ঈদের পরে শশুর বাড়ি/অন্যান্য আত্মীয়দের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া জায়েজ।
প্রশ্নঃ ১৪৫৭৯২. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আমি জানতে চাই ঈদের নামাজ পড়ে শশুর বাড়ি ঘুরতে যাওয়া যাবে কি আর যদি যাওয়া যায় তাহলে শরীয়ত বিধান কি আছে , কুরআন হাদীসের আলোতে জানাবেন
২৩ মার্চ, ২০২৬
Tamil Nadu ৬০০০৬৮
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি ভাই!
বর্তমান যুগে মানুষ নিজ নিজ কাজ, চাকরি ও দুনিয়াবি ব্যস্ততায় এতটাই নিমগ্ন থাকে যে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। অথচ ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (صلة الرحم) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ
“তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও, এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক (নষ্ট করা) থেকে বিরত থাকো।”
— (সূরা আন-নিসা ৪:১)
তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন:
অন্যান্য মানুষ অপেক্ষা আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বেশি থাকায় তাদের অধিকারও যেহেতু অন্যদের তুলনায় বেশি, তাই তাদের অধিকারসমূহ আদায়ে অধিকতর যত্নবান থাকা।
তাফসীরে মা‘আরেফুল কুরআন:
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কঃ আলোচ্য সূরার সূচনাতেই আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। ’আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক’ কথাটি অত্যন্ত ব্যাপক। এর দ্বারা সব রকম আত্মীয়ই বোঝানো হয়েছে। কালামে পাকে ’আরহাম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলত একটি বহুবচনবোধক শব্দ। এর একবচন হচ্ছে ’রিহম’। আর ’রিহম’ অর্থ জরায়ু বা গর্ভাশয় অর্থাৎ জন্মের প্রাক্কালে মায়ের উদরে যে স্থানে সন্তান অবস্থান করে। জন্মসূত্রেই মূলত মানুষ পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বুনিয়াদকে ইসলামী পরিভাষায়—’সেলায়ে-রিহমী’ বলা হয়। আর এতে কোন রকম ব্যত্যয় সৃষ্টি হলে তাকে বলা হয় ‘কেতয়ে-রিহমী’।
হাদীস শরীফে আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার রিযিকের প্রাচুর্য এবং দীর্ঘ জীবনের প্রত্যাশা করে, তার উচিত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলা।” – (মিশকাত, পৃ. ৪১৯)
এ হাদীসে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সু-সম্পর্ক রাখার দুটি উপকারিতা বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সু-সম্পর্ক রাখলে পরকালে তো কল্যাণ লাভ হবেই, ইহকালেও সম্পদের প্রাচুর্য এবং আল্লাহর রাসূল (সা)-এর পক্ষ থেকে দীর্ঘ জীবন লাভের আশ্বাস সম্পর্কিত সু-সংবাদ দেওয়া হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা) বলেনঃ মহানবী (সা)-এর মদীনায় আগমনের সাথে সাথে আমিও তাঁর দরবারে গিয়ে হাযির হলাম। সর্বপ্রথম আমার কানে তাঁর যে কথাটি প্রবেশ করল, তা হলো এইঃ
يا ايها الناس افشوا السلام واطعموا الطعام وصلو الارحام وصلوا بالليل والناس نيام تدخلوا الجنة بسلام
—হে লোক সকল! তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বেশি বেশি সালাম দাও। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য মানুষকে খাদ্য দান কর। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোল এবং এমনি সময় নামাযে মনোনিবেশ কর, যখন সাধারণ লোকেরা নিদ্রামগ্ন থাকে। স্মরণ রেখো, এ কথাগুলো পালন করলে তোমরা পরম সুখ ও শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।—(মিশকাত, পৃ. ১০৮)
অন্য এক হাদীসে আছেঃ উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মুনাহ (রা) তাঁর এক বাদীকে মুক্ত করে দিলেন। অতঃপর মহানবী (সা)-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছালেন, তখন তিনি বললেন, ’তুমি যদি বাঁদীটি তোমার মামাকে দিয়ে দিতে, তাহলে বেশি পুণ্য লাভ করতে পারতে।’ —(মিশকাত, পৃ. ১৭১)
ইসলাম দাস-দাসীদের আযাদ করে দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছে এবং একে অতীব পুণ্যের কাজ বলে আখ্যায়িত করেছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক রাখাকে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী (সা) এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেনঃ
الصدقة على المسكيـن صدقة وهي على ذي الرحم ثنتان صدقة
——’কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করলে সদকার সওয়াব পাওয়া যাবে। কিন্তু কোন নিকটাত্মীয়কে সাহায্য করলে একই সঙ্গে সদকা এবং আত্মীয়তার হক আদায়ের দ্বৈত পুণ্য লাভ করা যায়।’ –(মিশকাত, পৃ. ১৭১)
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাদের অধিকার আদায় যেমন অত্যন্ত পুণ্যের কাজ, তেমনি তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকেও মহানবী (সা) অত্যন্ত গর্হিত কাজ বলে উল্লেখ করেছেন।
এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ لايدخل الجنة قاطع — ’যে ব্যক্তি আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ –(মিশকাত, পৃ. ৪১৯)
لا تنزل الرحمة على قوم فيه قاطع رحم
—যে কওমের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী কোন ব্যক্তি বিরাজ করবে, তাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হবে না।’ –(মিশকাত, পৃ. ৪২০ )
আয়াতের শেষাংশে মানুষের অন্তরকে আত্মীয়-স্বজনের অধিকার আদায়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বলা হয়েছেঃ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে খুবই সচেতন ও পর্যবেক্ষণকারী। আল্লাহ তোমাদের অন্তরের ইচ্ছার কথাও ভালোভাবে অবগত রয়েছেন। কিন্তু যদি লোকলজ্জার ভয়ে অথবা সমাজ ও পরিবেশের চাপে পড়ে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদ্ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর কাছে এর কোন মূল্য নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহকে ভয় করার কি তাৎপর্য রয়েছে, তাও অনুধাবন করতে কোন বেগ পেতে হয় না। কারণ, তাঁকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। তিনি সর্বক্ষণই মানুষের আচার-আচরণ ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে থাকেন।
https://muslimbangla.com/sura/4/tafsir/1
আরেক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ
“আত্মীয়-স্বজনকে তার হক প্রদান করো।”
— (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৬)
https://muslimbangla.com/sura/17/tafsir/26
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন:
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
“যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ুতে বরকত দেওয়া হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।”
— (সহীহ বুখারী: 5986, সহীহ মুসলিম)
https://muslimbangla.com/hadith/5560
আত্মীয়তার খোঁজ-খবর নেওয়া শুধু সামাজিক কাজ নয়; বরং এটি একটি বড় সাওয়াবের আমল। যেহেতু সারা বছর ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখা হয়ে ওঠে না, তাই ঈদের মতো আনন্দের সময়, যখন মানুষ কিছুটা অবসর পায়, তখন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের বাড়িতে যাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ এবং প্রশংসনীয়। এতে ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়, সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ পালন করা হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, এ ধরনের যাওয়া-আসাকে ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নত হিসেবে আবশ্যক মনে করা যাবে না; বরং এটি মুস্তাহাব ও ভালো কাজ হিসেবে গণ্য হবে। কেউ না গেলে তাকে দোষারোপ করাও উচিত নয়। সাক্ষাতের সময় ইসলামী আদব অনুযায়ী সালাম দেওয়া, কুশল বিনিময় করা এবং জরুরী মনে না করে প্রয়োজনমতো মুসাফাহা (হাত মিলানো) ও মুয়ানাকা (আলিঙ্গন) করা জায়েজ।
সুতরাং ঈদের নামাজের পর শ্বশুরবাড়ি বা অন্যান্য আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া- যদি উদ্দেশ্য হয় আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, তাহলে তা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে একটি উত্তম, বৈধ এবং সাওয়াবের কাজ।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
শাহাদাত হুসাইন ফরায়েজী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মুফতী, ফাতাওয়া বিভাগ, মুসলিম বাংলা
লেখক ও গবেষক, হাদীস বিভাগ, মুসলিম বাংলা
খতীব, রৌশন আলী মুন্সীবাড়ী জামে মসজিদ, ফেনী
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এ সম্পর্কিত আরও জিজ্ঞাসা/প্রশ্ন-উত্তর
মাসায়েল-এর বিষয়াদি
আল কুরআনুল কারীম
৪
হাদীস ও সুন্নাহ
৬
তাসাউফ-আত্মশুদ্ধি । ইসলাহী পরামর্শ
৩
শরীআত সম্পর্কিত
১৫
ফিতনাসমুহ; বিবরণ - করণীয়
২
আখিরাত - মৃত্যুর পরে
৩
ঈমান বিধ্বংসী কথা ও কাজ
৬
ফিরাকে বাতিলা - ভ্রান্ত দল ও মত
২
পবিত্রতা অর্জন
৮
নামাযের অধ্যায়
১৯
যাকাত - সদাকাহ
৫
রোযার অধ্যায়
৬
হজ্ব - ওমরাহ
২
কাফন দাফন - জানাযা
৫
কসম - মান্নত
১
কুরবানী - যবেহ - আকীকা
৪
বিবাহ শাদী
৮
মীরাছ-উত্তরাধিকার
২
লেনদেন - ব্যবসা - চাকুরী
৯
আধুনিক মাসায়েল
৬
দন্ড বিধি
২
দাওয়াত ও জিহাদ
৩
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
৬
সীরাতুন নবী সাঃ । নবীজীর জীবনচরিত
৩
সাহাবা ও তাবেঈন
৩
ফাযায়েল ও মানাকেব
৩
কিতাব - পত্রিকা ও লেখক
৩
পরিবার - সামাজিকতা
৭
মহিলা অঙ্গন
২
আখলাক-চরিত্র
২
আদব- শিষ্টাচার
১২
রোগ-ব্যধি। চিকিৎসা
২
দোয়া - জিকির
২
নাম। শব্দ জ্ঞান
৩
নির্বাচিত
২
সাম্প্রতিক
১
বিবিধ মাসআলা
১