পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাসহ আল ওয়ালা ওয়াল বারা
প্রশ্নঃ ১৭২৯৮৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আল ওলা ওয়াল বারা কি..? পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা সহ জানিয়ে বাধিত করবেন
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
সংক্ষেপে, আল-ওয়ালা ওয়াল বারা বলতে বোঝায়—একজন মুসলমান কাকে ভালোবাসবে ও বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে এবং কার সঙ্গে দীন ও আকীদার ক্ষেত্রে সম্পর্কচ্ছেদ ও শত্রুতা পোষণ করবে—এ-সংক্রান্ত ইসলামী আকীদা।
একজন মুসলমান তাওহীদ ও ইখলাসের অনুসারীদের ভালোবাসবে এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে। অন্যদিকে, মুশরিকদের শিরক ও কুফরকে ঘৃণা করবে এবং তাদের বাতিল আকীদা থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করবে। এটি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর সাথীদের দীনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাঁদের অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সূরা মুমতাহিনাহ এর ০৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآَءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
অর্থ “তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সাথীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। যখন তাঁরা তাঁদের সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করো, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের আকীদা ও উপাস্যকে অস্বীকার করছি। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনা পর্যন্ত আমাদের ও তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশিত থাকবে।’”
সূরা মায়েদাহ এর ৫১ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ফরমান—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের নিজেদের অভিভাবক ও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে সঠিক পথ দেখান না।” (সূরা মায়েদা: ৫১)
এ আয়াতে বিশেষভাবে আহলে কিতাবদেরকে এ ধরনের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর সাধারণভাবে কাফেরদের সঙ্গে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنْ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيل
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তাদের প্রতি ভালোবাসার বার্তা পাঠাও, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে। তারা রাসুলকে এবং তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে, শুধু এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং আমার পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়ে থাকো, তাহলে কেন তোমরা গোপনে তাদের প্রতি ভালোবাসার বার্তা পাঠাও? তোমরা যা গোপন করো এবং যা প্রকাশ করো, সবই আমি জানি। তোমাদের মধ্যে যে এমন কাজ করবে, সে অবশ্যই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হবে।” (সূরা মুমতাহিনাহ: ১)
আল্লাহ তাআলা আরও জানিয়েছেন, কোনো ব্যক্তি কাফের হলেও যদি সে কারও নিকটাত্মীয় হয়, তবুও ঈমানের বিপরীতে কুফরকে প্রাধান্য দিলে তাকে এ ধরনের অভিভাবক ও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করা যাবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لاَ تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنْ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الإِيمَانِ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের পিতা ও ভাইদের অভিভাবক ও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমানের পরিবর্তে কুফরকে পছন্দ করে। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে এভাবে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, তারাই জালিম।” (সূরা তাওবা: ২৩)
সূরা মুজাদালাহ: ২২ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
لاَ تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ
অর্থ: “যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, তাদেরকে তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব করতে দেখবে না; যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই কিংবা আত্মীয়স্বজন হয়।” (সূরা মুজাদালাহ: ২২)
মুমিনদের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব
শায়েখ ড. সালিহ ইবনে ফাওযান আল-ফাওযান বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যেমন ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসের শত্রু কাফেরদেরকে অভিভাবক ও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন, তেমনি মুমিনদেরকে অভিভাবক ও বন্ধুরূপে গ্রহণ করা এবং তাদের ভালোবাসা ওয়াজিব করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ * وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের অভিভাবক হলেন আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং মুমিনগণ—যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং বিনীত থাকে। আর যারা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দলভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহর দলই বিজয়ী।” (সূরা মায়েদা: ৫৫-৫৬)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
অর্থ: “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। আর যারা তাঁর সঙ্গে আছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়াশীল।” (সূরা ফাতহ: ২৯)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
অর্থ: “মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো।” (সূরা হুজুরাত: ১০)
অতএব, মুমিনরা পরস্পর দীন ও আকীদার ভিত্তিতে ভাই। তাদের বংশ, দেশ কিংবা সময়ের মধ্যে যত দূরত্বই থাকুক না কেন, ঈমানের সম্পর্ক তাদেরকে এক বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
অর্থ: “আর যারা তাঁদের পরে এসেছে, তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই ভাইদেরকে ক্ষমা করুন, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছেন। আর মুমিনদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি অতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।’” (সূরা হাশর: ১০)
সুতরাং সৃষ্টির সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত সব মুমিন পরস্পর ভাই এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের জন্মভূমি ও সময়ের মধ্যে যত ব্যবধানই থাকুক না কেন, পরবর্তী প্রজন্ম পূর্ববর্তী মুমিনদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা একে অপরের জন্য দোয়া করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
বন্ধুত্ব ও শত্রুতার বাহ্যিক প্রকাশ
মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতার কিছু বাহ্যিক প্রকাশ রয়েছে। মানুষের কথা, আচরণ ও কাজের মাধ্যমে এসব সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এসব বাহ্যিক রূপ থেকেই বোঝা যায়, কেউ কারও প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করছে, নাকি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করছে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন