অন্তরের সম্পদ বের করা
অন্তরের সম্পদ বের করা
[মানুষের মাঝে আল্লাহ অসীম সম্ভাবনা ও গুণাবলী (আল্লাহর ৯৯ নামের প্রতিচ্ছবি) লুকিয়ে রেখেছেন। বাইরের জগতে যেমন মানুষ চাবি আবিষ্কার করে পাথর, তামা, লোহার ব্যবহার শিখেছে—ঠিক তেমনি নিজের ভেতরের এই সম্পদ আবিষ্কারের জন্যও চাবি প্রয়োজন। সেই চাবি হলো দ্বীন, নবীদের অনুসরণ এবং আমল।
পার্থক্য শুধু এই: দুনিয়া আবিষ্কার করতে গিয়ে মানুষ বাইরে ডুব দিয়েছে, আর নিজেকে আবিষ্কার করতে হলে তাকে অন্তরে ডুব দিতে হবে, দুনিয়া থেকে কিছুটা সরে আসতে হবে। শুয়োপোকা যেমন প্রজাপতিতে রূপান্তরের সম্ভাবনা নিজের ভেতরেই বহন করে, তেমনি প্রতিটি মানুষের ভেতরেই ওলি-আল্লাহ হওয়ার সম্ভাবনা লুকানো আছে। এই আমলের মাধ্যমেই আমরা নিজের অজানা নিজেকে আবিষ্কার করি, মরণোত্তর জীবনের জন্য অমূল্য পুঁজি সংগ্রহ করি।
বাইরের জিনিসের চাবি যেমন মানুষের বুদ্ধিতে ছিল, ভেতরের জিনিসের চাবিও মানুষের অন্তরেই আছে—শুধু খুঁজে বের করতে হবে]
الحمد لله نستعينه ونعوذ به من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلله فلا هادي له. ونشهد ان لا إله إلا الله ونشهد أن محمد عبده ورسوله. فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم، بسم الله الرحمن الرحيم،
اللهُ نُوْرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ...
وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم:
الناس معادن كمعادن الفضة
(মানুষ খনির মতো, যেমন রুপার খনি)
আমরা যদি আজ থেকে পেছনে চলে যাই: দুইশ বছর, পাঁচশ বছর, হাজার বছর, তো বর্তমান দুনিয়াতে আমরা বিভিন্ন জিনিস থেকে যে ফায়দা পাচ্ছি, এটি পেছনে গেলে পাব না।
এরোপ্লেন ছিল না, রেলগাড়ি ছিল না, মোবাইল ছিল না। এই সব জিনিস বর্তমানের আবিষ্কার। অথচ দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা এমন একটি কণাও বৃদ্ধি করেননি, যা আগে ছিল না। একমাত্র লোহা... আল্লাহ তায়ালা এই লোহা সম্পর্কে বলেছেন:
وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيْد
লোহাকে আল্লাহ তায়ালা পরবর্তীতে অবতরণ করেছেন, নাযিল করেছেন। কিন্তু তাও হাজার হাজার বছর আগে। আদম আ.-এর সময় অথবা তারও আগে। তো সে হিসেবে এটাও আমাদের চিন্তার বিষয় নয়, এটিও আগে থেকে ছিল।
তো সব যেহেতু ছিল, তাহলে এই ফায়দাগুলো কেন ছিল না? উপকার কেন পাচ্ছিল না? না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল গাড়ি। অথচ এর সব উপকরণই ছিল। ধরণীর উপর যদিও সব জিনিসই ছিল, লোহাও ছিল, পেট্রলও ছিল, কিন্তু এগুলোর ব্যবহার করার চাবি ছিল না। যেমন একটি গাড়ি; গাড়ির চাবি যদি না থাকে, তাহলে এটি পড়ে থাকবে; এটি ব্যবহার করতে পারবে না।
তো আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এই সুবিধা সন্ধানের শক্তি, পদ্ধতি, আগ্রহ, উদ্দীপনা — সব দিয়েছেন যে, খুঁজে খুঁজে চাবি বের করবে। জিনিসের ব্যবহারের চাবি।
ইতিহাসবিদরা যেরকম বলে থাকে যে, জিনিসের জগতে মানুষ প্রথম চাবি আবিষ্কার করেছেন পাথরের। ওই জামানায় মানুষ পাথরকে ব্যবহার করা শিখেছে। পাথরকে ব্যবহার করা মানে, পাথর দিয়ে ঢিল মারতে পারত। এটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত। এখন তো ছোট ছোট ছেলেরাও ঢিল মারতে পারে। কিছুদিন আগে ছেলেরাই ঢিল মারত, এখন ওরাও বাদ দিয়ে দিয়েছে। আর ওই জামানায় ওটাই প্রথম অস্ত্র। আর এটি ছোট খাটো অস্ত্র নয়; কারণ জীবজগতের বাইরে কেউ ওই ঢিল মারাও জানত না। তো মানুষ প্রথম আবিষ্কার করেছে যে, নিজের হাত ছাড়াও পাথর দিয়ে মানুষকে আঘাত করা যায়।
এরপর এই অস্ত্রকে বিশেষ উন্নত করার চেষ্টা করেছে। পাথরকে বিশেষ আকৃতিতে কাটা, বা পাথর দিয়ে মাটি কাটা। সে সময় তো কোনো অস্ত্র ছিল না, তো পাথরকে ভেঙে বিশেষ আকৃতি দিয়ে এর তীক্ষ্ণতাকে বাড়ানো যায়, যাতে একে কোনো অস্ত্র বলা যেতে পারে। তো যে জামানায় মানুষ পাথরকে অস্ত্র বানানো শিখেছে, অস্ত্রকে ব্যবহার করা শিখেছে, তো ওটা সভ্যতার বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। আর সে জামানাকে বলা হতো পাথর যুগ।
এর পরবর্তীতে মানুষ তামাকে ব্যবহার করা শিখল। অর্থাৎ, এ কথা বলা যেতে পারে যে, মানুষ তামার চাবি পেয়েছে। সে চাবিগুলো কোথায় ছিল? পাথরের চাবি পাথরের ভেতরে ছিল না, পাথরের চাবি ছিল মানুষের ব্রেনের মধ্যে। খুঁজে বের করতে পেয়েছে।
কয়েকজন লোক দরজার একটি বিরাট সুন্দর মহলের সামনে এসে হাজির হলো; কিন্তু প্রবেশ করতে পারছে না। চাবির প্রয়োজন। চাবি ওই মহলের ভেতরে নেই, মহলের বাইরে কোথাও আছে। আগেকার জামানার চাবি, অন্যরকম। এখন খুঁজে দেখ, কার কাছে চাবি। দারোয়ান কোথায়? মালিক কোথায়? কার কাছে চাবি।
বর্তমান জামানার চাবি, এগুলো বিশেষ সংখ্যা, এগুলোর একটি বিশেষ সংযোগ। সে সংখ্যাগুলো যদি তার ব্রেনে থাকে, তাহলে সে সংখ্যাগুলো প্রবেশ করালে দরজা খুলে যায়। এই নীতিটা বড় পুরনো। গল্প ইত্যাদিতে এগুলো চলতে থাকে। বিশেষ করে যে সকল গল্প যুগ যুগ ধরে চলতে থাকে, কখনো কখনো তার আড়ালে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা থাকে, যার কারণে সব জামানায় এর বিশেষ আবেদন বা বিশেষ অর্থ থাকে।
