প্রশ্নঃ ১২৭৪৩. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,
আমি খাটো এই জন্য আমার বিয়ে হচ্ছে না।সবাই অপছন্দ করে।তাড়াতাড়ি বিয়ে হওয়ার জন্য কি আমল করতে হবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
নিচের উত্তরটি দেখুন।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
বাইতুল কুরআন মাদারাসা , মোহাম্মাদপুর
রেফারেন্স উত্তর :
প্রশ্নঃ ১০৬৬৬. আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, হুজুর কিছু দিন আগে ইউটিউবে দ্রুত বিয়ে হওয়ার ২ টি আমল দেখলাম। প্রথমটি হলো প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজ শেষে সূরা কাসাসের ২৪ নম্বর আয়াত ২১ বার পড়তে হবে, টানা ৪১ দিন। দ্বিতীয়টি হলো ফজর ও মাগরিবের ফরজ নামাজ শেষে বাম হাতের কব্জির উপর ডান হাতের কব্জি রেখে চাপ দিয়ে ধরে ৪১ বার ইয়া ফাত্তাহু পড়তে হবে। তবে যিনি আমলগুলো আলোচনা করেছিল, তিনি কোনো হাদীসের রেফারেন্স দেননি। এখন আমার প্রশ্ন এই আমলগুলো এবং আমলের নিয়ম গুলো কি সহীহ, এর কি কোনো হাদীস বা রেফারেন্স আছে? দয়া করে জানাবেন।
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
সম্মানিত প্রশ্নকারী!
বিবাহ আল্লাহ তায়ালার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাত। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।” —সূরা আর-রূম, ৩০:২১
বিবাহের সময় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত:
বিবাহ একটি সুন্নাত আমল। কে কখন বিবাহ করবে, তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। আল্লাহ তায়ালা চাইলে অসম্ভবকেও সম্ভব করে দিতে পারেন। আবার আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ছাড়া পৃথিবীতে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের বিবাহের উপযুক্ত বয়স অতিক্রম হয়ে গেলেও নানা কারণে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছেন না। কেউ বিবাহের প্রস্তাব পেয়েও শেষ পর্যন্ত বিবাহ করতে পারছেন না, আবার কেউ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও উপযুক্ত প্রস্তাব পাচ্ছেন না। কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যেই ভালো বিবাহের প্রস্তাব পেয়ে যান এবং দ্রুত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিষয়টি এমনই বৈচিত্রময়।
তবে এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হওয়া উচিত নয়। ধৈর্য ধরে আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা রেখে অপেক্ষা করতে হবে। কখনো কখনো বিলম্বের মধ্যেও আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য কল্যাণকর কিছু নির্ধারণ করে রাখেন। তাই দেরি হচ্ছে দেখে হতাশ না হয়ে বিশ্বাস রাখতে হবে—আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য যা কল্যাণকর, শেষ পর্যন্ত সেটিই ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
বিবাহের জন্য করণীয়:
বিবাহের জন্য দোয়া করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, জিকির-আজকার করা এবং আল্লাহর কাছে নেক জীবনসঙ্গী চাওয়া নিঃসন্দেহে বৈধ ও উত্তম আমল। তবে বিবাহ বিলম্বের কারণে হতাশ না হয়ে আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা রাখা উচিত। এ ধরনের মানুষের জন্য আমরা কিছু আমল তুলে ধরেছি।
তবে মনে রাখতে হবে যে, দ্রুত বিবাহের জন্য নির্দিষ্ট সূরা বা আয়াত নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট দিনের হিসেবে পড়ার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ প্রমাণিত কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। বরং এজাতীয় অজিফাগুলো অধিকাংশই অভিজ্ঞতা নির্ভর। সকলের ক্ষেত্রে এগুলো সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। তবে চাইলে যে কেউ আমল করে দেখতে পারে। অতএব, নিচের বিষয়গুলো এভাবেই বোঝা উচিত—
১. সূরা ইয়াসিন পড়া
সূরা ইয়াসিন কুরআনের একটি সূরা। কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে; আর একটি নেকি দশগুণ করা হয়।” —জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০
সুতরাং সূরা ইয়াসিন পড়া যাবে এবং এরপর বিবাহের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা যাবে।
২. সূরা কাসাসের ২৪ নম্বর আয়াত
হযরত মূসা (আ.)-এর এই দোয়াটি কুরআনে উল্লেখিত—رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ “হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী।” —সূরা আল-কাসাস, ২৮:২৪ । এটি অত্যন্ত সুন্দর একটি কুরআনি দোয়া। নিজের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য এ দোয়া করা যেতে পারে।
৩. ৩১৩ বার ‘আল্লাহ’ নামের জিকির:
১১ বার দরুদ শরিফ, এরপর ৩১৩ বার ‘আল্লাহ’ এবং শেষে ১১ বার দরুদ শরিফ—এভাবে ৪১ দিন আমল করার কথা বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।” —সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪১
৪. সূরা তাওবার ১২৯ নম্বর আয়াত:
আয়াতটি হলো—فَإِن تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ “অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলুন, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করি এবং তিনি মহান আরশের রব।’” —সূরা আত-তাওবা, ৯:১২৯।
আয়াতটি ১৯ বার বিসমিল্লাহ, ১১০০ বার এই আয়াত এবং শেষে ১০০ বার বিসমিল্লাহ এবং দুরুদ শরীফ পড়বে।
৫. সূরা মরিয়মের তিলাওয়াত:
সূরা মরিয়ম কুরআনের একটি সূরা। তিলাওয়াতের নিয়তে এবং বিবাহ প্রত্যাশীরা নিজের বা সন্তানের বিবাহের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করাও যাবে।
৬. ফাতেমা (রা.)-এর তাসবিহ:
হযরত ফাতেমা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ ﷺ যে তাসবিহ শিক্ষা দিয়েছিলেন, তা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
تُسَبِّحِينَ اللَّهَ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، وَتَحْمَدِينَ اللَّهَ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، وَتُكَبِّرِينَ أَرْبَعًا وَثَلَاثِينَ
অর্থাৎ, ৩৩ বার سُبْحَانَ اللهِ, ৩৩ বার الْحَمْدُ لِلَّهِ এবং ৩৪ বার اللهُ أَكْبَرُ পড়বে। —সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৭।
এটি প্রমাণিত সুন্নাত আমল। এর মাধ্যমে জীবনের অনেক কঠিন কাজ সহজ হয়ে থাকে। কাজেই বিবাহের উদ্দেশ্যে নিয়মিত এটি আমল করা যাবে।
৭. সূরা মুযযাম্মিল ২১ বার পড়া
সূরা মুযযাম্মিল কুরআনের সূরা। কুরআন তিলাওয়াত করা এবং আল্লাহর কাছে বিবাহের জন্য দোয়া করা বৈধ।
বিবাহের জন্য সর্বোত্তম আমল:
বিবাহের জন্য সাধারণভাবে বেশি বেশি দোয়া, ইস্তিগফার, দরুদ, কুরআন তিলাওয়াত ও নফল ইবাদত করা সাধ্যমতো সদকা করা উচিত। পাশাপাশি বৈধ পন্থায় বিবাহের চেষ্টা করাও জরুরি। কুরআনে নেক জীবনসঙ্গী ও পরিবার লাভের একটি সুন্দর দোয়া এসেছে—رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا “হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ করুন।”—সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪।
আর হযরত মূসা (আ.)-এর দোয়াটিও পড়া যায়— رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ “হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী।” —সূরা আল-কাসাস, ২৮:২৪
মাসআলা
বিবাহের জন্য দোয়া ও কুরআন-সুন্নাহসম্মত আমল করা জায়েজ ও উত্তম। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সূরা, আয়াত বা জিকিরকে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে ‘দ্রুত বিবাহের শরয়ি আমল’ হিসেবে প্রচার করার জন্য সহিহ দলিল প্রয়োজন। দলিল ছাড়া ১০০ বার, ৩১৩ বার, ১১০০ বার, ২১ বার বা ৪১ দিনকে শরিয়ত নির্ধারিত আমল মনে করা যাবে না।
তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কেউ কোনো বৈধ জিকির বা দোয়া নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়লে এবং সেটিকে শরিয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত মনে না করলে বিষয়টি আলাদা। কোনো আমলকে অভিজ্ঞতালব্ধ উপকারী আমল হিসেবে উল্লেখ করা হলে স্পষ্ট করে দিতে হবে যে, এর নির্দিষ্ট সংখ্যা ও ফলাফল শরিয়ত কর্তৃক প্রমাণিত নয়।
والله اعلم بالصواب
উত্তর দাতা:
বাইতুল কুরআন মাদারাসা , মোহাম্মাদপুর
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন