প্রবন্ধ
বেদখল মানুষ
১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
১১৩
০
[দুনিয়ার সব মেহনত দুই ভাগে বিভক্ত — সম্পদের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং সম্পদকে ব্যবহার করা। কিন্তু আম্বিয়া আ. এসেছেন তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় সম্পদ — মানুষের নিজের ভেতরের সম্পদ — বের করার শিক্ষা দিতে। রাসূল সা. বলেছেন, মানুষ সোনা-রুপার খনির মতো; তার ভেতরে মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে আছে।
বয়ানের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো — মানুষ কি আসলেই নিজের দখলে আছে? উত্তর হলো, না। রিকশাওয়ালা কষ্টের উপার্জন বিড়িতে ঢালছে, বিড়িওয়ালাকে কোটিপতি বানাচ্ছে — অথচ এতে তার নিজের কোনো লাভ নেই। ফুটবলে অচেনা দলের জন্য মাথা ফাটাচ্ছে, বিদেশি মডেলের দেখাদেখি পেপসি খাচ্ছে বিশেষ কায়দায় — এসবই প্রমাণ করে মানুষ অজান্তে অন্যের দখলে চলে গেছে। জিনে-ধরা মানুষের উপমা দিয়ে বলা হয়েছে, শয়তানও এভাবেই মানুষকে দখল করে — اِسْتَهْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ।
এই বেদখল অবস্থায় বুদ্ধি উত্তেজিত থাকে, কোনো যুক্তি কাজ করে না। জমির মামলায় দশগুণ ক্ষতি জেনেও ছাড়তে রাজি নয়, বেতন না কমলেও জুনিয়রের পদোন্নতিতে পেরেশান — এগুলোই বেদখল বুদ্ধির নমুনা। রবি ইবনে আমির রা. রুস্তমকে বলেছিলেন — আমরা এসেছি মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে আনতে। আল্লাহ صَمَد — তিনি বেনিয়াজ; তাঁর দাসত্বে কোনো শোষণ নেই, সব হুকুম মানুষের নিজের কল্যাণে।
মক্কার বারো বছরে একটিও শরিয়তের হুকুম আসেনি — শুধু জাহিলি পরিবেশ থেকে বের হয়ে বুদ্ধি ঠান্ডা করার কাজ হয়েছে। মদ হারামের আয়াতও ধাপে ধাপে নাযিল হয়েছে, কারণ অপ্রস্তুত মনে হঠাৎ হুকুম দিলে উলটো ফল হয়। তাই সমাধান একটাই — আল্লাহর পথে বের হয়ে মস্তিষ্ককে ঠান্ডা করা, শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া, তারপর ভালো-মন্দ বোঝার তাওফিক চাওয়া।]
৪ঠা মে ২০০৭, শুক্রবার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে, মাগরিব নামাজের পর
أعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ،
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لا تُرْجَعُونَ
وَقَالَ تعالى : وَالْعَصْرِ ، إِنَّ الإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ ، إِلاَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
وَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنَّا أُمَّةٌ أُمِّيَّةٌ لَا نَكْتُبُ وَلَا نَحْسُبُ ، أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلَامُ
.
একটা ঘটনা বলা হয় খলিফা ও বাদশাহ হারুনুর রশিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহির সম্বন্ধে। ঘটনা ইতিহাসের বিচারে কতটুকু শুদ্ধ বা সত্যতা ঠিকমতো বলতে পারছি না, সেইজন্য ঘটনা হোক বা গল্প, তো ঘটনা বা গল্পই।
এই এক ব্যক্তি অনেক সাধনা করে একটা বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, একটা সুঁইকে পাথরের উপর দাঁড় করাতে পারতেন। সুঁইয়ের ছিদ্র দিকটা উপরের দিকে দিয়ে পাথরের উপর দাঁড় করাতে পারতেন বড় একটা সুঁই। আর কিছুদূর থেকে ছোট একটা সুঁই বর্শার মতো নিক্ষেপ করে যে সুঁই দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনের ছিদ্র দিয়ে পার করাতে পারতেন। অদ্ভুত অসাধারণ ধরনের একটা দক্ষতা সারাজীবনের সাধনায় তিনি এটা অর্জন করেছেন। সেই ব্যক্তিকে খলিফা ও বাদশাহ হারুনুর রশিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহির সামনে আনা হলো। তিনি তার এই খেলা দেখালেন।
বাদশাহ মুগ্ধ হলেন কিন্তু খলিফা অসন্তুষ্ট হলেন।
একই ব্যক্তি তিনি বাদশাহও এবং খলিফাও। বাদশাহ হিসেবে সন্তুষ্ট হলেন আর একশো দিনারের পুরস্কার দিলেন, খলিফা হিসেবে অসন্তুষ্ট হলেন আর একশো দোররা মারার আদেশ দিলেন জল্লাদকে। বাদশাহ হিসেবে কেন মুগ্ধ, বাদশাহরা সভ্যতার পথপ্রদর্শক, রাজা-বাদশাহ, বৈজ্ঞানিক, জ্ঞানীরা সভ্যতাকে নিয়ে চলে, সভ্যতার কাণ্ডারি। সভ্যতার লক্ষ্য হচ্ছে দক্ষতা। যে জাতি যত বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সভ্যতার সমাজে সে তত বেশি উন্নতি করেছে।
ইতিহাসে এমন জামানা ছিল যে, মানুষ পাথরের ব্যবহার ছাড়া অন্য জিনিসের ব্যবহার জানত না। তার দক্ষতা ওই মাত্রায়, সে যুগকে পাথর-যুগ বলা হতো। তার দক্ষতার স্তর দিয়ে তার সভ্যতা মাপা হয়। এরা উন্নতি করল, তামার ব্যবহার শিখল। তামা দিয়ে অস্ত্র বানানো, তামা দিয়ে পাত্র বানানো, বা আরও উন্নত সভ্যতা এবং তাদের সম্বন্ধে বলা হয় তামার যুগ। আরও উন্নতি করল, লোহার ব্যবহার শিখল। লোহার যন্ত্র, লোহার অস্ত্র, লোহার পাত্র ইত্যাদি, লৌহযুগ। এভাবে বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন স্তরের দক্ষতা দিয়ে সভ্যতা মাপা হয়। এ প্রশ্ন আসে না যে, তারা পাথরের যুগে পাথরকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করত। উদ্দেশ্য সভ্যতার জগতে এটা অবান্তর প্রশ্ন; প্রশ্ন দক্ষতার, উদ্দেশ্যের নয়। যেহেতু সে একটা দক্ষতা অর্জন করেছে, সেই হিসেবে বাদশাহ একজন সভ্য সমাজের অধিনায়ক হিসেবে তাকে পুরস্কার দেওয়া প্রয়োজন মনে করলেন, আর তাকে একশো দিনারের পুরস্কারও দিলেন।
তিনি আবার খলিফাও ছিলেন, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের যে মেহনত এনেছেন, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে এই মেহনতকে নিয়ে যারা চলেছেন, সাহাবিরা, ওলিআল্লাহরা, খলিফারা সেই হিসেবে সেই ধারার মধ্যে হারুনুর রশিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি, তিনিও একজন খলিফা কিন্তু ইতিমধ্যে একটি ইসলামী সভ্যতাও গড়ে উঠেছে। সাহাবেদের জামানা সম্বন্ধে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানা সম্বন্ধে ইসলামী সভ্যতা শব্দ ব্যবহার করা হয় না। কারণ, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং নিজের সমাজের মধ্যে এমন বিশেষ কোনো ব্যাপারে কোনো দক্ষতা দেখাননি, যার কারণে এটাকে একটা সভ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
সাহাবেদের জামানাতেও, খোলাফায়ে রাশেদার জামানাতেও, তাদের সমাজের মধ্যে বিশেষ কোনো দক্ষতার কোনো চিহ্ন ছিল না। চারপাশে অন্যান্য জাতিগুলোর মধ্যে ছিল; উত্তরে রোম সাম্রাজ্য, দক্ষিণে ইয়ামান সাম্রাজ্য, পূর্বে পারস্য সাম্রাজ্য, পশ্চিমে গ্রিক সাম্রাজ্য। এইসব জাতিগুলো বড় উন্নত সভ্যতার। এদের মধ্যে নানান ধরনের উন্নত মানের দক্ষতা আছে। গণিতের জগতে, দর্শনের জগতে, স্থাপত্যশিল্পের জগতে, নানান ধরনের ময়দানে তারা তাদের দক্ষতাকে প্রমাণ করেছে এবং একটা সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু মক্কাতে মদীনাতে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগে এবং পরে পর্যন্ত এমন কোনো দক্ষতা তারা দেখাতে পারেননি, দেখাননি, যার কারণে তাদেরকে একটি উল্লেখযোগ্য সভ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
হারুনুর রশিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেই ধারারই এক ব্যক্তি যে খলিফা। ঈমান আমল, আর ঈমান আমল এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কথা বা প্রশ্ন হলো যে, জীবনের লক্ষ্য কী? ঈমান এটাই শেখায় প্রথম কথা — জীবনের লক্ষ্য কী, কাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তোমার জীবন, কে তোমার হিসাব নেবে, কে তোমাকে পাঠিয়েছে, ফিরে কার কাছে হিসাব দিতে হবে। এই কথাগুলো হলো ঈমানের মৌলিক কথা।
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لا تُرْجَعُونَ
'তোমরা কি ভেবেছো তোমাদেরকে অকারণেই সৃষ্টি করা হয়েছে আর তোমাদেরকে আমার কাছে অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে হবে না?'
