সেলায়ে রেহমীতে (আত্মীয়তার সম্পর্ক) কারা কারা অন্তর্ভুক্ত?
প্রশ্নঃ ১৬৯০৪৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমরা জানি যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না , এখন আত্মীয় বলতে কাদের কে বোঝানো হয়েছে, সেই সম্পর্কের ভিতরে কে কে অন্তর্ভুক্ত, আত্মীয় তো অনেক বড় এক সার্কেল কোন আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না সেটা একটু পরিষ্কারভাবে জানতে চাচ্ছি
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কুরআন-হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই মূলনীতি হলো, সকল আত্মীয়ের সঙ্গেই আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে আত্মীয়তার নৈকট্য ও দূরত্বের ভিত্তিতে তাদের অধিকারের ক্ষেত্রে কম-বেশি পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ, যে আত্মীয় যত বেশি নিকটবর্তী, তার হক তত বেশি এবং সে তত বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।
আত্মীয়তার পরিধির মধ্যে মানুষের উসূল ও ফুরূ‘সহ নিকট ও দূর—সকল নসবী আত্মীয় অন্তর্ভুক্ত।
উসূল বলতে ওপরের দিকের বংশীয় আত্মীয়দের বোঝায়। যেমন—মা-বাবা এবং তাদের ওপরের দিকের পিতা-মাতা অর্থাৎ দাদা-দাদি, নানা-নানি ইত্যাদি।
আর ফুরূ‘ বলতে নিচের দিকের বংশীয় আত্মীয়দের বোঝায়। যেমন—ছেলে-মেয়ে এবং তাদের পরবর্তী বংশধর অর্থাৎ নাতি-নাতনি ও তাদের সন্তানাদি।
এছাড়াও ভাই-বোন, তাদের সন্তান-সন্ততি, বাবা-মায়ের ভাই-বোন অর্থাৎ চাচা, ফুফু, মামা, খালা এবং তাদের সন্তান-সন্ততিসহ অন্যান্য নিকট ও দূর নসবী আত্মীয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচা-মামা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং পিতা-মাতা উভয় দিকের নিকট ও দূর আত্মীয়দের সঙ্গেই সাধ্যানুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
তবে সবার অধিকার এক পর্যায়ের নয়। যেমন বাবা-মায়ের হক দূরবর্তী আত্মীয়ের তুলনায় বেশি। একইভাবে নিকট আত্মীয়ের হক দূরবর্তী আত্মীয়ের চেয়ে বেশি। সুতরাং আত্মীয় যত নিকট হবে, তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ও তার প্রতি সদাচরণ করা তত বেশি গুরুত্বের বিষয়।
আরেকটি বিষয় হলো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মুসলিমের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখা বৈধ নয়। কোনো মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত রাগ, অভিমান বা পার্থিব কারণে তিন দিনের বেশি কথাবার্তা বন্ধ রাখা নিষিদ্ধ। তাই কারও সঙ্গে কোনো কারণে মনোমালিন্য হলে তিন দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই সালাম, দোয়া ও খোঁজখবরের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা উচিত। যে ব্যক্তি আগে সালাম দিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়, হাদিসে তাকেই উত্তম বলা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব পরিস্থিতিতেই আত্মীয়ের সঙ্গে মেলামেশা করতেই হবে। যদি কোনো আত্মীয় প্রকাশ্যে ফাসেকি, গুনাহ বা বিদআতে লিপ্ত থাকে এবং তাকে সংশোধন করার উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে সম্পর্ক সীমিত বা বিচ্ছিন্ন করা হয়, যাতে সে নিজের ভুল থেকে ফিরে আসে—তাহলে প্রয়োজন ও কল্যাণ বিবেচনায় তা বৈধ।
একইভাবে কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কারণে যদি নিজের দ্বীন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে অথবা দুনিয়াবি কোনো গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য তার থেকে দূরে থাকা বৈধ। কারণ এমন অবস্থায় সম্পর্ক বজায় রাখার চেয়ে নিজের দ্বীন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং মূলনীতি হলো—আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না; বরং সকল নসবী আত্মীয়ের সঙ্গে সাধ্যানুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে আত্মীয়তার নৈকট্য অনুযায়ী হকের অগ্রাধিকার নির্ধারিত হবে। আর কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে যদি দ্বীন বা দুনিয়ার মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, অথবা তাকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে সম্পর্ক সীমিত করা প্রয়োজন হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী দূরত্ব অবলম্বন করার অবকাশ রয়েছে। তাও হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য।
দলিল:
عن يحيى بن أبي كثير، عن أبي سلمة، عن أبي هريرة رضي الله عنه، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «ثلاث من كن فيه حاسبه الله حسابا يسيرا وأدخله الجنة برحمته» قالوا: لمن يا رسول الله؟ قال: «تعطي من حرمك، وتعفو عمن ظلمك، وتصل من قطعك» قال: فإذا فعلت ذلك، فما لي يا رسول الله؟ قال: «أن تحاسب حسابا يسيرا ويدخلك الله الجنة برحمته» هذا حديث صحيح الإسناد ولم يخرجاه.
(المستدرك على الصحيحين للحاكم، ج: 3، ص: 563، رقم الحديث: 3912، ط: دار الكتب العلمية - بيروت)
عن أبي أيوب الأنصاري - رضي الله عنه - قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «ولا يحل للرجل أن يهجر أخاه فوق ثلاث ليال يلتقيان فيعرض هذا ويعرض هذا، وخيرهما الذي يبدأ بالسلام». متفق عليه.
قال الخطابي: رخص للمسلم أن يغضب على أخيه ثلاث ليال لقلته، ولا يجوز فوقها إلا إذا كان الهجران في حق من حقوق الله تعالى، فيجوز فوق ذلك. وفي حاشية السيوطي على الموطأ، قال ابن عبد البر: هذا مخصوص بحديث كعب بن مالك ورفيقيه، حيث أمر صلى الله عليه وسلم أصحابه بهجرهم، يعني زيادة على ثلاث إلى أن بلغ خمسين يوما. قال: وأجمع العلماء على أن من خاف من مكالمة أحد وصلته ما يفسد عليه دينه أو يدخل مضرة في دنياه يجوز له مجانبته وبعده، ورب صرم جميل خير من مخالطة تؤذيه. وفي النهاية: يريد به الهجر ضد الوصل، يعني فيما يكون بين المسلمين من عتب وموجدة، أو تقصير يقع في حقوق العشرة والصحبة دون ما كان من ذلك في جانب الدين، فإن هجرة أهل الأهواء والبدع واجبة على مر الأوقات ما لم يظهر منه التوبة والرجوع إلى الحق.
(مرقاة المفاتيح، 8/3146، كتاب الآداب، باب ما ينهى عنه من التهاجر والتقاطع واتباع العورات، الفصل الأول، ط: دار الفكر)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন