আন নিসা

সূরা নং: ৪, আয়াত নং: ১০৫

তাফসীর
اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ لِتَحۡکُمَ بَیۡنَ النَّاسِ بِمَاۤ اَرٰىکَ اللّٰہُ ؕ  وَلَا تَکُنۡ لِّلۡخَآئِنِیۡنَ خَصِیۡمًا ۙ

উচ্চারণ

ইন্না-আনঝালনাইলাইকাল কিতা-বা বিলহাক্কিলিতাহকুমা বাইনান্না-ছি বিমাআরা-কাল্লাহু ওয়ালা-তাকুল লিলখাইনীনা খাসীমা-।

অর্থ

মুফতী তাকী উসমানী

নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি সত্য-সম্বলিত কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আল্লাহ তোমাকে যে উপলব্ধি দিয়েছেন, সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে মীমাংসা করতে পার। আর তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষাবলম্বনকারী হয়ো না। ৭৭

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

৭৭. এ আয়াতসমূহ যদিও সাধারণ পথ-নির্দেশ সম্বলিত, কিন্তু নাযিল হয়েছে বিশেষ এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। বনু উবায়রিকের বিশর নামক এক ব্যক্তি, যে বাহ্যিকভাবে মুসলিম ছিল, হযরত রিফাআ নামক এক সাহাবীর ঘর থেকে কিছু খাদ্যশস্য ও হাতিয়ার চুরি করে নিয়ে যায়। আর নেওয়ার সময় সে এই চালাকি করে যে, খাদ্যশস্য যে বস্তায় ছিল তার মুখ কিছুটা আলগা করে রাখে। ফলে রাস্তায় অল্প-অল্প গম পড়তে থাকে। এভাবে যখন এক ইয়াহুদীর বাড়ির দরজায় পৌঁছায় তখন সে বস্তার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরে আবার চোরাই হাতিয়ারও সেই ইয়াহুদীর বাড়িতে রেখে আসে, অতঃপর যখন অনুসন্ধান করা হল, তখন একে তো ইয়াহুদীর বাড়ি পর্যন্ত খাদ্যশস্য পড়ে থাকতে দেখা গেল। দ্বিতীয়ত: হাতিয়ারও তার বাড়িতেই পাওয়া গেল। তাই প্রথম দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেয়াল এ দিকেই গেল যে, সেই ইয়াহুদীই চুরি করেছে। ইয়াহুদীকে জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, হাতিয়ার তো বিশর নামক এক ব্যক্তি আমার কাছে রেখে গেছে। কিন্তু সে যেহেতু এর সপক্ষে কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতে পারছিল না, তাই তাঁর ধারণা হল সে নিজের জান বাঁচানোর জন্যই বিশরের নাম নিচ্ছে। অপর দিকে বিশরের খান্দান বনু উবায়রিকের লোকজনও বিশরের পক্ষাবলম্বন করল এবং তারা জোর দিয়ে বলল, বিশরের নয়; বরং ওই ইয়াহুদীরই শাস্তি হওয়া উচিত। এ পরিস্থিতিতেই এ আয়াত নাযিল হয় এবং এর মাধ্যমে বিশরের ধোঁকাবাজীর মুখোশ খুলে দেওয়া হয়। আর ইয়াহুদীকে সম্পূর্ণ নিরপরাধ সাব্যস্ত করা হয়। বিশর যখন জানতে পারল গোমর ফাঁস হয়ে গেছে, তখন সে পালিয়ে মক্কায় চলে গেল এবং কাফিরদের সাথে মিলিত হল। সেখানেই কাফেররূপে অত্যন্ত ঘৃণিত অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। এ আয়াতসমূহের দ্বারা এক দিকে তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা উন্মোচন করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমায় ফায়সালা দানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বাতলে দেওয়া হয়। প্রথম মূলনীতি হল, যে-কোনও ফায়সালা আল্লাহ তাআলার কিতাবে প্রদত্ত বিধানাবলীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। দ্বিতীয় মূলনীতি এই যে, আল্লাহ তাআলা নিজ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিভিন্ন সময়ে এমন বহু বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কুরআন মাজীদে সরাসরি যার উল্লেখ নেই। ফায়সালা দানের সময় বিচারককে তা থেকেও আলো নিতে হবে। এরই প্রতি ইঙ্গিত করে আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যাতে আল্লাহ তোমাকে যে উপলব্ধি দিয়েছেন, সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে ফায়সালা করতে পার।’ এতদদ্বারা কুরআন মাজীদের বাইরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহও যে প্রামাণ্য মর্যাদা রাখে, তার প্রতিও ইশারা করা হয়েছে। তৃতীয় মূলনীতি এই বলা হয়েছে যে, মামলা-মোকদ্দমায় যে ব্যক্তি সম্পর্কেই জানা যাবে, সে ন্যায়ের উপরে নেই, তার পক্ষে অবস্থান নেওয়া ও তার উকিল হওয়া জায়েয নয়। বনু উবায়রিক বিশরের পক্ষে ওকালতি করলে তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, প্রথমত এ ওকালতিই জায়েয নয়। দ্বিতীয়তঃ অভিযুক্ত ব্যক্তি এর দ্বারা বড়জোর দুনিয়ার জীবনে উপকৃত হবে। আখিরাতে তোমাদের ওকালতি তাকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে পারবে না।