স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য তালাক না দেওয়ার বিধান কী?
প্রশ্নঃ ১৬৪৮১৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, স্বামী স্ত্রী বিবাদের কারণে স্ত্রী কে বাবার বাড়িতে রাখা হয়।এবং তাদের কন্যা কে বাবার কাছেই রাখেন।বলা হয়েছিল মা সুস্থ হওয়া অব্দি কন্যা তার বাবার বাড়িতেই থাকবেন।স্বামী কন্যা কে একবারের জন্য ও তার মায়ের সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ করতে দেননি।বলা হয় কাগজ পাঠিয়ে দিবেন।মুখে কোন তালাক শব্দ ব্যবহার করেন নি।উনি স্ত্রীর খরচ বা কোন প্রকার দায়িত্ব পালন করেননি।সম্পর্ক নাই বললেই চলে।কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে স্ত্রী কে তালাক শব্দ দিয়ে শেষ করছেন না।যাতে সে অন্য কোথাও বিয়ে বসতে না পারেন।১ বছর হয়ে গেছে। এখন করনীয় কি?
১৫ আগস্ট, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ইসলাম অকারণে সংসার ভেঙে ফেলাকে পছন্দ করে না। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় তালাক ইসলামে পছন্দনীয় নয়। তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন বিরোধ সৃষ্টি হলে, একসঙ্গে সংসার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং সংশোধনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন শরীয়ত বিচ্ছেদের পথও রেখেছে।
এক্ষেত্রে প্রথমে স্বামীকে বুঝানো উচিত। নিজের পক্ষ থেকে বুঝিয়ে কাজ না হলে উভয় পরিবারের মুরব্বি ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা উচিত। এরপরও যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে শরীয়তসম্মতভাবে বিচ্ছেদের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
* স্ত্রীর করণীয়
স্ত্রী নিজে থেকে স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন না—যদি স্বামী তাকে তালাকের অধিকার (তাফওয়ীযে তালাক) অর্পণ না করে থাকেন।
তবে বর্তমানে অনেক কাবিননামায় ১৮ নম্বর ধারায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার অর্পণ করা হয়ে থাকে। যদি প্রশ্নোক্ত নারীর কাবিননামায় এই অধিকার দেওয়া থাকে এবং তা কার্যকর হওয়ার মতো কোনো শর্ত পূরণ হয়ে থাকে, তাহলে তিনি স্বামীর নতুন অনুমতি ছাড়াই অর্পিত অধিকার অনুযায়ী নিজের ওপর তালাক কার্যকর করতে পারবেন।
আর যদি স্বামী তাকে তালাকের অধিকার অর্পণ না করে থাকেন, তাহলে স্ত্রী নিজে থেকে তালাক কার্যকর করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে তিনি স্বামীর সঙ্গে খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ করতে পারেন যেমন, স্বামীর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে মোহর ফেরত দেওয়া, মাফ করা বা টাকার বিনিময়ে বিচ্ছেদ নেওয়া।
* প্রশ্নোক্ত ঘটনার ক্ষেত্রে
যেহেতু প্রায় এক বছর ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক নেই, স্ত্রীকে কোনো খরচ দেওয়া হচ্ছে না এবং স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে তালাকও দিচ্ছেন না, তাই বিষয়টি এভাবে অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা সমাধান নয়।
প্রথমে উভয় পরিবারের মুরব্বি ও নির্ভরযোগ্য আলেমের মাধ্যমে মীমাংসার শেষ চেষ্টা করা উচিত। তাতেও সমাধান না হলে, কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছে কি না দেখে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর তা না থাকলে খুলা অথবা শরয়ি ফয়সালার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
শুধু স্ত্রীকে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে তালাক না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা শরীয়তের উদ্দেশ্য নয়। তবে স্বামী তালাক না দিলেই স্ত্রী নিজে থেকে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবেন এমনও নয়; বৈবাহিক সম্পর্ক শরয়ি পদ্ধতিতে শেষ হওয়া আবশ্যক।
(سورة البقرة-229)
فَإنْ خِفْتُمْ أَنْ لاَ يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيما افْتَدَتْ بِهِ
(رد المحتار-كتاب الطلاق، باب تفويض الطلاق-4/452)
وأنواعه ثلاثة : تفويض ، وتوكيل ، ورسالة وألفاظ التفويض ثلاثة : تخيير وأمر بيد ، ومشيئة .
( قال لها اختاري أو أمرك بيدك ينوي ) تفويض ( الطلاق ) لأنها كناية فلا يعملان بلا نية ( أو طلقي نفسك فلها أن تطلق في مجلس علمها به ) مشافهة أو إخبارا ( وإن طال ) يوما أو أكثر ما لم يوقته ويمضي الوقت قبل علمها ( ما لم تقم ) لتبدل مجلسها حقيقة ( أو ) حكما بأن ( تعمل ما يقطعه ) مما يدل على الإعراض لأنه تمليك فيتوقف على قبول في المجلس لا توكيل ، فلم يصح رجوعه ، حتى لو خيرها ثم حلف أن لا يطلقها فطلقت لم يحنث في الأصح ( لا ) تطلق ( بعده ) أي المجلس ( إلا إذا زاد ) في قوله طلقي نفسك وأخواته ( متى شئت أو متى ما شئت أو إذا شئت أو إذا ما شئت ) فلا يتقيد بالمجلس ( ولم يصح رجوعه ) لما مر
* যদি সত্যিই স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে শুধু ঝুলিয়ে রাখেন, তার ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার ও স্বাভাবিক বৈবাহিক জীবনযাপনের অধিকার আদায় না করেন এবং এর ফলে স্ত্রীকে দীর্ঘদিন শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, আর উদ্দেশ্য হয় তাকে অন্যত্র বিবাহ থেকে বাধা দেওয়া, তাহলে এ আচরণ জুলুম, নির্যাতন ও গুনাহের কাজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُوا
“তোমরা তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না, যাতে সীমালঙ্ঘন করো।” সূরা আল-বাকারা- ২৩১
অতএব, স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে তালাক না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা শরীয়তসম্মত নয়। আল্লাহ তাআলা আরও নির্দেশ দিয়েছেন দাম্পত্য সম্পর্ক হয় সুন্দরভাবে বজায় রাখতে হবে, অথবা সুন্দরভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ জুলুমের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেছেন,
اتَّقُوا الظُّلْمَ، فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।” সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৭৮
আরেক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا عِبَادِي، إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تَظَالَمُوا
“হে আমার বান্দারা! আমি জুলুমকে আমার ওপর হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।” সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৭৭
সুতরাং স্ত্রীর শরয়ি অধিকার আদায় না করে, ভরণপোষণ না দিয়ে, দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এবং শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন ও কষ্টের মধ্যে রেখে, শুধু তাকে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে তালাক না দিয়ে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা অত্যন্ত নিন্দনীয় জুলুম ও গুনাহের কাজ। এর জন্য তাকে আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
তাওহীদুল ইসলাম
নায়েবে মুফতী, ফতোয়া বিভাগ
জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, সাত মসজিদ, মুহাম্মদপুর
নায়েবে মুফতী, ফতোয়া বিভাগ
জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, সাত মসজিদ, মুহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১