নামাজে অবিচল থাকার জন্য করণীয়
প্রশ্নঃ ১৬৭৬৭০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি সারাদিন কি করলাম এইটা নিয়ে রাতে চিন্তা করি এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করি যেন তিনি আমাকে মাফ করে দেন। আমি প্রতিদিন নিয়ত করি ৫ ওয়াক্ত নানাজ পড়ব, তবে কখনো পড়া হয়, কখনো হয় না। একূম ৫ ওয়াক্ত কখনোই হয় না। কিভাবে আমি প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পাড়ি?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রারম্ভিক সান্ত্বনা ও ঈমানের সুসংবাদ
দিন শেষে নিজের ভুলত্রুটি নিয়ে ভাবা এবং আল্লাহর ভয়ে রাতে একা একা কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাওয়া আপনার অন্তরে খাঁটি ঈমান ও আল্লাহর ভালোবাসার এক জীবন্ত আলামত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
«النَّدَمُ تَوْبَةٌ»
অনুতাপ বা মনের এই অনুশোচনাই হলো তাওবা। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫২)
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/29543
আল্লাহ তাআলা আপনার এই চোখের পানি ও মনের ব্যাকুলতাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন। শয়তানের প্ররোচনায় কখনো হতাশ হবেন না; সে চায় আপনি নিজেকে ব্যর্থ মনে করে নিরাশ হয়ে যান। আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নতুন প্রত্যয়ে শুরু করুন।
কোনো কারণে ফরজ নামাজ ছুটে গেলে করণীয় কী?
১. দ্রুত কাজা আদায় করা ফরজ:
ঘুমের কারণে, কাজের চাপে বা অলসতাবশত কোনো ফরজ নামাজ সময়মতো পড়া না হলে তা এমনি এমনি মাফ হয়ে যায় না; বরং যখনই সুযোগ হবে যত দ্রুত সম্ভব সেই ফরজ নামাজের কাজা আদায় করা আবশ্যক (ফরজ)।
হাদিস শরিফ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ نَسِيَ صَلَاةً، أَوْ نَامَ عَنْهَا، فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا»
যে ব্যক্তি কোনো নামাজ ভুলে যায় কিংবা ঘুমিয়ে থাকার কারণে ছুটে যায়, তার কাফফারা হলো—মনে পড়ার সাথে সাথেই তা পড়ে নেওয়া। (সহিহ বুখারি: ৫৯৭; সহিহ মুসলিম: ৬৮৪)
২. আন্তরিক তাওবা ও ইস্তিগফার:
যেহেতু নামাজের ওয়াক্ত পার করা কবিরা গুনাহ, তাই কাজা আদায়ের সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চেয়ে নেবেন।
প্রতিদিন নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজে অবিচল থাকার আত্মিক ও বাস্তবমুখী কৌশল
১. নামাজের ফজিলত ও নামাজ ত্যাগের ভয়াবহতা প্রতিনিয়ত জানা ও অনুধাবন করা:
মনের ভেতর নামাজের তীব্র অনুভূতি জাগ্রত রাখতে নিয়মিত এ সংক্রান্ত কুরআন ও হাদিসের বাণীগুলো পড়ুন।
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। নামাজ ঠিক থাকলে বাকি সব আমল সহজ হয়ে যাবে (তিরমিযী: ৪১৩)।
ভয়াবহতা: ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দেওয়া কুফরির সমতুল্য মারাত্মক অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, বান্দা এবং কুফর-শিরকের মধ্যে পার্থক্যই হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া। (সহিহ মুসলিম: ৮২) জাহান্নামের ‘সাকার’ নামক ভয়ংকর স্তরে যাওয়ার প্রধান কারণ হবে নামাজ না পড়া (সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৪২-৪৩) এই কথাগুলো স্মরণ রাখলে মনে গাফিলতি আসবে না।
২. নামাজি ও নেককার মানুষদের সঙ্গ (সাহচর্য) গ্রহণ করা:
মানুষের অভ্যাস মূলত তার সঙ্গীদের দ্বারা গড়ে ওঠে।
যারা নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়েন, বাজারে বা মহল্লায় তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলুন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ভালো সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো আতর বিক্রেতার মতো; সে হয়তো তোমাকে সুবাস উপহার দেবে, না হয় তুমি তার কাছ থেকে আতর কিনবে, নতুবা অন্তত তার কাছ থেকে উত্তম সুবাস পাবে। (সহিহ বুখারি: ২১০১)
নামাজি বন্ধুদের সাথে থাকলে আজান হওয়ামাত্রই তাদের সাথে মসজিদে যাওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদ তৈরি হবে।
৩. নামাজের দুনিয়াবি ফায়দা ও না পড়ার ক্ষতি অন্তরে গেঁথে নেওয়া:
নামাজ শুধু আখেরাতের বিষয় নয়, এর রয়েছে অপরিসীম পার্থিব কল্যাণ:
দুনিয়াবি ফায়দা: নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজে চেহারায় নূর আসে, মন দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতামুক্ত থাকে, সময়ে ও উপার্জনে অদৃশ্য বরকত নেমে আসে এবং অন্যায়-অশ্লীল কাজ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায় (সূরা আনকাবুত: ৪৫)
না পড়ার দুনিয়াবি ক্ষতি: বেনামাজির জীবনে পেরেশানি বাড়ে, উপার্জনে বরকত থাকে না এবং অন্তরে এক ধরনের স্থায়ী অশান্তি ও শূন্যতা তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا﴾
আর যে ব্যক্তি আমার স্মরণ (নামাজ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার দুনিয়াবি জীবন হবে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও অশান্তিময়। (সূরা তাহা: ১২৪)
৪. আজানের সাথে সাথে ‘৫ মিনিটের মধ্যে অজু’ করার অভ্যাস:
শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো দেরি করানো (যেমন: ভাবায়, আর একটু পর যাই, কাজটা শেষ করে যাই)। এই চিন্তা মাথায় আসামাত্রই সব কাজ ফেলে দ্রুত অজু করে ফেলবেন। ওজু হয়ে গেলে নামাজ পড়ার আলসেমি ৯০% দূর হয়ে যায়।
৫. দোকানে নামাজের পরিবেশ রাখা ও বরকতের বিশ্বাস রাখা:
দোকানে এক কোণে একটি পরিষ্কার জায়নামাজ ও টুপি সবসময় প্রস্তুত রাখবেন। কোনো কারণে মসজিদে যেতে না পারলেও দোকানের ভেতরেই ওয়াক্তের মধ্যে ফরজটুকু পড়ে নেবেন।
মনে গভীর বিশ্বাস রাখবেন—দোকান আপনাকে রিজিক দেয় না, রিজিক দেন স্বয়ং আল্লাহ। আল্লাহর হুকুম মেনে ৫-১০ মিনিট নামাজে দিলে দোকানে বিক্রি কমবে না, বরং আল্লাহ আপনার ব্যবসাতে অপ্রত্যাশিত বরকত দান করবেন।
৬. বিশেষ দুটি মাসনূন দোয়া নিয়মিত পাঠ করা:
ক. হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক দোয়া:
«رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ»
হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব, আমার দোয়া কবুল করুন। (সূরা ইবরাহিম: ৪০)
খ. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেখানো দোয়া:
«اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ»
(আল্লা-হুম্মা আ‘ইন্নী ‘আলা- যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ‘ইবা-দাতিকা)
হে আল্লাহ! আপনার জিকির করতে, আপনার শুকরিয়া আদায় করতে এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন। (আবু দাউদ: ১৫২২)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন