ঋণের টাকা হারিয়ে গেলে বা আমানতের টাকা চুরি হয়ে গেলে দায় কার?
প্রশ্নঃ ১৬৭৫৪৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ঋণ গ্রহীতা ঋন পরিশোধের সময় যদি ঋনদাতা বলে যে টাকাটা তোমার কাছে রাখো কয়েকদিন পরে নিচ্ছি এর মধ্যে যদি টাকা হারিয়ে যায় তাহলে জরিমানা কার?
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ঢাকা ১২১৯
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনী ভাই!
প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়টির দুইটি রূপ হতে পারে।
এক. ঋণগ্রহীতা তার ঋণ পরিশোধ করতে চেয়েছে কিন্তু পাওনাদার বলেছে এখন তোমার কাছেই রাখো; আমি কিছু দিন পরে নিব।
দুই. ঋণগ্রহীতা পাওনাদারকে টাকা/তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছে; কিন্তু পাওনাদার সেটা বুঝে পেয়ে আবার ঋণগ্রহীতাকে এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছে যে, এখন তোমার কাছেই রাখো; আমি কিছু দিন পরে নিব।
প্রথম সুরতে: ঋণগ্রহীতার টাকা তার কাছেই রয়ে গেছে। কাজেই এখন যদি সেই টাকা নষ্ট হয়ে যায়, চুরি হয়ে যায়, হারিয়ে যায় তাহলে তার দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে। পাওনাদারের এখানো কোনো দায়/গচ্ছা নেই। কেননা সে তো এখনো তার পাওনা বুঝেই নেয়নি। হ্যাঁ ঋণগ্রহীতা দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে তখন ফিরিয়ে দিয়েছে।
দ্বিতীয় সুরতে: যখন ঋণগ্রহিতা পাওনাদারকে তার টাকা বুঝিয়ে দিয়েছে এবং পাওনাদার সেটা বুঝে পেয়ে আবার ঋণগ্রহীতাকে এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছে যে, এখন তোমার কাছেই রাখো; আমি কিছু দিন পরে নিব। এর অর্থ হলো, সে তার পাওনা বুঝে পেয়ে তার ঋণগ্রহীতার কাছেই আমানত রেখেছে।
আর আমানতের বিধান হলো, যদি আমানত গ্রহীতা নিজের টাকা-পয়সার মতোই নিরাপদে রেখে দেন এবং তার পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা বা অসাবধানতা না থাকা সত্ত্বেও সেটা চুরি হয়ে যায় কিংবা হারিয়ে যায়, তবে আমানত গ্রহীতার এখানে কোনো দায় নাই। এক্ষেত্রে তাকে কোনো জরিমানা দিতে হবে না।
কিন্তু যদি আমানত গ্রহীতা সেটাকে নিজের টাকা-পয়সার মতো নিরাপদে না রাখে বরং অবহেলা বা অসাবধানতায় অরক্ষিত স্থানে রেখে দেয় এবং এর ফলে সেটা চুরি হয়ে যায় কিংবা হারিয়ে যায়, তবে আমানত গ্রহীতা এখানে দায়বদ্ধ থাকবে। এক্ষেত্রে তাকে আমানতের ক্ষতিপুরণ দিতে হবে।
সুনানে বায়হাকীতে বর্ণিত হয়েছে,
أن عَليًّا وابنَ مَسعودٍ رضي الله عنهما قالا: لَيسَ على مُؤتَمَنٍ ضَمانٌ
ورُوّينا عن شُرَيحٍ: لَيسَ على المُستَودَعِ غَيرِ المُغِلِّ ضَمانٌ.
অর্থ : আলী (রাযি.) এবং ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তাঁরা উভয়ে বলেছেন: "যার নিকট আমানত রাখা হয়েছে (আমানতদার), তার ওপর কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।"
এবং কাজী শুরাইহ্ (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: "আমানত রক্ষাকারীর ওপর কোনো জরিমানা নেই, যতক্ষণ না সে খিয়ানত করে।"
(সুনানে কুবরা লিল-বায়হাকী, ১২৮২৫)
অপর হাদীসে আমর ইবন শুআয়েবের দাদা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَنْ أُودِعَ وَدِيعَةً فَلاَ ضَمَانَ عَلَيْهِ "
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কেউ যদি কারো কাছে কোন আমানাত রাখা হয়, (এবং তা যদি তার কাছ থেকে বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে) তার ওপর কোন ক্ষতিপূরণ আসবে না।
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৪০১
হাদীসের লিংক: https://muslimbangla.com/hadith/27692
ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব ফতহুল কদীরে আছে,
"قال (الوديعة أمانة في يد المودع إذا هلكت لم يضمنها) لقوله عليه الصلاة والسلام ليس على المستعير غير المغل ضمان ولا على المستودع غير المغل ضمان"
অর্থ: (হেদায়া গ্রন্থকার) বলেন: "(গচ্ছিত রাখা) আমানতের বস্তু আমানতগ্রহীতার কাছে একটি আমানতস্বরূপ; তা যদি ধ্বংস বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সে তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হবে না।" কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: "খিয়ানতকারী ব্যতীত সাধারণ ব্যবহারকারীর (ধার গ্রহণকারী) ওপর কোনো জরিমানা নেই, এবং খিয়ানতকারী ব্যতীত আমানতগ্রহীতার ওপরও কোনো জরিমানা নেই।"
[ফাতহুল কদীর: ৮/৪৮৫]
মাজমাউ আনহুরে আছে,
(فلا يضمن) أي لا يضمن المودع الوديعة بغير تعد (بالهلاك) سواء أمكن التحرز عنه أو لا هلك معها للمودع شيء أو لا لقوله عليه السلام: ليس على المستودع غير المغل ضمان» ولأن شرعيتها لحاجة الناس إليها
অর্থ: (অতএব সে জরিমানা দেবে না) অর্থাৎ কোনো প্রকার সীমালঙ্ঘন ছাড়া আমানতের বস্তু নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে গেলে আমানতগ্রহীতা তার ক্ষতিপূরণ দেবে না; চাই সেই ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল কিংবা ছিল না, অথবা সেই আমানতের সাথে আমানতগ্রহীতার নিজস্ব কোনো সম্পদ নষ্ট হয়ে থাকুক বা না থাকুক। কারণ নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "খিয়ানতকারী ছাড়া আমানতগ্রহীতার ওপর কোনো জরিমানা নেই।" তাছাড়া মানুষের পারস্পরিক জীবনের প্রয়োজন মেটাতেই আমানতের এই শরঈ বিধান তৈরি করা হয়েছে।
[মাজমাউল আনহুর: ২/৩৩৮]
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ওপরের বিস্তারিত বিবরণ থেকে আশা করছি আপনি আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত সমাধান পেয়ে গেছেন। প্রশ্নোক্ত ঋণদাতা এবং গ্রহীতার মাঝে যেই আঙ্গিকে লেনদেন হয়েছে সেই আঙ্গিকেই বিধান আরোপিত হবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১