প্রবন্ধ
আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন: 'আসল ইসলাম'-এর নামে ঈমান হরণ
৫ জুলাই, ২০২৬
৮২৪
০
আজকের দিনে ইসলামের শত্রুরা মুসলিম উম্মাহকে শারীরিক ও দৈহিকভাবে যতটুকু আঘাত করছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতি করছে অধ্যাত্মিক ও বিশ্বাসগত দিক থেকে। দেখা যায়, প্রতিদিন যে পরিমাণে মুসলমানকে হত্যা করা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ মুসলমানের ঈমান-আকিদা ধ্বংস করা হচ্ছে; অর্থাৎ কৌশলে তাদেরকে বেঈমান ও মুরতাদে পরিণত করা হচ্ছে। সমরাস্ত্রের সূক্ষ্ম প্রয়োগে শত্রুপক্ষ যেমন এগিয়ে, তেমনি মুসলমানদের ঈমানচ্যুত করার মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র প্রয়োগেও তারা অত্যন্ত চতুর ও দূরদর্শী। তাদের কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্র এমনই মারাত্মক যে, তা যদি পাহাড়-পর্বতের ওপর প্রয়োগ করা হতো, তবে সেগুলোও হয়তো স্থানচ্যুত হয়ে যেতো। এই ধরনের একটা ভয়ঙ্কর বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র হলো 'আসল ইসলাম' এর অস্ত্র।
'আসল ইসলাম'-এর নামে কুফরি মতবাদ প্রচার
এই মতবাদের মূল কথাই হলো, 'বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে ইসলাম প্রচলিত আছে তা আসল ইসলাম নয়; আসল ইসলাম তো ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দী পরেই শেষ হয়ে গেছে! সেই থেকে আজ পর্যন্ত কোটি কোটি মুসলমান যে ইসলামের ওপর রয়েছে, তা বিকৃত ও ভুল ইসলাম।'
এই ফেতনার ধারকেরা অত্যন্ত চতুর ও কৌশলী। তারা কখনো সরাসরি বলে না যে, 'নাউযুবিল্লাহ, ইসলাম ধর্মটাই ভুল।' কারণ তারা ভালো করেই জানে, সরাসরি ইসলামের বিরোধিতা করলে কোনো মুসলমান তাদের ফাঁদে পা দেবে না। তাই তারা 'ইসলাম রক্ষা'র ছদ্মবেশ ধারণ করে বলে:
'সমাজে প্রচলিত এই ইসলাম হলো মোল্লা-মৌলবীদের ইসলাম, সাধারণ মুসলমানদের মনগড়া ইসলাম; এসব ভুল ও কুসংস্কারে ভরা। আসল ইসলাম তো শুধু কুরআনে সংরক্ষিত আছে। আর সেই কুরআনের প্রকৃত ইসলাম আমরাই তোমাদের শেখাবো। সুতরাং, তোমরা আমাদের কাছে এসো।'
বাস্তবে, এরাই হলো মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বিপজ্জনক 'ঈমানের ডাকাত'। ইসলামের প্রতি সরলমনা মুসলমানদের আবেগকে পুঁজি করে তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের ঈমান লুটে নিচ্ছে।
তাদের চতুর প্রতারণার স্বরূপ উন্মোচন
এই ছদ্মবেশী দলগুলোর প্রতারণার জালটি মূলত তিনটি ধাপে বিন্যস্ত:
উম্মাহর ধারাবাহিকতার প্রতি অবিশ্বাস তৈরি: তারা প্রথমেই একজন মুসলমানের মনে এই বিষ ঢুকিয়ে দেয় যে, বিগত
চৌদ্দশত বছর ধরে কোটি কোটি মুসলিম, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আলেম যে দ্বীনের ওপর ছিলেন, তা ভুল ছিল। এই একটিমাত্র সন্দেহের মাধ্যমে তারা একজন মুসলিমকে তার গৌরবময় অতীত, ঐতিহ্য এবং উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন ধারা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
'শুধু কুরআন'-এর স্লোগান দিয়ে বিভ্রান্তি: তারা 'কুরআনে ফিরে আসার' এক চটকদার ও আকর্ষণীয় স্লোগান দেয়।
সাধারণ মুসলমানরা ইসলামের প্রতি ভালোবাসার কারণে সহজেই এই স্লোগানে আকৃষ্ট হয়। কিন্তু এই স্লোগানের আড়ালে তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ, হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনদের অনুসৃত পথকে অস্বীকার করা।
মনগড়া ও কুফরি ব্যাখ্যার অনুপ্রবেশ: যখন তারা একজন মুসলিমকে উম্মাহর সর্বসম্মত বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন করতে
সফল হয়, তখন তারা পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর ওপর নিজেদের মনগড়া, বিকৃত এবং কুফরি আকিদা চাপিয়ে দেয়। 'কুরআনের ইসলাম'-এর নাম দিয়ে তারা মূলত নিজেদের মনগড়া নতুন এক ধর্ম প্রচার করে।
এই কুফরি মতবাদের খণ্ডন
উন্মাদনারও তো একটা সীমা আছে! কী সাংঘাতিক এক আত্মঘাতী বিশ্বাস-ইসলামের প্রথম কয়েক শতাব্দী পরেই নাকি মূল ইসলাম বিকৃত হয়ে গেছে, যার ফলে বর্তমানের ইসলামও নাকি ভুল! আর এই খোঁড়া যুক্তি দেখিয়েই তারা চটকদার স্লোগান দেয়, 'তাই সরাসরি কুরআনে ফিরে এসো!'