তা নয় বরং আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন অকারণে নয়, নির্দিষ্ট লক্ষ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তার জীবনের হিসাব দিতে হবে, এক এক মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যে উদ্দেশ্যে তাকে পাঠিয়েছেন, সেই উদ্দেশ্যের দিকেই তার জীবন ধাবিত বা প্রবাহিত ছিল কি না, নাকি সে উদ্দেশ্যহারা ছিল।
এর মোকাবেলায় সভ্যতা এই কথাই বলে যে, সে কী ধরনের কী মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছে, সেই দক্ষতা কোন লক্ষ্যে এটা অবান্তর প্রশ্ন, দক্ষতা কি না? সেই যুগে বাদশাহ তার দক্ষতার প্রশংসা করলেন, আর একশো দিনারের পুরস্কারও দিলেন।
খলিফা তার দায়িত্ব পালন করলেন যে, এর উদ্দেশ্য কী? এই যে সারাজীবন ব্যয় করে সে একটা দক্ষতা অর্জন করল, একটা সুঁইকে পাথরের উপর দাঁড় করাতে পারে, আর এক সুঁইকে নিক্ষেপ করে তার ছিদ্র দিয়ে পার করিয়ে দিতে পারে, আল্লাহ কি তাকে এই জন্য পাঠিয়েছেন? এই জিনিস শেখার জন্য বা বকার জন্য বা তার জীবনের লক্ষ্য কী? এর দ্বারা এই কষ্টের দ্বারা, সাধনার দ্বারা সে কি তার লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হলো, নাকি সে তার জীবনকে অকারণে খেলার মধ্যে শেষ করে দিল। যেহেতু এটা লক্ষ্যহীন কাজ, আর জীবন বড় মূল্যবান। আল্লাহ তায়ালা একবারই তাকে পাঠিয়েছেন, আবার ফিরে আসার সুযোগ তার থাকবে না।
এই জীবনকে যদি নষ্ট করে দেয়, বড়ই আফসোসের কথা হবে, সে শাস্তির উপযোগী। তাকে এই জন্য, তার এই কথার উপর তোমাকে এই কাজ করতে কে বলেছে, তোমার মূল্যবান জীবনকে তুমি একটা সুঁইকে পাথরের উপর দাঁড় করাবে, এই কথার উপর জীবন শেষ করে দেবে — এর চেয়ে অর্থহীন কী কাজ হতে পারে। একশো দোররা তাকে শাস্তি দেওয়া হলো।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে মানুষকে পাঠিয়েছেন আর একটা লক্ষ্য সামনে রেখে পাঠিয়েছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে তার জীবনের প্রতি মুহূর্তে ব্যয় করতে হবে। আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে হিসাব দিতে হবে। আর মানুষ এ কথা ভুলে যায় আর খেলার মধ্যে লাগিয়ে দেয়।
খেলা জিনিসটাই হচ্ছে দক্ষতার প্রমাণ, কোনো সার্থকতা এর পেছনে নেই। যতক্ষণ খেলা চলছে, ফুটবল, মনে করা যাক, এক পক্ষ মনে করে যে অপর পক্ষের দিকে তার বলকে নিয়ে গোলবারের ভেতর ঢুকাতে হবে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, যদি তোমার বলকে তুমি ওখানে দিতে পারো এতে তোমার জীবনের কী লাভ হলো? কার কোনো সমস্যার সমাধান হলো, কার জীবন সার্থক হলো, তোমার বা তোমার ছেলের বা অন্য কারো? তার কাছে কোনো উত্তর নেই। অপর পক্ষ যে এতপ্রাণপণে চেষ্টা করছে যে, তারা বলটা যেন গোলবারে ঢুকাতে না পারে, তাকেও যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, যদি অপরপক্ষ বল ঢুকিয়ে দেয় তাতে তোমার কী সর্বনাশ হবে? তারও কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পরে যখন শিস বেজে যায়, হুইসেল বেজে যায় আর খেলা শেষ হয়ে যায়, তখন যদি আবার বল বারবার করে ঢুকায় তারও কোনো অর্থ নেই। কেউ বাধাও দেয় না। এতেই প্রমাণিত হয় যে, কিছুক্ষণ আগেও এটা সমানভাবে অর্থহীন ছিল, তো মাঝখানে কেন এত ব্যস্ততা, অকারণে ব্যস্ততা। এই প্রশ্ন সে করে না যে, এর সার্থকতা কী? যদি করত তাহলে এরকম অকারণে একটা কাজের পেছনে সে তার শ্রমকে ব্যয় করত না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এটা শুধু এক ঘণ্টার খেলার ব্যাপার নয়, মানব-ইতিহাস সম্পূর্ণ এভাবেই তার গোটা জীবনকে শেষ করে দিল। বিশেষ বিশেষ দক্ষতা অর্জন করার পেছনে সে তার সম্পূর্ণ জীবনকে, শুধু তার নয় সম্পূর্ণ জাতি শেষ হয়ে গেছে। এই প্রশ্ন করে না যে, এটা কেন, লক্ষ্য কী?
প্যারিসে তবলিগের এই মেহনতের সাথে জড়িত, প্রতি বছর পরপর সময় লাগায়, কিছুদিন আগেই নিজামুদ্দিন চিল্লা দিয়ে গেছেন ফ্রান্স। তার বর্তমান নাম রাবিয়া, আগে অন্য নাম ছিল। উল্লেখযোগ্য সাংবাদিক ছিলেন। ফ্রান্সের সম্ভবত প্রচারের দিক থেকে এক নম্বর পত্রিকা, যে পত্রিকা সবচেয়ে বেশি প্রচার হয়, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় লা-মুঁ (Le Monde), সেই পত্রিকার একজন বিশিষ্ট ও দক্ষ সাংবাদিক ছিলেন। মুসলমান হওয়ার পরে, দীনের মেহনতে জড়িত হওয়ার পরে, সময় লাগানোর পরে, মনের ভেতর নানান ধরনের প্রশ্ন জেগেছে আর সেই সব প্রশ্নের মধ্যে এটাও একটা প্রশ্ন, আমার সাংবাদিকতা যে একটা পেশা, একটা কাজ আমি করছি, এর সার্থকতা কী? নিজের কাছে যেহেতু সন্তোষজনক উত্তর পাননি, তো সাংবাদিকতা আর করেননি। তাও আমি যা-ই করি না কেন এই প্রশ্ন আমাকে করতেই হবে যে, আমার লক্ষ্য কী, সার্থকতা কী? যদি সন্তোষজনক উত্তর আমার কাছে না থাকে তাহলে আমি কেন করবো? বড় দুঃখের জীবন তার, যে না বুঝে তার জীবন ব্যয় করতে থাকে।
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالأَخْسَرِينَ أَعْمَالاً ، الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
আল্লাহ তায়ালা বলছেন, বলো, (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছেন, আপনি বলে দিন)
هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالأَخْسَرِينَ أَعْمَالاً
আমি কি তোমাকে অবগত করবো তাদের ব্যাপারে, যারা তাদের শ্রমের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। চেষ্টা-সাধনা, শ্রম ও সবকিছুর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তারা কারা?
الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
দুনিয়ার জীবনে যারা তাদের শ্রমকে নষ্ট করেছে,
وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
এবং তারা ভাবছে যে, বড় সুন্দর কাজ করে যাচ্ছে; অথচ এটা অর্থহীন। রাবিয়া তিনি এই উত্তর না পাওয়াতে এখন আর সাংবাদিকতা করেন না, অথচ সবচেয়ে পরিচিত যে পত্রিকা লা-মুঁ এবং তার বিশিষ্ট ও দক্ষ একজন সাংবাদিক ছিলেন এবং সেই দক্ষতা এখনো আছে। তিনি তা প্রয়োগের ব্যাপারে কোনো একটা সন্তোষজনক উত্তর পাচ্ছেন না যে, এর দ্বারা আমার জীবন সার্থক হচ্ছে কি না।
তারই খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিলিপ পতি তার নাম, তিনি মুসলমান হননি। মুসলমান না হওয়ার কারণে তার মনে এই প্রশ্ন জাগে না, এর সার্থকতা কী? তিনি সার্কাসের জগতে অত্যন্ত দক্ষ ব্যক্তি, ওই মাত্রার যে, একসময় তিনি বেশ কয়েক বছর আগের কথা টুইন টাওয়ার তখনো ছিল, টুইন টাওয়ারের মাথার উপর এই টাওয়ার থেকে ওই টাওয়ার দড়ি টাঙিয়েছেন আর সেই দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে গেছেন টুইন টাওয়ারের উপরে।
কোথায় টুইন টাওয়ারের মাঝখানে দড়ি দিয়ে হেঁটে যাওয়া, শুধু দড়ি দিয়ে হেঁটে যাওয়ার প্রশ্ন নয়, এত উচ্চতার কারণে আরও অনেকগুলো প্রশ্ন চলে আসে। জোরে বাতাস চলে, নিচে, যদি হেঁটে যাওয়া হয়, বাতাসের কোনো পথ থাকে না, বাতাসের যে দড়িও দোলে, নিজেও দুলবে, স্বাভাবিক দড়ি এখানে এতদূর পর্যন্ত টিকবে না, শক্ত দড়ি দিতে হবে ইত্যাদি। সব হিসাব-নিকাশ করার পরে সেই উঁচু টাওয়ারের মাঝখানে দড়ি টাঙিয়ে আর সে দড়ি দিয়ে এপাশ থেকে ওপাশ হেঁটে গেছেন। ওই ঘটনা ওই দিনই ঘটেছে, যেদিন নিক্সন রিজাইন (Resign) করেছেন। কিন্তু এ ঘটনার গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে, পত্রিকার হেডলাইনে দুই খবর পাশাপাশি ছিল — টুইন টাওয়ারে দড়ি দিয়ে পার হয়ে গেছেন একজন ব্যক্তি, আর নিক্সন রিজাইন করেছেন।
ফিলিপ পতিকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, যে এত উপরে গিয়ে ওখান থেকে তুমি হেঁটে পার হলে, নিচে মাটি দিয়ে পার হলেই তো পারতে। এই লম্বা পথে যাওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? বলবে যে, আমার তো ওই পারে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আর আমি উপরে যে দড়ি দিয়ে পার হলাম, পার হওয়ার জন্য নয় একটা দক্ষতা প্রমাণ করার জন্য। উদ্দেশ্য কী, লক্ষ্য কী, স্বার্থ কী — এগুলো অবান্তর প্রশ্ন। আমি আমার দক্ষতা প্রমাণ করতে চাই; এর মধ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমি খুঁজছি না, এটাই আমার লক্ষ্য।
কত ভিন্নতা! অথচ দুই বন্ধু। একজন সাংবাদিকতা করার ব্যাপারে প্রশ্ন করছেন যে লক্ষ্য কী? সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ার কারণে দক্ষ সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও, সে কাজ আর এখন করতে পারছেন না। কারণ, আমাকে হিসাব দিতে হবে, আল্লাহ তায়ালা আমাকে পাঠিয়েছেন, আমার হিসাব নেবেন আমাকে হিসাব দিতে হবে। আর অপরজন যেহেতু হেদায়েতের পথে বেচারা আসেনি, সে তার জীবনের সামনে কোনো লক্ষ্য দেখে না, দক্ষতাকেই সে তার জীবনের সার্থকতা মনে করে।
দুনিয়াতে মানুষ এই দুই পথের পথিক। এক পথকে আমরা সভ্যতা নামে বলি চিনি। সভ্যতার মানুষকে নানান ধরনের দক্ষতা শেখায়। পুরো দুনিয়াতে সভ্য জগৎ মানেই হচ্ছে যে, ওখানে শিক্ষার চর্চা আছেই। কোনো সভ্যতার ওখানে শিক্ষার কোনো ধরনের কোনো চর্চা ও পদ্ধতি নেই, এটা হতে পারে না।
স্কুল-কলেজ না থাকুক, সেই পাথর-যুগেও যদি যাওয়া যায়, তো সেখানেও কোনো না কোনো ধরনের শিক্ষার একটা চর্চার ছিল। সভ্যতার জগতের শিক্ষার লক্ষ্য তাকে দক্ষ ব্যক্তি বানানো। আল্লাহ তায়ালা প্রথম থেকেই আম্বিয়া আলাইহিস সালামকেও পাঠিয়েছেন। একেবারে আদম আলাইহিস সালাম থেকে আরম্ভ করে আর শেষে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। একের পর এই একজন নবীদেরকে পাঠিয়েছেন, নবীরা একটা মেহনত করেছেন নবীদের মেহনত সম্পূর্ণ ভিন্ন। নবীদের মেহনতের লক্ষ্য এটা ছিল না যে, মানুষকে দক্ষ মানুষ বানাবেন; বরং তাদের লক্ষ্য এটা ছিল শুদ্ধ মানুষ বানানো।
দুটো ভিন্ন স্বতন্ত্র পথ; একটা হলো দক্ষতা তার লক্ষ্য, এরেকটা শুদ্ধতা তার লক্ষ্য। আম্বিয়া আলাইহিস সালাম মেহনত করেছেন মানুষকে শুদ্ধ জীবনের পথ দেখানোর জন্য। প্রতিটি ব্যাপারে একজন শুদ্ধ মানুষ নবীদের পথের পথিক যারা, সে এই প্রশ্ন করবে যে — আমি যে এই কাজটা করতে যাচ্ছি, এই কাজটা শুদ্ধ কি না, উচিত কি না, ভালো কি না। এটা হলো নবুওয়তি পথের প্রশ্ন। সভ্যতার পথের প্রশ্ন এটা নয় যে, কাজটা উচিত কি না বা শুদ্ধ কি না। বরং এটা, এটা আমি পারবো কি না, এটাতে আমার দক্ষতা প্রমাণিত হয় কি না। একজন শিল্পী তার শিল্পকাজে এই কথা চিন্তা করে না যে, এর লক্ষ্য কী, শুদ্ধ না অশুদ্ধ, বরং সে তার দক্ষতা প্রমাণ করতে চায়। একজন বৈজ্ঞানিক সে তার দক্ষতা প্রমাণ করতে চায়। দার্শনিক ও গণিতশাস্ত্রবিদ সে তার দক্ষতা প্রমাণ করতে চায়। সভ্যতার জগতে যে শাখায়ই হোক না কেন, তার লক্ষ্য হচ্ছে অর্জন করা। কেন? ওইটা অবান্তর প্রশ্ন। দক্ষতা মানুষের সাময়িক কাজে লাগে, আর শুদ্ধতা মানুষের জন্য প্রতিটি জামানাতে সর্বক্ষণ প্রয়োজন।
আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন খলিফা হলেন। পাড়ার কিছু মেয়েরা ছিল, তারা বলল যে, তিনি তো এখন আর আমাদের বকরির দুধ দোহন করে দেবেন না। তিনি তাদের প্রতিবেশীদের উট দোহন করে দিতেন। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু এই কাজে বড় দক্ষ ছিলেন, দুধ দোহন করা একটা দক্ষতা। সবাই পারে না। আর উটের দুধ দোহনের মধ্যে আবার কয়েকটা পদ্ধতি আছে। বিশেষ করে দুটো, এমনভাবে যেন প্রচুর ফেনা ওঠে। আর এক হলো এমনভাবে যেন কোনো ফেনা না ওঠে। মাখন-টাখন বের করতে হলে ফেনা তোলা পদ্ধতিতে বেশি ভালো।
আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু দুটোই ভালো পারতেন। যখন দুধ দোহন করতে যেতেন, জিজ্ঞাসা করতেন কীভাবে দুধ দোহন করবো; ফেনা তুলে না ফেনা ছাড়া। যেভাবে বলতেন সেইভাবে করতেন। খলিফা যখন হয়ে গেলেন যে, প্রতিবেশীদের দুধ দোহন করতেন, প্রতিবেশীর ছোট মেয়ে ছিল। সে বলল যে, এখন তো আর তিনি এগুলো করবেন না। কারণ, তিনি এখন তো খলিফা হয়ে গেছেন। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন যে, না এখনো আমি তোমাদের দুধ দোহন করে দেবো আর খলিফা হওয়ার পরেও তাদের কাছে যেতেন আর তাদের দুধ দোহন করে দিতেন।
এই ঘটনার মধ্যে দুটো জিনিস পাওয়া যায়। এক হলো যে, দুধ দোহনের ব্যাপারে একটা দক্ষতা, আর এক হলো একজন খলিফার আচরণের শুদ্ধতা। দুধ দোহনের ব্যাপারে একটা দক্ষতা ছিল, ওইটার বর্তমানে আমাদের কাছে কোনো মূল্য নেই। আমরা এখানে যারা আছি আমাদের কারো কোনো উট নেই, আর দুধ দোহনের প্রশ্নও ওঠে না। আমি দুধ দোহন করতে পারি বা না পারি, আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু পারতেন না পারতেন না, তা কিছু প্রশ্নই আসে না।
কারণ, আমার উটই কোথায় আর দুধই কোথায়। অতএব তাঁর দক্ষতার যে মূল্য ছিল বড়ই সাময়িক। ওইটার এখন আর কোনো মূল্য নেই। কিন্তু তাঁর আমলের মধ্যে এই আচরণের মধ্যে একজন ব্যক্তি হিসেবে, একজন মুসলমান হিসেবে যে আচরণের শুদ্ধতা দেখা যাচ্ছে, ওইটা তখনো মূল্যবান ছিল এখনো মূল্যবান, কিয়ামত পর্যন্ত মূল্যবান। একজন খলিফা হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও মানুষের আখলাক আর অহংকারী না হওয়া, বিনয় থাকা, খেদমত করতে পারা, অনেকগুলো কথা এর মধ্যে আছে, আর এগুলো তখনো মূল্যবান। একজন ব্যক্তি হিসেবে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদের কাছে যে মূল্য রাখেন, তাঁর দক্ষতার কারণে নয়; তাঁর জীবনের শুদ্ধতার কারণে। আম্বিয়া আলাইহিস সালাম শুদ্ধ মানুষ গড়ে গেছেন আর তাদেরকে পরবর্তী মানুষের জন্য নিদর্শন হিসেবে রেখে গেছেন যে, এরা শুদ্ধ মানুষ।
তাদেরকে দেখে তোমরা তোমাদের জীবনকে শুদ্ধ করো। বিশেষ কোনো দক্ষ ব্যক্তিকে রেখে যাননি, তাদের কাছ থেকে তোমরাও কোনো দক্ষতা অর্জন করো, বরং শুদ্ধ জীবন রেখে গেছেন।
আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রীর একবার খেয়াল হলো যে, একটু মিষ্টি খেলে বড় ভালো হতো। বিশেষ করে মা-বাবার তো নিজেরা এত বেশি খেয়াল করে না, কিন্তু বাচ্চাদের ব্যাপারে আগ্রহ হয়। সব মা-বাবা বাচ্চাদেরকে ভালোবাসে। তাদেরকে একটু ভালো খাবার দিতে চায়। তো নিজের হয় না। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, যে-কোনোভাবে যদি একটু বাচ্চাদেরকে মিষ্টি বানিয়ে দিতে পারতাম। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন যে, আমার তো সে সামর্থ্য নেই।
খলিফা হওয়ার পরে কাঁধে কিছু কাপড় নিয়ে বিক্রি করার জন্য রওনা হয়েছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন, দেখে বললেন যে, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? বললেন, জানো যে আমি একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী। এটাই আমার পেশা, অতএব কিছু কাপড় বিক্রি করতে যাচ্ছি। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনি যদি কাপড় বিক্রি করতে যান তাহলে খেলাফতের কাজ কে দেখবে? আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমার পরিবারকে কে দেখবে? দুজনে মিলে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না।
তারপর দুজনে মিলে গেলেন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে। যার সম্বন্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন যে, প্রতিটি উম্মতের একজন আমীন আছেন, আমানতদার ব্যক্তি, আর এই উম্মতের আমীন হচ্ছেন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ। সে হিসেবে দুজন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন, অথচ আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে খলিফা। আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ফয়সালা দিলেন যে, একজন ব্যক্তির জন্য যে পরিমাণ প্রয়োজন, সেই প্রয়োজন হিসেবে বায়তুল মাল থেকে যেন তাঁকে ভাতা দেওয়া হয়। যাতে তাঁর প্রয়োজন মেটাতে পারেন।
মুসলমান হওয়ার আগে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু কাপড়ের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। এখন হয়েছেন ফেরিওয়ালা। প্রথম দিক থেকে বলা যেতে পারে যে, ব্যবসায়ী হিসেবে যে একটা যোগ্যতা-দক্ষতা ছিল, এখন সম্ভবত হারিয়ে ফেলেছেন, ওই দিকে অবনতি হয়েছেন। কিন্তু এখন অন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, সে হিসেবে তার ভাতা ঠিক করেছেন। যখন স্ত্রী চাইলেন যে, কিছু অতিরিক্ত মিষ্টি বানানোর জন্য, তখন আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু অপারগতা প্রকাশ করলেন যে, আমাকে তো এতটুকুই দেওয়া হয়েছে, যেটুকু আমার প্রয়োজন। এর চেয়ে বেশি আমাকে দেওয়া হয় না। তাঁর স্ত্রী সেই রোজকার ভাতা থেকে অল্প অল্প করে বেশ কিছুদিনে অল্পটুকু সঞ্চয় করতে পারলেন যাতে একটু মিষ্টি কেনার একটা বন্দোবস্ত হয়। আর যখন কিছু সঞ্চয় হয়ে গেল অল্প অল্প করে, তো সে থেকে একটু মিষ্টি তৈরি করলেন।
এই সঞ্চয় দেখে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এতে প্রমাণিত হয় যে, বায়তুল মাল থেকে আমি যে ভাতা নিতাম তা প্রয়োজনের চেয়ে কিছু অতিরিক্ত ছিল। সঞ্চয় থেকে প্রমাণিত হলো, যেটুকু সঞ্চয় করেছিলেন ওইটা দিয়ে মিষ্টি আর করতে দিলেন না। বায়তুল মাল থেকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে একজন সাধারণ মুসলমানের প্রয়োজন যতটুকু ততটুকু। সেই শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত নেওয়া শুদ্ধ নয়। কারণ তাঁর আচরণকে শুদ্ধ রাখবেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেহনত করেছেন, মানুষকে শুদ্ধ জীবনে গড়ে তোলার জন্য। শুদ্ধ, সুন্দর, ভালো জীবন যেন হয়। তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত — যা-কিছু করা সবকিছু যেন শুদ্ধ হয়, সুন্দর হয়।
এই যে একটা কাজ করে বায়তুল মাল থেকে ভাতা কমিয়ে দিলেন, এতে কোনো ধরনের কোনো দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না, যে-কেউ করতে পারে। প্রশ্ন হলো যে করে কি না; করবে সে-ই যার জীবনে শুদ্ধতা অতি মূল্যবান। আর যে শুদ্ধতাকে ওই মাত্রায় মূল্য দেয় না, সে করবে না। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু পুরো দুনিয়ার জন্য নিদর্শন। কোনো দক্ষতার কারণে নয়, জীবনের শুদ্ধতার কারণে। নবীরা নিজেরাও শুদ্ধ ছিলেন আর তারা শুদ্ধ মানুষ বানিয়ে গেছেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন মহিলাকে ডেকে পাঠালেন কোনো কাজে, সেই মহিলা গর্ভবতী ছিল। খলিফা যখন ডেকেছেন, কোনো কারণে নয়, ভয় লেগেছে। রাজা-বাদশাহদের দেখে মানুষ ভয় পায়, কারণে-অকারণে। অনেক সময় অকারণেও ভয় পায়।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গীদের সাথে হাঁটছিলেন, ফিরে তাকিয়েছেন, যেমন তাকিয়েছেন একজন আর একজনের পেছন দিকে পড়েছে, একজন পড়েও গেছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নারাজ হলেন, আমি কি জালিম না কী যে, আমাকে দেখে ভয় পাও। জালিম ছিলেন না কিন্তু তবুও ভয় পায়। সেই মহিলাকে ডেকে পাঠিয়েছেন তিনি ভয় পেয়েছেন, আর ভয় পাওয়ার কারণে তার গর্ভপাত হয়ে গেছে। পেটে যে সন্তান ছিল মারা গেছে।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রশ্ন করলেন যে, গর্ভপাত হওয়ার মূল কারণ তো আমি। আমার ডাকার কারণে সে ভয় পেল, আর সে ভয়ের কারণে গর্ভপাত হলো। পরোক্ষভাবে সেই হত্যার জন্য তো দায়ী। ফতোয়া চাইলেন, উলামারা ফতোয়া দিলেন যে, ঘটনাক্রমে ইচ্ছাকৃত নয় অ্যাক্সিডেন্টাল (Accidental) ঘটনাক্রমে যে মৃত্যু, যদি কেউ কাউকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে তাকে যে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তোমাকে সেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, ইচ্ছাকৃত নয় সেইজন্য ওই দোষ নয়; কিন্তু ক্ষতিপূরণ তাকে দিতে হবে হত্যার। তিনি খলিফা তাঁকে কেউ বাধ্য করছে না, নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছেন। এটা তো একটা মানুষ।
হারাম শরীফ মসজিদে গিয়েছেন। কাঁধে চাদর ছিল। চাদর যে বাঁশের মধ্যে থাকে সেটাতে চাদর রেখেছেন। যেখানে চাদর রেখেছেন সেখানে একটা কবুতর ছিল। কবুতর চাদর রাখার কারণে উড়ে গেল। গিয়ে অন্য জায়গায় বসেছে। আর যেখানে কবুতরটা বসেছে সেখানে একটা সাপ ছিল, সেই সাপ কবুতরটাকে ধরে খেয়ে ফেলেছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রশ্ন করলেন, নিজে নিজেই প্রশ্ন করলেন যে, এই কবুতরের মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী।
আমার চাদর রাখার কারণে সে তার নিরাপদ জায়গাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। আর বিপদে পড়েছে। আমি চাদর না রাখলে এ কাজ হতো না। হারামের ভেতরে সব ধরনের হত্যা নিষিদ্ধ, এটাও একটা হত্যা। ফতোয়া চাইলেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ফতোয়া দিলেন সেই ফতোয়া অনুযায়ী কাজ করলেন।
বড় সূক্ষ্মভাবে এবং বড় নিপুণভাবে নিজের জীবনের শুদ্ধতাকে বিচার করছেন। একটা কবুতর, কে খোঁজ করে। খবর পাঠিয়েছেন একজন মহিলাকে সে ভয় পেয়েছে আর কী হয়েছে একটা অ্যাক্সিডেন্ট না কী ব্যাপার, এটা তার ব্যাপার। কিন্তু নিজের জীবনকে, প্রতিটি আচরণকে শুদ্ধ রাখতে চান যে, আমার দায়িত্ব এখানে কতটুকু। আর সে দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে বড় সতর্ক।
তিনি যখন আঘাতপ্রাপ্ত হলেন, তাঁকে খঞ্জর মেরেছিল, আর সেই আঘাতে তিনি ইন্তেকাল করেন। জানেন, বেশি আর সময় বাকি নেই, অনেক ঘটনা আছে, অনেক কথা, অনেক দায়িত্ব ইত্যাদির ব্যাপারে। তার মধ্যে এটাও যে, তিনি তাঁর ছেলেকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে পাঠালেন। আর এই কথা দিয়ে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা শরীফের কাছে একটা খালি জায়গা আছে, যেখানে বর্তমানে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু দাফন করা আছেন। ওই জায়গার মালিক ছিলেন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা। আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে অনুমতি চাইলেন যে, ওই জায়গায় তিনি উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দাফন করার অনুমতি দেন কি না। আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা অনুমতি দিলেন।
খুব খুশি হলেন, আল্লাহর কাছে শোকর আদায় করলেন। কিন্তু আবার অসিয়ত করলেন কাফন পরানোর পরে, জানাজার পরে, লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় আবার যেন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে যান, আবার যেন জিজ্ঞাসা করেন, আর এই কথা আবার সতর্ক করে দিলেন যে, আমিরুল মুমিনীন এই জায়গা চাচ্ছেন এভাবে বলবে না, বরং বলবে যে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এই জায়গা চাচ্ছেন।
কারণ, তখন আর আমি আমিরুল মুমিনীন নেই। আর তখন যদি আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা আবার অনুমতি দেন, তাহলে ওই জায়গায় আমাকে দাফন করবে, যদি দ্বিতীয় বার অনুমতি দিতে চান না, তাহলে আমাকে অন্যান্য মুসলমানদের জায়গায় দাফন করবে।
এই দ্বিতীয়বার আবার অনুমতি চাওয়া কেন? এক হলো যে প্রথমবার যখন অনুমতি চেয়েছেন তখন তিনি জীবিত, আর সে হিসেবে আমিরুল মুমিনীন বলা যেতে পারে, ওই সময় যে অনুমতি চেয়েছেন সেই অনুমতির মধ্যে আমিরুল মুমিনীন হিসেবে তাঁর যে একটা মর্যাদা আছে সেই মর্যাদা সেখানে কার্যকর। আর জীবিত ব্যক্তির কারণে একটা লজ্জার প্রশ্নও আছে, অস্বীকার করতে অনেক সময় লজ্জাও লাগে।
আমিরুল মুমিনীনের কারণে একধরনের বাধ্যতাও আছে, আবার লজ্জার কারণে একধরনের বাধ্যতাও আছে। সেইজন্য হয়তো-বা পুরোপুরি সন্তুষ্টির সাথে নয়, কিছুটা হলেও চাপে পড়ে অনুমতি দিয়েছেন।
ইন্তেকালের পরে যখন আবার জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন আর আমিরুল মুমিনীনও নেই, আর সেই শব্দও নেই। শব্দেরও একটা ওজন আছে, সেই শব্দও নেই। তাঁকে আমিরুল মুমিনীন ডাকা হয়। আবার তিনি একজন যে সাধারণ মুসলমান মানুষ উমর হয়ে গেছেন, আর মারাও গেছেন, অস্বীকার করলেও তাঁর কাছে কেউ লজ্জা পাবে এমন কথাও নয়, তখন যদি তিনি আবার অনুমতি দেন তো সেটাকেই যেন গ্রহণ করা হয়। কত নিপুণভাবে দেখছেন যে, আচরণ শুদ্ধ কি না। আমি একজন মানুষের হককে তার কাছ থেকে অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নিচ্ছি কি না।
এই যে কথাগুলো শুদ্ধ-সুন্দর জীবন গড়া, এটা সভ্যতার পথের জিনিস নয়, এটা নবুওয়তি জিনিস। নবুওয়ত এবং নবুওয়তি-পথে যারা চলে তারা দুনিয়ার মানুষকে শুদ্ধ আচরণের শিক্ষা দেয়।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু জিহাদের ময়দানে শত্রুর বুকে চেপে বসেছেন, ওই সময় সে থুথু দিয়েছে, থুথু ফেলেছে, আর রাগান্বিত হয়েছে, আর যখনই রাগ হয়েছে তখনই ছেড়ে দিয়েছেন। কেন যে, রাগের কারণে এখন যদি আমি হত্যা করি তাহলে এখানে আমার নিজের স্বার্থও জড়িত। অতএব এখন আর শুদ্ধ থাকল না, রাগ না থাকলে শুদ্ধ ছিল, এখন আর থাকল না। সেখানে পারা না-পারার প্রশ্ন ওঠে না, উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন।
জিহাদের ময়দানে যাচ্ছেন, পরবর্তী জামানায়, ফিতনার জামানায় মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর মোকাবেলায় যে যুদ্ধ ছিল। ঘোড়ায় উঠবেন, রেকাব বলে যেখানে ঘোড়ার সওয়ারি তার পা রাখে, পা-দানি বলা যেতে পারে। রেকাবে পা রেখেছেন, ওই বিষয়টির ব্যাখ্যা আসবে।, ওই সময় সম্ভবত সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু অথবা অন্য কোনো সাহাবি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার কী ধারণা, আপনি যুদ্ধে জিতবেন?”
আনি রাদিয়াল্লাহু আনহু খুব নিশ্চিতভাবে বললেন, “না।” তিনি যে হারবেন, তাঁর কথার সুর ও ধরণে মনে হয় যে এ ব্যাপারে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। নিশ্চিততার সঙ্গেই বললেন, “না।”
সাহাবি অবাক হয়ে বললেন, “আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে আপনি হারবেন, তবুও যুদ্ধে যাচ্ছেন?”
তিনি উত্তরে বললেন, “হারা বা জেতা ওইটা বিষয় নয়, উচিত না অনুচিত ওইটা বিষয়। আমি মনে করি এই যুদ্ধ উচিত। অতএব আমি যুদ্ধে যাব। ওখানে এই প্রশ্ন আসে না যে জিতব না হারব।”
এটাই খেলাফতের বৈশিষ্ট্য।
এটি খুব বেশি দিনের আগের কথা নয়, মাত্র পঞ্চাশ-ষাট বছর হবে। দিল্লিতে উপমহাদেশের একটি মজলিস হয়েছিল। সেই মজলিসের মধ্যে এই কথার আলোচনা হচ্ছিল—উনি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যে ঘটনা আমি এখন বললাম। কথা শুনে উপস্থিত মজলিসের বড় একজন আলেম, তাঁরও নাম আমি ভুলে গেছি, তিনি নতুন করে কালেমা পড়লেন।
বললেন, “আজ আমি নতুন করে আমার মুসলমান হওয়া ঘোষণা করছি। খলিফা কী আর বাদশাহ কী—এই ব্যাপারে আমার ভুল ধারণা ছিল। এই দুইয়ের মধ্যে প্রভেদ এই একটা ঘটনাতেই বুঝে ফেলা যায়। খলিফা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উত্তরসূরি, সে পারা-না-পারাকে দেখে না, সে উচিত-অনুচিত শুধু ওইটাই দেখে।
আর রাজা-বাদশাহরা উচিত-অনুচিত ওইটা তত বেশি দেখে না, সম্ভব কি অসম্ভব সেটাকে গুরুত্ব দেয়। কোনো বাদশাহ যুদ্ধে যাওয়ার সময়, রাজা যুদ্ধে যাওয়ার আগে সে এটা চিন্তা করবে যে এটা সম্ভব কি না, আমরা যুদ্ধে জিতব না হারব। যদি জিতি তাহলে যুদ্ধ করি, যদি হারি তাহলে না যুদ্ধ করাই ভালো, অন্য পথ ধরি। আর খেলাফত—ওখানে এটা যে উচিত না অনুচিত, পরিণতি কী হতে পারে সেটা দেখার বিষয় নয়।”
নবীয়া আলাইহিমুস সালাম দুনিয়াতে এসেছেন দুনিয়ার মানুষকে শুদ্ধ জীবনের পথ দেখানোর জন্য। আর বড় পরিতাপের কথা, আজ পুরো দুনিয়াতে ওই নবুয়তি পথ প্রায় বিলুপ্ত। আমাদের বক্তারা, তারাও তাদের জীবনকে দক্ষতা দিয়ে সমৃদ্ধ করতে চায়; শুদ্ধতা দিয়ে নয়, দক্ষতা দিয়ে। আমাদের পড়ানেওয়ালা, বক্তৃতা রাখেনেওয়ালা, দাড়ি-টিপি সবই আছে, কিন্তু নিজের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক মাপে সে তার দক্ষতা দিয়ে। আর নবীয়া আলাইহিমুস সালামকেপাঠিয়েছেন বরং পুরো দুনিয়ার মানুষকে ডেকে বলে যে, তার জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক তার দক্ষতার সাথে জড়িত নয়, তার জীবনের শুদ্ধতার সাথে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সত্যতা-দক্ষতার এই জগতের দিকে ইঙ্গিত করেই হয়তো বলেছেন, নিজেদের সম্পর্কে, মুসলিম উম্মত সম্পর্কে—
“আমরা নিরক্ষর উম্মত, আমরা লিখিও না, গণনাও করি না।”
যে লিখতে জানে না, গণনা করতে জানে না, তার ব্যাপারে আর বেশি প্রশ্ন করার দরকার নেই—সে সব ব্যাপারেই অজ্ঞ, অদক্ষ। আর গোটা উম্মত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কথা বলেছেন। এর মানে এটা নয় যে, উম্মতের মধ্যে কেউই লিখতে জানে না, বা কেউই গণনা করতে জানে না। কিন্তু মোটামুটিভাবে, স্বাভাবিকভাবে এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য এই রকম। অথচ এই উম্মতকেই পাঠানো হয়েছে পুরো দুনিয়ার মানুষের পথপ্রদর্শক হিসেবে। যারা লিখতে জানে না, গণনা করতে জানে না, তারা কীভাবে শিক্ষা দেবে? আর তাদেরকে পাঠানো হয়েছে শিক্ষক হিসেবে।
তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এবং তাঁর উম্মত যারা মুয়াল্লিম উম্মত, তারা নিশ্চয়ই মানুষকে বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত ইত্যাদি কোনো ধরনের কোনো শিক্ষা দেওয়ার যোগ্যতাই রাখেন না। শিক্ষা দেবেন কী? তাহলে কীসের মুয়াল্লিম; দুনিয়ার মানুষকে শুদ্ধ-সুন্দর জীবনের পথ দেখানোর মুয়াল্লিম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হায়াতে থাকতেই সাহাবিরা এই চারপাশের দেশগুলোতে যেতে আরম্ভ করল, মুয়াল্লিম হিসেবে, তাদেরকে দীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। সবচেয়ে প্রথমে দক্ষিণে ইয়েমেন, উন্নত সভ্যতা ছিল। তারপরে উত্তরে রোম, রোম তো ইতালির যে রোম আমরা চিনি, সেটা তো উত্তরে নয়, উত্তর-পশ্চিম, অনেক পশ্চিমে। রোম বলতে বোঝায় বর্তমান প্যালেস্টাইন ইত্যাদি, এগুলো রোম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। সেই হিসাবে এই সব অঞ্চলও রোম। রোম, কত উন্নত সভ্যতা, দামেস্ক ইত্যাদি, সাহাবিরা গেলেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জামানায় পারস্য এবং মিশরে যেতে আরম্ভ করল। আর সব দেশগুলো জাতিগুলো বড় উন্নত সভ্যতা, চূড়ান্ত মাত্রার দক্ষতা তারা অর্জন করেছে, আর সাহাবিরা গেছেন মুয়াল্লিম হিসেবে। তারা তাদের জগতে কোনো দক্ষতার মুয়াল্লিম হওয়ার দাবি করেননি। সাহাবিরা গ্রিকদেরকে গিয়ে এই কথা বলেননি যে, তোমরা গণিত কিছু কম জানো আমরা আরও ভালো গণিত শেখাতে এলাম। গিয়েছেন আর্কিমিডিস আর পিথাগোরাসের সন্তান বংশধরদের কাছে, সাহাবিরা যারা গণনাই জানেন না তাদের কাছে কি গণিত শিখবেন? এই কথার দাবিও করেননি, বরং তারা গেছেন শুদ্ধ-সুন্দর জীবনের পথ দেখানোর জন্য। আর ওইটার ব্যাপারে তারা ঠিকই যোগ্য ছিলেন।
তার প্রমাণ এই কিছুদিনের মধ্যেই, তারা সাহাবিদের অনুসরণ করছে, তারা বিজ্ঞান-দর্শন ইত্যাদির জগতে বড় দখলওয়ালা। এই কথা তারা জানে যে, সাহাবিরা এই জিনিসগুলো কিছুই জানেন না। এরকম নয় যে, একটা ভুলের মধ্যে করেছেন, তারা নয়। সাহাবিরা যে লিখতে জানেন না, তা সে ভালো করেই দেখছে; গণনা করতে জানেন না, তাও সে ভালো করেই জানে। আর নিজে যে এত দক্ষতা গণিত আর দর্শনে রাখে, তাও সে ভালো করেই জানে। কিছুই না জেনেও, তবে সে কেন সাহাবিদের অনুসরণ করল? এইজন্য যে, আমাদের জীবন শুদ্ধ নয়, আর আমার শুদ্ধ জীবনের প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে এবং আখিরাতে মানুষকে ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন তার কোনো দক্ষতার বিনিময়ে নয়, বরং তার জীবনের শুদ্ধতার বিনিময়ে। যার জীবন যে মাত্রায় শুদ্ধ হবে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে এবং আখিরাতে সেই মাত্রায় তাকে ভালো জীবন দান করবেন।
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
যে নেক আমল করে, পুরুষ হোক বা নারী হোক এবং সে ঈমানওয়ালা, আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করছেন যে, আমি নিশ্চয়ই তাকে ভালো জীবন দান করবো। এই যে ওয়াদা শুধু ভালো আমলের উপর। ভালো আমল কোনো দক্ষতা দাবি করে না, ভালো আমল শুদ্ধতা দাবি করে। এমনকি আমলের জগতেও না।
আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে কি তার থেকে কিছু বেশিও হতে পারে। আমেরিকা থেকে তবলিগে এসেছেন পাকিস্তানে। প্রথম আমেরিকান যিনি তবলিগে সময় লাগানোর জন্য এসেছেন। তাঁর আবার বয়স ছিল প্রায় ৭০ বছরের মতো, আর অশিক্ষিত লোক, এমনি যারা অশিক্ষিত থাকে নতুন জিনিস শেখা তার জন্য মুশকিল হয়। কারণ, শেখার অভ্যাসই তার নেই। ছেলেবেলা থেকেই অশিক্ষিত, তার উপর বয়স ৭০ বছর। তার উপর আবার ওই জাতি যেখানে আরবি যে ধ্বনিগুলো আইন, কাফ, হা এগুলো কোনোটাই তার নেই। তো নামাজ শিখতে হবে, পদে পদে বাধা। বড় হওয়ার পরে জীবনে কোনোদিন হাঁটুকে ভাঁজ করেননি। পশ্চিম জগতে ওই হাঁটুকে ৯০ ডিগ্রির চেয়ে বেশি ভাঁজ করার কোনোদিন প্রয়োজন হয় না, কোনো জায়গায় না। বাথরুমে যায় সেখানেও চেয়ারের মতো বসা, তো হাঁটুকে ৯০ ডিগ্রির চেয়ে কম নিতে হচ্ছে না, আর বাকি তো কাজকর্মই নেই। যার ৭০ বছর তার মধ্যে কমপক্ষে ৬৫ বছর পর্যন্ত এই যে, কম ভাঁজ করেননি, এখন কেমন করে করবে? নামাজ পড়তে হলে আত্তাহিয়্যাতুতে ভাঁজ করতে হয়, তো বেচারা কিছুদিনের মধ্যে হাঁটু-টাটু ফুলে গিয়ে বড় সমস্যায় পড়েছে। আবার আঙুলও ভাঁজ করতে হয়, এ হলো এক। আরেক মুশকিল যে, এই বয়সে নতুন করে শেখা, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, 'হা' আছে 'আইন' আছে; আমাদের জন্যই মুশকিল, তাদের আরও মুশকিল। তারপর ওই বয়সে মানুষের স্মরণশক্তিও থাকে না। অনেক দিনে এক আয়াত শিখলেন, বহু কষ্ট করে। দ্বিতীয় আয়াত যখন শিখতে গেলেন, তো প্রথম আয়াত ভুলে গেলেন। কিন্তু তিনি হয়ে গেছেন মুস্তাজাবুদ দাওয়া। দুআ যখনই করেন তখনই কবুল হয়। এমনকি বেশ এই ব্যাপারে খ্যাতিও হয়ে গেছে।
জামাত গেছে কুয়েতের অঞ্চলে। আফগানিস্তানের পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানের অঞ্চল। বৃষ্টি হয়নি, অনাবৃষ্টিতে বড় কষ্ট। তারা বলল যে, তুমি দূরদেশ থেকে আল্লাহর পথে বের হয়েছো, তোমার দুআ কবুল হবে। তুমি দুআ করো যেন বৃষ্টি হয়। দুআ করলেন তখনই বৃষ্টি হলো।
পাঞ্জাবের থাল একটা অঞ্চল আছে যেখানে লবণের খনি আছে, লবণের পাহাড়, ভেতরে রেল লাইন আছে, আমি গিয়েছিলাম সেখানে। উপরে লবণ, ডানে লবণ, বায়ে লবণ, সবদিকে লবণের পাহাড়। ওই অঞ্চলে আশেপাশে যে পানি-টানি থাকে, কুয়া যদি করে সেগুলো পানি ওইরকম লবণাক্ত পানি হয়।
