রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৮. সফরের আদব-বিধান

হাদীস নং: ৯৬৭
সফরের আদব-বিধান
সফরকালে চলা, যাত্রাবিরতি দেওয়া, রাত্রি যাপন করা ও সফরে ঘুমানোর আদব; রাত্রিকালীন যাত্রার ইস্তিহবাব; (যাত্রীবাহী) পশুর প্রতি কোমলতা ও পশুর সুবিধাদির প্রতি লক্ষ রাখা; পশুর পক্ষে বহন করা সম্ভব হলে নিজের পেছনে কোনও সহযাত্রী নেওয়ার বৈধতা এবং পশুর প্রতি কর্তব্যপালনে অবহেলাকারীকে তার কর্তব্যপালনের হুকুম দেওয়া

কেউ গৃহপালিত পশুর যত্ন নিতে অবহেলা করলে তাকে সতর্ক করা
৯৬৭. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন জা'ফর রাযি. বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারিতে আমাকে তাঁর পেছনে বসালেন এবং চুপিসারে আমাকে একটি কথা বললেন। সে কথা আমি কোনও লোককে বলব না। নিজ হাজত সমাধাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দিয়ে নিজেকে আড়াল করা পছন্দ করতেন, তা হতো কোনও উঁচু বস্তু বা খেজুর বাগানের দেওয়াল।

ইমাম মুসলিম হাদীছটি এরূপ সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বারকানী অনুরূপ সনদে হাদীছটিতে 'খেজুর বাগানের দেওয়াল'-এর পর অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন- সুতরাং একদা তিনি জনৈক আনসারী ব্যক্তির বাগানে প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে একটি উট দেখতে পেলেন। উটটি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, অমনি সেটি আওয়াজ করে উঠল এবং তার দু'চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির কাছে এসে তার কুঁজ ও মাথার পেছনের অংশে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে উটটি শান্ত হলো। তারপর তিনি বললেন, এই উটটির মালিক কে? কার এ উটটি? এক আনসারী যুবক এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আমার। তিনি বললেন, তুমি কি এ পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর না যে, আল্লাহ তোমাকে এটির মালিক বানিয়েছেন? এটি তো আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখ এবং বেশি কাজ করিয়ে ক্লান্ত করে ফেল। -আবু দাউদ
كتاب آداب السفر
باب آداب السير والنزول والمبيت والنوم في السفر واستحباب السُّرَى والرفق بالدواب
ومراعاة مصلحتها وأمر من قصّر في حقها بالقيام بحقها وجواز الإرداف عَلَى الدابة إِذَا كانت تطيق ذلك
967 - وعن أَبي جعفر عبد الله بن جعفر رضي الله عنهما، قَالَ: أردفني رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - ذَاتَ يَوْمٍ خَلْفَهُ، وَأسَرَّ إليَّ حَدِيثًا لا أُحَدِّثُ بِهِ أحَدًا مِنَ النَّاسِ، وَكَانَ أحَبَّ مَا اسْتَتَرَ بِهِ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - لِحاجَتِهِ هَدَفٌ أَوْ حَائِشُ نَخْلٍ. يَعنِي: حَائِطَ نَخْلٍ. رواه مسلم هكَذَا مُختصرًا. (1) [ص:290]
وزادَ فِيهِ البَرْقاني بإسناد مسلم - بعد قَوْله: حَائِشُ نَخْلٍ - فَدَخَلَ حَائِطًا لِرَجُلٍ مِنَ الأنْصَارِ، فَإذا فِيهِ جَمَلٌ، فَلَمَّا رَأى رَسولَ الله - صلى الله عليه وسلم - جَرْجَرَ وذَرَفَتْ عَيْنَاهُ، فَأتَاهُ النَّبيُّ - صلى الله عليه وسلم - فَمَسَحَ سَرَاتَهُ - أيْ: سِنَامَهُ - وَذِفْرَاهُ فَسَكَنَ، فَقَالَ: «مَنْ رَبُّ هَذَا الجَمَلِ؟ لِمَنْ هَذَا الجَمَلُ؟» فَجَاءَ فَتَىً مِنَ الأنْصَارِ، فَقَالَ: هَذَا لِي يَا رسولَ الله. قَالَ: «أفَلاَ تَتَّقِي اللهَ في هذِهِ البَهِيمَةِ الَّتي مَلَّكَكَ اللهُ إيَّاهَا؟ فَإنَّهُ يَشْكُو إلَيَّ أنَّكَ تُجِيعُهُ وتُدْئِبُهُ». رواه أَبُو داود كرواية البرقاني.
قَوْله «ذِفْرَاهُ»: هُوَ بكسر الذال المعجمة وإسكان الفاءِ، وَهُوَ لفظ مفرد مؤنث. قَالَ أهل اللغة: الذِّفْرى: الموضع الَّذِي يَعْرَقُ مِن البَعِيرِ خَلف الأُذُنِ، وَقوله: «تُدْئِبهُ» أيْ: تتعِبه.

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: مسلم 1/ 184 (342) (79)، وأبو داود (2549).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটির প্রথম অংশ সংক্ষিপ্ত, যা ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় অংশটি বিস্তারিত। ইমাম আবূ দাউদ রহ. তার হাদীছগ্রন্থে তা উল্লেখ করেছেন। হাদীছটিতে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তাঁর প্রাকৃতিক প্রয়োজন সমাধার জন্য যাচ্ছিলেন। সঙ্গে হযরত জা'ফর ইবন আবী তালিব রাযি.-এর পুত্র আব্দুল্লাহ রাযি.-কে নিয়ে নেন। আব্দুল্লাহ রাযি. উটের পিঠে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে বসেছিলেন। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কানে কানে একটি কথা বলেন। সে কথাটি কী ছিল? আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-

لَا أَحَدِّثُ بِهِ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ (সে কথা আমি কোনও লোককে বলব না)। হয়তো সে কথাটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিগত এমন কোনও কথা ছিল, যার ব্যাপক প্রচার তাঁর কাম্য ছিল না। অথবা সে কথাটি হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-এর বিশেষ কোনও ফযীলত বিষয়ক। এমনও হতে পারে যে, সে কথাটি ছিল বিশেষ কোনও ব্যক্তি বা সমষ্টি সম্পর্কিত এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপক প্রচার সমীচীন মনে করছিলেন না। তাই তিনি হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-কে তা প্রকাশ করতে নিষেধ করে দেন। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-ও সে হুকুম যথাযথভাবে পালন করেন। কারও কাছে তিনি তা প্রকাশ করবেন না বলে ব্যক্ত করেছেন এবং তিনি তা-ই করেছেন। ফলে আজও পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না সে কথাটি আসলে কী। এর ভেতর আমাদের শিক্ষা রয়েছে। গুরুজন কর্তৃক যে কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয় কিংবা যে কথার প্রকাশ ক্ষতিকর বলে মনে হয়, তা কোনওক্রমেই প্রকাশ করা যাবে না।

হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. জানান وَكَانَ أَحَبَّ مَا اسْتَتَرَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِحَاجَتِهِ هَدَفٌ أَوْ حَائِشُ نَخْل (নিজ হাজত সমাধাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দিয়ে নিজেকে আড়াল করা পছন্দ করতেন, তা হতো কোনও উঁচু বস্তু বা খেজুর বাগানের দেওয়াল)। অর্থাৎ তিনি তাঁর প্রাকৃতিক প্রয়োজন উন্মুক্ত কোনও স্থানে সারতেন না। এর জন্য তিনি কোনও আড়াল খুঁজতেন। আর তাঁর পছন্দ ছিল هدف (উঁচু কোনও বস্তু)। যেমন পাথরের বড় চাঁই, টিলা, পাহাড়, বালুর স্তূপ ইত্যাদি। অথবা তাঁর পছন্দ ছিল حَائِش نخل (খেজুর বাগানের দেওয়াল)। উল্লেখ্য, তখনও পর্যন্ত বাড়ির ভেতর হাম্মাম তৈরির প্রচলন হয়নি। লোকে মলমূত্র ত্যাগের জন্য বাড়ির বাইরে উপযুক্ত কোনও জায়গা খুঁজে নিত।

যা হোক, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রয়োজন সারার জন্য জনৈক আনসারী ব্যক্তির খেজুর বাগানের ভেতর প্রবেশ করলেন। বাগানের ভেতর একটি উট ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-

فَلَمَّا رَأَى رَسُوْلَ اللهِ ﷺ جَرْجَرَ وَذَرَفَتْ عَيْنَاهُ

(উটটি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, অমনি সেটি আওয়াজ করে উঠল এবং তার দু'চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল)। جرجر এর মূল হলো الْجَرْجَرَةُ। এর অর্থ গরগর করা, ঘোঁৎ ঘোঁৎ করা। মূলত শব্দটি উটের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। উট কোনও কারণে গলার ভেতর বার বার যে আওয়াজ করে থাকে, তাকেই الْجَرْجَرَةُ বলা হয়। উটটি এভাবে আওয়াজ করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল আর সেইসঙ্গে তার চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পড়ছিল। বোঝা যাচ্ছে সেটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পেরেছিল। বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা এর সত্যতা মেলে যে, গাছ-পাথর পর্যন্ত তাঁকে চিনত।

যা হোক, উটটির এ অবস্থা দেখে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব মায়া লাগল। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-

فَأَتَاهُ النَّبِيُّ ﷺ فَمَسَحَ سَرَاتَهُ - أَيْ: سِنَامَهُ - وَذِفْرَاهُ فَسَكَنَ (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির কাছে এসে তার কুঁজ ও মাথার পেছনের অংশে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে উটটি শান্ত হলো)। উটটির প্রতি এ আচরণ ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীর মমতা ও দয়ার প্রকাশ। তাঁর সে মমতার স্পর্শ উটটি ভালোই অনুভব করতে পারল। ফলে সে তার আওয়াজ বন্ধ করে শান্ত হয়ে গেল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটিকে শান্ত করেই ক্ষান্ত হলেন না: তিনি এর মালিককে সতর্ক করারও প্রয়োজন মনে করলেন। তিনি জানতে চাইলেন এর মালিক কে এবং সে কোথায় আছে। মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বার বর্ণনায় আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-কে বললেন, দেখো তো এই উটটি কার? আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন, আমি মালিকের সন্ধানে বের হয়ে পড়লাম। জানতে পারলাম উটটি জনৈক আনসারী ব্যক্তির। আমি তাকে ডেকে আনলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এ উটটির খবর কী? সে বলল, কী তার খবর? আল্লাহর কসম, আমি জানি না তার কী হয়েছে। আমরা এটিকে দিয়ে কাজ করিয়েছি এবং এর পিঠে করে পানি টেনেছি। পরে এটি পানি বইতে অক্ষম হয়ে যায়। তাই গত রাতে আমরা পরামর্শ করেছি যে, এটি জবাই করে গোশত বিতরণ করে ফেলব। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরূপ করো না। বরং এটি আমাকে হিবা করে দাও। কিংবা বললেন, আমার কাছে বিক্রি করো। সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আপনারই। তিনি সেটির উপর সদাকার আলামত লাগিয়ে দিলেন। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৭৫৩)

আলোচ্য বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারী أَفَلَا تَتَّقِي اللهَ فِي هَذِهِ الْبَهِيمَةِ الَّتِي مَلَكَكَ اللهُ إِيَّاهَا ؟ (তুমি কি এ পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর না যে, আল্লাহ তোমাকে এটির মালিক বানিয়েছেন)? এ বাক্যটি 'আল্লাহকে ভয় করো' অপেক্ষা বেশি বলিষ্ঠ ও বেশি হৃদয়গ্রাহী। অর্থাৎ তোমাকে এর মালিক বানানো তোমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ। সে অনুগ্রহের দাবি তুমি তাঁর শোকর আদায় করবে। সে শোকরের একটা বড় দিক তো এই যে, তুমি এটিকে ঠিকভাবে দানাপানি দেবে, ভালোভাবে এর যত্ন করবে এবং সদয়ভাবে এটিকে ব্যবহার করবে। কিন্তু তুমি তো তা করছ না। তুমি এর বিপরীতটাই করছ। আর এভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা করছ ও গুনাহগার হচ্ছ। তোমার উচিত আল্লাহকে ভয় করে এরূপ আচরণ থেকে বিরত থাকা। তা করলে তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বৃদ্ধি পাবে, তাঁর নি'আমত স্থায়ী হবে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিককে তার আচরণ সংশোধন করার প্রতি উৎসাহদানের লক্ষ্যে বলছেন- فَإِنَّهُ يَشْكُو إِلَيَّ أَنَّكَ تُجِيعُهُ وَتُدْئِبُهُ (এটি তো আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখ এবং বেশি কাজ করিয়ে ক্লান্ত করে ফেল)। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আছে, এটি অভিযোগ করছে তুমি একে দিয়ে কাজ বেশি করাও, কিন্তু খাবার কম দাও। উটটির পক্ষে এ অভিযোগ করা অসম্ভব কিছু নয়। যে আল্লাহ মানুষকে বাক্‌শক্তি দিয়েছেন, তিনি চাইলে পশুপাখিকে দিয়েও কথা বলাতে পারেন। অবলা পশুকে দিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে অভিযোগপূর্ণ কথা বলানোটা আল্লাহ তা'আলার কুদরতেরই প্রকাশ। এটা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মু'জিযা ও অলৌকিকত্বও বটে। তাঁর সঙ্গে উটের পক্ষ হতে মানবসুলভ আচরণের একাধিক ঘটনা হাদীছ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে। যেমন হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

এক আনসার পরিবারের একটি উট ছিল। সেটি দিয়ে তারা তাদের বাগানে পানির সেচ দিত। একবার এমন হলো যে, উটটি অবাধ্য হয়ে গেল। সেটি আর কাজ করতে রাজি হলো না। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে অভিযোগ জানাল। তারা বলল, আমাদের ফসল ও খেজুরের বাগান শুকিয়ে গেছে।

অথচ উটটিকে দিয়ে আর কাজ করানো যাচ্ছে না। তিনি তাদের সঙ্গে চলে আসলেন এবং তাদের বাগানে প্রবেশ করলেন। উটটি বাগানের এক কোণে অবস্থান করছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির দিকে এগিয়ে গেলেন। আনসারগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কুকুরের মতো কামড়ানো শুরু করে দিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি না জানি আপনার উপর হামলা করে বসে। তিনি বললেন, না, সে আমার কোনও ক্ষতি করবে না। ওদিকে উটটি যেই না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, অমনি তাঁর দিকে এগিয়ে আসল এবং একদম সামনে এসে তাঁর সামনে সিজদায় পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটির কপালে হাত রাখলেন। ফলে সেটি এমন বাধ্য হয়ে গেল যে, অতটা বাধ্য আর কখনও হয়নি। তিনি উটটিকে নিয়ে কাজে লাগিয়ে দিলেন। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবোধ অবলা পশুটি আপনাকে সিজদা করছে। আমরা তো বুঝমান। তাহলে আমাদেরই তো আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে আপনাকে সিজদা করা উচিত? তিনি বললেন, কোনও মানুষের জন্য অপর কোনও মানুষকে সিজদা করা বৈধ নয়। তা যদি বৈধ হতো, তবে আমি নারীকে হুকুম করতাম যেন তার স্বামীকে সিজদা করে। (মুসনাদুল বাযযার: ৬৪৫২)

হযরত জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক সফর থেকে ফিরছিলাম। পথে বনূ নাজ্জারের একটি বাগান পড়ে। সে বাগানটির ভেতর একটি উট ছিল। বাগানে কেউ ঢুকলেই উটটি তার উপর হামলা করত। বিষয়টা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হলো। তিনি বাগানে প্রবেশ করলেন এবং উটটিকে ডাকলেন। উটটি এসে তাঁর সামনে মাটির উপর মুখ রাখল এবং তাঁর সামনে বসে পড়ল।

তিনি একটি লাগাম আনিয়ে উটটিকে পরিয়ে দিলেন এবং মালিকের হাতে সেটি সমর্পণ করলেন। তারপর তিনি উপস্থিত লোকদের দিকে ফিরে বললেন, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে যা-কিছু আছে তাদের সকলেই জানে আমি আল্লাহর রাসূল। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩১৭১৯; সুনানে দারিমী: ১৮)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. প্রাকৃতিক প্রয়োজন লোকচক্ষুর আড়ালে সারা উচিত।

খ. বাহনজন্ত শক্তিশালী হলে তাতে আরোহীর পেছনে সহযাত্রী নেওয়া যেতে পারে।

গ. পালিত জন্তুকে দানাপানির কষ্ট দেওয়া জায়েয নয়।

ঘ. কারও গোপন কথা প্রকাশ করতে নেই।

ঙ. জীবজন্তুর কষ্ট দেখলে তা লাঘব করা উচিত।

চ. কেউ জীবজন্তুকে কষ্ট দিলে তাকে সতর্ক করা বাঞ্ছনীয়।

ছ. গবাদি পশুর মালিক হতে পারাটা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ। এর জন্য শোকর আদায় করা কর্তব্য।

জ. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জিযা ও অলৌকিকত্ব সত্য। তাতে বিশ্বাস রাখা জরুরি।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান