প্রবন্ধ
নাস্তিকতার বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান পতন
৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৫২৮
০
একদা বিজ্ঞানমঞ্চে যে নব্য নাস্তিকতাকে সর্বজনীন সত্য বলে চালিয়ে দেওয়ার মহোৎসব শুরু হয়েছিল, তা আজ আধুনিক বিজ্ঞানেরই নতুন অনুসন্ধানে কাঁচের দেয়ালের মতো গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। সত্য কখনো কোনো মুখরোচক ধারণার কাছে বন্দি থাকে না, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব নিজেই তার সৃষ্টিকর্তার সাক্ষী হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে!
কী আশ্চর্য! আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা থেকেই নব্য নাস্তিকতা নতুন করে প্রাণ পেতে শুরু করে। পরবর্তীতে ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্ব যখন সামনে এলো, তখন মনে হলো নাস্তিকতা যেন এমন এক দুর্বার গতি পেল, যাকে থামানোর আর কিছুই নেই। চারদিক থেকে শত শত বিজ্ঞানী এবং বহু নামিদামি সংস্থা-সংগঠন নাস্তিকতার প্রচার ও প্রসারে নেমে পড়ল। এই নব্য নাস্তিকতার ধাক্কায় কোটি কোটি মানুষ স্রষ্টায় বিশ্বাস হারাল। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল, নাস্তিকতাই বুঝি পুরো পৃথিবী দখল করে নিচ্ছে; আর ‘বিজ্ঞান’ মানেই মানুষের মন-মগজে গেঁথে গেল কেবলই নাস্তিকতা।
কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই নাস্তিকতার মূল স্তম্ভ এই বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরলেন বাঘা বাঘা কয়েকজন বিজ্ঞানী, যাঁরা নিজেরাও একসময় বিবর্তনবাদী নাস্তিক ছিলেন এবং বিবর্তনবাদের প্রতিটি চোরাগলি যাঁদের জানা ছিল। ব্যস, এবার পাশা উল্টে গেল! বিবর্তনতত্ত্ব এমন এক বড় ধাক্কা খেল যে, তার মেরুদণ্ডটাই আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। নামজাদা বিজ্ঞানীরা বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে একে একে কলম ধরতে শুরু করলেন।
অন্যদিকে, কিছু বিজ্ঞানী স্বয়ং বিজ্ঞান, যুক্তি ও দর্শনকে হাতিয়ার করে আস্তিকতার সপক্ষে জোরালো প্রমাণ উপস্থাপন করা শুরু করলেন। দারুণ জমে উঠল আলোচনা! তাঁদের দেখে সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি খোদ বিবর্তনবাদী নাস্তিক বিজ্ঞানীদেরও অনেকে বিবর্তনবাদ ও নাস্তিকতাকে চিরতরে ‘বিদায়’ জানালেন। ফলে দেখা গেল, ‘বিজ্ঞান’ নাম দিয়ে যে বিবর্তনকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল (এবং যা এখনও অব্যাহত আছে), সেই বিবর্তনবাদ মুখ থুবড়ে পড়ল। দিন যত যাচ্ছে, এটি নতুন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে এবং অনেক বিজ্ঞানীই একে বিজ্ঞানের পৌরাণিক কাহিনীর কাতারে ফেলে দিচ্ছেন।
শত শত বছর ধরে বোঝানো হয়েছে যে, সৃষ্টির সবকিছু বিন্দুমাত্র সূচনার পর প্রাকৃতিক উপায়ে নিজে নিজেই এতদূর এসেছে। কিন্তু পরবর্তীতে এটিই প্রমাণিত হলো যে, এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরের এই ধারণা একটি কাল্পনিক বিষয়—হাজার চেষ্টা করেও যার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। জীবাশ্মের তথ্যাদি (Fossil Records) পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রজাতিগুলো হঠাৎ করেই নিখুঁত গঠনে আত্মপ্রকাশ করেছে, কোনো মধ্যবর্তী রূপান্তরকারী প্রজাতির অস্তিত্ব সেখানে পাওয়া যায় না। এছাড়া কোষের ভেতরের জটিলতা (Irreducible Complexity) এবং ডিএনএ-র মধ্যে সংকেত হিসেবে জমা থাকা অগাধ তথ্য (Digital Code/Information) প্রমাণ করে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি একজন অতি-বুদ্ধিমান ‘ডিজাইনার’ বা পরিকল্পনাকারী ছাড়া ঘটা একেবারেই অসম্ভব। অন্ধ প্রকৃতি কখনো অর্থপূর্ণ ইনফরমেশন তৈরি করতে পারে না।
আর সৃষ্টির সূচনা বা 'বিগিনিং'-এর কথা তো বাদই দিলাম। মৌলিক যেকোনো বিষয়ের একেবারে শুরুতে গেলে সেখানে আর বিজ্ঞানের সাধারণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আধুনিক কসমোলজি বা মহাকাশবিজ্ঞান স্বীকার করে নিয়েছে যে, এই মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট সূচনা বা ‘বিগিনিং’ ছিল। ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর স্থির মহাবিশ্বের (Steady State Model) সেই নাস্তিক্যবাদী ধারণা ধুলায় মিশে গেছে। সময়, স্থান ও পদার্থের এই বিশাল সাম্রাজ্য যদি একসময় অস্তিত্বহীন থাকে, তবে তা নিজে নিজে অস্তিত্বে আসতে পারে না। বিষয়টি কীভাবে আছে এবং কেন আছে—বিজ্ঞান সে বিষয়ে নিঃশব্দ।
অথচ অনেক নাস্তিক দাবি করেন, সবকিছু ‘এমনি এমনি’ হয়ে গেছে। এটি স্রেফ তাঁদের অন্ধ বিশ্বাস, যার পেছনে কোনো সত্যতা নেই। ‘এমনি এমনি হতে পারে’ এই কথার পক্ষে না আছে কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ, না কোনো বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিযুক্ত ভিত্তি। কোনো নিয়ম ছাড়া নিয়ম তৈরি হতে পারে না, পরম শৃঙ্খলা ছাড়া ফাইন-টিউনড মহাবিশ্ব টিকতে পারে না।
এর বিপরীতে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাক্ষুষ প্রমাণ বলছে, যেকোনো নির্মিত বস্তুর জন্য একজন নির্মাণকারী অবশ্যই প্রয়োজন। বিজ্ঞান বলে: কার্যকারণ (Cause and Effect) ছাড়া কোনো কিছুই ঘটে না। আর দর্শন বলে: যে বস্তু একসময় ছিল না কিন্তু পরে অস্তিত্বে এসেছে, তার পেছনে অবশ্যই একটি ‘কারণ’ থাকতে হবে, আর সেই মূল ও পরম কারণটিই (Uncaused Cause) হলেন মহান সৃষ্টিকর্তা।
নাস্তিক্যবাদী বা বিবর্তনবাদীদের মূল দাবি হলো, অসংখ্য-অগণিত সময় নাকি লুকিয়ে আছে তাদের হাতে, আর সেই অসীম সময়ের ভেতর অন্ধ প্রকৃতির কোটি কোটি ‘ভুল চেষ্টা’র পর নাকি ধীরে ধীরে সবকিছু নিজে নিজে সঠিক রূপ ধারণ করেছে!
বলি, একটা জিনিস ‘নিজে নিজে’ হতে আসলে কত সময় লাগে? আধুনিক বিজ্ঞান বলে, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় চৌদ্দশত কোটি বছর। অথচ বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার ফ্রেড হোয়েল গাণিতিক হিসাব কষে দেখিয়েছিলেন, একটি সরলতম জীবকোষ যদি নিজে নিজে অস্তিত্বে আসার জন্য প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন বারও অন্ধ চেষ্টা চালাতে থাকে, তাহলেও মহাবিশ্বের এই পুরো সময়কে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিলেও তা ঘটা গাণিতিকভাবে অসম্ভব!
অথচ জীবকোষ তো বাস্তবে বিদ্যমান! আমাদের চোখের সামনেই তা জীবন আর স্পন্দনে জীবন্ত। তাহলে এখান থেকে কী প্রমাণিত হলো? এটি কি আদৌ নিজে নিজে হওয়া সম্ভব ছিল? যদি সবকিছু অন্ধ সময় আর ‘এমনি এমনি’ হওয়ার ওপর নির্ভর করত, তবে জীবকোষ আজ পর্যন্ত চির-অনস্তিত্বেই পড়ে থাকত!
তদুপরি, প্রকৃতিতে ‘ভুলভাল’ হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র বা নিয়ম নেই। ভৌতবিজ্ঞান ও রসায়নের প্রতিটি নিয়ম প্রথম দিন থেকেই পরম নিখুঁত, যথার্থ ও সুনির্দিষ্ট। যেখানে প্রকৃতির পুরো কাঠামোটাই সুনির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা, সেখানে চেতনাহীন জড় প্রকৃতি কিসের ভিত্তিতে কোটি কোটি বার ‘ভুল ট্রায়াল’ দিতে যাবে? আজ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক ইতিহাসে কোনো ভুলভাল আকস্মিক দুর্ঘটনার মাধ্যমে সুসংগঠিত কোড বা জীবন তৈরি হওয়ার একটিও চাক্ষুষ প্রমাণ মেলেনি।
অতএব, এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা অন্ধ প্রকৃতির ভুলভ্রান্তির ফসল নয়; বরং এর স্পষ্ট ও অকাট্য অর্থ হলো, এর পেছনে রয়েছেন একজন পরম মহাজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান পরিকল্পনাকারী, যাঁর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও অসীম ক্ষমতায় এই মহাবিশ্ব ও জীবন অস্তিত্ব লাভ করেছে!
আর তারা যখন একেবারে শুরুতে ফিরে যায়, ভাবতে শুরু করে কীভাবে এই অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর মহাবিশ্বের সূচনা হলো, তখন আশ্রয় নেয় ‘মাল্টিভার্স’ বা ‘বহুবিশ্ব’ ধারণার মতো অবাস্তব কল্পনার রূপকথায়!
চিন্তা করে দেখুন, অলীক কল্পনারও তো একটা সীমা থাকা উচিত! এটা কি বিজ্ঞান, নাকি বিজ্ঞানের ঘাড়ে চেপে বসা নাস্তিকতার ভূত? নাকি দর্শনের ঘাড়ে কোনো অ-দর্শনের জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা? এ ধরনের কাল্পনিক ও প্রমাণহীন থিওরির বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রত্যাখ্যান ইতিমধ্যে আমরা আমাদের ‘স্রষ্টা’ বিষয়ক বইতে বিস্তারিত আলোচনা করেছি, আলহামদুলিল্লাহ!
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ
...
ঈমান-আমল সুরক্ষিত রাখতে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সঙ্গে থাকুন, অন্যদের সঙ্গ ছাড়ুন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتّ...
ইসলামী শরীয়ার দৃষ্টিতে বিকাশ ও মোবাইল ব্যাংকিং
...
দু'টি ধারা : কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহ
হিদায়াতের মূল উৎস কুরআন সুন্নাহ'র শিক্ষা। এ শিক্ষা অর্জন করতে হবে শিক্ষকের মাধ্যমে। শিক্ষকের মাধ্যম...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন