রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৮. সফরের আদব-বিধান

হাদীস নং: ৯৬৯
সফরের আদব-বিধান
সফরসঙ্গীর সাহায্য-সহযোগিতা করা: বাড়তি বাহন ও আসবাবপত্র সফরসঙ্গীকে দিয়ে দেওয়া

এ পরিচ্ছেদে বহু হাদীছ আছে, যা পেছনে গত হয়েছে। যেমন একটি হাদীছ হলো-'আল্লাহ তাঁর বান্দার সাহায্য করতে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে রত থাকে' (রিয়াযুস সালেহীন, চতুর্থ খণ্ড, হাদীছ নং ২৪৫)। আরেকটি হাদীছ হলো-'প্রতিটি সৎকর্মই একটি সদাকা' (রিয়াযুস সালেহীন, দ্বিতীয় খণ্ড, হাদীছ নং ১৩৪)। এরকম আরও আছে।
৯৬৯. হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কোনও এক সফরে ছিলাম। এ অবস্থায় উষ্ট্রারোহী এক ব্যক্তি হাজির হলো। সে ডানে-বামে তার দৃষ্টি ঘোরাতে থাকল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার কাছে অতিরিক্ত বাহন আছে সে যেন তা যার বাহন নেই তাকে দিয়ে দেয়। যার অতিরিক্ত রসদ আছে সে যেন যার রসদ নেই তাকে তা দিয়ে দেয়। এভাবে তিনি বিভিন্ন প্রকার মালের কথা উল্লেখ করতে থাকেন। তাতে আমাদের মনে হলো আমাদের কারওই অতিরিক্ত মালে কোনও অধিকার নেই। -মুসলিম (সহীহ মসলিম: ১৭২৮; সুনানে আবু দাউদ: ১৬৬৩; মুসনাদে আহমাদ: ১১২৯৩; সহীহ ইবন হিব্বান: ৫৪১৯; শু'আবুল ঈমান: ৩১১৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৬৮৬)
كتاب آداب السفر
باب إعانة الرفيق في الباب أحاديث كثيرة تقدمت كحديث:
«وَاللهُ في عَوْنِ العَبْدِ مَا كَانَ العَبْدُ في عَوْنِ أخِيهِ» (1). وحديث: «كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَة» (2) وَأشْبَاهِهِما.
969 - وعن أَبي سعيد الخدري - رضي الله عنه - قَالَ: بَيْنَمَا نَحْنُ في سَفَرٍ إذْ جَاءَ رَجُلٌ عَلَى رَاحِلَةٍ لَهُ، فَجَعَلَ يَصْرِفُ بَصَرَهُ يَمِينًا وَشِمَالًا، فَقَالَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لاَ ظَهْرَ لَهُ، وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلُ زَادٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لاَ زَادَ لَهُ»، فَذَكَرَ مِنْ أصْنَافِ المَالِ مَا ذَكَرَهُ، حَتَّى رَأيْنَا، أنَّهُ لاَ حَقَّ لأَحَدٍ مِنَّا فِي فَضْلٍ. رواه مسلم. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) انظر الحديث (565).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. জানাচ্ছেন, কোনও এক সফরে তারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। এ অবস্থায় কোনও এক ব্যক্তি নিজ বাহনে চড়ে সকলের সামনে হাজির হয়। হাদীছের শব্দ হলো راحلة। অর্থাৎ এমন পশু, যাতে আরোহণ করা হয় বা সফরে ব্যবহার করা হয়। শব্দটি সাধারণত উটের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। লোকটি এসে ডানে-বামে চোখ ঘোরাতে থাকে। অর্থাৎ সে এমন কাউকে খুঁজছিল, যে তাকে একটি বাহন দেবে। কেননা তার বাহনটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেটি তাকে ও তার মালামাল বহন করতে পারছিল না। তাই তার একটি বাহন দরকার ছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ প্রয়োজন বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি তার সমাধানকল্পে সাহাবায়ে কেরামকে হুকুম করেন-

مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٌ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا ظَهْرَ لَهُ (যার কাছে অতিরিক্ত বাহন আছে সে যেন তা যার বাহন নেই তাকে দিয়ে দেয়)। ظَهْرٌ এর অর্থ পিঠ। বাহনজন্তুর পিঠে চড়া হয় বলে শব্দটি দ্বারা গোটা বাহনকেও বোঝানো হয়। لِيَعُدْ ক্রিয়াপদটির উৎপত্তি العائدة থেকে। এর অর্থ দান করা, সাহায্য করা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোঝাচ্ছেন, যার অতিরিক্ত বাহন আছে, তার উচিত যার মোটেই নেই তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা এবং অতিরিক্ত বাহনটি তাকে দিয়ে দেওয়া। কেননা অতিরিক্তটা নিজের কাছে রাখার কোনও ফায়দা নেই। পক্ষান্তরে সেটি দিয়ে অন্যকে সাহায্য করলে ছাওয়াব পাওয়া যাবে। দুনিয়ার আসবাবসামগ্রী দ্বারা যেমন পার্থিব ফায়দা হাসিল করা উদ্দেশ্য, তেমনি তার কল্যাণমূলক ব্যবহার দ্বারা আখিরাতে ছাওয়াব অর্জন করাও উদ্দেশ্য বটে। বেকার ফেলে রাখার দ্বারা না দুনিয়ার লাভ আছে আর না আছে আখিরাতের ছাওয়াব।

সফর অবস্থায় যেমন বাহনের প্রয়োজন হয়, তেমনি প্রয়োজন হয় রসদেরও। যারা অভাবগ্রস্ত, তাদের কারও হয়তো বাহনের দরকার পড়ে, কারও দরকার পড়ে খাদ্যদ্রব্য বা অন্যকিছুর। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রসঙ্গক্রমে অন্যান্য জিনিস দ্বারাও সফরসঙ্গীর সাহায্য করার হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেন-

وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلُ زَادٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا زَادَ لَهُ (যার অতিরিক্ত রসদ আছে সে যেন যার রসদ নেই তাকে তা দিয়ে দেয়)। অর্থাৎ যার কাছে বাড়তি খাদ্যসামগ্রী আছে, সে যেন তা নিজের কাছে রেখে না দেয়; বরং যে সঙ্গীর খাবার নেই, তাকে তা দিয়ে দেয় এবং তার খাদ্যকষ্ট লাঘবের চেষ্টা করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিরিক্ত বাহন, অতিরিক্ত রসদ এবং এমনিভাবে অতিরিক্ত অন্যান্য মাল যেমন তাঁবু, কাপড়, জুতা ইত্যাদির কথা একের পর এক বলতে থাকলেন। তাতে করে সাহাবায়ে কেরামের যে অনুভূতি হয়েছিল, হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. তা এই বলে ব্যক্ত করেন যে-

فَذَكَرَ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ حَتَّى رَأَيْنَا أَنَّهُ لَا حَقَّ لأحدٍ منا فِي فضل (এভাবে তিনি বিভিন্ন প্রকার মালের কথা উল্লেখ করতে থাকেন। তাতে আমাদের মনে হলো আমাদের কারওই অতিরিক্ত মালে কোনও অধিকার নেই)। অর্থাৎ প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত যে মাল থাকে, তা নিজের কাছে রেখে দেওয়ার কোনও অধিকার নেই। যার প্রয়োজন আছে, তাকে তা দিয়ে দিতে হবে, তাতে তা যে মালই হোক। খাদ্য হোক, বাহন হোক কিংবা পোশাক বা ব্যবহারের অন্য যে-কোনও সামগ্রীই হোক।

অতিরিক্ত মালে কোনও অধিকার না থাকার দ্বারা বাহ্যত বোঝা যায় নিজের কাছে তা রাখা জায়েয নয়; অভাবগ্রস্তকে দিয়ে দেওয়া ফরয। কেউ কেউ বলেন, এটা যাকাত ফরয হওয়ার আগের কথা। তখন অতিরিক্ত মাল নিজের কাছে রাখা জায়েয ছিল না। পরে যাকাতের বিধান নাযিল হওয়ার দ্বারা তা রহিত হয়ে যায়। এখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ নিজের কাছে রেখে দেওয়া জায়েয। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তা থেকেও গরিব-দুঃখীকে দেওয়া ফরয হয়ে যায়। তাই এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-

إِنَّ فِي الْمَالِ لَحَقًّا سِوَى الزَّكَاةِ
'নিশ্চয়ই সম্পদে যাকাত ছাড়াও হক আছে।' (জামে' তিরমিযী: ৬৫৯; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৫৯২)

কারও কারও মতে অতিরিক্ত মালে অধিকার না থাকার দ্বারা তা গরিব-দুঃখীকে দিয়ে দেওয়া ফরয বা ওয়াজিব বলে বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। বরং বোঝানো উদ্দেশ্য তা জমা না রেখে দান-খয়রাত করাই বাঞ্ছনীয়। এটা করা যদিও ফরয বা ওয়াজিব নয়, তথাপি আখিরাতের সঞ্চয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এটাই অগ্রাধিকারযোগ্য। সারকথা এর দ্বারা গুরুত্বের সঙ্গে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ ও দান-খয়রাতের প্রতি উৎসাহিত করা উদ্দেশ্য।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সফরকালে বাড়তি সম্পদ দ্বারা সফরসঙ্গীদের সাহায্য-সহযোগিতা করা চাই।

খ. সফরকালে দলনেতার উচিত সচ্ছলদেরকে অভাবগ্রস্তদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনে উৎসাহ দেওয়া।

গ. কারও যদি নিতান্তই ঠ্যাকা দেখা দেয় এবং অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়ার দরকার হয়, তবে সে ক্ষেত্রে মুখে না চেয়ে হাবভাব দিয়ে বোঝানোই শ্রেয়।

ঘ. যে ব্যক্তি সফরে থাকে, তাকে যাকাতের অর্থ দ্বারাও সাহায্য করা যায়, যদিও বাড়িতে তার অর্থসম্পদ থাকে। শর্ত হলো সফরে সে এমন স্থান বা অবস্থায় আছে যে, তাৎক্ষণিক কোনো উপায়ে তার কাছে তার সম্পদ পৌঁছার মতো অবস্থা নেই।

ঙ. সওয়ালকারী যদি ভালো পোশাক পরিহিত থাকে বা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে আসে, তবুও তাকে খালি হাতে ফেরানো ঠিক নয়। কেননা বাস্তবিকপক্ষেই সে অভাবগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান