অসুস্থতার সময় চিকিৎসা গ্রহণ করার বিধান
প্রশ্নঃ ১৩১৭৭৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। হুজুর, আমি একজন ছেলে, আমার বয়স ১৬ বছর। আমি একজন জেনারেল পড়ুয়া ছাত্র। দয়া করে আমার নিচের লেখাগুলো ও প্রশ্নগুলো অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়বেন এবং শরীয়তসম্মত সঠিক উত্তর দিয়ে আমাকে উপকৃত করবেন—ইনশাআল্লাহ। হুজুর, আমার মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি প্রশ্ন ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জানি—রোগ আল্লাহ তাআলাই দেন এবং আল্লাহ তাআলাই রোগ থেকে মুক্ত করেন ও সুস্থতা দান করেন। এই বিশ্বাসের আলোকে আমার প্রশ্ন হলো—যদি রোগ দেওয়া ও ভালো করা দুটোই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয়, তাহলে আমরা ঔষধ খাব কেন? চিকিৎসা গ্রহণ করব কেন? আমি দেখেছি, অনেক মানুষ আছেন যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অসুস্থ অবস্থায়ও শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে কোনো চিকিৎসা করান না এবং কোনো ঔষধও গ্রহণ করেন না। তারা বলেন—রোগ যেহেতু আল্লাহ দিয়েছেন, তিনিই ভালো করবেন। হুজুর, আমার নিজের একটি বাস্তব সমস্যার কথাও নিবেদন করছি। আমি আগে শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলাম। কিন্তু ৪ বছর হস্তমৈথুনে লিপ্ত হওয়ার পর আমার শারীরিক শক্তি অনেক কমে গেছে বলে আমি অনুভব করছি। এ কারণে আমার মনে এই চিন্তাও আসে—যেহেতু এই ঘটনাও আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় ঘটেছে, তাহলে আমি কেন চিকিৎসা করব বা ঔষধ গ্রহণ করব? এই রোগ তো আল্লাহ তাআলাই দিয়েছেন, তিনিই চাইলে ভালো করবেন—তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজন কী? এই বিষয়গুলো নিয়ে আমার অন্তরে প্রচণ্ড দ্বিধা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাই হুজুর, আমার উপরোক্ত কথাগুলো মনোযোগ সহকারে পড়ে দয়া করে নিচের প্রশ্নগুলোর শরীয়তসম্মত, স্পষ্ট ও সঠিক উত্তর দিয়ে আমাকে দিকনির্দেশনা দিবেন। আমার প্রশ্নগুলো হলো— ১. যেহেতু রোগ আল্লাহ তাআলাই দেন এবং আল্লাহ তাআলাই সুস্থতা দান করেন, তাহলে আমরা ঔষধ খাব কেন এবং চিকিৎসা গ্রহণ করব কেন? ২. আমার মনে হয়, ঔষধ খাওয়া ও চিকিৎসা করানো যেন আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শিরক করার মতো—এই ধারণাটি কি সঠিক, না ভুল? ৩. আমি যেহেতু নিজের ভুলের কারণে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছি, এখন কি আমার ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত, নাকি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে চিকিৎসা ছাড়া বসে থাকা উচিত? হুজুর, আমার অবস্থা মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তাই দয়া করে আমার লেখাগুলো ও প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে শরীয়াহসম্মত সঠিক উত্তর প্রদান করবেন—যাতে আমি সঠিক পথে চলতে পারি এবং উপকৃত হই। আপনার মূল্যবান উত্তর পাওয়ার আশায় অপেক্ষায় রইলাম। জাযাকাল্লাহু খাইরান।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
বিষয়টি নিয়ে এখানে খুব বেশি লম্বা আলোচনার সুযোগ নেই। তবে কিছু মৌলিক বিষয় আপনার সামনে তুলে ধরছি। বাকি এ বিষয় নিয়ে আপনার নিকটস্ত কোনো বিজ্ঞ আলেমের সাথে আলোচনা করার পরামর্শ থাকল, আশা করি আপনার জন্য বিষয়টি উপকারী হবে, ইনশাআল্লাহ।
প্রথমত আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তিনি আমাদেরকে কেন সৃষ্টি করেছেন সে ব্যাপারে কুরআন স্পষ্ট বলা হয়েছে। তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তার ইবাদাত করার জন্য। ইবাদাতের সরল অর্থ হলো, তার আদেশ মেনে চলা এবং তার নিষেধসমূহ থেকে বিরত থাকা। আর এর মাধ্যমেই তিনি মূলত আমাদেরকে পরীক্ষা করছেন যে, কে ভালো করে আর কে মন্দ করে। এবং তার ভিত্তিতেই আখেরাতে আমাদের প্রতিদান দিবেন।
পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয় আল্লাহর সৃষ্টি এবং তার নিয়ন্ত্রণে। তার মধ্য হতে, আমাদের অসুস্থতাও একটি বিষয়। এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরণের পরীক্ষা যে, বান্দা বিপদের সময় ধৈর্য্য ধারণ করে কি না? বিপদের সময়ও আল্লহকে স্মরণ রাখে কি না?
যেমন আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
আয়াতঃ وَلَنَبۡلُوَنَّکُمۡ حَتّٰی نَعۡلَمَ الۡمُجٰہِدِیۡنَ مِنۡکُمۡ وَالصّٰبِرِیۡنَ ۙ وَنَبۡلُوَا۠ اَخۡبَارَکُمۡ
অর্থঃ (হে মুসলিমগণ!) আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যাতে দেখে নিতে পারি তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদকারী ও ধৈর্যশীল এবং যাতে তোমাদের অবস্থাদি যাচাই করে নিতে পারি।সূরাঃ মুহাম্মাদ - আয়াত নংঃ 31
আয়াতঃ وَلَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَالۡجُوۡعِ وَنَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَنۡفُسِ وَالثَّمَرٰتِ ؕ وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ ۙ
অর্থঃ আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনও) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ 155
আল্লাহ কখনো দিয়ে, আবার কখনো নিয়ে পরীক্ষা করেন, যেটি কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে। এবং উভয় অবস্থাই যে মুমিনের জন্য কল্যাণকর তা এক হাদিসে এভাবে এসেছে,
حَدَّثَنَا هَدَّابُ بْنُ خَالِدٍ الأَزْدِيُّ، وَشَيْبَانُ بْنُ فَرُّوخَ، جَمِيعًا عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ الْمُغِيرَةِ، - وَاللَّفْظُ لِشَيْبَانَ - حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ، حَدَّثَنَا ثَابِتٌ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى، عَنْ صُهَيْبٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ " .
৭২২৯। হাদ্দাব ইবনে খালিদ আযদী ও ফাররুখ ইবনে শায়বান (রাহঃ) ......... সুহায়ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মু’মিনের অবস্থা ভারী অদ্ভুত। তাঁর সমস্ত কাজই তাঁর জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ব্যতিত অন্য কারো জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যাবস্থা নেই। তাঁরা আনন্দ (সুখ শান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়, আর দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এও তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়।
সহীহ মুসলিম, হাদীস নংঃ ৭২২৯
বাকি কোনো পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী, সেগুলোও বর্ণনা করা হয়েছে। অসুস্থতার ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূলের মাধ্যমে আমাদের কাছে যে দিক নির্দেশনা এসেছে, আমরা সেটা মেনে চলার জন্য আদিষ্ট। হ্যা, অনেক বিষয়ের তাৎপর্য আমাদের কাছে অস্পষ্ট থাকতে পারে, সেটা আমাদের আকলের বোধশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে।, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নির্দেশনাবলীর বৈপরীত্বের কারণে নয়।
এবার দেখা যাক, অসুস্থতার ক্ষেত্রে আমাদের জন্য কী নির্দেশনা রয়েছে,
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ অর্থ: "তোমরা নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।" (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫) মুফাসসিরগণের মতে, কোনো রোগ নিরাময়ের উপায় থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
সুরা নিসায় আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ অর্থ: "হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের সতর্কতা (প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা) অবলম্বন করো।" (সুরা নিসা, আয়াত: ৭১) চিকিৎসা এবং প্রতিষেধক গ্রহণ করা এই 'সতর্কতা' বা প্রতিরোধেরই অংশ।
আল্লাহ তাআলা সরাসরি ওষুধের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন:
فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ অর্থ: "তাতে (মধুতে) মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য।" (সুরা নাহল, আয়াত: ৬৯) যদি উপকরণের প্রয়োজন না থাকত, তবে আল্লাহ মধুতে আরোগ্য রেখেছেন—এই তথ্য আমাদের দিতেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبَادَةَ الْوَاسِطِيُّ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ عَيَّاشٍ، عَنْ ثَعْلَبَةَ بْنِ مُسْلِمٍ، عَنْ أَبِي عِمْرَانَ الأَنْصَارِيِّ، عَنْ أُمِّ الدَّرْدَاءِ، عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ الدَّاءَ وَالدَّوَاءَ وَجَعَلَ لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءً فَتَدَاوَوْا وَلاَ تَدَاوَوْا بِحَرَامٍ " .
৩৮৩০. মুহাম্মাদ ইবনে উবাদা (রাহঃ) .... আবু দারদা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেনঃ মহান আল্লাহ রোগ এবং ঔষধ নাযিল করেছেন। আর তিনি প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। তাই তোমরা ঔষধ ব্যবহার করবে, তবে হারাম জিনিস দিয়ে ঔষধ ব্যবহার করবে না।
সুনানে আবু দাউদ, রোগব্যধি ও চিকিৎসা-তাদবীর, হাদীস নংঃ ৩৮৩০
অন্য এক হাদিসে এসেছে,
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْمَخْزُومِيُّ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنِ ابْنِ أَبِي خُزَامَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَجُلاً، أَتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ رُقًى نَسْتَرْقِيهَا وَدَوَاءً نَتَدَاوَى بِهِ وَتُقَاةً نَتَّقِيهَا هَلْ تَرُدُّ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ شَيْئًا فَقَالَ " هِيَ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ حَدِيثِ الزُّهْرِيِّ وَقَدْ رَوَى غَيْرُ وَاحِدٍ هَذَا عَنْ سُفْيَانَ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ أَبِي خُزَامَةَ عَنْ أَبِيهِ وَهَذَا أَصَحُّ هَكَذَا قَالَ غَيْرُ وَاحِدٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ أَبِي خُزَامَةَ عَنْ أَبِيهِ .
২১৫১. সাঈদ ইবনে আব্দুর রহমান মাখযূমী (রাহঃ) ..... ইবনে আবু খিযামা তার পিতা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এসে বললঃ আপনি কি মনে করেন, এই ঝাড়-ফুঁক যা আমরা করাই, ঔষধ যা দিয়ে আমরা চিকিৎসা করি, পরহেয যার মাধ্যমে আমরা সাবধানতা অবলম্বন করি এগুলি কি আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের কিছু রদ করতে পারে? তিনি বললেনঃ এ-ও আল্লাহর তাকদীরের অন্তর্গত।
জামে' তিরমিযী, হাদীস নংঃ ২১৪৮
সুতরাং অসুস্থতার সময় ধৈর্য্য ধারণ করুন, অসুস্থতার কারণে হাদিসে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে তার আশা রাখুন। এবং নির্দ্বিধায় সম্ভাব্য সকল বৈধ পন্থায় চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে সে অনুযায়ী নিজেদেরকে পরিচালনা করার তওফিক দান করুন, আমীন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা ৷
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন