প্রবন্ধ
অবস্থা থেকে ফায়দা নেওয়া
৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
১৬৯৬
০
[১২ই সেপ্টেম্বর ২০১৪, গুলশান সোসাইটি মসজিদ, ঢাকা]
[প্রত্যেক পরিস্থিতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিয়ামত বা ফায়দা নেওয়ার সুযোগ। একই ঘটনা (যেমন: মেঘ) ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে – কৃষকের জন্য আশা, ইটভাটার মালিকের জন্য দুশ্চিন্তা। মূল পার্থক্যটি দৃষ্টিভঙ্গির: দুনিয়াদার মানুষ অবস্থা দেখে ভয় পায়, আল্লাহওয়ালারা সব অবস্থায় الْحَمْدُ لِلَّهِ বলেন।
স্বয়ং রোগ, দারিদ্র্য বা মৃত্যুও খারাপ নয়; বরং প্রতিটি অবস্থার জন্য নির্ধারিত আমল (যেমন: ফজরের নামাজ, ধৈর্য, শুকরিয়া) করলেই সেই অবস্থা থেকে আধ্যাত্মিক ফায়দা অর্জন সম্ভব। জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ভর করে "অবস্থা" নয়, বরং সেই অবস্থার প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উপযুক্ত আমলের উপর।
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ — সর্বাবস্থায় শোকরিয়া আদায় করাই হলো প্রকৃত জ্ঞানের পরিচয় এবংআখেরাতের সফলতার চাবিকাঠি]।
কৃষক বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছে। বৃষ্টি না হলে মাটি নরম হবে না, চাষও করা যাবে না। মেঘ দেখে তার মধ্যে বড় আশা জাগে, আর মনে আনন্দ আসে যে, বৃষ্টি হবে এবং সে চাষ করতে পারবে। তারই পাশে আরেকজন ইট তৈরি করছে; তার ইট শুকাতে হবে। মেঘ দেখে তার মনে বড় ভয় ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়—পাছে সব ইট ভিজে নষ্ট হয়ে যায়।
আপাতদৃষ্টিতে উভয়ই একই জিনিস দেখছে—মেঘ। কিন্তু তাদের মনে সম্পূর্ণ ভিন্ন, বিপরীত অনুভূতি সৃষ্টি হচ্ছে। একজনের মধ্যে আশা জাগে, অন্যজনের মধ্যে ভয় দেখা দেয়।
দুনিয়াদার মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতি দেখে ভয় ও দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয়। আর আল্লাহওয়ালারা সব অবস্থা দেখেও বলেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ। সাহাবায়ে কেরামকে এটাই শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, আমাদেরকেও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যেন সর্বাবস্থায় আমরা বলি, الْحَمْدُ لِلَّهِ।
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ
এটা কেবল মুখের কথা নয়; এই الْحَمْدُ لِلَّهِ বলার অর্থ হলো প্রতিটি অবস্থার মধ্যকার ভালো দিক খুঁজে বের করা। আল্লাহ যা দিয়েছেন, তার পিছনে অনেক বড় নিয়ামত লুকিয়ে আছে। কখনো আমরা তা দেখতে পাই, কখনো দেখি না। দুনিয়ার মানুষ কখনো সঠিক দেখে, কখনো ভুল দেখে। অনেক সময় নিয়ামতের মধ্যে মুসিবত দেখে, আবার মুসিবতের মধ্যে নিয়ামত দেখে।
আসলে যা নিয়ামত, তারা তা মুসিবত ভাবে। আর যা আসলে মুসিবত, তারা তাকে নিয়ামত মনে করে। উল্টোভাবে দেখলে সবকিছুর চলাও উল্টো হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা কারও জন্য খারাপ অবস্থা সৃষ্টি করেন না। মানুষের বোঝা ও কর্মই উল্টো। কেউ কেবল খারাপ অবস্থায় পড়ার কারণে জাহান্নামে যাবে না। যে জাহান্নামে যাবে, সে যাবে তার অবস্থার উপযুক্ত আমল না করার কারণে। আর যে জান্নাতে যাবে, সে যাবে তার অবস্থার উপযুক্ত আমল করার কারণেই।
ফজরের ওয়াক্ত হলো—সেই সময় দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেওয়া। এটাই সেই সময়ের উপযুক্ত আমল এবং এটাই তার শোকর। যে তা করল, সে ভোরবেলার ফায়দা নিল। যে মাগরিবের নামাজ পড়ল, সে সন্ধ্যার ফায়দা নিল। যে অভাবগ্রস্ত হলো, অভাবের মধ্যে যা করণীয় তা যদি করে, তবে সে সেই অবস্থার ফায়দা পাবে। দেখা যাবে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু সে আসল ফায়দাগুলোই পাচ্ছে।
তারপর যদি প্রাচুর্য আসে, প্রাচুর্য নিজে থেকেই লাভের বস্তু নয়। এর করণীয় কাজ করতে পারলেই তা লাভদায়ক, নতুবা ক্ষতির কারণ।
অভাবের সময় যা করণীয় তা করতে পারলে লাভবান হওয়া যাবে, না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রাচুর্যের সময় যা করণীয় তা করলে লাভবান হবে, না করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রোগে পড়া, আবার স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়া—রোগও খারাপ নয়, আবার ভালোও নয়; স্বাস্থ্যও খারাপ নয়, আবার ভালোও নয়। অনেক রোগী জান্নাতে যাবে, আবার অনেক রোগী জাহান্নামেও যাবে। অনেক স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি জান্নাতে যাবে, আবার অনেক স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি জাহান্নামেও যাবে।
স্বাস্থ্যই যদি মাপকাঠি হতো, তাহলে কেবল স্বাস্থ্যবানরাই জান্নাতে যেত; কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। জান্নাতে যাবে তারাই—যারা নিজের অবস্থাকে সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছে এবং সে অনুযায়ী আমল করতে পেরেছে।
রোগকে যে বুঝতে ও এর কদর করতে পেরেছে, তার জন্য রোগ বিশাল লাভের। স্বাস্থ্যকে যে বুঝতে ও কদর করতে পেরেছে, তার জন্য স্বাস্থ্যও বিরাট লাভের।
প্রত্যেক অবস্থায় الْحَمْدُ لِلَّهِ।
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ
"সর্বাবস্থায় আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা।"
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে প্রতিটি অবস্থা বুঝতে এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আর এটাই হলো শোকর, এটাই الْحَمْدُ لِلَّهِ। যে এটি করতে পারল, সে এখন থেকেই লাভবান হওয়া শুরু করে দিল।
একজন রোগী হাসপাতালে শয্যাশায়ী, খুব খারাপ অবস্থায়; কিন্তু তার নিজের কাছে যদি এই অবস্থা ভালো লাগে, তাহলে তার আত্মীয়-স্বজন কি আর অস্বস্তি বোধ করবে? তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, "কেমন আছ?" এবং সে দিল থেকে বলে الْحَمْدُ لِلَّهِ, তাহলে তার সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন সবাই স্বস্তি পাবে।
আরবদের মধ্যে প্রচলন ছিল—তারা কথা দিয়ে নিজেদের অবস্থা প্রকাশ করত। আমাদের দেশে প্রচলন হলো, আপনজন অসুস্থ হলে চুপ থাকা। কিন্তু আরবরা অকারণে কথা বলত না, তারা কথা দিয়েই অবস্থার ব্যাখ্যা দিত।
বেলাল (রা.)-এর ইন্তেকালের সময় তাঁর পরিবারের লোকজন—সম্ভবত তাঁর স্ত্রী—বলে উঠলেন, "হায় দুঃখ! হায় দুঃখ!" বেলাল (রা.) জবাব দিলেন, "কি আনন্দ! কি আনন্দ! আমি এখনই আমার প্রিয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সঙ্গী-সাথীদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি।"
তিনি মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন, অথচ বলছেন "কি আনন্দ!" কিছুক্ষণ পরে তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মৃত্যুর আগেও তিনি কবিতা ছাড়ছেন না! তিনি নিয়ামত দেখছেন। যদি নিয়ামত দেখতে পারেন, তাহলে মৃত্যুই বা কী, আর অন্য কিছুই বা কী? দুনিয়ার মানুষের জন্য মৃত্যুই হলো সবচেয়ে বড় মুসিবত। আর তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন।
আল্লাহ তাআলা মেহেরবানী করে আমাদেরকে দ্বীন দিয়েছেন, যেন আমরা আল্লাহকে চিনতে পারি। আল্লাহকে যদি চিনতে পারি, তাহলে আল্লাহ তাআলা যে অবস্থা দেন, সেই অবস্থাকেও চিনতে পারব। আর আল্লাহ তাআলা যা বলেন, তাও বুঝতে পারব। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফিক নসীব করুন।
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দ্বীনের খেদমত ও দাওয়াত
...
হযরতজী ইলিয়াস সাহেব রহ.-এর নির্বাচিত বাণীসমূহ
বর্তমান বিশ্বে জনসাধারণের মাঝে সহীহ দীনী মেহনতসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা কার্যকর, নিরাপদ ও ব্যাপক মেহন...
হাদীসের আলোকে মসজিদে ঘুমানোর শরয়ী বিধান
...
দা'য়ীর সাথে আল্লাহ তা'আলা আছেন
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর... আহলে ইলমের ওয়াদা রূহের জগতে আল্লাহ তা'আলা সাধারণ ল...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন