পশু জাবাইয়ের বিধানের ওপর আপত্তির অপনোদন
প্রশ্নঃ ১৫৫৪০৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মুশরিকরা অনেক সময় ইসলাম ও মুসলিমদের অপমান করার উদ্দেশ্যে বলে থাকে যে, ইসলামে প্রাণীকে কষ্ট দিতে নিষেধ করে, আবার সেই প্রাণীকেই কষ্ট দিয়ে জবাই করে তার মাংস ভক্ষণ হালাল করেছে!
কেউ কুকুরকে পানি পান করিয়ে জান্নাতে যায় আবার, কুকুরকে আল্লাহর রাসূল সা. হত্যা করতে বলেন। এমন দ্বিমুখী নীতি কেনো?
১০ জুন, ২০২৬
চাঁদপুর
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
ইসলামে কোনো দ্বিমুখী নীতি নাই। বরং ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনে আল্লাহ তায়ালার আমর (আদেশ) এবং সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত হিকমত এবং মানবকল্যাণ নিহিত রয়েছে। সমালোচকদের এই আপত্তি মূলত ইসলামের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা এবং হাদিসের প্রেক্ষাপট না বোঝার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। অথবা বুঝেও জ্ঞান পাপী মনোভাবের কারণে হয়েছে।
নিচে আপনার উত্থাপিত দুটি পয়েন্টের সুনির্দিষ্ট ও রেফারেন্সভিত্তিক যৌক্তিক জবাব দেওয়া হলো:
১. প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া বনাম মাংস ভক্ষণের জন্য জবাই করা:
ইসলামের নীতি হলো অকারণে বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া বা হত্যা করা হারাম। কিন্তু মানুষের জীবনধারণ ও পুষ্টির প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কিছু প্রাণীকে সুনির্দিষ্ট নিয়মে জবাই করার অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন, কারণ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব এবং দুনিয়ার সকল মাখলুক মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করা হয়েছে। কাজেই জবাই করে প্রাণী ভক্ষণ করা আর অকারণে প্রাণী হত্যা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এতে কোনো দ্বিচারিতা নেই।
5515 - حَدَّثَنَا أَبُو النُّعْمَانِ، حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ أَبِي بِشْرٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ ابْنِ عُمَرَ، فَمَرُّوا بِفِتْيَةٍ، أَوْ بِنَفَرٍ، نَصَبُوا دَجَاجَةً يَرْمُونَهَا، فَلَمَّا رَأَوْا ابْنَ عُمَرَ تَفَرَّقُوا عَنْهَا، وَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: «مَنْ فَعَلَ هَذَا؟» إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ مَنْ فَعَلَ هَذَا " تَابَعَهُ سُلَيْمَانُ، عَنْ شُعْبَةَ، حَدَّثَنَا المِنْهَالُ، عَنْ سَعِيدٍ، عَنْ ابْنِ عُمَرَ: «لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ مَثَّلَ بِالحَيَوَانِ» وَقَالَ عَدِيٌّ، عَنْ سَعِيدٍ، عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
৫১১৯। আবু নু‘মান (রাহঃ) ......... সা‘ঈদ ইবনে জুবাইর (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেনঃ আমি ইবনে ‘উমর (রাযিঃ) -এর কাছে ছিলাম। এরপর আমরা একদল তরুণ, কিংবা তিনি বলেছেন, একদল মানুষের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, তারা একটি মুরগি বেধে তার প্রতি তীর ছুড়ছে। তারা যখন ইবনে ‘উমর (রাযিঃ) -কে দেখতে পেল, তখন তারা তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ইবনে ‘উমর (রাযিঃ) বললেনঃ এ কাজ কে করেছে? এ কাজ যে করে নবী করীম (ﷺ) তার উপর অভিশাপ দিয়েছেন।
শু‘বা (রাহঃ) থেকে সুলাইমান অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। মিনহাল, ইবনে ‘উমর (রাযিঃ) এর সূত্রে বলেন, যে ব্যক্তি পশুর অঙ্গহানি ঘটায় তাকে নবী করীম (ﷺ) অভিসম্পাত করেছেন।
সহীহ বুখারী
৫৮- যবাহ করা ও শিকারের অধ্যায়
হাদীস নংঃ ৫১১৯
আন্তর্জাতিক নং: ৫৫১৫https://muslimbangla.com/hadith/5119
সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১৯৫৮।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন, "তোমরা কোনো প্রাণসম্পন্ন জিনিসকে (তীর বা অস্ত্রের আঘাতের) নিশানা বানিও না।" সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১৯৫৭।
তাছাড়া প্রাণীকে জবাই করার সময় কষ্ট না দেওয়ার ব্যাপারেও ইসলামে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ " .
অর্থ: আল্লাহ তাআ’লা প্রত্যেক বিষয়ে তোমাদের উপর ইহসান (যথাসাধ্য সুন্দর রূপে সম্পাদন করা) অত্যাবশ্যক করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন (কাউকে) হত্যা করবে, তখন উত্তম পন্থার সাথে হত্যা করবে; আর যখন যবেহ করবে তখন উত্তম পন্থায় যবেহ করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধার করে নেয় এবং তার যবেহকৃত জন্তুকে শান্তি প্রদান করে (অহেতুক কষ্ট না দেয়)। সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ৪৮৯৭
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/11946
এটি কোনো দ্বিমুখী নীতি নয়। যেমন একটি দেশের আইন মানুষকে আঘাত করা অপরাধ বলে গণ্য করে, কিন্তু চিকিৎসার প্রয়োজনে সার্জারি করার সময় ছুরি দিয়ে শরীর কাটার অনুমতি দেয়। একইভাবে, অকারণে প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া অপরাধ, কিন্তু মানুষের জীবনধারণের জন্য দয়ার্দ্র নিয়মে জবাই করা সম্পূর্ণ বৈধ।
২. কুকুরকে পানি খাইয়ে জান্নাত বনাম কুকুর হত্যার নির্দেশ:
কুকুর সংক্রান্ত ইসলামের বিধানকে বুঝতে হলে প্রথমত এটি জানতে হবে যে—ইসলামে কোনো প্রাণীর প্রতিই অকারণে নিষ্ঠুরতা সমর্থন করে না, আবার জননিরাপত্তার স্বার্থে ক্ষতিকর প্রাণীকে দমন করার আদেশ দেয়।
ইসলামের সাধারণ শিক্ষা হলো—সব সৃষ্টির প্রতি দয়া করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যভিচারী নারী ও এক ব্যক্তির ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যারা পিপাসার্ত কুকুরকে জুতোয় করে কুয়ো থেকে পানি এনে খাইয়েছিল এবং এই দয়াশীলতার কারণে আল্লাহ তাদের জান্নাত দান করেন (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩২৮০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৪৪) এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ অবস্থায় নিরীহ কুকুরের প্রতি দয়া করাও অনেক বড় সওয়াবের কাজ
কিন্তু কুকুর হত্যার নির্দেশের পেছেনে ভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে এবং তার যথার্থ ব্যাখ্যাও রয়েছে।
মদিনায় একসময় জলাতঙ্ক রোগ বা কুকুরের সংখ্যা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তখন সাময়িকভাবে রাসুল (সা.) কুকুর হত্যার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই সাধারণ নির্দেশটি মনসুখ বা রহিত করে দেওয়া হয়।
আল-মিনহাজ শরহ সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৩৫।
যাদুল মা'আদ (زاد المعاد), খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪১৭।
আইনটি রহিত হওয়ার প্রমাণ: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, "আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাদের কুকুর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন... পরবর্তীতে তিনি তা নিষেধ করেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭২) https://muslimbangla.com/hadith/10924
হিংস্র ও ক্ষতিকর কুকুর হত্যা:
আইন রহিত হওয়ার পর শুধুমাত্র মানুষের জন্য বিপজ্জনক, কামড়াতে আসে এমন জলাতঙ্কগ্রস্ত বা হিংস্র ও কালো কুকুর (যা সাধারণত বেশি ক্ষতিকারক হয়) হত্যার অনুমতি বহাল রাখা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُغَفَّلٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " لَوْلاَ أَنَّ الْكِلاَبَ أُمَّةٌ مِنَ الأُمَمِ لأَمَرْتُ بِقَتْلِهَا فَاقْتُلُوا مِنْهَا الأَسْوَدَ الْبَهِيمَ "
"যদি কুকুররা আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের মাঝে একটি উম্মত বা জাতি না হতো, তবে আমি সব কুকুর হত্যার নির্দেশ দিতাম (কিন্তু তারা একটি জাতি, তাই ঢালাওভাবে হত্যা করা যাবে না)।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮৪৫)
https://muslimbangla.com/hadith/17183
প্রয়োজনে কুকুর পোষার অনুমতি:
ইসলামে শিকারের জন্য, ঘরবাড়ি, ফসল বা গবাদিপশু পাহারার জন্য কুকুর রাখার স্পষ্ট অনুমতি দেওয়া হয়েছে (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭১) https://muslimbangla.com/hadith/10923
সারকথা: ইসলামের কোনো বিধানেই বৈপরীত্য নেই। বরং প্রতিটি বিধানের পেছনেই খোদায়ী হিকামাহ এবং মানব সম্প্রদায়ের জন্য কল্যাণ রয়েছে। তার কিছু হয়তো আমরা উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু অধিকাংশই উপলব্ধি করতে পারি না। নিরীহ ও সাধারণ অবস্থায় কুকুরের প্রতি দয়া করা এবং পানি খাওয়ানো জান্নাতে যাওয়ার উসিলা। পক্ষান্তরে, সমাজে যখন কোনো হিংস্র বা জলাতঙ্কগ্রস্ত কুকুর, পাগলা কুকুর মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন জননিরাপত্তার স্বার্থে তা দমন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি যেকোনো আধুনিক ও সভ্য সমাজের আইনের মতোই অত্যন্ত যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১