আমলের সূরাগুলো মোবাইলে শুনা যাবে কি না
প্রশ্নঃ ১৫৯১০৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার প্রশ্নটি হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরে যে পাঁচটা সূরা আছে ওই সূরা গুলা যদি আমি না পড়ে মোবাইলে শুনি তাহলে কি সওয়াব হবে।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কুরআন তিলাওয়াত নিজে মুখে পড়া এবং অন্যের কাছ থেকে শোনা উভয়টিই ইবাদত।
কুরআনের অনেক আয়াত ও রাসূল সা.-এর অনেক হাদিসে কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
{ الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِ أُولَئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمَنْ يَكْفُرْ بِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} [البقرة: 121]
অর্থাৎ, আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা সেটাকে যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে, তারা তার উপর বিশ্বাস করে। আর যারা তা অস্বীকার করে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। [আল-বাকারা : ১২১]
অন্য এক আয়াতে বলেন,
{ وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ} [الأعراف: 204]
অর্থাৎ, আর যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং চুপ থাকবে, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো। [আরাফ : ২০৪]
রাসূল সা. হাদিসে বলেন,
عبدالله بن مسعود رضي الله عنه أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قال: «من قرأ حرفًا من كتاب الله فله به حسنة، والحسنة بعشر أمثالها، لا أقول: ألم حرف بل ألف حرف ولام حرف وميم حرف (صحيح) صحيح الترمذي ج3 حديث 2327.
অর্থাৎ, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কুরআন থেকে একটি হরফ পড়বে তার কারণে তাকে একটি নেকি দান করা হবে, এবং তা আরও দশগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। আমি বলছি না ‘আলিফ লাম মিম’ একটি হরফ; বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ এবং ‘মিম’ আরেকটি হরফ। [তিরমিযি : ৩/২৩২৭]
এমনিভাবে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণেরও ফজিলত রয়েছে। যেমনটি আমরা উল্লেখিত প্রথমে আয়াতে দেখতে পাই, তাতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা মনোযোগ দিয়ে শুনলে এবং চুপ থাকলে অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।
এছাড়া হাদিসেও কুরআন তিলাওয়াত শুনার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
তবে শুনার সাওয়াব তিলাওয়াতকারীর সাওয়াবের মত হবে না; কেননা যে তিলাওয়াত করে সে শুনেও। তবে হ্যা, প্রত্যেকের সাওয়াবের পরিমাণ নির্ধারণ হবে প্রত্যেকের ইখলাসের ভিত্তিতে। সুতরাং যেখানে সরাসরি কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে ওই ফজিলত অর্জন করার জন্য তিলাওয়াতই করতে হবে। তবে হ্যাঁ শ্রবণ করলে তার সাওয়াব অবশ্যই পাওয়া যাবে; কেননা এটিও একটি স্বতন্ত্র ইবাদত; কেননা আল্লাহ তাআলা কুরআন তিলাওয়াত হলে শুনতে বলেছেন এবং চুপ থাকতে বলেছেন। এমনিভাবে যে তিলাওয়াত করতে পারে না সে একেবারে কিছু না করার চেয়ে শ্রবণ করাই উত্তম হবে।
আর মোবাইলে খারাপ কিছু শুনলে বা দেখলে যদি গুনাহ হয়, তাহলে ভালো কিছু শুনলে সওয়াব হবে না কেন; এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে আমরা আল্লাহর রহমতের কাছে এই আশা রাখতে পারি যে, কোরআন তেলাওয়াত মোবাইল থেকে শুনলেও সওয়াব পাওয়া যাবে।
তবে মনে রাখতে হবে যে, কোরআন তেলাওয়াত মনোযোগসহ শ্রবণ করা আবশ্যক। (ফাতওয়ায়ে শামী-১/৫১০)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
রেফারেন্স উত্তর :
প্রশ্নঃ ৩২৫৯৪. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমার প্রশ্ন গুলো হলো - ১. খতম তারাবি পড়লে কি কোরআন খতমের সওয়াব পাওয়া যায়? ২. কোরআন তিলাওয়াত শোনা এবং পড়ার সওয়াব কি একই? ৩. সম্পূর্ণ কুরআনের তেলাওয়াত শোনার মাধ্যমে কি কোরআন খতমের সওয়াব পাওয়া যাবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কুরআন তেলাওয়াত শোনার চেয়ে নিজে কুরআন তেলাওয়াত করার সওয়াব বেশি, যদিও কুরআন তিলাওয়াত করা এবং কুরআন শোনা উভয়ই মুস্তাহাব আমল এবং অনেক সওয়াবের কাজ, তবে কুরআন তিলাওয়াত কুরআন শোনার চেয়ে উত্তম কাজ। হাদিস শরীফে আছে হজরত আবু মুসা আশআরীর রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন,
مَثَلُ الَّذِى يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَالأُتْرُجَّةِ طَعْمُهَا طَيِّبٌ وَرِيحُهَا طَيِّبٌ وَالَّذِى لاَ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَالتَّمْرَةِ طَعْمُهَا طَيِّبٌ وَلاَ رِيحَ لَهَا ‘‘
যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে তার উদাহরণ একটি কমলালেবুর মতো, যার স্বাদ এবং সুগন্ধ রয়েছে এবং যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত করে না তার উদাহরণ একটি খেজুরের মতো, যার স্বাদ ভাল। কিন্তু কোন গন্ধ নেই (সহীহ বুখারীঃ ৫০২০, সহীহ মুসলিমঃ ৭৯৭।)
(২) আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
" أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ إِذَا رَجَعَ إِلَى أَهْلِهِ أَنْ يَجِدَ فِيهِ ثَلاَثَ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ " . قُلْنَا نَعَمْ . قَالَ " فَثَلاَثُ آيَاتٍ يَقْرَأُ بِهِنَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلاَتِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ ثَلاَثِ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ " .
তোমাদের কেউ কি এ কথা পছন্দ করে যে, যখন সে তার বাড়ীতে ফিরে যায় তখন সেখানে সে তিনটি গর্ভবর্তী তাজা উট পেয়ে যাবে? আমরা বললাম জ্বী, হ্যাঁ! তিনি বললেন তা হলে তিনটি আয়াত যা তোমাদের কেউ তার নামাযে পাঠ করে তা তার জন্য তিনটি গর্ভবর্তী মোটা তাজা উটের চেয়ে উত্তম।
সহীহ মুসলিম , হাদিস নং: ১৭৪৫ আন্তর্জাতিক নং: ৮০২
হাদিসের লিংকঃ HTTPS://MUSLIMBANGLA.COM/HADITH/8794
(৩) আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেনঃ
" مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে তার নেকী হবে। আর নেকী হয় দশ গুণ হিসাবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম মিলে একটি হয়ফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, এবং মীম আরেকটি হরফ।
জামে' তিরমিযী, হাদিস নং: ২৯১০ আন্তর্জাতিক নং: ২৯১০
হাদিসের লিংকঃ HTTPS://MUSLIMBANGLA.COM/HADITH/32555
এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, কুরআন শোনার চেয়ে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব বেশি, কারণ এগুলো পড়ার সাথে সম্পর্কিত।
তেলাওয়াত শোনার সাওয়াব:
অবশ্যই তেলাওয়াত শোনাও একটি মুস্তাহাব কাজ এবং নিম্নোক্ত হাদীসটি এর পক্ষে প্রমাণ বহন করে।ইবরাহিম নাখায়ী ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে বললেন,
اقْرَأْ عَلَيَّ ، قَالَ : أَقْرَأُ عَلَيْكَ ، وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ ؟ قَالَ : إِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي ، قَالَ : فَقَرَأَ عَلَيْهِ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ النِّسَاءِ إِلَى قَوْلِهِ : { فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا } ، فَبَكَى .
আমাকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাও! তিনি আরজ করলেন, আমি আপনাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাবো! অথচ কুরআন আপনার প্রতিই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে? রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ আমি অন্যের থেকে তেলাওয়াত শোনতে পছন্দ করি, অতঃপর তিনি প্রথম থেকেই সূরা নিসা পাঠ করতে লাগলেন যখন তিনি
فَكَيفَ إِذا جِئنا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهيدٍ وَجِئنا بِكَ عَلىٰ هـٰؤُلاءِ شَهيدًا ﴿٤١﴾ سورة النساء
আয়াতে পৌঁছলেন তখন কেঁদে ফেললেন।
এই হাদিস অন্যের থেকে কুরআন তেলাওয়াত শোনার ফাজায়েল বহন করে ।
মোট কথা, উভয়টিই সওয়াবের কাজ। তবে তেলাওয়াতের সাওয়াব শ্রবণের সাওয়াব থেকে অধিক। আর ইমাম সাহেব নামাজে পড়তে থাকতে তখন মুসল্লীগণ তেলাওয়াত করবে না। তখন মুসল্লীর দায়িত্ব হলো, চুপ থেকে মনোযোগের সাথে তেলাওয়াত শ্রবণ করা। নামাজে/তারাবীহতে তেলাওয়াত করলে এবং শ্রবণ করলে উভয়েরই অধিক সওয়াব প্রাপ্তির আশা করা যায়।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া ইবরাহিমিয়া দারুল উলুম মেরাজনগর, কদমতলী, ঢাকা।
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন