কার কাছ থেকে ইলিম শিখবেন?
প্রশ্নঃ ১৪৫৫২৫. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, বর্তমানে এই ফিতনার যুগে আলেমদের কার্যকলাপ এর জন্য তাদের উপর বিশ্বাস করতে পারছি না তাই আল কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বলেন কোন ধরনের আলেমদের কাছ থেকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা সবচাইতে ভালো হবে
২৬ মার্চ, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী দ্বীনি ভাই!
আপনার প্রশ্নের উত্তর কি বলে লেখা শুরু করবো সেটা ভাবতে আমাদের কিছুটা সময় লেগেছে। কালের দুর্বিপাকে, স্বার্থপর দুনিয়াবীর বেড়াজালে আটকে গিয়ে আলেম নামধারী কিছু মানুষ সমাজে অনৈতিক এবং বেশরঈ কাজ যে করছে না সেটা কিন্তু নয়; আগে আপনার মনে এই খটকা, আলেমদের প্রতি এই অনাস্থা কেন আসলো তার দুই একটা কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করি।
১. আমাদের কাছে আপনার এই অনস্থার প্রধানতম কারণ মনে হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে মানুষের মধ্যে ইলমে দ্বীনের শূণ্যতা। অর্থাৎ আমরা এখন শরীয়তের পরিপক্ব ইলম থেকে তো দূরে সরে গিয়েছি-ই বরং নূন্যতম জরুরী ইলম থেকেও ছিঁটকে পড়তে শুরু করেছি। যার ফলে আমরা কোনটা শরীয়ত এবং কোনটা জাহালাত সেটা নির্ণয় করতে ব্যর্থ হচ্ছি। এবং এর ধারাবাহিকতায়ই আমরা আলেম চিনতেও ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমান জামানায় অতি পরিচিত, অতি জশ-খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিকেই আমরা বিজ্ঞ আলিম হিসেবে নির্ণয় করছি। এটা কিছুতেই সঠিক নয়। কাজেই প্রথমে নিজেদের মধ্যে আলেম চেনার মতো ইলমী যোগ্যতাও রাখতে হবে।
২. যাদের আনুসরণ আমরা করি তাদেরকে মানুষ ভাবি না; বরং তাদের মনে করি আসমানের ফেরেশতা। মনে করি তারা ভুলে ঊর্ধ্বে। তাদের দ্বারা এটি হবে কেন? এই মানসিকতা পরিহার করাও আবশ্যক। কেননা মানবীয় দুর্বলতা আল্লাহ সকল মানুষের মধ্যেই দিয়েছেন। মানবীয় দুর্বলতার উর্ধ্বে ওঠে তিনি যেই কাজগুলো করেন সেগুলোই অনুসরণীয়। তার ভুলত্রুটি ক্ষমাযোগ্য কিংবা অগ্রহনযোগ্য।
৩. গ্রহন এবং প্রত্যাখ্যানের সীমা নির্ধারণে পরিমিতবোধের অভাব। মানুষ যাকে অনুসরণ করে তার কোনো ছোট ভুল ধরা পড়লে তার অতীত জীবনের বড়বড় কৃতিত্বকেও অগ্রাহ্য করে বসে। মনে করে তিনি এই কাজ করেছেন! কাজেই তার পেছনের জীবনের সবই বেকার। এর বিপরিতে দ্বীন-শরীয়তসম্পর্কে ব’কলম কোনো মানুষও যদি কোনো একটি ভালো কথা বলতে পারে, একটি সুন্দর আচরণ প্রদর্শন করতে পারে তাহলে তাকেই অনুসরণীয় বানিয়ে ফেলি।
৪. মিডিয়ার অপপ্রচার। আপাতত এই চারটি কারণের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখলাম।
করণীয়:
প্রিয়ভাই আপনি কোন ধরনের আলেমদের কাছ থেকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা সবচাইতে ভালো হবে মর্মে জানতে চেয়েছেন। তার আগে আমরা যদি আপনাকে প্রশ্ন করি বর্তমান সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যেই অস্থিরতা এবং জাল-জালিয়তি চলছে সেক্ষেত্রে আপনি, আমি, আমরা কি করি? নিশ্চয় নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে ভালো চিকিৎসক খুঁজে পেতে চেষ্টা করি! এখানেও আমাদের তা-ই করতে হবে। ভালো আলেম, আহলে দ্বীল, আহলুল্লাহ এবং আহলুত তাকওয়া ওলামায়ে কেরামকে খুঁজে নিতে হবে। তাদের মাঝেও যদি কোনো ভুল ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় তাহলে সেগুলো মানবীয় দুর্বলতা মনে করে এড়িয়ে গিয়ে যতটুকু ভালো ততটুকু গ্রহন করতে হবে।
মনে রাখতে হবে সন্ধা যতই ঘনিয়ে আসে সূর্যের তাপও ততই কমতে থাকে। নবুয়তের সূর্য আমাদের থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর অতিক্রম করে চলে গেছে। কাজেই নববী সূর্যের কিরণের ম্লান এবং তার উত্তাপের অবনমনের প্রভাব সবখানেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য করণীয় হলো নবী সা. যা বলেছেন তাই।
وَعَنْ ثَوْبَانَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّمَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي الْأَئِمَّةَ الْمُضِلِّينَ وَإِذَا وُضِعَ السَّيْفُ فِي أُمَّتِي لَمْ يُرْفَعْ عَنْهُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد والترمذيُّ
হযরত সওবান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলিয়াছেনঃ আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে পথভ্রষ্টকারী নেতাদের খুব বেশী ভয় করিতেছি। আর আমার উম্মতের উপরে যখন একবার তলোয়ার চলিতে থাকিবে, তখন আর কিয়ামত পর্যন্ত তাহাদের হইতে উহা উঠিবে না। — আবু দাউদ ও তিরমিযী
হাদিসের ব্যাখ্যা:
‘পথভ্রষ্টকারী নেতা' দ্বারা গোমরাহ, বেদ'আতী ও বেশরীঅতী আলেম, পীর অথবা যালিম নেতা ও শাসক, যাহারা অনৈসলামিক কাজের দিকে মানুষদিগকে আহ্বান করে তাহাদিগকে বুঝান হইয়াছে। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর উপর প্রথম তলোয়ার চালানো হইয়াছে, যাহা অদ্যাবধি উঠে নাই এবং কিয়ামত পর্যন্ত উহা উঠার সম্ভাবনাও নাই।
কাজেই ফিতনার এই ধারা কেয়ামত পর্যন্তই চলতে থাকবে। আমাদের হিদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদ্বীনের আদর্শ অনুসরন করতে হবে।
হাদিস:
'আব্দুল্লাহ্ ইবন আহমদ ইবন বাশীর ইবন যাকওয়ান দিমাকী (রাহঃ)...... ইয়াহইয়া ইবন আবু মুতা' (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন ঃ আমি ইরবায ইবন সারিয়া (রাযিঃ)-কে বলতে শুনেছি: একদিন রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নসীহত করলেন। এতে আমাদের অন্তরে ভয়ের সঞ্চার হলো এবং চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে এলো। তখন জিজ্ঞাসা করা হলো : ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাদের বিদায় গ্রহণকারী ব্যক্তির ন্যায় নসীহত করলেন, সুতরাং এ ব্যাপারে আপনি আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিন। তখন তিনি বললেনঃ তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে আর শুনবে ও অনুসরণ করবে, যদিও তোমাদের নেতা হাবশী গোলাম হয়। আমার পরে অচিরেই তোমরা কঠিন মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের উপর আমার সুন্নত এবং হিদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদ্বীনের আদর্শের উপর অবিচল থাকা অপরিহার্য। তোমরা তা শক্তভাবে আঁকড়িয়ে ধরে থাকবে। সাবধান! তোমরা নতুন উদ্ভাবিত জিনিস (বিদ'আত) পরিহার করবে। কেননা প্রত্যেক বিদ'আতই গুমরাহী।
হাদিসের লিংক এবং ব্যাখ্যা: https://muslimbangla.com/hadith/25332।
ইলিম অর্জনের পথ ও পদ্ধতি: সম্পর্কে জানতে নিচের লিংক দুটি দেখুন।
https://muslimbangla.com/article/376
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর পরিচয়: https://muslimbangla.com/masail/7921
আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবত ছাড়া দ্বিনের ওপর টিকে থাকা প্রায়ই অসম্ভব। তাই তাদের সোহবতও অপরিহার্য। নিচের পরামর্শটি দেখুন। https://muslimbangla.com/masail/47799
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
সাইদুজ্জামান কাসেমি
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১