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কুরআন এলো কোত্থেকে? পুরো মুসলিম উম্মাহ যদি ইসলাম ভুলে গিয়ে থাকে, তাহলে সেই উম্মাহর হাত ধরেই আসা কুরআনের উপর তো ভরসা রাখারও কোনো যুক্তি থাকে না।
প্রকৃতপক্ষে, কুরআনের প্রতি এদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। কুরআন হলো ওদের শেষ চাল, কারণ ইসলামকে আঘাত করার জন্য কুরআন ছাড়া ওদের কাছে আর কোনো ঢাল বা সম্বল নেই। তাই নিজেদের কুফরি ও ভ্রান্ত আকিদাকে আড়াল করতেই তারা পবিত্র কুরআনের অপব্যাখ্যাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
আমি সব ধরনের মুসলমানকে স্পষ্ট ভাষায় বলে যেতে চাই, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ইরশাদ করেছেন:
'যদি তারা ঈমান আনে, যেমন ঈমান এনেছ তোমরা (সাহাবায়ে কেরাম), তবে অবশ্যই তারা হেদায়েত পাবে।' (সূরা আল-বাকারা: ১৩৭)
সুতরাং, কেউ যদি নিজেকে প্রকৃত মুমিন বা মুসলিম হিসেবে দাবি করতে চায়, তবে তাকে সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে উম্মাহর মাধ্যমে চলে আসা ঈমান ও ইসলামের ওপরই বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আরও সতর্ক করা হয়েছে:
'যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের (তথা মুসলিম উম্মাহর) পথ ছেড়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে, তাকে আমরা জাহান্নামে প্রবেশ করাবো।' (সূরা আন-নিসা: ১১৫)
এ থেকে স্পষ্ট যে, মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলে আসা সর্বসম্মত বিশ্বাস ও আমল থেকে যারা বিচ্যুত হবে, তারা নিশ্চিতভাবেই ভ্রান্ত এবং জাহান্নামি।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুরো উম্মত কখনো সামগ্রিকভাবে ভুল বা ভ্রান্তির ওপর একতাবদ্ধ হবে না, এটি সহিহ হাদিস দ্বারা সুপ্রমাণিত (সুনান তিরমিযি: হাদিস ২১৬৭, মাজমাউয যাওয়ায়েদ: হাদিস ৯১০০)। অতএব, যারা দাবি করে যে পুরো মুসলিম উম্মাহ গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, তারা মূলত সরাসরি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
সুতরাং, মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলে আসা সর্বসম্মত বিশ্বাস এবং আমল থেকে যারা বিচ্যুত হয়ে নতুন পথের সন্ধান করে, তারা মূলত নিজেদের ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। এই ফেতনার যুগে নিজের ঈমান ও আকিদাকে রক্ষা করতে হলে ইসলামের মূলধারা এবং ওলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনার সাথে যুক্ত থাকা অপরিহার্য।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ
...
ঈমান সুরক্ষায় কুসংস্কার থেকে দূরে থাকুন!
আমাদের সমাজে সামাজিকতা ও নিয়মনীতি পালনের নামে বহু কুপ্রথা ও কুসংস্কার প্রচলন রয়েছে। শরীয়তে এগুলোর কো...
ইসলামই পৃথিবীর ভবিষ্যত
...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (১ম পর্ব)
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন