গুনাহগার মুসলিমরা কি জাহান্নামের শাস্তি অনুভব করবে না?
প্রশ্নঃ ১৬৮০৯১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, একটি বয়ানে বলা হয়েছে, গুনাহগার মুসলমানরা জাহান্নামে শাস্তির সময় অনুভূতিহীন থাকবে এবং আজাবের কষ্ট অনুভব করবে না। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বক্তব্যের সঠিক ব্যাখ্যা কী?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
গুনাহগার মুসলমানরা জাহান্নামে শাস্তির সময় "অনুভূতিহীন থাকবে বা "কষ্ট অনুভব করবে না"—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং কোরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মিরাজেরই রাতে তিনি ব্যভিচারী, সুদখোর বা নামাজ চোরদের জাহান্নামে চিৎকার ও আর্তনাদ করতে দেখেছেন। তাছাড়া জাহান্নামের সবচেয়ে হালকা শাস্তি যাকে দেওয়া হবে তিনি হলেন (নবীজির চাচা আবু তালিব)। আগুনের জুতো পরানোর কারণে তার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে। তিনি ভাববেন তার কষ্টই সবচেয়ে বেশি।
আপনার শোনা বয়ানটিতে সহিহ মুসলিমের 185-1 নং হাদিসের ভুল বা আংশিক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখা আবু সাঈদ আল খুদরি (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন -
أَمَّا أَهْلُ النَّارِ الَّذِينَ هُمْ أَهْلُهَا فَإِنَّهُمْ لاَ يَمُوتُونَ فِيهَا وَلاَ يَحْيَوْنَ وَلَكِنْ نَاسٌ أَصَابَتْهُمُ النَّارُ بِذُنُوبِهِمْ - أَوْ قَالَ بِخَطَايَاهُمْ - فَأَمَاتَهُمْ إِمَاتَةً حَتَّى إِذَا كَانُوا فَحْمًا أُذِنَ بِالشَّفَاعَةِ فَجِيءَ بِهِمْ ضَبَائِرَ ضَبَائِرَ فَبُثُّوا عَلَى أَنْهَارِ الْجَنَّةِ ثُمَّ قِيلَ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ أَفِيضُوا عَلَيْهِمْ . فَيَنْبُتُونَ نَبَاتَ الْحِبَّةِ تَكُونُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ " . فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ كَأَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَدْ كَانَ بِالْبَادِيَةِ
জাহান্নামীদের মধ্যে যারা প্রকৃতপক্ষে জাহান্নামী, তাদের মৃত্যুও ঘটবে না এবং তারা পুনর্জীবিত হবে না। তবে তন্মধ্যে তোমাদের এমন কতিপয় লোকও থাকবে, যারা গুনাহের দায়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাআলা (তাদের উপর পতিত আযাবের নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলে) তাদেরকে কিছুক্ষণ নির্জীব করে রেখে দিবেন। অবশেষে তারা পুড়ে সম্পূর্ণ অঙ্গার হয়ে যাবে। এ সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাফাআতের অনুমতি হবে। তখন এদেরকে দলে দলে নিয়ে আসা হবে এবং জান্নাতের নহর গুলিতে ছড়িয়ে দেয়া হবে। পরে বলা হবে, হে জান্নাতীরা তোমরা এদের গায়ে পানি ঢেলে দাও! ফলত স্রোত বাধিত পানিতে গজিয়ে ওঠা শস্যদানার মত তারা সজীব হয়ে উঠবে। উপস্থিতদের মধ্যে একজন বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যেন এককালে গ্রামে অবস্থান করেছেন।
সহীহ মুসলিম, আন্তর্জাতিক নং: ১৮৫-১
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/7408
এখানে "আগুন তাদের মৃত্যু দেবে" বা "কয়লা হয়ে যাওয়া"-র অর্থ এই নয় যে, তারা পুরো শাস্তি জুড়ে বেহুঁশ বা অনুভূতিহীন থাকবে। বরং এর সঠিক ব্যাখ্যা হলো, গুনাহগার মুসলমানরা জাহান্নামে প্রবেশের পর তাদের অপরাধের শাস্তি স্বরূপ চরম আজাব ও তীব্র কষ্ট ভোগ করবে।
যখন তাদের শাস্তির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে আসবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, ঠিক তার কিছু আগে আল্লাহ তাদের ওপর এক ধরনের অসচেতনতা বা "মৃত্যুসদৃশ অবস্থা" দান করবেন।
এর উদ্দেশ্য হলো, যেন সুপারিশের মাধ্যমে তাদের বের করে আনার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত শেষ সময়টাতে তারা আর কষ্ট না পায়। অর্থাৎ, এটি তাদের শাস্তির শুরুর দিকের কথা নয়, বরং শাস্তির একদম শেষ সীমানায় আল্লাহর রহমতের একটি বহিঃপ্রকাশ।
কোরআনের আলোকে আজাব অনুভবের প্রমাণ
পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, জাহান্নামিদের আজাব বা কষ্ট অনুভবের ক্ষমতা কোনোভাবেই হ্রাস পাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আগুনে প্রবেশ করাবো। যখনই তাদের চামড়া পুড়ে গলে যাবে, তখনই আমি তার জায়গায় নতুন চামড়া বদলে দেবো, যেন তারা শাস্তি আস্বাদন করতে পারে (لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ)।" (সূরা আন-নিসা: ৫৬)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, কষ্ট অনুভবের জন্যই আল্লাহ চামড়া পরিবর্তন করে দেবেন। যদি তারা অনুভূতিহীনই থাকত, তবে চামড়া পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন হতো না।
হাদিসের আলোকে আজাব অনুভবের প্রমাণ: সহিহ বুখারি ও মুসলিমের একাধিক হাদিসে গুনাহগার মুমিনদের আজাবের তীব্র অনুভূতির কথা বলা হয়েছে।
সারকথা: কোনো কোনো বক্তা সহিহ মুসলিমের ওই হাদিসটি পুরোপুরি না বুঝে বা আংশিক পড়ে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করার জন্য বলে বসেন যে "মুসলমানদের কষ্ট হবে না।" এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। সঠিক আকিদা হলো: গুনাহগার মুসলমানরা তাদের পাপের অনুপাতে জাহান্নামের তীব্র ও ভয়ংকর কষ্ট সজ্ঞানেই ভোগ করবে, তবে কাফেরদের মতো তারা সেখানে চিরকাল থাকবে না এবং শাস্তির শেষ ভাগে আল্লাহর বিশেষ রহমতে তাদের কষ্ট লাঘব করে অবশেষে জান্নাতে আনা হবে
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন