রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৮. সফরের আদব-বিধান

হাদীস নং: ৯৬৮
সফরের আদব-বিধান
সফরকালে চলা, যাত্রাবিরতি দেওয়া, রাত্রি যাপন করা ও সফরে ঘুমানোর আদব; রাত্রিকালীন যাত্রার ইস্তিহবাব; (যাত্রীবাহী) পশুর প্রতি কোমলতা ও পশুর সুবিধাদির প্রতি লক্ষ রাখা; পশুর পক্ষে বহন করা সম্ভব হলে নিজের পেছনে কোনও সহযাত্রী নেওয়ার বৈধতা এবং পশুর প্রতি কর্তব্যপালনে অবহেলাকারীকে তার কর্তব্যপালনের হুকুম দেওয়া

সফরে বাহনজন্তুর ভার লাঘবের প্রতি লক্ষ রাখা
৯৬৮. হযরত আনাস রাযি. বলেন, আমরা যখন কোনও মঞ্জিলে অবতরণ করতাম, তখন হাওদা না খোলা পর্যন্ত নফল নামায পড়তাম না। -আবু দাউদ
كتاب آداب السفر
باب آداب السير والنزول والمبيت والنوم في السفر واستحباب السُّرَى والرفق بالدواب
ومراعاة مصلحتها وأمر من قصّر في حقها بالقيام بحقها وجواز الإرداف عَلَى الدابة إِذَا كانت تطيق ذلك
968 - وعن أنس - رضي الله عنه - قَالَ: كُنَّا إِذَا نَزَلْنَا مَنْزِلًا، لاَ نُسَبِّحُ حَتَّى نَحُلَّ الرِّحَال. رواه أَبُو داود بإسناد عَلَى شرط مسلم. (1)
وَقَوْلُه: «لا نُسَبِّحُ»: أيْ لاَ نُصَلِّي النَّافِلَةَ، ومعناه: أنَّا - مَعَ حِرْصِنَا عَلَى الصَّلاَةِ - لا نُقَدِّمُهَا عَلَى حَطِّ الرِّحَالِ وَإرَاحَةِ الدَّوَابِّ.

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: أبو داود (2551).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটি দ্বারা জীবজন্তুর প্রতি বিশেষত বাহনজন্তর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের গভীর মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। জীবের প্রতি দয়ার এ শিক্ষা তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই পেয়েছিলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদীছে জীবজন্তুর প্রতি সদয় আচরণের তাগিদ করেছেন। ফলে সাহাবায়ে কেরামও এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। তারা যে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে এ শিক্ষার অনুসরণ করতেন, আলোচ্য হাদীছটি দ্বারা ভালোভাবেই তা বোঝা যাচ্ছে। হযরত আনাস রাযি. এতে বলছেন-

كُنَّا إِذَا نَزَلْنَا مَنْزِلًا لَا نُسَبِّحُ حَتَّى نحُلَّ الرِّحالَ

(আমরা যখন কোনও মঞ্জিলে অবতরণ করতাম, তখন হাওদা না খোলা পর্যন্ত নফল নামায পড়তাম না)। الرِّحَالُ শব্দটি رَحْلٌ এর বহুবচন। رَحْل এর অর্থ হাওদা। অর্থাৎ কাঠের তৈরি ওই আসন, যা মুসাফির বাহনজম্ভর পিঠে স্থাপিত করে তার উপর সওয়ার হয়। তাছাড়া মুসাফির সফরের প্রয়োজনীয় যেসব সামগ্রী উটের পিঠে করে নিয়ে যায়, তাকেও رحل বলা হয়ে থাকে। তো হযরত আনাস রাযি. বলছেন, আমরা যখন কোনও মঞ্জিলে পৌঁছতাম, তখন প্রথমে উটের পিঠ থেকে হাওদা ও অন্যান্য মালামাল নামাতাম। তারপর নফল নামায পড়তাম।

এ কথা সকলেরই জানা যে, সাহাবায়ে কেরাম নফল নামাযের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। অথচ তা সত্ত্বেও উটের পিঠ থেকে মালামাল না নামানো পর্যন্ত তারা নফল নামায পড়তেন না। এর উদ্দেশ্য ছিল কেবলই উট বা বাহনজন্তুকে আরাম দেওয়া। এমনিতেই আরোহী ও অন্যান্য ভার বহনের কারণে জন্তুটি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে আছে। সফরকালে এ ভার উটের পিঠে চাপানোটা আরোহীর জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু কোনও মঞ্জিলে পৌঁছার পর তো সে প্রয়োজন বাকি থাকে না। এখন উটের পিঠে তা রেখে দেওয়ার দ্বারা তাকে শুধু শুধুই কষ্ট দেওয়া হবে। জীবের প্রতি দয়ালুপ্রাণ সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে তা মেনে নেওয়াটা সম্ভব ছিল না। তাই নফল নামায খানিকটা পিছিয়ে দেওয়া হোক, কিন্তু শুধু শুধু বোঝা চাপিয়ে রেখে উটকে কষ্ট দেওয়া না হোক। এটাই তাদের পক্ষে প্রীতিকর ছিল।

বোঝা গেল জীবজন্তুকে অহেতুক কষ্ট দেওয়া কিছুতেই সমীচীন নয়। বরং যথাসম্ভব তাদেরকে আরাম দেওয়া চাই। উলামায়ে কেরামের কেউ কেউ এমনও বলেছেন, কোনও মঞ্জিলে পৌঁছার পর নিজে খানাপিনায় রত হওয়ার আগে বাহনজন্তুর খাবার ব্যবস্থা করা চাই। তারা এটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। ইমাম খাত্তাবী রহ. এ বিষয়ে একটি আরবী কবিতার অংশবিশেষও উল্লেখ করেছেন। তাতে বলা হয়েছে-

حَقُّ الْمَطِيَّةِ أَنْ يُبْدَأَ بِحَاجَتِهَا
لا أَطْعِمُ الضَّيْفَ حَتَّى أَعْلِفَ الْفَرَسَا

'এটা বাহনজন্তুর হক যে, তার প্রয়োজন আগে পূরণ করা হবে
আমি ঘোড়াকে না খাওয়ানো পর্যন্ত অতিথিকে খাওয়াই না।'

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. মুসাফিরের উচিত ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হওয়া বা ব্যক্তিগত কাজকর্ম সমাধা করার আগে পশুর পিঠ থেকে মালপত্র নামিয়ে নেওয়া।

খ. পশুপাখিকে অহেতুক কষ্ট দিতে নেই।

গ. সফর অবস্থায় নফল ইবাদত করতে দোষ নেই; বরং অন্যের হক নষ্ট না হওয়ার শর্তে তা করা পছন্দনীয়।

ঘ. সফরে বা কোনও দাওয়াতে গেলে সেখানে নিজ খাওয়াদাওয়ার আগে খাদেম ও গাড়ির চালকের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান