বারবার বিপদ আসার কারণ কি?
প্রশ্নঃ ১৩৭৬৭৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, বারবার বিপদ আসার কারণ কি? বিপদ দূর করার জন্য কি আমল করবো?
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
চৌদ্দগ্রাম
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
জীবনে বারবার বিপদ আসা বা কষ্টের সম্মুখীন হওয়াটা মানুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বারবার বিপদ আসার কিছু কারণ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ঈমানের পরীক্ষা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, তিনি মুমিনদের পরীক্ষা করবেন। যার ঈমান যত শক্তিশালী, তার পরীক্ষাও তত কঠিন হয়।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ 155
আয়াতঃ وَلَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَالۡجُوۡعِ وَنَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَنۡفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ؕ وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ ۙ
অর্থঃ আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনও) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়।
নবী-রাসূলগণের জীবনে সবচেয়ে বেশি বিপদ আসত। সুতরাং বিপদ আসা মানেই আল্লাহ আপনার উপর অসন্তুষ্ট—এমনটা ভাবা ভুল। এটি আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা হতে পারে।
২. গুনাহ মাফ ও মাকাম বৃদ্ধি
কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা বান্দাকে দুনিয়াতে ছোটখাটো বিপদ দিয়ে তার অতীতের গুনাহগুলো মুছে দিতে চান, যেন আখেরাতে তাকে আর শাস্তি ভোগ করতে না হয়।
হাদীস শরীফে এসেছে,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلاَ وَصَبٍ وَلاَ هَمٍّ وَلاَ حُزْنٍ وَلاَ أَذًى وَلاَ غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلاَّ كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ ".
আবু সা‘ঈদ খুদরী ও আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম (ﷺ) বলেছেনঃ মুসলিম ব্যক্তির উপর যে সকল যাতনা, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আপতিত হয়, এমন কি যে কাটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এ সবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহ সমুহ ক্ষমা করে দেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নংঃ ৫৬৪১ - ৫৬৪২)
৩. আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা
মানুষ যখন অনেক দিন সুখে থাকে, তখন অনেক সময় সে আল্লাহকে ভুলে যায় বা ইবাদতে অলসতা করে। তখন আল্লাহ তাকে ছোট কোনো বিপদ দিয়ে সতর্ক করেন, যেন সে পুনরায় আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তওবা করে। বিপদ মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করে।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
সূরাঃ আল মু'মিনূন - আয়াত নংঃ 76
আয়াতঃ وَلَقَدۡ اَخَذۡنٰہُمۡ بِالۡعَذَابِ فَمَا اسۡتَکَانُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَمَا یَتَضَرَّعُوۡنَ
অর্থঃ আমি তো তাদেরকে (একবার) শাস্তিতে ধৃত করেছিলাম। তখনও তারা নিজ প্রতিপালকের সামনে নত হয়নি এবং তারা তো কোন রকম অনুনয়-বিনয় করে না।
বোঝা যায়, বিপদের উদ্দেশ্যই হলো বিনয় ও আল্লাহর দিকে ফেরা।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
সূরাঃ আস সিজদাহ্ - আয়াত নংঃ 21
আয়াতঃ وَلَنُذِیۡقَنَّہُمۡ مِّنَ الۡعَذَابِ الۡاَدۡنٰی دُوۡنَ الۡعَذَابِ الۡاَکۡبَرِ لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ
অর্থঃ এবং সেই বড় শাস্তির আগে আমি তাদেরকে অবশ্যই লঘু শাস্তির স্বাদও গ্রহণ করাব। #%১১%# হয়ত তারা ফিরে আসবে।
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
সূরাঃ ইউনুস - আয়াত নংঃ 12
আয়াতঃ وَاِذَا مَسَّ الۡاِنۡسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنۡۢبِہٖۤ اَوۡ قَاعِدًا اَوۡ قَآئِمًا ۚ فَلَمَّا کَشَفۡنَا عَنۡہُ ضُرَّہٗ مَرَّ کَاَنۡ لَّمۡ یَدۡعُنَاۤ اِلٰی ضُرٍّ مَّسَّہٗ ؕ کَذٰلِکَ زُیِّنَ لِلۡمُسۡرِفِیۡنَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
অর্থঃ মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে (সর্বাবস্থায়) আমাকে ডাকে। তারপর আমি যখন তার কষ্ট দূর করে দেই, তখন সে এমনভাবে পথ চলে যেন সে কখনও তাকে স্পর্শ করা কোনও বিপদের জন্য আমাকে ডাকেইনি! যারা সীমালংঘন করে তাদের কাছে নিজেদের কৃতকর্মকে এভাবেই মনোরম করে তোলা হয়েছে।
৪. গুনাহের পরিণাম
মাঝে মাঝে আমাদের নিজেদের কৃতকর্ম বা গুনাহের ফলেও বিপদ আসে। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
সূরাঃ আশ্-শূরা - আয়াত নংঃ 30
আয়াতঃ وَمَاۤ اَصَابَکُمۡ مِّنۡ مُّصِیۡبَۃٍ فَبِمَا کَسَبَتۡ اَیۡدِیۡکُمۡ وَیَعۡفُوۡا عَنۡ کَثِیۡرٍ ؕ
অর্থঃ তোমাদের যে বিপদ দেখা দেয়, তা তোমাদের নিজ হাতের কৃতকর্মেরই কারণে দেখা দেয়। আর তিনি তোমাদের অনেক কিছুই (অপরাধ) ক্ষমা করে দেন।
বিপদ থেকে মুক্তির জন্য ৫টি শক্তিশালী আমল:
১. সবর বা ধৈর্য ধরা
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
৩. দোয়া ইউনুস পাঠ করা
৫. নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া
মনে রাখবেন: রাতের অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে থাকে। আপনার বর্তমান কঠিন সময়টি হয়তো আপনার জন্য অনেক বড় কোনো কল্যাণের দরজা খুলে দেবে।
আমাদের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে আমরা অনেক সময় ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারি না। কোনো বিপদে পড়লে আমরা অস্থির হয়ে যাই, অথচ সেই বিপদের মাধ্যমেই হয়তো আল্লাহ আমাদের কোনো বড় ক্ষতি থেকে বাঁচান কিংবা আমাদের জন্য স্থায়ী কোনো কল্যাণের পথ খুলে দেন।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হিয়েছে,
সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ 216
আয়াতঃ کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِتَالُ وَہُوَ کُرۡہٌ لَّکُمۡ ۚ وَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ۚ وَعَسٰۤی اَنۡ تُحِبُّوۡا شَیۡئًا وَّہُوَ شَرٌّ لَّکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ ٪
অর্থঃ তোমাদের প্রতি (শত্রুর সাথে) যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, আর তোমাদের কাছে তা অপ্রিয়। এটা তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক। আর এটাও সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে পছন্দ কর, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মন্দ। আর (প্রকৃত বিষয় তো) আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।
এই আয়াতটি আমাদের শেখায় যে, আমাদের ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা অনেক বেশি নিখুঁত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমিনের অবস্থা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন:
" عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ " .
মু’মিনের অবস্থা ভারী অদ্ভুত। তাঁর সমস্ত কাজই তাঁর জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ব্যতিত অন্য কারো জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যাবস্থা নেই। তাঁরা আনন্দ (সুখ শান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়, আর দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এও তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ২৯৯৯)
পরিশেষে: আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর অটল থেকে তাঁর কাছে কল্যাণ কামনা করাই হলো প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দান করুন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
আব্দুল কাইয়ুম
মুফতী ও মুহাদ্দিস, দারুল কুরআন আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা
মুহাম্মদপুর, ঢাকা
মুফতী ও মুহাদ্দিস, দারুল কুরআন আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা
মুহাম্মদপুর, ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১