প্রবন্ধ
সালাফে সালিহিনদের আমল
৮৭২৬
০
আলি ইবনে আবু তালিব রা. যখন খলিফা ছিলেন, রাতের অন্ধকারে পিঠের উপর রুটি বহন করে নিয়ে মিসকিনদের দান করতেন। তিনি বলতেন, রাতের অন্ধকারের সাদাকাহ রবের রাগ বিদূরিত করে।
মদিনায় এমন কিছু পরিবার বসবাস করত, যাদের যাপিত জীবন ছিল সুখেশান্তিতে। লোকেরা বুঝতেই পারত না, এদের জীবিকা কোত্থেকে আসে! যখন খলিফাতুল মুসলিমিন আলি রা. শাহাদাত বরণ করলেন, এইসব পরিবারের অদৃশ্য জীবিকা বন্ধ হয়ে গেল!
গোসল দেওয়ার সময় লোকেরা আলি রা.-এর শরীরে রশির দাগ দেখতে পেয়ে তাজ্জব বনে গেল! রাতের অন্ধকারে তিনি পানির মটকা রশি দিয়ে বেঁধে বহন করে নিয়ে যেতেন বিধবা নারীদের ঘরে! খুঁজ নিয়ে দেখা গেল, তিনি প্রায় ১০০ টি পরিবারের খোরপোষ জোগাতেন!
ইমাম যাহাবি বলেন, এজন্য আলি রা. কিছুটা ব্যয়কুণ্ঠতা দেখাতেন। যেহেতু তিনি রাতের আঁধারে খুব বেশি বেশি সাদাকাহ করতেন। অথচ, তার পরিবারের লোকেরা মনে করত, তিনি গোপনে সঞ্চয় করছেন!
মদিনাবাসী একজন লোকের ভাষ্য যে, আলি রা.-এর ইনতিকালের আগে আমরা গোপন সাদাকাহ থেকে বঞ্চিত ছিলাম না।
আইয়ুব সাখতিয়ানি রহ.। একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ি ও হাদিসবিশারদ। দারসে বসে অনেক সময় তিনি হাদিস পড়াতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো কোনো কথা বা কাজ তার অনুভূতির জগতটাকে এমনভাবে ছুঁয়ে যেত যে, তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে যেতেন। কিন্তু চটজলদি তিনি ঘাড় ফিরিয়ে নিতেন। নাক সাফ করতেন। আর বলতেন- আহ, কী মারাত্মক সর্দি! বুঝাতে চাইতেন, তার সর্দি হয়েছে; অথচ তিনি কান্না করছিলেন!
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি বলেন, আমি এমনও কিছু মানুষের সান্নিধ্যগ্রহণ করেছি, যাদের কেউ কেউ একই বালিশে আপন স্ত্রীর পাশে শয্যাযাপন করত, আল্লাহর ভয়ে তার চোখ থেকে পানি বেরিয়ে, গাল দিয়ে গড়িয়ে পড়ে বালিশ ভিজত, কিন্তু স্ত্রী টেরই পেত না!
তিনি বলেন, আমি এমনও লোককে পেয়েছি, যে মসল্লিদের সাথে নামাজের কাতারে দাঁড়াত, আল্লাহর ভয়ে তার চোখেরজল গড়িয়ে গাল ভিজে যেত, কিন্তু পাশের মুসল্লি মোটেও বুঝতে পারত না!
আইয়ুব সাখতিয়ানি সারারাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন। কিন্তু লোকচক্ষু হতে লুকাতেন। যখন ফজর হতো, তখনই কেবল একটু-আধটু গলা খাঁকারি দিতেন। যাতে লোকেরা বুঝে, আইয়ুব এইমাত্র জাগলেন!
দাউদ ইবনে আবু হিন্দ চল্লিশ বছর রোজা রেখেছেন, কিন্তু তার পরিবার-পরিজন মোটেও বুঝতে পারেনি। তিনি ছিলেন পুঁতি বিক্রেতা। সকালবেলা ঘর থেকে বের হবার সময় নাশতা নিয়ে বেরুতেন, কিন্তু রাস্তায় এগুলো সাদাকাহ করে দিতেন। বিকেলবেলা ঘরে ফিরতেন, এবং পানাহার করতেন। কেউ বুঝতই না যে, তিনি ইফতার করছেন!
রাবি ইবনে খুসাইম আমল করতেন গোপনে। অনেক সময় তিনি অনুচ্চস্বরে তিলাওয়াত করতেন। ইত্যবসরে কোনো আগন্তুক তার কাছে প্রবেশ করলে, সাথে সাথে তিনি কুরআন বন্ধ করে ফেলতেন!
মুহাম্মাদ ইবনে আসলামের স্ত্রী বলেন, তার স্বামী যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, একটি কোণে গিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। যাতে তাকে কেউ না দেখে। নামাজে তিনি কাঁদতেন। নামাজান্তে যখন তিনি বেরুতেন, তখন চেহারা ধুয়ে নিতেন। চোখে সুরমা লাগিয়ে নিতেন। কেউ বুঝতেই পারত না, তিনি যে এত কেঁদেছেন!
শুধু তাই নয়; তিনি কিছু লোককে দান-খায়রাত করতেন। কাপড়চোপড় দিতেন। কিন্তু বাহককে বলে দিতেন, খবরদার! এসব কে পাঠিয়েছে- ভুলেও বলবে না!
মানসুর ইবনুল মুতামির একাধারে ৬০ বছর দিনেরবেলা রোজা রেখেছেন, আর রাতেরবেলা নামাজ পড়েছেন। এতে করে তিনি খুব বেশি কাঁদতেন। তার কান্নার আতিশয্যজনিত কারণে তার মা বলতেন,
-কী রে মনসুর! তুই কি কাউকে হত্যা করেছিস যে, এত কাঁদিস?
-মা! আমি জানি, আমি কী করেছি!
কিন্তু সকালবেলা ঠিকই তিনি চোখে সুরমা লাগিয়ে, মাথায় তেল মেখে, ঠোঁট আর্দ্র করে লোকদের সামনে যেতেন। যাতে লোকেরা তাকে ঠিকঠাক দেখতে পায়!
নোট : এমনই ছিল সালাফে সালিহিনদের আমল। রিয়া থেকে বাঁচতে তারা এভাবেই গোপনে আমল করতেন। আর আমরা...!
____
সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৩৯৪, যাহাবি
তাজকিরাতুল হুফফাজ : ১/১৩১, যাহাবি।
হিলয়াতুল আউলিয়া : ২/৩৪৭, ইস্পাহানি
তাহজিবুল কামাল : ২৮/৫৫৪, ইমাম মিজ্জি।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
শবে বরাত সম্পর্কে দশটি জরুরি কথা
শবে বরাত নিয়ে বর্তমানে বেশ বির্তকমণ্ডিত একটি অবস্থা বিরাজমান- সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেউ বলতে চাচ্...
اللہ تعالیٰ کے نزدیک پسندیدہ امور
تمام ادیان میں صرف اور صرف اسلام ہی اللہ تعالیٰ کے ہاں معتبر دین ہے، اسلام کے علاوہ تمام ادیان عند ا...
ফযীলতপূর্ণ যিলহজ্ব মাস:
হিজরী বর্ষের সর্বশেষ মাস যিলহজ্ব। বড়ই ফযীলত পূর্ণ মাস এটি। ‘আশহুরে হুরুম’ তথা ইসলামের সম্মানিত চার ম...
মনযিল এর আমল: পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও কিছু কথা
মানযিল কী? মানযিল মূলত কুরআনে নির্বাচিত কিছু আয়াতের সমষ্টি। কুরআনের ১৮ টি স্থান থেকে মোট ৭৯ টি আয়াত ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন