প্রবন্ধ
সূর্যোদয়, সুর্যাস্ত, সুবহে সাদিক ইত্যাদির ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক সময় কেন যোগ/বিয়োগ করা হয়?
৬৬০১
০
ইদানিং আমরা সবাই মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে সময় দেখে সেহরি আর ইফতার করে থাকি। আমাদের অনেকেরই জানা নেই, বৈজ্ঞানিকভাবে হিসেব করে বের করা সময় নির্ভুল নয়। ফলে আমাদের সূর্যাস্তের সময়ের সাথে সতর্কতামূলক তিন মিনিট সময় যোগ করে তারপর ইফতার শুরু করা উচিত। একইভাবে, অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে পাওয়া সময়ের অন্তত তিন মিনিট আগেই আমাদের সেহরি খাওয়া শেষ করা উচিত। অবশ্য, যে অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থেকে সময় নেয়া হচ্ছে তারা নিজেরাই যদি এই সতর্কতামূলক সময় যোগ (সেহরির ক্ষেত্রে বিয়োগ) করে দেয় তাহলে অন্য কথা। অনেক মোবাইল অ্যাপেই ব্যবহারকারীরা নিজের সুবিধামতো এই সতর্কতামূলক সময় সেইভ করে রাখার অপশন দেয়া আছে।
বিজ্ঞানীরা কিছু অনুমানের (assumptions) উপর ভিত্তি করে সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়, সুবহে সাদিক এর সময়গুলো বের করে থাকেন। এরকম তিনটি অনুমানের ক্ষেত্র হলঃ
ক) অবলোকনকারীর প্রকৃত অবস্থানঃ বিজ্ঞানিরা যে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ ধরে সময় বের করেন অবলোকনকারীর অবস্থান তার চেয়ে সর্বোচ্চ ১৫ মাইল এদিক সেদিক হতে পারে। অবলোকনকারীর অবস্থান একদম শতভাগ নিশ্চিতভাবে নিরূপণ করা এবং সেই অনুযায়ী সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময় বের করা দুরুহ ব্যাপার।
খ) আলোর প্রতিসরণাংকঃ সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময় বের করার জন্য আলোর প্রতিসরণাংক ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। বিজ্ঞানের সাথে যারা পরিচিত তারা জানেন, আলোর প্রতিসরণাংক একটি ধ্রুবক সংখ্যা যা বিভিন্ন মাধ্যমে, বিভিন্ন তাপমাত্রায় বিভিন্ন রকম হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই হিসেবগুলো করার সময় আলোর প্রতিসরণাংকের কোন একটি মান ধরে নেন, যদিও এই মান প্রকৃত বা বাস্তব মানের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। বরং ভিন্ন হবে বলেই নিশিচভাবে বলা যায়। অবলোকনকারী আর দিকচক্রবালের মধ্যে যে বিস্তৃত বায়বীয় মাধ্যম তার বিভিন্ন স্তরে আলোর প্রতিসরণাঙ্ক বিভিন্ন রকম হওয়াই স্বাভাবিক। আলোর প্রতিসরণাঙ্ক চাপ ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তন হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক হিসেব করার সময় একটি মান ধরে নিয়ে হিসেব চালিয়ে যেতে হয়।
গ) সমতল ভূমিঃ বৈজ্ঞানিকভাবে সময় বের করার সময় ধরে নেয়া হয় যে, অবলোকনকারী আর দিকচক্রবালের মাঝে শুধুই সমতল ভূমি আছে। আর পৃথিবীকে একটি নিখুত গোলক কল্পনা করা হয়। যদিও পৃথিবী মোটেও নিখুত গোলক নয়। আর পশ্চিম দিকে নিম্নমুখী ঢালের উপস্থিতি থাকলেও সূর্যাস্তের বাস্তব সময় আর হিসেব করে বের করা সময়ের মধ্যে পার্থক্য থাকবে।
এসব কারণেই, প্রাকৃতিকভাবে অবলোকন করা সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময় আর বৈজ্ঞানিকভাবে বের করা সময়ের মধ্যে পার্থক্য থাকে। ফলে সতর্কতা হিসেবে তিন/চার মিনিট যোগ বা বিয়োগ করে নিতে হয়।
সহিহ বুখারিতে একটি বিখ্যাত হাদিস আছে যেখানে, ইচ্ছাকৃতভাবে ইফতার দেরিতে করার ব্যপারে হুশিয়ার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ইহুদি-খৃস্টানরা দেরিতে ইফতার করে । তাই আমাদের উচিত সময় হবার সাথে সাথেই ইফতার করে নেয়া। কেউ কেউ এই হাদিস উল্লেখ করে ইফতারির সময়ের সাথে সতর্কতামূলক সময় যোগ করার বিরোধিতা করে। তাদের খেয়াল করা উচিত যে, আমাদের প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং সাহাবায়ে কেরাম (রাজিয়াল্লাহু আনহুম)- এর যুগে তো প্রাকৃতিকভাবে সূর্যাস্ত অবলোকন করা হতো। উনারা কোন বৈজ্ঞানিক হিসেবের উপর নির্ভর করতেন না। আমরা প্রাকৃতিকভাবে সূর্যাস্ত-সূর্যোদয় অবলোকন করছি না বলেই তো সতর্কতামূলক সময় ধরে নেয়ার কথা এসেছে। আজও কেউ চাইলে প্রাকৃতিকভাবে সূর্যাস্ত-সূর্যোদয় অবলোকন করে একদম নিখুত সময়ে ইফতার শুরু করতে পারে। তবে তাকে সুর্যাস্ত, সূর্যোদয়, সুবহে সাদিক বলতে শরীয়তে ঠিক কি বুঝায় সে সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে আর অবলোকনের জন্য যথোপযুক্ত জায়গাও বের করে নিতে হবে। শহর অঞ্চলে এরকম জায়গা পাওয়াও কঠিন। বুখারি শরিফের হাদিসটিতে 'দেরি' বলতে কি বুঝানো হয়েছে তা ইবন হাজার আস্কালানী (রহঃ) 'ফাতহুল বারি' গ্রন্থে উল্লেখে করেছেন। ইহুদি-খৃস্টানরা আকাশে তারা উদয় হওয়া পর্যন্ত দেরি করতো। এই 'দেরি' তিন/চার মিনিটের 'দেরি' নয়।
রেফারেন্স:
http://askimam.org/public/question_detail/1783.html
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন