গাশত কি? গাশতের ফায়দা কি?
প্রশ্নঃ ১৪৮৬৯. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, গাশত কি? গাশতের ফায়দা কি?
৩ মার্চ, ২০২২
ঢাকা
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
গাশত - এটি ফার্সি শব্দ যার অর্থ বা উদ্দেশ্য হলো ( দ্বীনের দাওাত নিয়ে ) ঘুরাফেরা করা।
এ বিষয়ে একটি অনুলিপি তুলে ধরা হলো>>>>----
গাশতের আদব।
ইন্নাল হামদা লিল্লাহ
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আ'লা রাসুলিহিল কারীম
আম্মাবাদ,
মেরে ভাই, আযিয ও দোস্ত! বুযুর্গ ,আল্লাহপাক মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি সুখ সফলতা রেখেছেন একমাত্র দ্বীনের মধ্যে। যেমন মাছের শান্তি রেখেছেন পানির মধ্যে। আল্লাহপাকের হুকুম নবীর তরীকায় পুরা করাকে দ্বীন বলে।
মানুষ যখনই দ্বীন থেকে গাফেল হয়ে গেছে, আখিরাতকে ভূলে দুনিয়ামুখী হয়েছে, একমাত্র আল্লাহপাকের উপর ভরসাকে ছেড়ে সৃষ্ট বস্তুর উপর একীন করেছে তখনই আল্লাহপাক মানুষের কামিয়াবী ও নাজাতের জন্য পর্যায়ক্রমে লক্ষাধিক নবী রাসূলকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। দাওয়াতের এই মেহনত করতে গিয়ে কোন নবীকে আগুনের মধ্যে যেতে হয়েছে, কাউকে মাছের পেটে যেতে হয়েছে, কারও শরীর থেকে লোহার চিরুনী দ্বারা চামড়া-গোশত খসিয়ে নেওয়া হয়েছে। তথাপি তারা কেহ দ্বীনের মেহনতে সামান্যটুকু কমতি করেন নি।
হযরত ঈসা (আ:) এর পর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়ত প্রাপ্তি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় দাওয়াতের মেহনত বন্ধ থাকায় গোটা আরব বদ্বীনীতে ভরপুর হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে তারা নিজের কন্যা সন্তা নকে জীবন্ত কবর দিয়েছে। এমনকি ক্বাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ঢুকিয়েছিল। এজন্য ঐ যুগকে অন্ধকার যুগ বলা হয়। এজন্য আল্লাহপাক দয়াপরবশ হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সারা দুনিয়ার সমস্ত মানব জাতির হেদায়েতের জন্য হযরত মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আখেরী নবী করে দুনিয়ায় পাঠালেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পর মাত্র ২৩ বছরের মেহনতে সেই অসভ্য, বর্বর, ঘৃনীত মানুষগুলো সোনার মানুষে পরিনত হলেন।
যেহেতু আর কোন নবী দুনিয়াতে আসবেন না তাই এই মেহনতের জিম্মাদারী এখন আমাদের সবার উপর। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ ۗ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ ۚ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ
" তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। মানুষের মঙ্গলের জন্যই তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমাদের শ্রেষ্ঠত্বের কারন এই যে, তোমরা সৎকাজের আদেশ করে থাক ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান করে থাক এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনিয়া থাক। (আল কোরআন ৩ঃ১১০ )” মুসলমান যে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি এবং সেরা উম্মত বহু হাদিসের দ্বারা সেটা প্রমাণিত হয়েছে, কোরআনে পাকেও বিভিন্ন আয়াতে তা উল্লেখ আছে। উল্লেখিত আয়াতেও মুসলমানদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলে ঘোষনা করা হয়েছে এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কারনও বর্ননা করা হয়েছে। তা এই যে আমরে বিল মা'রুফ, নেহি অনিল মোনকার অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। আমরা যদি এই দাওয়াতের মেহনত না করি কাল কিয়ামতের মাঠে আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে। আর আমরা যদি এই মেহনত করি আল্লাহপাক আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে ইজ্জত ও সম্মান দান করবেন। এই মেহনত করার জন্য সবাই তৈয়ার আছি না ভাই ?
ফজীলত:
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
১. আল্লাহপাক বলেন ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে ভাল কথা কার হতে পারে যে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকে এবং নেক আমল করে এবং বলে যে নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের মধ্যে একজন।(আল-কোরআন)
২.আল্লাহপাকের রাস্তায় এক সকাল অথবা এক বিকাল ব্যয় করা দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে উত্তম।(বোখারী)
৩.আল্লাহর রাস্তার ধূলাবালি আর জাহান্নামের ধূয়া কখনো একত্রিত হবে না।(তিরমিযি)
৪. আল্লাহর রাস্তায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা শবে ক্বদরের রাত্রে হাজরে আসওয়াদ পাথরের পার্শ্বে দাড়িয়ে সারারাত ইবাদকত করার চেয়ে উত্তম।(ইবনে হিব্বান)
৫. আল্লাহর রাস্তায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকা আপন ঘরে থেক ৭০ বছর নামায পড়ার চেয়ে উত্তম।(তিরমিযী)
তরতীব:
জামাতের মধ্যে দুইটি অংশ হইবে একটি মসজিদের ভিতরে থাকবে আর অন্যটি গাস্তে যাবে। যে জামাত গাস্তে যাবে তাতে থাকবে এককন রাহবার, এককন মুতাকাল্লিম,কয়েকজন মামুর এবং একজন যিম্মাদার।রাহবার এলাকার লোক হইলে খুব ভাল হয়।
সারা দুনিয়াকে সামনে নিয়ে আল্লাহপাকের রাজির জন্য গাস্তে যাওয়া।
গাস্তে যাওয়ার আগে নিজের দুর্বলতা পেশ করে দোয়া করা।
৭-১০ জন সাথী হলে ভালো হয়।
নজরের হেফাজত করা।
জিকিরে ফিকিরে যাওয়া।
রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলা।
মহল্লার শেষ প্রান্ত থেকে শুরু করে মসজিদের দিকে আসা।
মসজিদেও আমল চলবে। এক ভাই ঈমান একীনের কথা বলবে, কিছু ভাই কথা শুনবে, ২/১ ভাই এস্তেকবাল করবে, ২/১ ভাই দোয়া ও জিকিরে লিপ্ত থাকবে।
রাহবারের কাজঃ
রাহবারের কাজ হলো মহল্লার ডান দিক দিয়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে এক এক করে সকল লোকের নিকট জামাতকে নিয়ে যাওয়া এবং সালাম দিয়ে বলা যে আল্লাহর রাস্তার মেহমানেরা আসছে আপনার সাথে কথা বলবে। যদি তিনি কাজে ব্যস্ত থাকেন তবে কাজ থেকে ফারেক করে মুতাকাল্লিমের কাছে নিয়ে আসবেন।রাহবার মুতাকাল্লিম,যিম্মাদার ছাড়া অন্য কেউ সালাম দিবেন না, সালামের উত্তরও দিবেন না।
মুতাকাল্লিমের কাজঃ
মুতাকাল্লিম ভাই নরম নরম স্বরে তিন কথার উপর দাওয়াত দিবেন। তাওহীদ,রিসালাত এবং আখিরাতের উপর।দাওয়াত এমনভারে দিতে হবে যে যেন বয়ানও না হয় এবং এলানও না হয়।
-------------------------------------
তাবলীগ জমাতের সাথে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কিছু পরিভাষা প্রচলিত। এটার বাংলা পরিভাষা অনেকেই জ্ঞাত নয়, একারণে বিষয়টি নিয়ে অনেক জিজ্ঞাসা। পাঠকের কথা বিবেচনা করে এখানে অতি ব্যবহৃত পরিভাষা সমূহ উপস্থাপন করা হচ্ছে। পাঠক মনে রাখা প্রয়োজন ভারতবর্ষে যাদের দ্বারা এটি উদ্বোধিত হয়েছিল তাদের ভাষা ছিল উর্দু। সে কারণে উর্দুর আধিক্য লক্ষ্য করা যায়।পাশাপাশি রয়েছে আরবী শব্দের আধিক্য।
ইজতেমা : সমাবেশ, মহাসমাবেশ
তাবলিগ : পৌঁছানো, প্রচার করা
আমির : দলপতি, নেতা
রাহবার : পথপ্রদর্শক
মামুর : আমিরের অনুসরণকারী
মুতাকাল্লিম : কথক, বক্তা
গাশত : ভ্রমণ, ঘোরাফেরা করা
উমুমি গাশত : দলবদ্ধভাবে দাওয়াতে গমন
খুসুসি গাশত : বিশেষ কাউকে দাওয়াত দেয়ার জন্য ভ্রমণ করা
তাশকিল : গঠন, রূপদান (জামাত গঠন করা)
তালিম : শিক্ষা (শিক্ষার আসর)
আম বয়ান : সবার উদ্দেশে দেয়া বক্তৃতা
খাস বয়ান : বিশেষ কোনো শ্রেণীর জন্য প্রদত্ত বক্তৃতা
তায়ারুফি বয়ান : (যে কোনো স্থানে জামাত যাওয়ার পর দেয়া) পরিচিতিমূলক বয়ান
ছয় নম্বর : তাবলিগে অগ্রাধিকার দেয়া সাহাবিদের বিশেষ ছয় গুণ
একরাম : সম্মান দেখানো, সহযোগিতা বা খেদমত করা।
ইস্তেকবাল : অভ্যর্থনা
খেদমত : সেবা করা (জামাতের সাথীদের খাবার আয়োজনের দায়িত্ব)
মাশওয়ারা : পরামর্শ
সামানা : আসবাবপত্র
খিত্তা : টুকরো জায়গা, এলাকা (ইজতেমা মাঠের এলাকা নির্ধারক নাম)
চিল্লা : ৪০ দিনের জন্য বিভিন্ন মসজিদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়া
তিন চিল্লা : চার মাস মেয়াদে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়া
সাল : এক বছর আল্লাহর রাস্তায় কাটানো।
জোড় : বিভিন্ন স্তরের সাথীদের বিশেষ সম্মেলন।
শবগুজারি : তাবলিগের মারকাজে (আল্লাহর রাস্তায়) রাতযাপন।
নুসরত : সাহায্য করা (বহিরাগত জামাতের কাজে সহযোগিতা করা)।
উসুল : আদায় করা (তাবলিগি সফরের জন্য কাউকে বের করে আনা)।
মোজাকারা : পরস্পর আলোচনা।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
মুসলিম বাংলা ফাতওয়া বিভাগ
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১