বাচ্চাদের যেসব বই বা গল্প ইত্যাদি আছে, এগুলো দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গাই রয়েছে; কিন্তু ঘুরেফিরে একটা জিনিস প্রায়ই পাওয়া যায় — রাজমহল। কিন্তু এই রাজমহলের দরজা খোলার জন্য প্রয়োজন পাসওয়ার্ডের। একেক দেশে একেক ধরনের রূপকথার মধ্যে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের শব্দ। এই শব্দ যদি বলা হয়, তাহলে দরজা খুলে যায়।
এর মধ্যে আড়ালের একটি কথা থাকে যে, এই সব কিছুর ব্যবহার কিছু জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। এটাকে আরও ব্যাপকভাবে বলা যেতে পারে যে, এটা ব্যবহার করার জ্ঞান যার কাছে আছে। এটা ব্যবহার করার কৌশল দেমাগের মধ্যে কোথাও আছে, এটা ব্যবহার করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
যারা বিভিন্ন উপায় বের করেছেন, তারা খুঁজে খুঁজে খুব চিন্তা-ভাবনা করে বের করেছেন। ভালো করে মন দিয়ে তালাশ করেছেন, আর এ সময় বাকি সবকিছুকে ভুলে গেছেন। ইতিহাসবিদ, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিকদের নানান গল্প, সত্য-মিথ্যা অতিরঞ্জিত সবকিছুই আছে। তবে এদের সবার গল্পে একটি জিনিস পাওয়া যায় যে, তারা কীভাবে নিজের দেমাগের ভেতরে ডুবে ছিলেন। কেন ডুবে ছিলেন? কারণ, তারা গভীর মনোযোগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য-তালাশ করছিলেন।
যেমন, ডুবুরি সমুদ্রে ডুব দেয় মুক্তা খোঁজার জন্য, ঠিক এই বিশ্বজগতের ফায়দার জন্য মানুষের ডুব দেওয়ার আসল জায়গা ওই সমুদ্র নয়, বরং তার দেমাগ। আর তারা এমনভাবে ডুব দিয়েছেন যে, বাইরের জগতের কোনো কিছু তাদের খেয়াল ছিল না।
মাদ্রাসার একজন গণিতজ্ঞ ছিলেন। ওই গণিতের মধ্যেই বেচারির ধ্যান লেগে ছিল। এইজন্য আইএসসি পাস করতে পারেননি অনেকবার পরীক্ষা দিয়ে। কিন্তু কেমন করে বিষয়টি ধরা পড়ল! আল্লাহ যদি চান, তাহলে মানুষের নিকট জানাশোনা হয়েই যায়। যেহেতু আইএসসি পাস করতে পারেননি, তাই ছোটখাটো একটি কোম্পানিতে কেরানির চাকরি নেন। খুব অভাবী পরিবার ছিল। আর ওই ব্যক্তির কাগজ কেনার সামর্থ্য ছিল না, আগেকার জামানার আলিআল্লাহদের মতো। যেমন ইমাম শাফেয়ী রহ. কাগজ কিনতে পারছিলেন না।
গরিব মা, মা-ও টাকা দিতে পারছিলেন না, আর তিনি তো ছোট মানুষ, উপার্জনের সুযোগ নেই। তো তাঁর ঘোরাফেরার সময় যখনই কোনো হাড় বা এ জাতীয় কিছু পেতেন, ঘোড়া, উট ইত্যাদি জানোয়ারের যে হাড় পেতেন, এগুলো মূল্যবান সম্পদ হিসেবে ধুয়ে মুছে যত্ন করে রেখে দিতেন। আর এ হাড়গুলোই ছিল তাঁর নোটবুক। তো তিনিই দুনিয়ার ইমাম হয়েছেন আর খুঁজে ফিরেছেন কাগজ। আর একই কাগজের মধ্যে নীল কালি দিয়ে একবার আবার লাল কালি দিয়ে আরেকবার লিখতেন। অর্থাৎ, লিখতে গিয়ে একবার ভরে গেল, তো অন্য কালি দিয়ে আবার লিখতেন।
কুয়েতের একটি ঘটনা। একজন লোকের একটি জমি সরকার দখলে নিয়ে নেয়। নেওয়ার সময় তাকে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করেই নিয়েছে। আমাদের এখানে তো জমি নেওয়ার সময় এটা ঠিক না, ওটা ঠিক না, ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে উপযুক্ত দাম না দিয়েই নেয়, ওখানে এর সম্পূর্ণ বিপরীত; সরকার তাকে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করেই তার জমি নিয়েছে। আল্লাহর ফজলে আরব জগতে মুসলমানদের মধ্যে দীনদারি অনেক না থাকার পরেও তাদের মোয়ামালা তথা লেনদেন অনেক উন্নত। অনেক টাকা পেল।
সে ভাবল, টাকা যদি জমিয়ে রাখি তবে নষ্ট হয়ে যাবে, তাই ব্যবসা ইত্যাদি বিনিয়োগ করা দরকার। এখন ব্যবসা করব — বললেই তো আর ব্যবসা করা যাবে না, ব্যবসা তো জানতে হবে। ও তো ব্যবসায়ী নয়, ব্যবসা জানেও না। কিন্তু ও ব্যবসায় যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। ও পেয়েছে একুশ মিলিয়ন অর্থাৎ, দুইশ পঞ্চাশ লক্ষ টাকা।
এক জায়গায় গিয়ে দেখেছে, ওখানে নিলাম হচ্ছে। ওখানে তারা ডাকাডাকি করতে করতে বিশ পর্যন্ত উঠেছে। এমন সময় ও গিয়ে হাজির হয়েছে। ও গিয়েই বলল, একুশ। কী জিনিস — এ বিষয়ে কিছুই জানে না।
ও গিয়েই বলল, একুশ। ও পেয়েছিল একুশ হাজার দিনার। ওখানে একুশ বলেছে, এখন ও পেয়ে যাবে। পেয়ে যাওয়ার পরে আরেক লোক এ জিনিসের বড়ই আগ্রহী। সে বলল, আমিও এটি নিতে চাই। সে বলল, আমি তো এটি নিয়ে নিয়েছি। সে বলল, আমাকে দিয়ে দাও। আমি তোমাকে বাড়িয়ে দেব। সে বলল, আচ্ছা নিয়ে নাও। এক আমার পাওনা। সে এক আর একুশ বলেছে। কী জিনিস, এটা আর ওকে বলেনি।
তো যখন ওকে দিল, তখন তাকে দিল এক মিলিয়ন। দশ লক্ষ। ও ভেবেছিল, এক হাজার। কেন? কারণ, ও বিশ বলেছে, একুশ বলেছে; কিন্তু হাজারও বলেনি, মিলিয়নও বলেনি, কিছুই বলেনি। ও সাদাসিধা মানুষ, ও না বুঝেই একুশ বলেছিল। তো মানুষের বোকামির কারণেও অনেক ফায়দা হয়। তো এরকম আল্লাহ তায়ালা তার কিসমতে রেখেছেন যে, এভাবে বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে টাকা দান করবেন।
ওইরকম ছুটির দিন স্কুলে গিয়েছে। যেহেতু ছুটির দিন, কেউই আসেনি, ও দিবাস্বপ্ন সম্পূর্ণ ঘণ্টা ঘুরিয়ে এসেছে। একজন ছাত্রও সামনে ছিল না।
আমি এ কথা এইজন্য বলি, দুনিয়াকে জানতে হলে দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে জানতে পারবে না। যারা দুনিয়াকে আবিষ্কার করেছে, তারা দুনিয়াতে অন্ধ ছিল। নিজের ভেতরে এ তো জোর দিয়েছে যে, কোনো ছাড় নেই। এটি কি সহজ কথা যে, একজন শিক্ষক ক্লাসে পড়াচ্ছেন অথচ একজন ছাত্রও যে নেই — সে টেরই পাচ্ছে না। নিজেকে কী মাত্রায় হারাতে হয়।
আল্লাহওয়ালাদের যেরকম মনোযোগের কথা বলা হয়েছে যে, তীর টেনে বের করে নেওয়া হয়েছে নামাজের ভেতরে আর তিনি টেরই পাননি। এ কথা যেমন আশ্চর্যের, ওই দুনিয়া যারা আবিষ্কার করেছে, তাদের দেমাগের ভেতরে ঢুকলেও এমন আশ্চর্য জিনিস দেখতে পাওয়া যাবে। পার্থক্য এটা যে, নামাজের ভেতরে ধ্যানের যে কথা শুনতে পাই, এটা ছিল কলবের ভেতর আর অন্যান্যদেরটা ছিল দেমাগের ভেতরে। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে যে, একটি দিলের মধ্যে আর আরেকটি বুদ্ধির মধ্যে।
কী আবিষ্কার করেছে? চাবি জোগাড় করেছে। গোটা জগত তার বিশেষ শিষ্টতায় চলে আর সে এই চাবি প্রায় ব্যবহার করতে পারে।
এক সময় মানুষ গরু দিয়ে হালচাষ করতে জানত না। গরু তো ছিল; তার চোখের সামনেই গরু হাঁটত, কিন্তু গরু হাঁটলে কী হবে, এই গরুকে চালানোর জ্ঞান আমার কাছে নেই। অর্থাৎ, এই গরুর চাবি আমার কাছে নেই। গাড়ির মতো। গাড়ি আছে, কিন্তু চাবি না থাকলে আমি গাড়ি খুলতেও পারব না, চালুও করতে পারব না। তো গরু আমার সামনেই আছে, কিন্তু এই গরু চালানোর জন্য যে চাবি প্রয়োজন তথা গরু সম্বন্ধে জ্ঞানের প্রয়োজন, ওটা ছিল না। যখন পেয়েছি, গরুকে দিয়ে কাজ করাচ্ছি।
তারপর এমন জামানা এলো, মানুষ তামার চাবি আবিষ্কার করল। ওই জামানাকে বলা হয়, তাম্র যুগ। স্কুলের ছোট ক্লাসে বিভিন্ন যুগ সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। তারপর এলো লোহার যুগ। অর্থাৎ, প্রতিটি যুগে জিনিসকে ব্যবহার করছে আর এ জগৎকে ব্যবহার করার জন্য একেকটি ধাপ শুরু করেছে।
জিনিস তো হাজার বছর আগেও যা ছিল, বর্তমানেও তা আছে। বর্তমান দুনিয়াতে যা যা আছে, হাজারও বছর আগেও সব ছিল; একটি কণাও বাইরে থেকে নতুন আসেনি। কিন্তু হাজার বছর আগে যদি চলে যান, তবে না আধুনিক শহর পাবেন, না আধুনিক প্রযুক্তি পাবেন, না কিছুই পাবেন না। কী ছিল না? চাবি ছিল না। পেট্রোল ছিল, কিন্তু পেট্রোলকে ব্যবহার করার চাবি ছিল না। এখন চাবি পেয়েছে, এখন ব্যবহার করতে পারে। তো আল্লাহ তায়ালা মানুষের দেমাগ দিয়েছেন, বুদ্ধি দিয়েছেন। দুনিয়ার জিনিসকে ব্যবহার করার জ্ঞান, তার চাবি তার ভেতরে আছে।
আদম আ.-এর আউলিয়াত ফেরেশতাদের উপর যে, আদম আ. জিনিসগুলোর নাম জানতেন। আমরা যেটা জানতাম, আল্লাহ তায়ালা আদম আ.-কে অনেকগুলো জিনিসের নাম শেখালেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে এসব জিনিসের নাম বলতে বললেন, কিন্তু তারা বলতে পারলেন না। আদম আ. এগুলোর নাম বলে দিলেন।
আসলে নাম জানা এমন কী বড় জ্ঞান? আসলে নাম নয়, নাম মানে পরিচয়। নামের সাথে যদি ব্যক্তির জ্ঞানও থাকে। যেমন আমি জানি, তার নাম আবদুর রহমান। মানে আমি আবদুর রহমানকে চিনি। তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। আমি আবদুর রহমানকে ডাকতে পারব। সে আসবে, তাকে দিয়ে আমি আমার কাজ করাতে পারব। তো আদম আ.-কে আল্লাহ তায়ালা অর্থাৎ মানব জাতির দেমাগের ভেতর সব জিনিসের পরিচয়ের একটি মৌলিক সম্ভাবনা দিয়ে রেখেছেন, খোঁজ করে সেখান থেকে বের করতে হবে।
আদম আ.-কে আল্লাহ তায়ালা জিনিসের জ্ঞান দিয়েছেন। সব আদম আ.-এর নসলের ভেতরে এটা আছে। যে খোঁজ করবে সে পাবে। পাথর আবিষ্কার করল, পাথর ব্যবহার করল। তারপর তামা সম্পর্কে জ্ঞান আবিষ্কার করল, তামাকে ব্যবহার করে আরেক ধাপ এগোলো। তো আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সন্ধানের একটি শক্তি দিয়েছে। আর এ শক্তি দিয়ে সে জগৎকে চিনতে পারে। নিজের মনের ভেতর থেকে জগৎকে ব্যবহার করার চাবি বের করতে পারে।
ওই যে বললাম, চাবি জিনিসের মধ্যে থাকে না, চাবি তো তার নিজের ভেতরে রয়েছে। ওই চাবি যে ব্যবহার করতে পারবে, জিনিসও সে ব্যবহার করতে পারে। গাড়ি বাইরে আর চাবি ঘরের ভেতরে। তো গাড়ি চালাতে চাইবে তাকে ঘর থেকে চাবি বের করতে হবে।
আম্বিয়া আ.-এর কাজ — মনের জগৎ উন্নত করা
আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন মানুষের মনের ভেতরের চাবি আবিষ্কার করে তার মনের ভেতরে যে একটা জগৎ আছে, ওটা বাইরের জগতের চেয়ে অনেক উন্নত মানের করা। কিন্তু যে এটা আবিষ্কার করতে পারে, এই চাবি বের করতে পারে, এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে, বাইরের জগৎ এর ধারে কাছেও না।
আল্লাহর ৯৯ নাম — সিফাত মানুষের ভেতরে আছে
আল্লাহ তায়ালার পরিচিতি প্রধানত ৯৯টি নাম বলা হয়; যদিও আল্লাহ তায়ালার পরিচিতি অসংখ্য। কুরআনে করিমের বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ সমুদ্র যদি কালি হয়ে যায় আর সব গাছকে যদি কলম বানানো হয় তবুও আল্লাহর কথা বলে শেষ করতে পারবে না।
আল্লাহর কথার মানে মূলত আল্লাহর পরিচিতির কথা। ৯৯টি নাম যা রাসূল সা. বলেছেন, এগুলো মূলত মৌলিক কয়েকটি। এর অসংখ্য শাখাগত হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা নিজের যে সুন্দর সিফাতের নামগুলো রয়েছে, ওই সিফাতগুলো আল্লাহ তায়ালার সিফাতের অংশ। আল্লাহ তায়ালা মানুষের মধ্যে এই সিফাতগুলোর মৌলিক দিকগুলো দিয়েছেন। যে খোঁজ করবে, সে ওই সিফাতগুলো বের করতে পারবে।
আল্লাহর সিফাত 'আল-আদিল' তথা ন্যায় বিচার করা। ন্যায়-বিচার করার এই গুণ আল্লাহ তায়ালা জন্মগতভাবে মানুষেরও মধ্যে দিয়ে রেখেছেন। এটাকে যদি সে যত্ন করে তবে সেও ন্যায়-বিচারকারী হবে, নতুবা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যাবে। আল-করিম... আল্লাহ মেহেরবান, আল্লাহ তায়ালা রিজিকদাতা... এরকম আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নাম রয়েছে। সব নামের যত সিফাত যেগুলো আছে, সব মানুষের মধ্যে দিয়ে রেখেছেন। যে বের করতে পারবে, ফায়দা পাবে
বাইরের দিকে দেখবেন, প্রথম দৃষ্টিতে ধারণা করা অসম্ভব যে, এই গুলো কারো মাঝে থাকতে পারে। একজন চোর, একজন ডাকাত... তার মাঝে যে এত বড় বড় গুণ থাকতে পারে। কী অন্যায়... ইতিহাসে এমন অনেক রয়েছে যে, নামকরা ডাকাত ছিলেন, পরবর্তীতে নামকরা আলি-আল্লাহ হয়েছেন।
[
সিলেটের ঘটনা — না খেয়ে থাকার অভ্যাস
অনেকদিন সিলেটে এক জামাতে ছিলাম। আমরা দুই-তিন জন গাশতে বের হলাম। ফিরতে ফিরতে আসরের সময় পার হয়ে গেল। এসে দেখি, জামাতের খাওয়া দাওয়াও শেষ হয়ে গিয়েছে। খেদমতে যিনি ছিলেন, তাঁর খাবার বাকি ছিল। আমরা আসার পরে আমাদেরকে অল্প দিয়ে বললেন, আপনারা তিনজন খেয়ে নিন। আমরা কৌতূহল করলাম, তিনি বললেন, না আপনারা খেয়ে নিন। অল্প ছিল। আমরা যখন বেশি জোরাজুরি করলাম, তখন তিনি বলছেন, এগুলো আপনি (?)। আপনারা খেয়ে নিন। কী ব্যাপার? তিনি বললেন, আমার অভ্যাস।
জিজ্ঞাসা করলাম, কীভাবে এ অভ্যাস হলো? বলল, মদ খেয়ে ট্রেনে পড়ে থাকতাম বারো-তেরো ঘণ্টা। তারপর হুঁশ আসার পরে ধাতস্থ হতে হতে আরো ৪-৫ ঘণ্টা লেগে যেত। এভাবে আমার না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে। সেই অভ্যাস এখন কাজে লাগবে। না খেয়ে থাকার অভ্যাস। সিলেটের নামকরা এক মাতাল ছিল।
ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ — সুব্যবহার বনাম অপব্যবহার
মানুষের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা এ সিফাতগুলো রেখেছেন, যে যেভাবে ব্যবহার করতে পারে। ভূপৃষ্ঠে যখন ভূমিকম্প হয়, মাটির নিচের খনিজ সম্পদ থেকে হয়; কিন্তু সম্পদের অসুদ্ধ ব্যবহার। এ জিনিস সব ধ্বংস করে দেয়। পেট্রোল জাতীয় জিনিসই হবে। এই পেট্রোল যদি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে, তাহলে কত কাজে আসতে পারে; কিন্তু যদি এর অপব্যবহার হয়, তাহলে সব ধ্বংস করে ছাড়ে।
আমাদের বাংলাদেশে যে কখনো কখনো সাইক্লোন হয়, একেকটি সাইক্লোনের মধ্যে এই পরিমাণ শক্তি থাকে যে, যদি মানুষ এর ব্যবহার করতে পারত, তবে কোথায় পেট্রোল-বিদ্যুতের অভাব থাকত না। মাটির নিচে আল্লাহ তায়ালা যে সম্পদগুলো রেখেছেন, এগুলো যদি এলোপাথাড়ি বের হয়, আগুনের আকারে বের হয়, অথবা ভূমিকম্প হয়, তাহলে বড় ধ্বংসকারী হয়। এই সম্পদ যদি ব্যবহার করতে পারে তাহলে বড় ফায়দা হয়।
আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি মানুষের ভেতরে এরকম খনিজ সম্পদ রেখেছেন। রাসূল সা. ইরশাদ করেন:
الناس معادن فخيارهم في الجاهلية خيارهم في الإسلام إذا فقهوا
'মানুষ খনিজ সম্পদ যেমন সোনা-রুপার খনি হয়। তোমাদের মধ্যে উত্তম ওই ব্যক্তি, যে জাহিলিয়াতে বিশিষ্ট্য ছিল, ইসলামে যদি তারা জানে তবে ইসলামেও বিশিষ্ট্য হবে।'
ওই সম্পত্তি যার মাটির নিচে পেট্রোল আছে, আর ভূমিকম্প যা বের করতে পারে, তো ওই মাটি থেকে পেট্রোল বের হবে। অতএব, মানুষের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা অসাধারণ শক্তি রেখেছেন; এর ব্যবহার করা জানতে হবে।
ইমাম আহমদ রহ. অত্যন্ত নির্যাতিত হয়েছেন। বিভিন্ন সময় অনেকে খুব মেরেছে, জেলে পুরেছে। একটি ফেতনার জামানা ছিল যে, কুরআন খালেক না মাখলুক। তাকে দিয়ে রাজা-বাদশাহরা তাদের পছন্দের কথা বলাতে চাইত। তিনি আল্লাহওয়ালা, শুদ্ধ কথা বলবেন, তাদের পছন্দের অশুদ্ধ কথা বলবেন না। এইজন্য খুব কষ্ট করেছেন। অনেক নির্যাতন সহ্য করেছেন। ধীরে ধীরে শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। শরীর দুর্বল হলে অনেকসময় মনও দুর্বল হয়ে যায়। ওই জেলে এক ডাকাত ছিল, ডাকাত কাছ থেকে তাঁর শরীরের দুর্বলতা লক্ষ্য করেছে, সাথে সাথে তাঁর মনের দুর্বলতাও লক্ষ্য করল।
একদিন ডাকাত তাঁর কাছে এসে বলল, আমি ডাকাতি করি, এইজন্য আমাকে কোড়া (চাবুকাঘাত) মারা হয়; কিন্তু আমি ডাকাতি ছাড়ি না। আপনি উম্মতের ইমাম, আপনিও আপনার লক্ষ্যচ্যুত হবেন না। (আল্লাহু আকবার) এই ডাকাতের কথা তাঁর মনে এত সাহস দিলো যে, মনে যত দুর্বলতা ছিল, সব দূর হয়ে গেল। ইমাম আহমদ রহ. জেলখানায় সেই ডাকাতের জন্য দু'আ করেছেন, আর আল্লাহ তায়ালা সেই ডাকাতকে বড় আলি-আল্লাহও বানিয়েছেন।
এই জাতীয় দৃষ্টান্ত আরো বহু পাওয়া যায়: হুজায়ফা ইবনে আইয়ামান রহ.। খুব নামকরা ডাকাত ছিল, আল্লাহ তায়ালা তাওবা নসিব করেছেন, বড় আলি-আল্লাহ হয়েছেন। ওই একই শক্তি। খারাপের দিকে গেলে খারাপ, ভালোর দিকে গেলে ভালো।
যারা ঠকায়, তারা কত বুদ্ধিমান!
যারা দুনিয়াতে মানুষকে ঠকায়; যে ঠকায়, নিশ্চয় যাকে ঠকায় তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে। কিন্তু এত বুদ্ধিমান মানুষকে যারা বোকা বানাতে পারে, সে কি পরিমাণ বুদ্ধিমান!
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। অ্যামেরিকান টুরিস্ট ফ্রান্সের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার পর্যবেক্ষণের আশায় ভ্রমণে গেল। সেই অ্যামেরিকান ফ্রান্সের কয়েকজন ব্যবসায়ী কনসোর্টিয়ামের নিকট আইফেল টাওয়ার বিক্রি করে চলে গেল। পরে ব্যবসায়ীরা টের পেল যে, আমরা এ কী করলাম! এটা তো এত বড় বোকামির জিনিস যে, যারা করেছে, তারা দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী। আন্তর্জাতিক ব্যাংকের মালিক-টালিক। তারা যখন বুঝতে পারল, তখন তারা তা প্রকাশ না করে, তৃতীয় আরেকদলের নিকট বিক্রি করে দিলো। তো একজন মানুষ কি পরিমাণ চালাক হলে দেশসেরা ব্যবসায়ীদের নিকট আইফেল টাওয়ার বিক্রি করে চলে যেতে পারে। কদিন পরে তো তারা চাঁদও বিক্রি করে দেবে!
বুদ্ধি উচ্চ লেভেলের হলে ভালো-খারাপ দুটোই সম্ভব
যদি মানুষ উচ্চ লেভেলের বুদ্ধিমান ও চালাক হয় তাহলে খারাপ কাজও করতে পারে, ভালো কাজও করতে পারে।
ইমাম আবু হানিফা বা ইমাম মালেক বা কোনো ইমামের উক্তি, যে উক্তি তাঁর বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা প্রকাশ করে যে, কোনো এক ঘরে তাঁর সম্পর্কে কথাবার্তা হচ্ছিল। সে ঘরটি কাঠের ঘর ছিল। সম্ভবত এই উক্তিকারী ইমাম মালেক রহ.। তিনি বলছেন:
'ইমাম আবু হানিফা রহ. এখন ব্যক্তি, যদি তিনি চান যে, এই ঘরটি কাঠের তো কাঠের প্রমাণ করতে পারবেন আর যদি চান, যদি সোনার প্রমাণ করতে চান, তবে সোনার প্রমাণ করে দেবেন। আর এটা তোমাকে মেনে নিতে হবে।' (আল্লাহু আকবার)
যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারবেন, যদিও চোখের সামনে দেখছে কাঠের, কিন্তু মানতে হবে সোনার। প্রমাণ করেই ছাড়বেন। আল্লাহ তায়ালা এত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে হক প্রমাণ করে ছাড়েন, যদি আমাদের চোখে আপত্তি থাকে।
তো বুদ্ধি দিয়ে মানুষ দুনিয়ার জিনিসকে আবিষ্কার করেছে। আল্লাহ তায়ালা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন, তাঁর দীনের ভেতরের সম্পদকে আবিষ্কার করার জন্য। বাইরে থেকে দেখে কে জানবে যে, এই চোর; এই ডাকাত এত বড় আলি-আল্লাহ হতে পারে — কে ধারণা করতে পারবে।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের মাঝে নানারকম দৃষ্টান্ত রেখেছেন, মানুষ যদি লক্ষ্য করে অনেক কিছু শিখতে পারবে।
এই শুয়োপোকা, যার গায়ে এমনসব লোম, হাতে লাগলে খারাপ লাগে; দেখতেও কুৎসিত। এই শুয়োপোকা কিছুদিন পরে প্রজাপতি হয়ে ঘুরবে, এটা কে চিন্তা করতে পারে! অথচ বেশিদিন লাগবে না। তার ডানা হয়ে যাবে, হাত-পা হয়ে যাবে আর ফুলে ফুলে বেড়াবে। আর তার ডানায় কত রঙের-বেরঙের ডিজাইনও থাকবে।
আর এই প্রজাপতি যে হয়ে গেল, প্রজাপতি হওয়ার আগে শুয়োপোকা থাকাকালীন প্রজাপতি হওয়ার সব সম্ভাবনা তার ভেতরে নিহিত ছিল, প্রকাশ ছিল না। যে রকম মাটির ভেতরে যে পেট্রোল আছে, বের করলে এটা প্রকাশ হয়; এর আগে তার প্রকাশ ছিল না। তদ্রূপ শুয়োপোকার ভেতরে প্রজাপতি হওয়ার সব সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তার প্রকাশ ছিল না। সময়মতো তা প্রকাশ পেয়েছে, এখন সে পোকা প্রজাপতি। প্রতিটি মানুষের ভেতরে আল্লাহ তায়ালা এই গোপন বিষয়গুলো রেখেছেন।
কুফর শব্দ অর্থ ঢাকা। প্রতিটেকের ভেতরে আল্লাহ তায়ালা এই সৌন্দর্য রেখেছেন। কুফর হচ্ছে যা থিওরিক্যালি/ডিওরিক্যালি ঢাকা পড়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ
'যারা ইমান এনেছে আর অন্ধকার দিয়ে ইমানকে লুকায়নি।' [সূরা আনআম: ৮২]
কুফর হচ্ছে ওই জিনিস, যা দিয়ে তার মনের উপর পর্দা পড়ে যায়। ভিতরে তারপরেও আছে, বাইরে পর্দার কারণে দেখা যায় না। আবার তার ভেতরে থেকে ইমান বের হবে; আল্লাহর পরিচিতি বের হবে। যদি আল্লাহর পরিচিতি যত্ন করে, তো বলছিলাম আল্লাহ তায়ালার সুন্দর সুন্দর সিফাত বিশিষ্ট নাম আছে, সে সিফাতগুলো আল্লাহ তায়ালা মানুষের অন্তরের ভেতরেও দিয়ে দেন। যদি সে মেহনত করে, আল্লাহ তায়ালা ওগুলোকে তার মাঝে বৃদ্ধি করেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
صِبْغَةَ اللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ
'আল্লাহর রং, আল্লাহর চেয়ে ভালো কে রাঙাতে পারে? আর আমরা তারই ইবাদত করি।' [সূরা বাকারা: ১৩৮]
আল্লাহর বান্দা আল্লাহর ইবাদত কেন করে? এই ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর বান্দা আল্লাহর এতবেশি নৈকট্য অর্জন করবে যে, তার ভেতর থেকে আল্লাহর রং বের হবে।
একজন সাহাবি একবার রাসূল করিম সা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, মুমিনের পরিচয় কী? রাসূল সা. বললেন, প্রথম পরিচয়: তাকে দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়বে। তার মধ্যে, তার চেহারার মধ্যে আল্লাহর পরিচয় আছে। দেখলেই বোঝা যাবে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ছেলেকে তার পিতার সমসাময়িক বা বন্ধুরা বলছে, বাবা তোমাকে দেখলে তোমার পিতার কথা মনে পড়ে। ছেলেকে দেখলে যেমন ছেলের পিতার কথা মনে পড়ে, অর্থাৎ ছেলের চেহারার মধ্যে পিতার পরিচিতি লেখা আছে। আল্লাহর ইমানদার ব্যক্তিরা হলো ওই সব ব্যক্তি, যাদের দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে। তার চেহারার মধ্যে ওই নূর আছে। এই নূর অর্জন হবে কীভাবে? এর জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ইবাদত দিয়েছেন। ওই ইবাদত নিয়ে যখন সে যাবে, তো আল্লাহ তায়ালার নূর তার চেহারার মধ্যে পড়ে আর তার চেহারায় দেখা যায়। ইমানদারের যে নূর রয়েছে, এ নূরের ব্যাখ্যা তো কেউ দিতে পারবে না, কিন্তু বোঝবে।
নূরানি সিফাত — এখনও বিদ্যমান
বর্তমান দুনিয়াতেও এমন লোক আছে, যাকে একবার দেখার কারণে বেনামাযি ব্যক্তিও নামায পড়ে। শুধু একবার দেখার কারণেই নামাযের ভক্ত হয়ে যায়। লোকটি কোথাও যাচ্ছিল, সে ইমানদারের সাথে সাক্ষাৎ হল সালাম দিলো, আস সালামু আলাইকুম। ইমানদার ব্যক্তি উত্তরে বলল, ওয়ালাইকুমুস সালাম। এখন লোকটি ভাবল, নামাযের সময় হয়েছে, নামাযটি পড়ে নিই। অনেক সময় খেয়াল করে, অনেক সময় খেয়াল করে না। এই নূরানি সিফাত আল্লাহ তায়ালা এখনো বেশুমার মানুষের মাঝে রেখেছেন।
ভালো জিনিসের দিকে আকর্ষিত করে এমন মানুষ যেমন আছে; আবার আল্লাহ না করুন, খারাপ জিনিসের দিকে আকর্ষিত করে, এমন মানুষও অনেক রয়েছে। যাকে দেখলেই মনের মাঝে খারাপ চিন্তা মাথায় আসে। যাকে দেখলে ভালো ইচ্ছা জাগে, আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে এমন মানুষ অনেক বেশি রেখেছেন। খারাপকে আল্লাহ তায়ালা আড়ালে রেখেছেন। তো নেক বান্দা হলো, যে আল্লাহর কথা মানে। যত বেশি সে আল্লাহর কথা মানতে থাকবে, আল্লাহ তায়ালা ততবেশি তাঁর পরিচয় সে বান্দার ভেতর দিয়ে প্রকাশ করবেন। এইজন্য মানুষকে বলা হয়, আল্লাহর খলিফা
খলিফা কী? খলিফা অর্থ প্রতিনিধি। আমরা মনে করি, প্রতিনিধি যাকে আপনি... ইমানদার তো সে অর্থে প্রতিনিধি, সে যেখানেই যাবে আল্লাহ তায়ালার সিফাত বহন করে নিয়ে যাবে। তাকে দেখলেই আল্লাহর কথা মনে হবে। ও আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব বহন করেই নিয়ে যাবে। ওকে দেখলেই আল্লাহর কথা মনে হবে। ও আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করেই যাবে, জেগে থাকুক বা ঘুমিয়ে থাকুক। এমনকি দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পরে তার কবরও আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করতে করতে থাকবে। আর মাজারের কারণে বহু লোক দীনদার হয়ে যাবে। আসলে আল্লাহ তায়ালা এত সম্পৃক্ত করে দেবেন যে, আল্লাহর কুরআন বলে:
إن الله مع المحسنين
'আল্লাহ তায়ালা তার সঙ্গী হয়ে যাবে।'
আর আল্লাহ তায়ালা সঙ্গী হন তার সঙ্গে যার সাথে তার সম্পৃক্ততা আছে, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে।
আবু বকর সিদ্দিক রা. রাসূল সা.-এর সঙ্গী ছিলেন। রাসূল সা.-কে যখন মক্কার লোকেরা খুঁজছিল, যখন রাসূল সা. হিজরত করছিলেন। রাসূল সা.-কে না পেয়ে তারা সাথে সাথে বলল, আবু বকর রা.-কে খোঁজো। ওখানেই পাওয়া যাবে। আমাদের অনেক লোক আছে, আবদুর রহমান ও আবদুল কুদ্দুস সহদর। আবদুর রহমানের সাথে দেখা হলেই মানুষ জিজ্ঞাসা করে, আবদুল কুদ্দুস কোথায়? একজনকে দেখলে আরেকজনের কথা অজান্তেই মনে পড়ে যায়। আবার কখনো কখনো জিজ্ঞাস করার প্রয়োজনও নেই, তবুও সৌজন্যমূলক কিছু না কিছু জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে আবদুল কুদ্দুসের কথাই জিজ্ঞাসা করে।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর নেক বান্দাদেরকে নিজের সাথে এত সম্পর্ক করবেন যে, তাদের মাঝে আল্লাহর সিফাত জাহির করবেন। আল্লাহর যত সিফাত আছে, সব সিফাতগুলো নেক বান্দার মাধ্যমে প্রকাশ করবেন। যত সিফাত আছে, সব প্রকাশ করবেন। তো আল্লাহ তায়ালার আসমাউল হুসনা তথা গুণাবলীর নামসমূহ ওই বান্দার মাঝে প্রকাশিত করবেন। আর এগুলো মনের ভিতর দিয়েছেন, নিজের মনের ভেতর থেকে আল্লাহর এই সিফাতগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা ।
দুনিয়ার সমস্ত জগতের চাবি নিজের মনের ভেতরে। যেরূপ পাথর যুগে পাথরের চাবি মানুষের মনের ভেতরে ছিল, তামা যুগে তামার চাবি মানুষের মনের ভেতরেই ছিল, লৌহ যুগে লোহার চাবি মানুষের মনের ভেতরেই ছিল। মানুষ ওই চাবিগুলো খুঁজে খুঁজে বের করেছে।
আল্লাহ তায়ালা বান্দার ভেতরে তার নিজের পরিচিতি লুকিয়ে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা নিজের পরিচয় দিয়েছেন:
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ
'আল্লাহর নূরের দৃষ্টান্ত প্রদীপের মতো, যে প্রদীপ শিখার মতো। যে শিখা থাকে প্রদীপের মাঝে।'
আল্লাহওয়ালাগণ বলে থাকেন, এগুলো সব মুমিনের দিলের দৃষ্টান্ত; বিভিন্ন অবস্থা। বাইরের জগতে যেমন জিনিসের ব্যবহার করার পরিচিতি, আল্লাহ তায়ালা মানুষের নিজের ভেতর দিয়েছেন, মানুষের বিভিন্ন স্তরের পরিচিতি।
নবী, সিদ্দিক, শুহাদা, সালেহিন — মানুষের স্তর
নবীয়ীন, সিদ্দিকীন, সুহাদা, সালেহিন... বাইরের জগতের পরিচিতি যেমন, পাথরযুগ, তামার যুগ, লোহার যুগ ইত্যাদি... বিভিন্ন সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে জানতে; ঠিক সেরকমভাবে মানুষের নিজের উত্থানে বিভিন্ন স্তর আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন। সবচেয়ে উপরের স্তর হচ্ছেন নবী, তারপর সিদ্দিকীন, তারপর শুহাদা, তারপর সালেহিন; একেক স্তরের।
প্রতিটেক স্তরে তাদের নিজস্ব আজায়েব (বিস্ময়) রয়েছে। সমুদ্রে যখন কেউ ডুব দেয় তখন তাকে নিচক সমুদ্রই মনে হয়, কিন্তু যারা ডুব দেয় তারা আজিব তথা বিস্ময়কর জিনিসমূহ প্রত্যক্ষ করে। বাইরের থেকে মনে হয়, তারা পানি দেখে, হয়তো গভীরে আরো অন্ধকার হবে বা আরো নীল হবে; যেহেতু উপর থেকে নীলই দেখা যায়; কিন্তু ডুব দিলে একেক গভীরতায় একেক রং। লাল, তারপর হলুদ; উল্টো দিকে গেলে ভায়োলেন্ট, ইন্ডিগো। সবচেয়ে উপরে লাল থাকে। তারপর আস্তে আস্তে হলুদ, তারপর সবুজ, তারপর নীল। আর একেবারে উপরে বেশ পরিষ্কার। ঠিক তদ্রূপ মানুষের মনের ভেতরে অনেক স্তর রয়েছে। যে যেই গভীরতায় ডুব দেবে, সে ওখান থেকে ওই রং পাবে।
রয়েছে। যে যেই গভীরতায় ডুব দেবে, সে ওখান থেকে ওই রং পাবে।
তো আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন, এই সম্পূর্ণ দীনই হচ্ছে, আল্লাহর পথে বের হয়ে মানুষ যেন তার নিজেকে আবিষ্কার করে।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের মাঝে অসাধারণ জিনিস রেখেছেন, মানুষ যেন সে সম্পর্কে জানেই না। ওটাকে আবিষ্কার করার জন্য আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে দীন দিয়েছেন। যতবেশি সে রাসূল সা.-এর পথে চলবে, ততবেশি আল্লাহ তায়ালার সাথে তার সম্পর্ক হবে; আল্লাহর মহব্বত হবে, আর ততবেশি এর প্রতিফলন তার মাঝে পড়বে। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
'যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালো বাসবেন।'
আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার যে স্তরে সে যাবে, সে স্তরের রং তার মাঝে প্রকাশ পাবে; বিভিন্নভাবে।
এইজন্য দুনিয়াকে আবিষ্কার করতে হলে যেমন দুনিয়াকে ভুলতে হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে তার নিজেকে আবিষ্কার করতে হলে বাইরের জগতে ভুলতে হবে। একটি হলো জিনিসের আবিষ্কার, আর আরেকটি হলো নিজেকে আবিষ্কার। চলেছে কাছাকাছি সমান্তরাল ধরনের রাস্তায়। দুনিয়াদার যেমন দুনিয়াকে আবিষ্কার করার জন্য এমনভাবে হারিয়ে গেল যে, তার সামনে কোনো মানুষ আসছে কি না, সে কিছুই লক্ষ্য করছে না; ঠিক নামাযী তার নামাযের মাঝে এমনভাবে হারিয়ে গেল যে, তার পা কেটে তীর বের করে ফেলল যে, ও টেরই পাচ্ছে না; সে কোথাও ডুবে আছে।
এ দুনিয়ায় যদি ডুবে দুনিয়া আবিষ্কারের জন্য, তবে যখন মৃত্যুবরণ করবে, তখন দুনিয়ার আবিষ্কারে জীবন চলে যাবে । বড়ই ক্ষতির ব্যবসা! আর যদি সে নিজের মধ্যে যায় তাহলে এমন সম্পদ পাবে, যে সম্পদ বাকি থাকবে কবর পর্যন্ত।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ (৩০)
نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ (৩১)
نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
দুনিয়াতেও আল্লাহ তায়ালা সঙ্গী আছেন, মৃত্যুর সময়ও ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে আসবেন। তার মৃত্যু হবে আনন্দের সাথে। দুনিয়া থেকে যখন চলে যাবে, আল্লাহ তায়ালার সামনে তার ইস্তেকবাল হবে।
ওখানে গেলেই আল্লাহ তায়ালা নুযুল নাযিল করবেন। নুযুল হলো, মেহমান যখন উপস্থিত হয়; আগের জামানায় তো আগে থেকে জানা থাকত না, এখন তো সংবাদ জানিয়ে উপস্থিত হয়। তো মেহমান আগমন করলে, মেজবান ঘরে উপস্থিত যা থাকে তা মেহমানের তরে তাৎক্ষণিক উপস্থাপন করা হয়; ইতিমধ্যে আরো ভালো জিনিসের ব্যবস্থা করা হয়।
আমরা হায়াতুস সাহাবা ও হেকায়াতুস সাহাবা গ্রন্থে পেয়েছি, রাসূল সা. হযরত আবু বকর ও হযরত উমর রা.-কে সঙ্গে নিয়ে সম্ভবত আবু আইয়ুব আনসারি রা.-এর বাড়িতে গেলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কাঁচা-পাকা খেজুর নিয়ে আসলেন। এর কিছুক্ষণ পরে খাসি জবাই করে তার গোশত প্রস্তুত করে নিয়ে আসলেন। তো মানুষ মেহমান আসলে প্রথমেই উপস্থিত যা আছে, তা প্রস্তুত করে নিয়ে আসে, এরপর ইতিমধ্যে অন্যকিছু প্রস্তুত করে নিয়ে আসে। আল্লাহ তায়ালা যে, তাৎক্ষণিক সব আয়োজন করতে পারবেন না, কিছু সময় লাগবে — এমন নয়; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এ শব্দ ব্যবহার করেছেন।
নেক বান্দা যখন আল্লাহর নিকট হাজির হবে, তখন তাৎক্ষণিকভাবে প্রথম যে সব নেয়ামত দেওয়া হবে, সেগুলোকে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন 'নুযুল'। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে:
نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ
এরপর আল্লাহ তায়ালা আরো দেবেন; কী দেবেন — এটা আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। যা হবে:
قال النبي ﷺ: قال الله تعالى: أعددت لعبادي الصالحين ما لا عين رأت، ولا أذن سمعت، ولا خطر على قلب بشر
'এমন নেয়ামত যা চোখও কোনোদিন দেখেনি, কানও কোনোদিন শোনেনি, মানুষের অন্তরও কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি।'
এই সবকিছু তার মনের ভেতরে আল্লাহ তায়ালা আগে থেকেই রেখেছেন। এই মনের উপর যদি সে মেহনত করে তবে আল্লাহ তায়ালা তাকে তা বের করে দেবেন।
বাইরের জগতে মেহনত লাগে না, শুয়োপোকা সাধারণত কিছুদিন পরে স্বাভাবিকভাবেই প্রজাপতি হয়ে যায়। এটি এমন নয় যে, যদি ইমান আনে আর নেক আমল করে তাহলে প্রজাপতি হবে, আর ইমান না আনলে প্রজাপতি হবে না কোনো দিন।
আল্লাহ তায়ালা সবার ভেতরে এই সম্ভাবনা রেখেছেন যে, যেই ইমান আনবে; নেক আমল করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ওই স্তরে পৌঁছাবেন, যতটুকু সে যায়। যে ইমান আনবে না এবং নেক আমল করবে না সে কোনোদিন তার ওই উন্নত জীবন বা তার সন্ধান কোনোদিনই পাবে না। শুয়োপোকা থেকে অনেক খারাপ অবস্থায় তার জীবন শেষ হয়ে যাবে। এর আগে বলেছিলাম, আল্লাহওয়ালা আফসোস করে বলে:
يا ليتني مت قبل هذا ونسي من سنيا
যেন তারা আরো উন্নত জীবনে যেতে পারে; কিন্তু কাফেররা আফসোস করবে:
وَكُنْتُ تُرَابًا
'যদি আমি বালু হতাম!' [সূরা নাবা: ৪০]
কত নিকৃষ্ট জিনিস হতে চাচ্ছে!
তো আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীন দিয়েছেন। আল্লাহর পথে বের হই। আল্লাহ তায়ালা যে আমার উন্নত সম্ভাবনা রেখেছেন, ওই সম্ভাবনাকে আমি আমার করি — এর নামই দীন। সব কাজ তথা বাইরের জগত থেকে উপকৃত হওয়ার নাম কাজ; আর আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিজের ভেতর থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য যা দিয়েছেন এই কাজের মোকাবেলায়, তার নাম আমল। আমল বাইরের জিনিস, জিনিস থেকে উপকৃত হওয়ার নাম, নিজের থেকে উপকৃত হওয়ার নাম আমল। তো আল্লাহ তায়ালা আমল দিয়েছেন, আমল দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করব, আর নিজ থেকে উপকৃত হব। এই সব তোমার ভেতরে দেওয়া আছে, শুধু বের করার অপেক্ষা। আর এই আমল দিয়ে নিজ থেকে বের করবে।
হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. বলেন আল্লাহ তায়ালা মানুষের দিলের ভেতরে অসীম শক্তি রেখছেন। তো যে যতটুকু চায়, সেখান থেকে বের করতে পারে। আর এটা দুনিয়াতেও শেষ হবে না, মওতেও শেষ হবে না ।আখিরাতেও শেষ হবে না।
এইজন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে একটু দুনিয়া থেকে আড়ালে গিয়ে...
আমি আবারো বলছি, 'দুনিয়া থেকে আড়ালে গিয়ে'।
কারণ, দুনিয়াদারও দুনিয়া থেকে সরে গিয়ে দুনিয়াকে আবিষ্কার করেছে। আল্লাহওয়ালারাও দুনিয়া থেকে একটু সরে গিয়েই তার নিজেকে আবিষ্কার করবে। আর আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত আমাদের মধ্যে রেখেছেন, সে নেয়ামতকে সে উদ্ধার করবে। আর কাছেই আছে, দূরে নয়; তার নিজের ভেতরেই আছে।
এইজন্য সবাই নিয়ত করি, আল্লাহর পথে বের হবো, আর আল্লাহর পথে গিয়ে আল্লাহর এই অসীম সম্পদ উদ্ধার করব, ইনশাআল্লাহ। তাহলে আমরা কারা চার মাসের জন্য, তিন চিল্লার জন্য যাবো, হিম্মত করি ইনশাআল্লাহ। হিম্মত করে দাঁড়াই ইনশাআল্লাহ।
সমাপ্ত।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দ্বীন ও দুনিয়া
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] দুনিয়ার সব মানুষের কাজকর্ম ও চেষ্টা-পরিশ্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারী, ২০২৬
৩১৯৬
ফ্রান্সে তাবলীগের কাজের সুচনা
৮ ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বাদ ঈশা মোজাকারা, মানিকদি বাজার মসজিদ, ঢাকা আল্লাহ তাআলার বড় মেহেরবানি যে, আল...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৩৬৯২
নিভৃতচারী আল্লাহওয়ালাদের খোঁজে
হজরতের গড়া ছোট্ট, অথচ সুন্দর মাদ্রাসা। মাদ্রাসা থেকে এক ছাত্রকে রাহবার হিসেবে সাথে নিয়ে যখন হজরতের ব...
মাওলানা ডাঃ মোহাম্মদ মাসীহ উল্লাহ
১০ নভেম্বর, ২০২৪
১২০৬১
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইখলাসের হুকুম দিয়েছেন। ইবাদতের মধ্যে যেমন ইখলাস দিয়েই তার মূল্য। পরিমাণে খুবই...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
৪০৯৪