মানুষের জীবন বড় কষ্ট, সেরকম অঞ্চলে গিয়েছেন। তারা অভিযোগ করল যে, আমাদের পানি বড় কষ্ট, কুয়াতে পানি আছে কিন্তু সেটা লবণাক্ত পানি। দুআ করো পানি যেন মিষ্টি হয়, দুআ করলেন তো ওই লবণাক্ত পানি মিষ্টি হয়ে গেল। এবং এত পরিচয় হয়ে গেল যে, পাকিস্তানের তখন আমির ছিলেন বশীর সাব রহমাতুল্লাহি আলাইহি, তিনি চাকরি করতেন। চাকরির কাজে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার সময় প্লেনে আর সিট পাচ্ছেন না বুকিং পাচ্ছেন না, বেশ সমস্যায় পড়ে গেছেন। তাঁর আসার প্রয়োজন, কোনো উপায় না পেয়ে এর কথা শুনেছেন, খবর পাঠালেন তাঁর কাছে যে, আমেরিকানকে বলো আমার জন্য দুআ করতে, আমি যেন সিট পেয়ে যাই। বেচারা তো বললেন যে, ঠিক আছে উত্তরে বললেন যে আই শ্যাল ওয়ার্ক টু নাইট (I shall work tonight) আজকে রাত্রে আমি দেখবো। রাতে দেখলেন, পরের দিন তিনি সিট পেয়ে গেছেন। চলে এলেন। অথচ নামাজ পড়ার ব্যাপারেও বলা যেতে পারে অদক্ষ। ঠিকমতো পা ভাঁজ করতে পারছেন না, ঠিকমতো সূরা ফাতিহা পড়তে পারছেন না, কিন্তু তাঁর আচরণ শুদ্ধ। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার মানুষকে ডাকছেন শুদ্ধ জীবনের দিকে। আর মানুষ দৌড়াচ্ছে দক্ষতার দিকে। জীবনকে যদি সে শুদ্ধ করতে পারে, আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, তাকে দুনিয়াতেও ভালো জীবন দেবেন আখিরাতেও ভালো জীবন দেবেন। মানুষ নিজেকে মূল্যবান বানাতে চায়, আর বড় ভুল, দক্ষতা দিয়ে বানাতে চায়। দক্ষতার দ্বারা তার নিজের জীবন মূল্যবান হয় না। সে মূল্যবান জিনিসের উৎপাদনকারী হয়।
একজন কুমার মাটির পাত্র বানায়, সে যদি দক্ষ কুমার হয় তাহলে শুদ্ধ পাত্র বানাতে পারে। নিজে শুদ্ধ হয় না। সে হচ্ছে দক্ষ, সে দক্ষ কুমার, তার কৃতি শুদ্ধ পাত্র। শুদ্ধ মানুষ হবে না, ও যার মূল্য বড় সাময়িক।
নিজ গুণেও মূল্যবান হয় আর উৎপাদনের গুণেও মূল্যবান হয়। ফুল-ফল নিজ গুণে নিজ দাবিতে মূল্যবান। গোবর উৎপাদনের গুণে মূল্যবান। কৃষকরা গোবরকেও মূল্য দিয়ে কেনে, গোবরেরও মূল্য আছে। গোবরের যে মূল্য আছে সেটা তার নিজ গুণে নয় যে, গন্ধ ভালো, সুন্দর, এইজন্য কেউ গোবর কেনে না; বরং সুন্দর ফুলের উৎপাদনের সহায়ক। ফুলকে যে কেনে তার নিজ গুণে। আম্বিয়া আলাইহিস সালাম যে পথ এনেছেন, সেই পথে একজন মানুষ নিজ দাবিতে মূল্যবান হয়, শুদ্ধ জীবনের জন্য। আর গোটা দক্ষতার পথ তাকে শুদ্ধ উৎপাদনের সহায়ক বানায়। যত দিন পর্যন্ত ওই উৎপাদন আছে তত দিন তার মূল্য আছে।
গোবরের মূল্য সবার কাছে নয়, শুধু কৃষকের কাছে আর তার চাষের মৌসুমে। অন্য কারো কাছে মূল্য নেই আর কৃষকেরও মৌসুম পার হয়ে গেলে আর সারের দরকার হয় না। তখন তার কাছেও মূল্য নেই। কিন্তু ফুল-ফল এগুলো সবার কাছে সবসময় মূল্যবান।
একজন দক্ষ ডাক্তার শুধু রোগীর কাছে মূল্যবান, যত দিন পর্যন্ত সে রোগী। একজন শুদ্ধ মানুষ সবার কাছে সবসময় মূল্যবান। এই জন্য নবীরা যে পথ এনেছেন, ওই পথে যারা মূল্যবান হয় তারা তখনো মূল্যবান ছিলেন, আজও মূল্যবান, কিয়ামত পর্যন্ত মূল্যবান থাকবেন। আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, সব সাহাবিরা তখনো মূল্যবান ছিলেন, আজও মূল্যবান আর ভবিষ্যতেও থাকবেন।
তারা যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সেই পথ আজও আমাদের জন্য বড় অর্থপূর্ণ। তাদের যেসব যেসব দক্ষতা ছিল, কেউ ভালো যোদ্ধা, কেউ দুধ দোহনে দক্ষ, ওই দক্ষতার মূল্য শেষ হয়ে গেছে। এখন আর আমরা তরবারি, তীর দিয়ে যুদ্ধও করি না। সাহাবিরা কেউ যদি বড় দক্ষ যোদ্ধাও হয়ে থাকেন, আমাদের কাছে সেই দক্ষতার এখন কোনো মূল্য নেই; কিন্তু তাদের শুদ্ধতার মূল্য আছে, আর থাকবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন, আমরাও যেন নিজেদেরকে শুদ্ধ জীবনের দিকে নিয়ে যাই। যে নিজেকে শুদ্ধ বানাতে পারবে, তার জীবন ধন্য হবে। আল্লাহ তায়ালা তার জন্য দুনিয়াতেও ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন, আখিরাতেও ভালো জীবনের ওয়াদা করেছেন।
এই জন্য বড় জবরদস্ত মেহনতের প্রয়োজন। আবার বলছি, পুরো দুনিয়াতে শিক্ষার খুব চর্চা আছে, কিন্তু পুরো দুনিয়াতে এটা কোনো বিশেষ সমাজ বা কাউকে দোষারোপ করে বলছি না, যেরকম আমাদের এই দেশের এই সমাজে বিশেষ কোনো দুর্বলতা বা বিশেষ কোনো দোষ তা নয়। গোটা দুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিরই একটা বড় দুর্বলতা যে, শিক্ষার লক্ষ্যই হচ্ছে দক্ষতা; শুদ্ধতা নয়। আর মানুষের জীবনে প্রতিমুহূর্তে শুদ্ধতার প্রয়োজন।
এইজন্য আল্লাহর পথে বের হয়ে আমরা আমাদের নিজেদেরকে শুদ্ধ বানাই, ঠিক না ভাই? ইনশাআল্লাহ। এইজন্য সবাই নিয়ত করি যে, চিল্লার জন্য, তিন চিল্লার জন্য আল্লাহর পথে বের হব। আর এইজন্য বের হব যে, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদেরকে শুদ্ধ বানানোর পথ দেখিয়ে দেন, যেন আমরা শুদ্ধ হতে পারি। আর শুদ্ধ কারা?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিরা যেরকম ছিলেন। এইজন্য সবাই নিয়ত করি, ইনশাআল্লাহ আল্লাহর পথে যত দ্রুত বের হব। ঠিক না ইনশাআল্লাহ। আপাতত আমাদের সামনে সুযোগ আছে, এখানে বলা যেতে পারে ছাত্রদেরই মজলিস। কিছুদিন পরেই গ্রীষ্মকালীন অবকাশ আছে। ছুটি আছে। প্রায় চল্লিশ দিন আমরা ছুটি পাব। এই গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে চল্লিশ দিনের জন্য নিয়ত করি। আল্লাহর পথে বের হই। দাঁড়াই বিসমিল্লাহ করে। ইনশাআল্লাহ, চিল্লার এক এক চিল্লার জন্য, ৪০ দিনের জন্য।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
ঈমানের মেহনত : পরিচয় ও পদ্ধতি
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর.. মুহতারাম হাযেরীন! আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের জন্য চারট...
হাদীসের আলোকে মসজিদে ঘুমানোর শরয়ী বিধান
...
তাবলীগ ও তাযকিয়া; একটি বিভ্রান্তির নিরসন
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যদি তাবলীগের চিল্লা উসূল মোতাবেক লাগানো হয় এবং চিল্লার মধ্যে স্বীয় নফসের ফ...
দ্বীনের খেদমত ও দাওয়াত
...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন