অহংবোধ না থাকলে কি টাখনুর নিচে কাপড় পরা জয়েজ?
প্রশ্নঃ ১৫৯৭৬১. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, টাখনুর উপরে কাপড় পরার ব্যাপারে শরীয়তের সর্বসম্মত অবস্থান কি? বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরাম তো বলে থাকেন সর্ব অবস্থায় পড়া হারাম টাখনুর নিচে। আবার সাধারণ মানুষকেও কেউ বলে এটা নাকি শুধুমাত্র নামাজের সময়ের জন্য উপরে উঠিয়ে পড়তে হয় বা উপরে পড়তে হয়। এবং আমি চ্যাট জিপিটির মাধ্যমে জানলাম যদিও এটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তারপরেও এটা থেকে জানলাম যে তুরস্কের ওলামায়ে কেরাম নাকি বলেন কেউ কেউ বা অনেকে যে অহংকার এর উদ্দেশ্য না থাকলে এটা পড়া মাকরূহ কিন্তু হারাম নয়। এবং তারাও এই বিষয়ে হাদিস থেকে দলিল দেন। তাহলে আমাদের বাংলাদেশে তো এটা আমরা যেভাবে দেখতে পাই যে একেবারে অকট্যভাবে প্রমাণিত মত বিষয়। কিন্তু এটা কি ইজতিহাদী বিষয় আসলে? অন্য দেশের ওলামায়ে কেরাম ভিন্ন কেন বলেন? যদিও ইসলাম তো দেশের উপর নির্ভর করে না কিন্তু দেশ ভেদে এরকম মতভেদ কেন থাকবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
টাখনুর ওপরে কাপড় পড়া শুধু সুন্নাতই নয় বরং প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক। টাখনুর নিচে কাপড় পড়া হারাম। হাদিস শরিফ রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَا أَسْفَلَ مِنَ الكَعْبَيْنِ مِنَ الإِزَارِ فَفِي النَّارِ»
আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী (ﷺ) বলেছেনঃ ইযারের (লুঙ্গি) যে পরিমাণ টাখনুর নীচে যাবে, সে পরিমাণ জাহান্নামে যাবে।
সহীহ বুখারী, হাদীস নংঃ ৫৩৭১, আন্তর্জাতিক নং: ৫৭৮৭।
হাদিসে পুরুষের জন্য নামাজের ভেতরে বাইরে সর্বাবস্থায় কাপড় টাখনুর নিচে পরিধান করা কবিরা গুনাহ বলে উল্লেখ রয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুবলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'য়ালা তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথা তো বলবেনই না বরং তাদের দিকে তাকিয়েও দেখবেন না। এমনকি তিনি তাদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র করবেন না বরং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কারা? তবে এরা তো ধ্বংস, তাদের বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা তিনবার বলেছেন।
তারা হলো-
(ক.) যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরে।
(খ.) যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম খেয়ে ব্যাবসার পণ্য বিক্রি করে।
(গ.) যে ব্যক্তি কারো উপকার করে আবার খোটা দেয়।
- মুসলিম শরীফ, তিরমিজী, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করে হজরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, লুঙ্গির যে অংশ টাখনুর নিচে থাকবে তা আগুনে প্রজ্জ্বলিত হবে। বুখারী শরীফ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পুরুষের শরীরের যে কোনো পোশাক টাখনুর নিচে ঝুলে পড়া হারাম। পোশাক যদি টাখনুর নিচে ঝুলে যায়, তাহলে টাখনুর নিচের ওই অংশকে জাহান্নামের অংশ বলে ধরা হবে। - বুখারী শরীফ।
এই বিধান কি অহংকারের সাথে সম্পৃক্ত?
অনেকেই টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করে এবং যুক্তি দেখায় যে আমি তো অহংকার বশতঃ কাপড় টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরি নাই। আমি আমি এমনিতেই পরিছি। কাজেই এতে তেমন অসুবিধা নেই! কিন্তু বাস্তবতা হলো, তার এই যক্তি সঠিক নয়। নিচের হাদিসটি দেখুন।
مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلاَءَ لَمْ يَنْظُرِ الله إلَيْهِ يَوْمَ الْقِياَمَـةِ
“যে ব্যাক্তি অহংকার বশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরিধান করবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না” এখান থেকে বুঝা গেলে অহংবোধের কারণে কাপড় ঝুলালে ওপরোক্ত শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আর যদি অহংবোধ না থাকলে তাহলে সেটাও নিষিদ্ধ। তার প্রমাণ হলো ওপরে বর্ণিত প্রথম হাদিস। যাতে নবী সা. ইরশাদ করেছেন
ماَ أسْفَلَ الكعبين مِـنَ الإزاَرِ فَفِيْ النّـارِ
“যে টাখনুদ্বয়ের নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা হত তা আগুনের মধ্যে জ্বলবে” এ হাদিসে দোযখের আগুনে টাখনু জ্বলার ব্যাপারে অহঙ্কারের কথা উল্লেখ নেই।
আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন,
إِزْرَةُ الْمُؤْمِنِ إِلَى نِصْفِ السَّاقِ وَلا حَرَجَ أَوْ لا جُنَاحَ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْكَعْبَيْنِ ومَا كَانَ أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَمَنْ جَرَّ إِزَارَهُ بَطَرًا لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِياَمَةِ
“মুমিম ব্যাক্তির কাপড় নেসফে সাক তথা অর্ধ হাঁটু পর্যন্ত, এতে কোন অসুবিধা নেই” (হাঁটু থেকে পায়ের তোলার মধ্যভাগকে নেসফে সাক বলা হয়) অন্য বর্ণনায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরুপ বলেনঃ “পায়ের টাখনু এবং হাটুর মধ্যবর্তী স্থানে কাপড় পরিধান করাতে কোন অসুবিধা নেই। যে টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা হবে তা জাহান্নামে যাবে, এবং যে ব্যাক্তি অহংকার বশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে পরবে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না”।
দেখুন, এই হাদিসে দুইটি বিধান একসাথে বলা হয়েছে।
অতএব অহংকারের উদ্দেশ্য থাকলে টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা যাবে না আর অহংকারবোধ না থাকলে পরা যাবে এটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সালাফ থেকে এমনটি বর্ণিত নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সহিহ বুঝ দান করুন। আমিন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইমাম বুখারী, উত্তরা, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন