স্বামীর দোষ গোপন করা এবং অন্যদের কাছে মিথ্যা প্রশংসা করার শরয়ী বিধান
প্রশ্নঃ ১৬৫৩০১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্বামীকে সবার কাছে ভালো রাখার জন্য মিথ্যা প্রশংসা করা জায়েজ আছে কিনা? আর তার খারাপ ব্যবহার সবার আছে অস্বীকার করা, এবং কল না দিলেও বলা যে কল দিয়েছে, এরূপ করা কি জায়েজ আছে???
১৯ আগস্ট, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রথম কথা হচ্ছে, মিথ্যা একটি জঘন্য পাপ।
রাসূল সা. বলেন,
فعن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : (إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يَكُونَ صِدِّيقًا . وَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا)
رواه البخاري (6094) ومسلم (2607) .
হাদিস: নিশ্চয়ই সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায় এবং পুণ্য জান্নাতে নিয়ে যায়। আর মানুষ (সর্বদা) সত্য বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে সে 'সিদ্দীক' (পরম সত্যবাদী) হিসেবে লিখিত হয়। আর নিশ্চয়ই মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায় এবং পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়। আর মানুষ (সর্বদা) মিথ্যা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে সে 'কাযযাব' (চরম মিথ্যুক) হিসেবে লিখিত হয়।
বুখারি (৬০৯৪) ও মুসলিম (২৬০৭)
অপর এক হাদিসে বলেন,
وعن عائشة رضي الله عنها قالت : (مَا كَانَ خُلُقٌ أَبْغَضَ إِلَى أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْكَذِبِ ، وَلَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يَكْذِبُ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْكَذِبَةَ ، فَمَا يَزَالُ فِي نَفْسِهِ عَلَيْهِ حَتَّى يَعْلَمَ أَنَّهُ قَدْ أَحْدَثَ مِنْهَا تَوْبَةً)
رواه أحمد في "المسند" (42/101)
হাদিস: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবীদের কাছে মিথ্যার চেয়ে অধিক ঘৃণিত অন্য কোনো স্বভাব ছিল না। কোনো ব্যক্তি যদি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে একটি মিথ্যা কথাও বলত, তাহলে তার প্রতি তাঁর (রাসূলুল্লাহ সা.-এর) অন্তরে অসন্তুষ্টি থেকেই যেত, যতক্ষণ না তিনি জানতে পারতেন যে, লোকটি ওই মিথ্যার জন্য তওবা করেছে।
মুসনাদে আহমাদ (৪২/১০১)
তবে হ্যাঁ, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে মিথ্যা বলাকে শরিয়ত অনুমোদন দিয়েছে।
যেমন হাদিসে এসেছে,
حديث أم كلثوم بنت عقبة رضي الله عنها أنها سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول : (لَيْسَ الْكَذَّابُ الَّذِي يُصْلِحُ بَيْنَ النَّاسِ وَيَقُولُ خَيْرًا وَيَنْمِي خَيْرًا)
رواه مسلم (2605) .
উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দেয় এবং ভালো কথা বলে বা ভালো কথা পৌঁছায়।” (সহীহ মুসলিম: ২৬০৫)।
আলী রা. থেকে বর্ণিত,
وقول علي بن أبي طالب رضي الله عنه : (إِذَا حَدَّثْتُكُمْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَلأَنْ أَخِرَّ مِنَ السَّمَاءِ أَحَبُّ إِلَىَّ مِنْ أَنْ أَكْذِبَ عَلَيْهِ ، وَإِذَا حَدَّثْتُكُمْ فِيمَا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ فَإِنَّ الْحَرْبَ خَدْعَةٌ) رواه البخاري (3611) ومسلم (1066) .
অর্থাৎ, আলী (রা.) বলেন: আমি যখন তোমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো হাদিস বর্ণনা করি, তখন তাঁর নামে মিথ্যা বলার চেয়ে আকাশ থেকে নিচে পড়ে যাওয়া আমার কাছে বেশি প্রিয়। কিন্তু আমি যখন তোমাদের সাথে এমন বিষয়ে কথা বলি, যা আমার ও তোমাদের মধ্যকার ব্যাপার, তখন (মনে রেখো) যুদ্ধ হলো একটি কৌশল।
বুখারি (৩৬১১) ও মুসলিম (১০৬৬)
উপরোক্ত বর্ণনাগুলোর ভিত্তিতে উলামায়ে কেরাম বলেন,
যদি সত্য বলার কারণে কোনো মুমিনের প্রাণনাশের বা বড় বিপদের আশঙ্কা থাকে, তবে মিথ্যা বলা যাবে। এমনিভাবে ক্ষতি রোধ করতে বা মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক করতে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে (যেমন- স্ত্রীর মন রক্ষার্থে বা মানুষের মধ্যে বিবাদ মেটাতে)। তবে এর অপব্যবহার থেকে সতর্ক থাকতে হবে। হ্যাঁ, যদি ইশারা-ইঙ্গিতে (তাওরিয়া) কাজ হয়, তবে সরাসরি মিথ্যা না বলে সেই কৌশল অবলম্বন করাই উত্তম।
উমর (রা.) বলেন, “ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় মানুষের জন্য মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকার উপায় রয়েছে।” (সুনানুল কুবরা, বায়হাকি: ১০/১৯৯)।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় আমরা বলব,
প্রথমত, স্বামীর খারাপ দিক বা ত্রুটি অন্যদের কাছে গোপন রাখা এবং তার খারাপ আচরণের কথা প্রকাশ না করা শুধু জায়েজই নয়, বরং এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। ইসলামে অন্যের দোষ গোপন রাখার প্রতি খুব জোর দেওয়া হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত গোপনীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ তা বাইরের মানুষের কাছে বলে বেড়ানো গীবত বা পরনিন্দার অন্তর্ভুক্ত, যা মারাত্মক গুনাহ। তাই অন্যের সামনে স্বামীর সম্মান বজায় রাখতে তার দোষগুলো গোপন করা স্ত্রীর জন্য একটি প্রশংসনীয় কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ، حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، حَدَّثَنَا سُهَيْلٌ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لاَ يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْدًا فِي الدُّنْيَا إِلاَّ سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ " .
৬৩৫৯। আবু বকর ইবনে আবি শাঈবা (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কোন বান্দা যদি অপর কারো দোষ-ত্রুটি দুনিয়াতে গোপন রাখে আল্লাহ তাআলা তার দোষ-ক্রটি কিয়ামত দিবসে গোপন রাখবেন।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ৬৩৫৯, আন্তর্জাতিক নং: ২৫৯০-২
দ্বিতীয়ত, সবার কাছে স্বামীর ভালো ইমেজ তৈরি করার জন্য নিজের পক্ষ থেকে মিথ্যা গল্প বানিয়ে বলা জায়েজ নয়। যেমন, স্বামী কল দেয়নি, তবুও অন্যদের কাছে বলা যে 'সে কল দিয়েছে' বা সে যা দেয়নি তা নিয়ে অন্যদের কাছে মিথ্যা প্রশংসা করে গর্ব করা শরিয়তে নিষিদ্ধ।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মহব্বত বাড়ানোর জন্য শরিয়তে একে অপরের সাথে সরাসরি কথা বলার সময় কিছুটা বাড়িয়ে বলার সুযোগ রয়েছে (যেমন স্ত্রীকে খুশি করতে স্বামী তার গুণের প্রশংসা করল)। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে গিয়ে স্বামী বা স্ত্রীর ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য দিয়ে গর্ব করা সাধারণ মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত এবং এটি জায়েজ নেই।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী মুহাম্মাদ রাশেদুল ইসলাম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১