গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও পরিত্রাণের উপায়
প্রশ্নঃ ১৬৮৮২৭. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, যাকাত ও সদকায়ে ফেতরের মধ্যে পার্থক্য ভাই,/ভায়েরা আমি একটা গুনাহের ভিতরে লিপ্ত আছি।আপনি বা আপনারা এমন কোন উপদেশ দেন যে উপদেশের মাধ্যমে এই গুনাহের কাছ থেকে ফিরে যেতে পারি
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাউফল
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশ্নের শুরুতে যাকাত ও সদকায়ে ফেতরের পার্থক্য এবং পরবর্তী অংশে গুনাহ থেকে পরিত্রাণের উপায়- দুটি ভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভবত প্রথম অংশটি ভুলবশত লেখা হয়েছে। তাই আমরা এখানে প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায় সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছি। আর যাকাত ও সদকায়ে ফেতরের পার্থক্য জানতে চাইলে অনুগ্রহ করে বিষয়টি আলাদাভাবে ও স্পষ্ট করে প্রশ্ন করুন।
ভাই, আপনি যে নিজের গুনাহকে গুনাহ হিসেবে উপলব্ধি করছেন এবং তা থেকে ফিরে আসতে চাইছেন- এটাই আল্লাহর বড় নিয়ামত। গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য শুধু ইচ্ছা করাই যথেষ্ট নয়; গুনাহের কারণ ও পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রেখে ঈমানি পরিবেশ ও নেক আমলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে হবে। তাই-
১. গুনাহকে ছোট মনে করবেন না।
মুমিন তার গুনাহকে অত্যন্ত ভয় করে। ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন-
إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدٌ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ، وَإِنَّ الْفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ
“মুমিন তার গুনাহকে এমন মনে করে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় করছে- তা তার ওপর পড়ে যেতে পারে। আর ফাসেক-ফাজেরের কাছে গুনাহ যেন নাকের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সামান্য মাছির মত।” -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৮
২. আন্তরিকভাবে তাওবা করুন।
গুনাহ ছেড়ে দিন, অনুতপ্ত হন এবং পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করুন। আল্লাহ বলেন-
وَ الَّذِیْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْۤا اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوْبِهِمْ وَ مَنْ یَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللهُ، وَ لَمْ یُصِرُّوْا عَلٰی مَا فَعَلُوْا وَ هُمْ یَعْلَمُوْنَ.
এবং তারা সেই সকল লোক, যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা (অন্য কোনোভাবে) নিজেদের প্রতি যুলুম করলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার ফলশ্রুতিতে নিজেদের গোনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কেই বা আছে, যে গোনাহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা জেনেশুনে তাদের কৃতকর্মে অবিচল থাকে না। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৫
আর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
“গুনাহ থেকে তাওবাকারী এমন, যেন সে কোনো গুনাহই করেনি।”
৩. গুনাহের কারণ ও পরিবেশ থেকে দূরে থাকুন।
যে ব্যক্তি, স্থান, বন্ধুত্ব, অ্যাপ, ওয়েবসাইট-স্যোসাল মিডিয়া বা পরিস্থিতি আপনাকে গুনাহের দিকে টেনে নেয়, তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিন। যে কোনো মূল্যে হোক এসব থেকে বিরত থাকুন।
৪. সৎসঙ্গ গ্রহণ করুন।
নেককার, আল্লাহভীরু ও দ্বীনদার মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করুন। ভালো সঙ্গ ঈমান ও আমল বৃদ্ধিতে সাহায্য করে; আর খারাপ সঙ্গ গুনাহের প্রতি সাহসী করে তোলে।
৫. আল্লাহর নজরদারির কথা স্মরণ করুন।
মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন- এই অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রাখুন। বিশেষত একাকী অবস্থায় নিজেকে প্রশ্ন করুন, “মানুষ না দেখলেও আমার রব তো আমাকে দেখছেন।”
৬. নামাজ ও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করুন।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করুন এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করুন। আল্লাহ বলেন-
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ
“নিশ্চয়ই নেক আমলসমূহ গুনাহসমূহকে দূর করে দেয়।” -সূরা হূদ: ১১৪
৭. অবসর সময় কমিয়ে নেক কাজে ব্যস্ত থাকুন।
খালি সময়কে কুরআন, যিকির, ইলম, পরিবার ও উপকারী কাজে লাগান। কখনও বেকার বসে থাকবেন না। অন্যথায় শয়তান কুপ্ররোচনা দিতে সুযোগ পাবে। গুনাহের পর কোনো নেক আমল করার ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا
“মন্দ কাজের পর ভালো কাজ করো; তা মন্দ কাজকে মুছে দেবে।” -জামে তিরমিজি হাদীস ১৯৮৭
৮. বারবার গুনাহ হয়ে গেলেও হতাশ হবেন না।
পড়ে গেলে আবার উঠে দাঁড়ান এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ দিন-রাত তাওবার সুযোগ দেন। তাই শয়তানের প্ররোচনায় কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।
৯. আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
বেশি বেশি এই দোয়া করুন-
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
“হে আল্লাহ! আপনার যিকর, আপনার শুকরিয়া এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন।”
মনে রাখবেন, গুনাহ থেকে বাঁচা একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম। তাই শুধু গুনাহ ছাড়ার সংকল্প নয়; বরং গুনাহের পথ বন্ধ করা, সৎসঙ্গ গ্রহণ, নামাজ-কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং বারবার তাওবা করা- এই বিষয়গুলো একসঙ্গে অবলম্বন করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে গুনাহ থেকে হেফাজত করুন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা
খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১