প্রবন্ধ
‘মাওলানা’ শব্দের ব্যবহার বিষয়ক বিভ্রান্তি নিরসন
৮৪৫৪
০
উপমহাদেশীয় আলেমদের মাওলানা শব্দে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। এটাকে একটা আঞ্চলিক পরিভাষা বলা যেতে পারে। তবে অনেকেই এই পরিভাষার বিষয়ে ঘোর আপত্তি করেন। তাদের যুক্তি হলো, কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আনতা মাওলানা ফানছুরনা—অর্থাৎ আপনিই আমাদের প্রভু/অভিভাবক। সুতরাং আপনি আমাদের সাহায্য করুন।’ যেহেতু কুরআনে আল্লাহ্ তাআলাকে সম্বোধন করে মাওলানা বলা হয়েছে তাই অন্য কাউকে এভাবে সম্বোধন করা যাবে না।
তাদের এই যুক্তিটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটাই আমরা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করব এই লেখাতে।
‘মাওলানা’ শব্দটি মূলত আরবী। এটি দুইটি ভিন্ন শব্দের সমন্বয়ে গঠিত—মাওলা+না=মাওলানা। ‘না’ একটি আরবী সর্বনাম। এর অর্থ আমাদের। আর মাওলার একাধিক অর্থ আছে— প্রভু, বন্ধু, সাহায্যকারী, মনিব, দাস, চাচাতো ভাই, প্রতিনিধি, অভিভাবক, নিকটবর্তী, আত্মীয়, নেতা, গুরু, প্রতিপালক, সর্দার, প্রেমিক, প্রতিবেশী, আনুগত্য, প্রার্থনা, নীরবতা, ইবাদত, দণ্ডায়মান ইত্যাদি।
সেহিসেবে মাওলানা শব্দের যৌগিক অর্থ দাঁড়ায়—আমাদের প্রভু, আমাদের অভিভাবক, আমাদের নেতা, আমাদের সর্দার, আমাদের বন্ধু ইত্যাদি।
সময়ের পালাক্রমে এটি আরব থেকে ইরান, তুর্কি ঘুরে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেছে প্রধানত উর্দুভাষাতে। এর মাধ্যমে এতে যুক্ত হয়েছে আরও বাড়তি ও সুনির্দিষ্ট কিছু অর্থ। যদিও এর সাথে মূল শব্দের মর্মগত উপস্থিতি ঠিকই বিদ্যমান আছে।
আরেকটু খুলে যদি বলি, উর্দু ভাষায় ‘মাওলানা’ শব্দটি উস্তাদ ও আলেমে দ্বীন অর্থে ব্যবহৃত হয়। কারণ আলেমগণ সাধারণ মুসলিমদের দ্বীনী বিষয়ের অভিভাবক হয়ে থাকেন। সেজন্যই দেখা যায়, দ্বীনী কোন বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হলে মানুষ আলেমদের কাছে ছুটে যায়। তাদের থেকে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা নেয়। উর্দু থেকে শব্দটি বাংলাভাষায় আগমন করায় উর্দুতে ব্যবহৃত অর্থটিও বাংলায় অবধারিতভাবে ঢুকে পড়ে।
যারা ধর্মীয় পণ্ডিতদের বেলায় মাওলানা শব্দটি ব্যবহারের বিরোধী, তাদের যুক্তি কেন দুর্বল তা এবার বিশদে আলোচনা করব। তার আগে একটা মূলনীতি বলে নেই। সেটা হলো, একটা শব্দের একাধিক অর্থ থাকলে কোথায় কোন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তা বিবেচনায় রাখা জরুরী। অন্যথায় নানান রকম আপত্তি মনের কোনায় উঁকি দিতে পারে।
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর প্রিয় সাহাবী যায়দ বিন হারিসা রা. কে সম্বোধন করে বলেছেন-, ‘আনতা আখুনা ওয়া মাওলানা—তুমি আমাদের ভাই ও বন্ধু।’ এখানে মাওলানা শব্দটিতে রাসূল সা. বন্ধু অর্থে ব্যবহার করেছেন। যদি অর্থের বিবেচনা না রেখে শুধু শব্দটি কোন মানুষের জন্য ব্যবহার করা নাজায়েয হত, তাহলে কখনো আল্লাহর রাসুল সা. এটি বলতেন না। যাদের দৃষ্টিতে ‘মাওলানা’ বললে শিরক হয়ে যায়, তারা এক্ষেত্রে কী বলেবন?
মূলত আল্লাহর জন্য আয়াতে মাওলানা প্রভু/অভিভাবক অর্থে ব্যবহৃত হলেও আলেমদের ক্ষেত্রে সে অর্থে ব্যবহার করা হয় না। প্রথমত আলেমগণ সাধারণ মানুষের প্রভু নন। দ্বিতীয়ত তারা শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রে মানুষের অভিভাবক। আর আল্লাহ তাআলা হলেন সকল ক্ষেত্রে অভিভাবক। দুইটার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান আছে।
অন্য আরেকটি হাদীসে রাসূল সা. বলেছেন, ‘যার কোনো ‘মাওলা’ নেই আমি তার ‘মাওলা’। এখানে ‘মাওলা’ শব্দটি সম্পত্তির অভিভাবক বুঝাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একবার রাহবা নামক জায়গায় আলী রা. এর কাছে কিছু লোক আগমন করলেন। তাদের মধ্যে সাহাবী আবু আয়্যুব আনসারী রা.ও ছিলেন। তারা এসে তাঁকে সালাম দিল এভাবে—আসসালামু আলাইকা ইয়া মাওলানা! অর্থাৎ হে আমাদের সর্দার! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।
তাফসিরের কিতাবে বিভিন্ন সময় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর আযাদ করা গোলাম ও বিশেষ একজন সাগরেদ বা ছাত্রের নাম পাওয়া যায়—ইকরিমা মাওলা ইবনে আব্বাস। অর্থাৎ ইবনে আব্বাস
রা. এর আযাদ করা গোলাম ইকরিমা। এই শব্দটি এখানে কোন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তা মাথায় না রেখে যদি কেউ ভেবে বসে, ইকরিমাকে ইবনে আব্বাসের প্রভু বলা হয়েছে তা নিতান্তই মূর্খতা হবে।
এই শব্দটির নানান অর্থের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান। পূর্বযুগের বহু আলেম তাদের লেখনীতে এতি ব্যবহার করে আসছেন। যেমন, মুসনাদে আহমাদের যে কপিটি মিশরের দারুল কুতুবিল মিশরিয়্যাহতে সংরক্ষিত আছে তার লিপিকার ও বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ বিন সালিম বসরী যে বাক্য দিয়ে কিতাবটি লেখা শুরু করেছেন তা হলো-
بسم الله الرحمن الرحيم، وصلى الله على سيدنا ومولانا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين،
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, আল্লাহ্ আমাদের সাইয়্যিদ (নেতা) ও মাওলানা (সর্দার) মুহাম্মাদ সা. ও তাঁর পরিবার এবং সকল সাহাবীদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন।”
মাওলা শব্দটির সাথে বহুবচনের সর্বনাম যুক্ত না করে অনেক সময় একবচনের সর্বনাম ‘ইয়া’ যুক্ত করে বলা হয়- মওলভি/মৌলবি (مولوي)। যার অর্থ হয় আমার অভিভাবক, আমার নেতা, আমার সর্দার, আমার বন্ধু ইত্যাদি। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মীয় পন্ডিতদের জন্য এটিও সমানভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও এই যুগে শব্দটির ব্যবহারের হার তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। মাওলানা শব্দ অন্য কারো জন্য ব্যবহারের উপর আপত্তি থাকলে এটি নিয়েও আপত্তি তোলা উচিত। যেহেতু দুইটা একই অর্থ ধারণ করে। পার্থক্য শুধু শেষে যুক্ত হওয়া সর্বনামে।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন