তাকদির মানুষের চেষ্টার সাথে কীভাবে কাজ করে
প্রশ্নঃ ১৬৮৫৩৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আকিদা ও বিশ্বাস: তাকদির বা ভাগ্যের সাথে মানুষের চেষ্টার সম্পর্ক আসলে কীভাবে কাজ করে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক ও স্পর্শকাতর বিষয় হলো তাকদির। বহু মানুষ তাকদির ও মানুষের চেষ্টার সম্পর্ক বুঝতে ভুল করে বিভ্রান্তির শিকার হয়।
কুরআন, সহিহ হাদিস এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদার আলোকে তাকদির এবং মানুষের চেষ্টার সম্পর্কটি কীভাবে কাজ করে, তা বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো,
১. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মূলনীতি
তাকদিরের ক্ষেত্রে ইতিহাসে দুটি বিভ্রান্ত দল তৈরি হয়েছিল।
১. জাবারিয়া (الجبرية): তারা মনে করত, মানুষ পুতুলের মতো, মানুষের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা বা চেষ্টা নেই। (এটি একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস)।
২. কাদারিয়া (القدرية): তারা দাবি করত, ভাগ্যে আগে থেকে কিছুই লেখা নেই; মানুষ নিজেই নিজের সব কাজের একক স্রষ্টা। (এটিও পথভ্রষ্টতা)।
সঠিক আকিদা (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত):
মানুষ সম্পূর্ণ বাধ্যও নয়, আবার লাগামহীন স্বাধীনও নয়। আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা করার ক্ষমতা ও চেষ্টা করার সামর্থ্য (কসব/ইখতিয়ার) দিয়েছেন; আর এই চেষ্টার ভিত্তিতেই মানুষ পরকালে প্রতিদান বা শাস্তি পাবে। তবে মানুষের সকল চেষ্টা আল্লাহর সার্বিক ক্ষমতা ও তাকদিরের অধীনে পরিচালিত হয়।
২. তাকদির ও চেষ্টার সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে?
অনেকে মনে করেন, ভাগ্যে যা লেখা আছে তা-ই তো হবে, তাহলে চেষ্টা করে কী লাভ? এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ,
ক. তাকদির হলো আল্লাহর ‘অনন্ত পূর্বজ্ঞান’:
আল্লাহ তাআলা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঊর্ধ্বে। মানুষ ভবিষ্যতে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় কোন পথ বেছে নেবে, কী চেষ্টা করবে এবং কী সিদ্ধান্ত নেবে—আল্লাহ তাআলা তাঁর অনন্ত ও নিখুঁত জ্ঞান দ্বারা সৃষ্টির পূর্বেই জানতেন। আল্লাহ আগে লিখে রেখেছেন বলেই আপনি বাধ্য হয়ে তা করছেন এমন নয়; বরং আপনি নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় কী করবেন, আল্লাহ তা আগে থেকেই জানতেন বলেই তা লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।
একটি সহজ উপমা: একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক যদি ক্লাসের একটি ছাত্রের নিয়মিত অবহেলা দেখে পরীক্ষার আগেই খাতায় লিখে রাখেন যে—এই ছাত্রটি ফেল করবে, আর ছাত্রটি সত্যিই পরীক্ষায় ফেল করল। এখন ছাত্রটি কি বলতে পারবে যে, শিক্ষক লিখে রেখেছিলেন বলেই আমি ফেল করেছি? কখনোই না! সে ফেল করেছে নিজের পড়াশোনা না করার কারণে। আল্লাহ তাআলার জ্ঞান শিক্ষকের চেয়েও কোটি কোটি গুণ নিখুঁত ও সার্বভৌম।
খ. মাধ্যম ও পরিণতি, উভয়ই তাকদিরের অংশ:
আল্লাহ কেবল মানুষের গন্তব্যই লিখে রাখেননি, বরং সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম ও চেষ্টাকেও তাকদিরে নির্ধারণ করে রেখেছেন।
যেমন: কারো ভাগ্যে যদি কোটিপতি হওয়া লেখা থাকে, তার অর্থ এই নয় যে ঘরে বসে থাকলে আসমান থেকে টাকা পড়বে; বরং তার ভাগ্যে এটাও লেখা রয়েছে যে সে পরিশ্রম করবে, বুদ্ধি খাটাবে এবং আল্লাহ তার মাধ্যমে তাকে রিজিক দেবেন।
৩. কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা মানুষের কর্ম ও চেষ্টার গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
১. মানুষ তার চেষ্টার বাইরে কিছু পায় না:
﴿وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ﴾
আর মানুষ তা-ই পায়, যা সে চেষ্টা করে। (সূরা আন-নাজম: ৩৯)।
২. চেষ্টা না করলে অবস্থা পরিবর্তন হয় না:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সূরা আর-রাদ: ১১)
৩. মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার স্বীকৃতি:
﴿فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ﴾
অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক, আর যার ইচ্ছা সে কুফরি করুক। (সূরা আল-কাহফ: ২৯)
৪. সহিহ হাদিসের আলোকে তাকদির ও চেষ্টা
ক. আমরা কি চেষ্টা ছেড়ে বসে থাকব? রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঐতিহাসিক জবাব:
হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদিন বললেন, তোমাদের প্রত্যেকেরই জান্নাত বা জাহান্নামের স্থান নির্ধারিত রয়েছে।
উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম তখন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে কি আমরা আমাদের লিখিত ভাগ্যের ওপর ভরসা করে আমল/চেষ্টা ছেড়ে দেব না?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
«اعْمَلُوا فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ»
না, বরং তোমরা তোমাদের আমল ও চেষ্টা অব্যাহত রাখো! কারণ যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই পথটি সহজ করে দেওয়া হবে।
এরপর নবীজি (ﷺ) সূরা আল-লাইলের আয়াত তেলাওয়াত করলেন, যে ব্যক্তি দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ভালো বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করে, আমি তার জন্য সহজ পথ (কল্যাণ) সুগম করে দিই। (সহিহ বুখারি: ৪৯৪৭; সহিহ মুসলিম: ২৬৪৭)
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/4588
খ. উট বেঁধে রাখা বনাম তাওয়াক্কুল:
এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি উটের রশি না বেঁধে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি বেঁধে রেখে ভরসা করব?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
«اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ»
আগে উটের রশিটি শক্ত করে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো। (জামে তিরমিযী: ২৫১৭)
অর্থাৎ—মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা (রশি বাঁধা) করা, আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর তাকদিরের ওপর নির্ভর করা।
গ. এক তাকদির থেকে অন্য তাকদিরে যাওয়া (হযরত উমর রা.-এর ফয়সালা):
সিরিয়ায় যখন ভয়াবহ প্লেগ মহামারী ছড়িয়ে পড়ল, তখন খলিফা হযরত উমর (রা.) সেখানে প্রবেশ না করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রধান সেনাপতি হযরত আবু উবাইদাহ (রা.) তাঁকে বললেন, আপনি কি আল্লাহর তাকদির থেকে পালাচ্ছেন?
হযরত উমর (রা.) যুগান্তকারী উত্তর দিয়েছিলেন,
«نَفِرُّ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ إِلَى قَدَرِ اللَّهِ»
হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আল্লাহর অপর তাকদিরের দিকেই ফিরে যাচ্ছি। (সহিহ বুখারি: ৫৭২৯; সহিহ মুসলিম: ২২১৯)।
(অর্থাৎ রোগাক্রান্ত অঞ্চলে যাওয়া যেমন এক তাকদির, সতর্কতা অবলম্বন করে রক্ষা পাওয়াও আল্লাহরই আরেক তাকদির)।
৫. বাস্তব জীবনে তাকদির ও চেষ্টার ভারসাম্য রাখার নিয়ম:
একজন প্রকৃত মুমিন তাকদিরকে জীবনে যেভাবে কাজে লাগায়:
কোনো কাজ শুরু করার আগে: মনে করতে হবে ফলাফল আমার চেষ্টার ওপর নির্ভর করে; তাই নিজের শতভাগ শ্রম, বুদ্ধি ও সাধনা ব্যয় করতে হবে। (যেমন: ব্যবসার জন্য পরিশ্রম করা, রোগ হলে ওষুধ খাওয়া, পরীক্ষার জন্য পড়ালেখা করা)।
কাজ শেষ হওয়ার পর (ফলাফলের সময়): নিজের মনমতো ফলাফল না এলে বা কোনো বিপদে পড়লে হতাশ না হয়ে তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে এবং বলতে হবে: «قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ» — আল্লাহ যা তাকদিরে রেখেছিলেন এবং যা চেয়েছেন, তা-ই হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)
হাদীসের লিংক:https://muslimbangla.com/hadith/13581
এতে মানুষের হৃদয় সব ধরনের মানসিক দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্ত থাকে।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর ঢাকা
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন