মাদরাসায় বোর্ডিং না থাকলে মহল্লাবাসীর যাকাত-ফিতরা ও কুরবানীর চামড়া কালেকশন করা যাবে কিনা?
প্রশ্নঃ ১৫৩৩৪৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, মাদ্রাসায় বোর্ডিং নেই। সমস্ত ছাত্র লজিংয়ে থেকে পড়াশোনা করে। এমন মাদ্রাসায় যাকাত, ফিতরা ও কুরবানির চামড়া কালেকশন করে। কুরবানির চামড়া কিছু ফ্রিতে, আর কিছু আংশিক মূল্য নিয়ে বাকিটুকু মাদ্রাসায় দান করে। বিগত ছয় বছর যাবত এমনই চলে আসছে। মহল্লাবাসীর যাকাত, ফিতরা ও কুরবানি কি আদায় হয়েছে?
১৬ মে, ২০২৬
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
মূল প্রশ্নের উত্তর লেখার আগে কয়েকটি মূলনীতি উল্লেখ করতে চাই।
বেসরকারি তথা কওমি মাদরাসাগুলোতে ধনী ছাত্ররা নিজের প্রদেয় নিজেই প্রদান করে। আর যে ছাত্র সাধারণত গরিব ঘর থেকে আসে, তাদের ব্যয় পূর্ণাঙ্গ কিংবা আংশিক নির্বাহ করা হয় মাদরাসার লিল্লাহ তহবিল থেকে।
লিল্লাহ বোর্ডিং বলতে যে ধারণা আমরা পোষণ করি, এটাই একমাত্র লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের রূপ নয়। সাধারণভাবে লিল্লাহ বোর্ডিং বলতে এদেশের মানুষ মনে করে, একটা লঙ্গরখানা, যেখানে মাদরাসার গরিব ছাত্ররা ফ্রিতে খানা খেতে পারবে। মুসলমানরা এই লঙ্গরখানার ব্যয় তাদের যাকাত ফিতরা মান্নত থেকে নির্বাহ করবে।
লিল্লাহ বোর্ডিং এর একটা ফরমেট এমনও হতে পারে, মাদরাসার ছাত্ররা লজিংয়ে থেকে পড়াশোনা করবে, মাদরাসার লিল্লাহ তহবিল থেকে তাদের প্রতি মাসের খরচ পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক নির্বাহ করবে। বিশেষত মাদরাসায় তাদের যে সমস্ত প্রদেয়, সেগুলো এই লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে নির্বাহ করা হবে।
সুতরাং আপনার উল্লেখিত এই মাদরাসায় যদি লিল্লাহ তহবিল থাকে, সেই তহবিলের জন্য মহল্লাবাসীর কাছ থেকে যাকাত ফিতরা মান্নত এবং কুরবানীর পশুর চামড়া উঠানো হয়, তবে ঠিক আছে।
লিল্লাহ তহবিলে যেহেতু মহল্লাবাসীর যাকাত ফিতরা মান্নতের টাকা উঠানো হয়,দ্ধ তাই লিল্লাহ তহবিল থেকে একমাত্র গরিব (যাকাত গ্রহণের হকদার) ছাত্ররাই প্রাপ্য হবে। ধনী ছাত্রদেরকে এই তহবিল থেকে প্রদান করার অবকাশ নেই।
اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَالۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡہَا وَالۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُہُمۡ وَفِی الرِّقَابِ وَالۡغٰرِمِیۡنَ وَفِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ
প্রকৃতপক্ষে সদকা (যাকাত) ফকীর ও মিসকীনদের হক এবং সেই সকল কর্মচারীদের, যারা সদকা উসূলের কাজে নিয়োজিত এবং যাদের মনোরঞ্জন করা উদ্দেশ্য তাদের। তাছাড়া দাসমুক্তিতে, ঋণগ্রস্তের ঋণ পরিশোধে এবং আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের সাহায্যেও (তা ব্যয় করা হবে)। এটা আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
—সূরা তাওবাহ ৬০
===
কুরবানির পশুর গোশত আপনি চাইলে আপনার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, মাদরাসা, কিংবা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে দিতে পারেন।
আপনার দেয়া এই গোস্ত তারা খেতে পারবে। প্রয়োজনে গোস্তগুলো বিক্রি করে তেল মশলা কিংবা চাল-ডাল ক্রয় করে খেলেও আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়।
কুরবানীর পশুর গোশত যেমন কাউকে দেওয়া যায়, চামড়াটাও তেমনি ভাবে দেয়া যায়।
যাকে কুরবানির পশুর চামড়া প্রদান করলেন, তিনি চাইলে এই চামড়া শুকিয়ে নিজের ব্যবহারে রাখতে পারেন। অথবা চামড়াটি বিক্রি করে তার মূল্য দিয়ে ডাল ভাত খেতে পারেন। এইতেও আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়।
আপনি আপনার নতুন আত্মীয় যেমন শ্বশুর বাড়ি, মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি, বেয়াই সাহেবের বাড়ি, যেকোনো আত্মীয়ের বাড়িতে যেমন কুরবানীর গোশত হাদিয়া পাঠাতে পারেন, তেমনিভাবে তাদের বাড়িতে কুরবানির পশুর চামড়াও পাঠাতে পারবেন। কেননা কুরবানির গোশতের যেই হুকুম, পশুর চামড়ার একই হুকুম।
কুরবানির গোস্ত যেমন গরিব আত্মীয়কে দেওয়া যায়, ঠিক তদ্রুপ ধনী আত্মীয়কেও দেওয়া যায়।
একই ব্যাপার চামড়ার ক্ষেত্রেও। কেননা ইসলামের কোথাও কুরবানির পশুর গোশত ও চামড়ার হুকুমের মধ্যে পার্থক্য করেনি।
পার্থক্য হবে শুধুমাত্র তখন, যখন আপনি আপনার কুরবানি দেওয়া এই পশুর চামড়া বিক্রি করে দিবেন। তখন তার মূল্য শুধুমাত্র গরীব মিসকিনকেই দিতে পারবেন। ধনীদেরকে দিতে পারবেন না।
কিন্তু আপনাকে যদি কেউ কুরবানীর গোশত হাদিয়া দেয়, সেটা আপনি বিক্রি করার সুযোগ রাখেন। তদ্রুপ আপনাকে যদি কেউ কুরবানীর পশুর চামড়া প্রদান করে সেটাও আপনি বিক্রি করার হক রাখেন। এবার এই চামড়া বিক্রির মূল্য আপনি নিজের প্রয়োজন মত ভোগ করতে পারবেন। (নিজের কুরবানির পশুর গোশত বা চামড়া বিক্রির মূল্য ভোগ করতে পারবেন না)
আপনার উল্লেখিত মাদরাসা এলাকা থেকে কুরবানীর পশুর চামড়া উঠানো সম্পূর্ণ ঠিক আছে। এমনকি এই মাদরাসার ছাত্ররা যদি লজিংয়ে অবস্থান করে পড়াশোনা করে তাতেও এ মাদরাসা কুরবানীর পশুর চামড়া কালেকশন করতে পারে।
قال الماوردي في الحاوي:
أما بيع لحم الأضحية، فلا يجوز في حق المضحي لقول الله تعالى: {فكلوا منها وأطعموا البائس الفقير} فنص على أكله، وإطعامه، فدل على تحريم بيعه.....
وأما الفقراء فعلى المضحي أن يدفع إليهم منها لحما، ولا يدعوهم لأكله مطبوخا ...
فإذا أخذوه لحما جاز لهم بيعه، كما يجوز لهم بيع ما أخذوه من الزكوات، والكفارات، وإن لم يجز المزكي، والمكفر بيعه. اهــ.
আপনার উল্লিখিত মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যদি যাকাত ফিতরার টাকাগুলো কালেকশন করার পর যথাযথভাবে গরিব ছাত্রদের পিছনে নিয়ম তান্ত্রিকভাবে ব্যয় করে থাকে, তাহলে এলাকাবাসীর যাকাত ফিতরা আদায় হয়েছে ইনশাআল্লাহ।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসহাক মাহমুদ
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া
খতীব, নবোদয় সি ব্লক জামে মসজিদ, মোহাম্মদপুর
ইমাম, বায়তুল ওয়াহহাব জামে মসজিদ, মোহাম্মদপুর
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া
খতীব, নবোদয় সি ব্লক জামে মসজিদ, মোহাম্মদপুর
ইমাম, বায়তুল ওয়াহহাব জামে মসজিদ, মোহাম্মদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১