প্রবন্ধ
বিজ্ঞান বনাম বিজ্ঞানবাদ
৯ জুলাই, ২০২৬
৬২০
০
মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন ও সত্য অনুসন্ধানে 'বিজ্ঞান' আমাদের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে কেবল জ্ঞান অর্জনের একটি পথ না ভেবে, সত্যে পৌঁছানোর 'একমাত্র' মাধ্যম হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক পার্থক্যটি বোঝার জন্যই আমাদের জানতে হবে 'বিজ্ঞান' (Science) এবং 'বিজ্ঞানবাদ' (Scientism)-এর মধ্যকার সীমানা।
১. Science (বিজ্ঞান)-এর সংজ্ঞা
অক্সফোর্ড ডিকশনারি বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছে,
Knowledge about the structure and behavior of the natural and physical world, based on facts that you can prove, for example by experiments.
অর্থাৎ, প্রাকৃতিক ও ভৌত জগতের গঠন ও আচরণ সম্পর্কিত এমন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান, যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রমাণযোগ্য বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
২. Scientism (বিজ্ঞানবাদ)-এর সংজ্ঞা
অক্সফোর্ড ডিকশনারি বিজ্ঞানবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছে,
complete belief in scientific methods, or in the truth of scientific knowledge.
'বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালী এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের সত্যতার ওপর সম্পূর্ণ ও অবিচল বিশ্বাস রাখা।'
এমআইটি-র পদার্থবিদ ইয়ান হাচিনসন বিজ্ঞানবাদের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে: 'প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আদলে তৈরি জ্ঞানই একমাত্র প্রকৃত জ্ঞান।' ("Scientism says, or at least implicitly assumes, that rational knowledge is scientific, and everything else that claims the status of knowledge is just superstition, irrationality, emotion, or nonsense."
Ian Hutchinson, Monopolizing Knowledge, p: 1.)
দার্শনিক টম সোরেল বলেছেন, এটি হলো 'জ্ঞানের অন্যান্য শাখার তুলনায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া।' ("Scientism is a matter of putting too high a value on natural science in comparison with other branches of learning or culture."
Tom Sorell, Scientism: Philosophy and the Infatuation with Science, p: 15, (Preface).)
Science এবং Scientism-এর মধ্যকার পার্থক্য
অক্সফোর্ডের এই দুটি সংজ্ঞা গভীরভাবে লক্ষ করলে এদের মধ্যে প্রধান ৩টি পার্থক্য দেখা যায়:
১. পদ্ধতি বনাম মানসিকতা:
Science হলো একটি সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি (Methodology)। এটি পরীক্ষা, নিরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের একটি সক্রিয় মাধ্যম।
Scientism কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি বা মানসিকতা (Attitude)। এটি বিজ্ঞানের অর্জিত ফলাফলের ওপর এক ধরণের চূড়ান্ত বিশ্বাস স্থাপন করাকে বোঝায়।
দার্শনিক টম সোরেল ঠিক এই মানসিকতার দিকটিই ইঙ্গিত করে বলেছেন, এটি হলো 'জ্ঞানের অন্যান্য শাখার তুলনায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া।' অর্থাৎ, এটি কোনো নিরপেক্ষ বিজ্ঞানচর্চা নয়, বরং বিজ্ঞানের প্রতি এক ধরণের অন্ধ মোহ বা পক্ষপাতমূলক মানসিকতা।
২. বিজ্ঞানের পরিধি ও সীমাবদ্ধতা:
Science নিজেকে কেবল প্রাকৃতিক ও ভৌত জগতের (Natural and physical world) কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। যা পরীক্ষা করা যায় না, তা বিজ্ঞানের আওতাভুক্ত নয়।
Scientism দাবি করে যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ। এর বাইরে মানুষের আবেগ, নীতিশাস্ত্র, দর্শন বা আধ্যাত্মিকতার মতো অবস্তুগত বিষয়গুলোর কোনো স্বাধীন সত্যতা নেই।
এমআইটি-র পদার্থবিদ ইয়ান হাচিনসন বিজ্ঞানবাদের এই সংকীর্ণতাকে আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞানবাদ ধরে নেয় যে, 'প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আদলে তৈরি জ্ঞানই একমাত্র প্রকৃত জ্ঞান এবং অন্য যা কিছু জ্ঞানের মর্যাদা দাবি করে, তা কেবলই কুসংস্কার, অযৌক্তিকতা, আবেগ বা অর্থহীন কথা।'
৩. প্রমাণের ওপর নির্ভরতা বনাম বিশ্বাসের ওপর নির্ভরতা:
Science সর্বদা প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায় (Based on facts that you can prove)। নতুন কোনো শক্তিশালী প্রমাণ এলে বিজ্ঞান তার পূর্বের তত্ত্ব সংশোধন করতে দ্বিধা করে না। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক কার্ল পপার বিজ্ঞানের এই বৈশিষ্ট্যকে আরও সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, বিজ্ঞানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো মিথ্যা প্রমাণের সুযোগ (falsifiability)। (In so far as a scientific statement speaks about reality, it must be falsifiable: and in so far as it is not falsifiable, it does not speak about reality.
Karl Popper, The Logic of Scientific Discovery, p. 316.
অর্থাৎ যে দাবি কোনোভাবেই ভুল প্রমাণ করা সম্ভব নয়, সেটি বৈজ্ঞানিক দাবিই নয়।
Scientism এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। এটি নিজেই একটি সম্পূর্ণ বিশ্বাসে (Complete belief) রূপ নেয়। বিজ্ঞানবাদীরা যখন দাবি করে 'বিজ্ঞানই একমাত্র সত্যের উৎস', তখন তাদের এই দাবিটিকে কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দিয়ে ভুল বা মিথ্যা প্রমাণ করার কোনো সুযোগ তারা রাখে না। ফলে পপারের সূত্র অনুযায়ী, বিজ্ঞানবাদ নিজেই কোনো বৈজ্ঞানিক কাঠামোর মধ্যে পড়ে না; বরং এটি একটি অনমনীয় গোঁড়ামি।
অতএব, অক্সফোর্ডের সংজ্ঞার পাশাপাশি হাচিনসন ও সোরেলের বক্তব্য (Science + Religion Dialogue. (n.d.). What is scientism? DoSER. https://sciencereligiondialogue.org/resources/what-is-scientism/)
মেলালে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় যে, Science হলো সত্যকে খোঁজার একটি বস্তুনিষ্ঠ রাস্তা, আর Scientism হলো সেই রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে বাকি সব মানবিক, দার্শনিক ও যৌক্তিক জ্ঞানের দরজাকে একপেশেভাবে বন্ধ করে দেওয়ার একটি চরমপন্থী মতবাদ।
একটি সুন্দর উপমায় বিষয়টি শেষ করা যাক। বিজ্ঞানবাদী মনোভাব অনেকটা সেই জেলের মতো যে শুধু নিজের জালে ধরা পড়া মাছেরই অস্তিত্ব স্বীকার করে, বাকি সব মাছকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দেয়।
বিজ্ঞানকে ভালোবাসার মানে এই নয় যে বিজ্ঞানকে সর্বশক্তিমান বানাতে হবে। বরং বিজ্ঞানের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা মানে হলো তার সীমাকেও সম্মান করা এবং সেই সীমার বাইরে জ্ঞানের অন্য শাখাগুলোকেও নিজের জায়গা দেওয়া।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআন হাদীসের শুধু তরজমা পড়ে আমল করা গোমরাহী
কুরআন হাদীসের শুধু তরজমা পড়ে আমল করা গোমরাহী। বরং আমল করতে হবে কুরআন-হাদীসের সর্বশেষ নির্দেশ তথা ‘সু...
ইলমে দীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ভাবনা
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,اليوم أكملت لكم دينكم وأتممت عليكم نعم...
ওলী হওয়ার সহজ পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর… আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে আজ এখানে একত্র করেছেন ...
দা'য়ীর সাথে আল্লাহ তা'আলা আছেন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... আহলে ইলমের ওয়াদা রূহের জগতে আল্লাহ তা'আলা সাধারণ ল...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন