প্রবন্ধ
অসৎ কাজে বাধা না দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি
১৭ অক্টোবর, ২০২৬
০
০
একজন মানুষ অন্যায় করছে, এটি উদ্বেগের বিষয়; কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ না করা। কেউ স্বার্থের ভয়ে, কেউ সম্পর্ক রক্ষায়, আবার কেউ উদাসীনতাবশত নীরব থাকে। এভাবেই অন্যায় বিস্তার লাভ করে, আর সমাজ হারায় ন্যায় ও কল্যাণের পথ।
ইসলাম শুধু নিজে সৎ থাকার শিক্ষা দেয় না; বরং সাধ্যানুযায়ী অন্যকে সৎকাজে উৎসাহিত করা এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দেয়। তবে এ দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সামর্থ্য ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি। তাই অসৎকাজে বাধা দেওয়ার গুরুত্ব এবং তা পরিত্যাগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১. অসৎ কাজে বাধা দেওয়া: ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব
ইসলামের দৃষ্টিতে সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা কেবল নৈতিক সৌজন্য নয়; বরং এটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব এবং সমাজের কল্যাণ রক্ষার অন্যতম উপায়। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদির শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ হিসেবে এই বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
(হে মুসলিমগণ!) তোমরা সেই শ্রেষ্ঠতম দল, মানুষের কল্যাণের জন্য যাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ করে থাক ও অন্যায় কাজে বাধা দিয়ে থাক এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাই ব্যক্তিগত সংশোধনের পাশাপাশি সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখাও একজন মুমিনের দায়িত্ব।
২. অসৎ কাজে বাধা না দেওয়ার ভয়াবহতা
মানুষ যখন অন্যায় করে, তখন তার অপরাধের দায় প্রথমত তার নিজের। কিন্তু সমাজের মানুষ যদি অন্যায়ের বিস্তার রোধে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা পরিত্যাগ করে, তাহলে সেই সমাজও মারাত্মক বিপদের দিকে এগিয়ে যায়।
কুরআনুল কারিমে পূর্ববর্তী কিছু জাতির নিন্দার কারণ হিসেবে অন্যায় থেকে একে অপরকে বিরত না রাখার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
তারা যেসব অসৎ কাজ করত, তাতে একে অন্যকে নিষেধ করত না। বস্তুত তাদের কর্মপন্থা ছিল অতি মন্দ। (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৭৯)
আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শুধু অসৎকাজ করার নিন্দা করা হয়নি; বরং অসৎকাজ থেকে পরস্পরকে বিরত না রাখারও নিন্দা করা হয়েছে। অর্থাৎ, অন্যায় করা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি অন্যায়ের বিস্তার রোধে দায়িত্বশীল ভূমিকা না নেওয়াও গুরুতর বিষয়।
৩. আল্লাহর ব্যাপক শাস্তি ও বিপর্যয়ের আশঙ্কা
অসৎ কাজে বাধা না দেওয়ার অন্যতম ভয়াবহ পরিণতি হলো, অন্যায়ের প্রভাব কেবল অন্যায়কারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে। সমাজে যখন জুলুম, দুর্নীতি, প্রতারণা ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার অভিঘাত নিরপরাধ মানুষকেও বহন করতে হতে পারে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে ইরশাদ করেন,
وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
এবং সেই বিপর্যয়কে ভয় কর, যা বিশেষভাবে তোমাদের মধ্যে যারা জুলুম করে কেবল তাদেরকেই আক্রান্ত করবে না। জেনে রেখ, আল্লাহর আযাব সুকঠিন। (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৫)
এ আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, একজন মুসলিমের দায়িত্ব কেবল নিজেকে শরিয়তের অনুসারী বানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজে কোনো মন্দ কাজের বিস্তার ঘটতে দেখলে সাধ্যানুযায়ী তা প্রতিরোধের চেষ্টা করাও তার দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে বিপর্যয় দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু সরাসরি অন্যায়কারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
তাওজিহুল কুরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, এ দায়িত্ব পালনে যদি অবহেলা করে এবং সেই মন্দ কাজের দরুণ কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়, তবে মন্দ কাজে যারা সরাসরি জড়িত ছিল কেবল তারাই সেই বিপর্যয়ের শিকার হবে না; বরং যারা নিজেরা সরাসরি মন্দ কাজ করেনি, কিন্তু অন্যদেরকে তা করতে বাধাও দেয়নি, তাদেরকেও তার শিকার হতে হবে। (তাওজিহুল কুরআন)
৪. অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ
অসৎকাজ প্রতিরোধের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে। যদি সে তা করতে সক্ষম না হয়, তাহলে যেন মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ করে)। যদি তাও করতে সক্ষম না হয়, তাহলে যেন অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে। আর এটি ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)
এই হাদিসে অন্যায় প্রতিরোধের তিনটি স্তর বর্ণিত হয়েছে, হাত দিয়ে প্রতিরোধ, মুখে প্রতিবাদ এবং অন্তরে অন্যায়কে ঘৃণা করা। অর্থাৎ, অন্যায় প্রতিরোধে সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে হবে। তবে হাত দিয়ে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বৈধ কর্তৃত্ব ও সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করা জরুরি।
৫. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ সংকুচিত হয়ে যায়
সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইন থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সত্য বলার মানসিকতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার সাহস এবং অপরাধ প্রতিরোধে দায়িত্বশীল ভূমিকা।
কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে, দুর্বল মানুষের অধিকার কেড়ে নেয় কিংবা নিরপরাধ কাউকে অপবাদ দেয়, অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা ভয়ে বা স্বার্থের কারণে সত্য গোপন করে, তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
হে মুমিনগণ! তোমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী হয়ে যাও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতারূপে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৫)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে অবস্থান নেওয়া এবং সত্য সাক্ষ্য দেওয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দৃষ্টান্ত
অসৎকাজ প্রতিরোধের গুরুত্ব বোঝাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি হৃদয়গ্রাহী উপমা পেশ করেছেন। হজরত নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন,
مَثَلُ الْقَائِمِ عَلَى حُدُودِ اللَّهِ وَالْوَاقِعِ فِيهَا كَمَثَلِ قَوْمٍ اسْتَهَمُوا عَلَى سَفِينَةٍ، فَأَصَابَ بَعْضُهُمْ أَعْلَاهَا وَبَعْضُهُمْ أَسْفَلَهَا
আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষাকারী এবং তা লঙ্ঘনকারীর দৃষ্টান্ত এমন একদল মানুষের মতো, যারা একটি জাহাজে ওঠার জন্য লটারি করল। তাতে কারও ভাগে পড়ল জাহাজের ওপরের অংশ, আর কারও ভাগে পড়ল নিচের অংশ।
এরপর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নিচের অংশের যাত্রীরা পানি সংগ্রহ করতে গেলে ওপরের যাত্রীদের পাশ দিয়ে যেতে হতো। তখন তারা ভাবল, নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে পানি সংগ্রহ করলে ওপরের যাত্রীদের বিরক্ত করতে হবে না। এখন ওপরের যাত্রীরা যদি তাদের এই কাজ করতে দেয়, তাহলে সবাই ধ্বংস হবে; আর যদি তাদের বাধা দেয়, তাহলে নিজেরাও বাঁচবে, অন্যদেরও বাঁচাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৯৩)
এই উপমা আমাদের শেখায়, সমাজের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই অন্যায়কে অবাধে চলতে দিলে তার ক্ষতি শুধু অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো সমাজ বিপদের মুখে পড়তে পারে। অন্যায় প্রতিরোধ করা তাই ব্যক্তিগত সংশোধনের পাশাপাশি সম্মিলিত কল্যাণ রক্ষারও উপায়।
৭. দোয়া কবুল না হওয়ার আশঙ্কা
সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার দায়িত্ব পরিত্যাগ করার একটি ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ، ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ
সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। অন্যথায় অচিরেই আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন। এরপর তোমরা তাঁর কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে না। (জামে তিরমিযি, হাদিস: ২১৬৯)
হাদিসটি মুসলমানদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। সমাজে অন্যায়ের বিস্তার ঘটতে দেওয়া এবং সংশোধনের দায়িত্ব অবহেলা করা যে কত গুরুতর বিষয়, তা এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। তাই বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি কামনার পাশাপাশি সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার দায়িত্বও পালন করতে হবে।
৮. সমাজের ধ্বংস ও সামষ্টিক বিপর্যয়
একটি সমাজের সুস্থতা শুধু তার অধিবাসীদের ব্যক্তিগত নেক আমলের ওপর নির্ভর করে না; বরং সমাজে সংশোধনমূলক ভূমিকা কতটা সক্রিয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَىٰ بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ
আর আপনার প্রতিপালক এমন নন যে, জনপদগুলোকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করবেন, যখন সেখানকার অধিবাসীরা সংশোধনকারী। (সূরা হুদ, আয়াত: ১১৭)
হজরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আমাদের মধ্যে নেককার লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি উত্তরে বলেন,
نَعَمْ، إِذَا كَثُرَ الْخَبَثُ
হ্যাঁ, যখন পাপাচার ও অনাচার ব্যাপক হয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৪৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৮০)
এ হাদিস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, সমাজে পাপাচার ও অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তার পরিণতি শুধু অপরাধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে। তাই নিজের সংশোধনের পাশাপাশি সমাজের সংশোধনেও যথাসাধ্য ভূমিকা রাখা জরুরি।
৯. অসৎ কাজে বাধা দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি
অসৎকাজ প্রতিরোধ করতে গিয়ে পদ্ধতিগত ভুল হলে কখনো কখনো সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে আরও বড় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাই এ দায়িত্ব পালনে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
এক. অন্যায় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। কোনো কথা শোনা, অনুমান করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য দেখেই কাউকে অপরাধী বলা উচিত নয়। যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করতে হবে।
দুই. জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে নসিহত করা। কাউকে সংশোধনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তার কল্যাণ; অপমান, বিদ্রূপ কিংবা অহংকার প্রদর্শন নয়। একান্তে নসিহত করা অধিক উপযোগী হলে সেই পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত।
তিন. সামর্থ্য ও কর্তৃত্ব বিবেচনা করা। যে বিষয়ে বৈধ কর্তৃত্ব নেই, সেখানে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করা যাবে না। অপরাধ প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের সীমারেখা বুঝতে হবে।
চার. সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনা করা। কোনো পদক্ষেপে আরও বড় অন্যায় বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে বিকল্প পদ্ধতি অনুসন্ধান করতে হবে। প্রতিবাদের লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়; বরং যথাসম্ভব কল্যাণ অর্জন করা।
পাঁচ. নিজের সংশোধন দিয়ে শুরু করা। অন্যকে অন্যায় থেকে নিষেধ করার পাশাপাশি নিজেকেও অন্যায় থেকে বাঁচতে হবে। নিজের আচরণে অসততা রেখে অন্যকে সততার উপদেশ দিলে কথার প্রভাব দুর্বল হয়ে যায়।
ছয়. অন্যায়কারীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। কোনো ব্যক্তি ভুল করলে তাকে চিরস্থায়ীভাবে অপমানিত করা বা তার প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো উদ্দেশ্য নয়। বরং অন্যায় বন্ধ করা, ক্ষতিগ্রস্তের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়াই কাম্য, যেখানে তা ন্যায়সংগত ও নিরাপদ।
অসৎকাজের বিস্তার রোধ করা শুধু অন্যায়কারীর সংশোধনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সমাজের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সামষ্টিক কল্যাণ জড়িত। কুরআন ও হাদিসে এ দায়িত্ব অবহেলার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। তাই আসুন, আমরা নিজেরা অন্যায় থেকে বেঁচে থাকি, অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিই এবং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় প্রতিরোধে ভূমিকা রাখি। নির্যাতিতের পাশে দাঁড়াই, সত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হই এবং অন্যায়কারীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করি।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
ওলী হওয়ার সহজ পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর… আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে আজ এখানে একত্র করেছেন ...
তাকওয়া হাসিলের উপায়
‘ইসলাহে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির বিষয়ে কিছু কথা আপনাদের খিদমতে পেশ করতে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্র...
সন্তানের শিক্ষা ভাবনাঃ অতি উৎসাহ যেন বিপরীত ফল বয়ে না আনে!
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন