তালিবে ইলমের মর্যাদা ও দৈনন্দিন আমলের রুটিন
প্রশ্নঃ ১৭০৩৯০. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মুহতারাম,একজন তালিবুল ইলম এর আমলের রুটিন কেমন হওয়া উচিৎ, এবং তালিবুল ইলম এর মর্যাদা কী,জানালে উপকৃত হব
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
দ্বীনি ইলম অন্বেষণ
করা একজন মুমিনের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব। তালিবুল
ইলমের মর্যাদা ইসলামে অত্যন্ত সুউচ্চ এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন ও আমল একটি সুশৃঙ্খল
রুটিনে পরিচালিত হওয়া আবশ্যক।
ইলম অর্জনের পথ
জান্নাতের পথ। আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল ﷺ ইলম
অর্জনকারীদের বিশেষ সম্মান দান করেছেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
﴿يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ﴾
অর্থ: “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে,
আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নীত
করবেন।” (সূরা আল-মুজাদালাহ: ১১)
আবু দারদা (রাযি.) ও
আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«من سلك طريقا يلتمس فيه علما سهل الله له به طريقا إلى الجنة»
অর্থ: “যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের
জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«وإن الملائكة لتضع أجنحتها لطالب العلم رضا بما يصنع»
অর্থ: “নিশ্চয়ই ফেরেশতারা তালিবুল ইলমের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার সম্মানে নিজেদের ডানা
বিছিয়ে দেয়।”
নবী কারীম ﷺ বলেছেন,
একজন ইলম অন্বেষণকারী ও আলিমের জন্য
আসমান-জমিনের সমস্ত সৃষ্টি, এমনকি পানির নিচের মাছ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«وإن العلماء ورثة الأنبياء، إن الأنبياء لم يورثوا دينارا ولا درهما، إنما ورثوا العلم فمن أخذه أخذ بحظ وافر»
অর্থ: “নিশ্চয়ই আলিমগণ নবীগণের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ কোনো দিনার বা দিরহামের
(অর্থ-সম্পদের) উত্তরাধিকার রেখে যাননি; বরং তাঁরা রেখে গেছেন কেবল ইলমের উত্তরাধিকার। অতএব যে
ব্যক্তি তা গ্রহণ করল, সে এক মহা সম্পদ লাভ করল।”
একজন তালিবুল ইলমের
আদর্শ আমলি রুটিন
একজন তালিবুল ইলমের
সার্বিক সফলতা নির্ভর করে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ইলমের সাথে আমলের সমন্বয়ের
ওপর। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে কেন্দ্র করে তার দৈনিক রুটিন সাজানো যেতে পারে।
- ফজরের আযানের কিছুক্ষণ পূর্বে উঠে
তাহাজ্জুদ আদায় করা ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল
(রহ.) বলেছিলেন:
عجبت لطالب علم لا يكون له ورد في الليل
অর্থ: “আমি এমন তালিবুল ইলমকে দেখে বিস্মিত হই, যার রাতে তাহাজ্জুদের কোনো নির্দিষ্ট আমল নেই!”
- সাহরির সময়ে গভীর ধ্যানে ইস্তিগফার
পাঠ ও ইলমে বরকতের দোয়া করা। - মসজিদে গিয়ে প্রথম তাকবীরের সাথে
ফজরের সালাত আদায় এবং সালাতের পরের মাসনূন তাসবিহাত ও সকালের আযকার শেষ করা। - এ সময়ে মস্তিষ্ক সবচেয়ে সতেজ থাকে, তাই কুরআনের নতুন
হিফজ, তিলাওয়াত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মতনের হিফজ করা। - সূর্যোদয়ের ১০-১৫ মিনিট পর দুই বা
চার রাকাত সালাতুল ইশরাক আদায় করা। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) ফজর
থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকিরে বসতেন এবং বলতেন:
هذه غدوتي، ولو لم أتغد هذا الغداء سقطت قوتي
অর্থ: “এটি আমার সকালের আত্মিক খাদ্য; এই খাদ্য গ্রহণ না করলে আমার আত্মিক শক্তি লোপ পেত।”
- মাদরাসার দরস বা উস্তাদের হালকায়
গভীর মনোযোগ সহকারে অংশগ্রহণ করা। - দরস শেষে দরসের বিষয়গুলো সহপাঠীদের
সাথে মুযাকারা করা। - জামাতের সাথে যোহরের সালাত ও
সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ আদায় করা। - খাবার গ্রহণের পর ২০-৩০ মিনিট ‘কায়লুলাহ’ নেওয়া, যা রাতের ইবাদত ও সারাদিনের পাঠে শক্তি যোগায়।
- আসরের সালাতের পর সন্ধ্যার মাসনূন
আযকার আদায় করা। - হাদিসের কিতাব, সীরাত বা সাধারণ
ইসলামী সাহিত্যের গভীর মুতালাআ করা। - কিছু সময় শারীরিক সুস্থতার জন্য
হালকা হাঁটাচলা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করা। - মাগরিবের পর ক্লাসের পড়া মুখস্থ এবং
আগামী দিনের দরসের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করা। - জামাতে ইশার সালাত ও সুন্নাত আদায়
করা। - অনর্থক আড্ডা পরিহার করে দ্রুত
বিছানায় যাওয়া। সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে শয়ন করা ও ঘুমের দোয়াসমূহ পাঠ করা।
তালিবুল ইলমের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ নসিহত
- পার্থিব খ্যাতি বা বাহবার উদ্দেশ্যে
নয়; বরং আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে ইলম শিখতে হবে । - যে পরিমাণ ইলম শেখা হবে, তা নিজের জীবনে
বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। - এক মুহূর্ত সময়ও অনর্থক নষ্ট না করা।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ও ইবন আকিল (রহ.)-এর মতো মনিষীগণ সময়কে সর্বোচ্চ
গুরুত্ব দিয়েছেন। - ইমাম আশ-শাফিয়ী (রহ.) বলেছেন:
لا يطلب أحد هذا العلم بالملك وعز النفس فيفلح، ولكن من طلبه بذل النفس وضيق العيش وخدمة العلماء أفلح
অর্থ: “কোনো ব্যক্তি অহংকার ও আত্মমর্যাদার বড়াই নিয়ে ইলম অন্বেষণ করে সফল হতে পারে না;
বরং যে ব্যক্তি বিনয়,
সাধারণ জীবনযাপন এবং আলিমদের খেদমতের
মাধ্যমে ইলম অনুসন্ধান করে, সে-ই সফলকাম হয়।”
আল্লাহ তায়ালাকে
প্রত্যেক তালিবুল ইলমকে কবুল করেন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
খতীব, বাইতুল মামুর জামে মসজিদ, মিরাশপাড়া গাজীপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন