প্রবন্ধ
রমযানে নফল নামায দীর্ঘ করব যেভাবে
৪৭৩৬
০
অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমযান মাসে আমরা অনেকেই
একটু বেশি নফল নামায পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু জানি না কেমন ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের নফল নামাযতাঁর নফল নামাযে! তাঁর নফল নামাযের অন্যতম বৈশিষ্ট্য
ছিল তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তা আদায় করতেন। এ বিষয়ে আমরা সামনে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
দীর্ঘ নফল নামাযের ব্যাপারে অনেকেরই জানার বিষয় থাকে- ‘আমরা সাধারণ মানুষ নামায দীর্ঘ
করব কিভাবে। আমরা তো হাফেয না। হাফেয আলেম সাহেবরা তো নফল নামায দীর্ঘ করতে পারেন।
তাদের কুরআন শরিফ মুখস্ত, বড় বড় সূরাগুলো মুখস্ত তাই তারা পারে। আমরা কিভাবে এত লম্বা
নামায পড়ব। দীর্ঘ কিয়াম-কেরাত, দীর্ঘ রুকু-সেজদা কিভাবে আমরা আদায় করব? আমরা তো হাফেয
আলেম না। আমরা ছোট ছোট কয়েকটি সূরা পারি। এসব প্রশ্নের উত্তরই আমরা এ প্রবন্ধে দেওয়ার
চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
প্রথমেই জেনে নিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের নফল নামাযের বৈশিষ্ট্য কেমন ছিল। এটা বোঝার জন্য একটি হাদীসই মনে
হয় যথেষ্ট। তা হলো, আমরা জানি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বাপর
সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন- আপনি এত কষ্ট
করে নামায আদায় করেন যে, আপনার পা পর্যন্ত ফুলে যায়, অথচ আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহ
ক্ষমা করা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন-
أَفَلاَ أُحِبّ أَنْ أَكُونَ عَبْدًا شَكُورًا.
‘আমার কি উচিত নয় যে, (এই মহা অনুগ্রহের জন্য আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে) আমি একজন পূর্ণ শোকর আদায়কারী বান্দা হব?’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৮৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৮২০
এ হাদীস দ্বারা বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা দীর্ঘ নামায পড়তেন যে, দাঁড়িয়ে কেরাত পড়তে পড়তে পা ফুলে যেত।
আরেক হাদীসে এসেছে-
عَنْ جَابِرٍ
قَالَ : سُئِلَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم
أَيُّ الصَّلَاةِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: طُولُ الْقُنُوتِ.
হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শ্রেষ্ঠ নামায সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে- তিনি জবাবে বলেছেন ‘দীর্ঘ কুনূত’।
-
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহ. বলেন,
وَالْمُرَادُ
بِالْقُنُوتِ الْقِيَامُ وَلِأَنَّ ذِكْرَ الْقِيَامِ الْقِرَاءَةُ.
قوله صلى الله عليه
وسلم أفضل الصلاة طُولُ الْقُنُوتِ الْمُرَادُ بِالْقُنُوتِ هُنَا الْقِيَامُ
بِاتِّفَاقِ العلماء.
شرح النووي على
مسلم : (4/200، 6/35)
এখানে ‘তূলুল কুনূত’ তথা দীর্ঘ কুনুত মানে
হচ্ছে দীর্ঘ কিয়াম। আর দীর্ঘ কিয়াম মানে নামাযে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লম্বা কেরাত পড়া।
-শরহুন নববী আলা মুসলিম : ৪/২০০; ৬/৩৫
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে
সম্বোধন করে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
يَاأَيُّهَا
الْمُزَّمِّلُ (1) قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا (2) نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ
مِنْهُ قَلِيلًا (3) أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا (4)
হে চাদরাবৃত! রাতের কিছু অংশ
ছাড়া বাকি রাত (ইবাদতের জন্য) দাঁড়িয়ে যাও, রাতের অর্ধাংশ বা
অর্ধাংশ থেকে কিছু কমাও। বা তা থেকে কিছু বাড়িয়ে নাও এবং ধীর-স্থিরভাবে স্পষ্টরূপে
কুরআন তেলাওয়াত করো। -সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত নং ১-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম কিভাবে এ নির্দেশনার বাস্তবায়ন করেছেন তা আমরা উপরে হযরত আয়েশা
সিদ্দীকা রা. এর বর্ণনা দ্বারা বুঝতে পেরেছি।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের নফল নামাযের বিবরণ দিয়ে বলেন-
صَلَّيْتُ مَعَ
النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم لَيْلَةً، فَلَمْ يَزَلْ قَائِمًا حَتَّى هَمَمْتُ
بِأَمْرِ سَوْءٍ. قُلْنَا: وَمَا هَمَمْتَ؟ قَالَ: هَمَمْتُ أَنْ أَقْعُدَ
وَأَذَرَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم.
আমি একবার রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে রাতে নামাযে দাঁড়ালাম। তিনি এতটাই দীর্ঘ
সময় দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন যে, আমি মনে মনে একটি দুষ্ট চিন্তা করছিলাম। সাহাবায়ে
কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, কী চিন্তা করছিলেন? জবাবে তিনি বলেন, আমি ভাবছিলাম,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামের সাথে এ নামায ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ি।
-
রাসূলের সুন্নাহ পালনে পাগলপারা
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর মতো সাহাবীরই যদি এ মন্তব্য হয়, তাহলে অনুমান করা
যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের নফল নামায কতটা দীর্ঘ
হতো!
এ বিষয়ে হযরত আয়েশা রা. এর একটি
হাদীস খুবই প্রাসঙ্গিক। হযরত আয়েশা রা.কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের রাতের নফল নামায (বিশেষত রমযানে) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তিনি
এর সৌন্দর্য এবং দীর্ঘতা সম্পর্কে একাধিকবার বলেছেন-
فَلَا تَسَلْ عَنْ
حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ
তুমি এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা
সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না! -সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২০১৩, ১৯০৯, ৩৩৭৬;
হযরত আয়েশা রা. এর বিবরণ-ভাষ্যে
বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতটা দীর্ঘ ও সুন্দর করে
নামায পড়তেন- যা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়।
উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম
যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের নফল নামাযের অন্যতম বৈশিষ্ট্য
ছিল দীর্ঘ কিয়াম ও কেরাত। অর্থাৎ দীর্ঘক্ষণ
দাঁড়িয়ে লম্বা কেরাতের মাধ্যমে তিনি নামায আদায় করতেন।
হাফেজ-আলেমদের জন্য দীর্ঘ কেরাতের মাধ্যমে
নামায আদায়ের বিষয়টি সহজে সম্ভব। কিন্তু গায়রে হাফেজ বা সাধারণ মানুষ তাদের জন্য দীর্ঘ
কেরাতের মাধ্যমে নামায আদায়ের পদ্ধতি কী? তাদেরও তো মন চায় যদি রাসূলের নফল নামাযের
মতো দুই চার রাকাত দীর্ঘ নফল নামায পড়তে পারতাম! কিন্তু তারা তো হাফেজ না। কীভাবে তা
করবে!।
এই চাওয়া ও ব্যথার উপশম আমরা করতে চাই এ
প্রবন্ধের মাধ্যমে। তার আগে একটি মাসয়ালা জেনে নিই। তা হলো, নফল নামাযে একই রাকাতে
একই সূরা বার বার পড়া যায়। আবার একই সূরা বার বার প্রত্যেক রাকাতেও পড়া যায়। এতে কোন
অসুবিধা নেই।
সুতরাং সাধারণদের জন্য নফল নামায দীর্ঘ করার
পদ্ধতি হলো, প্রথমত যদি লম্বা দু’একটি সূরা (যেমন সূরা কাহফ, ইয়াসিন, ওয়াকিয়া, আর-রহমান,
মুলক ইত্যাদি) মুখস্ত থাকে তাহলে সেগুলো পড়বে। অন্যথায় ছোট ছোট সূরার মধ্যে যার যে
কয়টি সূরা মুখস্ত আছে সবগুলো একই রাকাতে বার বার পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, কারও যদি ৫/১০টি
সূরা মুখস্ত থাকে তাহলে ৫/১০টি সূরাই এক রাকাতে পড়বে আরও লম্বা করতে চাইলে আবার এই
সূরাগুলোই পড়বে। এভাবে বার বার পড়বে। যেমন ১০টি সূরাই ৫/৭ বার ঘুরিয়ে পড়ল। তাহলে তার
৫০/৭০টি সূরা পরিমাণ কিয়াম-কেরাত লম্বা হবে। আবার
পরের রাকাতে একই নিয়মে ১০টি সূরা ৫/৭ বার পড়বে তাহলে দ্বিতীয় রাকাতও ৫০/৭০টি সূরা পরিমাণ
লম্বা কিয়াম-কেরাত হবে। একই সূরা বার
বার পড়ার ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহসহ বা বিসমিল্লাহ ছাড়া উভয় পদ্ধতিতেই পড়া যায়।
শুধু কিয়াম-কেরাতই নয়, অন্যান্য হাদীসের ভিত্তিতে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম নফল নামাযে রুকু সেজদাও অনেক দীর্ঘ করতেন। আমরা রুকু সেজদার যে তাসবীহগুলো
পারি এবং পড়ি সেগুলো যতবার ইচ্ছা পড়ে রুকু-সেজদা দীর্ঘ করতে পারি। অথবা সেজদার মধ্যে
কুরআন হাদীসে বর্ণিত যে কোন দোয়া আরবিতে পড়তে পারি। সেজদার মধ্যে বেশি বেশি দোয়া করতে
পারি। এতে সেজদাও দীর্ঘ হবে। তাতেও আমাদের নফল নামায দীর্ঘ হবে। আবার এ সময়ে দোয়া কবুল
হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। কারণ এ সময় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়ে থাকে।
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, নবী
কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ.
বান্দা আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সেজদারত অবস্থায়। তাই তখন বেশি বেশি দোয়া করো। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৮২; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৮৭৫; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১১৩৭
প্রাসঙ্গিক হাদীস আবদুল্লাহ ইবনে
আব্বাস রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أَلَا وَإِنِّي نُهِيتُ أَنْ أَقْرَأَ الْقُرْآنَ رَاكِعًا أَوْ سَاجِدًا، فَأَمَّا الرُّكُوعُ فَعَظِّمُوا فِيهِ الرَّبَّ عَزَّ وَجَلَّ، وَأَمَّا السُّجُودُ فَاجْتَهِدُوا فِي الدُّعَاءِ، فَقَمِنٌ أَنْ يُسْتَجَابَ لَكُمْ.
শুনে রাখো, আমাকে রুকু ও সেজদায় কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং রুকুতে তোমরা রবের সম্মানপ্রকাশক তাসবীহ পড়ো আর সিজদায় অধিক পরিমাণে দুআ করো। কেননা, সেজদা অবস্থায় দোয়া করলে তা কবুল হওয়ারই অধিক উপযুক্ত। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৭৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৮৭৬
সুতরাং আসুন এই মাহে রমযানের বরকতময় সময়গুলো
ইবাদতের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ করি। নামায তেলাওয়াত যিকির দোয়ার মাধ্যমে নিজের জীবনকে
পরিবর্তন করি। নৈকট্য হাসিল করি মহান রবের, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন ইবাদতের জন্য।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
রজব ও শা’বান : প্রেক্ষিত মধ্যপন্থা বনাম প্রান্তিকতা
মহিমান্বিত রমাযান মাসের পূর্বে আমাদের সামনে রয়েছে দুটি মাস; রজব ও শা’বান। বক্ষমান নিবন্ধে আমরা রজব এ...
বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে শাবান ও শবে বরাত
এতদিন পর্যন্ত শবে বরাতকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণীর মানুষ বাড়াবাড়িতে লিপ্ত ছিল। তারা এ রাতটি উপলক্ষে ন...
সুরা ওয়াকীয়ার ফযীলত সম্পর্কিত বর্ণনার তাহকীক
সুরা ওয়াকিয়া পবিত্র কুরআনের ৫৬ তম সুরা। এ সুরার ফযীলত সম্পর্কে বেশ কিছু হাদিস এবং সাহাবি-তাবেয়ীদে...
লাইলাতুল কদর : গুরুত্ব ও ফযীলত
রমযানের পুরো মাস জুড়ে বিরাজ করে রহমত বরকত এবং ক্ষমার ঘোষণা। তবে এ মাসে রয়েছে বিশেষ এক মহিমান্বিত রজন...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন