শক্তির মূল উৎস" বলে। ইসলামী দৃষ্টিতে এই "অন্তরের আমি" মূলত নফসে আম্মারা (প্রবৃত্তি), যার অন্ধ অনুসরণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا - أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ ۚ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ ۖ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا
অর্থ : আপনি কি দেখেছেন ঐ ব্যক্তি কে, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার জিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তার চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট।
(সূরা আল-ফুরকান, আয়ান নং ৪৩-৪৪)
নিজের প্রবৃত্তি বা কল্পিত অভ্যন্তরীণ শক্তিকে পথপ্রদর্শক বানানো তাওহীদের মৌলিক দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত, কারণ ইসলামে একমাত্র আল্লাহই পথপ্রদর্শক ও একমাত্র নির্ভরস্থল।
৩. সব ধর্মই সঠিক বা ধর্মীয় বহুত্ববাদ
মেডিটেশন-চর্চাকারীদের সাধারণ অবস্থান হলো সব ধর্মকে সমান সঠিক মনে করা এবং মেডিটেশনকে সব ধর্মের ঊর্ধ্বে সর্বজনীন বিজ্ঞান হিসেবে দেখানো। অথচ ইসলামের ভিত্তি হলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীন ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
অর্থ : নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন হলো ইসলাম।
(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ
অর্থ : যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অনুসন্ধান করবে, তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।
(সূরা আলে ইমরান, ৩:৮৫)
এই বহুত্ববাদী দাবি তাওহীদ ও রিসালাতের ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই জাতীয় বহু ইসলামবিরোধী ধ্যান-ধারণা, আকিদা-বিশ্বাস ও কার্যক্রম তাদের রয়েছে। তাই এ জাতীয় কার্যক্রমের সাথে জড়িত হওয়া জায়েজ হবে না। সুতরাং তাদের যোগ-সাধনা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক। অন্যথায় নিজের অজান্তে তাদের কুফরী আকিদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা নিজের মধ্যে চলে আসার ঝুঁকি থাকে।
আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর:
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মূল কার্যক্রম যদিও নাজায়েজ ও হারাম এবং ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী, তবে তাদের কিছু সেবামূলক কার্যক্রম রয়েছে যা সরাসরি হারাম নয়; যেমন: রক্তদান কর্মসূচি, ত্রাণ বিতরণ, কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদি।
চাকরি ও উপার্জনের বিধান:
কেউ যদি সরাসরি মেডিটেশন প্রশিক্ষণ দেন, কোর্স পরিচালনা করেন, বা এই আকীদাগত শিক্ষা প্রচারে সরাসরি জড়িত থাকেন, তবে তার কাজ শরীয়ত-বিরোধী কার্যক্রম হওয়ার কারণে জায়েজ হবে না এবং এর বিনিময়ে পাওয়া বেতনও হালাল হবে না।
আর তার কাজ যদি এ জাতীয় শরীয়ত-বিরোধী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত না থাকে, বরং বৈধ সেবামূলক কার্যক্রমই যদি তার মূল দায়িত্ব হয়, তাহলে তার বেতন অবৈধ হবে না। তবে যেহেতু এ ফাউন্ডেশনের মূল কার্যক্রম শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক, তাই এমন পরিবেশে থাকলে বা এমন আকিদা-বিশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তিদের সাথে ওঠা-বসা হলে ইসলামী শরীয়তের খেলাফ অনেক চিন্তা-চেতনা অজান্তেই নিজের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি না করাই নিরাপদ।
ঐ প্রতিবেশীর হাদিয়া/উপহার গ্রহণের হুকুম:
যদি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে উনার মূল দায়িত্ব শুধু বৈধ কাজ হয়, তাহলে উনার হাদিয়া/উপহার গ্রহণ করা যেতে পারে।
আর যদি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে উনার মূল দায়িত্ব হয় প্রশিক্ষণ দেওয়া বা ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী কার্যক্রম প্রচার-প্রসার করা, তাহলে উনার ইনকাম বৈধ হবে না। উনার যদি আর কোনো বৈধ ইনকাম না থাকে, বা থাকলেও অধিকাংশ ইনকাম অবৈধ হয়, তবে উনার হাদিয়া/উপহার গ্রহণ করা যাবে না। তবে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তিনি সুনির্দিষ্টভাবে হালাল ইনকাম থেকেই হাদিয়া দিয়েছেন, তাহলে তা গ্রহণ করা যাবে।
আর যদি উনার অধিকাংশ ইনকাম হালাল হয়, তাহলেও উনার হাদিয়া/উপহার গ্রহণ করার অবকাশ আছে। তবে যদি নিশ্চিত জানা যায় যে, তিনি হারাম টাকা থেকেই উপহার দিয়েছেন, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েজ হবে না।
প্রসিদ্ধ ফতোয়ার কিতাব ফতোয়ায়ে আলমগিরীতে রয়েছে:
أَهْدَى إلَى رَجُلٍ شَيْئًا أَوْ أَضَافَهُ إنْ كَانَ غَالِبُ مَالِهِ مِنْ الْحَلَالِ فَلَا بَأْسَ إلَّا أَنْ يَعْلَمَ بِأَنَّهُ حَرَامٌ، فَإِنْ كَانَ الْغَالِبُ هُوَ الْحَرَامَ يَنْبَغِي أَنْ لَا يَقْبَلَ الْهَدِيَّةَ، وَلَا يَأْكُلَ الطَّعَامَ إلَّا أَنْ يُخْبِرَهُ بِأَنَّهُ حَلَالٌ
(অর্থ: কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে কোনো উপহার দেয় বা দাওয়াত খাওয়ায়, তবে উপহারদাতার উপার্জনের অধিকাংশ যদি হালাল হয়, তাহলে তা গ্রহণ করায় কোনো অসুবিধা নেই; যতক্ষণ না নিশ্চিত জানা যায় যে প্রদত্ত বস্তুটি সরাসরি হারাম। আর যদি উপার্জনের অধিকাংশ অংশই হারাম হয়, তবে তার হাদিয়া গ্রহণ করা বা খাবার খাওয়া উচিত নয়; যতক্ষণ না সে নিশ্চিত করে যে এই নির্দিষ্ট বস্তুটি হালাল অর্থ থেকে এসেছে।)
— (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, ৫/৩৪২)
পরামর্শ:
উনাকে কোয়ান্টাম থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত। বিভিন্ন হেকমত ও সুন্দর আদবের সাথে কোয়ান্টামের শরীয়ত-বিরোধী কার্যক্রম ও আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের সহযোগিতা নিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করবেন।
উনাকে আপাতত নিচের বই দুটি পড়ার জন্য উপহার দিতে পারেন:
১. ‘ইসলাম ও কোয়ান্টাম মেথড’ — মাওলানা মুহাম্মাদ আফসারুদ্দীন
২. ‘নব্য আহলে কুরআন’
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন