প্রবন্ধ
সবরের হাকিকত: ইসলামি জীবনদর্শনে সক্রিয় ধৈর্যের স্বরূপ
৯ জুলাই, ২০২৬
৬৯৮
০
ইসলামি জীবনদর্শনে ‘সবর’ বা ধৈর্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক পরিভাষা। কুরআন মজীদে নব্বইয়েরও বেশি স্থানে ধৈর্যের কথা বলা হয়েছে। তবে আমাদের সমাজে সবরের যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, তা প্রায়ই অসম্পূর্ণ। অনেকে মনে করেন সবর মানে হলো হাত গুটিয়ে বসে থাকা, পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করা কিংবা কেবল কষ্টের সময় চুপ থাকা। অথচ সবরের প্রকৃত হাকিকত বা মর্ম অত্যন্ত বৈপ্লবিক ও সক্রিয়। নিচে সবরের প্রকৃত রূপ ও এর বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হলো,
১. উপকরণ গ্রহণ ও কার্যকরী প্রচেষ্টার সাথে ধৈর্য
ইসলামি আকীদা অনুযায়ী, সবরের প্রথম শর্ত হলো সাধ্যমতো চেষ্টা করা এবং ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম বা ‘আসবাব’ গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা এই মহাবিশ্বকে কার্যকারণ সম্পর্কের অধীনে সৃষ্টি করেছেন। তাই কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হাত গুটিয়ে বসে থেকে বলা যে "আমি ধৈর্য ধরছি"—তা মূলত ধৈর্যের নামে অলসতা।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা এর সর্বোত্তম উদাহরণ পাই। হিজরতের সময় তিনি কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকেননি, বরং যথাযথ পরিকল্পনা করেছেন, সাহাবী হযরত আলী (রা.)-কে নিজের বিছানায় শুইয়েছেন, গুহায় আত্মগোপন করেছেন এবং একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেছেন। অর্থাৎ সম্ভাব্য সব উপায় গ্রহণের পর তিনি ফলাফলের জন্য ধৈর্য ধরেছেন। হাদীস শরীফে এসেছে, এক ব্যক্তি তার উট না বেঁধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমি কি উটটি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব?" রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন:
"আগে উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ২৫১৭)
২. দোয়ার সাথে ধৈর্য
ধৈর্যের সাথে দোয়ার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মুমিনের বড় অস্ত্র হলো দোয়া। যখন মানুষ কোনো সংকটে পড়ে, তখন তার ধৈর্য হারানো বা হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকতে দোয়া এক অসীম শক্তি হিসেবে কাজ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের (নামাজ ও দোয়া) মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা, হায়াত নং: ১৫৩)
দোয়া মুমিনকে এই আশ্বাস দেয় যে সে একা নয়, বরং মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা তার সাথে আছেন। এটি মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখে।
৩. সক্রিয়তা ও কর্মতৎপরতার সাথে ধৈর্য
ধৈর্যের অর্থ কখনোই স্থবিরতা বা জড়তা নয়। সবর মানে হলো প্রতিকূল স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানো। প্রবাদে ‘تحرّك’ (সক্রিয়তা) ও ‘عمل’ (কর্ম) শব্দ দুটি ব্যবহারের মাধ্যমে এটিই বোঝানো হয়েছে যে, সংকটকালে আমাদের কর্মতৎপরতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিতে হবে। নবী-রাসূলগণের জীবনে আমরা দেখি, চরম অত্যাচার ও বাধার মুখেও তাঁরা তাঁদের দাওয়াতের কাজ বা কর্মতৎপরতা এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেননি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আর মানুষের জন্য তা-ই থাকে, যার জন্য সে চেষ্টা করে।" (সূরা আন-নাজম, হাদীস নং: ৩৯)
কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বা বাধা আসলে সেই বাধা অতিক্রম করার মানসিক শক্তির নামই হলো সবর।
৪. পরিশ্রম ও প্রস্তুতি: বীজ বপনের সাথে ধৈর্য
কৃষকের উপমাটি ধৈর্যের হাকিকত বোঝার জন্য অত্যন্ত যুতসই। একজন কৃষক জমিতে লাঙ্গল দেয়, কঠোর পরিশ্রম করে বীজ বপন করে, আগাছা পরিষ্কার করে এবং রোদ-বৃষ্টি সহ্য করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই সবর। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য বর্তমানে পরিশ্রমের ‘বীজ’ বপন করতে হয়। এই পরিশ্রমের প্রক্রিয়া চলাকালীন যে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, তাকেই প্রকৃত সবর বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং (সৎকাজে) সুদৃঢ় থাকো।" (সূরা আল-ইমরান, আয়াত নং: ২০০)
৫. আল্লাহর প্রতি সুধারণা
ধৈর্য ধারণকারী ব্যক্তির মনে যদি আল্লাহর প্রতি সন্দেহ থাকে, তবে সেই ধৈর্য তাকে শান্তি দিতে পারে না। ‘হুসনে জান’ বা আল্লাহর প্রতি সুধারণা হলো ধৈর্যের জ্বালানি। মুমিন বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তাকে যে পরীক্ষায় ফেলেছেন, তার পেছনে অবশ্যই কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে তেমন আচরণই করি।" (সহীহ বুখারী: ৭৪০৫)
কুরআন ঘোষণা দিয়েছে— "নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।" (সূরা আলাম নাশরাহ, আয়াত নং: ৫-৬)
৬. তাওয়াক্কুল ও 'কুন ফায়াকুন'-এর ওপর বিশ্বাস
সবরের চূড়ান্ত পর্যায় হলো ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা। যখন বান্দা তার সামর্থ্য অনুযায়ী সব চেষ্টা শেষ করে, তখন সে ফলাফল আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়। তখন তার হৃদয়ে এই প্রশান্তি বিরাজ করে যে, আমার মালিক ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা হয়ে যায়)-এর ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তিনি যখন কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু বলেন: ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।" (সূরা ইয়াসিন, আয়াত নং: ৮২)
এই বিশ্বাসের কারণে মুমিন কখনও নিরাশ হয় না।
৭. পূর্বসূরিদের সবর: ঈমানি পরীক্ষার এক শাশ্বত উপমা
সবরের এই পথচলা কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ঈমানি ইতিহাসের এক দীর্ঘ পরম্পরা। সত্যের পথে চলতে গেলে পরীক্ষা ও প্রতিকূলতা আসা যে অনিবার্য, তা আমাদের পূর্বসূরিদের জীবন থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। জান্নাত লাভ কেবল মৌখিক দাবির বিষয় নয়, বরং তা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
"তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের নিকট এখনো তোমাদের পূর্ববর্তীদের মতো অবস্থা আসেনি। তাদের ওপর এসেছিল দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট এবং তারা প্রকম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?’ জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।" (সূরা বাকারা, আয়াত নং: ২১৪)
এই আয়াতের বাস্তব ও শিউরে ওঠার মতো চিত্র ফুটে ওঠে নবী করীম (সা.)-এর এক অমর বাণীতে। হযরত খাব্বাব ইবনুল আরত (রা.) যখন মক্কার কাফেরদের চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আরজি পেশ করলেন, তখন রাসুল (সা.) তাকে অতীতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিল, যাকে ধরে এনে গর্ত খুঁড়ে তাতে পুঁতে রাখা হতো। অতঃপর তার মাথার ওপর করাত রেখে তাকে দুই টুকরো করে ফেলা হতো। এমনকি লোহার চিরুনি দিয়ে তার হাড় থেকে গোশত ও রগ আলাদা করে দেওয়া হতো। তবুও এই অমানবিক যাতনা তাকে দ্বীন থেকে বিচ্যুত করতে পারতো না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৬১২)
পূর্বসূরিদের এই অটল সবর আমাদের শেখায় যে, চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আদর্শের ওপর পাহাড়ের মতো অটল থাকাই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।
৮. ধৈর্যের আনন্দদায়ক ও ফলপ্রসূ ফলাফল
যখন কোনো ব্যক্তি পরিশ্রম, দোয়া, সক্রিয়তা এবং তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ে ধৈর্য ধারণ করে, তখন তার জীবনের ফলাফল হয় অত্যন্ত চমৎকার। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের কোনো হিসাব ছাড়াই প্রতিদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন:
"ধৈর্যশীলদের তো তাদের সওয়াব বা প্রতিদান পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।" (সূরা আয-যুমার, আয়াত নং: ১০)
হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কূয়া থেকে দাসত্ব, জেলখানা থেকে মিশরের সিংহাসন—এই পুরো দীর্ঘ সফরে তিনি সক্রিয় ধৈর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ফলাফল হিসেবে আল্লাহ তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্মান দান করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, সবর বা ধৈর্য হলো জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর ও সক্রিয় লড়াই। এটি কেবল চোখের জল ফেলা বা অসহায়ত্ব প্রকাশ নয়, বরং এটি হলো আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নাম। আমাদের মনে রাখা উচিত—যে সবরের সাথে শ্রম নেই তা অলসতা; যে সবরের সাথে দোয়া নেই তা অহংকার; আর যে সবরের সাথে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস নেই তা কেবল হতাশা। একজন মুমিনের ধৈর্য হতে হবে ওই গুণের সমষ্টির মতো—যেখানে পরিশ্রম থাকবে, দোয়া থাকবে, সক্রিয়তা থাকবে এবং সর্বোপরি থাকবে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার ওপর অটল বিশ্বাস। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই প্রকৃত সবর ধারণ করার তাওফিক দান করুন।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঈমানের মূল ভিত্তি ইসলামী আকায়েদ
...
শান্তি সম্প্রীতি ও উদারতার ধর্ম ইসলাম
নামে যার শান্তির আশ্বাস তার ব্যাপারে আর যাই হোক, সন্ত্রাসের অপবাদ দেয়ার আগে তার স্বরূপ উদঘাটনে দু'দণ...
ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের বহুমুখী ষড়যন্ত্র মুসলিম উম্মাহর করণীয়
কুরআন-হাদীসে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানের পরিচয় ইয়াহুদী জাতি পৃথিবীর প্রাচীনতম জাতি। আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ আ...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (১ম পর্ব)
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন