প্রবন্ধ
জিহাদের ময়দানে নারী সাহাবীগণ
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৪৬
০
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)-এর ত্যাগ ও কুরবানির কথা আলোচনা করলে সাধারণত পুরুষ সাহাবীদের বীরত্বের ঘটনাগুলোই বেশি সামনে আসে। অথচ দ্বীনের এই মহান সংগ্রামে নারী সাহাবিয়াগণের অবদানও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা কখনো আহতদের সেবা করেছেন, কখনো তৃষ্ণার্ত মুজাহিদদের পানি পান করিয়েছেন, কখনো খাবার প্রস্তুত করেছেন, কখনো অসুস্থদের পরিচর্যা করেছেন; আবার প্রয়োজনের বিশেষ মুহূর্তে কেউ কেউ অস্ত্র হাতে নিয়ে মুসলিমদের ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিরক্ষায়ও দাঁড়িয়েছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—নারী সাহাবীদের জিহাদের ময়দানে অংশগ্রহণ বলতে প্রত্যেকের সরাসরি যুদ্ধ করা বোঝায় না। বরং তাঁদের অধিকাংশের ভূমিকা ছিল যুদ্ধের সহযোগী ও সেবামূলক দায়িত্ব পালন করা। আর যাঁরা সরাসরি অস্ত্র ধারণ করেছেন, তাঁদের ঘটনাগুলো ছিল বিশেষ পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই আম্মাজান আয়িশা (রাযি.)-কে জিহাদ সম্পর্কে বলেছেন,
جِهَادُكُنَّ الْحَجُّ
“তোমাদের জিহাদ হলো হজ।”—সহিহ বুখারি, ২৮৭৫।
অতএব নারী সাহাবীদের জিহাদের ঘটনাগুলোকে তাঁদের অসাধারণ ঈমান, ত্যাগ, সাহস ও দ্বীনের প্রতি আনুগত্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হবে; একই সঙ্গে শরিয়তের সাধারণ বিধান ও বিশেষ পরিস্থিতির ঘটনাকে পৃথক করে বুঝতে হবে
যুদ্ধের ময়দানে নারীদের উপস্থিতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে কোনো কোনো গযওয়ায় সাহাবিয়ারা মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন, এটি সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আনাস (রাযি.) বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَغْزُو بِأُمِّ سُلَيْمٍ وَنِسْوَةٍ مِنَ الْأَنْصَارِ مَعَهُ إِذَا غَزَا، فَيَسْقِينَ الْمَاءَ وَيُدَاوِينَ الْجَرْحَى.
“রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন গযওয়ায় যেতেন, তখন উম্মে সুলাইম (রাযি.) এবং আনসারদের কিছু নারী তাঁর সঙ্গে যেতেন। তাঁরা পানি পান করাতেন এবং আহতদের চিকিৎসা করতেন।”—সহিহ মুসলিম, ১৮১০।
এই সংক্ষিপ্ত হাদীসের মধ্যে নারী সাহাবীদের ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। তাঁরা যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে কেবল অবস্থান করতেন না; বরং মুসলিম মুজাহিদদের জন্য এমন কাজ করতেন, যা যুদ্ধের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
একজন আহত মুজাহিদের জীবন বাঁচানো, তৃষ্ণার্ত সৈনিককে পানি দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা কিংবা যুদ্ধরত বাহিনীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা—এসবও ছিল সেই কঠিন সময়ে দ্বীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খেদমত।
উম্মে আতিয়্যাহ (রাযি.)—এর সাতটি গযওয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা
নারী সাহাবীদের এ ভূমিকার সবচেয়ে স্পষ্ট দলিলগুলোর একটি হলো উম্মে আতিয়্যাহ আনসারিয়্যাহ (রাযি.)-এর বর্ণনা। তিনি বলেন,
غَزَوْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ سَبْعَ غَزَوَاتٍ، أَخْلُفُهُمْ فِي رِحَالِهِمْ، فَأَصْنَعُ لَهُمُ الطَّعَامَ، وَأُدَاوِي الْجَرْحَى، وَأَقُومُ عَلَى الْمَرْضَى.
“আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে সাতটি গযওয়ায় অংশগ্রহণ করেছি। আমি তাঁদের অবস্থানস্থল ও মালপত্রের দেখাশোনা করতাম, তাঁদের জন্য খাবার প্রস্তুত করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের সেবা করতাম।”—সহিহ মুসলিম, ১৮১২।
[أم عطية الأنصارية]
وحديثها أصل في غسل الميتة؛ من كبار الصحابيات، وكانت تغزو مع رسول الله - صَلّى الله عَلَيْه وآله وسلّم - وتداوي الجرحى، وتمرض المرضى.
أخرج لها: المؤيد بالله ، وأبو طالب، ومحمد.
عنها: أنس، ومحمد، وحفصة، ابنا سيرين
খেয়াল করার বিষয় হলো, উম্মে আতিয়্যাহ (রাযি.) নিজেই বলছেন—তিনি সাতটি গযওয়ায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু তাঁর নিজের বর্ণিত দায়িত্বের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের কথা নেই; বরং তিনি খাবার প্রস্তুত করা, আহতদের চিকিৎসা করা, অসুস্থদের সেবা করা এবং শিবিরের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধের ময়দানে নারীর অবদানকে শুধু তরবারি ও বর্শার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তাঁদের প্রকৃত খেদমত অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।
একজন মুজাহিদ যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলা করছেন, আর তাঁর পেছনে কেউ তাঁর ক্ষত বেঁধে দিচ্ছেন, পানি দিচ্ছেন, খাবার তৈরি করছেন এবং অসুস্থ অবস্থায় তাঁর পরিচর্যা করছেন—দুই ধরনের কাজই সেই সামগ্রিক প্রচেষ্টার অংশ
উহুদের ময়দানে উম্মে ‘আমারা (রাযি.)
নারী সাহাবীদের সাহসিকতার কথা উঠলে যে নামটি বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়, তিনি হলেন নুসাইবাহ বিনতে কা‘ব (রাযি.), যিনি উম্মে ‘আমারা নামে পরিচিত।
তিনি ছিলেন আনসারদের সম্মানিত সাহাবিয়া। তিনি বাইআতে আকাবায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে উহুদ, হুদাইবিয়া, হুনাইন ও ইয়ামামাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁর জীবনী প্রাচীন জীবনীগ্রন্থগুলোতে বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।
উহুদের দিন তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ।
প্রথমদিকে তিনি অন্য নারীদের মতো পানি সরবরাহ ও আহতদের সেবার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতি যখন হঠাৎ পরিবর্তিত হলো এবং বহু সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন, তখন উম্মে ‘আমারা (রাযি.) পিছিয়ে যাননি। বরং তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিরক্ষায় দাঁড়িয়ে যান।
তাঁর নিজের বর্ণনা সম্পর্কে ঐতিহাসিক সূত্রে এসেছে,
فَجَعَلْتُ أُبَاشِرُ الْقِتَالَ وَأَذُبُّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ بِالسَّيْفِ وَأَرْمِي بِالْقَوْسِ
অর্থাৎ, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিরক্ষায় সরাসরি যুদ্ধ করেন এবং তীর-ধনুকও ব্যবহার করেন। উহুদের দিনে তিনি একাধিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
তাঁর জীবনের এই ঘটনা নিঃসন্দেহে সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।—সিয়ারু আলামীন নুবাল
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মুখে উম্মে ‘আমারা (রাযি.)-এর মর্যাদা
উম্মে ‘আমারা (রাযি.)-এর উহুদের দিনের অবস্থান তাঁর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। জীবনীগ্রন্থে তাঁর উহুদের দিনের সাহসিকতার প্রশংসাসূচক বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম যাহাবি তাঁর জীবনীতে তাঁকে উল্লেখ করেছেন,
أُمُّ عَمَارَةَ نُسَيْبَةُ بِنْتُ كَعْبٍ ... الْفَاضِلَةُ الْمُجَاهِدَةُ
অর্থাৎ, তিনি ছিলেন মর্যাদাশীল ও আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী সাহাবিয়া।
তাঁর জীবনের আরেকটি দিকও অত্যন্ত বিস্ময়কর। পরবর্তী সময়ে তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানেও মারাত্মকভাবে আহত হন; তাঁর একটি হাত কেটে যায়। তাঁর ছেলে হাবীব (রাযি.)-কে মুসাইলিমা হত্যা করেছিল। এসব ঘটনা তাঁর পরিবারের দ্বীনের জন্য ত্যাগের গভীরতাও প্রকাশ করে।
অর্থাৎ উম্মে ‘আমারা (রাযি.)-এর জীবন কেবল একটি যুদ্ধের সাহসিকতার গল্প নয়; বরং তাঁর জীবনের দীর্ঘ পথজুড়ে ঈমান, আনুগত্য ও ত্যাগের ছাপ রয়েছে।—সিয়ারু আলামিন নুবালা
হুনাইনের ময়দানে উম্মে সুলাইম (রাযি.)
উম্মে সুলাইম (রাযি.) ছিলেন আরেক সাহসী আনসারি সাহাবিয়া। হুনাইনের যুদ্ধের দিনও তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে ছিলেন।
আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে,
أَنَّ أُمَّ سُلَيْمٍ اتَّخَذَتْ يَوْمَ حُنَيْنٍ خِنْجَرًا، فَكَانَ مَعَهَا، فَرَآهَا أَبُو طَلْحَةَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذِهِ أُمُّ سُلَيْمٍ مَعَهَا خِنْجَرٌ، فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَا هَذَا الْخِنْجَرُ؟ قَالَتْ: اتَّخَذْتُهُ، إِنْ دَنَا مِنِّي أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ بَقَرْتُ بِهِ بَطْنَهُ...
“উম্মে সুলাইম (রাযি.) হুনাইনের দিন একটি খঞ্জর সঙ্গে রেখেছিলেন। আবু তালহা (রাযি.) তাঁকে দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই যে উম্মে সুলাইম, তাঁর সঙ্গে একটি খঞ্জর রয়েছে।’ রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটি কী?’ তিনি বললেন, ‘আমি এটি সঙ্গে রেখেছি। কোনো মুশরিক আমার কাছে এলে এর মাধ্যমে তার পেট বিদীর্ণ করব।’”
এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
يَا أُمَّ سُلَيْمٍ، إِنَّ اللَّهَ قَدْ كَفَى وَأَحْسَنَ
“হে উম্মে সুলাইম! আল্লাহ যথেষ্ট হয়েছেন এবং উত্তম করেছেন।”—সহিহ মুসলিম, ১৮০৯।
এই ঘটনা উম্মে সুলাইম (রাযি.)-এর অসাধারণ সাহস ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। বিশেষ করে হুনাইনের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাননি।
তবে এখানেও লক্ষণীয় বিষয় হলো—এটি একটি বিশেষ পরিস্থিতির ঘটনা। এটিকে নারীদের জন্য সাধারণভাবে যুদ্ধের নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
খন্দকের যুদ্ধে সাফিয়্যাহ (রাযি.)—এর খন্দকের দুর্গে সাহসিকতা
সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রা.) খন্দকের যুদ্ধের সময় হাসসান ইবন সাবিত (রা.)-এর দুর্গ ফারেআ-তে অবস্থান করছিলেন। সেখানে হাসসান (রা.)-এর সঙ্গে নারী ও শিশুরাও ছিল।
সাফিয়্যা (রা.) বলেন, এক ইহুদি লোক আমাদের দুর্গের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে লাগল। তখন বনু কুরাইযা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছিল। ফলে আমাদের রক্ষা করার মতো সেখানে কেউ ছিল না। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মুসলিমরা শত্রুবাহিনীর সম্মুখে অবস্থান করছিলেন; আমাদের দিকে ফিরে আসাও তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
আমি হাসসান (রা.)-কে বললাম, “আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, এই ইহুদি লোকটি দুর্গের চারপাশে ঘোরাফেরা করছে। আমি আশঙ্কা করছি, সে আমাদের অবস্থা জেনে আমাদের পেছনে থাকা ইহুদিদের কাছে খবর পৌঁছে দেবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণও আমাদের ব্যাপারে ব্যস্ত হওয়ার সুযোগে নেই। তাই আপনি নিচে নেমে তাকে হত্যা করুন।”
হাসসান (রা.) বললেন, “আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা! আপনি তো জানেন, আমি এ কাজের লোক নই।”
তখন সাফিয়্যা (রা.) বলেন, হাসসান (রা.) যখন এ কথা বললেন এবং তাঁর কাছ থেকে কোনো সাহায্য পেলাম না, তখন আমি নিজের কাপড় শক্ত করে বেঁধে নিলাম, একটি লাঠি/দণ্ড হাতে নিলাম এবং দুর্গ থেকে নিচে নেমে সেই ইহুদির কাছে গেলাম। এরপর সেই দণ্ড দিয়ে তাকে আঘাত করতে থাকলাম, অবশেষে তাকে হত্যা করলাম।
তারপর আমি দুর্গে ফিরে এসে হাসসান (রা.)-কে বললাম, “আপনি নিচে গিয়ে তার পরিত্যক্ত অস্ত্র-সামগ্রী নিয়ে আসুন। আমি শুধু এ কারণে তার মাল-সামগ্রী নিইনি যে, সে একজন পুরুষ।”
হাসসান (রা.) বললেন, “হে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা! তার মাল-সামগ্রীর প্রতি আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সংকটময় পরিস্থিতিতে নারীরা কেবল শুশ্রূষা ও রসদ সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; প্রয়োজন দেখা দিলে প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালনের সাহসও তাঁদের মধ্যে ছিল।
খায়বারে নারীদের বিভিন্ন সহযোগিতামূলক দায়িত্ব
কয়েকজন নারী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে চুলের সুতা কাটা, আল্লাহর পথে সহযোগিতা করা, আহতদের চিকিৎসা করা, যোদ্ধাদের তীর পৌঁছে দেওয়া এবং সাওয়ীক পান করানোর কথা উল্লেখ করেন। বর্ণনাটি হলো—
فَقُلْنَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، خَرَجْنَا نَغْزِلُ الشَّعَرَ، وَنُعِينُ بِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَمَعَنَا دَوَاءُ الْجَرْحَى، وَنُنَاوِلُ السِّهَامَ، وَنَسْقِي السَّوِيقَ...
অর্থাৎ, তাঁরা শুধু আহতদের চিকিৎসাই করতেন না; বরং যুদ্ধের প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রস্তুত করা, তীর পৌঁছে দেওয়া এবং যোদ্ধাদের পানীয় সরবরাহের মতো কাজেও অংশ নিতেন। এটি নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়ক ও সেবামূলক ভূমিকার আরও বিস্তৃত একটি চিত্র তুলে ধরে।— সুনান আবি দাউদ, কিতাবুল জিহাদ।
উম্মে আম্মারা নুসাইবা বিনতে কা‘ব (রা.)—উহুদ ও ইয়ামামার সাহসী মুজাহিদা
নুসাইবা বিনতে কা‘ব (রা.), যিনি উম্মে আম্মারা নামে প্রসিদ্ধ, উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিরক্ষায় অসাধারণ সাহস প্রদর্শন করেন। তাঁর জীবনীতে বর্ণিত হয়েছে যে, মুসলিম বাহিনীর পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হওয়ার পর তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট অবস্থান করে তাঁকে রক্ষা করতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে ইয়ামামার যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং গুরুতরভাবে আহত হন; তাঁর শরীরে বহু আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং এক হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। —লাওয়ামিউল আনওয়ার
তাঁর এই জীবনচরিত নারী সাহাবীদের মধ্যে ঈমান, সাহস, আত্মত্যাগ ও দ্বীনের জন্য বিপদ গ্রহণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখযোগ্য। তবে উহুদের যুদ্ধের বিস্তারিত ঘটনাগুলো মূলত সীরাত ও জীবনীগ্রন্থে বিভিন্ন সনদে এসেছে।
রেফারেন্স: ইবন হাজর, আল-ইসাবাহ ফি তাময়ীযিস সাহাবাহ; যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; ইবনুল আসীর, উসদুল গাবাহ।
শুধু অস্ত্র নয়—সেবাও ছিল তাঁদের জিহাদ
নারী সাহাবীদের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কখনো কখনো শুধু নুসাইবাহ (রাযি.)-এর তরবারি বা উম্মে সুলাইম (রাযি.)-এর খঞ্জরের ঘটনা সামনে আসে। এতে তাঁদের অবদানের একটি বড় অংশ আড়ালে পড়ে যায়।
সহিহ মুসলিমের হাদীসগুলো দেখলে বরং অন্য একটি চিত্র সামনে আসে। উম্মে আতিয়্যাহ (রাযি.) সাতটি গযওয়ায় অংশগ্রহণের কথা বলে যে কাজগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলো হলো—
رِحَالِهِمْ — শিবির ও মালপত্রের দেখাশোনা,
أَصْنَعُ لَهُمُ الطَّعَامَ — খাবার প্রস্তুত করা,
أُدَاوِي الْجَرْحَى — আহতদের চিকিৎসা করা,
أَقُومُ عَلَى الْمَرْضَى — অসুস্থদের সেবা করা।—সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৮১৫
আর আনাস (রাযি.)-এর বর্ণনায় উম্মে সুলাইম (রাযি.) ও আনসারি নারীদের কাজ ছিল—
فَيَسْقِينَ الْمَاءَ وَيُدَاوِينَ الْجَرْحَى
“তাঁরা পানি পান করাতেন এবং আহতদের চিকিৎসা করতেন।”—সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৪৫৩১
সুতরাং যুদ্ধের ময়দানে নারী সাহাবীদের ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক। তাঁদের কেউ ছিলেন সেবিকা, কেউ চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত, কেউ রসদের দায়িত্বে, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে কেউ প্রতিরক্ষায় অস্ত্রও ধারণ করেছেন।
সাহাবিয়াদের ত্যাগের প্রকৃত শিক্ষা
নারী সাহাবীদের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—দ্বীনের জন্য অবদান রাখার ক্ষেত্র একটিমাত্র নয়।
উম্মে আতিয়্যাহ (রাযি.) আমাদের শেখান, আহতদের সেবা করাও আল্লাহর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেদমত।
উম্মে সুলাইম (রাযি.) শেখান, বিপদের সময় একজন মুমিন নারীর অন্তরে কতখানি সাহস ও দৃঢ়তা থাকতে পারে।
সাফিয়্যাহ (রাযি.)-এর ঘটনা শেখায়, সংকটের সময় নিজের দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে না গিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হয়।
আর উম্মে ‘আমারা (রাযি.)-এর জীবন শেখায়—ঈমান ও ভালোবাসা মানুষের মধ্যে এমন সাহস সৃষ্টি করতে পারে, যা সাধারণ অবস্থায় কল্পনাও করা যায় না।
তবে তাঁদের অনুসরণ করার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক নারীকে যুদ্ধের ময়দানে যেতে হবে। বরং তাঁদের অনুসরণ করার অর্থ হলো—নিজের সামর্থ্য, দায়িত্ব ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্বীনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা।
কারও জন্য তা হতে পারে সন্তানদের দ্বীনি তরবিয়ত দেওয়া, কারও জন্য ইলম শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া, কারও জন্য পরিবারকে দ্বীনের ওপর পরিচালনা করা, কারও জন্য অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সেবা করা—আর কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে শরিয়তসম্মত প্রয়োজন দেখা দিলে অন্য ধরনের খেদমতও হতে পারে।
শেষ কথা, ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের মুমিন নারীরা ছিলেন না নিস্তেজ দর্শক। তাঁরা দ্বীনের জন্য কষ্ট সহ্য করেছেন, হিজরত করেছেন, সন্তান ও স্বামীকে দ্বীনের পথে উৎসাহিত করেছেন এবং প্রয়োজনের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
কখনো তাঁদের হাতে ছিল পানির মশক, কখনো চিকিৎসার সরঞ্জাম, কখনো খাবারের পাত্র; আবার উহুদের ভয়াবহ মুহূর্তে উম্মে ‘আমারা (রাযি.)-এর হাতে উঠে এসেছিল তরবারি। হুনাইনের ময়দানে উম্মে সুলাইম (রাযি.) আত্মরক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে খঞ্জর সঙ্গে রেখেছিলেন। আর সাতটি গযওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনাকারী উম্মে আতিয়্যাহ (রাযি.) দেখিয়ে দিয়েছেন—মুজাহিদদের খাবার তৈরি করা, আহতদের চিকিৎসা করা ও অসুস্থদের সেবা করাও কত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তাঁদের জীবন তাই আমাদের সামনে এক অনন্য সত্য তুলে ধরে—দ্বীনের জন্য ত্যাগের ময়দান শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের নাম নয়। কখনো তা হয় ক্ষতবিক্ষত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কখনো তৃষ্ণার্তকে পানি দেওয়া, কখনো অসুস্থের সেবা করা, কখনো সন্তানকে ঈমানের ওপর গড়ে তোলা; আর যখন বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তখন কোনো কোনো সাহাবিয়া নিজের জীবন বিপন্ন করেও ইসলামের প্রতিরক্ষায় দাঁড়িয়েছেন।
তাঁদের এই ঈমান, ত্যাগ, সাহস ও আনুগত্য মুসলিম নারীদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের নারীদের ইসলামের জন্য যাবতীয় কষ্ট-ক্লেশ, ধৈর্য, সবরের তাওফিক দান করুন। আমীন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (১ম পর্ব)
...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه،ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا،...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন