প্রবন্ধ
নারীদের কুরবানী প্রসঙ্গ: একটি ভুল ধারণার অপনোদন
৬০৯২
০
প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নেসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল- এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।
এই বিধান কেবল পুরুষদের জন্য না। মহিলাদের জন্যও। মানে যে ব্যক্তির কাছেই কুরবানীর দিনগুলোতে এই পরিমাণ সম্পদ থাকবে তার উপরই কুরবানি ওয়াজিব হবে। এখানে পুরুষ-মহিলার কোন ব্যবধান নাই। কিন্তু আমাদের সমাজের দুঃখজনক চিত্র হলো, মেয়েদেরকে কুরবানী করতে দেখা যায় না বললেই চলে। অনেকে তো এটা জানেই না যে, মহিলাদের উপরও সম্পদের ভিত্তিতে কুরবানি ওয়াজিব হয়।
একজন নারী তার স্বর্ণালঙ্কারের যাকাত দিচ্ছে। তাহলে নিশ্চিতভাবেই তো সেই সম্পদ বর্তমান থাকলে তার উপরও আলাদা করবানীও ওয়াজিব হচ্ছে। কিন্তু তিনি সেটা করছেন না; বরং স্বামী যে কুরবানী দিচ্ছেন সেটাকেই যথেষ্ট বলে ধরে নিচ্ছেন। অথচ স্বামীর কুরবানী তার মালিকানাধীন সম্পত্তির। এর সাথে স্ত্রীর কুরবানীর কোন সম্পর্ক নেই। স্ত্রীর উপর তার সম্পত্তির কারণে যে কুরবানি ওয়াজিব হয়েছে সেটা স্বামীর কুরবানী দ্বারা আদায় হবে না। দুইটা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। আদায়ও করতে হবে আলাদাভাবে। এটা অনেকে জানেও না, বুঝেও না। ফলে কুরবানি না দেবার গুনাহ কামিয়ে নিচ্ছেন।
এখানে একটা সমস্যার সৃষ্টি হয় অনেকের ক্ষেত্রে। তা হলো, স্ত্রীর কাছে দেখা যায় অনেক স্বর্ণালঙ্কার আছে, কিন্তু নগত অর্থ নেই। এক্ষেত্রে সমাধান হলো, কিছু স্বর্ণ বিক্রি করে সেই টাকায় কুরাবানীর পশু কিনতে হবে। অথবা স্বামীর যদি সামর্থ্য থাকে তাহলে তাকে অনুরোধ করতে পারে স্ত্রীর কুরবানীটা আদায় করে দিতে। যদি স্ত্রীর অনুমতিক্রমে স্বামী নিজের কুরবানী করার পাশাপাশি স্ত্রীর কুরবানীটাও আদায় করে দেয় তাহলেও স্ত্রীর কুরবানী আদায় হয়ে যাবে।
আমাদের দেশে মিম্বারে-মেহরাবে বিষয়টা তেমন আলোচিত হয় না। কুরবানি বিষয়ক বইপত্রেও এটাকে ভেঙ্গে বলা হয় না সবসময়। হয়তো মহিলাদের কথা আলাদাকরে না বলে সাধারণভাবে বলে যাওয়াকেই লেখকরা যথেষ্ট মনে করা হয়। কিন্তু অবস্থা এখন এই পর্যায়ে চলে এসেছে বলে মনে হচ্ছে যে, এটা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা উচিত।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, কেউ যদি ওয়াজিব হবার পরে কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানী না করেন তাহলে কুরবানীর ওয়াজিবটা তার উপর থেকে যায়। পরবর্তীতে কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা তার জন্য ওয়াজিব। এই পরিমাণ অর্থ সদকা করে দিলে তিনি কুরবানী করার যিম্মা থেকে মুক্ত হবেন। তার আগে নয়। সুতরাং যারা অনেক বছর ধরে কুরবানী ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও কুরবানী করছেন না; তাদের উপর কিন্তু কুরবানীর এই যিম্মা রয়ে গেছে। তারা কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সমপরিমাণ টাকা সদকা করে দিবেন।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন